ধান-নদী-খাল-এই তিনে বরিশাল। এই বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার ইন্দুরকানি গ্রামে বাস করতেন শ্রীনাথ ও স্বর্ণকুমারী বৈরাগী। চারদিকের খাল-বিল নদী-নালা তখন বর্ষার পানিতে থৈ থৈ করছে। কবি রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু বর্ষাকালের এমনই এক স্মরণীয় ক্ষণে, ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ৩রা জুন তারিখে শ্রীনাথ ও স্বর্ণকুমারীর ঘর আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান। বাবা-মা তাঁদের এই আদরের সন্তানটির নাম রাখেন প্রিয়নাথ বৈরাগী। প্রিয়নাথের ছিল তিন ভাই ও এক বোন। বোনের নাম ছিল বিধুমুখী আর ভাইদের নাম: উত্তম, অতুল ও সুবোধ। প্রিয়নাথ ছিলেন একজন প্রখ্যাত সংগীতপ্রেমী। তাঁর দুই ভাই উত্তম এবং অতুলের হৃদয়ও সর্বদাই জুড়ে থাকত সংগীতের প্রতি অগাধ প্রীতি। দুঃখের বিষয় মাত্র ২১ বছর বয়সে বড় ভাই উত্তম অকালে মৃত্যুবরণ করলে প্রিয়নাথ শোকে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন।
এই পরিবারের বৈরাগী নাম গ্রহণের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস আছে। তাঁদের আগের নাম ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রিয়নাথ বৈরাগীর পিতামহ তৎকালীন সমাজের নিষ্ঠুর বিধি-বিধান ও অনুশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এরই চিহ্ন হিসেবে তিনি বন্দ্যোপাধ্যায় নামটি পরিত্যাগ করে বৈরাগী নাম গ্রহণ করেন। পরে গৈলা গ্রাম ত্যাগ করে তাঁরা তরুণসেন গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন।
প্রিয়নাথ বৈরাগীর বাবা ছিলেন গ্রামের প্রাইমারি মিশন স্কুলের একজন নামকরা শিক্ষক। তাঁর মা ছিলেন নম্র ও কোমল স্বভাবের একজন শিক্ষিত নারী। স্বর্ণকুমারী সংসার ধর্ম পালনের অবসর মুহূর্তগুলোতে এলাকার নিরক্ষর মা-বোনদের অক্ষর জ্ঞান দান করে কাটাতেন। সেই সময়ে কি ছেলে কি মেয়ে-শিক্ষার আলো কারো মাঝেই ছিল না বললেই চলে। এই পরিস্থিতিতে এলাকার সবার চিঠি লিখে ও পড়ে দিতেন প্রিয়নাথের মা। সময় করে মেয়েদের পবিত্র বাইবেল থেকে পাঠ করেও শোনাতেন। তাইতো স্বর্ণ কুমারী ছিলেন ধর্ম-বর্ণ, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধার পাত্রী।
প্রিয়নাথ বৈরাগীর শিশুকাল মা-বাবার সাথেই কাটে। প্রাইমারি পাস করেন মিশন স্কুল থেকে। পরবর্তীকালে শ্রীরামপুর মিশন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। কলকাতা স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে তিনি এফ, এ (বর্তমানে আই, এ) পাস করেন। প্রিয়নাথের অমায়িক ব্যবহার এবং মনের উদারতা, মিষ্টি-মধুর কথাবার্তা মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করত। ছাত্রজীবনে লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত সংগীতচর্চা এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে তিনি অনেক সাফল্য বয়ে এনেছেন। সংগীতপ্রেমী পরিবারের প্রতিটি সদস্য অপূর্ব মায়াভরা কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। প্রিয়নাথ নিয়মিত খ্রীষ্টীয় সংগীতের চর্চা করতেন। সময় ও সুযোগ পেলেই ঈশ্বরভক্ত এই গুণী সেবক সংগীত রচনা ও সুর নিয়ে আপন জগতে চলে যেতেন।
প্রিয়নাথের কলেজজীবন পার হওয়ার সময়েই তার বাবা শ্রীনাথ বৈরাগী ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে স্বর্গবাসী হন। পিতার অকালমৃত্যুতে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে প্রিয়নাথের উপর। প্রচণ্ড ঈশ্বরভক্ত প্রিয়নাথ বাবার ও প্রিয় বড় ভাইয়ের বিরহ-ব্যথায় প্রথমে কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। তা সত্ত্বেও ঈশ্বরের উপর আস্থাশীল ও বিশ্বাসী প্রিয়নাথ সব কিছু সামলে নিলেন এবং সংসারের দায়িত্ব গ্রহণ করে চাকরির সন্ধানে বের হলেন। একসময় সুন্দরবনের কর বিভাগে একটা চাকরি পেলেন। এর মাধ্যমে তাঁর স্রষ্টার মহিমা প্রকাশের আরও বেশি সুযোগ হয়ে গেল। সুন্দরবনের অপরিসীম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে বিমোহিত করে তুলল। নদীর বিশালতা ও প্রাকৃতিক সবুজ বনানী ও এর তীরভূমি তাঁকে প্রার্থনায় নিমগ্ন হওয়ার সুযোগ এনে দিল। এই সময়ে প্রিয়নাথ খ্রীষ্টীয় সংগীত রচনা ও সুর দেওয়ার উপর অধিক সময় দিতে লাগলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁর এই চাকরি খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না। কর বিভাগের দুর্নীতি সহ্য করতে না পেরে তিনি চাকরি ছেড়ে চলে আসেন নোয়াখালী। সেখানে তিনি মিশন স্কুলে শিক্ষকতার কাজ গ্রহণ করেন।
| কাজ: ১। প্রিয়নাথ বৈরাগীর মা কীভাবে নিরক্ষর লোকদের শিক্ষা দিতেন তা ভূমিকাভিনয়ের মাধ্যমে প্রদর্শন কর। কাজ: ২। প্রিয়নাথ বৈরাগী জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তা ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ কর। |