মানবজাতির মুক্তিদাতা যীশু খ্রীষ্ট ঐশরাজ্য প্রচারের জন্য তিন বছর প্রকাশ্যে কাজ করেছেন। তাঁর আশ্চর্য কাজগুলো ছিল মুক্তিকর্ম সাধনের জন্য মানুষের পূর্বপ্রস্তুতির একটা অংশ। এগুলো হলো তাঁর প্রচারিত ও আরম্ভ করা ঐশরাজ্যের চিহ্নস্বরূপ। যাঁরা যীশুর উপর অগাধ বিশ্বাস রেখেছে, তাঁদের বেলায় আশ্চর্য কাজগুলো ঘটেছে। যাঁদের অন্তরে বিশ্বাস ছিল না, তাঁদের বেলায় এগুলো ঘটতে দেখা যায়নি। যীশুর আশ্চর্য কাজগুলো আমাদের বিশ্বাসের সাথেও খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আমাদের অন্তরে বিশ্বাস থাকলে বর্তমানকালে আমাদের জীবনেও যীশুর আশ্চর্য কাজ ঘটতে পারে। এই অধ্যায়ে আমরা যীশুর আশ্চর্য কাজ সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব।

এই অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা:
- প্রভু যীশুর আশ্চর্য কাজ সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারব
- প্রভু যীশুর আশ্চর্য কাজের বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যাখ্যা করতে পারব
- নায়িন নগরে মৃত যুবককে জীবন দানের ঘটনাটি ব্যাখ্যা করতে পারব
- প্রভু যীশুর ঐশ্বরিক শক্তির উপর বিশ্বাসী হবো।
আশ্চর্য কাজ বলতে আমরা বুঝি অসাধারণ ও বিস্ময়কর ঘটনা। এগুলো কীভাবে ঘটে তা মানুষ তার সাধারণ জ্ঞান দ্বারা বুঝতে পারে না বা তার কারণও ব্যাখ্যা করতে পারে না। আশ্চর্য কাজকে অলৌকিক কাজও বলা হয়ে থাকে। 'অলৌকিক' কথার অর্থ হলো 'লোকের দ্বারা করা অসম্ভব'। আশ্চর্য বা অলৌকিক ঘটনা মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এই ঘটনা ঘটে ঐশ্বরিক শক্তিতে এবং ঈশ্বর নিজে সেখানে উপস্থিত থাকেন।
পবিত্র বাইবেলে শুধু যীশু খ্রীষ্টের মধ্য দিয়েই আশ্চর্য কাজ ঘটেনি। পুরাতন নিয়মেও আমরা অনেক আশ্চর্য ঘটনা দেখতে পাই। উদাহরণস্বরূপ, মিশর দেশ থেকে ইস্রায়েল জাতির মুক্তির আগে ঈশ্বর দশটি আঘাত হেনেছিলেন। মোশীর মধ্য দিয়ে লোহিত সাগর দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল এবং সেখান দিয়ে ইস্রায়েল জাতির লোকেরা সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল। মরুভূমিতে তিনি ইস্রায়েল জাতির লোকদেরকে স্বর্গ থেকে মান্না দিয়েছিলেন। পাথরের মধ্য থেকে পানি বের হয়ে এসেছিল। এ রকম আরও অনেক ঘটনা আমরা দেখতে পাই।
প্রভু যীশুর আশ্চর্য কাজগুলো ছিল ভিন্ন রকমের। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কারণে যীশুর আশ্চর্য কাজগুলো অন্য রকমের হয়েছে। পরবর্তী পাঠে আমরা সে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব। নিচে প্রভু যীশুর ৩৬টি আশ্চর্য কাজের একটি তালিকা তুলে ধরা হলো।
