ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর বৈসু উৎসব (পাঠ-০২)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসব - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

1.2k

'বৈসু' ত্রিপুরাদের প্রধান সামাজিক উৎসব। তিন দিন ধরে এই উৎসব পালিত হয়। তবে এই তিন দিনের জন্য 'বৈসু'র রয়েছে তিনটি আলাদা নাম। যেমন- প্রথম দিনের নাম হলো হারি বৈসু, দ্বিতীয় দিনের নাম বৈসুমা এবং তৃতীয় দিনটি উদযাপিত হয় বিসিকাতাল নামে। পুরনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর লক্ষ্যে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব যুগ যুগ ধরে উদযাপিত হয়ে আসছে।
হারি বৈসু: এটি বৈসুর প্রথম দিন এবং মূলত প্রস্তুতি পর্ব। ত্রিপুরা নারীরা ঐদিন বিন্নি চাল গুঁড়ো করে তা দিয়ে সুস্বাদু পিঠা তৈরি করে। 'হারি বৈসু'র দিন ঘরে ঘরে পিঠা বানানোর ধুম পড়ে যায়, যা পরবর্তী দুই দিনেও কমবেশি অব্যাহত থাকে। ঐদিন ত্রিপুরা নারী- পুরুষ মিলে সকাল সকাল বনে গিয়ে কলা পাতা, লাইরু পাতা সংগ্রহ করে আনে। এসব পাতা ব্যবহার করে তারা বৈসুর হরেক রকম পিঠা তৈরি করে।

বাড়িঘর পরিপাটি করে সাজানোর পাশাপাশি 'হারি বৈসু'র দিন ত্রিপুরা নারীরা পরিবারে ব্যবহার্য যাবতীয় কাপড়-চোপড় ধুয়ে পরিষ্কার করে নেয়। গ্রামের সব বয়সের নারী-পুরুষ সেদিন খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ফুল সংগ্রহে নেমে পড়ে এবং সকাল সকাল নদীতে স্নান সেরে সংগৃহীত ঐসব ফুল নদীতে উৎসর্গ করে। ঘরের কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করার মধ্য দিয়ে পুরনো বছরের যাবতীয় বিপদ-আপদ, জঞ্জাল ও দুঃখ-বেদনা ধুয়ে মুছে যাবে বলে ধারণা করা হয়। 'হারি বৈসু'র দিন থেকে 'গরয়া নৃত্য' শুরু হয় এবং একটানা ৫/৭ দিন ধরে এই নৃত্য চলতে থাকে। নৃত্যে অংশগ্রহণকারীদের 'গরয়া চেরক' নামে ডাকা হয়। তারা গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে ঢাক-ঢোল-বাঁশি বাজিয়ে এই নৃত্য পরিবেশন করে।

'হারি বৈসু'র দিনে গৃহকর্তা ঘরের গবাদিপশুগুলোকে পরিচর্যা ও আদরযত্ন করে থাকেন। যেহেতু গবাদিপশু দিয়ে হাল চাষ থেকে শুরু করে পরিবারের অনেক উপকার সাধিত হয়, সেজন্য ঐদিন গবাদিপশুর শিং ও গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিয়ে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
বৈসুমা: বৈসুমার দিনটি ত্রিপুরাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মহান একটি দিন। কারণ এই দিনে ত্রিপুরা সমাজে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। সবাই একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যায় এবং একে অপরের সমব্যথী হয়। ধনী-গরিব সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী নানা ধরনের পিঠা, সরবত, পাঁচন ইত্যাদি অতিথিদের পরিবেশন করে। তবে 'বৈসুমা'র দিনে প্রাণীবধ একেবারেই নিষিদ্ধ। ঐদিন গরয়া নৃত্য পরিবেশন ছাড়াও পালা গান এবং বিভিন্ন খেলাধুলা সারাদিন ধরে চলে।
বিসিকাতাল: 'বৈসু'র এই দিনটি নববর্ষকে স্বাগত জানানোর দিন। শিশু-কিশোর ও যুবক-যুবতীরা নতুন কাপড়-চোপড় পরিধান করে গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে হাঁস-মুরগি এবং অন্যান্য পশু-পাখির জন্য খাবার বিলিয়ে দেয়। ত্রিপুরাদের সামাজিক রীতি অনুসারে তারা বয়স্কদের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। গ্রামের যুবক-যুবতী ও নবদম্পতি নদী কিংবা কুয়ার স্বচ্ছ ও সতেজ পানি তুলে এনে গ্রামের মুরুব্বি বা বয়স্কদের স্নান করায় এবং আশীর্বাদ গ্রহণ করে। এই দিনে পরিবারের সকল সদস্যের মঙ্গলের জন্য পূজা ও উপাসনা করা হয়। গ্রামের প্রত্যেকটি ঘরের দরজা সারা দিন-রাত খোলা থাকে অতিথিদের জন্য। মনে করা হয়ে থাকে যে, এই দিনে কিছু না খেয়ে কেউ ফিরে গেলে তা গৃহস্থের জন্য অমঙ্গল।

কাজ- ১ : ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর বৈসু উৎসবের তিনটি দিনের কর্মকান্ডের বিবরণ নিচের ছক অনুযায়ী সাজিয়ে লিখ।

বৈসুর তিন পর্বের নাম

কর্মকাণ্ডের বিবরণ

হারি বৈসু

বৈসুমা

বিসিকাতাল

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...