প্রভু যীশুর জন্মের পরে ও দীক্ষাস্নান গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত পবিত্র বাইবেল থেকে আমরা তাঁর সম্বন্ধে মাত্র কয়েকটি ঘটনা জানতে পারি। ঘটনাগুলো হলো: (ক) মন্দিরে প্রভু যীশুকে নিবেদন করা; (খ) মিশর দেশে পলায়ন: (গ) মিশর দেশ থেকে ইস্রায়েল দেশে ফিরে আসা; (ঘ) নাজারেথে যীশুর শৈশবকাল যাপন; (ঙ) মন্দিরে বালক যীশুর হারিয়ে যাওয়া; এবং (চ) মা-বাবার সাথে নাজারেথে যীশুর ফিরে যাওয়া। এই ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা প্রভু যীশুর শৈশব সম্পর্কে কিছু কথা জানতে চেষ্টা করব।
যীশুর জন্মের চল্লিশ দিন পর যোসেফ ও মারীয়া শিশু যীশুকে যেরুসালেম মন্দিরে উৎসর্গ করতে নিয়ে গেলেন। ইহুদিদের এই বিশ্বাস ছিল যে সন্তান জন্ম দেওয়ার মধ্য দিয়ে একজন মহিলা অশুচি হয়ে যায়।

তাই তাকে শুচি হওয়ার জন্য মন্দিরে যেতে হতো। পুত্রসন্তানের জন্ম হলে মাকে চল্লিশ দিন পরে মন্দিরে যেতে হতো। আর কন্যা সন্তানের জন্ম হলে যেতে হতো আশি দিন পরে। সেখানে গিয়ে শিশুটিকে উৎসর্গ করতে হতো। শিশুটির পরিবর্তে একটি মেষশাবক উৎসর্গ করে বাবা-মা শিশুটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তারা দরিদ্র বলে মেষশাবকের পরিবর্তে এক জোড়া ঘুঘু বা পায়রার ছানা উৎসর্গ করতে পারত। কাজেই যীশুর জন্মের চল্লিশ দিন পর যোসেফ ও মারীয়া তাঁদের শিশুপুত্র যীশুকে নিয়ে যেরুসালেম মন্দিরে গেলেন। দরিদ্র ছিলেন বলে তাঁরা মন্দিরে উৎসর্গ করলেন এক জোড়া ঘুঘু। মন্দিরে সিমিয়োন নামে একজন ধর্মগুরু ছিলেন। তিনি ছিলেন খুবই ধার্মিক ও ভক্তিপ্রাণ মানুষ।
তিনি মুক্তিদাতার আগমন নিজের চোখে দেখে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। যোসেফ ও মারীয়া শিশু যীশুকে মন্দিরে নিয়ে আসা মাত্রই সিমিয়োন চিনে ফেললেন যে ইনিই হলেন সেই মুক্তিদাতা, যাঁর অপেক্ষায় ইস্রায়েল জাতি এত দিন ধরে দিন গুনছিল। কাজেই সিমিয়োন শিশু যীশুকে কোলে নিয়ে ঈশ্বরের প্রশংসা করলেন। তিনি মুক্তিদাতাকে দেখতে পেয়েছেন বলে হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব করলেন।
পূর্ব দেশ থেকে তিনজন পণ্ডিত এসে নবজাত রাজার অর্থাৎ যীশুর খোঁজ করছিলেন। তাঁরা হেরোদের কাছে গিয়ে এ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। রাজা হেরোদ বললেন, তিনি এখনো সেই রাজার সম্পর্কে জানেন না। তাই তিনি তিনজন পণ্ডিতকে বললেন, তাঁরা গিয়ে যেন নতুন রাজার খোঁজ করেন। পেলে পর খবরটা তাঁরা যেন রাজা হেরোদকেও জানান। যাতে তিনি (হেরোদ) গিয়ে শিশু রাজাকে প্রণাম জানাতে পারেন। আসলে রাজা হেরোদ নতুন রাজার আগমনের সংবাদ পেয়ে ভয় পেয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন হয়তো তাঁর রাজত্ব শেষ হয়ে গেছে। তাই তিনি তাঁর অঞ্চলের দুই বছরের কম বয়সী সব শিশুকে হত্যা করার হুকুম দিলেন। আর সৈন্যরা সব শিশুকে হত্যা করতে শুরু করে দিল। এদিকে পণ্ডিতগণ নবজাত শিশু যীশুকে প্রণাম জানিয়ে অন্য পথে নিজেদের দেশে চলে গেলেন। রাতে ঈশ্বরের এক দূত স্বপ্নে যোসেফকে দেখা দিলেন। দূত তাঁকে বললেন, শিশুটিকে ও তাঁর মাকে নিয়ে মিশর দেশে পালিয়ে যাও। আমি না বলা পর্যন্ত সেখানেই থাক। কারণ রাজা হেরোদ শিশু যীশুকে হত্যা করার জন্য খোঁজ করছে। তাই যোসেফ ঐ রাতেই শিশু যীশু ও মারীয়াকে নিয়ে মিশর দেশে পালিয়ে গেলেন।
