সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। আপাতদৃষ্টিতে মূলত বাঙালি অধ্যুষিত মনে হলেও, বাংলাদেশে নানা নৃগোষ্ঠী, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ বাস করে। জীববৈচিত্র্য যেমন প্রকৃতির জন্য অপরিহার্য, মানবজাতির জন্য সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তাও অনুরূপ। তাই সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বিকাশের দায়িত্ব আমাদের সকলের। এই অধ্যায়ে আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বসবাসের অঞ্চল এবং তাদের সাংস্কৃতিক পরিচিতি সম্পর্কে ধারণা পাব।

এই অধ্যায় শেষে আমরা-
- বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের সংক্ষিপ্ত একটি পরিচয় দিতে পারব।
- ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ বাংলাদেশের কোন কোন অঞ্চলে বসবাস করে তা উল্লেখ করতে পারব।
- বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অবস্থানের একটি অঞ্চলভিত্তিক ছক তৈরি করতে পারব।
- বাংলাদেশের মানচিত্রে চিহ্নিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক রূপরেখা বর্ণনা করতে পারব।
- বাংলাদেশের মানচিত্র অঙ্কন করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অবস্থান চিহ্নিত করতে পারব।
বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বসবাসের অঞ্চল ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে এই অধ্যায়ে পরিচিত হব। তবে তার আগে, নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে আমাদের কিছু সাধারণ ধারণা থাকা প্রয়োজন। প্রথমেই জানা দরকার নৃগোষ্ঠী বলতে কী বোঝায়। 'নৃ' শব্দের অর্থ হলো মানুষ, আর 'গোষ্ঠী' মানে হলো সামাজিক দল। সুতরাং, মানুষের বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সামাজিক দলকে নৃগোষ্ঠী বলা হয়ে থাকে। পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষই কোনো না কোনো নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
প্রত্যেকটি নৃগোষ্ঠীই একটি আরেকটি থেকে আলাদা। পরস্পরের মধ্যে পার্থক্যের এই সীমারেখা নৃগোষ্ঠীগুলো সর্বদাই বজায় রাখে। তাই একটি নৃগোষ্ঠীকে পৃথকভাবে চেনার জন্য আমাদেরকে সব সময় সেই নৃগোষ্ঠীর সীমারেখা বজায় রাখা ও সদস্যপদ লাভের উপায় সম্পর্কে জানতে হবে। সুনির্দিষ্ট কিছু সামাজিক নিয়মের মধ্য দিয়ে কোনো নৃগোষ্ঠীর সদস্যপদ লাভ করতে হয়। আর এই নিয়মগুলো পালনের সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর পরিচিতি ও সীমারেখা আমাদের কাছে আলাদাভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছু উদাহরণের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি। যেমন, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, মান্দি, বাঙালি ইত্যাদির প্রত্যেকটি আলাদা নৃগোষ্ঠী। একজন বাঙালি ব্যক্তি কি নিজের ইচ্ছামত কখনও চাকমা, কিংবা কখনও মান্দি হতে পারবে? অথবা একজন চাকমা ব্যক্তি কি চাইলেই কখনও সাঁওতাল নৃগোষ্ঠীর সদস্যপদ পাবে? কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা অনুযায়ী যে কোনো নৃগোষ্ঠীর সদস্যপদ লাভ করা সম্ভব নয়, তাই না? কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা জন্মসুত্রে আমাদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় ও সদস্যপদ লাভ করে থাকি। সুতরাং, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, মান্দি কিংবা বাঙালি প্রত্যেকটি নৃগোষ্ঠীই তাদের আলাদা সামাজিক পরিচিতি ও সীমারেখা বজায় রাখে এর সদস্যপদ নির্ধারণের মাধ্যমে। মোটামুটিভাবে আমরা জন্মসূত্রেই কোনো না কোনো নৃগোষ্ঠীর সদস্য এবং অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি ধারণ করি।
একটি নির্দিষ্ট নৃগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে আমরা সেই নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকের সাথে পরিচিত হয়ে উঠি। প্রথম অধ্যায়ে আমরা সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জেনেছি। আমরা নিজ নিজ নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিভিন্ন দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উপাদানগুলোর সাথে পরিচিত হই শৈশব থেকেই। সাধারণত দুটি নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান হতে পারে। তাই বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক উপাদানে কিছু মিল বা সাদৃশ্য থাকলেও এদের সদস্যদের পরিচিতি সব সময়ই পৃথক থাকে। সুতরাং, সামাজিক সীমারেখা বজায় রাখার মধ্য দিয়েই নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের পরিচিতির স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নৃগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য গড়ে উঠে। যথা:
(১) নৃগোষ্ঠীর সদস্যপদ ও পরিচিতির সামাজিক স্বীকৃতি: যেকোনো নৃগোষ্ঠী তার সদস্যদের নির্দিষ্ট
পরিচিতি দেয় বা আরোপ করে। অর্থাৎ, প্রত্যেকটি মানুষ তার নিজের নৃগোষ্ঠীর পরিচিতি নিয়ে শৈশব থেকে বেড়ে উঠে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, নমিতা খীসা ছোটবেলা থেকেই চাকমা পরিচিতি নিয়ে বড় হয়েছে।
নমিতা খীসা আত্মপরিচিতি হিসেবে নিজেকে চাকমা বলে দাবি করে। আবার অন্যান্য নৃগোষ্ঠী যেমন বাঙালি, সাঁওতাল, মান্দি কিংবা মারমা সদস্যরা নমিতা খীসাকে চাকমা বলে স্বীকৃতি দেয়। এর মানে হলো, চাকমা কিংবা যে কোনো নৃগোষ্ঠী ও এর সদস্যদের পরিচিতির বৃহত্তর সামাজিক স্বীকৃতি রয়েছে ।
(২) নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চেতনা ও বোধ: সাধারণত যেকোনো নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়ের চেতনা বা বোধ থাকে। অর্থাৎ, একটি নৃগোষ্ঠীর সকল সদস্যের মাঝে আত্মপরিচয়ের চেতনা ও জাতিসত্তার বোধ কাজ করে। তাই আমরা বিভিন্ন মানুষকে বলতে শুনি যে, 'আমরা বাঙালি', 'আমরা মান্দি', 'আমরা সাঁওতাল' কিংবা 'আমরা মারমা' ইত্যাদি। এই চেতনা ও বোধের জন্যই নৃগোষ্ঠীকে জাতিসত্তাও বলা হয়।
