সংস্কৃতি হলো আমাদের জীবনধারা। সংস্কৃতি আমাদের পরিচয়ও বহন করে। প্রকৃতিতে যেমন আমরা নানা বৈচিত্র্য দেখতে পাই, তেমনি সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও রয়েছে অসংখ্য বৈচিত্র্য। মানুষ ও তার সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করে নৃবিজ্ঞান। আমরা নৃবিজ্ঞান এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়ে জানতে পারব এই অধ্যায়ে। নিজের সংস্কৃতির পাশাপাশি অন্যের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার মাধ্যমে আমরা নিজেদের এবং আমাদের দেশকে সমৃদ্ধ করতে পারি। এই অধ্যায়ে আমাদের দেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী ও ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ ও তাদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাব।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-
○ সংস্কৃতির ধারণাটি বর্ণনা করতে পারব।
○ বাংলাদেশের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে পারব।
○ বাংলাদেশের সংস্কৃতির উপাদান ব্যাখ্যা করতে পারব।
রাতুলের স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলো ডিসেম্বরে। ছুটিতে সে তার মামার সাথে কানাডা বেড়াতে যায়। টরোন্টো শহরে তার মামার বাসা। তারা সবাই মিলে কানাডার অনেক জায়গায় বেড়াতে গেল। তখন শীতকাল। কানাডার শহর-গ্রামগুলো সবই সাদা বরফে ঢাকা। যতই দেখে ততই অবাক হতে থাকে রাতুল। কী অদ্ভুত সাদা বরফে ঢাকা এই দেশ কানাডা!
কানাডার মানুষগুলোও একেবারে অন্যরকম। টরোন্টো শহরে বিভিন্ন দেশের লোকজন বসবাস করে। তারা দেখতে যেমন আমাদের থেকে আলাদা, তেমনি তাদের কথাও কিছু বুঝতে পারে না রাতুল। এদের কেউ আফ্রিকান, কেউবা চীনদেশের, আবার অনেকে হয়ত ইউরোপীয় বা আমেরিকান। রাতুলের ভেবে খুব অবাক লাগে যে, একই দেশে কত জাতির মানুষ বসবাস করছে! যদি একটু আলাপ করা যেত ওদের সাথে, ভাবে রাতুল। এত শীতের মাঝে এরা কীভাবে থাকে, বরফের মাঝে কীভাবে চলাচল করে, এদের প্রিয় খাবার কী, অথবা কী ধরনের খেলাধুলা এদের পছন্দ ইত্যাদি নানা প্রশ্ন এসে উঁকি দেয় রাতুলের মনে। এদের ভাষা শিখতে পারলে কী মজাই না হতো, জানা যেত সবকিছু!
রাতুলের মামা সবাইকে নিয়ে বেড়াতে গেলেন বাফীন দ্বীপে। এটি একেবারে উত্তর মেরুর কাছাকাছি অবস্থিত কানাডার সবচেয়ে বড় দ্বীপ। বছরের বেশিরভাগ সময় এখানে বরফে ঢাকা থাকে। আরও অবাক করা বিষয় হলো, শীতকালে এখানে সূর্য উঠে না। সে সময় দিনের পর দিন আর মাসের পর মাস, অন্ধকারে ঢাকা থাকে এ অঞ্চল। এ সময় আকাশে লাল, নীলসহ বিভিন্ন রঙের আলোর খেলা দেখা যায়। আবার একই জায়গায় গরমকালে সূর্য ডুবেই না। এমনকি, রাতদুপুরেও সূর্য দেখা যায়। কী অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য ।

উত্তর মেরুর কাছাকাছি আর অন্ধকারে ডুবে থাকা এমন একটি ভুতুড়ে জায়গায় যে মানুষ বসবাস করতে পারে, আগে রাতুল তা কল্পনাও করেনি। বাফিন দ্বীপে ইনুইট নৃগোষ্ঠীর লোকেরা বসবাস করে। এরা এস্কিমো নামেও পরিচিত। ঐ অঞ্চলটি সারা বছর তুষারাবৃত থাকে বলে গাছপালা প্রায় নেই বলা যায়। এমনকি চাষাবাদও করা যায় না। ইনুইটরা তাই মূলত নানারকম মাছ এবং পশু শিকার করে বেঁচে থাকে। এই প্রচন্ড ঠান্ডায় বেঁচে থাকার জন্য কেরিবু নামে একটি প্রাণীর চামড়া দিয়ে তারা পোশাক তৈরি করে। ইনুইটদের চেহারা, ঘরবাড়ি, জামাকাপড়, চলাফেরা, ভাষা ইত্যাদি সবকিছুই একেবারে অন্যরকম। রাতুল আরও আশ্চর্য হয় ইনুইটদের বরফের তৈরি ঘর 'ইগলু' দেখে। মানুষ কীভাবে বরফের তৈরি ঘরে থাকতে পারে! রাতুল মনে মনে ভাবতে থাকে যে, তার বাংলাদেশের বন্ধুরা নিশ্চয়ই তার কথা। বিশ্বাসই করতে চাইবে না!