যীশুর বয়স যখন প্রায় চার বছর তখন রাজা হেরোদের মৃত্যু হয়। এরপর ঈশ্বরের দূত আবার স্বপ্নে যোসেফকে দেখা দিলেন। দূত তাঁকে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন শিশু যীশু ও মারীয়াকে সঙ্গে নিয়ে ইস্রায়েল দেশে ফিরে যান। দূতের নির্দেশ অনুসারে যোসেফ তা-ই করলেন। তিনি যীশু ও মারীয়াকে নিয়ে আবার ফিরে এলেন ইস্রায়েল দেশে। এখানে এসে তিনি শুনতে পেলেন যে হেরোদের জায়গায় তাঁর ছেলে আর্থেলিউস রাজত্ব করছেন। এতে তিনি আবার ভয় পেলেন। কারণ এই রাজাও হয়ত তাঁর পিতা হেরোদের মতো করে শিশু যীশুকে খুঁজতে পারেন। তাই তাঁরা গালিলেয়ায় চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে তাঁরা নাজারেথ নামে একটি শহরে বাস করতে লাগলেন।
যীশুর জন্মের পর ইহুদি নিয়ম অনুসারে যা যা করণীয় ছিল, যোসেফ ও মারীয়া তার সবই করলেন। এরপর তাঁরা শিশু যীশুকে নিয়ে নাজারেথে ফিরে গেলেন। কারণ নাজারেথ ছিল তাঁদের আপন শহর। এই শহরেই যীশুর শৈশবকাল কেটেছিল। আর এই কারণে সকলেই যীশুকে 'নাজারেথের যীশু' নামে চিনত। এই শহরের সকলের সাথে যীশুও খুব পরিচিত ছিলেন। এই শহরের মানুষের সঙ্গে যীশুর বন্ধুত্ব হতে লাগল। এখানকার আলো-বাতাসে তিনি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকলেন। এই সমাজের নিয়মকানুনও তিনি আয়ত্ত করলেন। দৈহিক দিক দিয়ে তিনি যেমন বড় হতে লাগলেন, তেমনি করে অন্তরে ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা, সহানুভূতি ইত্যাদি গুণের জন্ম হতে লাগল।
ইহুদিরা প্রতিবছর উদ্ধারপর্ব বা নিস্তারপর্ব নামে একটি মহাপর্ব পালন করত। এই পর্বটি বহুকাল আগের একটি ঘটনার স্মরণে পালন করা হতো। ইহুদিরা মিশরীয়দের হাতে বন্দী ছিল। তাদের হাত থেকে ঈশ্বর মোশী ও আরোনের নেতৃত্বে ইহুদিদের উদ্ধার করেছিলেন। সেখান থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা প্রতিশ্রুত দেশে গিয়ে বাস করতে শুরু করেছিল। সেই উদ্ধার বা নিস্তার লাভের ঘটনাটি তাঁদের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই প্রতিবছর তাঁরা এটিকে মহাপর্ব হিসেবে পালন করত। পর্বটি পালন করার জন্য তাঁরা যেরুসালেম মন্দিরে সমবেত হতো। পর্বে এসে তাঁরা তাদের সেই উদ্ধার বা নিস্তার লাভের ঘটনার স্মরণে মেষ বলি দিত ও আনন্দের সাথে ভোজ উৎসব করত। যেরুসালেম মন্দিরের চারদিকে ১৫ মাইলের মধ্যে যেসব ইহুদি বাস করত তাঁদের মধ্যে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্করা নিস্তারপর্বে প্রতিবছর যোগ দিতে বাধ্য ছিল। তাছাড়া, সারা পৃথিবীতে যত ইহুদি আছে, তারা জীবনে অন্তত একবার এই পর্বে যোগ দিত। যীশু, মারীয়া ও যোসেফের বাড়ি নাজারেথ শহরে ছিল। এই শহর যেরুসালেমের ১৫ মাইলের মধ্যেই ছিল।
এই হিসেবে যীশুর মা-বাবাও প্রতিবছর যোগ দিতেন। আরও একটি প্রথা ছিল, যেসব পুরুষ সন্তানের বয়স ১২ বছর হয়েছে, তারাও এই পর্বে যোগ দিবে। কাজেই যীশুর ১২ বছর পূর্ণ হওয়ার পর প্রথমবারের মতো তিনি যোসেফ ও মারীয়ার সাথে পর্বে যোগ দিতে গেলেন। এই পর্বে বহু লোকের সমাগম হতো।
