যীশু খ্রীষ্ট তাঁর শিষ্যদেরকে কাজ করার জন্য পৃথিবীর সকল জাতির সকল মানুষের কাছে প্রেরণ করেছেন। তাই শিষ্যদেরকে আমরা বলি প্রেরিতশিষ্য। যে কাজগুলো তিনি শিষ্যদের করতে প্রেরণ করেছেন, সেগুলো হলো প্রেরণকর্ম। তাঁরা যীশুর শিক্ষাগুলো নানা জাতির মানুষের কাছে প্রচার করতে শুরু করেছেন। মানুষ যেন যীশুকে পথ, সত্য ও জীবন হিসেবে চিনতে ও গ্রহণ করতে পারে, সেজন্য তাঁরা প্রচার করতে লাগলেন। তাঁরা মৃত্যুর আগে আরও অনেককে এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দিয়ে গেলেন। এভাবে আজও যীশুর কাজগুলো চলছে। পরিচালনা করছে যীশুরই স্থাপিত মণ্ডলী। বর্তমান যুগে মণ্ডলী যে কাজগুলো করে চলছে সেগুলো নিম্নরূপ:
আমরা জানি, মানুষ মুখের কথা বা উপদেশের চেয়ে কাজ দেখতে চায় বেশি। যারা
শুধু মুখে কথা বলে কিন্তু কাজে তা প্রয়োগ করে না সেই ধরনের লোকদের কেউ পছন্দ করে না। তাই খ্রীষ্টমণ্ডলী শুধু উপদেশ দিয়ে নয় কাজের মধ্য দিয়েও সাক্ষ্যদান করে যাচ্ছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং এ রকম আরও নানাভাবে মণ্ডলী জগতের মানুষের কাছে সাক্ষ্যদান করে যাচ্ছে। এই দায়িত্ব শুধু মণ্ডলীর পরিচালকদেরই নয় বরং প্রত্যেক খ্রীষ্টভক্তেরই। তাই খ্রীষ্টভক্তগণ যার যার সাধ্য অনুসারে গরিব-দুঃখী, অভাবী, দুঃখক্লিষ্ট মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে খ্রীষ্টীয় সাক্ষ্যদান করে যাচ্ছে ।
মণ্ডলীর প্রেরণকর্মের প্রধান বিষয় মঙ্গলবাণী ঘোষণা করা। ঈশ্বর মানুষকে ভালোবাসেন ও মানুষের পরিত্রাণের জন্যই তিনি তাঁর একমাত্র পুত্র যীশুকে এ জগতে প্রেরণ করেছেন। যীশু খ্রীষ্ট যাতনাভোগ ও মৃত্যুবরণ করেছেন। এরপর তিনি পুনরুত্থানও করেছেন। এটি জগতের মানুষের জন্য একটি সুখবর। কারণ মৃত্যু থেকে জীবিত হয়ে তিনি সকল মানুষের মুক্তিদাতা হয়েছেন। এ বিষয়টি সকল মানুষকে জানানোর জন্য মণ্ডলীর অনেক বিশপ, যাজক, ডিকন, ব্রাদার, সিস্টার, কাটেখিস্ট নিজ নিজ জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে কাজ করে যাচ্ছেন। অনেকে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জীবন পর্যন্ত বির্সজন দিচ্ছেন। এই দায়িত্বটি সকল খ্রীষ্টভক্তেরও। যে যেখানে আছে সেখানেই নিজ নিজ জীবনের আদর্শ দ্বারা এই কাজটি করার জন্য সকলকেই খ্রীষ্ট আহ্বান করছেন।
প্রভু যীশু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে প্রচারকাজ শুরু করেছেন। তিনি বলতেন,সময় হয়ে এসেছে; তোমরা মন ফেরাও এবং মঙ্গলসমাচারে বিশ্বাস কর। তাঁর শুরু করা কাজগুলো চালিয়ে নেবার দায়িত্ব দিয়ে তিনি শিষ্যদের প্রেরণ করেছেন। প্রেরিতশিষ্যগণও সকল মানুষকে জীবন পরিবর্তন করে পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে দীক্ষা গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান। খ্রীষ্টমণ্ডলী আজও মানুষকে মন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দীক্ষাস্নান গ্রহণ করার আহ্বান জানান। এর মাধ্যমে মানুষ নতুন জীবন লাভ করতে পারে। মন পরিবর্তন ও দীক্ষাস্নান-এই দুটি বিষয় একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যারা মন পরিবর্তন করে, তারা দীক্ষাস্নানও গ্রহণ করে।
সকল খ্রীষ্টবিশ্বাসীকেও এই দায়িত্বটি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে খ্রীষ্টবিশ্বাসীরা অন্যদের কাছে আমন্ত্রণ জানাবে খ্রীষ্টের উপর বিশ্বাসী হতে ও দীক্ষাস্নাত হতে। তবে মনে রাখতে হবে, সকলেরই নিজ নিজ ধর্ম পালন করার অধিকার আছে। কারও বিশ্বাসে যেন আঘাত না লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পবিত্র আত্মা যাদের অন্তরে বিশ্বাস জাগিয়ে তুলবেন, তারা মন পরিবর্তন করবে ও দীক্ষাস্নাত হবে।
| কাজ: তুমি কী কী জীবনাচরণ দিয়ে খ্রীষ্টের সাক্ষ্য হয়ে উঠতে পার তা জোড়ায় জোড়ায় আলোচনা কর। |
