প্রিয়নাথ বৈরাগী খ্রীষ্টীয় সমাজের একজন অমূল্য সম্পদ। আমাদের প্রভু যীশুই তাঁকে আহ্বান করেছিলেন। তিনি প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে প্রভুর আদর্শে জীবনযাপন করেছেন। খ্রীষ্টের নাম তিনি তাঁর জীবন ও কাজ দ্বারা প্রচার করেছেন। পবিত্র আত্মার শক্তিতে তিনি এই কাজগুলো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত করতে পেরেছিলেন। তাঁর জীবনাদর্শ আমাদের সামনে একটি উজ্জ্বল তারকার মতো। আমরা তাঁর জীবন পর্যালোচনা করলে তাঁর অবদানগুলোর চিত্র দেখব। এভাবে আমরা ঠিক তাঁর মতো করে না হলেও অন্য কীভাবে প্রভু যীশুর জন্য কাজ করতে পারি, তা ভাবতে চেষ্টা করব।

এই অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা:
- প্রিয়নাথ বৈরাগীর জন্ম ও শৈশবকাল বর্ণনা করতে পারব
- খ্রীষ্টসংগীতে প্রিয়নাথ বৈরাগীর অবদান বর্ণনা করতে পারব
- মানবসেবায় প্রিয়নাথ বৈরাগীর অবদান বর্ণনা করতে পারব
- প্রিয়নাথ বৈরাগীর জীবনী পাঠ করে মানবকল্যাণমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ হবো
ধান-নদী-খাল-এই তিনে বরিশাল। এই বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার ইন্দুরকানি গ্রামে বাস করতেন শ্রীনাথ ও স্বর্ণকুমারী বৈরাগী। চারদিকের খাল-বিল নদী-নালা তখন বর্ষার পানিতে থৈ থৈ করছে। কবি রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু বর্ষাকালের এমনই এক স্মরণীয় ক্ষণে, ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ৩রা জুন তারিখে শ্রীনাথ ও স্বর্ণকুমারীর ঘর আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান। বাবা-মা তাঁদের এই আদরের সন্তানটির নাম রাখেন প্রিয়নাথ বৈরাগী। প্রিয়নাথের ছিল তিন ভাই ও এক বোন। বোনের নাম ছিল বিধুমুখী আর ভাইদের নাম: উত্তম, অতুল ও সুবোধ। প্রিয়নাথ ছিলেন একজন প্রখ্যাত সংগীতপ্রেমী। তাঁর দুই ভাই উত্তম এবং অতুলের হৃদয়ও সর্বদাই জুড়ে থাকত সংগীতের প্রতি অগাধ প্রীতি। দুঃখের বিষয় মাত্র ২১ বছর বয়সে বড় ভাই উত্তম অকালে মৃত্যুবরণ করলে প্রিয়নাথ শোকে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন।
এই পরিবারের বৈরাগী নাম গ্রহণের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস আছে। তাঁদের আগের নাম ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রিয়নাথ বৈরাগীর পিতামহ তৎকালীন সমাজের নিষ্ঠুর বিধি-বিধান ও অনুশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এরই চিহ্ন হিসেবে তিনি বন্দ্যোপাধ্যায় নামটি পরিত্যাগ করে বৈরাগী নাম গ্রহণ করেন। পরে গৈলা গ্রাম ত্যাগ করে তাঁরা তরুণসেন গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন।
