সৃষ্টজীবের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (পাঠ ৩)

ঈশ্বরের সৃষ্টিকর্মের উদ্দেশ্য - খ্রীষ্টধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

156

সৃষ্টি করেই ঈশ্বর তাঁর কাজ শেষ করেননি। এই সৃষ্টিকে তিনি প্রতিনিয়ত রক্ষা করেন। সৃষ্টির সবকিছুই পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত ও নির্ভরশীল। সূর্য, চাঁদ, তারা, নক্ষত্র, জীবজন্তু, পাহাড়পর্বত, সমুদ্র, নদীনালা, মাটি, বায়ু, প্রকৃতি ইত্যাদি সবই একে অপরের পরিপূরক। একটি ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। প্রকৃতি ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। আবার প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার ও যত্নের জন্য মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সৃষ্টিলগ্ন থেকেই ঈশ্বর ও মানুষের মাঝে একটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। অন্যদিকে মানুষ ও অন্যান্য সমস্ত সৃষ্টির মাঝেও একটা পারস্পরিক সম্পর্ক ও নির্ভরশীলতা রয়েছে। শুধু তাই নয়, সব সৃষ্টিই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এর কয়েকটি উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করা যাক।

৩.১ সূর্যের আলোতে সব সৃষ্টিই প্রাণবন্ত ও সজীব হয়। গাছপালা, শাকসবজি, ফসলাদি বেড়ে উঠে। সূর্যের আলোতে সমুদ্র ও জলাশয়ের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে ওঠে। এরপর তা মেঘ হয়ে বৃষ্টির আকারে পৃথিবীতে নেমে আসে।

সেই বৃষ্টির পানি আবার ভূমির উর্বরতা বাড়ায়, সবকিছুর মধ্যে একটা সজীবতা আনে। মানুষের দেহের জন্য সূর্যের আলো শক্তি যোগায় ও স্বাস্থ্য ভালো রাখে। শীতের সময় সূর্যের আলো আমাদের উষ্ণতা দান করে। এমনকি রাতের বেলায় আমরা চাঁদের যে আলো পাই, তা-ও সূর্যের কাছ থেকে ধার করা।

৩.২ মানুষের সাথে আমরা কত কিছুর সম্পর্কই না দেখতে পাই! আমাদের চারিদিকে অনেক গাছপালা রয়েছে। সেগুলো থেকে বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন, দৈনিক খাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ, ঔষধ, জ্বালানি কাঠ, আসবাবপত্র ইত্যাদি পাই। লতাপাতা, ঘাস, খড় ইত্যাদি খেয়ে প্রাণী বাঁচে এবং সেই প্রাণীরা আমাদের উপকার করে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য গাছপালা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
৩.৩ কোনো কোনো পোকা আমাদের বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি করে। কিন্তু পাখিরা সেই পোকাগুলো খেয়ে জীবন ধারণ করে। এভাবে আমাদের ফসলগুলো পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। আর আমরা আনন্দের সাথে ফসলগুলো ঘরে তুলে আনি। ধানক্ষেতে প্রায়ই দেখা যায় ইঁদুর গর্ত করে এবং ধান কেটে নিয়ে যায়। কিন্তু সাপ এসে যদি ইঁদুরের গর্তে ঢোকে তখন গর্ত ছেড়ে ইঁদুর পালিয়ে যায়। তাতে আমাদের ফসল রক্ষা পায়।
৩.৪ প্রকৃতির সবকিছুতেই ঈশ্বর বিরাজমান। সবকিছুতেই তাঁর জীবনীশক্তি আছে। প্রকৃতির দান খাবার ও পানীয় গ্রহণ করে আমরা জীবন ধারণ করি। সেই খাবার ও পানিতে ঈশ্বর জীবনীশক্তি দিয়েছেন। খাদ্য ও পানীয়ের মধ্য দিয়ে আমরা ঈশ্বরকে আমাদের জীবনে গ্রহণ করি। কাজেই আমাদের জীবনের সাথে সম্পর্কিত খাদ্য, পানীয় ও বাতাস সবকিছুর মধ্যে ঈশ্বর আছেন।
৩.৫ নানা রকম পাখি, প্রজাপতি, ফড়িং আমাদের প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। পাখিদের দেখে ও তাদের মধুর গান শুনে আমরা আনন্দ পাই। কোকিল, দোয়েল, মাছরাঙা, কবুতর, ঘুঘু এবং এরকম হরেক রকমের পাখি, প্রজাপতি ইত্যাদির কথা আমরা নানা গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও নাটকে দেখতে পাই। কাক ও শকুনেরা অনেক পচা জিনিস, ময়লা ইত্যাদি খেয়ে আমাদের পরিবেশ পরিষ্কার রাখে।
৩.৬ প্রকৃতির বিচিত্র ফুল সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং মনে বৈচিত্র্য ও আনন্দ আনে। উপাসনায় আমরা ফুল দিয়ে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে হৃদয়ের ভক্তি নিবেদন করি। ফুল দিয়ে আমরা সাজসজ্জা করি, অতিথি বরণ করি, শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই, ফুলের সুরভিতে আমাদের মন পুলকিত হয়। ফুল থেকে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে এবং সেই মধু আমরা খাদ্য ও অনেক সময় ঔষধ হিসেবে গ্রহণ করি। ফুলের সৌন্দর্য ও পবিত্রতা আমাদের সকলের মন আকৃষ্ট করে।

এভাবে সৃষ্টিগুলোর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও যোগাযোগ দেখতে ও তা বুঝতে পেরে আমরা পরিতৃপ্তি ও আনন্দ পাই। এর জন্য আমাদের দরকার প্রজ্ঞা ও আস্থাশীলতা। প্রজ্ঞাপুস্তকে বলা হয়েছে: 'কেননা যা- কিছু আছে, তুমি সেই সব ভালোবাস; যা-কিছু গড়েছ, সেগুলোর তুমি কিছুই ঘৃণা কর না। যেহেতু কোনো কিছুর প্রতি যদি তোমার ঘৃণা থাকত, তা তুমি গড়তে না! তুমি ইচ্ছা না করলে কেমন করেই বা কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকতে পারবে? অস্তিত্বের উদ্দেশে তোমার আহ্বান না থাকলে তা কেমন করেই বা বেঁচে থাকবে? তুমি বরং সবকিছু বাঁচাও, কারণ, হে জীবনপ্রেমিক প্রভু, সবই তোমার' (প্রজ্ঞা ১১:২৪-২৬)।

কাজ: তুমি কোন কোন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরকে গ্রহণ করছ তা প্রথমে নিজের খাতায় লেখ এবং পরে দলের অন্যদের সাথে সহভাগিতা কর।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...