প্রভু যীশু যে আশ্চর্য কাজগুলো করেছেন, সেগুলোর মধ্য দিয়ে দুটি প্রধান বিষয় প্রকাশিত হয়েছে:
ক) প্রথমটি হলো: যীশু খ্রীষ্ট হলেন ঈশ্বর এবং
খ) দ্বিতীয়টি হলো: পিতা ঈশ্বর তাঁকে একটি বিশেষ কাজ করার জন্য প্রেরণ করেছেন।
ঈশ্বরের বিভিন্ন আশ্চর্য কাজ সম্পর্কে পূর্ব থেকেই ইহুদিদের ধারণা ছিল। কিন্তু প্রভু যীশুর কাজগুলো দেখে তাঁরা বিস্মিত হয়ে যেত। তারা বলত যে তারা আগে কখনো এ রকম ঘটনা দেখেনি। এতেই আমরা বুঝি, প্রভু যীশুর আশ্চর্য কাজগুলোর বিশেষ কিছু ভিন্ন রকম বৈশিষ্ট্য ছিল। সেগুলো আমাদেরও জানা দরকার।
বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
আমরা লক্ষ করি, প্রভু যীশু খ্রীষ্ট আশ্চর্য কাজগুলো করার পূর্বে পিতা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন। তিনি তাঁকে প্রশংসা ও ধন্যবাদ দিয়ে কাজটি শুরু করতেন। উদাহরণস্বরূপ, আশ্চর্যভাবে পাঁচ হাজার লোককে খাওয়ানোর পূর্বে তিনি উপরের দিকে তাকিয়ে পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এরপর লোকদের হাতে খাবারগুলো তুলে দিয়েছেন। একবার একটি অপদূতগ্রস্ত বালককে যীশুর শিষ্যদের কাছে আনা হয়েছিল। শিষ্যগণ তাকে নিরাময় করতে পারেননি। কিন্তু যখন তাকে যীশুর কাছে আনা হলো, তখন তিনি তাকে নিরাময় করলেন। শিষ্যদের তিনি বললেন, এ ধরনের অপদূতগ্রস্তদের নিরাময় করার জন্য প্রয়োজন হয় প্রার্থনা ও উপবাস।
যারা যীশুর কাছে এসে নিরাময় লাভ করত, তাদের অনেককেই তিনি ফিরে গিয়ে যাজককে দেখাতে বলতেন; তাদেরকে বলতেন নৈবেদ্য উৎসর্গ করে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে। উদাহরণস্বরূপ, একজন কুষ্ঠরোগীকে নিরাময় করে তিনি বললেন, যাজকের কাছে গিয়ে নিজেকে দেখাও, আর তুমি যে সেরে উঠেছ, তার জন্য তুমি এবার মোশী যেমন নির্দেশ দিয়ে গেছেন, সেইমতো নৈবেদ্যও উৎসর্গ কর। সবাই জানুক, তুমি এখন রোগমুক্ত।
প্রভু যীশু খ্রীষ্ট আশ্চর্য কাজ করতে গিয়ে তাঁর মানবীয় দিকটি প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ প্রেম, দরদবোধ, মমতা, সহানুভূতি, ক্ষমা প্রভৃতি মনোভাব জেগে উঠতো। তিনি অন্ধ, খঞ্জ, কুষ্ঠরোগী, অপদূতগ্রস্ত, অবশরোগী এবং এধরনের রোগী দেখলে তাদের জন্য অবশ্যই কিছু করতেন। রোগী-বাড়ি থেকে কেউ এসে তাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলে তিনি অবশ্যই তাদের সাথে যেতেন। কেউ অন্য কোনো সমস্যা নিয়ে এলেও তিনি তাদের সাথে আলাপ করতেন। পাপীদের বাড়ি গিয়ে তিনি তাদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করে তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনতেন। লাজারের মৃত্যুতে তিনি কেঁদেছেন। নাইন নগরের বিধবা মায়ের কান্না দেখে তিনি তার মৃত ছেলের জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন।
কথায় বলে বিশ্বাসে পরিত্রাণ। প্রভু যীশুর আশ্চর্য
কাজগুলোর ব্যাপারেও তা-ই ঘটেছে। কাজগুলো করার পূর্বে তিনি আগে যাচাই করে দেখেছেন অসুস্থ ব্যক্তি বা তার আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে গভীর বিশ্বাস আছে কি না। অর্থাৎ তারা তাঁর উপর পূর্ণ আস্থা রাখছে কি না। বিশ্বাস ও আস্থার পরিচয় পেলে তিনি তাদের সুস্থ করেছেন। যেখানে বিশ্বাসের অভাব বোধ হয়েছে, সেখানে তিনি আশ্চর্য কাজ করেননি। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর নিজের গ্রাম নাজারেথে তিনি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস দেখেননি। তাই সেখানে তিনি আশ্চর্য কাজ করেননি। সুস্থ করার পর তিনি বলতেন, তোমার বিশ্বাস তোমাকে সুস্থ করে তুলেছে।
