ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা পরিচয় (তৃতীয় অধ্যায়)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

1.3k

বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মাতৃভাষা। আর এই ভাষাগুলো পৃথিবীর ৪টি প্রধান ভাষা- পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এদেশে প্রচলিত বিভিন্ন ভাষার ধরন ব্যাখ্যা করলে দেখা যায় যে, ভাষাগুলোর কিছু পৃথক বৈশিষ্ট্য থাকলেও কিছু কিছু ভাষা আবার পরস্পর ঘনিষ্ঠ। আমাদের সবারই মাতৃভাষা সমান প্রিয়। তাই ভাষা কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা কোথা থেকে এল, কোন পরিবারের ভাষা, অনেক আগে এটি কেমন ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্যই এই অধ্যায়।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-

  • ভাষা সৃষ্টির ইতিহাস এবং ভাষার ধারণা ও উৎস বর্ণনা করতে পারব।
  • বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও ভাষা পরিবারের নাম উল্লেখ করতে পারব।
  • অস্ট্রো-এশিয়াটিক, চীনা-তিব্বতি, ইন্দো-আর্যীয় এবং দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের চিহ্নিত করতে পারব।
  • বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা-পরিবারের একটি অঞ্চলভিত্তিক ছক তৈরি করতে পারব।
  • বাংলাদেশের মানচিত্রে চিহ্নিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা-পরিবারের রূপরেখা বর্ণনা করতে পারব।
  • বাংলাদেশের মানচিত্র অঙ্কন করে বিভিন্ন ভাষা-পরিবারের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারব।
Content added By

ভাষা মানুষের এক অনন্য সাংস্কৃতিক অর্জন। ভাষার মাধ্যমে মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করে। তবে আদিকালে মানুষ আমাদের মতো এত সুন্দর করে ভাষার ব্যবহার শেখেনি। তারা তখন ইঙ্গিত বা ইশারার মাধ্যমে তাদের মনের কথা বা ভাব প্রকাশ করত। আসলে এভাবেই একসময় মুখ থেকে উচ্চারিত ধ্বনিগুলোকে অর্থপূর্ণভাবে সাজিয়ে ভাষার সৃষ্টি হয়। ভাষার এই সৃষ্টি কিন্তু একদিনে হয়নি। হাজার হাজার বছরের পরিবর্তন এবং মানব সভ্যতার বিকাশের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ভাষার।
ভাষা উৎপত্তির সময়কাল থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলের ও সংস্কৃতির মানুষ বিচিত্র ধরনের ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করেছে। ভাষার এই ভিন্নতাই ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন 'ভাষা পরিবার' ধারণার জন্ম দিয়েছে। বর্তমান পৃথিবীর জীবিত ও মৃত অসংখ্য ভাষার মধ্যে কোনো কোনোটির সঙ্গে অন্যগুলোর মিল দেখা যায়। আবার বিপরীত চিত্রও রয়েছে।
বর্তমান পৃথিবীতে কতগুলো ভাষা প্রচলিত রয়েছে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা এখনও সম্ভব হয়নি। তবে ভাষাবিজ্ঞানীগণ মনে করেন বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ছয় হাজার ভাষা প্রচলিত রয়েছে। পৃথিবীতে প্রচলিত প্রধান ভাষাগুলোর একটি সম্পর্ক লক্ষ্য করে ভাষাবিজ্ঞানীরা এদেরকে পরিবারভুক্ত করেছেন। এই ধারায় বাংলা, চাকমা, ইংরেজি, হিন্দি, ফারসি, ফরাসি, নেপালি ইত্যাদি ভাষাগুলো হচ্ছে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা বংশের অন্তর্ভুক্ত। দক্ষিণ ভারতের তামিল, তেলেগু, মালয়ালাম, কন্নড় এমনকি সিংহলিও দ্রাবিড় ভাষা বংশের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের খাসি, মুন্ডা, সাঁওতালির মতো ফিলিপাইন, মালয়, নিউজিল্যান্ড, হাওয়াই ফিজি প্রভৃতি দেশে প্রচলিত রয়েছে অন্ত্রিক ভাষা বংশের শাখা। আমাদের দেশের মারমা, মান্দি, ত্রিপুরা, চাক, খুমি, পাংখো প্রভৃতি; চীন, থাইল্যান্ড, মায়ানমার এবং তিব্বত অঞ্চলের ভাষাসমূহ হচ্ছে তিব্বতি-বার্মা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ভাষা-পরিবার ও পরিবারের ভাষাসমূহ