প্রিয়নাথ বৈরাগীর বাবা ছিলেন গ্রামের প্রাইমারি মিশন স্কুলের একজন নামকরা শিক্ষক। তাঁর মা ছিলেন নম্র ও কোমল স্বভাবের একজন শিক্ষিত নারী। স্বর্ণকুমারী সংসার ধর্ম পালনের অবসর মুহূর্তগুলোতে এলাকার নিরক্ষর মা-বোনদের অক্ষর জ্ঞান দান করে কাটাতেন। সেই সময়ে কি ছেলে কি মেয়ে-শিক্ষার আলো কারো মাঝেই ছিল না বললেই চলে। এই পরিস্থিতিতে এলাকার সবার চিঠি লিখে ও পড়ে দিতেন প্রিয়নাথের মা। সময় করে মেয়েদের পবিত্র বাইবেল থেকে পাঠ করেও শোনাতেন। তাইতো স্বর্ণ কুমারী ছিলেন ধর্ম-বর্ণ, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধার পাত্রী।
প্রিয়নাথ বৈরাগীর শিশুকাল মা-বাবার সাথেই কাটে। প্রাইমারি পাস করেন মিশন স্কুল থেকে। পরবর্তীকালে শ্রীরামপুর মিশন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। কলকাতা স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে তিনি এফ, এ (বর্তমানে আই, এ) পাস করেন। প্রিয়নাথের অমায়িক ব্যবহার এবং মনের উদারতা, মিষ্টি-মধুর কথাবার্তা মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করত। ছাত্রজীবনে লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত সংগীতচর্চা এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে তিনি অনেক সাফল্য বয়ে এনেছেন। সংগীতপ্রেমী পরিবারের প্রতিটি সদস্য অপূর্ব মায়াভরা কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। প্রিয়নাথ নিয়মিত খ্রীষ্টীয় সংগীতের চর্চা করতেন। সময় ও সুযোগ পেলেই ঈশ্বরভক্ত এই গুণী সেবক সংগীত রচনা ও সুর নিয়ে আপন জগতে চলে যেতেন।
প্রিয়নাথের কলেজজীবন পার হওয়ার সময়েই তার বাবা শ্রীনাথ বৈরাগী ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে স্বর্গবাসী হন। পিতার অকালমৃত্যুতে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে প্রিয়নাথের উপর। প্রচণ্ড ঈশ্বরভক্ত প্রিয়নাথ বাবার ও প্রিয় বড় ভাইয়ের বিরহ-ব্যথায় প্রথমে কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। তা সত্ত্বেও ঈশ্বরের উপর আস্থাশীল ও বিশ্বাসী প্রিয়নাথ সব কিছু সামলে নিলেন এবং সংসারের দায়িত্ব গ্রহণ করে চাকরির সন্ধানে বের হলেন। একসময় সুন্দরবনের কর বিভাগে একটা চাকরি পেলেন। এর মাধ্যমে তাঁর স্রষ্টার মহিমা প্রকাশের আরও বেশি সুযোগ হয়ে গেল। সুন্দরবনের অপরিসীম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে বিমোহিত করে তুলল। নদীর বিশালতা ও প্রাকৃতিক সবুজ বনানী ও এর তীরভূমি তাঁকে প্রার্থনায় নিমগ্ন হওয়ার সুযোগ এনে দিল। এই সময়ে প্রিয়নাথ খ্রীষ্টীয় সংগীত রচনা ও সুর দেওয়ার উপর অধিক সময় দিতে লাগলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁর এই চাকরি খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না। কর বিভাগের দুর্নীতি সহ্য করতে না পেরে তিনি চাকরি ছেড়ে চলে আসেন নোয়াখালী। সেখানে তিনি মিশন স্কুলে শিক্ষকতার কাজ গ্রহণ করেন।
| কাজ: ১। প্রিয়নাথ বৈরাগীর মা কীভাবে নিরক্ষর লোকদের শিক্ষা দিতেন তা ভূমিকাভিনয়ের মাধ্যমে প্রদর্শন কর। কাজ: ২। প্রিয়নাথ বৈরাগী জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তা ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ কর। |