(৩) সামাজিক কর্মকান্ড, ভাববিনিময় ও আদান-প্রদানের সাধারণ ক্ষেত্র: একই নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের জীবনধারা বা সংস্কৃতিতে যথেষ্ট মিল বা সাদৃশ্য রয়েছে। সাধারণত তারা একই ভাষায় কথা বলে ও ভাববিনিময় করে, তাদের জীবিকা নির্বাহ পদ্ধতি কাছাকাছি ধরনের কিংবা তাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও আদর্শেও যথেষ্ট মিল দেখা যায়। অর্থাৎ সংস্কৃতির বিভিন্ন দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উপাদানগুলো একই নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা সকলেই জানে ও ধারণ করে। আবার, সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের ভিত্তিতেই বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে পার্থক্য দেখা যায়।
এই তিনটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আমরা বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে পারি। তবে এখানে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, নৃগোষ্ঠী, ভাষাগোষ্ঠী, ধর্মগোষ্ঠী বা ধর্ম সম্প্রদায়, পেশাজীবী গোষ্ঠী ও মানব দল বা নরগোষ্ঠী এক কথা নয়। আমরা পরবর্তী সময়ে উপরের শ্রেণিতে এ ধরনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর পার্থক্য সম্পর্কে জানতে পারব। বাংলাদেশের অধিবাসীদের উপর আজ পর্যন্ত কোনো নৃবৈজ্ঞানিক জরিপ হয় নি। এ কারণে আমাদের দেশে কতোগুলো নৃগোষ্ঠী আছে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তাই আনুমানিকভাবে বলা হয় আমাদের দেশে ৪৫টিরও বেশি নৃগোষ্ঠী রয়েছে। সঠিক পদ্ধতিতে নৃবৈজ্ঞানিক জরিপ হলে নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে ধারণা করা যায়।
| কাজ-১ ঃ নৃগোষ্ঠী কাকে বলে? |
| কাজ-২ ঃ যে সকল বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নৃগোষ্ঠীসমূহকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায় তা উল্লেখ কর। |
একটি দেশে যদি অনেক নৃগোষ্ঠী থাকে, তবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ছোট আকারের নৃগোষ্ঠীগুলোকে ঐ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা হয়ে থাকে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ইংরেজিতে বলা হয় 'Ethnic Minority'। আপাতদৃষ্টিতে মূলত বাঙালি অধ্যুষিত মনে হলেও, বাংলাদেশে নানা ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করে। বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। এ দেশে বাঙালি নৃগোষ্ঠী হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ। অপরদিকে, বাংলাদেশে বসবাসকারী বাঙালি ছাড়া অন্যান্য যেকোনো নৃগোষ্ঠীকেই জনসংখ্যার বিবেচনায় ছোট বলে 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী', 'ক্ষুদ্র জাতিসত্তা' বা 'Ethnic Minority' বলা যেতে পারে। তবে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, জনসংখ্যার ভিত্তিতে ছোট কিংবা বড় হলেও প্রতিটি নৃগোষ্ঠীই এক একটি স্বতন্ত্র নৃগোষ্ঠী ও অনন্য জাতিসত্তা।
বাংলাদেশে 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী' বা 'ক্ষুদ্র জাতিসত্তা' বলতে মূলত অতীত ঐতিহ্যের ধারক ও প্রতিনিধিত্বকারী নৃগোষ্ঠীগুলোকে বোঝানো হয়। এই নৃগোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের মধ্যেও নিজ নিজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অনেকাংশে ধরে রেখেছে। এভাবে তারা নিজস্ব সংস্কৃতির প্রাচীন ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে। অর্থাৎ, দেশের ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতির পরিবর্তনের সাথে তারা মিশে যায়নি একেবারে। বরং তাদের সমাজ ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানসমূহে অনেকাংশে নিজস্বতা বজায় রেখেছে। সাধারণ কিছু সাদৃশ্যের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়। যেমন-
(১) নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে স্বতন্ত্র পরিচিতি ও জাতিসত্তার চেতনা;
(২) অতীত ঐতিহ্য, বিশেষত প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা;
(৩) স্বতন্ত্র সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা;
(৫) বসবাসকৃত অঞ্চলের প্রকৃতির সাথে নিবিড় ও গভীর সম্পর্ক;
(৬) আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলোর অবস্থান অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং আধিপত্যহীন।
এ ধরনের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০' নামে একটি আইন প্রণয়ন করে। এই আইনে বাংলাদেশের 'অ-বাঙালি' ও অতীত ঐতিহ্যবাহী জাতিসত্তাগুলোকে 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী' নামে আখ্যায়িত করা হয়।
বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর ৯০টি দেশে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি মানুষ বসবাস করছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলো ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত যেমন, 'আদিবাসী', 'উপজাতি', 'ট্রাইব' (Tribe), 'এবরিজিনাল' (Aboriginal), 'জনজাতি', 'তফসিলি জাতি', 'ক্ষুদ্র জাতিসত্তা', 'ফার্স্ট-নেশান' (First-Nation) প্রভৃতি। অন্যদিকে জাতিসংঘ এধরনের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলোকে 'ইন্ডিজেনাস পিপল' (Indigenous People) নামে অভিহিত করছে। বিশেষত সেপ্টেম্বর, ২০০৭-এ জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রে 'ইন্ডিজেনাস পিপল' (Indigenous People) দের বিশেষ অধিকার স্বীকৃত হয়।
'ইন্ডিজেনাস পিপল্' (Indigenous People)-এর বাংলা আভিধানিক অর্থ 'আদিবাসী জনগোষ্ঠী'। জাতিসংঘের ব্যবহৃত 'ইন্ডিজেনাস পিপল্' (Indigenous People)-এর ধারণার উৎপত্তি মূলত অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা মহাদেশের প্রথম অধিবাসী জনগোষ্ঠীর ধারণা থেকে। অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা মহাদেশে প্রথম মানুষ বসবাস শুরু করে যথাক্রমে প্রায় ৪৫ হাজার এবং ১৬ হাজার বছর আগে। এই আদি মানুষেরাই দুই মহাদেশের প্রথম ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী। এই দুই মহাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে হাজার হাজার বছর ধরে অন্যান্য মহাদেশের কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ প্রবেশ করেনি। অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা মহাদেশে বহিরাগত শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী প্রবেশের ইতিহাস বেশি দিনের নয়। তোমরা