প্রত্নতাত্ত্বিক সময়কাল ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা (পাঠ-০২)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রত্নঐতিহ্য - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

259

এই পৃথিবীর ইতিহাস কিংবা মানবজাতির উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে হলে আমাদের অতীতের বিভিন্ন সময়কাল সম্পর্কে কিছু সাধারণ ধারণা প্রয়োজন। এ জন্য বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অতীতের সময়কে কয়েকভাবে ভাগ করা হয়। পৃথিবীর প্রাকৃতিক অবস্থা ও মানব সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার সুবিধার্থে অতীতের সময়কে বিভিন্ন সময়কাল, পর্যায় ও যুগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে। এর মধ্য দিয়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে অতীতের বিভিন্ন পর্যায়ের ভূপ্রাকৃতিক, মানুষের শারীরিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি। এধরনের তিনটি সময়কাল নিম্নের সারণিতে দেওয়া হলো:

মহাজাগতিক সময়কাল : বিশ্বব্রহ্মান্ড বা মহাবিশ্বের উৎপত্তি, সৃষ্টি ও পরিবর্তনের ধারা নিয়ে আলোচনার জন্য মহাজাগতিক সময়কালকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা হয়।

ভূতাত্ত্বিক সময়কাল : পৃথিবীর উৎপত্তি আজ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে। তখন থেকেই আমাদের পৃথিবীর ভূপ্রকৃতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বসবাসযোগ্য হয়েছে। ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনের ধারা ও প্রাণের উৎপত্তি অধ্যয়নের জন্য ৪৫০ কোটি বছরকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করে ভূতাত্ত্বিক সময়কাল নির্ধারণ করা হয়।

মানব সময়কাল : মানুষের আবির্ভাব, শারীরিক গঠন ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক পরিবর্তন সম্পর্কে জানার জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানে অতীতের সময়কালকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়ে থাকে।

এই অধ্যায়ে আমরা মানব সময়কাল নিয়ে আলোচনা করব। মানব সময়কালের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে আলোচনার সময় আমরা এ অধ্যায়ের বিভিন্ন পাঠে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের সাংস্কৃতিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারব।

মানব সময়কালের বিভিন্ন পর্যায় ও সংস্কৃতির বিকাশ: প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানে মানবজাতির ঐতিহাসিক সময়কালকে সাধারণত দুটি পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়: (১) ঐতিহাসিক পর্যায় বা সময়কাল এবং (২) প্রাগৈতিহাসিক পর্যায় বা সময়কাল। ঐতিহাসিক পর্যায় বা সময়কাল বলতে আমরা যে সময় থেকে মানুষের ভাষার লিখিত রূপ বা পদ্ধতির উদ্ভাবন হয়েছে সেই সময়কালকে বুঝি। বর্ণমালা ও চিত্রলিপির
মাধ্যমে লেখার রীতি আবিষ্কারের ফলে অতীতের বিভিন্ন সময়কালের মানুষ তাদের নিজ নিজ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে লিখিত বর্ণনা রেখে গেছেন। সে সব ঐতিহাসিক দলিল থেকে আমরা বিভিন্ন অঞ্চল ও সময়কালের মানুষের ইতিহাস সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারি। যেমন, গুপ্ত সাম্রাজ্য, পাল সাম্রাজ্য কিংবা মুঘল সাম্রাজ্যের সময়কাল নিয়ে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে। ফলে এই সাম্রাজ্যগুলোর সময়কালকে আমরা আলাদাভাবে আলোচনা করতে পারি এবং সমসাময়িক কালের অন্যান্য সাম্রাজ্যের সাথে তাদের অবস্থার তুলনা করতে পারি।
ভাষার লিখিত রূপ আবিষ্কারের পূর্বের মানুষদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা অনেকটাই অনুমাননির্ভর। প্রাগৈতিহাসিক সময়কাল বলতে সাধারণত লিখিত ভাষা আবিষ্কারের পূর্বের সময়কেই বোঝানো হয়ে থাকে। প্রাগৈতিহাসিক সময়কালের আদি মানুষ সর্বপ্রথম পাথরের ব্যবহার, অর্থাৎ পাথর দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র বানানোর কৌশল আবিষ্কার করে। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধাতব পদার্থ যেমন ব্রোঞ্জ, তামা ও লোহার ব্যবহার উদ্ভাবন করে। মানুষের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, দ্রব্যাদি ও প্রযুক্তির ধরনের উপর ভিত্তি করে প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানে প্রাগৈতিহাসিক সময়কালকে তিন পর্যায় বা যুগে ভাগ করা হয়: (১) পাথর যুগ, (২) ব্রোঞ্জ ও তাম্র যুগ এবং (৩) লৌহ যুগ। প্রযুক্তির বিকাশ পৃথিবীর সব অঞ্চলে একই সময়ে বা একই ধারায় হয়নি। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এই তিনটি যুগের সময়কালে পার্থক্য রয়েছে।