ভাষা-পরিবার

শাখা

নৃগোষ্ঠীসমূহ

১. অস্ট্রো-এশিয়াটিক

মোন-খমের

খাসি।

মুন্ডারি

সাঁওতাল, মুন্ডা ইত্যাদি।

২. চীনা-তিব্বতি

বোড়ো

মান্দি (গারো), ককবরক, কোচ, পলিয়া, রাজবংশী ইত্যাদি।

কুকি-চীন

মেইতেই, খুমি, বম, খেয়াং, পাংখো, লুসাই, ম্রো ইত্যাদি।

সাক্-লুইশ

চাক, ঠার বা থেক।

তিব্বতি-বার্মিজ

মারমা, রাখাইন ইত্যাদি।

৩. দ্রাবিড়

কুঁড়ুখ ও আদি মালতো (বর্তমানে প্রায় লুপ্ত)।

৪. ইন্দো-ইউরোপীয়

বাংলা, চাকমা (তঞ্চঙ্গ্যা), বিষ্ণুপ্রিয়া, সাদরি, হাজং ইত্যাদি।

কাজ- ১ : বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা-পরিবারের তালিকা তৈরি কর।
Content added By

উৎপত্তির দিক থেকে বিচার করলে অনেক ভাষাই একে অপরের সাথে সংযুক্ত। বিভিন্ন ভাষার মানুষের মধ্যে প্রচুর আদানপ্রদানও দেখা যায়। তারপরও প্রতিটি ভাষা ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে অনন্য ও অতুলনীয়। যে কোনো মানুষের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তার মাতৃভাষা। শুধুমাত্র সৃজনশীলতা ও ভাবপ্রকাশের জন্যই ভাষা অপরিহার্য তা নয়, প্রতিটি ভাষাই সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে। ভাষাগত আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্যে আমরা সবাই সমৃদ্ধ হতে পারি।

বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠীরা প্রধানত চারটি ভিন্ন ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, যথা: (১) ইন্দো-ইউরোপীয়, (২) তিব্বতি-বর্মি, (৩) অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং (৪) দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠী। এ অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো ভাষা হল অস্ট্রো-এশিয়াটিক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত মুন্ডারি শাখার ভাষাসমূহ। বর্তমানে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে বসবাসকারী সাঁওতাল, হো, মুন্ডা, মাহলে এবং সিলেটের খাসি নৃগোষ্ঠীর মানুষ এই অস্ট্রো-এশিয়াটিক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে দিনাজপুর, রাজশাহী, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, রংপুর এলাকায় তাই অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর সাঁওতালি ও মুন্ডা ভাষার ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। উত্তর-পশ্চিমের ওরাঁও এবং পাহাড়িয়া নৃগোষ্ঠীর কুঁডুখ ভাষা মূলত দ্রাবিড় পরিবারভুক্ত। তিব্বতি-বর্মি ভাষাগোষ্ঠীর লোকেরা আসে প্রায় ছয় থেকে আট হাজার বছর আগে। বাংলাদেশের উত্তরের মান্দি (গারো), সিলেটের মেইতেই মণিপুরী ও পাঙ্গান মণিপুরী, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর যেমন মারমা, ত্রিপুরা, খুমি, বম্, ম্রো প্রভৃতি নৃগোষ্ঠীর ভাষা তিব্বতি-বর্মি ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ইন্দো- ইউরোপীয় পরিবারের আর্য জনগোষ্ঠীর আগমন প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। এই পরিবারের অন্তর্গত বাংলা ভাষা-ভাষী লোকেরা বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই বসবাস করে। তবে বাঙালি ছাড়াও চাকমা, সিলেটের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী এবং উত্তরবঙ্গের সাদরি ভাষাগোষ্ঠীর লোকেরা ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারভুক্ত।

কাজ- ১ : বাংলাদেশের একটা মানচিত্র আঁক। তারপর সেই মানচিত্রে ভিন্ন ভিন্ন রং ব্যবহার করে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর বসতি চিহ্নিত কর।
Content added By

পৃথিবীতে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর জনসংখ্যা কম হলেও বিস্তৃত এলাকা নিয়ে এদের বসবাস। সুদূর আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারত-চীন পর্যন্ত এ ভাষাগোষ্ঠীর বসবাস। ভাষাবিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণায় জানা গেছে বাংলাদেশের আদি বা সর্বপ্রাচীন ভাষা ছিল অস্ট্রিক ভাষা-পরিবারের ভাষা। ভারতবর্ষে প্রচলিত এই ভাষা-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ভাষাসমূহ অস্ট্রো-এশিয়াটিক শাখার ভাষা হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে প্রচলিত অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাসমূহ আবার দুটি শাখায় বিভক্ত। এগুলো হচ্ছে- মোন্ -খমের ও মুন্ডারি।