একটি বীজকে মাটিতে রোপণ করলে ঐ মাটিতেই বীজটির চারা গজায় ও বড় গাছে পরিণত হয়। এরপর সে ফুল ও ফল দেয়। একইভাবে প্রত্যেক দেশের খ্রীষ্টমণ্ডলী ঐ দেশেই রোপিত হয়েছে। সে ঐ দেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতি অনুসারে বিস্তারলাভ করে এবং ফল দান করে। অর্থাৎ সে নিজ দেশে বিশ্বাসে পরিপক্ক হয় ও খ্রীষ্টের সাক্ষ্য বহন করে। নিজ দেশের মানুষের কাছে সে খ্রীষ্টের আলো ছড়ায়। খ্রীষ্টের অনুসারী হিসেবে সে নিজ দেশে একটি মিলনসমাজ গড়ে তোলে। এভাবে সে নিজ দেশে একটি স্থানীয় মণ্ডলী হিসেবে গড়ে উঠে। প্রত্যেক দেশের স্থানীয় মণ্ডলী আবার বিশ্বমণ্ডলীর সাথেও সংযুক্ত। সারা পৃথিবীর সকল খ্রীষ্টভক্তদের সাথে সে এক পরিবারের মতো যুক্ত থাকে।
আমাদের ধর্মীয় বিষয় নিয়ে যখন অন্যান্য ধর্মের ভাই-বোনদের সাথে আলোচনা করি, তখন সেটাকে আমরা ধর্মীয় সংলাপ বলি। এর মধ্য দিয়ে আমরা পরস্পরের ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের আদান-প্রদান করি। ফলে একে অপরের ধর্ম ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে সম্মান করতে শিখি। এই ধর্মীয় সংলাপ বা আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা অন্য ধর্মানুসারীদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করি। আবার তাদের কাছে খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধগুলোকে তুলে ধরতে পারি।
খ্রীষ্টমণ্ডলীর মূল দায়িত্ব হলো মঙ্গলসমাচারের মূল্যবোধ অনুসারে মানুষের বিবেক গঠন করা। মানুষের ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করা। এর মধ্য দিয়ে মানুষকে খাঁটি মানুষ হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করা। খ্রীষ্টমণ্ডলী স্কুল, কলেজ, কারিগরি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র এবং এ ধরনের অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। এগুলোর মাধ্যমে মণ্ডলী মানুষের সুস্থ বিবেক গঠন, চিন্তাধারা ও আচার আচরণের উন্নয়ন করে থাকে।
খ্রীষ্টভক্তকে ব্যক্তিগত এবং সামাজিকভাবে এই দায়িত্বটি পালন করতে দেওয়া হয়েছে। আমরা ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধগুলো অনুসারে জীবন যাপন করার মাধ্যমে এই দায়িত্ব পালন করতে পারি। কারণ এই ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধগুলো দ্বারা আমরা একে অপরকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে শিখি। একে অন্যকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে সত্যিকার ভাই-বোন হয়ে উঠার অনুপ্রেরণাও লাভ করি।
প্রভু যীশু তাঁর প্রচার জীবনে দরিদ্র, অভাবী, নির্যাতিত ভাই-বোনদের পক্ষ সমর্থন করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে তাদের পাশে দাঁড়াবার শিক্ষা দিয়েছেন। আমরা সবাই ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে সৃষ্ট। খ্রীষ্টমণ্ডলীও যীশুর শিক্ষা অনুসরণ করে দীন-দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াবার আহ্বান পেয়েছে। আমাদের দায়িত্ব হলো দরিদ্রদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করা। আমাদের যাজক, ব্রতধারী-ব্রতধারিণী ও সকল ভক্তজনগণ অনেক সেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের অমূল্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য দূরীকরণ, কুষ্ঠাশ্রম, প্রতিবন্ধী সেবাকেন্দ্র, বয়স্ক সেবাকেন্দ্র ইত্যাদির মাধ্যমে তারা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আমরাও যেন আমাদের যার যার কর্মস্থলে থেকে দরিদ্র ও অভাবী ভাই-বোনদের সেবা করি। এভাবে যেন যীশুর ভালোবাসা অন্যের কাছে তুলে ধরি।
| কাজ: তুমি তোমার জীবনে কখনো দরিদ্র ও অভাবীদের জন্য কোনো দয়ার কাজ করে থাকলে তা দলে অন্যদের সাথে সহভাগিতা কর। |
Read more