(১) পাথর বা প্রস্তর যুগ (Stone Age): প্রাগৈতিহাসিক সময়কালের সবচেয়ে আদি যুগের নাম প্রস্তর যুগ (Stone Age)। এই যুগ তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত। এই পর্যায়গুলোতে সাংস্কৃতিক বিকাশ সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো।

ক) পুরোপলীয় (Palaeolithic): এ সময়ে মানুষ আগুনের ব্যবহার শেখে। এছাড়াও ছিল পাথর ও হাড়ের তৈরি জিনিসপত্র এবং অন্যান্য দ্রব্যাদি যেমন, ধারালো পাথর, কাটারি, হাত কুঠার, বর্শা ইত্যাদি। এসবের সাহায্যে মানুষ বন-জঙ্গল হতে শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ করে তাদের খাদ্য ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির চাহিদা মেটাত। সাধারণত ২৫ থেকে ১০০ জনের একটি দল যাযাবর জীবনযাপন করত। পরবর্তীতে তারা নদী বা হ্রদের কাছে গুহা বা ছোট কুটির তৈরি করে বসবাস করত।

খ) মধ্যপলীয় (Mesolithic): শিকার করতে বর্শা, তীর-ধনুক এবং মাছ শিকারের জন্য হারপুন, ঝুড়ি বা খাঁচা এবং নৌকার ব্যবহার আবিষ্কার করে মানুষ। শিকার ও সংগ্রহের পাশাপাশি বন্য শস্যের বীজ সংগ্রহ করা এবং বন্য পশু পোষ মানানোর প্রচেষ্টা করে। অতিপ্রাকৃত শক্তি ও মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করত মানুষ এবং মৃতদেহ সৎকারের আচার অনুষ্ঠান পালন করত।

গ) নব্যপ্রস্তর (Neolithic): পাথরের তৈরি মসৃণ দ্রব্যাদি, হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার করা হত কৃষি কাজ এবং আত্মরক্ষার জন্য, যেমন- কাস্তে, বাটালী, নিড়ানী, লাঙ্গল, জোয়াল, মৃৎপাত্র ইত্যাদি। সেইসাথে মানুষ পশু ও মৎস্য শিকার এবং খাদ্য সংগ্রহ করত। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তার জন্য স্থায়ীভাবে গ্রামে বসবাস শুরু করে। মানব সমাজে পূর্বপুরুষ পূজা ও বহু আত্মার ধারণার বিকাশ ঘটে এবং শামান (ধর্মীয় ওঝা) এবং তার সহযোগীদের আবির্ভাব ঘটে।

(২) ব্রোঞ্জ ও তাম্র যুগ (Bronze Age): এ যুগের শুরুতে তামা নির্মিত এবং পরবর্তীকালে ব্রোঞ্জ নির্মিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও জিনিসপত্র, তাঁত এবং মাটির চাকা আবিষ্কার করে মানুষ। শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে এবং বিভিন্ন পেশাজীবী দলের উদ্ভব হয়। নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা শুরু করে মানুষ।

(৩) লৌহ যুগ (Iron Age): লোহার তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও জিনিসপত্র ব্যবহার শুরু করে মানুষ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয় এবং রাজধানীর সাথে অন্যান্য শহরের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান হয় এই সময়ে।

কাজ-১ : বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক সময়কালের নাম লিপিবদ্ধ কর।

কাজ-২ : প্রাগৈতিহাসিক সময়কালের বিভিন্ন সংস্কৃতির উপাদানের নাম লিখ।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...