প্রিয়নাথ বৈরাগীর বংশের প্রত্যেকেই সাহিত্য ও সংগীতপ্রেমী ছিলেন। সবাই নিজ নিজ প্রতিভায় ও চেষ্টায় গুণী ও প্রতিভাবান হিসাবে সমাজে পরিচিতি লাভ করেছেন। তবে খ্রীষ্টীয় সাহিত্য ও সংগীতে আগে থেকেই তাঁদের বংশের আগ্রহ ও দরদ ছিল উল্লেখ করার মতো। প্রিয়নাথ বৈরাগী আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পিতা ঈশ্বরের কাছ থেকে অনুগ্রহ প্রাপ্ত হয়েছিলেন, যার প্রমাণ তার রচিত খ্রীষ্টীয় আধ্যাত্মিক সংগীতের বিশাল ভাণ্ডার।

সংগীতপ্রেমী প্রিয়নাথ বুঝতে পেরেছিলেন অথৈ দুঃখের মাঝে ভক্তিমূলক নির্মল খ্রীষ্ট-প্রেমের গান আত্মার খোরাক যোগায়। সংগীত মনে জাগায় সাহস এবং ঈশ্বরপ্রেমে নিমগ্ন হলে মনের মধ্যে প্রভু যীশুর দেখানো পথে চলা সহজ হয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জগতের সকল কিছুই ক্ষণস্থায়ী। তিনি প্রভু যীশুকে একমাত্র সত্য বলে মেনে নিয়ে এক অমর গান রচনা করেন, যার বাণী অমর, যার সুর স্রষ্টার সান্নিধ্যে নিয়ে যেতে পারে। প্রিয়নাথের অনেক গানের মধ্যে একটি গান হলো-
আমার জুড়ালো প্রাণ এসে যীশুর পায়।
এসে দয়াল যীশুর শ্রীচরণ তলে আমার ঘুচলো ভবের ভয়।
ঐ চরণে নাইরে দুঃখ-ক্লেশ, নাইরে ভবের জ্বালা, পাপ অশান্তির লেশ
বুঝি দুগ্ধ মধু প্রবাহী সেই দেশ আছে ঐ চরণ তলায়।
খ্রীষ্টপ্রেমী সংগীত সাধক প্রিয়নাথের প্রতিটি গানের বাণীর মধ্যে লুকিয়ে আছে জীবনের পরম শান্তি। এ গান যে মানুষটি রচনা করতে পেরেছেন, তার হৃদয় যে প্রভুর প্রেমে কতখানি বিগলিত হয়েছিল তা প্রকৃতই ভাববার বিষয়। খ্রীষ্টীয় সংগীত সাধক প্রিয়নাথ বৈরাগীর গানের গভীরে গেলে যেকোনো মানুষের হৃদয় ঈশ্বরের মহিমা ও প্রশংসা গানে নেচে উঠে। প্রতিটি প্রাণ সকাতর ও চঞ্চল হয়ে ওঠে প্রভুর সান্নিধ্য লাভের আশায়। তাইতো আমরা এই গানটিতে খুঁজে পাই তাঁর সকরুণ আর্তি:
তোমার জয় হোক, জয় হোক, হে মহারাজ, হোক মহিমা কীর্তন এ মহীতলে।
ভবে যত নরনারী এসে সারি সারি লুটাক তোমার ঐ চরণতলে।
বসে স্বর্গের সিংহাসনে চেয়ে আছ জগৎ পানে
কোথায় কে কাঁদে অভাজন, করে হাত প্রসারণ
কর হে ধারণ, তুলে কোলে।
সংগীতের নিপুণ কারিগর প্রিয়নাথ প্রভু যীশুর নিকট নিজেকে সঁপে দিতে পেরেছিলেন। তাইতো তিনি দুঃখের সময় যীশুকে ডেকেছেন, আবার আনন্দের সময় যীশুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে হয়েছেন অন্তঃপ্রাণ। মনের আনন্দে আজ ডাকি তোমারে।
ওহে যীশু দয়াময়, যারা তোমার দয়া পায় তারা ধন্য হয় এই সংসারে।
আমার নয়নের জল, তুমি কখন এসে মুছে দিলে আমি জানি না দয়াল।
এখন যে দিকেতে চাই, সুখের কূল-কিনারা নাই, সংসার ভরা সুখের জোয়ারে।
এমনিভাবে প্রভু যীশুর ভক্ত সংগীত পাগল মহান এই মানুষটির হৃদয় ভরা ছিল স্বর্গীয় ভালোবাসায়। বরিশাল, ফরিদপুর অঞ্চলের মানুষের মাঝে কত সহজ ও সাবলীল ভাব ও ভঙ্গি, তাল-লয়-সুর ও ছন্দের মাধ্যমে খ্রীষ্টকে প্রচার করেছেন তা আশ্চর্য প্রদীপের ন্যায় আলো দিয়েছে সহস্র মনে। এই আলো খ্রীষ্টের ভালোবাসার আলো।