১। কানা নগরে বিয়ের উৎসব (যোহন ২:১-১১)।
২। কাফার্নাউম নগরে মন্দ আত্মা বিতাড়ন (মার্ক ১:২১-২৮; লুক ৪:৩১-৩৭)।
৩। আশ্চর্যভাবে জালভর্তি মাছ ধরা পড়ে (লুক ৫:১-১১)
৪। নাইন নগরে মৃত যুবকের জীবন দান (লুক ৭:১১-১৭)।
৫। একজন কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করেন (মথি ৮:১-৪; মার্ক ১:৪০-৪৫; লুক ৫:১২-১৬)।
৬। শতানীকের চাকরকে সুস্থ করেন (মথি ৮:৫-১৩: লুক ৭:১-১০; যোহন ৪:৪৬-৫৪)।
৭। পিতরের শাশুড়িকে জীবন দান (মথি ৮:১৪-১৭; মার্ক ১:২৯-৩৪; লুক ৪:৩৮-৪১)।
৮। দিনের শেষে মন্দ আত্মা বিতাড়ন (মথি ৮:১৬-১৭: মার্ক ১:৩২-৩৪; লুক ৪:৪০-৪১)।
৯। ঝড় থামানো (মথি ৮:২৩-২৭; মার্ক ৪:৩৫-৪১; লুক ৮:২২-২৫)।
১০। গেরাসিনীয়দের মাঝে অপদূত বিতাড়ন (মথি ৮:২৮-৩৪; মার্ক ৫:১-২০; লুক ৮:২৬-৩৯)।
১১। কাফার্নাউম নগরে পক্ষাঘাতগ্রস্তকে নিরাময়করণ (মথি ৯:১-৮; মার্ক ২:১-১২; লুক ৫:১৭-২৬)।
১২। মৃত বালিকাকে জীবন দান (মথি ৯:১৮-২৬; মার্ক ৫:২১-৪৩; লুক ৮:৪০-৫৬)।
১৩। একজন স্ত্রীলোকের আশ্চর্য রোগমুক্তি (মথি ৯:২০-২২; মার্ক ৫:২৪-৩৪; লুক ৮:৪৩-৪৮)।
১৪। গালিলেয়ায় দুজন অন্ধকে দৃষ্টিশক্তি দান (মথি ৯:২৭-৩১)।
১৫। একজন অপদূতগ্রস্ত বোবার বাকশক্তি লাভ (মথি ৯:৩২-৩৪)।
১৬। বেথসাথা জলকুণ্ডের ধারে এক লোকের অলৌকিক আরোগ্য লাভ (যোহন ৫:১-১৮)।
১৭। একজন হাত-নুলা ব্যক্তির নিরাময় লাভ (মথি ১২:৯-১৩); মার্ক ৩:১-৬: লুক ৬:৬-১১)।
১৮। একজন অন্ধ ও বোবার মধ্য থেকে মন্দ আত্মা বিতাড়ন (মথি ১২:২২-২৮; মার্ক ৩:২০-৩০; লুক ১১:১৪-২৩)।
১৯। একজন স্ত্রীলোকের মধ্য থেকে বিদেহী আত্মা বিতাড়ন (লুক ১৩:১০-১৭)।
২০। পাঁচ হাজার মানুষকে আহার দান (মথি ১৪:১৩-২১; মার্ক ৬:৩১-৩৪; লুক ৯:১০-১৭; যোহন ৬:৫-১৫)।
২১। জলের উপর দিয়ে হাঁটা (মথি ১৪:২২-৩৩; মার্ক ৬:৪৫-৫২; যোহন ৬:১৬-২১)।
২২। গেন্নেসারেৎ নগরের তীরে বহু মানুষের আরোগ্যলাভ (মথি ১৪:৩৪-৩৬: মার্ক ৬:৫৩-৫৬)।
২৩। অনিহুদি স্ত্রীলোকের কন্যার নিরাময়লাভ (মথি ১৫:১-২৮; মার্ক ৭:২৪-৩০)।
২৪। দেকাপলিসে একজন কালা ও তোতলার নিরাময়লাভ (মার্ক ৭:৩১-৩৭)।
২৫। চার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষকে আহার দান (মথি ১৫:৩২-৩৯; মার্ক ৮:১-৯)।
২৬। বেথসাথায় একজন অন্ধের দৃষ্টিশক্তি লাভ (মার্ক ৮:২২-২৬)।
২৭। প্রভু যীশুর দিব্য রূপান্তর (মথি ১৭:১-১৩; মার্ক ৯:২-১৩; লুক ৯:২৮-৩৬)।
২৮। অপদূতগ্রস্ত বালকের নিরাময়লাভ (মথি ১৭:১৪-২১; মার্ক ৯:১৪-২৯; লুক ৯:৩৭-৪৯)।
২৯। মাছের মুখে রৌপ্যমুদ্রা (মথি ১৭:২৪-২৭)।
৩০। উদরীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির নিরাময়লাভ (লুক ১৪:১-৬)।