কানাডা যাত্রার পর থেকে আবার দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত রাতুল ছিল অচেনা আর অপরিচিত এক জগতে। সেখানে সে ছিল অনেকের মাঝে আলাদা। সেখানকার মানুষদের চিন্তাভাবনা, কাজকর্ম আর তাদের আচার-ব্যবহারের সাথে রাতুলের আগে পরিচয় ছিল না। তার চিরচেনা বাংলাদেশ থেকে এই নতুন জগত অনেক আলাদা। সেখানকার মানুষের চেহারা, ভূ-প্রকৃতি কিংবা আবহাওয়ার সাথে বাংলাদেশের রয়েছে অনেক পার্থক্য। দুই দেশের মানুষের আচার-আচরণ, আদব-কায়দা, চলাফেরা এবং কাজকর্মেও ব্যবধান অনেক। এই পার্থক্য আর বৈচিত্র্যের বিস্ময় রাতুলকে ভাবিয়ে তুলল। আমরা সবাই মানুষ, তারপরও কেন কানাডা ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এত পার্থক্য? বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী ও দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় কিংবা ভাষায় এত তফাৎ কেন হয়? পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ও অঞ্চলের মানুষদের সাথেও কি আমাদের এত পার্থক্য?
রাতুলের কানাডা ভ্রমণে যে জিনিসটি তাকে অবাক করেছে তা হল সংস্কৃতির ভিন্নতা। কিন্তু যে বিষয়টি তাকে কৌতূহলী করেছে তা হলো হরেক রকম মানুষের নানা রকম বিশ্বাস, রীতি-নীতি, আচার-আচরণ দেখার অভিজ্ঞতা। রাতুল তার অতি পরিচিত নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে কানাডার সংস্কৃতির পার্থক্যের বিভিন্ন দিক আবিষ্কার করেছে। সংস্কৃতির এ পার্থক্যগুলোই তাকে বিস্মিত করেছে। দেশবিদেশে ভ্রমণে গেলে সেখানকার অনেক কিছুই আমাদের কাছে একেবারে অজানা অচেনা মনে হয়, অবাক লাগে। সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণেই এমনটি হয়। যেমন করে চারপাশের বায়ু আমাদের ঘিরে রাখে প্রতি মুহূর্ত আর বায়ুর অক্সিজেন আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, ঠিক সংস্কৃতিও তেমনি করে আমাদের ঘিরে রাখে সব সময়। আমাদের জীবনযাত্রার ধরনই হল আমাদের সংস্কৃতি।
প্রত্যেক জনগোষ্ঠীরই নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। আবার এক অঞ্চলের সংস্কৃতি থেকে অন্য অঞ্চলের সংস্কৃতি ভিন্ন হয়ে থাকে। সংস্কৃতি আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে কানাডার বরফে ঢাকা অঞ্চলে অথবা বাংলাদেশের সমভূমিতে বা নদীর পাড়ে বসবাস করতে হয়। পাহাড়ের উপরে কিংবা মরুভূমি অঞ্চলে কীভাবে ফসল ফলাতে হয় সেটিও সংস্কৃতি বলে দেয়। আমাদের চিন্তাভাবনা, রীতিনীতি ও ধ্যানধারণাকে লালন করে সংস্কৃতি। দৈনন্দিন জীবনে কখন কাকে আমাদের কী বলতে হবে, অথবা কখন কী করা উচিত- এর সবকিছুই সংস্কৃতি আমাদের শেখায় একেবারে ছোটবেলা থেকে। সমাজে চলাফেরার জন্য এবং সবাই মিলে একসাথে বসবাসের জন্য সংস্কৃতি আমাদের শেখায় রীতিনীতি, নিয়মকানুন, আদবকায়দা। তাই সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করেই আমরা সমাজের অন্যদের সাথে মিলেমিশে বসবাস করতে পারি।
মানুষ ও তার সংস্কৃতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করে নৃবিজ্ঞান। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ও তাদের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির গঠন, উৎপত্তি, প্রবাহ, প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গবেষণা করে নৃবিজ্ঞান। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে তুলনামূলক আলোচনাও নৃবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু। 'নৃ' শব্দের অর্থ হলো মানুষ। আর তাই নৃবিজ্ঞানকে মানববিজ্ঞানও বলা হয়ে থাকে। নৃবিজ্ঞানের প্রধান চারটি শাখা রয়েছে। এখানে নৃবিজ্ঞানের শাখাগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলো।
১. সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান | বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতির বৈচিত্র্য নিয়ে অধ্যয়ন করে সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান। মানুষের প্রতিদিনের কাজকর্ম, চিন্তা-ভাবনা ও আচার-আচরণ হলো সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু। |
২. শারীরিক নৃবিজ্ঞান | বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের দৈহিক গঠন-বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করে শারীরিক নৃবিজ্ঞান। এজন্য প্রাচীন মানুষের ফসিল ও কঙ্কাল থেকে শুরু করে মানুষের বংশগতি, ডি.এন.এ., খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি, খুলির মাপ, আঙ্গুলের ছাপ ইত্যাদি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা করে শারীরিক নৃবিজ্ঞান। |
৩. ভাষার | ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের ভাষার উৎপত্তি, তুলনা, গড়ন ও কাঠামো ব্যাখ্যা করে ভাষার নৃবিজ্ঞান। ভাষা ব্যবহারের ধরন, বর্ণমালা, উচ্চারণের বৈচিত্র্য ইত্যাদি ভাষার নৃবিজ্ঞানের অধ্যয়নের বিষয়। |
৪. প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান | বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতির দৃশ্যমান উপাদানগুলোর অতীত ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে গবেষণা করে প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান। মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন নগরী থেকে শুরু করে অতীত ও বর্তমান মানুষের ব্যবহৃত দ্রব্যাদি বা নিদর্শন নিয়ে অধ্যয়ন করে প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান। |
| কাজ-১ ঃ নৃবিজ্ঞানের শাখা সমূহের তালিকা তৈরি কর। |
পৃথিবীর সকল মানুষেরই সংস্কৃতি আছে। সংস্কৃতি হলো মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নিয়ম-নীতি, আইন-কানুন, আদর্শ ও মূল্যবোধ, প্রথা ও রীতি, অভ্যাস ও আচরণ ইত্যাদির সমষ্টি। বেঁচে থাকার জন্য আমাদের কাজ করতে হয়, খাদ্য উৎপাদন করতে হয়। শুধু উৎপাদন করলেই হয় না, তাকে সমাজের আইনকানুনও মেনে চলতে হয়। সমাজের নানা প্রথা, বিশ্বাস আর ধর্মও মেনে চলে মানুষ। মানুষের সংস্কৃতি শেখা শুরু হয় পরিবার থেকে। যেমন জন্মের পর সংস্কৃতি শেখার প্রথম পাঠ হলো আমাদের মাতৃভাষা। এরপর ধারাবাহিকভাবে আমরা সংস্কৃতি শিখতে শুরু করি পরিবার ও সমাজের অন্যান্য মানুষের কাছ থেকে। মানুষের সমগ্র জীবনব্যবস্থাই তার সংস্কৃতি। নৃবিজ্ঞানীদের মতে অনেকগুলো উপাদান মিলে সংস্কৃতি গড়ে উঠে, যেমন:
○ জ্ঞান : সকল সংস্কৃতির মানুষই তাদের নিজস্ব জ্ঞানের উপর নির্ভর করে। টিকে থাকার জন্য খাদ্যের উৎস, আহরণের উপায় ও প্রস্তুত করার উপায় এসব বিষয়ে সকল সংস্কৃতির মানুষের নিজস্ব জ্ঞান আছে। জ্ঞান ব্যবহার করে মানুষ আবাসস্থল নির্মাণ করে কিংবা তার চারপাশের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে জীবন ধারণ করে।
○ বিশ্বাস: প্রত্যেক সংস্কৃতিতে মানুষের জন্ম, অস্তিত্ব, তার জগৎ ও মৃত্যুকে ঘিরে নানা রকম বিশ্বাস প্রচলিত আছে। এর সাথে যুক্ত হয় অন্যান্য ধারণা, যেমন: সৃষ্টিকর্তা, প্রাণীদের আত্মা, অতিপ্রাকৃত শক্তিসহ আরও অনেক কিছু। এ ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান আমাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
○ আদর্শ ও নৈতিকতা: প্রত্যেক মানুষেরই তার সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নৈতিকতার মান থাকে, যা তাকে ন্যায়-অন্যায়ের বোধ দেয়। এই আদর্শ ও নৈতিকতা মানুষের বিভিন্ন আচরণকে প্রভাবিত করে।
○ নিয়ম-নীতি ও আইন-কানুন: প্রত্যেক সংস্কৃতিই মানুষের সামাজিক জীবনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন-কানুন তৈরি করে এবং তা প্রয়োগ করে।
