পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা- খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর জন্য বৈসাবি একটি সর্বজনীন ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব। চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং নববর্ষের প্রথম দিনকে ঘিরে বৈসাবি উৎসব পালিত হয়। বৈসাবি আসলে ত্রিপুরাদের 'বৈসু', মারমা ও রাখাইনদের 'সাংগ্রাই', চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের 'বিঝু', অহমিয়াদের 'বিহু' প্রভৃতি উৎসবের সমষ্টি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মূল উৎসবের নামের প্রথম অক্ষরটি নিয়ে 'বৈসাবি' শব্দটি সৃষ্টি করা হয়েছে। এর পেছনে একটি মহৎ উদ্দেশ্য আছে। সেটি হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা। বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে পাহাড়ি ছাত্র ও যুব সমাজের কিছু অগ্রণী সদস্যের উদ্যোগে এই সমন্বিত উৎসবটি চালু হয়। এর পেছনে যে সামাজিক বাস্তবতা বা প্রেক্ষাপট পাহাড়ি তরুণ-তরুণীদের এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল তা জানা থাকা প্রয়োজন ।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পাহাড়ের পরিস্থিতি ছিল খুব অশান্ত ও সংঘাতপূর্ণ। এ সময় শিক্ষার্থী এবং যুব সমাজের সচেতন ও অগ্রসর অংশটি এগিয়ে আসে। তারা স্কুল-কলেজের ছাত্র- যুবাদের সাথে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেয় যে, এরপর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের প্রধান উৎসবটি সবাই মিলে একসাথে উদ্যাপন করা হবে। তারা বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকে এমন একটি নামও এই উৎসবের জন্য ঠিক করে যা 'বৈসাবি' নামে পরিচিত হয়। পার্বত্য তিন জেলার মধ্যে রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগেই সর্বপ্রথম বৈসাবি উৎসবটি পালিত হয়। এর পরবর্তী সময় থেকে চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবটি পার্বত্য চট্টগ্রামে 'বৈসাবি' নামে সম্মিলিতভাবে পালিত হয়ে আসছে। অবশ্য একইসাথে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নামেও সেটি পালন করা হয়। সবার কাছে 'বৈসাবি' এখন বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শান্তি ও ঐক্যের প্রতীক। খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ফুল সংগ্রহ করে নদী ও মন্দিরে গিয়ে পূজা অর্চনা, ঘরদোর সাজানো, ছোট বড় সবার অংশগ্রহণে প্রভাতফেরী, দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবার সাথে কুশল বিনিময়, পানাহার, শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নেওয়া, সন্ধ্যায় মন্দিরে গিয়ে মোম ও আগরবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা এবং জগতের সকল মানুষ ও প্রাণীর জন্য মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে বৈসাবি উৎসবটি উদযাপিত হয়। এ উপলক্ষে সাধারণতঃ গ্রামাঞ্চলে নানা ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা এবং শহরাঞ্চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এমনকি কিছু সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার উদ্যোগে সপ্তাহ বা মাসব্যাপী বৈসাবি মেলাও চলে। সবাই মিলে এই উৎসব উদযাপনের পাশাপাশি উৎসবটি উপলক্ষে পাহাড়িদের বিভিন্ন সংগঠন এবং ছাত্র-ছাত্রী, তরুণ-তরুণীদের উদ্যোগে সমাজ সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে সংকলন, প্রকাশনা, গানের সিডি, দেয়াল পত্রিকা প্রভৃতি প্রকাশিত হয়। এছাড়া ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবন ও সংস্কৃতি নিয়ে নাটক, ঐতিহ্যবাহী পালাগানের আসর, আলোচনা সভা, সেমিনার প্রভৃতি এখন এই উৎসবের বাড়তি আকর্ষণ।
কাজ- ১ : বৈসাবি উৎসবটি কারা চালু করে এবং কেন? কাজ- ২ : বৈসাবি উৎসবের কিছু কার্যক্রমের নাম লিখ। |
Read more