৩১। দশজন কুষ্ঠরোগীর নিরাময়লাভ (লুক ১৭:১১-১৯)।
৩২। জন্মান্ধের দৃষ্টিশক্তি লাভ (যোহন ৯:১-১২)।
৩৩। জেরিখো নগরের কাছে অন্ধের দৃষ্টিশক্তি লাভ (মথি ২০:২৯-৩৪; মার্ক ১০:৪৬-৫২; লুক ১৮:৩৫-৪৩)।
৩৪। মৃত লাজারকে জীবনদান (যোহন ১১:১-৪৪)।
৩৫। একটি ডুমুর গাছ শুকিয়ে যায় (মথি ২১:১৮-২২; মার্ক ১১:১২-১৪)।
৩৬। মহাযাজকের চাকরের কান সুস্থ করে দেওয়া (লুক ২২:৪৯-৫১)।
শিষ্যচরিত গ্রন্থে বলা হয়েছে: 'আপনারা তো জানেন, নাজারেথের সেই যে যীশু, পরমেশ্বর তাঁকে অভিষিক্ত
করেছিলেন পবিত্র আত্মার অধিষ্ঠানে, ঐশ শক্তির অভ্যঞ্জনে। পরমেশ্বর তাঁর সঙ্গে ছিলেন বলেই তিনি নানা জায়গায় ঘুরে মানুষের মঙ্গল সাধন করে গেছেন। আর, শয়তানের কবলে নিপীড়িত হচ্ছিল যারা, সেই সব মানুষকে তিনি সুস্থও করে গেছেন' (শিষ্য ১০:৩৮)।
প্রভু যীশুর আশ্চর্য কাজ বর্তমান জগতেও বিভিন্নভাবে ঘটছে। বিশ্বাসের চোখে তাকালে আমরা অবশ্যই সেগুলো দেখতে পাব। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বাসপূর্ণ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনে আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সাধুসাধ্বীদের মধ্য দিয়ে আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। চিকিৎসকের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের শক্তিতেই আশ্চর্য কাজ ঘটছে। প্রকৃতির মধ্যেই তিনি সুস্থতাকারী বা নিরাময়কারী শক্তি দিয়ে রেখেছেন।
| কাজ: ১। তোমার জীবনে ঘটেছে বা অন্যের জীবনে ঘটতে দেখেছ এমন একটি আশ্চর্য ঘটনার কথা দলের সকলের সাথে সহভাগিতা কর। কাজ: ২। উল্লেখিত আশ্চর্য কাজের যে কোন একটির ছবি অংকন কর। |
প্রভু যীশু যে আশ্চর্য কাজগুলো করেছেন, সেগুলোর মধ্য দিয়ে দুটি প্রধান বিষয় প্রকাশিত হয়েছে:
ক) প্রথমটি হলো: যীশু খ্রীষ্ট হলেন ঈশ্বর এবং
খ) দ্বিতীয়টি হলো: পিতা ঈশ্বর তাঁকে একটি বিশেষ কাজ করার জন্য প্রেরণ করেছেন।
ঈশ্বরের বিভিন্ন আশ্চর্য কাজ সম্পর্কে পূর্ব থেকেই ইহুদিদের ধারণা ছিল। কিন্তু প্রভু যীশুর কাজগুলো দেখে তাঁরা বিস্মিত হয়ে যেত। তারা বলত যে তারা আগে কখনো এ রকম ঘটনা দেখেনি। এতেই আমরা বুঝি, প্রভু যীশুর আশ্চর্য কাজগুলোর বিশেষ কিছু ভিন্ন রকম বৈশিষ্ট্য ছিল। সেগুলো আমাদেরও জানা দরকার।
বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
