ঐশপ্রকাশের ধাপসমূহ (পাঠ ২)

ঈশ্বরকে জানা - খ্রীষ্টধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

267

প্রেমময় ঈশ্বর তাঁর নিজের প্রতিমূর্তিতে সৃষ্ট মানুষকে দিয়েছেন জ্ঞান-বুদ্ধি। তা দিয়ে মানুষ সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরকে জানতে চেষ্টা করে। তবে মানুষ শুধু তার নিজের চেষ্টায় ঈশ্বরকে পরিপূর্ণভাবে জানতে পারে না। কারণ মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি সীমিত। তাই ঈশ্বর নিজেই ইচ্ছা করেছেন মানুষের কাছে নিজেকে প্রকাশ করতে। তিনি তাঁর কাজ ও বাণীর মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন তাঁকে জানতে, মানতে ও ভালোবাসতে পারে। এভাবে মানুষ যেন প্রকৃত সুখী জীবনযাপন করতে পারে।

ঈশ্বর মানুষের কাছে নিজেকে হঠাৎ করে প্রকাশ করেননি। সৃষ্টির আদি থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে তিনি মানুষের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার মধ্য দিয়ে যীশুর আত্মপ্রকাশের পূর্ণতা পেয়েছে। নিচে আমরা ঈশ্বরের আত্মপ্রকাশের ধাপগুলো একের পর এক আলোচনা করব।
ক) সৃষ্টি: ঈশ্বর সৃষ্টিকর্তা ও সর্বশক্তিমান। তিনি সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন। তিনিই ভালোবাসা। সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে ইচ্ছা করেছেন। তাই তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। এসব সৃষ্টির মধ্য দিয়েই ঈশ্বরের প্রকাশ ঘটছে।

খ) আদি পিতা-মাতা: সৃষ্টির ষষ্ঠ দিনে ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। এ কারণে তিনি মানুষকে নিজের সাথে মিলন বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। ঈশ্বরের এই আত্মপ্রকাশের পথে মানুষের পাপ বাধা হয়ে দাঁড়াল। পাপের ফলে মানুষ শাস্তি পেলেন। মানুষের পতন হলো। স্বর্গ থেকে মানুষ প্রেরিত হলেন জগতে।
কিন্তু এই পতনের হাত থেকে মানুষকে উদ্ধার করার জন্য ঈশ্বর প্রতিশ্রুতি দিলেন। এই প্রতিশ্রুতি পালনে ঈশ্বর বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। এভাবে সর্বদা মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে। যারা মুক্তির খোঁজ করে, তারা সবাই পরিত্রাণ পায়।
গ) নোয়া: ধীরে ধীরে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকল। তারা বহু জাতি ও ভাষায় বিভক্ত হয়ে গেল। পৃথিবীতে পাপের পরিমাণও বেড়ে গেল। ঈশ্বরকে তারা ভুলেই গেল। একমাত্র নোয়া ও তাঁর পরিবার ঈশ্বরের অনুগত ছিলেন এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখাতেন।

ঈশ্বর এক মহাপ্লাবনের মধ্য দিয়ে নোয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ছাড়া অন্য সকল মানুষকে ধ্বংস করে ফেললেন। নোয়ার সাথে এক জোড়া করে সমস্ত জীবজন্তু ঈশ্বর রক্ষা করেছিলেন। এই প্লাবনের মাধ্যমে পৃথিবীর পাপ ধুয়ে গেল। এরপর নোয়ার সাথে ঈশ্বরের একটি সন্ধি স্থাপিত হলো। নোয়ার মাধ্যমে তিনি এক নতুন মানবজাতি গড়ে তুললেন।

