আমাদের সমাজে বিভিন্ন মহৎপ্রাণ ব্যক্তি নানাভাবে জনহিতকর কাজ করে গেছেন এবং বর্তমানেও করছেন। আমরা মনে করি, সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল ও সার্থক। তবে প্রত্যেকের সেবার ধরন এক নয়। প্রিয়নাথ বৈরাগী একদিকে সার্থক পালক হিসেবে, আবার তাঁর সার্থকতা রয়েছে শিক্ষকতায়, সাহিত্যচর্চায়, পুস্তক অনুবাদে, রোগীদের জন্য বিশেষ প্রার্থনায়, সেবক সমিতি গঠন এবং লেখক হিসেবে। নিচে আমরা কয়েকটি দিক একটু বিস্তারিতভাবে দেখি।
প্রিয়নাথ বৈরাগী নামের সাথে গুরুজি সম্বোধনটি তাঁর ভক্তজনের কাছে ছিল শ্রদ্ধার ও সম্মানের। একজন গুণী মানুষকে তার শিল্পকর্মের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়। খ্রীষ্টীয় ও ভজনশীল সংগীতজগতে প্রিয়নাথের অবদান সম্পর্কে সবাই জানে। গুরুজি প্রিয়নাথ বৈরাগীর গান ও সুর আজও মানুষের হৃদয় কাঁদায়, চোখে জল আনে, পবিত্রতার আকাশে তারা জ্বল জ্বল করে, আঁধার রাতে পথ দেখায়, কাতর-শোকাতুর প্রাণে আনে সান্ত্বনা এবং দেখায় জীবন পথ।
খ্রীষ্টীয় সংগীতজগতে প্রিয়নাথ বৈরাগী উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৫৭ খ্রীষ্টাব্দের সময়টুকু পর্যন্ত যে অবদান রেখে গেছেন তা অপরিসীম। প্রভু যীশু খ্রীষ্টকে মুক্তিদাতা হিসেবে গ্রহণ করে খ্রীষ্টের অনুসারীদের হৃদয়-মনে গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা জাগিয়ে রাখার মাধ্যম হিসেবে যে সকল সংগীত তিনি রচনা ও সুর করেছেন, তা খ্রীষ্টান সমাজের জন্য এক বিরাট অবদান।
বড় ভাই উত্তম অকালে মৃত্যুবরণ করাতে প্রিয়নাথই তখন পরিবারের বড় সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরিবারের দুর্দিনে তাঁর একটা চাকরির ভীষণ প্রয়োজন ছিল। সুন্দরবনের কর বিভাগে তিনি যে চাকরিটা পেয়েছিলেন তা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সৎ ও নির্ভীক প্রিয়নাথের জীবনে ন্যায়, সততা ও বিবেকবোধ নাড়া দিয়ে ওঠে। ঐ চাকরিতে অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর বাড়ি, গাড়ি ও অগাধ সহায়-সম্পত্তির মালিক হওয়ার মতো লোভনীয় সুযোগ ছিল। কিন্তু এসব তাঁকে আকর্ষণ করতে পারেনি। তিনি প্রকৃত খ্রীষ্ট বিশ্বাসীর উদাহরণ হিসাবে লোভ-লালসা পরিহার করে চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। এভাবে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন।
খ্রীষ্ট বিশ্বাসী প্রিয়নাথ সুশিক্ষিত ও বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে চলে যান ভারতের শ্রীরামপুর। সেখানে শ্রীরামপুর কলেজ থেকে ধর্মতত্ত্বের উপর উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেন। ধর্মতত্ত্বে ডিগ্রি গ্রহণকালীন তার আগ্রহ, ইচ্ছা ও বহুমুখী গুণ এবং প্রতিভার ছাপ লক্ষ করা যায়। ফলে মিশনারি কর্তৃপক্ষ তাঁকে পালক হিসাবে নিয়োগ দেন। একজন আধ্যাত্মিক পালক হিসেবে তাঁর বাণী প্রচারের সুনাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মণ্ডলীর সকল লোক তাঁর সংগীতের ভক্ত হয়ে পড়ে। যুবক-যুবতীরা দল বেঁধে আসত তাঁর গান শুনতে। এই সময়েই তাঁর লেখা গান ও সুর করা গান সকলের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মণ্ডলীর কাজ করার সময় কর্তৃপক্ষ ও তাঁর মায়ের অনুরোধে ইছাময়ীকে বিয়ে করেন। ইছাময়ী তখন ছিলেন মিশন স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী। স্ত্রী হিসেবে তিনি ছিলেন অসাধারণ। প্রিয়নাথ বৈরাগীকে খ্রীষ্টের বাণী প্রচারে তিনি সার্বক্ষণিক সাহায্য করতেন। ১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি শ্রীরামপুর থেকে চলে আসেন নিজ গ্রাম ইন্দুরকানিতে। সুসমাচার প্রচারে আবার তাঁর ডাক আসে। তিনি চলে যান ভারতের রাজস্থানে। কিছুদিন প্রচার করার পর সেখানকার আবহাওয়ায় খাপ খাওয়াতে না পারায় তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। পরে তিনি আবার নিজ গ্রামে চলে আসেন।