আমরা লক্ষ করি, প্রভু যীশু খ্রীষ্ট আশ্চর্য কাজগুলো করার পূর্বে পিতা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন। তিনি তাঁকে প্রশংসা ও ধন্যবাদ দিয়ে কাজটি শুরু করতেন। উদাহরণস্বরূপ, আশ্চর্যভাবে পাঁচ হাজার লোককে খাওয়ানোর পূর্বে তিনি উপরের দিকে তাকিয়ে পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এরপর লোকদের হাতে খাবারগুলো তুলে দিয়েছেন। একবার একটি অপদূতগ্রস্ত বালককে যীশুর শিষ্যদের কাছে আনা হয়েছিল। শিষ্যগণ তাকে নিরাময় করতে পারেননি। কিন্তু যখন তাকে যীশুর কাছে আনা হলো, তখন তিনি তাকে নিরাময় করলেন। শিষ্যদের তিনি বললেন, এ ধরনের অপদূতগ্রস্তদের নিরাময় করার জন্য প্রয়োজন হয় প্রার্থনা ও উপবাস।
যারা যীশুর কাছে এসে নিরাময় লাভ করত, তাদের অনেককেই তিনি ফিরে গিয়ে যাজককে দেখাতে বলতেন; তাদেরকে বলতেন নৈবেদ্য উৎসর্গ করে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে। উদাহরণস্বরূপ, একজন কুষ্ঠরোগীকে নিরাময় করে তিনি বললেন, যাজকের কাছে গিয়ে নিজেকে দেখাও, আর তুমি যে সেরে উঠেছ, তার জন্য তুমি এবার মোশী যেমন নির্দেশ দিয়ে গেছেন, সেইমতো নৈবেদ্যও উৎসর্গ কর। সবাই জানুক, তুমি এখন রোগমুক্ত।
প্রভু যীশু খ্রীষ্ট আশ্চর্য কাজ করতে গিয়ে তাঁর মানবীয় দিকটি প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ প্রেম, দরদবোধ, মমতা, সহানুভূতি, ক্ষমা প্রভৃতি মনোভাব জেগে উঠতো। তিনি অন্ধ, খঞ্জ, কুষ্ঠরোগী, অপদূতগ্রস্ত, অবশরোগী এবং এধরনের রোগী দেখলে তাদের জন্য অবশ্যই কিছু করতেন। রোগী-বাড়ি থেকে কেউ এসে তাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলে তিনি অবশ্যই তাদের সাথে যেতেন। কেউ অন্য কোনো সমস্যা নিয়ে এলেও তিনি তাদের সাথে আলাপ করতেন। পাপীদের বাড়ি গিয়ে তিনি তাদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করে তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনতেন। লাজারের মৃত্যুতে তিনি কেঁদেছেন। নাইন নগরের বিধবা মায়ের কান্না দেখে তিনি তার মৃত ছেলের জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন।
কথায় বলে বিশ্বাসে পরিত্রাণ। প্রভু যীশুর আশ্চর্য
কাজগুলোর ব্যাপারেও তা-ই ঘটেছে। কাজগুলো করার পূর্বে তিনি আগে যাচাই করে দেখেছেন অসুস্থ ব্যক্তি বা তার আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে গভীর বিশ্বাস আছে কি না। অর্থাৎ তারা তাঁর উপর পূর্ণ আস্থা রাখছে কি না। বিশ্বাস ও আস্থার পরিচয় পেলে তিনি তাদের সুস্থ করেছেন। যেখানে বিশ্বাসের অভাব বোধ হয়েছে, সেখানে তিনি আশ্চর্য কাজ করেননি। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর নিজের গ্রাম নাজারেথে তিনি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস দেখেননি। তাই সেখানে তিনি আশ্চর্য কাজ করেননি। সুস্থ করার পর তিনি বলতেন, তোমার বিশ্বাস তোমাকে সুস্থ করে তুলেছে।
