একটি দেশে যদি অনেক নৃগোষ্ঠী থাকে, তবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ছোট আকারের নৃগোষ্ঠীগুলোকে ঐ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা হয়ে থাকে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ইংরেজিতে বলা হয় 'Ethnic Minority'। আপাতদৃষ্টিতে মূলত বাঙালি অধ্যুষিত মনে হলেও, বাংলাদেশে নানা ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করে। বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। এ দেশে বাঙালি নৃগোষ্ঠী হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ। অপরদিকে, বাংলাদেশে বসবাসকারী বাঙালি ছাড়া অন্যান্য যেকোনো নৃগোষ্ঠীকেই জনসংখ্যার বিবেচনায় ছোট বলে 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী', 'ক্ষুদ্র জাতিসত্তা' বা 'Ethnic Minority' বলা যেতে পারে। তবে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, জনসংখ্যার ভিত্তিতে ছোট কিংবা বড় হলেও প্রতিটি নৃগোষ্ঠীই এক একটি স্বতন্ত্র নৃগোষ্ঠী ও অনন্য জাতিসত্তা।
বাংলাদেশে 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী' বা 'ক্ষুদ্র জাতিসত্তা' বলতে মূলত অতীত ঐতিহ্যের ধারক ও প্রতিনিধিত্বকারী নৃগোষ্ঠীগুলোকে বোঝানো হয়। এই নৃগোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের মধ্যেও নিজ নিজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অনেকাংশে ধরে রেখেছে। এভাবে তারা নিজস্ব সংস্কৃতির প্রাচীন ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে। অর্থাৎ, দেশের ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতির পরিবর্তনের সাথে তারা মিশে যায়নি একেবারে। বরং তাদের সমাজ ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানসমূহে অনেকাংশে নিজস্বতা বজায় রেখেছে। সাধারণ কিছু সাদৃশ্যের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়। যেমন-
(১) নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে স্বতন্ত্র পরিচিতি ও জাতিসত্তার চেতনা;
(২) অতীত ঐতিহ্য, বিশেষত প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা;
(৩) স্বতন্ত্র সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা;
(৫) বসবাসকৃত অঞ্চলের প্রকৃতির সাথে নিবিড় ও গভীর সম্পর্ক;
(৬) আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলোর অবস্থান অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং আধিপত্যহীন।
এ ধরনের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০' নামে একটি আইন প্রণয়ন করে। এই আইনে বাংলাদেশের 'অ-বাঙালি' ও অতীত ঐতিহ্যবাহী জাতিসত্তাগুলোকে 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী' নামে আখ্যায়িত করা হয়।
বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর ৯০টি দেশে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি মানুষ বসবাস করছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলো ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত যেমন, 'আদিবাসী', 'উপজাতি', 'ট্রাইব' (Tribe), 'এবরিজিনাল' (Aboriginal), 'জনজাতি', 'তফসিলি জাতি', 'ক্ষুদ্র জাতিসত্তা', 'ফার্স্ট-নেশান' (First-Nation) প্রভৃতি। অন্যদিকে জাতিসংঘ এধরনের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলোকে 'ইন্ডিজেনাস পিপল' (Indigenous People) নামে অভিহিত করছে। বিশেষত সেপ্টেম্বর, ২০০৭-এ জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রে 'ইন্ডিজেনাস পিপল' (Indigenous People) দের বিশেষ অধিকার স্বীকৃত হয়।
'ইন্ডিজেনাস পিপল্' (Indigenous People)-এর বাংলা আভিধানিক অর্থ 'আদিবাসী জনগোষ্ঠী'। জাতিসংঘের ব্যবহৃত 'ইন্ডিজেনাস পিপল্' (Indigenous People)-এর ধারণার উৎপত্তি মূলত অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা মহাদেশের প্রথম অধিবাসী জনগোষ্ঠীর ধারণা থেকে। অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা মহাদেশে প্রথম মানুষ বসবাস শুরু করে যথাক্রমে প্রায় ৪৫ হাজার এবং ১৬ হাজার বছর আগে। এই আদি মানুষেরাই দুই মহাদেশের প্রথম ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী। এই দুই মহাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে হাজার হাজার বছর ধরে অন্যান্য মহাদেশের কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ প্রবেশ করেনি। অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা মহাদেশে বহিরাগত শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী প্রবেশের ইতিহাস বেশি দিনের নয়। তোমরা নিশ্চয়ই পড়েছ যে, ১৪৯২ সালে কলম্বাস আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেছিলেন। এখানে আবিষ্কার বলতে বোঝানো হয়েছে যে, কলম্বাস ও তাঁর সহযাত্রীরা ইউরোপ মহাদেশ থেকে প্রথম আমেরিকা মহাদেশে প্রবেশ করেন ১৪৯২ সালে। ইউরোপ থেকে কলম্বাসের আগমনের পূর্বেও আমেরিকা মহাদেশে মানুষের বসবাস ছিল হাজার হাজার বছর ধরে। মাত্র পাঁচশত বছর আগে কলম্বাসের নেতৃত্বে শ্বেতাঙ্গদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পনের হাজার বছর ধরে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীরাই হলো আমেরিকার স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী। বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শ্বেতাঙ্গরা মূলত সেখানে বহিরাগত এবং বসতিস্থাপনকারী। তাই জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী এই দুই মহাদেশে খুব সহজেই আদিবাসী ও বসতিস্থাপনকারী জনগোষ্ঠীর পার্থক্য নিরূপণ করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বসতি স্থাপনের ইতিহাসের দিক থেকে এ ধরনের পার্থক্য নিরূপণ করা সহজ কথা নয়।
বর্তমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী হাজার হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। ঐতিহাসিক দিক থেকে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল ও উচ্চভূমি এলাকার অধিবাসী। বাংলাদেশে মাত্র কয়েকশত বছর পূর্বেও জনসংখ্যা স্বল্পতার কারণে এক নৃগোষ্ঠী অন্য নৃগোষ্ঠীর বসতি অঞ্চলে প্রবেশ করেনি। এজন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর অধিকার ও প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছে।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাচীন-ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলোর বহু সদস্য অসীম বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। অনেক ত্যাগ স্বীকারের মধ্য দিয়ে তারাও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়াও ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন থেকে শুধু করে বিভিন্ন জাতীয় প্রয়োজনে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের অবদান সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। এদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতেও তাদের অবদান প্রশংসনীয়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে এ সকল নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে অসামান্য ভূমিকা রেখে চলেছে। এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে এ অধ্যায়ের পরবর্তী পাঠগুলোতে আলোচনা করা হলো।
কাজ-১ ঃ বাংলাদেশ কেন একটি বৈচিত্রপূর্ণ দেশ? কাজ-২ ঃ এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহকে যে সকল নামে ডাকা হয় তার একটি তালিকা তৈরী কর। |
Read more