ঘ) আব্রাহাম: ঈশ্বর নিজেকে আরও প্রকাশ করার জন্য একজন ধর্মপ্রাণ ও বিশ্বাসী ভক্তকে বেছে নিলেন। তাঁর নাম হলো আব্রাম। পরে ঈশ্বর তাঁর নাম পরিবর্তন করে আব্রাহাম রেখেছিলেন। তিনি ঈশ্বরের খুব বাধ্য ছিলেন। আব্রাহামকে ঈশ্বর একটি আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি আব্রাহামকে তাঁর পিতৃগৃহ, আত্মীয়স্বজন ও দেশ ছেড়ে কানান দেশে যেতে আহ্বান করেছিলেন। ঈশ্বর প্রতিজ্ঞা করলেন, আব্রাহামের বংশ থেকে সৃষ্টি হবে এক মহাজাতি। আব্রাহামের তখনো কোনো সন্তান ছিল না। তিনি ও তাঁর স্ত্রী সারা বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও আব্রাহাম ঈশ্বরের কথা বিশ্বাস করলেন। ঈশ্বরের সেই আদেশ পালন করে আব্রাহাম ঈশ্বরের নির্দেশিত দেশে চলে গেলেন। ঈশ্বর আব্রাহামের উপর খুব সন্তুষ্ট হলেন। ঈশ্বর তাঁকে প্রচুর আশীর্বাদ করলেন। তাঁর সাথে ঈশ্বর একটি সন্ধি স্থাপন করেছিলেন।

আব্রাহাম একটি সন্তান লাভ করলেন। তাঁর নাম ইসায়াক। ঈশ্বর আব্রাহামকে বলেছিলেন, তিনি যেন তাঁর প্রিয় সন্তান ইসায়াককে বলি দেন। আব্রাহাম তাই করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু ঈশ্বর তাঁকে তা করতে দেননি। এভাবে তিনি ঈশ্বরের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার প্রমাণ দেন। ইসায়াক নিজে এবং তাঁর পুত্র যাকোবও ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। ঈশ্বর যাকোবের নাম দিয়েছিলেন ইস্রায়েল।

ঙ) মোশী: ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ ও মুক্তিকর্ম বাস্তবায়নের জন্য ইস্রায়েল জাতিকে বেছে নিয়েছিলেন। তারা বাস করত কানান দেশে। অভাবের কারণে তারা মিশর দেশে এসে বসবাস করতে লাগল। ক্রমে তাঁরা ঐ দেশের দাসে পরিণত হলো। মিশর দেশের রাজা ফারাও তাঁদেরকে দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করাতেন। তাদেরকে শাস্তিও দিতেন প্রচুর। তাই তাঁরা ঈশ্বরের কাছে কান্নাকাটি করতে লাগল। ঈশ্বর মোশীকে আহ্বান করলেন ইস্রায়েল জাতিকে মুক্ত করে স্বাধীন দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

মোশী তাঁর ভাই আরোনের সহায়তায় ইস্রায়েল জাতিকে মুক্ত করলেন। তাদেরকে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে মরুভূমির মধ্য দিয়ে স্বাধীন দেশের দিকে নিয়ে গেলেন। পরে মোশীর মধ্য দিয়ে ঈশ্বর ইস্রায়েল জাতির জন্য দশ আজ্ঞা দিলেন। এভাবে মোশীর মধ্য দিয়ে ঈশ্বর নিজেকে আরও অনেকবার প্রকাশ করলেন।

চ) ইস্রায়েল জাতি: মোশীর নেতৃত্বে ঈশ্বর ইস্রায়েল জাতিকে প্রতিশ্রুত দেশে আনলেন। এই দেশ হলো দুধ আর মধুপ্রবাহী দেশ। অর্থাৎ থাকা-খাওয়াসহ সবকিছুর নিরাপত্তা পাওয়া গেল এখানে। তাদেরকে নিয়ে ঈশ্বর একটি বিশেষ জাতি গঠন করলেন। মোশীর মধ্য দিয়ে সিনাই পর্বতে ঈশ্বর ইস্রায়েল জাতির সাথে একটি সন্ধি স্থাপন করেন।

ঈশ্বর যে আজ্ঞাগুলো তাদের দিয়েছিলেন, সেগুলোর মাধ্যমে তারা ঈশ্বরকে ন্যায়বান, প্রেমময় ও মঙ্গলময় বলে আরও গভীরভাবে জানতে লাগল। তিনি তাঁদের আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন যে তিনি তাদের জন্য একজন ত্রাণকর্তাকে পাঠিয়ে দিবেন। এভাবে ইস্রায়েলীয়রা হলো ঈশ্বরের মনোনীত জনসমাজ।