যীশুর আশ্চর্য কাজের জন্য সব সময় রোগী বা সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিশ্বাস দরকার হয়নি। উদাহরণস্বরূপ শতানিকের চাকর তাঁর বাড়িতে অসুস্থ ছিল। কিন্তু যীশুর কাছে এসেছেন শুধু শতানিক। যীশু তাঁকে বললেন, আপনার চাকর সুস্থ হয়ে যাবে। আর সেই মুহূর্তেই তার বাড়িতে তার চাকরটি সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। কারণ শতানিকের বিশ্বাস খুবই গভীর ছিল।
প্রভু যীশু তার আশ্চর্য কাজ কখনো কোনো গোপন স্থানে একাকী করেননি। তিনি সেগুলো করেছেন সবার সামনে, সমাজগৃহে বা জনসমাবেশে। এ কারণে তাঁকে অনেকবার সমাজ নেতা ও ফরিসিদের বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে। তবে মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গী হিসেবে শুধু কিছু বাছাই করা ব্যক্তিকে সঙ্গে করে নিয়েছেন। যেমন- কয়েকটি আশ্চর্য কাজের সময় তিনি পিতর, যাকোব ও যোহনকে এবং এর সাথে অসুস্থ ব্যক্তির মা-বাবাকে সাথে রেখেছেন।
প্রভু যীশু খ্রীষ্টের আশ্চর্য কাজগুলোর মধ্যে বিভিন্নতা ছিল। তিনি বিভিন্ন রকমের অসুস্থ ব্যক্তিদের সুস্থ করেছেন। প্রকৃতির উপর যে তাঁর আধিপত্য ছিল তা-ও তাঁর আশ্চর্য কাজের মধ্যে দেখা গেছে। তিনি ধমক দিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে ঝড় থামিয়েছেন ও জলের উপর দিয়ে হেঁটেছেন। অপদূতে ধরা লোকদের তিনি নিরাময় করেছেন। পাগলদেরও তিনি সুস্থ করেছেন। বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা আশ্চর্যভাবে নিরাময় করেছেন। আবার বিভিন্ন ধরনের অপদূতে পাওয়া ব্যক্তিকে আশ্চর্যভাবে স্বাভাবিক করে তুলেছেন। এই রকম নানা ধরনের আশ্চর্য কাজ তিনি করেছেন।
প্রভু যীশু তাঁর আশ্চর্য কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় মুখের কথা ব্যবহার করেছেন। আবার অসুস্থ ব্যক্তিকে স্পর্শ করেছেন বা মুখের থুতু ব্যবহার করে আশ্চর্যভাবে নিরাময় করেছেন। যখন যে রকম করা দরকার ছিল তিনি পরিস্থিতি অনুসারে তাই করেছেন।
যীশুর আশ্চর্য কাজগুলো শুধু ইহুদিদের জন্যই ছিল না। এর বাইরে থেকেও যারা আসত তাদের জন্য তিনি দয়া দেখিয়েছেন। শতানিক ইহুদি ছিলেন না। তবে যীশুর উপর তাঁর বিশ্বাস ও আস্থা ইহুদিদের চাইতেও গভীর ছিল। আর একবার এক অনিহুদি মা তার মেয়ের জন্য যীশুর কাছে এসে মেয়ের সুস্থতার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। যীশু প্রথমে তাঁর বিশ্বাস পরীক্ষা করার জন্য বললেন যে তাঁকে শুধু ঈশ্বরের মনোনীতদের জন্যই পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ঐ নারীর বিশ্বাস দেখে তিনি আশ্চর্য হলেন ও তাঁর মেয়েকে নিরাময় করলেন।