১. মোন-খমের শাখা: বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় একশটিরও অধিক ভাষা মোন-খমের শাখার অন্তর্ভুক্ত। এই ভাষাগুলো পূর্ব-ভারত থেকে ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া এবং চীন থেকে মালয়েশিয়া ও আন্দামান সাগরের নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ছড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে এই শাখার ভাষার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো খাসি ভাষা।

২. মুন্ডারি শাখা: অধিকাংশ ভাষাবিজ্ঞানী মুন্ডারি শাখাকে অস্ট্রিক ভাষা-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত মনে করলেও এর ভিন্নমতও রয়েছে। বাংলাদেশে এই শাখার ভাষার মধ্যে রয়েছে মুন্ডা এবং সাঁওতালি ভাষা। এ দুটি ভাষাই এ অঞ্চলের অত্যন্ত প্রাচীন ভাষা।

কাজ- ১ : পৃথিবীতে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ কোন কোন দেশে বাস করে?
Content added By

ভাষাবিজ্ঞানীরা চীনা-তিব্বতি (Sino-Tibetan) পরিবারের ভাষাসমূহের বিস্তৃতি মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণে মিয়ানমার (বার্মা) এবং বালিস্টান থেকে পিকিং (বেইজিং) পর্যন্ত পূর্ব গোলার্ধের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এই পরিবারে প্রায় দুই থেকে তিনশ ভাষা রয়েছে। ভাষা পরিবারের নাম চীনা-তিব্বতি হলেও এই পরিবারের ভাষাগুলো তিব্বতি-বর্মি (Tibeto-Burman) নামে পরিচিত। ভারতবর্ষে এই ভাষা পরিবার দুটি ভাগে বিভক্ত। একটি চাইনিজ বা চীনা এবং অন্যটি তিব্বতি-বর্মি। তিব্বতি-বর্মি আবার দুইটি ভাগে বিভক্ত-একটি তিব্বতি- হিমালয়ান ও অপরটি আসাম-বার্মিজ। আসাম- বার্মিজ আবার কয়েকটি শাখায় বিভক্ত। যেমন বোড়ো, নাগা, কুকি-চীন, কাচিন, বার্মিজ ইত্যাদি।

ক. বোড়ো শাখা: বাংলাদেশে মান্দি বা গারো, কক্কোরক (ত্রিপুরা), প্রভৃতি ভাষাসমূহ এই শাখার অন্তর্ভুক্ত।
খ. কুকি-চীন শাখা: এই শাখার ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে প্রচলিত আছে মেইতেই মণিপুরী, লুসাই, বম, খ্যাং, খুমি, ম্রো, পাংখো ইত্যাদি।
গ. সাক-লুইশ শাখা: বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার চাক ভাষা এবং বেদেদের ঠার বা ঠেট ভাষা এই শাখার অন্তর্ভুক্ত।
ঘ. তিব্বতী-বার্মিজ শাখা: বাংলাদেশের পার্বত্য জেলার মারমা এবং রাখাইন ভাষা এই শাখাভুক্ত। এই ভাষা অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষা।

কাজ- ১ : পৃথিবীতে চীনা-তিব্বতি পরিবারের ভাষাসমূহের বিস্তৃতি কোন কোন অঞ্চলে?

কাজ-২ : বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে চীনা-তিব্বতি ভাষা-পরিবারের সদস্য কারা? তাদের নাম লিখ।

