চাকমা নৃগোষ্ঠীর বিঝু উৎসব (পাঠ-০৪ ও ০৫)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসব - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

756

চাকমা সমাজের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহ্যবাহী সর্বজনীন উৎসব হলো বিজু বা বিঝু উৎসব। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মতো চাকমারাও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে এই উৎসব পালন করে থাকে।
চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন মিলিয়ে মোট তিন দিন ধরে বিঝু উৎসবটি পালিত হয়। বয়স্করা বলেন, আগে যখন সুদিন ছিল তখন কমপক্ষে সাত দিন ধরে বিঝু উৎসব পালন করা হতো। চাকমাদের বিঝু উৎসবটি তিন পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বটি হচ্ছে 'ফুলবিঝু', দ্বিতীয় পর্বটি 'মূলবিঝু' এবং তৃতীয় পর্বটি 'নুওবঝর' (নতুন বছর) বা 'গোজ্যাপোজ্যা বিঝু' (শুয়ে বসে আরাম আয়েসে কাটানোর দিন)
ফুল বিঝু : এদিন খুব ভোরবেলা শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা বন কিংবা বাগান থেকে হরেক রকমের ফুল সংগ্রহ করে আনে। সকালে তারা নদীতে গোসল করতে যায়। সে সময় তারা পাতার নৌকা বা পাত্র তৈরি করে তার উপর ফুল সাজিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। সংগৃহীত ফুল দিয়ে তারা বাড়ির আঙিনা, দরজা প্রভৃতি সাজায়। কিয়াঙ বা বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়েও তারা বুদ্ধের উদ্দেশ্যে ফুল দেয়। ঐদিন (বা তারও আগে) গৃহকর্ত্রীর নেতৃত্বে ঘরের কাপড়-চোপড় ও ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়। সন্ধ্যায় ঘরের আঙিনায় বা কিয়াঙে (মন্দির) গিয়ে মোমবাতি জ্বালানো হয়। এ সময় তারা নিজেদের আত্মীয়স্বজনসহ পৃথিবীর সকল প্রাণী ও বিশ্বের শান্তির জন্য প্রার্থনা করে। এদিন সকালবেলা শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহপালিত পশু-পক্ষীদেরকে ধান, চাল, খই প্রভৃতি খাদ্য দিয়ে থাকে।

মূল বিঝু: বিঝুর তিন দিনের মধ্যে এই মূলবিঝুর দিনটি সবচেয়ে উৎসবমুখর, সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দিন। নৃগোষ্ঠী-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, পরিচিত-অপরিচিত সবার জন্য ঘরের দরজা খোলা থাকে। ঘরে যার যা আছে তা দিয়ে সবাইকে অত্যন্ত যত্ন ও আগ্রহ সহকারে আপ্যায়ন করা হয়। ঐদিন ঐতিহ্যবাহী নানা ধরনের নানা স্বাদের পিঠা, তাজা ফলমূল এবং সেদ্ধ করা মিষ্টি আলু মূলতঃ সকাল বেলার অতিথিদের
জন্য প্রস্তুত করা হয়। বিঝুর দিন একটি বিশেষ ধরনের পাঁচমিশালী উপাদেয় খাবার পরিবেশন করা হয় যার নাম 'পাজন'। পাঁচ অন্ন (পাঁচন) শব্দ থেকেই সম্ভবত 'পাজন' শব্দের উৎপত্তি। এই পাজন তৈরি
হয় কমপক্ষে পাঁচ পদের সবজি দিয়ে। তবে সবাই চেষ্টা করে পাজন-এ সব্জির সংখ্যা বাড়াতে। এটি বিঝু উৎসবের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি উপাদান। বিঝুর দিন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য 'জগরা' পানীয় পরিবেশন করা হয়। 'জগরা' হলো বিন্নি ধানের চাল দিয়ে তৈরি এক ধরনের মিষ্টি জাতীয় পানীয় যা সাধারণত বিঝু উপলক্ষে তৈরি করা হয়। আর 'দচুনি' হলো চাকমাদের একটি ঐতিহ্যবাহী পানীয় যা সচরাচর বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে কিংবা বেড়াতে আসা ঘনিষ্ঠ ও সম্মানিত অতিথিদের আপ্যায়নে একটি অপরিহার্য পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গ্রামাঞ্চলে সান্ন্যাপিধ্যা, বিনিপিধ্যা, বিনি হগা, কলাপিধ্যা, বরাপিধ্যা, চিনি পানাহ্ প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলি ও পানীয় পরিবেশনের রেওয়াজ থাকলেও বর্তমানে শহরাঞ্চলে এসব খুব কমই দেখা যায়।

চাকমাদের একটি ঐতিহ্যবাহী পানীয় যা সচরাচর বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে কিংবা বেড়াতে আসা ঘনিষ্ঠ ও সম্মানিত অতিথিদের আপ্যায়নে একটি অপরিহার্য পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গ্রামাঞ্চলে সান্ন্যাপিধ্যা, বিনিপিধ্যা, বিনি হগা, কলাপিধ্যা, বরাপিধ্যা, চিনি পানাহ্ প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলি ও পানীয় পরিবেশনের রেওয়াজ থাকলেও বর্তমানে শহরাঞ্চলে এসব খুব কমই দেখা যায়।
দুপুরে তরুণ-তরুণীরা নদী বা কুয়ো থেকে কলসি ভরে জল এনে বয়স্কদের গোসল করায়। বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে বুদ্ধের মূর্তিকেও গোসল করানো হয়। এভাবে গোসল করা বা করানোটা হলো পুরনো বছরের সব জঞ্জাল, অশুভ বা বিপদ আপদ থেকে মুক্ত হয়ে পূতপবিত্র হওয়ার প্রতীক। সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালিয়ে বুদ্ধকে, গঙ্গী-মাকে (নদীকে) পুনরায় পূজা করা হয়। বাসার প্রতিটি কামরায় ও দরজায় মোমবাতি জ্বালানো হয় এবং গোয়ালঘরেও মোমবাতি দেয়া হয়। চাকমাদের বিশ্বাস, এতে পুরনো বছরের সব অজ্ঞানতা, অন্ধকার ও আপদ-বিপদ দূর হয়ে যায় এবং নতুন বছরের দিনগুলো মানুষের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে নিয়ে আসে।

নুঅ-বঝর বা গোজ্যাপোজ্যা বিঝু এই দিনটি পালিত হয় মূলতঃ নানা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। ঐদিন অনেকে কিয়াঙে যায় অথবা বাড়িতে কোনো বৌদ্ধ ভিক্ষুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে মঙ্গলসূত্র শ্রবণ করে, যাতে নতুন বছরটি ভালোভাবে কেটে যায়।

কাজ- ১ : চাকমা নৃগোষ্ঠীর বিঝু উৎসবের তিনটি দিনের কর্মকাণ্ডের বিবরণ সাজিয়ে লিখ।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...