যীশুর আশ্চর্য কাজগুলো নিয়ে বিশ্বাসপূর্ণ আলোচনা করা দরকার। এর মাধ্যমে আমাদের প্রত্যেকের মনে যীশুর প্রতি বিশ্বাস আরও বেড়ে উঠবে। বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে আমরাও আমাদের জীবনে যীশুর আশ্চর্য কাজ দেখতে পাব।
| কাজ: পাঁচজন করে দলে বিভক্ত হও। তোমার প্রিয় যীশুর যেকোনো একটি আশ্চর্য কাজ শ্রেণিকক্ষে দলভিত্তিক অভিনয় করে দেখাও। |
যীশু একদিন নাইন নগরে গেলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর শিষ্যরাও ছিলেন এবং সেই সঙ্গে ছিল আরও অনেক লোক। তিনি যখন নগরদ্বারের খুব কাছাকাছি এসেছেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন, এক মৃত লোককে কবর দেবার জন্য বহু লোক নগরের বাইরে আসছে। যে মারা গেছে, সে তার মায়ের একমাত্র ছেলে, আর তার মা হলেন বিধবা। বিধবা মা মৃত ছেলের জন্য আকুলভাবে কান্নাকাটি করছিল। এই বিধবাটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নগরের আরও অনেক লোক আসছে। এই করুণ দৃশ্য দেখে যীশুর অন্তর করুণায় ভরে উঠল। যীশু তখন তাকে বলেন, 'মা, তুমি কেঁদো না'। এর পর এগিয়ে গিয়ে তিনি খাটুলিটার উপর হাত রাখলেন। আর যারা তাকে বহন করছিল, তারা তখন থেমে গেল। যীশু এবার বললেন, 'যুবক, আমি তোমাকে বলছি, ওঠ।' আর সঙ্গে সঙ্গে মৃত যুবকটি উঠে বসল আর কথা বলতে লাগল। এরপর যীশু যুবকটিকে তার মায়ের হাতে তুলে দিলেন। সবাই কেমন যেন ভয় পেয়ে গেল। তারা তখন ঈশ্বরের বন্দনা করে বলতে লাগল, 'আমাদের মধ্যে একজন মহান প্রবক্তা আবির্ভূত হয়েছেন।' এ ছাড়া তারা আরো বলতে লাগল যে, ঈশ্বর তাঁর আপন জাতিকে আজ দেখা দিয়ে গেলেন। ফলে যীশুর কথা সেই অঞ্চলের সবার মুখে ছড়িয়ে পড়ল।
ঘটনার ব্যাখ্যা: এই ঘটনাটির মধ্য দিয়ে আমরা নিম্নোক্ত বিষয়গুলো দেখতে পাই:
মানুষের দুঃখ-বেদনার সবচেয়ে করুণ চিত্রটি এখানে ফুটে উঠেছে। বিধবা মা তাঁর একমাত্র যুবক ছেলেকে হারিয়েছে। পৃথিবীতে এখন তাঁর দেখাশোনা করার আর কেউ নেই। এই বিধবা মা এখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব, অসহায় ও একাকী। তিনি যে কী পরিমাণ দুঃখ পেয়েছিলেন তা আমরাও বুঝতে পারি। বিধবা মায়ের সাথে গ্রামের আরও লোকজন কান্নাকাটি করছিল। কিন্তু বিধবার ছেলেকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো ক্ষমতা তাদের কারও ছিল না।