ছ) প্রবক্তাগণ: ঈশ্বরের মনোনীত জাতি বারে বারে ঈশ্বরের অবাধ্য ও অকৃতজ্ঞ হয়েছে। প্রতিশ্রুত দেশে তারা জাতিগতভাবে বসতি স্থাপন করে। সমাজ ও দেশে তারা শান্তি-শৃঙ্খলা চায়। তাই তারা ঈশ্বরের কাছে একজন রাজার জন্য প্রার্থনা করে। ঈশ্বর তাদেরকে রাজা দেন। সেই থেকে তাঁরা রাজাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। সব রাজার জীবন একরকম ছিল না। কোনো কোনো রাজা ঈশ্বরকে ভুলে যান এবং অত্যাচারী হয়ে উঠেন। অনাচার, অন্যায্যতা, পাপ রাজাদের ও গোটা জাতিকে বিপথে নিয়ে যায়। ফলে ঈশ্বর তাদেরকে সুপথে ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন প্রবক্তা বা নবীকে পাঠান। প্রবক্তাগণ ঈশ্বরের কথাগুলো রাজাদের ও জাতির সব মানুষের কাছে বলতেন ও তাঁদের মন পরিবর্তনের আহ্বান জানাতেন। প্রবক্তাগণ তাদেরকে অসত্যের হাত থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতেন। তাঁরা খুব দৃঢ়তার সাথে ন্যায্যতা ও সত্যের কথা বলতেন। এভাবে প্রবক্তাদের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের প্রকাশ ঘটতে থাকে। ঈশ্বরকে প্রকাশ করার জন্য প্রবক্তাদের ভূমিকা ছিল খুবই বলিষ্ঠ।

জ) যীশু খ্রীষ্ট: ঈশ্বর একজন মুক্তিদাতাকে পাঠিয়ে দিবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিভিন্ন প্রবক্তার মুখ দিয়ে সেই কথা ঈশ্বর মানুষকে বারে বারে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ঈশ্বর সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি তাঁর আপন পুত্রকেই এ জগতে পাঠাবেন। এ কাজের জন্য তিনি মারীয়া/মরিয়মকে বেছে নিলেন। মারীয়ার গর্ভে মুক্তিদাতার জন্ম ঘটিয়ে তাঁকে পৃথিবীতে পাঠাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ঈশ্বর মারীয়ার কাছে মহাদূত গাব্রিয়েলকে পাঠিয়ে দিলেন। দূত মারীয়াকে এই সংবাদ জানালেন, তিনি পবিত্র আত্মার প্রভাবে গর্ভধারণ করবেন ও মুক্তিদাতার জননী হবেন। মারীয়া ঈশ্বরের এই ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণ করলেন। সময় পূর্ণ হলে পর মুক্তিদাতা যীশুর জন্ম হলো।

যীশু এসে মানুষের কাছে ঈশ্বরের পূর্ণ প্রকাশ ঘটালেন। ঈশ্বর যে মানুষকে ভালোবাসেন তা যীশুর মধ্য দিয়ে বাস্তবে প্রকাশিত হলো। তিনি সব মানুষকে ভালোবাসতে বলেছেন এবং নিজেও ভালোবেসেছেন। ক্রুশের উপর প্রাণ দিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন, তিনি মানুষকে ভালোবাসেন। যীশু আমাদের জন্য হলেন পথ, সত্য ও জীবন। তাঁর মধ্য দিয়ে আমরা পিতার কাছে যেতে পারি। আমাদের আদি পিতা-মাতার পাপের ফলে আমাদের জন্য স্বর্গের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মুক্তিদাতা যীশুর মাধ্যমে পিতা তা খুলে দিলেন। এভাবে আমরা যীশুর মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রকাশ দেখতে পেলাম।

ঝ) খ্রীষ্টমণ্ডলী: যীশু খ্রীষ্টের স্থাপিত মণ্ডলীর মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের প্রকাশ ঘটে চলছে। জগতের বাস্তব অবস্থায় পবিত্র আত্মা মণ্ডলীর পরিচালকগণের মাধ্যমে ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ করেন। পরিচালকদের মধ্য দিয়ে মণ্ডলীর জনগণ ঈশ্বরের প্রকাশ দেখতে পায়।

কাজ: প্রেমময় ঈশ্বর আমাদের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেছেন বলে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি প্রার্থনা লেখ।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...