নিশ্চয়ই পড়েছ যে, ১৪৯২ সালে কলম্বাস আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেছিলেন। এখানে আবিষ্কার বলতে বোঝানো হয়েছে যে, কলম্বাস ও তাঁর সহযাত্রীরা ইউরোপ মহাদেশ থেকে প্রথম আমেরিকা মহাদেশে প্রবেশ করেন ১৪৯২ সালে। ইউরোপ থেকে কলম্বাসের আগমনের পূর্বেও আমেরিকা মহাদেশে মানুষের বসবাস ছিল হাজার হাজার বছর ধরে। মাত্র পাঁচশত বছর আগে কলম্বাসের নেতৃত্বে শ্বেতাঙ্গদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পনের হাজার বছর ধরে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীরাই হলো আমেরিকার স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী। বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শ্বেতাঙ্গরা মূলত সেখানে বহিরাগত এবং বসতিস্থাপনকারী। তাই জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী এই দুই মহাদেশে খুব সহজেই আদিবাসী ও বসতিস্থাপনকারী জনগোষ্ঠীর পার্থক্য নিরূপণ করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বসতি স্থাপনের ইতিহাসের দিক থেকে এ ধরনের পার্থক্য নিরূপণ করা সহজ কথা নয়।
বর্তমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী হাজার হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। ঐতিহাসিক দিক থেকে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল ও উচ্চভূমি এলাকার অধিবাসী। বাংলাদেশে মাত্র কয়েকশত বছর পূর্বেও জনসংখ্যা স্বল্পতার কারণে এক নৃগোষ্ঠী অন্য নৃগোষ্ঠীর বসতি অঞ্চলে প্রবেশ করেনি। এজন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর অধিকার ও প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছে।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাচীন-ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীগুলোর বহু সদস্য অসীম বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। অনেক ত্যাগ স্বীকারের মধ্য দিয়ে তারাও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়াও ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন থেকে শুধু করে বিভিন্ন জাতীয় প্রয়োজনে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের অবদান সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। এদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতেও তাদের অবদান প্রশংসনীয়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে এ সকল নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে অসামান্য ভূমিকা রেখে চলেছে। এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে এ অধ্যায়ের পরবর্তী পাঠগুলোতে আলোচনা করা হলো।
কাজ-১ ঃ বাংলাদেশ কেন একটি বৈচিত্রপূর্ণ দেশ? কাজ-২ ঃ এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহকে যে সকল নামে ডাকা হয় তার একটি তালিকা তৈরী কর। |
বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই কয়েকটি নৃগোষ্ঠীর মানুষদের একসাথে বসবাস করতে দেখা যায়। সকল নৃগোষ্ঠীর বসবাসের অঞ্চলগুলো বাংলাদেশের মানচিত্রে চিহ্নিত করে আমরা এ বৈচিত্র্য দেখতে পারি। এভাবে আমরা বাংলাদেশের একটা সাংস্কৃতিক মানচিত্র অংকন করতে পারি। শুধু তাই নয়, সাংস্কৃতিক মানচিত্রে আমরা বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে নানা তথ্যও উপস্থাপন করতে পারি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের জন্য এ ধরনের মানচিত্রের গুরুত্ব অপরিসীম।
সাংস্কৃতিক মানচিত্রে দেশের বিভিন্ন জায়গার ভৌগোলিক সীমারেখার সাথে সাংস্কৃতিক তথ্যের সরাসরি সংযোগ ঘটানো যায়। বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মাঝে কারা পরস্পরের কাছাকাছি বা প্রতিবেশী ও কারা পরস্পরের দূরবর্তী তা শনাক্ত করতে সাহায্য করবে এ মানচিত্র। একই সাথে আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে নৃগোষ্ঠীগত তুলনা করতে পারব। তাই সাংস্কৃতিক মানচিত্রের মাধ্যমে আমরা যেমন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও স্থানসমূহ চিনতে পারব, তেমনিভাবে দেশের মানুষ ও সংস্কৃতিকে জানতে পারব।
বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে রংপুর, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও রাজশাহী অঞ্চলে সাঁওতাল, ওরাঁও, মাহলে, রাজোয়াড়, গরাত, তুড়ি, রাজবংশী, মুণ্ডাসহ আরও অনেক নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে। আবার খুলনা বিভাগে মুণ্ডা ছাড়াও বুনো ও বাগদি নৃগোষ্ঠীর মানুষ দেখা যায়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলা তিনটিতে অনেকগুলো ভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে, যেমন: ম্রো, খ্যাং, লুসাই, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমি, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, পাচ্ছো এবং বম্ প্রভৃতি। মান্দি বা গারো নৃগোষ্ঠীর লোকদের বসতি বাংলাদেশের নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে। তবে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, গাজীপুরে মান্দি বা গারোদের দেখা পাওয়া যায় বেশি। ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুরে আরও যে নৃগোষ্ঠীগুলোর বসতি দেখা যায় তারা হলো- হাজং, কোচ, ডালু, রাজবংশী প্রভৃতি। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে সিলেটের জৈন্তা পাহাড়ে খাসি নৃগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে। এছাড়াও সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ এলাকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, মেইতেই মণিপুরী এবং পাঙ্গান মণিপুরীদের বসবাস। পটুয়াখালী, বরগুনা ও কক্সবাজার জেলায় রয়েছে রাখাইন নৃগোষ্ঠীর বাস।