| কাজ: প্রিয়নাথ বৈরাগীর যে কোন দু'টি গান দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেয়ে শুনাও। |
আমাদের সমাজে বিভিন্ন মহৎপ্রাণ ব্যক্তি নানাভাবে জনহিতকর কাজ করে গেছেন এবং বর্তমানেও করছেন। আমরা মনে করি, সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল ও সার্থক। তবে প্রত্যেকের সেবার ধরন এক নয়। প্রিয়নাথ বৈরাগী একদিকে সার্থক পালক হিসেবে, আবার তাঁর সার্থকতা রয়েছে শিক্ষকতায়, সাহিত্যচর্চায়, পুস্তক অনুবাদে, রোগীদের জন্য বিশেষ প্রার্থনায়, সেবক সমিতি গঠন এবং লেখক হিসেবে। নিচে আমরা কয়েকটি দিক একটু বিস্তারিতভাবে দেখি।
প্রিয়নাথ বৈরাগী নামের সাথে গুরুজি সম্বোধনটি তাঁর ভক্তজনের কাছে ছিল শ্রদ্ধার ও সম্মানের। একজন গুণী মানুষকে তার শিল্পকর্মের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়। খ্রীষ্টীয় ও ভজনশীল সংগীতজগতে প্রিয়নাথের অবদান সম্পর্কে সবাই জানে। গুরুজি প্রিয়নাথ বৈরাগীর গান ও সুর আজও মানুষের হৃদয় কাঁদায়, চোখে জল আনে, পবিত্রতার আকাশে তারা জ্বল জ্বল করে, আঁধার রাতে পথ দেখায়, কাতর-শোকাতুর প্রাণে আনে সান্ত্বনা এবং দেখায় জীবন পথ।
খ্রীষ্টীয় সংগীতজগতে প্রিয়নাথ বৈরাগী উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৫৭ খ্রীষ্টাব্দের সময়টুকু পর্যন্ত যে অবদান রেখে গেছেন তা অপরিসীম। প্রভু যীশু খ্রীষ্টকে মুক্তিদাতা হিসেবে গ্রহণ করে খ্রীষ্টের অনুসারীদের হৃদয়-মনে গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা জাগিয়ে রাখার মাধ্যম হিসেবে যে সকল সংগীত তিনি রচনা ও সুর করেছেন, তা খ্রীষ্টান সমাজের জন্য এক বিরাট অবদান।
বড় ভাই উত্তম অকালে মৃত্যুবরণ করাতে প্রিয়নাথই তখন পরিবারের বড় সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরিবারের দুর্দিনে তাঁর একটা চাকরির ভীষণ প্রয়োজন ছিল। সুন্দরবনের কর বিভাগে তিনি যে চাকরিটা পেয়েছিলেন তা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সৎ ও নির্ভীক প্রিয়নাথের জীবনে ন্যায়, সততা ও বিবেকবোধ নাড়া দিয়ে ওঠে। ঐ চাকরিতে অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর বাড়ি, গাড়ি ও অগাধ সহায়-সম্পত্তির মালিক হওয়ার মতো লোভনীয় সুযোগ ছিল। কিন্তু এসব তাঁকে আকর্ষণ করতে পারেনি। তিনি প্রকৃত খ্রীষ্ট বিশ্বাসীর উদাহরণ হিসাবে লোভ-লালসা পরিহার করে চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। এভাবে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন।