○ প্রথা ও রীতি: সকল সংস্কৃতিরই নিজস্ব প্রথা, মূল্যবোধ ও রীতি রয়েছে। নিজ নিজ প্রথা এবং রীতি অনুযায়ী একেক সংস্কৃতির মানুষ একেকভাবে জীবনযাপন করে।
○সামর্থ্য ও দক্ষতা: সামর্থ্য ও দক্ষতার ভিত্তিতে মানুষ অন্যান্য সকল প্রাণী থেকে আলাদা। যেমন, ভাষা ব্যবহারের সামর্থ্য মানুষের অনন্য গুণাবলির অন্যতম। আবার একটি সংস্কৃতিতে সবারই কিছু নির্দিষ্ট দক্ষতা আছে, যেমন: শিকার করার দক্ষতা, গাছ-গাছালি সংগ্রহ করার দক্ষতা, চাষাবাদ করার দক্ষতা অথবা বাসস্থান বানানোর দক্ষতা ইত্যাদি।
○ সমাজ ব্যবস্থা: মানুষ সামাজিক জীব। তাই সমাজবদ্ধ হয়ে আমরা বসবাস ও জীবনধারণ করি। বেঁচে থাকার জন্য মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ ও প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতি থেকেই মানুষ খাদ্যসামগ্রী আহরণ করে। প্রকৃতি থেকেই আসে তার গৃহ নির্মাণের সকল সামগ্রী। আবার জামাকাপড় তৈরির কাঁচামালও পাওয়া যায় প্রকৃতিতেই। সংস্কৃতি আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতি থেকে দরকারী কাঁচামাল ও অন্যান্য দ্রব্যাদি সংগ্রহ করতে হয়। যেমন ইনুইটরা বরফের ঘর তৈরি করতে শেখে। উদাহরণস্বরূপ আরও বলা যেতে পারে, প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত খাদ্যশস্য ও শাকসবজি রান্না করে আমাদের খাবারের উপযুক্ত করতে হয়। রান্না করার কৌশল আমরা সংস্কৃতি থেকে পাই। সেইসাথে খাদ্যশস্য ও শাকসবজি উৎপাদনের পদ্ধতিও শিখি সংস্কৃতি থেকে। সংস্কৃতির ভিন্নতার জন্যই একজন সাঁওতাল কিংবা মারমা নৃগোষ্ঠীর কৃষক ও বাঙালি কৃষকের চাষ করার পদ্ধতির মধ্যে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তাই প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করে সংস্কৃতি।
| কাজ-১ : পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সংস্কৃতি আমাদের কীভাবে সাহায্য করে? |
সংস্কৃতির কিছু কিছু উপাদান আমরা খালি চোখেই দেখতে পারি। আবার সংস্কৃতির অনেক উপাদানই আমরা দেখতে পাই না। যেমন, মানুষের তৈরি ঘরবাড়ি আমরা দেখতে পাই; কিন্তু ঘরবাড়ি তৈরির জ্ঞান ও কৌশল দেখা যায় না। এদিক থেকে বিবেচনা করে সংস্কৃতির উপাদানসমূহকে দুভাগে ভাগ করা যায়। যথা: (১) দৃশ্যমান উপাদানসমূহ এবং (২) অদৃশ্য উপাদানসমূহ। নিচের সারণিতে কিছু উদাহরণের মাধ্যমে সংস্কৃতির দু'ধরনের উপাদানকে ব্যাখ্যা করা হলো।
সংস্কৃতির দৃশ্যমান উপাদানসমূহ | সংস্কৃতির অদৃশ্য উপাদানসমূহ |
বিভিন্ন ধরনের ঘরবাড়ি যেমন, স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, গীর্জা, মন্দির, অফিস, আদালত ইত্যাদি। | আমাদের সামগ্রিক জ্ঞান-ই হলো আমাদের সংস্কৃতি যা দেখা যায় না। |
বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র যেমন, চেয়ার, টেবিল, আলমিরা, খাট ইত্যাদি। | মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু এগুলো আমাদের আচার-আচরণকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করে। |
বিভিন্ন ধরনের পোশাক যেমন, শার্ট, প্যান্ট, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, শাড়ি, জুতা ইত্যাদি। | ধর্মীয় বিশ্বাস ও নীতিবোধ। |
বিভিন্ন ধরনের যানবাহন যেমন, গাড়ি, বাস, ট্রাক, ট্রেন, প্লেন ইত্যাদি। | ভাষা, ধ্বনি ও ব্যাকরণ। |
বিভিন্ন ধরনের খাবার ও পানীয় যেমন, রুটি, শরবত কোকাকোলা, পেপসি, বিস্কিট, চকোলেট ইত্যাদি। | শিল্পকলা, সাহিত্য ও সঙ্গীতের মর্মার্থ। |
চাষাবাদের বিভিন্ন উপকরণ যেমন, সার, কীটনাশক, ট্রাক্টর, সেচযন্ত্র, লাঙ্গল, জোয়াল, মই ইত্যাদি। | চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধিবৃত্তি, মেধা ও প্রতিভা। |
বিভিন্ন ধরনের বইপত্র যেমন, স্কুলের পড়ার বই, গল্পের বই, কবিতার বই, পেপার, পত্রিকা ইত্যাদি। | আদর্শ ও মূল্যবোধ। |
