রাতুলের স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলো ডিসেম্বরে। ছুটিতে সে তার মামার সাথে কানাডা বেড়াতে যায়। টরোন্টো শহরে তার মামার বাসা। তারা সবাই মিলে কানাডার অনেক জায়গায় বেড়াতে গেল। তখন শীতকাল। কানাডার শহর-গ্রামগুলো সবই সাদা বরফে ঢাকা। যতই দেখে ততই অবাক হতে থাকে রাতুল। কী অদ্ভুত সাদা বরফে ঢাকা এই দেশ কানাডা!
কানাডার মানুষগুলোও একেবারে অন্যরকম। টরোন্টো শহরে বিভিন্ন দেশের লোকজন বসবাস করে। তারা দেখতে যেমন আমাদের থেকে আলাদা, তেমনি তাদের কথাও কিছু বুঝতে পারে না রাতুল। এদের কেউ আফ্রিকান, কেউবা চীনদেশের, আবার অনেকে হয়ত ইউরোপীয় বা আমেরিকান। রাতুলের ভেবে খুব অবাক লাগে যে, একই দেশে কত জাতির মানুষ বসবাস করছে! যদি একটু আলাপ করা যেত ওদের সাথে, ভাবে রাতুল। এত শীতের মাঝে এরা কীভাবে থাকে, বরফের মাঝে কীভাবে চলাচল করে, এদের প্রিয় খাবার কী, অথবা কী ধরনের খেলাধুলা এদের পছন্দ ইত্যাদি নানা প্রশ্ন এসে উঁকি দেয় রাতুলের মনে। এদের ভাষা শিখতে পারলে কী মজাই না হতো, জানা যেত সবকিছু!
রাতুলের মামা সবাইকে নিয়ে বেড়াতে গেলেন বাফীন দ্বীপে। এটি একেবারে উত্তর মেরুর কাছাকাছি অবস্থিত কানাডার সবচেয়ে বড় দ্বীপ। বছরের বেশিরভাগ সময় এখানে বরফে ঢাকা থাকে। আরও অবাক করা বিষয় হলো, শীতকালে এখানে সূর্য উঠে না। সে সময় দিনের পর দিন আর মাসের পর মাস, অন্ধকারে ঢাকা থাকে এ অঞ্চল। এ সময় আকাশে লাল, নীলসহ বিভিন্ন রঙের আলোর খেলা দেখা যায়। আবার একই জায়গায় গরমকালে সূর্য ডুবেই না। এমনকি, রাতদুপুরেও সূর্য দেখা যায়। কী অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য ।

উত্তর মেরুর কাছাকাছি আর অন্ধকারে ডুবে থাকা এমন একটি ভুতুড়ে জায়গায় যে মানুষ বসবাস করতে পারে, আগে রাতুল তা কল্পনাও করেনি। বাফিন দ্বীপে ইনুইট নৃগোষ্ঠীর লোকেরা বসবাস করে। এরা এস্কিমো নামেও পরিচিত। ঐ অঞ্চলটি সারা বছর তুষারাবৃত থাকে বলে গাছপালা প্রায় নেই বলা যায়। এমনকি চাষাবাদও করা যায় না। ইনুইটরা তাই মূলত নানারকম মাছ এবং পশু শিকার করে বেঁচে থাকে। এই প্রচন্ড ঠান্ডায় বেঁচে থাকার জন্য কেরিবু নামে একটি প্রাণীর চামড়া দিয়ে তারা পোশাক তৈরি করে। ইনুইটদের চেহারা, ঘরবাড়ি, জামাকাপড়, চলাফেরা, ভাষা ইত্যাদি সবকিছুই একেবারে অন্যরকম। রাতুল আরও আশ্চর্য হয় ইনুইটদের বরফের তৈরি ঘর 'ইগলু' দেখে। মানুষ কীভাবে বরফের তৈরি ঘরে থাকতে পারে! রাতুল মনে মনে ভাবতে থাকে যে, তার বাংলাদেশের বন্ধুরা নিশ্চয়ই তার কথা। বিশ্বাসই করতে চাইবে না!
কানাডা যাত্রার পর থেকে আবার দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত রাতুল ছিল অচেনা আর অপরিচিত এক জগতে। সেখানে সে ছিল অনেকের মাঝে আলাদা। সেখানকার মানুষদের চিন্তাভাবনা, কাজকর্ম আর তাদের আচার-ব্যবহারের সাথে রাতুলের আগে পরিচয় ছিল না। তার চিরচেনা বাংলাদেশ থেকে এই নতুন জগত অনেক আলাদা। সেখানকার মানুষের চেহারা, ভূ-প্রকৃতি কিংবা আবহাওয়ার সাথে বাংলাদেশের রয়েছে অনেক পার্থক্য। দুই দেশের মানুষের আচার-আচরণ, আদব-কায়দা, চলাফেরা এবং কাজকর্মেও ব্যবধান অনেক। এই পার্থক্য আর বৈচিত্র্যের বিস্ময় রাতুলকে ভাবিয়ে তুলল। আমরা সবাই মানুষ, তারপরও কেন কানাডা ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এত পার্থক্য? বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী ও দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় কিংবা ভাষায় এত তফাৎ কেন হয়? পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ও অঞ্চলের মানুষদের সাথেও কি আমাদের এত পার্থক্য?