পৃথিবীর অসহায় ও নিঃস্ব মানুষের দুঃখ-বেদনার প্রতি যীশুর যে কত গভীর সমবেদনা ছিল তা আমরা বুঝতে পারি। ছেলেহারা মায়ের কান্না দেখে যীশুর অনেক মমতা হলো। তিনি তাদের কাছে গেলেন। মৃতদেহ বহনকারীরা থামল। তিনি খাটিয়াটি স্পর্শ করে বললেন, যুবক, আমি তোমাকে বলছি, ওঠ। আর সঙ্গে সঙ্গে মৃত যুবকটি জীবিত হয়ে গেল। কান্নারত মাকে যীশু এভাবে সান্ত্বনা দিলেন।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই, যীশুর ঐশ্বরিক শক্তির প্রকাশ। তিনি ঈশ্বর। তিনি মানুষকে জীবন দেন। আবার তাঁর শক্তি মৃত্যুর উপরও আছে। মৃত্যু সব মানুষের জীবনে একদিন আসে। তাকে এড়াবার শক্তি কোনো মানুষের নেই। সেই মৃত্যুর উপরও যীশুর ক্ষমতা আছে। তিনি সর্বশক্তিমান।
| কাজ: তোমার আত্মীয়স্বজন বা পাড়ার কেউ মারা গেলে তুমি কীভাবে তাদের প্রতি সমবেদনা দেখাতে ও সান্ত্বনা দিতে পার তা দলে সকলের সাথে সহভাগিতা কর। |
শূন্যস্থান পূরণ কর:
১. আশ্চর্য কাজকে ………………… কাজও বলা হয়।
২. মরুভূমিতে তিনি ইস্রায়েল জাতির লোকদের স্বর্গ থেকে ………………… দিয়েছিলেন।
৩. বিশ্বাসপূর্ণ ………………… মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনে আশ্চর্য ঘটনা ঘটে।
8. প্রভু যীশু খ্রীষ্ট আশ্চর্য কাজটি করতে গিয়ে তাঁর ………………… দিকটি প্রকাশ করেছেন।
৫. বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে ………………… আমাদের জীবনে যীশুর আশ্চর্য কাজ দেখতে পাব।
বাম পাশের বাক্যাংশের সাথে ডান পাশের বাক্যাংশের মিল কর:
| বাম পাশ | ডান পাশ |
১. যীশু খ্রীষ্টের কাজগুলোর মধ্যে ২. প্রভু যীশুর আশ্চর্য কাজগুলোর বিশেষ ৩. পাথরের মধ্য থেকে পানি ৪. যীশু খ্রীষ্ট হলেন ৫. বিশ্বাসে |
|
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১. 'অলৌকিক কাজ কী-
ক. ঈশ্বরের শক্তিতে সম্পাদিত কাজ
খ. মানুষের চোখে ধাঁধা লাগানো কাজ
গ. মানুষের শক্তিতে সম্পাদিত কাজ
ঘ. যাদুকরের সম্পাদিত কাজ
২. যীশু আশ্চর্য কাজ করতেন কেন?
ক. তাঁর নিজের গৌরবের জন্য
খ. ঈশ্বরের গৌরবের জন্য
গ. মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রকাশের জন্য
ঘ. ঈশ্বরের গৌরব ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য
নিচের অনুচ্ছেদটি পড় এবং ৩ ও ৪ নং প্রশ্নের উত্তর দাও:
অপূর্ব পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষার পূর্বে তার পিতা-মাতা তাঁর জন্য বাড়িতে প্রার্থনাসভার আয়োজন করল এবং রবিবারে খ্রীষ্টযাগে প্রার্থনার জন্য ফাদারকে বিশেষ অনুরোধ জানাল। সবাই অপূর্বের জন্য বিশেষ প্রার্থনা ও আশীর্বাদ করল। সমাপনী পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে অপূর্ব ও তার পিতা-মাতা গ্রামের দরিদ্র ও বিধবাদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ করেন।
৩. পরীক্ষা উপলক্ষ্যে অপূর্বের পিতা-মাতা প্রার্থনার আয়োজন করল কেন?