একইভাবে সংস্কৃতির আরও অনেক দৃশ্যমান উপাদান রয়েছে। | জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখাও আমাদের সংস্কৃতির অদৃশ্য উপাদান। |
মানুষ তার নিজস্ব প্রয়োজনেই সংস্কৃতির দৃশ্যমান উপাদানগুলো সৃষ্টি করেছে। অনেক সময় শত শত বছর ধরেও এসব দৃশ্যমান ও বস্তুগত উপাদানগুলো টিকে থাকতে দেখা যায়। যেমন, আমরা জাদুঘরে গেলে এমন অনেক জিনিস দেখতে পাই, যেগুলো শত শত বছরের পুরনো। সেগুলো দেখে আমরা সে সময়ের মানুষ এবং তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারি।
সংস্কৃতির দৃশ্যমান উপাদানসমূহের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির অদৃশ্য উপাদানসমূহ, যেমন: মানুষের ধ্যান-ধারণা, মনোভাব, মুল্যবোধ ও মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। তাই সংস্কৃতি বলতে একদিকে যেমন বস্তুগত আবিষ্কারকে বোঝায়, তেমনি অন্যদিকে ঐ বস্তুগত আবিষ্কারের পিছনের ক্রিয়াশীল চিন্তা-ভাবনা, কৌশল বা জ্ঞানকেও বোঝায়। সংস্কৃতির এসব উপাদান কোনোভাবেই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

এবার একটি উদাহরণের মাধ্যমে সংস্কৃতির উপাদানসমূহের সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করি। আমরা সবাই নিশ্চয়ই সমুদ্রে ভেসে থাকা বিশাল বিশাল বরফখন্ডের কথা শুনেছি। এগুলোকে আইসবার্গ বা হিমরাশি বলে। পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি সমুদ্রে এসব হিমরাশি দেখা যায়। মজার বিষয় হল, হিমরাশিগুলোর শুধুমাত্র দশ ভাগের এক অংশ আমরা সমুদ্রের পানির উপরে দেখতে পাই।
বাকি নয় অংশই থাকে পানির নীচে। তাই পানির উপর থেকে দেখে কোনোভাবেই বোঝা যায় না যে, হিমরাশিগুলোর আকার কতো বড়, আর সমুদ্রের কতো গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের সংস্কৃতিকে সমুদ্রে ভাসমান এ হিমরাশির সাথে তুলনা করা যেতে পারে। হিমরাশির পানির উপরের দৃশ্যমান অংশের মতো আমাদের সংস্কৃতিরও অনেক উপাদান দৃশ্যমান রয়েছে। আবার হিমরাশির পানির নীচের অদৃশ্য অংশের মতো সংস্কৃতির অদৃশ্য উপাদানগুলো সব সময়ই আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, এই অদৃশ্য উপাদানগুলোই আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকে। তাই দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উপাদানসমূহ মিলিয়ে সমগ্র সংস্কৃতিকে আমরা একটা হিমরাশির সাথে তুলনা করতে পারি। পাশের চিত্রে সংস্কৃতির হিমরাশি এবং এর বিভিন্ন উপাদান দেখানো হলো।
| কাজ- ১ ঃ সংস্কৃতির অদৃশ্য উপাদানের ৫টি উদাহরণ দাও। |
প্রত্যেক সংস্কৃতিই অনন্য ও আলাদা। তথাপি বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে আমরা কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই। এই সকল বৈশিষ্ট্য জানার মাধ্যমেই কেবল আমরা সংস্কৃতি সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে পারি। এখানে সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো:
১. সংস্কৃতি শিখতে হয়: মানুষ সংস্কৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না। বরং সে জন্মের পর থেকে নিজের
সংস্কৃতি বিষয়ে ক্রমাগত শিক্ষালাভ করে। মায়ের হাত ধরেই একটি শিশু সংস্কৃতির প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে। এরপর তার আশপাশের সব কিছু থেকে তার নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে জানে। ধীরে ধীরে সেই শিশু কথা বলতে শেখে তার মাতৃভাষায়। শিশুটি তার নিজ পরিবারের সদস্যদের অনুসরণ ও অনুকরণ করার মাধ্যমেই তার পূর্বপুরুষের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হয়। ধারাবাহিকভাবে এই শিক্ষা গ্রহণ চলতে থাকে আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী, স্কুলকলেজ ও সমাজের অন্যদের কাছ থেকে।
