আহ্বান কথার অর্থ হলো ডাক। ঈশ্বর অদৃশ্য হলেও মানুষের সাথে তাঁর একটা অন্তরের যোগাযোগ আছে। তিনি মানুষকে দেহ, মন ও আত্মা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের দেহটা দেখা যায়, কিন্তু তার মন ও আত্মা দেখা যায় না। সেই অদৃশ্য মন ও আত্মা দিয়ে মানুষ ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। প্রার্থনা ও নীরব ধ্যানের মাধ্যমে সে ঈশ্বরের কথা শুনতে পায়। মানুষের অদৃশ্য মন ও আত্মার মধ্যে বিবেক বলে একটা শক্তি বা ক্ষমতা ঈশ্বর দিয়েছেন। সেই বিবেক দ্বারা বিবেচনা করে সে ঈশ্বরের ডাকে সাড়া দিবে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ঈশ্বর মানুষকে ডাকেন মানুষের মতো মানুষ হতে, প্রকৃত খ্রীষ্টান হতে এবং বিশেষ জীবনে প্রবেশ করতে। এই পাঠে আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করি।
ঈশ্বর আমাদেরকে মানব পরিবারে জন্ম দিয়েছেন। আমাদের সকলেরই দেহ, মন ও আত্মা আছে। দেহের মধ্যে যেসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকার কথা তার সবই আছে। তবুও আমাদেরকে ঈশ্বর মানুষ হওয়ার জন্য ডাকেন। এর অর্থই কী? আমাদের মা-বাবাও অনেক সময় আমাদেরকে বলেন, 'মানুষ হও'। তারা এর দ্বারা কী বুঝাতে চান তা আমরা জানি। তাঁরা আমাদেরকে মানবিক গুণ ও মূল্যবোধগুলো অর্জন করতে বলেন। ঈশ্বর আমাদের সামনে উদাহরণ হিসেবে তাঁর পুত্র যীশুকে রেখেছেন। যীশু একই সঙ্গে পূর্ণ ঈশ্বর এবং পূর্ণ মানব। যীশুর মধ্যে মনুষ্যত্বের সবগুলো গুণ ছিল। আমরা তাঁকে অনুসরণ করলে খাঁটি মানুষ হতে পারি। অর্জিত গুণ ও মূল্যবোধগুলো আমরা যতই অপরের কল্যাণে ব্যবহার করি, ততই আমরা দিন দিন 'মানুষের মতো মানুষ' হতে থাকি।
আমরা ঈশ্বরের কাছ থেকে দ্বিতীয় একটি আহ্বান পেয়েছি। সেটি হলো খ্রীষ্টান বা খ্রীষ্টের অনুসারী হওয়ার আহ্বান। খ্রীষ্টান পরিবারে জন্ম নিলেই এবং দীক্ষাস্নানসহ অন্যান্য সাক্রামেন্তগুলো গ্রহণ করলেই একজনকে খ্রীষ্টান বলা যায় না। যেমন করে আমাদের মা-বাবা আমাদেরকে মানুষ হতে বলেন, তেমনি আমাদেরকে দিনে দিনে খ্রীষ্টান হতে হবে। খ্রীষ্টান বা খ্রীষ্টের অনুসারী হতে হলে আগে খাঁটি মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হবে। খাঁটি মনুষ্যত্বের গুণগুলো আয়ত্ত করতে না পারলে আমরা খাঁটি খ্রীষ্টানও হতে পারি না। যতই আমরা ধীরে ধীরে মানুষের মতো মানুষ হবো ততই আমরা খাঁটি খ্রীষ্টান হবো। খ্রীষ্টকে অনুসরণ করার মাধ্যমে আমরা প্রকৃত খ্রীষ্টান হওয়ার আহ্বানে সাড়া দিতে পারি।
যারা খাঁটি মানুষ ও খাঁটি খ্রীষ্টান হতে পারে, তাদের মধ্য থেকে ঈশ্বর কাউকে কাউকে বিশেষ আহ্বান দিয়ে থাকেন। যেমন কেউ কেউ ঈশ্বরের আহ্বান পায় যাজক, পালক, ব্রাদার, সিস্টার, কাটেখিস্ট হওয়ার জন্য। এগুলোকে বিশেষ আহ্বান বলা হয় এই কারণে যে এই ধরনের জীবনের জন্য ঈশ্বর মানুষকে তাঁর বাণী প্রচার করার জন্য আহ্বান করেন। পবিত্র বাইবেলে আমরা এ রকম অনেক মানুষকে বিশেষ আহ্বান পেতে দেখেছি। তাঁদের কয়েকজনের নাম আমরা উল্লেখ করতে পারি। যেমন: আব্রাহাম, মোশী, এলিয়, ইসাইয়া, দানিয়েল, রুথ, এসথের, দেবোরা, দীক্ষাগুরু যোহন, মারীয়া, আন্না, মারীয়া মান্দালেনা, পিতর, পল এবং আরও অনেকে। যাঁরা ঈশ্বরের বিশেষ আহ্বান পেয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই খাঁটি মানুষ ও ঈশ্বরভক্ত ছিলেন।
বিশেষ আহ্বানের ব্যাপারে আমাদের মনে রাখা দরকার:
ক) ঈশ্বরের আহ্বান মানুষের জন্য একটি অত্যন্ত গৌরবজনক বিষয়। এই আহ্বানটি এতই গৌরবজনক যে এটি আসে ঈশ্বরের কাছ থেকে।
খ) কোনো একটি বিশেষ কাজ করার উদ্দেশ্যে ঈশ্বর এই আহ্বান করেন। তিনি একটি কাজ দিয়ে আহূত ব্যক্তিকে পাঠান।
গ) আহূত ব্যক্তিদের মনে রাখতে হবে যে ঈশ্বর তাদের ডেকেছেন ঈশ্বরের ও মানুষের সেবা করার জন্য, সেবা পাবার জন্য নয়।
ঘ) বিশেষ আহ্বান যারা পায়, তাদের অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সমালোচনা ও অপবাদ সহ্য করতে হয়। তাঁদের অনেক ত্যাগস্বীকার করতে হয়। কখনো কখনো তাদের শারীরিক নির্যাতনও সহ্য করতে হয়।
ঙ) ঈশ্বর যাঁকে ডাকেন ও বিশেষ কাজের জন্য পাঠান তাঁকে ঐ কাজটি করার জন্য প্রয়োজনীয় গুণও দেন। কাউকে তা নিজের ব্যবহারের জন্য দেন না। যে যে-গুণ পেয়েছে, তা দিয়ে সে মণ্ডলী, সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করবে, এটাই ঈশ্বর চান।
বিশেষ আহ্বানে আহূত ব্যক্তিদেরকে অবশ্যই খাঁটি মানুষ ও খাঁটি খ্রীষ্টান হতে হবে। এরপর ঈশ্বর যদি চান তবে তিনি তাঁর বিশেষ কাজের জন্য আমাদেরকে বিশেষ আহ্বান করতেও পারেন। এই আহ্বানে সাড়া দেবার জন্য আমাদেরকে প্রতিদিনই ঈশ্বরের ডাক শুনতে হবে। প্রার্থনা, ধ্যান, বিভিন্ন ঘটনা, ঈশ্বরের বাণী ও বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বই পড়া, বিভিন্ন আদর্শ ব্যক্তিদের জীবন ও পরামর্শ আমাদের এ বিষয়ে সহায়তা করতে পারে।