রংপুর বিভাগের মোট ৮টি জেলার প্রত্যেকটিতেই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ বাস করে। এসব জেলায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো হলো-সাঁওতাল, ওরাঁও, মালো, তুরি, কোচ, কোলহে, পাহাড়িয়া, মাহাতো, মুষহর, মাহলে, রাজবংশী প্রভৃতি। রংপুর বিভাগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যা আনুমানিক দুই লক্ষ। এদের মধ্যে নিচে সাঁওতাল জাতিসত্তার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।
সাঁওতাল জাতিসত্তা: বাংলাদেশে সাঁওতালরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিসত্তা। উত্তরবঙ্গের
রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, নবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী প্রভৃতি জেলায় তারা বাস করে। উত্তরবঙ্গে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে তাদের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সাঁওতালরা নিজেদের হড় বলে। ব্রিটিশ সরকার ১৮৩৬ সালে ভারতবর্ষের বিহার রাজ্যে সাঁওতালদের নিরাপদ বসবাসের জন্য একটি এলাকা নির্দিষ্ট করে দেয়, যা সাঁওতাল পরগণা নামে পরিচিত। পরে সেখানে বহিরাগত মহাজন ও ব্যবসায়ীরা তাদের উপর নিপীড়ন শুরু করে। তারা সহজ সরল সাঁওতালদেরকে বিভিন্ন কৌশলে ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলে। এই শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাঁওতালরা অবশেষে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৮৫৫ সালের সেই বিদ্রোহ ইতিহাসে 'সাঁওতাল বিদ্রোহ' নামে পরিচিত হয়। সাঁওতাল ভাষায় বিদ্রোহকে বলা হয় 'হুল'। এই বিদ্রোহের নায়ক দুই ভাই সিধু ও কানহুকে তারা তাদের জাতীয় বীর হিসেবে ভক্তি করে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার মহাজনদের পক্ষ নিয়ে কঠোর হস্তে সেই বিদ্রোহ দমন করে। এতে প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল বিদ্রোহী নিহত হন। ঐ সময় সাঁওতালরা দলে দলে বর্তমান বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে ও আসামে পাড়ি জমান বলে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন। আবার স্থানীয় জমিদাররা ব্যাপক পতিত জমি চাষাবাদের জন্য এই অঞ্চলে তাদেরকে নিয়ে আসেন বলেও অনেকের ধারণা। আদমশুমারি রিপোর্ট ২০১১ অনুসারে ১,৪৭,১১২ (এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার একশত বার) জন সাঁওতাল বাংলাদেশে বসবাস করে।
সাঁওতালী ভাষায় দেবতাকে বলা হয় 'বোঙ্গা'। তাদের আদি দেবতা হল সূর্য। অন্যান্য যেসব দেবতাকে সাঁওতালরা পূজা করে তাদের মধ্যে 'মারাং বুরু', 'অড়াংক্ বোঙ্গা', 'আবগে বোঙ্গা', 'জাহের এরা', 'গোঁসাই এরা' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সাঁওতালদের বিশ্বাস- সৃষ্টিকর্তা এবং আত্মা অমর ও অবিনশ্বর।
তারা সর্বত্র বিরাজমান এবং তাদেরকে তুষ্ট করার উপরই মানব জাতির ভাল-মন্দ নির্ভর করে। সাঁওতাল সমাজে হিন্দু দেব-দেবীর প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। সাঁওতালদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পুরুষরা বাম হাতে কজির উপরে বেজোড় সংখ্যক উল্কি চিহ্ন আঁকে। মেয়েরাও নিজেদের হাতে ও বুকে উল্কি চিহ্ন আঁকে। উল্কিবিহীন অবস্থায় কেউ মারা গেলে পরকালে যমরাজ তাকে কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকেন বলে তাদের বিশ্বাস। অনেকে এখন খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিতও হচ্ছে। ফলে ক্রমশ বদলে যাচ্ছে তাদের সংস্কৃতি ও জীবনধারা।
সাঁওতাল সমাজের মূল ভিত্তি হচ্ছে গ্রাম-পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েত পরিচালনার জন্য সাতজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি থাকেন। তারা হলেন মান্যহি, জগমান্যহি, গডেৎ, পারাণিক, জগ পারাণিক, নায়কে ও কুডাম নায়কে প্রভৃতি। জানগুরু পঞ্চায়েত সদস্য নয়, তাঁকে তান্ত্রিক ও ধর্মগুরু হিসেবে গণ্য করা হয়। 'মান্যহি' হলেন গ্রামপ্রধান। তার নেতৃত্বে গ্রামের সবকিছু পরিচালিত হয়।

সাঁওতালদের ভাষা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাপরিবারের অন্তর্গত। সাঁওতাল সমাজ বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত। সাঁওতালী ভাষায় এসব গোত্রকে 'পারিস' বলা হয়। সাঁওতাল সমাজ পিতৃপ্রধান। পিতার সূত্রে সন্তানের গোত্র পরিচয় নির্ধারিত হয়। পিতার সম্পত্তিতে পুত্রদের সমান অধিকার থাকলেও কন্যাসন্তান কোনো সম্পত্তি দাবি করতে পারে না। তাদের অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী। তবে সাঁওতাল সমাজে নারীকে উর্বরা শক্তির প্রতীক বলে গণ্য করা হয়। তাদের বিশ্বাস নারীরাই সর্বপ্রথম কৃষিকাজ আবিষ্কার করেছিল। নারী ও পুরুষ উভয়েই ক্ষেতে কাজ করে। ধান, সরিষা, তামাক, মরিচ, ভুট্টা, তিল, ইক্ষু প্রভৃতি ফসল তারা উৎপাদন করে। তাছাড়া খেজুর পাতা ও ছন দিয়ে তৈরি নানা প্রকার মাদুর, ঝাড়ু নিজেদের ব্যবহারের পাশাপাশি তারা সেসব জিনিস হাটেও বিক্রি করে।
সাধারণত সাঁওতালরা মাটির দেয়ালের উপর শন বা খড়ের ছাউনি দিয়ে তৈরি চারচালা ঘরে বসবাস করে। অতিথি আপ্যায়নসহ বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে 'হাঁড়িয়া' (নিজেদের তৈরি পানীয়) পরিবেশন তাদের সংস্কৃতির অংশ। সাঁওতালদের নিজস্ব উৎসবাদির মধ্যে বাহা, সোহ্রাই এবং এরোক উৎসব উল্লেখযোগ্য। তাদের সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো লাগ'ড়ে নাচ। সাঁওতালদের বিয়ের অনুষ্ঠানে আয়োজিত হয় 'দং' নাচ।
কাজ- ১ : রংপুর বিভাগে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নামের একটি তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ- ২ : সাঁওতাল জাতিসত্তার বসবাসের অঞ্চল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনধারার কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর। |
Read more