ভারতের রাজস্থান থেকে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে এলেন। এবার তাঁর ডাক পড়ল গৌরনদী ক্যাথলিক মিশনে অনুবাদকের কাজ করার জন্য। সুশিক্ষিত ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হিসেবে সেই সময়ে প্রিয়নাথ বাবুর খ্যাতি ও যশ ছিল মানুষের মুখে মুখে। গৌরনদীতে তিনি পবিত্র বাইবেল থেকে ঈশ্বরের বাণী অনুবাদ করেছেন। এছাড়া বাইবেল বিষয়ক অনেক মূল্যবান পুস্তকও তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন। এভাবে গৌরনদী ক্যাথলিক মিশনে তিনি অনেক মূল্যবান পুস্তক বাংলায় অনুবাদ করেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি সংগীত লেখা ও তাতে সুর করার কাজ চালিয়ে যান। মাঝে মাঝে তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও প্রার্থনাসভা পরিচালনা করেন। তাঁর নেতৃত্ব ও পরিচালনায় সবার মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হয় এবং সন্ধ্যাবেলায় তাঁর বাসায় গানের আসর বসত। সমবেত ভক্তদের তিনি নতুন নতুন গান শেখাতেন।
প্রিয়নাথ বৈরাগীর মিষ্টি-মধুর কথা এবং অমায়িক ব্যবহার ছিল সবাইকে কাছে টানার এক যাদুকরী মাধ্যম। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অনেক লোক তাঁর কাছে ছুটে আসত। কেউ প্রার্থনার অনুরোধ নিয়ে, কেউ বা আসত অর্থ সাহায্যের জন্য। তিনি গরিব-দুঃখী সবার জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রেখেছেন। সানন্দে এগিয়ে এসেছেন মানুষের সাহায্যে। কথিত আছে যে, তিনি তাঁর বেতনের টাকা থেকে দুঃখী দরিদ্রদের সাহায্য করেছেন।
১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দে প্রিয়নাথ ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন। সে সময় ঢাকা ও কলকাতা বেতারে বড়দিন ও পুণ্য সপ্তাহে খ্রীষ্টীয় সংগীত, গীতি আলেখ্য এবং নাটিকা পরিবেশন করা হতো। আর এ কাজে দক্ষ প্রিয়নাথের উপর গুরুদায়িত্ব ছিল তাঁর সফল বাস্তবায়নের কাজ। ঢাকায় থাকাকালীন তিনি বেশ কয়েকবার বেতারে খ্রীষ্টধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। জীবনের শেষ দিকে প্রিয়নাথ শ্রীরামপুরে বদলি হয়ে যান। সেখানে তাঁকে খ্রীষ্টীয় সাহিত্যবিষয়ক কর্মে নিযুক্ত করা হয়। ধর্মীয় নাটক লেখক হিসেবে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। তাছাড়া কবিতা, গল্প, কবিগানও তিনি রচনা করেন। তাঁর কর্মের ডালি বিশ্লেষণ করলে খুব সহজে বলা যায়, তিনি বড়মাপের একজন সাহিত্যিক ছিলেন।
প্রার্থনাশীল মানুষ হিসাবে ঈশ্বরভক্ত প্রিয়নাথ জীবনের শেষ সময়টুকু কাটিয়েছেন। মৃত্যুর আগে তিনি কলকাতার শ্রীরামপুরেই ছিলেন। অবশেষে ১৯৫৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর ভোর রাতে ঈশ্বরের সেবক প্রিয়নাথ বৈরাগী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তিনি আমাদের মাঝে সশরীরে নেই। তবে তাঁর প্রতিটি গানের বাণী ও সেবাকর্মের মধ্যে তিনি জীবন্ত রয়েছেন।
| কাজ: প্রিয়নাথ বৈরাগীর সেবাকর্মগুলোর মধ্যে প্রধানত কোনটি তুমি অর্জন করতে চাও এবং কীভাবে, তা লেখ। |