রাতুলের কানাডা ভ্রমণে যে জিনিসটি তাকে অবাক করেছে তা হল সংস্কৃতির ভিন্নতা। কিন্তু যে বিষয়টি তাকে কৌতূহলী করেছে তা হলো হরেক রকম মানুষের নানা রকম বিশ্বাস, রীতি-নীতি, আচার-আচরণ দেখার অভিজ্ঞতা। রাতুল তার অতি পরিচিত নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে কানাডার সংস্কৃতির পার্থক্যের বিভিন্ন দিক আবিষ্কার করেছে। সংস্কৃতির এ পার্থক্যগুলোই তাকে বিস্মিত করেছে। দেশবিদেশে ভ্রমণে গেলে সেখানকার অনেক কিছুই আমাদের কাছে একেবারে অজানা অচেনা মনে হয়, অবাক লাগে। সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণেই এমনটি হয়। যেমন করে চারপাশের বায়ু আমাদের ঘিরে রাখে প্রতি মুহূর্ত আর বায়ুর অক্সিজেন আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, ঠিক সংস্কৃতিও তেমনি করে আমাদের ঘিরে রাখে সব সময়। আমাদের জীবনযাত্রার ধরনই হল আমাদের সংস্কৃতি।
প্রত্যেক জনগোষ্ঠীরই নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। আবার এক অঞ্চলের সংস্কৃতি থেকে অন্য অঞ্চলের সংস্কৃতি ভিন্ন হয়ে থাকে। সংস্কৃতি আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে কানাডার বরফে ঢাকা অঞ্চলে অথবা বাংলাদেশের সমভূমিতে বা নদীর পাড়ে বসবাস করতে হয়। পাহাড়ের উপরে কিংবা মরুভূমি অঞ্চলে কীভাবে ফসল ফলাতে হয় সেটিও সংস্কৃতি বলে দেয়। আমাদের চিন্তাভাবনা, রীতিনীতি ও ধ্যানধারণাকে লালন করে সংস্কৃতি। দৈনন্দিন জীবনে কখন কাকে আমাদের কী বলতে হবে, অথবা কখন কী করা উচিত- এর সবকিছুই সংস্কৃতি আমাদের শেখায় একেবারে ছোটবেলা থেকে। সমাজে চলাফেরার জন্য এবং সবাই মিলে একসাথে বসবাসের জন্য সংস্কৃতি আমাদের শেখায় রীতিনীতি, নিয়মকানুন, আদবকায়দা। তাই সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করেই আমরা সমাজের অন্যদের সাথে মিলেমিশে বসবাস করতে পারি।
মানুষ ও তার সংস্কৃতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করে নৃবিজ্ঞান। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ও তাদের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির গঠন, উৎপত্তি, প্রবাহ, প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গবেষণা করে নৃবিজ্ঞান। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে তুলনামূলক আলোচনাও নৃবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু। 'নৃ' শব্দের অর্থ হলো মানুষ। আর তাই নৃবিজ্ঞানকে মানববিজ্ঞানও বলা হয়ে থাকে। নৃবিজ্ঞানের প্রধান চারটি শাখা রয়েছে। এখানে নৃবিজ্ঞানের শাখাগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলো।
১. সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান | বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতির বৈচিত্র্য নিয়ে অধ্যয়ন করে সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান। মানুষের প্রতিদিনের কাজকর্ম, চিন্তা-ভাবনা ও আচার-আচরণ হলো সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু। |
২. শারীরিক নৃবিজ্ঞান | বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের দৈহিক গঠন-বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করে শারীরিক নৃবিজ্ঞান। এজন্য প্রাচীন মানুষের ফসিল ও কঙ্কাল থেকে শুরু করে মানুষের বংশগতি, ডি.এন.এ., খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি, খুলির মাপ, আঙ্গুলের ছাপ ইত্যাদি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা করে শারীরিক নৃবিজ্ঞান। |
৩. ভাষার | ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের ভাষার উৎপত্তি, তুলনা, গড়ন ও কাঠামো ব্যাখ্যা করে ভাষার নৃবিজ্ঞান। ভাষা ব্যবহারের ধরন, বর্ণমালা, উচ্চারণের বৈচিত্র্য ইত্যাদি ভাষার নৃবিজ্ঞানের অধ্যয়নের বিষয়। |
৪. প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান | বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতির দৃশ্যমান উপাদানগুলোর অতীত ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে গবেষণা করে প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান। মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন নগরী থেকে শুরু করে অতীত ও বর্তমান মানুষের ব্যবহৃত দ্রব্যাদি বা নিদর্শন নিয়ে অধ্যয়ন করে প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান। |
| কাজ-১ ঃ নৃবিজ্ঞানের শাখা সমূহের তালিকা তৈরি কর। |
Read more