সমাজ কীভাবে সংগঠিত হয়? (পাঠ-০২)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজ জীবন - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

1.2k

ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সক্রিয় সম্পর্কের ভিত্তিতে সমাজ সংগঠিত হয়। আর এই সক্রিয় বা ক্রিয়াশীল সম্পর্কের ধরনকে বলে সামাজিক সংগঠন। এর ক্ষুদ্রতম একক হলো সমাজের যেকোনো দুজন ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ক। যেমন, পিতা ও পুত্রের সম্পর্ক। এই পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ধরন আবার সংস্কৃতিভেদে বিভিন্ন রকম হয়। সাঁওতালদের সংস্কৃতিতে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় পুত্র। একই- ভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী চাকমা রাজার ছেলে হবে পরবর্তী রাজা। সিলেটের খাসি কিংবা ময়মনসিংহের মান্দিদের মাঝে পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ধরন কিন্তু সম্পূর্ণই আলাদা। সেখানে মেয়ে সন্তানরা মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় কিন্তু ছেলে সন্তানরা কোনো সম্পত্তির মালিক হয় না।

একটি ক্ষুদ্র সামাজিক দল হলো সমাজ সংগঠনের দ্বিতীয় স্তর। তিনজন বা এর অধিক ব্যক্তির সম্পর্কের সমন্বয়ে গড়ে উঠে একটি ছোট সামাজিক দল। এ দলের সদস্যরা মিলিত বা যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করে। তাদের মধ্যে সম্পর্কের ধরন ও বন্ধনের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন রকমের সামাজিক দল দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ পরিবার একটি ছোট সামাজিক দল। নারী-পুরুষের বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে উঠে এ পরিবার। পরিবারে সন্তানরা বেড়ে উঠে এবং তার পুরুষ সদস্যরা এক ধরনের দায়িত্ব পালন করে আর মেয়েরা আরেক ধরনের। আবার এ পরিবারে বয়স্ক ও ছোটদের দায়িত্বও আলাদা। তাই বয়স ও নারী- পুরুষ ভেদে পরিবারের সদস্যদের কাজকর্মের মধ্যে এক ধরনের বিভাজন তৈরি হয়। সকল সদস্যের সুষ্ঠু দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে একটি পরিবার সক্রিয় হয়। তবে এ ক্ষেত্রেও সদস্যদের দায়িত্ব ও কাজকর্মের বিভাজনও সংস্কৃতিনির্ভর।
আত্মীয়তার ভিত্তিতে কয়েকটি পরিবার সম্পর্কযুক্ত হয়ে উঠে। কোনো পরিবারের বিপদে-আপদে বা প্রয়োজনে তার অন্য আত্মীয়-স্বজনরা এগিয়ে আসে। এভাবে দেখা যায়, এক পরিবার অন্য পরিবারকে আত্মীয়তার কারণে সাহায্য ও সহযোগিতা করে। আত্মীয়তার সম্পর্ক সে কারণেই আমাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক হচ্ছে সামাজিক বন্ধনের মূল। আবার আত্মীয়রা সকলে মিলে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামাজিক দল, তথা পরিবারগুলো পারস্পরিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে বৃহত্তর সামাজিক দল গড়ে তোলে। আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে কয়েকটি পরিবার মিলে গঠিত হয় একটি গোষ্ঠী। আর কয়েকটি গোষ্ঠীর সক্রিয়ভাবে একত্রে বসবাসের মধ্য দিয়েই সমাজ সংগঠিত হয়।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজব্যবস্থা মূলত আত্মীয়তার সম্পর্কনির্ভর। অর্থাৎ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে সামাজিক কার্যকলাপ পরিচালিত হয়ে থাকে। সমাজে কোন ব্যক্তির অবস্থান কী, কোথায় সে বসবাস করবে, কারা তার বন্ধু-বান্ধব, কাদের সাথে কোন ধরনের সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে, তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কেমন হবে, পরিবার বা সমাজে তার ভূমিকা কী হবে এসব কিছুই আত্মীয়তার সম্পর্কের দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ সমাজের সকল সম্পর্কই আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে উঠে।
সমাজ সংগঠনের ভিত্তি হিসেবে আত্মীয়তার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার এবং সামাজিক দলসমূহের মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র সৃষ্টি হয়। আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমেই উত্তরাধিকারের নিয়ম, বংশধারা গঠন, বিবাহ ব্যবস্থা, পরিবার প্রভৃতি পরিচালিত হয়। আগেই আমরা জেনেছি যে, অনেক সংস্কৃতিতে একজন ছেলে তার পিতার সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকে। আবার মান্দি সংস্কৃতিতে একজন মেয়ে সন্তান তার মাতার সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। তাই মান্দি সমাজে মেয়ে সন্তানরা বিয়ের পর একই গ্রাম বা এলাকায় পাশাপাশি বসবাস করে। তাদের ভাইরা অর্থাৎ পরিবারের ছেলে সন্তানরা বিয়ের পর তার শ্বশুরবাড়ি চলে যায়। অতএব আত্মীয়তার সম্পর্ক ব্যবস্থা বলতে আমরা বুঝি উত্তরাধিকার, বংশধারা, বিবাহ, পরিবার গঠন ও পরিচালনার নিয়মনীতি। তাই বলা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমেই মানুষ তাদের নিজ নিজ জীবন পরিচালনা করে থাকে।

কাজ- ১ : সমাজ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরগুলোর নাম লিখ।

কাজ- ২ : সামাজিক দল কাকে বলে? সামাজিক দল গঠনের উদ্দেশ্য চিহ্নিত কর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...