বাংলাদেশের মানচিত্রে বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বিবরণ সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে তোমরা নিজেরাই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ম্যাপ তৈরি করতে পার। অর্থাৎ, বাংলাদেশের যেকোনো একটি নির্দিষ্ট থানা, উপজেলা বা জেলার চৌহদ্দি মানচিত্রে চিহ্নিত করার পর সেখানে দেখানো যায় কোন্ কোন্ নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে। মানচিত্রে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর উপস্থিতি বোঝানোর জন্য তোমরা বিভিন্ন ধরনের চিহ্ন, রং বা সঙ্কেতের ব্যবহার করতে পার। এ প্রক্রিয়ায় একটি উপজেলা থেকে শুরু করে একটি জেলা বা বিভাগ হয়ে পুরো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য মানচিত্রে ধারণ করা যায়। মানচিত্রে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর উপস্থিতি ও অবস্থানকে আলাদা রঙে সাজানো হলে তোমরা একটি ঝলমলে রঙিন বাংলাদেশ পাবে। তোমরা দেখতে পাবে আমাদের দেশ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে কতটাই রঙিন ও সমৃদ্ধ। শুধু মানচিত্রেই নয়, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আমাদের জীবনেও আনে রঙের ছোঁয়া। বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথে আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে আমরা সবাই সমৃদ্ধ হতে পারি। সকল সংস্কৃতির ঐক্য আর সম্প্রীতির ভিত্তিতে আমরা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও রঙিন ও সুন্দর করে তুলতে পারব।
কাজ- ১ ঃ সাংস্কৃতিক মানচিত্র কী? সাংস্কৃতিক মানচিত্রের প্রয়োজনীয়তা কী? কাজ-২ ঃ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্র অঙ্কন কর। |
ঢাকা বিভাগের প্রায় সব জেলাতেই বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে। এসব জেলার মধ্যে শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও ঢাকা জেলাতে এদের বসবাস বেশি। ঢাকা বিভাগে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো হলো- মান্দি (গারো), হাজং, কোঁচ, রাজবংশী, ডালু, হো, মাহাতো, মুন্ডা, ওরাঁও প্রভৃতি। এছাড়া, মূলত চাকরি ও পড়াশুনোর সূত্রে অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বসবাস করে। ঢাকা বিভাগে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর জনসংখ্যা প্রায় তিন লক্ষ। এদের মধ্যে মান্দি জাতিসত্তা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
মান্দি জাতিসত্তা: বাংলাদেশে মান্দিরা গারো নামে অধিক পরিচিত। কিন্তু এই নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা নিজেদের
মান্দি নামে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। নিজেদের ভাষাকে তারা বলে 'আচিক কুসিক' অর্থাৎ পাহাড়ি ভাষা। মান্দিদের রয়েছে বিভিন্ন দল, গোত্র ও উপগোত্র। এসব গোত্রকে তাদের ভাষায় 'চাচ্চি' এবং বংশকে 'মাহারি' বলা হয়। মান্দি সমাজ মাতৃসূত্রীয়, অর্থাৎ মাতা হলেন পরিবারের প্রধান। সন্তানদেরকে মায়ের উপাধি গ্রহণ করতে হয়। মায়ের সুত্রেই মান্দিদের বংশধারা বা 'মাহারি' নির্ধারিত হয়। সমতলের গারোদের ভাষার নাম 'লামদানী'।
বাংলাদেশের মান্দি সমাজ মূলত কৃষিনির্ভর। আগে তারা প্রধানত জুমচাষ করতো। তবে সমাজের শিক্ষিত অনেকেই এখন সরকারি-বেসরকারি চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা পেশায় নিযুক্ত। তাদের সামাজিক উৎসবগুলো মূলত কৃষিকেন্দ্রিক। এক্ষেত্রে বৃহত্তম উৎসব হলো 'ওয়ানগালা'।

মান্দিদের আদি ধর্মের নাম 'সাংসারেক' আর প্রধান দেবতার নাম 'তাতারা রাবুগা'। কিন্তু মান্দি জাতিসত্তার অধিকাংশ মানুষ বর্তমানে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করায় খ্রিষ্ট-ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানগুলোই এখন তাদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
মান্দি নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের নাম 'দকমান্দা' ও 'দকশারি'। পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক হলো 'গান্দো'। মান্দিদের বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় খাদ্যও আছে। এমন একটি খাবারের নাম হল 'খাড়ি'। মুরগির মাংস দিয়ে এটি রান্না করা হয়। অতীতে মান্দিদের মাঝে দো'চালা লম্বা বাসগৃহ বেশ জনপ্রিয় ছিল। এ ধরনের ঘরকে মান্দি ভাষায় বলা হয় 'নক'।
কাজ- ১ ঃ ঢাকা বিভাগে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নামের একটি তালিকা প্রস্তুত কর কাজ-২ ঃ মান্দি জাতিসত্তার বসবাসের অঞ্চল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনধারার কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর। |
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থাৎ খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় ১৪টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বসবাস করে। জাতিসত্তাগুলো হলো খুমি, চাক্, খ্যাং, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, গুর্খা, ত্রিপুরা, পাংখো, বম্, মারমা, ম্রো, লুসাই, বনযোগী এবং অসমিয়া। আরেকটি নৃগোষ্ঠী রাখাইনদের বড় অংশের বসবাস কক্সবাজার জেলায়। বরগুনা, পটুয়াখালী ও বরিশাল জেলাতেও কিছু রাখাইন বাস করে। ত্রিপুরাদের বসতি আরও বিস্তৃত। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও তাদের বসবাস রয়েছে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, ফরিদপুর, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলায়। তাছাড়া সংখ্যায় কম হলেও চট্টগ্রাম বিভাগের সমতল জেলাগুলোতে গুর্খা, বাউড়ি প্রভৃতি জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে। চট্টগ্রাম বিভাগে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষ। এদের মধ্যে এখানে চাকমা জাতিসত্তা সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হলো।
চাকমা জাতিসত্তা: পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে চাকমারা জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের বৃহত্তম। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার জেলাতে তাদের বসবাস রয়েছে। এছাড়া চাকরিসূত্রে চাকমারা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বসবাস করছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা, আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ও দিল্লীসহ বিভিন্ন রাজ্যে অনেক চাকমা বসবাস করে।