খ্রীষ্ট বিশ্বাসী প্রিয়নাথ সুশিক্ষিত ও বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে চলে যান ভারতের শ্রীরামপুর। সেখানে শ্রীরামপুর কলেজ থেকে ধর্মতত্ত্বের উপর উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেন। ধর্মতত্ত্বে ডিগ্রি গ্রহণকালীন তার আগ্রহ, ইচ্ছা ও বহুমুখী গুণ এবং প্রতিভার ছাপ লক্ষ করা যায়। ফলে মিশনারি কর্তৃপক্ষ তাঁকে পালক হিসাবে নিয়োগ দেন। একজন আধ্যাত্মিক পালক হিসেবে তাঁর বাণী প্রচারের সুনাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মণ্ডলীর সকল লোক তাঁর সংগীতের ভক্ত হয়ে পড়ে। যুবক-যুবতীরা দল বেঁধে আসত তাঁর গান শুনতে। এই সময়েই তাঁর লেখা গান ও সুর করা গান সকলের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মণ্ডলীর কাজ করার সময় কর্তৃপক্ষ ও তাঁর মায়ের অনুরোধে ইছাময়ীকে বিয়ে করেন। ইছাময়ী তখন ছিলেন মিশন স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী। স্ত্রী হিসেবে তিনি ছিলেন অসাধারণ। প্রিয়নাথ বৈরাগীকে খ্রীষ্টের বাণী প্রচারে তিনি সার্বক্ষণিক সাহায্য করতেন। ১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি শ্রীরামপুর থেকে চলে আসেন নিজ গ্রাম ইন্দুরকানিতে। সুসমাচার প্রচারে আবার তাঁর ডাক আসে। তিনি চলে যান ভারতের রাজস্থানে। কিছুদিন প্রচার করার পর সেখানকার আবহাওয়ায় খাপ খাওয়াতে না পারায় তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। পরে তিনি আবার নিজ গ্রামে চলে আসেন।
ভারতের রাজস্থান থেকে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে এলেন। এবার তাঁর ডাক পড়ল গৌরনদী ক্যাথলিক মিশনে অনুবাদকের কাজ করার জন্য। সুশিক্ষিত ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হিসেবে সেই সময়ে প্রিয়নাথ বাবুর খ্যাতি ও যশ ছিল মানুষের মুখে মুখে। গৌরনদীতে তিনি পবিত্র বাইবেল থেকে ঈশ্বরের বাণী অনুবাদ করেছেন। এছাড়া বাইবেল বিষয়ক অনেক মূল্যবান পুস্তকও তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন। এভাবে গৌরনদী ক্যাথলিক মিশনে তিনি অনেক মূল্যবান পুস্তক বাংলায় অনুবাদ করেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি সংগীত লেখা ও তাতে সুর করার কাজ চালিয়ে যান। মাঝে মাঝে তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও প্রার্থনাসভা পরিচালনা করেন। তাঁর নেতৃত্ব ও পরিচালনায় সবার মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হয় এবং সন্ধ্যাবেলায় তাঁর বাসায় গানের আসর বসত। সমবেত ভক্তদের তিনি নতুন নতুন গান শেখাতেন।
প্রিয়নাথ বৈরাগীর মিষ্টি-মধুর কথা এবং অমায়িক ব্যবহার ছিল সবাইকে কাছে টানার এক যাদুকরী মাধ্যম। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অনেক লোক তাঁর কাছে ছুটে আসত। কেউ প্রার্থনার অনুরোধ নিয়ে, কেউ বা আসত অর্থ সাহায্যের জন্য। তিনি গরিব-দুঃখী সবার জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রেখেছেন। সানন্দে এগিয়ে এসেছেন মানুষের সাহায্যে। কথিত আছে যে, তিনি তাঁর বেতনের টাকা থেকে দুঃখী দরিদ্রদের সাহায্য করেছেন।
