আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি, ঈশ্বর অদৃশ্য। তাঁর দেহ নেই, আছে শুধু আত্মা। কিন্তু আমাদের আছে দেহ, মন ও আত্মা। ঈশ্বর মানুষের কোন অংশটুকু তাঁর নিজের প্রতিমূর্তিতে বা নিজের মতো করে গড়েছেন? তিনি নিজের মতো করে আমাদের দেহ ও মনের মধ্যে আত্মা দিয়েছেন। এবার আমরা বলতে পারি, আমাদের আত্মা হলো ঈশ্বরের মতো। এর অর্থ, আমরা আমাদের অন্তরে ঈশ্বরের কিছু কিছু গুণ পেয়েছি। সেই গুণগুলো কী?
ঈশ্বর নিজেই ভালোবাসা। তিনি ভালোবাসেন বলেই মানুষ এবং বিশ্বের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাদের খুব ভালোবাসেন। তিনি আমাদের মধ্যেও সেই ভালোবাসার গুণটি দিয়েছেন। তাই আমরা মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী, গরিব-দুঃখী, অসুস্থ ও অসহায় মানুষদের ভালোবাসি। আমরাও ইচ্ছা করলে ঈশ্বরের মতো নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারি।
আমরা বলতে পারি, মানুষের মধ্যে সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের সৃজনশীল গুণ আছে। সেই কারণে মানুষ সৃজনশীল চিন্তা ও কাজ করতে পারে। নতুন ধারণা প্রকাশ করতে পারে। নতুন নতুন শিল্প সৃষ্টি করতে পারে। অনেক নতুন যন্ত্রপাতি, জীবন রক্ষাকারী ঔষধ, আরও অনেক কিছু আবিষ্কার করতে পারে। ঈশ্বর মানুষকে নিজের প্রতিমূর্তিতে সৃষ্টি করেছেন, যেন সে ঈশ্বরের সৃষ্টি দেখাশোনা করার কাজের সহকর্মী হয়। মানবজাতির জন্য ঈশ্বরের যে পরিকল্পনা আছে তা-ও মানুষ জানবে এবং তা বাস্তবায়নেও অংশগ্রহণ করবে। এভাবে সে ঈশ্বরের সহকর্মী হয়ে উঠবে।
| কাজ: তুমি কী কী সৃজনশীল কাজ করতে পার তা জোড়ায় জোড়ায় বসে আলোচনা কর। |
ঈশ্বর তাঁর মুখের কথায় সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তাঁর কথায় অসীম শক্তি আছে। কারণ তিনি সর্বশক্তিমান। মানুষের কথায়ও শক্তি আছে। তবে মানুষের শক্তি সসীম। মা-বাবা, শিক্ষক বা গুরু ব্যক্তিরা আমাদেরকে ভালো মানুষ হতে বলেন। আমরা তাঁদের কথা শুনি ও ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে থাকি। এমনিভাবে অনেক কিছু করার জন্য ঈশ্বর মানুষকে শক্তি দিয়েছেন। মানুষ ঈশ্বরের কাছ থেকে সৃষ্টি করার গুণ পেয়েছে। তবে ঈশ্বরের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো, ঈশ্বর শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু মানুষ ঈশ্বরের শক্তিতে ও ঈশ্বরের দানগুলো দিয়েই আরও নতুন কিছু সৃষ্টি করে চলছে। এর অর্থ হলো, মানুষ শুধু ঈশ্বরের সৃষ্টির রূপান্তর ঘটিয়ে থাকে।
ঈশ্বর হলেন রক্ষা ও পালনকারী। তিনি সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে আমাদের রক্ষা করেন। মানুষ ঈশ্বরের কাছ থেকে এই গুণটি পেয়েছে। একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের বিপদের সময় পাশে দাঁড়াতে পারে এবং বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। সমস্যা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে। ভয়ের সময় অভয় দিতে পারে। দুঃখের সময় আনন্দ দিতে পারে। ব্যস্ততার সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। এভাবে মানুষ মুক্তিদায়ী ও রক্ষাকারীর ভূমিকা পালন করে। প্রলোভনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পথ দেখাতে পারে। চিকিৎসক রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারে। ঈশ্বর তাঁর পুত্র যীশুকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন মানুষের মুক্তির জন্য। মুক্তিদাতা যীশুর সাথে আমাদের উদ্ধার বা মুক্তিকাজের পার্থক্য হলো: তিনি আমাদেরকে পাপের হাত থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন। আমরা কিন্তু সেই পরিত্রাণ বা মুক্তি দিতে পারি না। তবে যীশুর মুক্তির বার্তাটিই আমরা মানুষের কাছে পৌঁছে দিই। পবিত্র আত্মা যে দানগুলো আমাদের দিয়েছেন, সেগুলো দিয়ে আমরা অন্যদের সহায়তা করতে পারি। কিন্তু আমরা সেই গুণগুলো অন্য মানুষকে দিতে পারি না।
| কাজ: জোড়ায় জোড়ায় বসে আলাপ কর তুমি কীভাবে অন্যদের উদ্ধার বা রক্ষা করতে পার। |
ঈশ্বর পবিত্র। তিনি মানুষের মধ্যে পবিত্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষা দিয়েছেন। ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে মানুষের সৃষ্ট হওয়ার অর্থ হলো ঈশ্বর মানুষকে ভালোবাসেন। তিনি পরিকল্পনা করেছেন, তাঁর সৃষ্ট মানুষ তাঁর ঐশ্বরিক জীবনের অর্থাৎ তাঁর পবিত্রতার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। ঈশ্বর সবকিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু প্রতিদানে মানুষ ঈশ্বরকে ভালোবাসবে, সেবা করবে ও সমস্ত সৃষ্টিকে তাঁর কাছে উৎসর্গ করবে।
ঈশ্বর সকল ভালোর উৎস। তিনি মানুষের মধ্যে বিবেক অর্থাৎ ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন। এ কারণে মানুষ ভালো কাজ করলে অন্তরে পরিতৃপ্তি লাভ করে। অন্যদিকে মন্দ কাজ করলে তার অন্তরে পাপের চেতনা হয়। তখন সে ক্ষমা লাভ করে ঈশ্বরের পবিত্রতা লাভ করতে আকাঙ্ক্ষা করে।
ঈশ্বর ক্ষমাশীল। ঈশ্বরপুত্র যীশু ক্ষমাশীল পিতার উদাহরণ দিয়ে ঈশ্বরের ক্ষমার বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট করে তুলেছেন। আমরাও ঈশ্বরের কাছ থেকে ক্ষমা করার শক্তি লাভ করেছি। আমরা ক্ষমা করতে পারি বলেই এক পরিবার, সমাজ ও পৃথিবীতে শান্তিতে বাস করতে পারি।
কাজেই আমরা এখন বলতে পারি, মানুষকে ঈশ্বর অনেক গুণ বা ঐশ্বরিক শক্তি দিয়েছেন। যেমন: দয়া, সহানুভূতি, ধৈর্য, যত্ন, প্রশংসা ইত্যাদি গুণ আমরা ঈশ্বরের কাছ থেকে পেয়েছি। এগুলো আমরা সীমিত আকারে বাড়িয়ে তুলতে পারি। তখন আমাদের মধ্যে ঐশ্বরিক গুণগুলো দেখা যায়। এই কারণে বলা যায়, মানুষ হলো ঈশ্বরের ঐশ্বরিকতার আয়না।
| কাজ : তোমার খাতায় দুটি কলাম তৈরি কর। বাম পাশের কলামে লেখ ঈশ্বরের কী কী গুণ তুমি দেখতে পাও। ডান পাশের কলামে লেখ ঈশ্বরের কোন কোন গুণ তুমি পেয়েছ। |
সামসংগীত: ৮: ৫-৬
মানুষকে তুমি তো করেছ প্রায় দেবতার সমান,
তাকে পরিয়েছ গৌরব আর মহিমার মুকুট!
তোমার সমস্ত সৃষ্টির প্রভুত্ব দিয়েছ তুমি তাকে,
রেখেছ নিখিল বিশ্ব তার পদতলে।
Read more