২. সংস্কৃতি আমাদের সবার একই সংস্কৃতির সদস্যরা সবাই এর অংশীদার। সংস্কৃতি মানুষ একা অর্জন
করতে পারে না। একই সংস্কৃতির সদস্যদের মাঝে বিনিময় ও আদানপ্রদানের মধ্য দিয়ে সেই সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, অর্থবহ হয় ও পূর্ণতা পায়। যেমন, বাংলা ভাষার জ্ঞান বাঙালি সংস্কৃতির সবার মাঝেই ছড়ানো আছে। বিশেষক্ষেত্র ব্যতিত একজন ভিনদেশি মানুষ বাংলা কথা বুঝতে পারবে না এবং বাংলা লেখাও পড়তে পারবে না। আবার আমাদের দেশেই বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর আলাদা মাতৃভাষা আছে। এক নৃগোষ্ঠীর মানুষ অন্য নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা অনেক সময়ই বুঝতে বা বলতে পারে না। যেমন, একজন বাঙালি সাঁওতালী ভাষা বুঝতে বা বলতে পারে না।
৩. সংস্কৃতি প্রবাহিত হয়: সংস্কৃতির উপাদানগুলো প্রধানত ভাষা, আচরণ, বিশ্বাস, ধর্ম প্রভৃতি এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রবাহিত হয় আদান-প্রদানের মাধ্যমে। বাবা-মা তাদের সন্তানদের সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয় শেখায় এবং তারাও তাদের সন্তানদের শেখায়। আর এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংস্কৃতি সঞ্চারিত হয়।
৪. সংস্কৃতি অখন্ড যা বিচ্ছিন্ন করা যায় না: সংস্কৃতির উপাদানগুলো পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। যেমন,
সংস্কৃতির উপাদান সংগীত, শিল্পকলা, ভাষা, সাহিত্য, বিশ্বাস, রীতি-নীতি ইত্যাদির একটিকে অন্যগুলোর থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। একটি সংস্কৃতিকে অর্থবহ করতে এর প্রত্যেকটি উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেকোনো একটি উপাদানের পরিবর্তন অন্য উপাদানগুলোকেও প্রভাবিত করে। তাই প্রত্যেকটি উপাদান নিয়েই সামগ্রিকভাবে মানুষের সংস্কৃতি গড়ে উঠে।
৫. সময়ের সাথে সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়: পারস্পরিক আদান-প্রদান, নিত্য নতুন উদ্ভাবন কিংবা স্থানান্তরের
মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির ক্রমাগত পরিবর্তন হয়। যেমন, বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারের সাথে সাথে সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয়। টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ইত্যাদি আমাদের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এনেছে।
| কাজ- ১ ঃ সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ কর। |
সংস্কৃতি হল আমাদের প্রাণ ও আমাদের পরিচয়। প্রকৃতিতে যেমন আমরা সীমাহীন বৈচিত্র্য দেখতে পাই, তেমনি মানুষের সংস্কৃতিতেও আমরা দেখি অশেষ বৈচিত্র্য। সংস্কৃতির এই বৈচিত্র্য বৃহত্তর অর্থে আমাদের জীবন ও পৃথিবীকে বর্ণময় ও আনন্দময় করে তোলে।
আমাদের বোধ, বুদ্ধি, বিবেক, বিবেচনা, চেতনা ইত্যাদি সবই সংস্কৃতির মাধ্যমে গড়ে ওঠে। তাই আমাদের নিজেকে জানতে সংস্কৃতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। নিজের সংস্কৃতিকে বোঝার পাশাপাশি অন্যদের সংস্কৃতি সম্পর্কেও আমাদের জানতে হবে। কেননা, এতে নিজেকে যেমন আরও ভালভাবে জানা যায়, তেমনি অন্যদের সাথে দূরত্ব কমিয়ে নতুন নতুন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের পারস্পরিক ভুল ধারণা, সন্দেহ, বিরোধ, নিছক ভয় ও অজ্ঞতা দূর করে মানবকল্যাণে ও উন্নয়নে সবাই মিলে একসাথে কাজ করা যায়। মানুষে মানুষে বিভেদ কমিয়ে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়।
সংস্কৃতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে উল্লেখ করা হলো-