১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দে প্রিয়নাথ ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন। সে সময় ঢাকা ও কলকাতা বেতারে বড়দিন ও পুণ্য সপ্তাহে খ্রীষ্টীয় সংগীত, গীতি আলেখ্য এবং নাটিকা পরিবেশন করা হতো। আর এ কাজে দক্ষ প্রিয়নাথের উপর গুরুদায়িত্ব ছিল তাঁর সফল বাস্তবায়নের কাজ। ঢাকায় থাকাকালীন তিনি বেশ কয়েকবার বেতারে খ্রীষ্টধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। জীবনের শেষ দিকে প্রিয়নাথ শ্রীরামপুরে বদলি হয়ে যান। সেখানে তাঁকে খ্রীষ্টীয় সাহিত্যবিষয়ক কর্মে নিযুক্ত করা হয়। ধর্মীয় নাটক লেখক হিসেবে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। তাছাড়া কবিতা, গল্প, কবিগানও তিনি রচনা করেন। তাঁর কর্মের ডালি বিশ্লেষণ করলে খুব সহজে বলা যায়, তিনি বড়মাপের একজন সাহিত্যিক ছিলেন।
প্রার্থনাশীল মানুষ হিসাবে ঈশ্বরভক্ত প্রিয়নাথ জীবনের শেষ সময়টুকু কাটিয়েছেন। মৃত্যুর আগে তিনি কলকাতার শ্রীরামপুরেই ছিলেন। অবশেষে ১৯৫৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর ভোর রাতে ঈশ্বরের সেবক প্রিয়নাথ বৈরাগী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তিনি আমাদের মাঝে সশরীরে নেই। তবে তাঁর প্রতিটি গানের বাণী ও সেবাকর্মের মধ্যে তিনি জীবন্ত রয়েছেন।
| কাজ: প্রিয়নাথ বৈরাগীর সেবাকর্মগুলোর মধ্যে প্রধানত কোনটি তুমি অর্জন করতে চাও এবং কীভাবে, তা লেখ। |
শূন্যস্থান পূরণ কর:
১. খ্রীষ্টের নাম প্রিয়নাথ তাঁর জীবন ও …………… দ্বারা প্রচার করেছেন।
২. তাঁদের আগের নাম ছিল …………… ।
৩. প্রিয়নাথ বৈরাগীর বাবা ছিলেন গ্রামের …………… স্কুলের একজন নামকরা শিক্ষক।
8. কলকাতা স্কটিশ …………… থেকে তিনি এফএ পাস করেন।
বাম পাশের বাক্যাংশের সাথে ডান পাশের বাক্যাংশের মিল কর:
বাম পাশ | ডান পাশ |
১. প্রিয়নাথের কলেজজীবন পার হওয়ার সময়েই ২. কর বিভাগের দুর্নীতি সহ্য করতে না পেরে ৩. প্রিয়নাথ বৈরাগীর বংশের ৪. পরিবারের দুর্দিনে তাঁর ৫. গৌরনদীতে তিনি পবিত্র বাইবেল থেকে |
|
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১. প্রিয়নাথ বৈরাগী খ্রীষ্টের বাণী কীভাবে প্রচার করেছেন?
ক. প্রার্থনা করে
খ. খেলাধুলা করে
গ. জীবন ও কাজ দ্বারা
ঘ. দয়ার কাজ দ্বারা
২. খ্রীষ্টপ্রেমী সংগীত সাধক প্রিয়নাথের গানের মধ্যে লুকিয়ে আছে-
ক. জীবনের পরম শান্তি
খ. ঐশ্বরিক ভালোবাসা
গ. আনন্দ উল্লাস
ঘ. দুঃখ-বেদনা
নিচের অনুচ্ছেটি পড় এবং ৩ ও ৪ নং প্রশ্নের উত্তর দাও:
আশীষ একজন শিক্ষিত যুবক। সে গান শুনতে ভালোবাসে। তার গ্রামের লোকদের সেবা দানের জন্য গ্রামে একটি সেবাসংঘ গঠন করা হলো। একসময় সেবার নামে অর্থ আদায় করে সংঘের ছেলেরা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছে দেখে আশীষ সেই সংঘ ত্যাগ করে।
৩. আশীষের চরিত্রে প্রিয়নাথের কোন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়?