ক. প্রার্থনা দ্বারা ভালো ফলাফল পাওয়া যায়
খ. প্রার্থনায় সুন্দর সমাজ গঠিত হয়
গ. প্রার্থনায় সহযোগিতার মনোভাব গড়ে উঠে
ঘ. প্রার্থনায় মনের দুর্বলতা কমে যায়
৪. কৃতকার্যতার পর অপূর্ব ও তার পিতা-মাতা দরিদ্র ও বিধবাদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ করেন-
i. গ্রামের লোকদের মন জয় করতে
ii. ঈশ্বরকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে
iii. ঈশ্বরের গৌরব প্রশংসা করতে
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii
সৃজনশীল প্রশ্ন
১. মেধাবী ছাত্র রক্তিম হঠাৎ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। রক্তিমের বাবা তার সুচিকিৎসার জন্য অনেক ডাক্তার দেখালেন কিন্তু সে ভালো হচ্ছিল না। নিরুপায় হয়ে তিনি ধর্মপল্লীর পালপুরোহিতের কাছে রক্তিমকে নিয়ে গেলেন। তিনি পালপুরোহিতকে অনুরোধ করেন যেন তিনি রক্তিমের সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেন। পালপুরোহিত রক্তিমের সুস্থতার জন্য ধর্মপল্লীর সকলকে একদিনের উপবাস ও প্রার্থনা করতে অনুরোধ করেন। ধর্মপল্লীর সকলের উপবাস, প্রার্থনা এবং ডাক্তারদের সুচিকিৎসায় রক্তিম সুস্থ হয়ে উঠল।
ক. যেকোনো আশ্চর্য কাজ করার পূর্বে যীশু কী করতেন?
খ. যীশুর আশ্চর্য কাজের মাধ্যমে কী কী প্রধান বিষয় প্রকাশিত হয়েছে?
গ. যীশুর মানবীয় কোন কাজের সাথে পালপুরোহিতের কাজের মিল খুঁজে পাওয়া যায় তা বর্ণনা কর।
ঘ. 'সবার প্রার্থনা, উপবাস ও সুচিকিৎসাই রক্তিমের সুস্থতার কারণ' বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকের আলোকে মূল্যায়ন কর।
২. পরশী স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল। স্কুলে যাওয়া আসা করতে তাকে একটি হাইওয়ে রাস্তা পার হতে হয়। রাস্তা পার হওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে একটি পিকআপ ভ্যান তাকে চাপা দিয়ে ফেলে রাখে। স্থানীয় লোকজন তাকে একটি হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা করলেও পরশী ভালো হচ্ছে না। এ অবস্থা দেখে তার পিতা-মাতা তাকে নিয়ে ব্রাদার নিউটনের কাছে গেলেন। ব্রাদার নিউটন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে পরশীকে সুস্থ করে তুললেন।
ক. যীশু নাইন নগরে কার ছেলেকে পুনর্জীবন দান করেন?
খ. মৃত ছেলেটিকে যীশু সুস্থ করতে পারলেন কেন?
গ. ব্রাদার নিউটনের মধ্যে যীশুর কোন গুণের প্রকাশ পেয়েছে তা পর্যালোচনা কর।
ঘ. 'ব্রাদার নিউটন হলেন যীশু খ্রীষ্টের মূর্তপ্রতীক' বিষয়টির সাথে তুমি কী মতামত পোষণ কর তা মূল্যায়ন কর।
সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন
১. যীশু খ্রীষ্ট ঐশরাজ্য প্রচারের জন্য কত বছর কাজ করেছেন?
২. আশ্চর্য কাজ বলতে কী বোঝায়?
৩. অলৌকিক কথার অর্থ কী?
8. যীশু আশ্চর্য কাজ করতেন কেন?
৫. আশ্চর্য কাজের প্রধান দুটি বিষয় কী কী?
বর্ণনামূলক প্রশ্ন
১. যীশুর আশ্চর্য কাজের বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা কর।
২. যীশু কীভাবে নাইন নগরে বিধবার মৃত ছেলেকে পুনর্জীবন দান করেছিলেন?
৩. যীশুর আশ্চর্য কাজগুলোর একটি তালিকা তৈরি কর।
Read more