ইহুদিরা প্রতিবছর উদ্ধারপর্ব বা নিস্তারপর্ব নামে একটি মহাপর্ব পালন করত। এই পর্বটি বহুকাল আগের একটি ঘটনার স্মরণে পালন করা হতো। ইহুদিরা মিশরীয়দের হাতে বন্দী ছিল। তাদের হাত থেকে ঈশ্বর মোশী ও আরোনের নেতৃত্বে ইহুদিদের উদ্ধার করেছিলেন। সেখান থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা প্রতিশ্রুত দেশে গিয়ে বাস করতে শুরু করেছিল। সেই উদ্ধার বা নিস্তার লাভের ঘটনাটি তাঁদের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই প্রতিবছর তাঁরা এটিকে মহাপর্ব হিসেবে পালন করত। পর্বটি পালন করার জন্য তাঁরা যেরুসালেম মন্দিরে সমবেত হতো। পর্বে এসে তাঁরা তাদের সেই উদ্ধার বা নিস্তার লাভের ঘটনার স্মরণে মেষ বলি দিত ও আনন্দের সাথে ভোজ উৎসব করত। যেরুসালেম মন্দিরের চারদিকে ১৫ মাইলের মধ্যে যেসব ইহুদি বাস করত তাঁদের মধ্যে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্করা নিস্তারপর্বে প্রতিবছর যোগ দিতে বাধ্য ছিল। তাছাড়া, সারা পৃথিবীতে যত ইহুদি আছে, তারা জীবনে অন্তত একবার এই পর্বে যোগ দিত। যীশু, মারীয়া ও যোসেফের বাড়ি নাজারেথ শহরে ছিল। এই শহর যেরুসালেমের ১৫ মাইলের মধ্যেই ছিল।
এই হিসেবে যীশুর মা-বাবাও প্রতিবছর যোগ দিতেন। আরও একটি প্রথা ছিল, যেসব পুরুষ সন্তানের বয়স ১২ বছর হয়েছে, তারাও এই পর্বে যোগ দিবে। কাজেই যীশুর ১২ বছর পূর্ণ হওয়ার পর প্রথমবারের মতো তিনি যোসেফ ও মারীয়ার সাথে পর্বে যোগ দিতে গেলেন। এই পর্বে বহু লোকের সমাগম হতো।
পর্ব শেষ হওয়ার পর লোকেরা দলে দলে হেঁটে বাড়ি ফিরত। কারণ এলাকাটি ছিল পাহাড়ি। রাতের বেলায় শুধু মহিলারা একা ভ্রমণ করত না। কারণ চোর-ডাকাতের ভয় ছিল। তবে মহিলারা রওনা দিত একটু আগে। কারণ তাঁরা হাঁটতো ধীরে ধীরে। পুরুষরা একটু পরে রওনা দিত, কারণ তাঁরা দ্রুত হাঁটতো। পাহাড়ি অঞ্চলের কাছে এসে পুরুষরা মহিলাদের দলে যোগ দিত। এই কারণে মারীয়া রওনা দেওয়ার আগে ভেবেছিলেন, যীশু হয়তো যোসেফের সাথে আছেন। আবার যোসেফ ভেবেছিলেন, যীশু হয়ত মারীয়ার সাথে চলে গেছেন। এই ভেবে তারা যীশুকে মন্দিরেই ফেলে রেখে চলে এসেছিলেন। সন্ধ্যাবেলায় যখন মারীয়া ও যোসেফের একত্রে দেখা হলো, তখন তাঁরা বুঝতে পারলেন, যীশু তাঁদের কারও সাথে বা কোনো আত্মীয়স্বজনদের সাথেও নেই। এতে তাঁরা ভীষণ চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তাই তাঁরা যীশুকে খোঁজার জন্য দ্রুত রওনা দিলেন যেরুসালেমের দিকে।
পর্ব শেষ হয়ে গেলেও শাস্ত্রবিষয়ক পণ্ডিতগণ একত্রিত হয়ে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আরও কিছু আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতেন। মন্দিরে বসে পণ্ডিতগণ আলোচনা করছিলেন। যীশু সেই পণ্ডিতদের মাঝখানে বসে তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলেন ও শুনছিলেন। যীশুর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও জ্ঞান দেখে তাঁদের সকলেই খুব আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন।
ঠিক এই সময়ে মারীয়া ও যোসেফ ওখানে গিয়ে হাজির হলেন। তাঁরা দেখতে পেলেন যীশু পণ্ডিতদের মাঝখানে বসে আলোচনায় অংশগ্রহণ করছেন। মারীয়া যীশুকে ফিরে পেয়ে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি বললেন, 'খোকা, এটা তোমার কেমন ব্যবহার? ভেবে দেখ তো, তোমার বাবা ও আমি কত উদ্বিগ্ন হয়েই না তোমাকে খুঁজছিলাম!' এতে যীশু যে উত্তর দিলেন তাতে তাঁরা সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। যীশু বললেন, 'তোমরা কেন আমাকে খুঁজছিলে? তোমরা কি জানতে না যে আমাকে আমার পিতার গৃহেই থাকতে হবে?' এই কথার অর্থ তাঁরা কেউ তখন কিছুই বুঝলেন না।
যীশু বলেছেন, তাঁকে পিতার গৃহে থাকতে হবে। এই কথার দ্বারা আমরা বুঝতে পারি, পিতা ঈশ্বর হলেন তাঁর প্রকৃত পিতা, আর যোসেফ হলেন তাঁর পালক পিতা। কুমারী মারীয়ার গর্ভে যীশুর জন্ম হয়েছিল পবিত্র আত্মার প্রভাবে। তিনি ঈশ্বরের সন্তান। যীশু পূর্ণ মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছেন কিন্তু তিনি নিজে পূর্ণ ঈশ্বর। তাঁকে পিতার গৃহে থাকতে হবে এই কথার দ্বারা তিনি যোসেফ ও মারীয়াকে বোঝালেন যে তিনি পিতার কাজে জীবন উৎসর্গ করতেই জন্ম নিয়েছেন।
Read more