ক. সংগীত সাধক
খ. জ্ঞান সাধক
গ. সমাজকর্মী
ঘ. অন্যায়ের প্রতিবাদী
8. আশীষের গুণাবলির কারণে সে হতে পারবে-
i. আদর্শ খ্রীষ্টবিশ্বাসী
ii. বিখ্যাত শিল্পী
iii. অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i
খ. ii
গ. i ও ii
ঘ. i, ii ও iii
সৃজনশীল প্রশ্ন
১. রোমিও ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত। সে প্রার্থনা, বাইবেল পাঠ, রোগী সেবা ইত্যাদি কাজ নিয়মিত করে। সংগীত সাধনা করাও তার একটি শখের কাজ। এলাকায় মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে সে সোচ্চার। এমনকি তার অনেক সহপাঠীকে তাদের অন্যায় কাজ থেকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে সে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করেছে।
ক. প্রিয়নাথ কোথায় চাকরি করতেন?
খ. কী কারণে তিনি কর অফিসের চাকরি ছেড়ে দেন?
গ. কার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রোমিওর মধ্যে ফুটে উঠেছে-ব্যাখ্যা কর।
ঘ. 'রোমিও যেন খ্রীষ্টীয় সমাজের এক অমূল্য সম্পদ'-এ উক্তির যথার্থতা মূল্যায়নে তোমার মতামত দাও।
২. সুব্রত ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা পোষণ করে আসছে লেখাপড়া করে সে পুরোহিত হবে। ধর্মীয় জীবনে প্রবেশের জন্য পড়ালেখার পাশাপাশি সে নিয়মিত বাইবেল পাঠ ও প্রার্থনা করে। গুরুজনদের সে শ্রদ্ধা করে, পাড়া প্রতিবেশীদের সাথে খুব ভালো ব্যবহার করে। অনেক সময় নিজের হাত খরচের টাকা থেকে দরিদ্র ছেলেমেয়েদের সাহায্য সহযোগিতা করে। পরিশেষে স্থানীয় পুরোহিতের সঙ্গে যোগাযোগ করে সে পুরোহিত জীবনে প্রবেশ করে। নিজের জীবনে ঈশ্বরকে খুঁজে পেতেই তার এ সাধনা।
ক) প্রিয়নাথ বৈরাগী কোন কলেজে ধর্মতত্ত্ব পড়াশুনা করেন?
খ) তিনি কেন ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশুনা করেন?
গ) সুব্রতের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো তোমার জীবনে কীভাবে কাজে লাগাবে? বর্ণনা কর।
ঘ) উৎসর্গীকৃত জীবনের মধ্যেই প্রকৃত সার্থকতা- উক্তিটির যথার্থতা মূল্যায়ণ কর।
সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন
১. প্রিয়নাথ বৈরাগীর পিতা ও মাতার নাম কী?
২. কে তৎকালীন সমাজের নিষ্ঠুর বিধি বিধান ও অনুশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন?
৩. প্রিয়নাথ কর বিভাগের চাকুরী ছেড়ে কোথায় কাজে যোগ দেন?
8. তিনি কখন ভারতের শ্রীরামপুরে গিয়েছিলেন?
৫. গৌরনদী ক্যাথলিক মিশনে কী কাজের জন্য প্রিয়নাথের ডাক পড়ল।
বর্ণনামূলক প্রশ্ন
১. প্রিয়নাথের জন্ম ও শৈশবকাল কীভাবে কেটেছে তা বর্ণনা কর।
২. মানব সেবায় প্রিয়নাথ বৈরাগীর অবদান বর্ণনা কর।
৩. মণ্ডলীর পালক হিসেবে প্রিয়নাথ বৈরাগীর অবদান তুলে ধর।
Read more