যীশুর আশ্চর্য কাজের জন্য সব সময় রোগী বা সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিশ্বাস দরকার হয়নি। উদাহরণস্বরূপ শতানিকের চাকর তাঁর বাড়িতে অসুস্থ ছিল। কিন্তু যীশুর কাছে এসেছেন শুধু শতানিক। যীশু তাঁকে বললেন, আপনার চাকর সুস্থ হয়ে যাবে। আর সেই মুহূর্তেই তার বাড়িতে তার চাকরটি সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। কারণ শতানিকের বিশ্বাস খুবই গভীর ছিল।
প্রভু যীশু তার আশ্চর্য কাজ কখনো কোনো গোপন স্থানে একাকী করেননি। তিনি সেগুলো করেছেন সবার সামনে, সমাজগৃহে বা জনসমাবেশে। এ কারণে তাঁকে অনেকবার সমাজ নেতা ও ফরিসিদের বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে। তবে মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গী হিসেবে শুধু কিছু বাছাই করা ব্যক্তিকে সঙ্গে করে নিয়েছেন। যেমন- কয়েকটি আশ্চর্য কাজের সময় তিনি পিতর, যাকোব ও যোহনকে এবং এর সাথে অসুস্থ ব্যক্তির মা-বাবাকে সাথে রেখেছেন।
প্রভু যীশু খ্রীষ্টের আশ্চর্য কাজগুলোর মধ্যে বিভিন্নতা ছিল। তিনি বিভিন্ন রকমের অসুস্থ ব্যক্তিদের সুস্থ করেছেন। প্রকৃতির উপর যে তাঁর আধিপত্য ছিল তা-ও তাঁর আশ্চর্য কাজের মধ্যে দেখা গেছে। তিনি ধমক দিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে ঝড় থামিয়েছেন ও জলের উপর দিয়ে হেঁটেছেন। অপদূতে ধরা লোকদের তিনি নিরাময় করেছেন। পাগলদেরও তিনি সুস্থ করেছেন। বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা আশ্চর্যভাবে নিরাময় করেছেন। আবার বিভিন্ন ধরনের অপদূতে পাওয়া ব্যক্তিকে আশ্চর্যভাবে স্বাভাবিক করে তুলেছেন। এই রকম নানা ধরনের আশ্চর্য কাজ তিনি করেছেন।
প্রভু যীশু তাঁর আশ্চর্য কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় মুখের কথা ব্যবহার করেছেন। আবার অসুস্থ ব্যক্তিকে স্পর্শ করেছেন বা মুখের থুতু ব্যবহার করে আশ্চর্যভাবে নিরাময় করেছেন। যখন যে রকম করা দরকার ছিল তিনি পরিস্থিতি অনুসারে তাই করেছেন।
যীশুর আশ্চর্য কাজগুলো শুধু ইহুদিদের জন্যই ছিল না। এর বাইরে থেকেও যারা আসত তাদের জন্য তিনি দয়া দেখিয়েছেন। শতানিক ইহুদি ছিলেন না। তবে যীশুর উপর তাঁর বিশ্বাস ও আস্থা ইহুদিদের চাইতেও গভীর ছিল। আর একবার এক অনিহুদি মা তার মেয়ের জন্য যীশুর কাছে এসে মেয়ের সুস্থতার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। যীশু প্রথমে তাঁর বিশ্বাস পরীক্ষা করার জন্য বললেন যে তাঁকে শুধু ঈশ্বরের মনোনীতদের জন্যই পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ঐ নারীর বিশ্বাস দেখে তিনি আশ্চর্য হলেন ও তাঁর মেয়েকে নিরাময় করলেন।
যীশুর আশ্চর্য কাজগুলো নিয়ে বিশ্বাসপূর্ণ আলোচনা করা দরকার। এর মাধ্যমে আমাদের প্রত্যেকের মনে যীশুর প্রতি বিশ্বাস আরও বেড়ে উঠবে। বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে আমরাও আমাদের জীবনে যীশুর আশ্চর্য কাজ দেখতে পাব।
| কাজ: পাঁচজন করে দলে বিভক্ত হও। তোমার প্রিয় যীশুর যেকোনো একটি আশ্চর্য কাজ শ্রেণিকক্ষে দলভিত্তিক অভিনয় করে দেখাও। |