খাগড়াছড়ি জেলার কিছু অংশ এবং রাঙ্গামাটি জেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে চাকমা সার্কেল যার প্রধান হলেন চাকমা চীফ বা চাকমা রাজা। পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও দুটি সার্কেলের মতো চাকমা সার্কেলও অনেক মৌজা নিয়ে গঠিত। প্রত্যেক মৌজায় রয়েছে কতগুলো গ্রাম। চাকমা ভাষায় গ্রামকে আদাম বা পাড়া বলা হয়। গ্রাম প্রধানের উপাধি হলো 'কার্বারী'। কয়েকটি 'আদাম' বা গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় এক-একটি মৌজা। মৌজা প্রধান হলেন 'হেডম্যান' যার নেতৃত্বে মৌজার অধিবাসীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত খাজনা আদায়, বিভিন্ন সামাজিক বিরোধের বিচারসহ এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম এবং জনগণের ভালমন্দ দেখভালের কাজগুলো পরিচালিত হয়। মৌজা প্রধানের সাথে আলাপ-আলোচনা করে চাকমা রাজা গ্রাম প্রধান বা কার্বারীকে নিয়োগ দেন। আর সাধারণত রাজার সুপারিশ অনুযায়ী মৌজার হেডম্যানকে নিয়োগ দেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক।
প্রথাগতভাবে চাকমা রাজা হলেন সমাজপতি এবং সমাজের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। চাকমা রাজা প্রথাগত আইন অনুযায়ী নিজ সার্কেলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের সামাজিক বিচারকাজ পরিচালনা করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। চাকমা সার্কেলের বর্তমান রাজার নাম ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। তিনি চাকমা রাজবংশের ৫১তম রাজা।
চাকমা সমাজের চারণ কবি 'গেংহুলি'দের পালাগান থেকে জানা যায় যে, সুদূর অতীতে চাকমারা চম্পকনগর রাজ্যে বসবাস করতো। চাকমা যুবরাজ বিজয়গিরি ২৬ হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধাভিযানে বের হয়ে একে একে চট্টগ্রাম, আরাকান, কুকি রাজ্য (লুসাই পাহাড়) প্রভৃতি অঞ্চল জয় করার পর চম্পকনগরে ফিরে না গিয়ে নববিজিত অঞ্চলগুলোর একাংশে নতুন রাজ্য স্থাপন করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। যুবরাজ বিজয়গিরি আনুমানিক ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে উল্লেখিত রাজ্যগুলো জয় করেন। বর্তমান কালের চাকমারা রাজা বিজয়গিরির সেই আরাকান ও চট্টগ্রাম বিজয়ী ২৬ হাজার সৈন্যের বংশধর বলে অনেকের ধারণা। তবে চাকমারা নিজেদেরকে শাক্যবংশীয় হিসেবে পরিচয় দিতেও গর্ববোধ করে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক মহামানব গৌতম বুদ্ধ শাক্যবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শাক্য শব্দ থেকে পরে চাকমা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেক গবেষক দাবি করেন।
চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক এবং মূলত কৃষিনির্ভর। জুমচাষ এবং কৃষিজমি চাষাবাদ উভয় ক্ষেত্রেই তারা সমান পারদর্শী। চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাদের প্রায় প্রত্যেকটি গ্রামে বৌদ্ধমন্দির রয়েছে। বৈশাখী
পূর্ণিমাসহ বিভিন্ন পূর্ণিমার দিনে তারা বৌদ্ধমন্দিরে ফুল, খাদ্যদ্রব্যসহ নানা উপাচার দিয়ে এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে বুদ্ধকে পূজা করে। চাকমা সমাজের একজন বোধিজ্ঞানপ্রাপ্ত সাধক বনভান্তে (শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির) বৌদ্ধদের কাছে পরম পূজনীয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। রাঙ্গামাটিতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত চাকমা রাজ বনবিহারে বৌদ্ধ পূর্ণিমা, কঠিন চীবর দান এবং অন্যান্য পূর্ণিমা তিথিতে ভক্ত, অনুসারী এবং ধর্মানুরাগীদের ঢল নামে।

প্রথাগতভাবে রাজার শাসনাধীন হলেও চাকমা জাতিসত্তা নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে চলা রাজনৈতিক সংঘাতের পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে 'পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন এবং উন্নয়ন কর্মকান্ড তদারকির জন্য 'পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ' গঠন করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ ঐতিহাসিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের সাধারণ সরকারি প্রশাসন, তিন পাহাড়ি রাজা এবং আঞ্চলিক পরিষদের সমন্বিত শাসনাধীনে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। প্রথাগত নেতৃত্বের বাইরে এই জাতীয় এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রভাবও চাকমা সমাজে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় ।
কাজ- ১ ঃ চট্টগ্রাম বিভাগে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নামের একটি তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ-২ ঃ চাকমা জাতিসত্তার বসবাসের অঞ্চল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনধারার কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর। |
সিলেট বিভাগে মোট ৪টি জেলা সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এসব জেলায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বহু ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বাস করে। তারা হলো খাড়িয়া, মান্দি, ওরাঁও, ত্রিপুরা, হাজং, খাসি, বিষ্ণুপ্রিয়া, মেইতেই, পাঙ্গান, বাগদি, বানাই, বীন, ভূমিজ, গন্ড, গঞ্জ, গুর্খা, হালাম, মুষহর, মাহাতো, নায়েক, নুনিয়া, পানিখা, পাত্র, শবর, কোচ, ডালু, সাঁওতাল, মুন্ডা, হো, মালো, মিকির, মাহলে, খন্দ প্রভৃতি। তবে সিলেট অঞ্চলে জনসংখ্যার দিক থেকে বাঙালি ছাড়া অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, মেইতেই মণিপুরী ও খাসি নৃগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ। সিলেট বিভাগে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মোট জনসংখ্যা প্রায় তিন লক্ষ, যাদের অধিকাংশই চা বাগানে কাজ করে। বাংলাদেশের মণিপুরী জাতিসত্তাসমূহ সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো।
মণিপুরী জাতিসত্তাসমূহ: মণিপুরী জাতিসত্তাসমূহের বসবাস সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ,
সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর (১৮১৯-১৮২৬) প্রথম দিকে বার্মার সৈন্যরা ভারতের মণিপুর রাজ্য আক্রমণ করলে সেখানকার কিছু জাতিসত্তার মানুষ এসে সিলেট অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে আসার কারণে বাংলাদেশে তারা মণিপুরী নামে পরিচিত। সাধারণভাবে মণিপুরী নামে পরিচিত হলেও এদের মাঝে রয়েছে তিনটি পৃথক ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তা। মণিপুরী নামে পরিচিত এই জাতিসত্তা বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ হলো: (১) মেইতেই মণিপুরী, (২) বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী এবং (৩) পাঙ্গান মণিপুরী। এই তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এখানে দেওয়া হলো।