আয়নায় যেমন নিজের চেহারার প্রতিফলন দেখা যায়, তেমনি অন্য সংস্কৃতির দৃষ্টিতে ও তুলনায় নিজের সংস্কৃতিকে আরও ভালোভাবে দেখা, চেনা ও জানা যায়। এভাবে নিজ সংস্কৃতির অতীত ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করে নিজেদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা যায়।- বিভিন্ন সংস্কৃতি থেকে শিক্ষালাভ করে নিজেদের সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করা যায়। মানুষের আচরণের সৃজনশীলতা, বৈচিত্র্য প্রভৃতি অনুধাবনের জন্য সংস্কৃতি পাঠ প্রয়োজন। এক সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও আবিষ্কার অন্য সংস্কৃতির মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নে ব্যবহার করা যায়।
- বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি অধ্যয়ন করে সেই নৃগোষ্ঠীকে বিশ্বের অগণিত মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলা সম্ভব। তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সকলকে অবগত করা যায়।
- বিভিন্ন দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশে সফলভাবে উন্নয়ন করতে হলে ঐ দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে। কোনো সমাজ বা গোষ্ঠীর সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা থাকলে তাদের উন্নয়নের প্রয়োজনীয় দিক ও কৌশলসমূহ যথাযথভাবে নির্ধারণ ও প্রয়োগ করা যায়।
- বর্তমান পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষ পরস্পরের কাছাকাছি আসছে। তারা যেন পরস্পর খাপ খাইয়ে ও মিলেমিশে থাকতে পারে তার জন্য সংস্কৃতি অধ্যয়ন গুরুত্বপূর্ণ।
- একইভাবে পৃথিবীতে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সংস্কৃতির উপাদানগুলো দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে আদানপ্রদানের ফলে অনেক ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো বোঝার জন্য সংস্কৃতি অধ্যয়ন গুরুত্বপূর্ণ।
| কাজ-১ ঃ নিজের সংস্কৃতিকে বোঝার পাশাপাশি অন্যদের সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের কেন জানতে হবে? |
সংস্কৃতির বৈচিত্র্য মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সম্পদ। বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলন এবং পারস্পরিক শিক্ষাগ্রহণ ও আদানপ্রদানের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের সভ্যতা। এক সংস্কৃতির আবিষ্কৃত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর বুকে। যেমন, লোহার ব্যবহার সর্বপ্রথম শুরু হয় ।
তুরস্কে এবং তারপর তা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে বলে মনে করা হয়। এভাবে আদান-প্রদানের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়েছে সংস্কৃতি আর উপকৃত হয়েছে মানুষ। পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া কোনো মানুষ যেমন একা টিকতে পারে না, তেমনি একটি সংস্কৃতিও একক প্রচেষ্টায় উন্নতি লাভ করতে পারে না। তাই একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সকল সংস্কৃতির মানুষের মিলিত প্রচেষ্টা। শুধুমাত্র সকল সংস্কৃতির মানুষের মাঝে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক ও সম্প্রীতির ভিত্তিতেই গড়ে উঠে একটি সুন্দর সামাজিক পরিবেশ।
সকল সংস্কৃতিই জ্ঞান আহরণের এক একটি অনন্য উৎস। আর তাই জ্ঞানের আধার হিসাবে যেকোনো সংস্কৃতির মর্যাদাই সমান। ছোট সংস্কৃতি আর বড় সংস্কৃতি বলে কিছু নেই। যেমন, আমাদের দেশে প্রায় দু' হাজার খুমি আর ১৪ কোটিরও বেশি বাঙালি বসবাস করে। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যার বিবেচনায় বাঙালিদের তুলনায় খুমিদের অবস্থান অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও সাংস্কৃতিক মর্যাদায় খুমি ও বাঙালিরা সমান। কেননা দুইটি সংস্কৃতিরই আলাদা কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র ভাষা, সংগীত, শিল্পকলা, বিশ্বাস, রীতি-নীতি ইত্যাদি উপাদান রয়েছে। তাই আমাদের সবারই পরস্পরের প্রতি এবং অন্যান্য সংস্কৃতির প্রতি আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন।