Content added By

আর্যদের আগমনের বহু পূর্বেই এই দ্রাবিড় ভাষাসমূহ সমগ্র ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশে দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের ভাষাসমূহের মধ্যে কুঁডুখ উল্লেখযোগ্য। যদিও পাহাড়িয়া, মালতো প্রভৃতি নৃগোষ্ঠীর মধ্যে একসময়ে দ্রাবিড় ভাষা প্রচলিত ছিল, বর্তমানে তা লুপ্ত এবং তারা সাদরি ভাষা ব্যবহার করে।
কুঁডুখ ভাষা: বাংলাদেশে উত্তরবঙ্গের প্রায় সবকটি জেলাতেই একসময় ওরাঁও বা কুঁডুখ ভাষা-ভাষীদের বসবাস থাকলেও বর্তমানে শুধুমাত্র রংপুর ও দিনাজপুর জেলাতে কুঁডুখ-ভাষী ওরাঁওগণ বাস করে। এছাড়াও সিলেটের চা বাগানে অল্প কিছু ওরাঁও বাস করে। বর্তমানে বাংলাদেশে এদের মোট সংখ্যা প্রায় ২৫,০০০।
কুঁডুখ ভাষাটি আদি ও কথ্য ভাষা। এই ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। বাংলাদেশের আদিবাসীদের মধ্যে বর্তমানে একমাত্র ওরাঁওরাই দ্রাবিড়ীয় ভাষা বংশের সদস্য।
পাহাড়িয়া ভাষা: বাংলাদেশের রাজশাহী, জয়পুরহাট, দিনাজপুর জেলায় প্রায় ৮০০০ পাহাড়িয়া নৃগোষ্ঠীর লোক বাস করে। পাহাড়িয়া নৃগোষ্ঠীর দুটি শাখা রয়েছে। এদের একটি শাওরিয়া পাহাড়িয়া এবং অন্যটি মাল/ মাড় পাহাড়িয়া। বাংলাদেশে মাল পাহাড়িয়াদের সংখ্যা কম। এদের ভাষাকে মালতো বলা হলেও আসলে মিশ্র ভাষা এবং দীর্ঘদিন বাঙালিদের পাশাপাশি বসবাসের ফলে মূল ভাষা হারিয়ে গেছে।
মাহলে ভাষা: উত্তরবঙ্গের মাহলে নৃগোষ্ঠীর ভাষার নাম মাহলে ভাষা। এদের ভাষার মূল রূপটি বর্তমানে বিলুপ্ত হয়েছে যা দ্রাবিড় ভাষা-পরিবারভুক্ত ছিল। বর্তমানে এদের কথ্য ভাষায় মূল মাহলে ভাষার শুধু কিছু কিছু শব্দাবলির প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। যেমন- দাঃক্ (পানি), ইর (ধান), দাকা (ভাত), ডাংরা (গরু, বলদ) ইত্যাদি।

কাজ- ১ : দ্রাবিড় পরিবারের ভাষাসমূহের বিস্তৃতির অঞ্চলসমূহের নাম লিখ।
Content added By

পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষের মাতৃভাষা হলো ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারভুক্ত। বাংলাদেশে ইন্দো- ইউরোপীয় ভাষা পরিবারভুক্ত ভাষার মধ্যে বাংলা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে চাকমা ভাষা এবং ওরাঁওদের ব্যবহৃত সাদরি ভাষা এই পরিবারভুক্ত ভাষা। এছাড়া বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের ভাষা এই পরিবারের ভাষা। অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর মধ্যে তঞ্চঙ্গ্যা ও রাজবংশী ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিরারের অন্তর্গত। ধারণা করা হয় আর্যরা ভারতবর্ষে এই ভাষার প্রবর্তন করেছিল।
প্রায় ৫০০০ বছর আগে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ ভারতবর্ষে এসেছিল। তাদের আগমনের সাথে সাথে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার প্রচলন হয়। ঋগ্বেদ এই ভাষার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন। ঋগ্বেদের ভাষা তথা বৈদিক ভাষা পরবর্তীকালে সংস্কৃত ভাষায় রূপান্তরিত হয়।

আর এরই আর একটি রূপ কালক্রমে লোকমুখে বিকৃত হতে হতে প্রাকৃত ভাষার রূপ নেয়। লোকমুখে প্রচলিত এই ভাষার নানারূপ পরিবর্তন হতে থাকে এবং তা বিভিন্ন ভাষার সংস্পর্শে আসে। এই প্রাকৃত ভাষা থেকেই অপভ্রংশ হয়ে নব্য ভারতীয় ভাষাসমূহের সৃষ্টি হয়। এভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইন্দো- ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের নানা ভাষার প্রচলন হয়।
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের অন্তর্গত বাংলা ভাষা বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত ভাষা। ৮০০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে বাংলা ভাষার উৎপত্তি। মাগধী-প্রাকৃত ভাষা থেকে বাংলা ভাষা ক্রমে উদ্ভুত হয়েছিল। চর্যাপদ একটি বৌদ্ধ ধর্মীয় পদাবলির সংকলন যা অষ্টম থেকে ১২শ শতকের মধ্যে রচিত হয়েছিল। এই চর্যাপদ বাংলা ভাষার লিখিত রূপের প্রাচীনতম নিদর্শন। সেই সময়কার বাংলা ভাষা এরপর বহু পরিবর্তন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন সময় ও স্থানভেদে ভাষা বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। আর তাই ভাষাকে বহমান নদীর সাথে তুলনা করা হয়।

কাজ-১ : বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের তালিকা তৈরি করা ।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...