(১) মেইতেই জাতিসত্তা: সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলাতে মেইতেইদের জনসংখ্যা বেশি। মেইতেইদের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা রয়েছে ভারতের মনিপুর রাজ্যে। তবে এছাড়াও ভারতের ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয় রাজ্যে, চীনের ইয়ুনান প্রদেশে এবং মিয়ানমারে মেইতেইদের বসবাস রয়েছে। বাংলাদেশের মেইতেই সমাজ এখনও গ্রাম ও কৃষিনির্ভর। মেইতেইদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, দৃশ্যশিল্প, তাঁতবস্ত্র প্রভৃতি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। মেইতেইদের মাতৃভাষা 'মেইতেইলোন' যা টিবেটো-বার্মান শাখার কুকি-চিন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। মেইতেইদের প্রাচীন ধর্মের নাম 'অপোকপা'। তাদের প্রধান দেব-দেবীরা হলেন সানামাহি, পাখংবা, অপোকপা, শিদাবা। অতি প্রাচীন কাল থেকে মেইতেইদের মাঝে নিজস্ব চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত। যারা এই চিকিৎসার কাজটি করেন তারা 'মাইবা' বা 'মাইবী' নামে পরিচিত ছিল।
(২) বিষ্ণুপ্রিয়া জাতিসত্তা বেশিসংখ্যক বিষ্ণুপ্রিয়া বাস করে মৌলভীবাজার জেলায়। এদের আদি নিবাস ভারতের মনিপুর রাজ্যে। বিষ্ণুপ্রিয়াদের কয়েকটি পরিবার মিলে একটি পাড়া গড়ে উঠে। প্রতিটি পাড়া বা গ্রামে রয়েছে এক একটি দেব মন্দির ও মন্ডপ। এসকল মন্দির ও মন্ডপ ঘিরে আবর্তিত হয় পাড়ার যাবতীয় ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকান্ড। প্রতিটি গ্রামে মন্দির পরিচালনা ও দেবতার পূজা-অর্চনার জন্য একটি ব্রাহ্মণ পরিবার থাকে। গ্রামে রয়েছে গ্রাম পঞ্চায়েত, আবার কয়েকটি গ্রামে রয়েছে পরগনা পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েত পরিচালনার জন্য ব্রাহ্মণদের মধ্যে থেকে বিজ্ঞজনকে নির্বাচন করা হয়। বিষ্ণুপ্রিয়া সমাজে গ্রাম পঞ্চায়েত ও পরগনা পঞ্চায়েতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিষ্ণুপ্রিয়ারা বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী। তাদের প্রধান উৎসব রাসযাত্রা, রথযাত্রা ইত্যাদি। কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথীতে রাসপূর্ণিমা উদযাপন করা হয়। রাসপূর্ণিমায় গোষ্ঠলীলা বা রাখাল রাস ও রাসলীলার আয়োজন করা হয়। সংকীর্তন হলো অন্যতম বৃহত্তর ধর্মীয় উৎসব। বিষ্ণুপ্রিয়াদের মাতৃভাষা ইন্দো-আর্যীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বিষ্ণুপ্রিয়া লোকেরা পাঁচটি গোত্রে বিভক্ত। একই গোত্রের মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়া সমাজে বিবাহ নিষিদ্ধ।
(৩) পাঙ্গান জাতিসত্তা: সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে (১৬০৬ খৃঃ) হবিগঞ্জের তরফ অঞ্চলের পাঠান শাসক খাজা ওসমানের সৈন্যাধ্যক্ষ মোহাম্মদ সানীর নেতৃত্বে ইসলাম ধর্মের অনুসারী এক দল সৈন্যবাহিনী মণিপুর রাজ্যে অভিযান চালায়। তখনকার মণিপুরের রাজা খাগোম্বার সাথে এক সন্ধির ফলে এই বাহিনী মণিপুরে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীকালে মোগল শাসক মীর জুমলা আসাম আক্রমণে বিপর্যস্ত হলে ঐ সৈন্যবাহিনীর অনেকে পার্শ্ববর্তী রাজ্য মণিপুরে আশ্রয় নেয়। তারা মণিপুরের স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং ইসলাম ধর্ম প্রচার করে। মণিপুরের মুসলমান জনগোষ্ঠীরাই পাঙ্গান নামে পরিচিত।
পাঙ্গানরা 'মেইতেইলোন' ভাষায় কথা বলে যা টিবেটো-বার্মান শাখার কুকি-চিন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এরা সবাই ইসলাম ধর্মের সুন্নী মতাবলম্বী। নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেই সাধারণত বিয়ে হয়। বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ অংশে এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
| কাজ- ১ ঃ সিলেট বিভাগে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নামের একটি তালিকা প্রস্তুত কর। |
রাজশাহী বিভাগে মোট ৮টি জেলা। এসব জেলার প্রত্যেকটিতে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি নানা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। কোথাও রয়েছে তাদের ঘনবসতি, আবার কোথাওবা তাদের বসবাস ছড়িয়ে-
ছিটিয়ে। রাজশাহী বিভাগে যেসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বাস। করে তাঁরা হলো-সাঁওতাল, পাহাড়িয়া, রাজবংশী, ও রাঁও, মাহাতো, মুন্ডা, ভূঁইমালী, ভূঁইয়া, ভূমিজ, খাড়িয়া, কোডা, মালো, পাহান, রাজোয়াড়, তুড়ি, কোঁচ, মুষহর, হো, মাহলে, বর্মণ, গন্ড প্রভৃতি। এই বিভাগে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর জনসংখ্যা আনুমানিক ছয় লক্ষ। নিচে ওরাঁও জাতিসত্তার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

ওরাঁও জাতিসত্তা: ওরাঁওরা বহু শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে বসবাস করে আসছে। বর্তমানে ওরাঁওরা উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, জয়পুরহাট, নওগাঁ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও নীলফামারী জেলায় বসবাস করে। এছাড়া সিলেট অঞ্চলের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলাতেও বেশ কিছু ওরাঁও বাস করে। এখানে তারা মূলত চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ এবং তাদের সাথে অন্যান্য অঞ্চলের ওরাওদের জীবনযাত্রায় বেশ পার্থক্য রয়েছে। গাজীপুর জেলায়ও কিছু সংখ্যক ওরাঁও বাস করে। নওগাঁ ও রংপুর জেলায় তাদের জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