প্রায়শঃ আমরা নিজের সংস্কৃতির তুলনায় অন্য সংস্কৃতিকে বিচার করার চেষ্টা করি। কিংবা হয়ত নিজস্ব মূল্যবোধের আলোকে ভিন্ন সংস্কৃতির কর্মকান্ড পরিমাপ করি। কেননা শৈশব থেকেই আমাদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি লালনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমাদের এটা বুঝতে হবে যে, আমাদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সংস্কৃতির অন্যান্য উপাদানের সাথে মিলে গঠিত হয়। সুতরাং আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে অন্য সংস্কৃতিকে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। কারণ, প্রত্যেক সংস্কৃতিই তার নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে অনন্য ও স্বতন্ত্র। তাই যেকোনো সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সঠিকভাবে বোঝার জন্য আমাদের সে সংস্কৃতির নিজস্ব মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকতে হবে। নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রত্যেক সংস্কৃতিকে আলাদাভাবে এবং সে সংস্কৃতির সমস্ত দিক বিবেচনা করে বুঝতে হয়। একটি সংস্কৃতির মূল্যবোধ দিয়ে অন্য সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করা যায় না।
কাউকে দাঁতে কালো রং করতে শুনেছ কখনও? তুমি যদি ম্রো নৃগোষ্ঠীর সদস্য হও, শুধু তাহলেই বুঝবে কালো দাঁত কতোটা সুন্দর। অর্থাৎ আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রো সংস্কৃতিতে সুন্দর দাঁত বলতে বুঝায় কালো রঙের দাঁত। কাঁচা বাঁশের রস দিয়ে ম্রো ছেলেমেয়েরা দাঁতের রং কালো করে। যার দাঁত যত কালো সে তত সুন্দর একজন ম্রো মানুষের দৃষ্টিতে। শুধু তাই নয়, অবিবাহিত ম্রো ছেলেরা বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহার করে। ছেলেরা ঠোঁটে রং দেয়া থেকে শুরু করে চুল বেঁধে, খোঁপা করে সাজগোজ করে। ম্রো সংস্কৃতিতে এটাই ছেলেদের সৌন্দর্য বলে বিবেচিত। সুতরাং, ম্রো নৃগোষ্ঠীর সদস্য ছাড়া অন্য সংস্কৃতির কারও পক্ষে ম্রো ছেলেদের সৌন্দর্য মূল্যায়ন করা খুবই কঠিন। এই সৌন্দর্য বোঝার জন্য প্রথমে ম্রো সংস্কৃতিতে সুন্দর বলতে কী বোঝায়, সেটা আগে বুঝে নিতে হবে।
আবার দেখা যায়, সাঁওতাল সংস্কৃতিতে শুধু পুরুষরা এবং মান্দি বা গারোদের মাঝে শুধু নারীরাই সম্পত্তির মালিক হয়। মান্দি বা গারোদের নিয়ম অনুযায়ী, ছেলেরা বিয়ের পর তাদের নিজেদের বাড়ি ছেড়ে কনের বাড়িতে বসবাস শুরু করে। তাই মান্দি বা গারো সংস্কৃতিতে শুধু মেয়েরাই তাদের মা'র সম্পত্তির মালিক হয়। শুধু তাই নয়, বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতা তাদের সবচেয়ে ছোট মেয়ের সাথে বসবাস করে বলে ছোট মেয়েরা তার মায়ের বসতবাড়ির ও জমির মালিক হয়। অন্যদিকে, সাঁওতাল সংস্কৃতিতে মেয়েদের সম্পত্তিতে কোনো মালিকানা থাকে না। সুতরাং, সাঁওতাল ও মান্দি (গারো) সংস্কৃতি দুটি ভিন্ন পদ্ধতিতে সম্পত্তির মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের নিজ নিজ সংস্কৃতির সাথে যদি এ দুটি পদ্ধতির ভিন্নতাও থাকে তারপরও গুরুত্ব ও মর্যাদার বিবেচনায় সব কয়টিই সমান মর্যাদার এবং গুরুত্বপূর্ণ। এখানে, কেউ কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, যেকোনো সাংস্কৃতিক নিয়মনীতিই সেই সংস্কৃতির জন্য উপযোগী, কার্যকর এবং ভালো।

| কাজ- ১ ঃ অন্যের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে কেন? |
Read more