ঈশ্বরের সব কাজই মহান, সবই সুন্দর ও ভালো। তবে সব সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো মানুষ। মানুষ কেন শ্রেষ্ঠ? এর প্রধান কারণ হলো: ঈশ্বর মানুষকে নিজের প্রতিমূর্তিতে অর্থাৎ নিজের মতো করে সৃষ্টি করেছেন। অন্য কোনো সৃষ্টিকে তিনি এমন করে সৃষ্টি করেননি। তাঁর প্রতিমূর্তিতে সৃষ্ট হওয়ার অর্থ তাঁর মতো আত্মা লাভ করা। আমাদের কাছে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে, ঈশ্বর কেন মানুষকে এভাবে সৃষ্টি করলেন? এর উত্তরে বলতেই হয়, ঈশ্বর মানুষকে ভালোবাসেন। অন্যান্য বিষয়ে আলোচনার পূর্বে এটি আমাদের আরও পরিষ্কারভাবে জানা ও বোঝা দরকার।
আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি ঈশ্বরের জন্য। ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর আনন্দ ও গৌরবের জন্য। আমরা যেন তাঁকে জানতে পারি, ভালোবাসতে পারি ও চিরদিন তাঁর পথে চলতে পারি। আমাদের আত্মা অমর। তাই আমাদের দেহের মৃত্যুর পরেও আত্মা চিরদিন জীবিত থাকবে। কাজেই আমরা চিরদিন তাঁর প্রশংসা ও গৌরব করব। ঈশ্বরের একান্ত ইচ্ছা, আমরা যেন তাঁর সাথে একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলি। এই গভীর সম্পর্কটি যেন এখন ও চিরকাল টিকে থাকে। এই কারণেই তিনি আমাদেরকে তাঁর নিজের প্রতিমূর্তিতে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র বাইবেলে এ কথা বলা হয়েছে: 'আমাদের ঈশ্বর প্রভুই একমাত্র প্রভু! আর তোমার ঈশ্বর স্বয়ং প্রভু যিনি, তাঁকে তুমি ভালোবাসবে তোমার সমস্ত অন্তর দিয়ে, তোমার সমস্ত প্রাণ দিয়ে, তোমার সমস্ত মন দিয়ে, আর তোমার সমস্ত শক্তি দিয়ে' (মার্ক ১২:২৯-৩০)।
ঈশ্বর আমাদের দেহ, মন ও আত্মা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আত্মাকে আমরা হৃদয় এবং অন্তরও বলে থাকি। তিনি আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাও দিয়েছেন। তিনি এগুলো দিয়েছেন মানুষ যেন ঈশ্বরকে জানতে, ভালোবাসতে ও তাঁর কথা মেনে চলতে পারে। আমাদের মন, আত্মা (হৃদয় ও অন্তর) এবং স্বাধীন ইচ্ছার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তির প্রকাশ ঘটে। এবার আমরা এগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
১.১ ঈশ্বর মানুষকে একটি মন দিয়েছেন যেন মানুষ ঈশ্বরকে জানতে পারে। ঈশ্বর যেভাবে চিন্তা করেন তা যেন মানুষ বুঝতে পারে। মানুষের মনে ঈশ্বর গভীর চিন্তাশক্তি দিয়েছেন, মানুষের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করার জন্য। আমরা জানি, আব্রাহাম ঈশ্বরকে ব্যক্তিগতভাবে জানতে পেরেছিলেন। তাই তাঁর সাথে তিনি বন্ধুত্ব করেছেন। এভাবে আমরাও আমাদের মন দিয়ে ঈশ্বরকে জানতে ও তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি।
১.২ মানুষকে সৃষ্টি করে ঈশ্বর তার মধ্যে দিয়েছেন আত্মা (হৃদয় বা অন্তর)। হৃদয় দিয়ে আমরা অনেক কিছু অনুভব করি। এই হৃদয়ে জন্ম হয় ভালো, ঘৃণা, আনন্দ, বেদনা, সহানুভূতি ও এরকম বিভিন্ন অনুভূতির। আমাদের জন্য ঈশ্বর হৃদয় দিয়েছেন, যেন আমরা ঈশ্বরকে ভালোবাসতে পারি। ঈশ্বরের ইচ্ছা এই, তিনি যা ভালোবাসেন ও ঘৃণা করেন, তাঁর সৃষ্ট মানুষও যেন তা ভালোবাসে ও ঘৃণা করে। তিনি চান, যেন আমরা সমস্ত অন্তর দিয়ে তাঁকে ভালোবাসি। তাই তিনি তাঁর নিজের মতো করে মানুষ সৃষ্টি করেছেন।