ওরাঁও জাতিসত্তা মূলত প্রকৃতি পূজারি। তাদের সৃষ্টিকর্তার নাম ধার্মেশ। তিনি প্রধান দেবতা এবং সূর্যে অবস্থান করেন বলে সূর্যকেও তারা তাদের দেবতা মানে। ওরাঁওদের সমাজে প্রায় সারা বছর নানা পূজা পার্বন ও উৎসব পালিত হয়। এ ধরনের কিছু উৎসব হলো- সারহুল, কারাম, খারিয়ানি এবং ফাগুয়া। এদের মধ্যে কারাম হলো সবচেয়ে বড় উৎসব। প্রচলিত বিশ্বাস মতে, একসময় ওরাঁও জাতি শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে গভীর জঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে কারাম বৃক্ষের নিচে আশ্রয় নেয়। এই বৃক্ষ শত্রুর হাত থেকে তাদের রক্ষা করে বলে এর স্মরণে তারা ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে কারাম উৎসবের আয়োজন করে থাকে।
এক সময় বরেন্দ্র অঞ্চল বন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল বলে শিকার ছিল তাদের অন্যতম জীবিকা। নিজ অঞ্চলে বসবাসের এলাকা ও কৃষিজমি কমে যাওয়ায় তারা এখন শহরমুখী হয়ে পড়ছে এবং নানা পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে। নারীরা বিভিন্ন হস্তশিল্প কেন্দ্র ও বেসরকারি সংস্থায়ও সম্পৃক্ত হচ্ছে।
এক সময় বরেন্দ্র অঞ্চল বন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল বলে শিকার ছিল তাদের অন্যতম জীবিকা। নিজ অঞ্চলে বসবাসের এলাকা ও কৃষিজমি কমে যাওয়ায় তারা এখন শহরমুখী হয়ে পড়ছে এবং নানা পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে। নারীরা বিভিন্ন হস্তশিল্প কেন্দ্র ও বেসরকারি সংস্থায়ও সম্পৃক্ত হচ্ছে।
ওরাঁওদের মধ্যে দুটি ভাষার প্রচলন রয়েছে। একটির নাম কুঁডুখ, যা দ্রাবিড় পরিবারভুক্ত এবং অপরটির নাম সাদরি। সাদরি ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের জীবন ও সংস্কৃতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে লোকসঙ্গীত, লোকনাট্য, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নৃত্যগীত, বাদ্য-বাজনা প্রভৃতি। নানা ধরনের পিঠাপুলি দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন ওরাঁও সমাজে একটি ঐতিহ্যবাহী রীতি।
ওরাঁও জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিক নানা ঘটনার সাক্ষী ও অংশীদার। ১৯৫০ সালে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে নাচোলে তেভাগা আন্দোলন নামে যে কৃষক আন্দোলন শুরু হয় তাতে তাঁরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শত শত ওরাঁও যুবক অংশ নিয়েছিল। ওরাঁওদের মধ্যে ৫৫টি গোত্রের সন্ধান পাওয়া যায় । একই গোত্রের নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ। তাদের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ওরাঁওদের যে গ্রাম সংগঠন আছে তাকে বলা হয় পাঞ্চেস। প্রতিটি গ্রামে একজন সর্দার বা মহাতোষ এবং একজন পুরোহিত বা নাইগাস থাকে। গ্রামের সাত- আটজন বয়স্ক ব্যক্তি দ্বারা তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য পাঞ্চেস গঠিত হয়।
কাজ-১ : রাজশাহী বিভাগে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নামের একটি তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ-২ : ওরাঁও জাতিসত্তার বসবাসের অঞ্চল উল্লেখ কর। |
রংপুর বিভাগের মোট ৮টি জেলার প্রত্যেকটিতেই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ বাস করে। এসব জেলায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো হলো-সাঁওতাল, ওরাঁও, মালো, তুরি, কোচ, কোলহে, পাহাড়িয়া, মাহাতো, মুষহর, মাহলে, রাজবংশী প্রভৃতি। রংপুর বিভাগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যা আনুমানিক দুই লক্ষ। এদের মধ্যে নিচে সাঁওতাল জাতিসত্তার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।
সাঁওতাল জাতিসত্তা: বাংলাদেশে সাঁওতালরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিসত্তা। উত্তরবঙ্গের
রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, নবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী প্রভৃতি জেলায় তারা বাস করে। উত্তরবঙ্গে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে তাদের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সাঁওতালরা নিজেদের হড় বলে। ব্রিটিশ সরকার ১৮৩৬ সালে ভারতবর্ষের বিহার রাজ্যে সাঁওতালদের নিরাপদ বসবাসের জন্য একটি এলাকা নির্দিষ্ট করে দেয়, যা সাঁওতাল পরগণা নামে পরিচিত। পরে সেখানে বহিরাগত মহাজন ও ব্যবসায়ীরা তাদের উপর নিপীড়ন শুরু করে। তারা সহজ সরল সাঁওতালদেরকে বিভিন্ন কৌশলে ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলে। এই শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাঁওতালরা অবশেষে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৮৫৫ সালের সেই বিদ্রোহ ইতিহাসে 'সাঁওতাল বিদ্রোহ' নামে পরিচিত হয়। সাঁওতাল ভাষায় বিদ্রোহকে বলা হয় 'হুল'। এই বিদ্রোহের নায়ক দুই ভাই সিধু ও কানহুকে তারা তাদের জাতীয় বীর হিসেবে ভক্তি করে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার মহাজনদের পক্ষ নিয়ে কঠোর হস্তে সেই বিদ্রোহ দমন করে। এতে প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল বিদ্রোহী নিহত হন। ঐ সময় সাঁওতালরা দলে দলে বর্তমান বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে ও আসামে পাড়ি জমান বলে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন। আবার স্থানীয় জমিদাররা ব্যাপক পতিত জমি চাষাবাদের জন্য এই অঞ্চলে তাদেরকে নিয়ে আসেন বলেও অনেকের ধারণা। আদমশুমারি রিপোর্ট ২০১১ অনুসারে ১,৪৭,১১২ (এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার একশত বার) জন সাঁওতাল বাংলাদেশে বসবাস করে।
সাঁওতালী ভাষায় দেবতাকে বলা হয় 'বোঙ্গা'। তাদের আদি দেবতা হল সূর্য। অন্যান্য যেসব দেবতাকে সাঁওতালরা পূজা করে তাদের মধ্যে 'মারাং বুরু', 'অড়াংক্ বোঙ্গা', 'আবগে বোঙ্গা', 'জাহের এরা', 'গোঁসাই এরা' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সাঁওতালদের বিশ্বাস- সৃষ্টিকর্তা এবং আত্মা অমর ও অবিনশ্বর।
তারা সর্বত্র বিরাজমান এবং তাদেরকে তুষ্ট করার উপরই মানব জাতির ভাল-মন্দ নির্ভর করে। সাঁওতাল সমাজে হিন্দু দেব-দেবীর প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। সাঁওতালদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পুরুষরা বাম হাতে কজির উপরে বেজোড় সংখ্যক উল্কি চিহ্ন আঁকে। মেয়েরাও নিজেদের হাতে ও বুকে উল্কি চিহ্ন আঁকে। উল্কিবিহীন অবস্থায় কেউ মারা গেলে পরকালে যমরাজ তাকে কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকেন বলে তাদের বিশ্বাস। অনেকে এখন খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিতও হচ্ছে। ফলে ক্রমশ বদলে যাচ্ছে তাদের সংস্কৃতি ও জীবনধারা।
