নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে নৃবৈজ্ঞানিক ধারণা (পাঠ-০১)

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিচিতি - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

419

বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বসবাসের অঞ্চল ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে এই অধ্যায়ে পরিচিত হব। তবে তার আগে, নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে আমাদের কিছু সাধারণ ধারণা থাকা প্রয়োজন। প্রথমেই জানা দরকার নৃগোষ্ঠী বলতে কী বোঝায়। 'নৃ' শব্দের অর্থ হলো মানুষ, আর 'গোষ্ঠী' মানে হলো সামাজিক দল। সুতরাং, মানুষের বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সামাজিক দলকে নৃগোষ্ঠী বলা হয়ে থাকে। পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষই কোনো না কোনো নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
প্রত্যেকটি নৃগোষ্ঠীই একটি আরেকটি থেকে আলাদা। পরস্পরের মধ্যে পার্থক্যের এই সীমারেখা নৃগোষ্ঠীগুলো সর্বদাই বজায় রাখে। তাই একটি নৃগোষ্ঠীকে পৃথকভাবে চেনার জন্য আমাদেরকে সব সময় সেই নৃগোষ্ঠীর সীমারেখা বজায় রাখা ও সদস্যপদ লাভের উপায় সম্পর্কে জানতে হবে। সুনির্দিষ্ট কিছু সামাজিক নিয়মের মধ্য দিয়ে কোনো নৃগোষ্ঠীর সদস্যপদ লাভ করতে হয়। আর এই নিয়মগুলো পালনের সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর পরিচিতি ও সীমারেখা আমাদের কাছে আলাদাভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছু উদাহরণের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি। যেমন, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, মান্দি, বাঙালি ইত্যাদির প্রত্যেকটি আলাদা নৃগোষ্ঠী। একজন বাঙালি ব্যক্তি কি নিজের ইচ্ছামত কখনও চাকমা, কিংবা কখনও মান্দি হতে পারবে? অথবা একজন চাকমা ব্যক্তি কি চাইলেই কখনও সাঁওতাল নৃগোষ্ঠীর সদস্যপদ পাবে? কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা অনুযায়ী যে কোনো নৃগোষ্ঠীর সদস্যপদ লাভ করা সম্ভব নয়, তাই না? কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা জন্মসুত্রে আমাদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় ও সদস্যপদ লাভ করে থাকি। সুতরাং, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, মান্দি কিংবা বাঙালি প্রত্যেকটি নৃগোষ্ঠীই তাদের আলাদা সামাজিক পরিচিতি ও সীমারেখা বজায় রাখে এর সদস্যপদ নির্ধারণের মাধ্যমে। মোটামুটিভাবে আমরা জন্মসূত্রেই কোনো না কোনো নৃগোষ্ঠীর সদস্য এবং অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি ধারণ করি।
একটি নির্দিষ্ট নৃগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে আমরা সেই নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকের সাথে পরিচিত হয়ে উঠি। প্রথম অধ্যায়ে আমরা সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জেনেছি। আমরা নিজ নিজ নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিভিন্ন দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উপাদানগুলোর সাথে পরিচিত হই শৈশব থেকেই। সাধারণত দুটি নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান হতে পারে। তাই বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক উপাদানে কিছু মিল বা সাদৃশ্য থাকলেও এদের সদস্যদের পরিচিতি সব সময়ই পৃথক থাকে। সুতরাং, সামাজিক সীমারেখা বজায় রাখার মধ্য দিয়েই নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের পরিচিতির স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নৃগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য গড়ে উঠে। যথা:

(১) নৃগোষ্ঠীর সদস্যপদ ও পরিচিতির সামাজিক স্বীকৃতি: যেকোনো নৃগোষ্ঠী তার সদস্যদের নির্দিষ্ট
পরিচিতি দেয় বা আরোপ করে। অর্থাৎ, প্রত্যেকটি মানুষ তার নিজের নৃগোষ্ঠীর পরিচিতি নিয়ে শৈশব থেকে বেড়ে উঠে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, নমিতা খীসা ছোটবেলা থেকেই চাকমা পরিচিতি নিয়ে বড় হয়েছে।
নমিতা খীসা আত্মপরিচিতি হিসেবে নিজেকে চাকমা বলে দাবি করে। আবার অন্যান্য নৃগোষ্ঠী যেমন বাঙালি, সাঁওতাল, মান্দি কিংবা মারমা সদস্যরা নমিতা খীসাকে চাকমা বলে স্বীকৃতি দেয়। এর মানে হলো, চাকমা কিংবা যে কোনো নৃগোষ্ঠী ও এর সদস্যদের পরিচিতির বৃহত্তর সামাজিক স্বীকৃতি রয়েছে ।

(২) নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চেতনা ও বোধ: সাধারণত যেকোনো নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়ের চেতনা বা বোধ থাকে। অর্থাৎ, একটি নৃগোষ্ঠীর সকল সদস্যের মাঝে আত্মপরিচয়ের চেতনা ও জাতিসত্তার বোধ কাজ করে। তাই আমরা বিভিন্ন মানুষকে বলতে শুনি যে, 'আমরা বাঙালি', 'আমরা মান্দি', 'আমরা সাঁওতাল' কিংবা 'আমরা মারমা' ইত্যাদি। এই চেতনা ও বোধের জন্যই নৃগোষ্ঠীকে জাতিসত্তাও বলা হয়।

(৩) সামাজিক কর্মকান্ড, ভাববিনিময় ও আদান-প্রদানের সাধারণ ক্ষেত্র: একই নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের জীবনধারা বা সংস্কৃতিতে যথেষ্ট মিল বা সাদৃশ্য রয়েছে। সাধারণত তারা একই ভাষায় কথা বলে ও ভাববিনিময় করে, তাদের জীবিকা নির্বাহ পদ্ধতি কাছাকাছি ধরনের কিংবা তাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও আদর্শেও যথেষ্ট মিল দেখা যায়। অর্থাৎ সংস্কৃতির বিভিন্ন দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উপাদানগুলো একই নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা সকলেই জানে ও ধারণ করে। আবার, সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের ভিত্তিতেই বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে পার্থক্য দেখা যায়।

এই তিনটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আমরা বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে পারি। তবে এখানে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, নৃগোষ্ঠী, ভাষাগোষ্ঠী, ধর্মগোষ্ঠী বা ধর্ম সম্প্রদায়, পেশাজীবী গোষ্ঠী ও মানব দল বা নরগোষ্ঠী এক কথা নয়। আমরা পরবর্তী সময়ে উপরের শ্রেণিতে এ ধরনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর পার্থক্য সম্পর্কে জানতে পারব। বাংলাদেশের অধিবাসীদের উপর আজ পর্যন্ত কোনো নৃবৈজ্ঞানিক জরিপ হয় নি। এ কারণে আমাদের দেশে কতোগুলো নৃগোষ্ঠী আছে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তাই আনুমানিকভাবে বলা হয় আমাদের দেশে ৪৫টিরও বেশি নৃগোষ্ঠী রয়েছে। সঠিক পদ্ধতিতে নৃবৈজ্ঞানিক জরিপ হলে নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে ধারণা করা যায়।

কাজ-১ ঃ নৃগোষ্ঠী কাকে বলে?
কাজ-২ ঃ যে সকল বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নৃগোষ্ঠীসমূহকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায় তা উল্লেখ কর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...