১.৩ ঈশ্বর তাঁর নিজের মতো করে সৃষ্ট মানুষের মধ্যে দিয়েছেন ইচ্ছাশক্তি। এ কারণে প্রতিটি ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় যে পথ বেছে নেয়, সেই পথে তিনি তাকে চলতে দেন। এতে তিনি কোনো বাধা দেন না। তিনি চাইলে এমনভাবে মানুষকে সৃষ্টি করতে পারতেন, যেন মানুষ কেবল তাঁর ইচ্ছা অনুসারেই চলবে, তাঁর দেখানো পথেই চলবে। তিনি হয়তো চাইতে পারতেন, মানুষ যেন অন্য কোনো পথে পা না বাড়ায়। কিন্তু তাতে মানুষ হয়ে যেত একেকটি পুতুল, রোবট বা কারখানায় তৈরি কোনো পণ্য। তাহলে তো তার স্বাধীনতা থাকতো না। মানুষ হলো তাঁর একটি বিশেষ সৃষ্টি। তিনি আমাদেরকে তাঁর নিজের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তিনি খুশি হন যদি মানুষ স্বাধীনভাবে তাঁকে ভালোবাসা ও উপাসনা করার পথটি বেছে নেয়।
তিনি মানুষকে একটি মহান দায়িত্ব দিয়েছেন। দায়িত্বটি হলো মানুষ নিজের ইচ্ছায় বেছে নিবে সে কি ঈশ্বরের পথে চলবে, নাকি শয়তানের পথে চলবে। সে কি ঈশ্বরের বাণী মেনে চলবে, নাকি তা অবজ্ঞা করবে। ঈশ্বর কাউকে তাঁর বাণীতে বিশ্বাস করতে ও তা মেনে চলতে বাধ্য করেন না। কারণ তিনি মানুষকে ভালোবাসেন। তিনি চান, মানুষ স্বাধীন ইচ্ছায় হৃদয় থেকে তাঁকে ভালোবাসুক। কারণ জোর করে কারও সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক সৃষ্টি করা যায় না। তবে যুগের শেষ দিনে মানুষের বিচার হবে। মানুষ নিজের ইচ্ছায় যে পথটি বেছে নেবে, সেই অনুসারে বিচারে তার পুরস্কার বা শাস্তি হবে।
আমরা যেন এরকম মনে না করি যে আমরা ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে সৃষ্ট বলে আমরা ঈশ্বরের সমান। অথবা এ-ও যেন মনে না করি যে আমাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ঈশ্বরের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সমান। তা কিন্তু ঠিক নয়। ঈশ্বর হলেন অসীম অর্থাৎ তিনি একই সাথে বিশ্বের সর্বত্রই বিরাজমান। কোনো কিছুতেই তাঁর সীমাবদ্ধতা নেই। আর মানুষ হলো সসীম। অর্থাৎ মানুষের সবকিছুতেই সীমাবদ্ধতা আছে। উদাহরণস্বরূপ, মানুষ একসাথে শুধু একটা স্থানেই উপস্থিত থাকতে পারে।
ঈশ্বর হলেন চিরজীবন্ত। তাঁর কোনো আদি বা অন্ত নেই। তিনি ছিলেন, আছেন ও চিরদিন থাকবেন। তিনি আমাদের এমন মন, হৃদয় ও ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন, যেন আমরা তাঁর সাথে একটি জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তুলি এবং সেই সম্পর্কের মধ্যে বাস করি। তিনি আমাদেরকে অন্যান্য প্রাণীর মতো করে সৃষ্টি করেননি। কারণ অন্য প্রাণীরা মানুষের মতো করে ঈশ্বরের সাথে জীবন্ত সম্পর্ক গড়তে পারে না। কিন্তু আমরা পারি। কারণ আমরা তাঁর প্রতিমূর্তিতে গড়া।
| কাজ: তিন থেকে পাঁচজন করে এক একটি দলে বস। এবার তোমার ডান পাশের ব্যক্তির মধ্যে ঈশ্বরের কোন গুণের প্রকাশ দেখতে পাও তা সবার সাথে সহভাগিতা কর। |
Read more