সাঁওতাল সমাজের মূল ভিত্তি হচ্ছে গ্রাম-পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েত পরিচালনার জন্য সাতজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি থাকেন। তারা হলেন মান্যহি, জগমান্যহি, গডেৎ, পারাণিক, জগ পারাণিক, নায়কে ও কুডাম নায়কে প্রভৃতি। জানগুরু পঞ্চায়েত সদস্য নয়, তাঁকে তান্ত্রিক ও ধর্মগুরু হিসেবে গণ্য করা হয়। 'মান্যহি' হলেন গ্রামপ্রধান। তার নেতৃত্বে গ্রামের সবকিছু পরিচালিত হয়।

সাঁওতালদের ভাষা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাপরিবারের অন্তর্গত। সাঁওতাল সমাজ বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত। সাঁওতালী ভাষায় এসব গোত্রকে 'পারিস' বলা হয়। সাঁওতাল সমাজ পিতৃপ্রধান। পিতার সূত্রে সন্তানের গোত্র পরিচয় নির্ধারিত হয়। পিতার সম্পত্তিতে পুত্রদের সমান অধিকার থাকলেও কন্যাসন্তান কোনো সম্পত্তি দাবি করতে পারে না। তাদের অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী। তবে সাঁওতাল সমাজে নারীকে উর্বরা শক্তির প্রতীক বলে গণ্য করা হয়। তাদের বিশ্বাস নারীরাই সর্বপ্রথম কৃষিকাজ আবিষ্কার করেছিল। নারী ও পুরুষ উভয়েই ক্ষেতে কাজ করে। ধান, সরিষা, তামাক, মরিচ, ভুট্টা, তিল, ইক্ষু প্রভৃতি ফসল তারা উৎপাদন করে। তাছাড়া খেজুর পাতা ও ছন দিয়ে তৈরি নানা প্রকার মাদুর, ঝাড়ু নিজেদের ব্যবহারের পাশাপাশি তারা সেসব জিনিস হাটেও বিক্রি করে।
সাধারণত সাঁওতালরা মাটির দেয়ালের উপর শন বা খড়ের ছাউনি দিয়ে তৈরি চারচালা ঘরে বসবাস করে। অতিথি আপ্যায়নসহ বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে 'হাঁড়িয়া' (নিজেদের তৈরি পানীয়) পরিবেশন তাদের সংস্কৃতির অংশ। সাঁওতালদের নিজস্ব উৎসবাদির মধ্যে বাহা, সোহ্রাই এবং এরোক উৎসব উল্লেখযোগ্য। তাদের সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো লাগ'ড়ে নাচ। সাঁওতালদের বিয়ের অনুষ্ঠানে আয়োজিত হয় 'দং' নাচ।
কাজ- ১ : রংপুর বিভাগে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নামের একটি তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ- ২ : সাঁওতাল জাতিসত্তার বসবাসের অঞ্চল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনধারার কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর। |
বরিশাল ও খুলনা বিভাগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা আনুমানিক আড়াই লক্ষ। বরিশাল বিভাগে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হলো রাখাইন। তাদের বসবাস মূলত পটুয়াখালী, বরিশাল ও বরগুনা জেলায়। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলাতেও রাখাইনদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস করে। খুলনা বিভাগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনবসতি দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম। এই বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো হলো- মুন্ডা, মাহাতো, বুনো, বাগদি, রাজোয়াড়, রাজবংশী প্রভৃতি। মূলত কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলাতেই এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বসবাস করছে। নিচে মুন্ডা জাতিসত্তার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।
মুন্ডা জাতিসত্তা: বাংলাদেশে মুন্ডারা উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনের কাছাকাছি এলাকায় বাস করে। ঝিনাইদহ জেলায় এবং বৃহত্তর সিলেটের চা বাগান এলাকাতে বেশ কিছু মুন্ডা পরিবার আছে। খুলনা জেলার কয়রা ও ডুমুরিয়া উপজেলার কয়েকটি গ্রামে তাদের বসতি রয়েছে। এছাড়া সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, দেবহাটা এবং তালা উপজেলায়ও মুন্ডাদের একটি বড় অংশ বাস করে। ভারতের ঝাড়খন্ড, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড় এবং উড়িষ্যা রাজ্যে অধিক সংখ্যক মুন্ডা বাস করে।
মুন্ডা জনগোষ্ঠী প্রধানত কৃষিজীবী। মুন্ডা বিদ্রোহ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে একটি স্মরণীয় বিদ্রোহ। বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ শুরু হয়। তিনি ইংরেজদের শাসন এবং দেশীয় শোষকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে একটি সমৃদ্ধিশালী সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। দৃঢ় আদর্শের জন্য তাকে মুন্ডারা ভগবান মনে করে। ১৮৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের সিংভূম, তামার ও বাসিয়ার অঞ্চলে ব্রিটিশ সরকারের অফিস, পুলিশ স্টেশন, মিশন হাউস আক্রমণ করেন এবং অবশেষে গ্রেপ্তার হন। ১৯০০ সালে রাঁচি কারাগারে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। শুধুমাত্র তীর- ধনুক নিয়েই তিনি পরাক্রমশালী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

মুন্ডারা ১৩টি 'কিলি' বা গোত্রে বিভক্ত। তাদের নিজস্ব মোড়ল ও রাজা আছে। মোড়ল একটা গোত্রকে আর রাজা কয়েকটি গোত্রকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা সামাজিক ও ধর্মীয় নানা সমস্যায় দিকনির্দেশনা ও সমাধান দিয়ে থাকেন। মুন্ডাদের বাড়িঘর মাটি দিয়ে তৈরি। সমাজে ছেলে সন্তানরাই পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। মুন্ডাদের ধর্মের নাম স্বর্ণা। তাদের বিশ্বাস সিং বোঙ্গা বা সূর্য প্রভু সকল শক্তির উৎস এবং পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা।
মুন্ডাদের ভাষার নাম মুন্ডারি। তবে বর্তমানে তারা ওরাঁওদের সাদরি ভাষাকেও সমানভাবে গ্রহণ করেছে। তাদের নাচের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। তারা ধর্মীয় এবং অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে লাল ও সাদা মাটি দিয়ে চিত্রকর্ম, নানা আল্পনা ও শিল্পকর্ম আঁকে। তাদের বাড়িঘরেও অনুরূপ আল্পনা শোভা পায়।
কাজ- ১ : খুলনা ও বরিশাল বিভাগে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নামের একটি তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ-২ : মুন্ডা জাতিসত্তার বসবাসের অঞ্চল, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনধারার কিছু বিবরণ লিপিবদ্ধ কর। |
Read more