পর্ব শেষ হওয়ার পর লোকেরা দলে দলে হেঁটে বাড়ি ফিরত। কারণ এলাকাটি ছিল পাহাড়ি। রাতের বেলায় শুধু মহিলারা একা ভ্রমণ করত না। কারণ চোর-ডাকাতের ভয় ছিল। তবে মহিলারা রওনা দিত একটু আগে। কারণ তাঁরা হাঁটতো ধীরে ধীরে। পুরুষরা একটু পরে রওনা দিত, কারণ তাঁরা দ্রুত হাঁটতো। পাহাড়ি অঞ্চলের কাছে এসে পুরুষরা মহিলাদের দলে যোগ দিত। এই কারণে মারীয়া রওনা দেওয়ার আগে ভেবেছিলেন, যীশু হয়তো যোসেফের সাথে আছেন। আবার যোসেফ ভেবেছিলেন, যীশু হয়ত মারীয়ার সাথে চলে গেছেন। এই ভেবে তারা যীশুকে মন্দিরেই ফেলে রেখে চলে এসেছিলেন। সন্ধ্যাবেলায় যখন মারীয়া ও যোসেফের একত্রে দেখা হলো, তখন তাঁরা বুঝতে পারলেন, যীশু তাঁদের কারও সাথে বা কোনো আত্মীয়স্বজনদের সাথেও নেই। এতে তাঁরা ভীষণ চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তাই তাঁরা যীশুকে খোঁজার জন্য দ্রুত রওনা দিলেন যেরুসালেমের দিকে।
পর্ব শেষ হয়ে গেলেও শাস্ত্রবিষয়ক পণ্ডিতগণ একত্রিত হয়ে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আরও কিছু আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতেন। মন্দিরে বসে পণ্ডিতগণ আলোচনা করছিলেন। যীশু সেই পণ্ডিতদের মাঝখানে বসে তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলেন ও শুনছিলেন। যীশুর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও জ্ঞান দেখে তাঁদের সকলেই খুব আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন।
ঠিক এই সময়ে মারীয়া ও যোসেফ ওখানে গিয়ে হাজির হলেন। তাঁরা দেখতে পেলেন যীশু পণ্ডিতদের মাঝখানে বসে আলোচনায় অংশগ্রহণ করছেন। মারীয়া যীশুকে ফিরে পেয়ে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি বললেন, 'খোকা, এটা তোমার কেমন ব্যবহার? ভেবে দেখ তো, তোমার বাবা ও আমি কত উদ্বিগ্ন হয়েই না তোমাকে খুঁজছিলাম!' এতে যীশু যে উত্তর দিলেন তাতে তাঁরা সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। যীশু বললেন, 'তোমরা কেন আমাকে খুঁজছিলে? তোমরা কি জানতে না যে আমাকে আমার পিতার গৃহেই থাকতে হবে?' এই কথার অর্থ তাঁরা কেউ তখন কিছুই বুঝলেন না।
যীশু বলেছেন, তাঁকে পিতার গৃহে থাকতে হবে। এই কথার দ্বারা আমরা বুঝতে পারি, পিতা ঈশ্বর হলেন তাঁর প্রকৃত পিতা, আর যোসেফ হলেন তাঁর পালক পিতা। কুমারী মারীয়ার গর্ভে যীশুর জন্ম হয়েছিল পবিত্র আত্মার প্রভাবে। তিনি ঈশ্বরের সন্তান। যীশু পূর্ণ মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছেন কিন্তু তিনি নিজে পূর্ণ ঈশ্বর। তাঁকে পিতার গৃহে থাকতে হবে এই কথার দ্বারা তিনি যোসেফ ও মারীয়াকে বোঝালেন যে তিনি পিতার কাজে জীবন উৎসর্গ করতেই জন্ম নিয়েছেন।
মারীয়া ও যোসেফের ঘরে তিনি জন্ম নিয়েছেন। তাঁদের আদর-যত্নে তিনি বড় হয়েছেন। বাবা-মায়ের প্রতি বাধ্যতার মতো প্রয়োজনীয় গুণটি তাঁর মধ্যে ছিল। তাই তিনি মন্দিরের আলোচনা ফেলে রেখে বাবা-মায়ের সাথে নাজারেথে ফিরে গেলেন। পরিবারের সমস্ত কাজকর্মে তিনি অংশগ্রহণ করতেন। তিনি দৈহিকভাবে বড় হতে লাগলেন। এর পাশাপাশি তিনি বিদ্যাশিক্ষা, ধর্মীয় জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতাও লাভ করতে লাগলেন। ঈশ্বরের ও মানুষের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগল। ঈশ্বরের কাছ থেকে পেতে লাগলেন প্রজ্ঞা আর মানুষের কাছ থেকে পেতে লাগলেন স্নেহ-ভালোবাসা। এভাবে তিনি একজন পরিপক্ব মানুষ হতে লাগলেন।
| কাজ: যীশুর শৈশবের সাথে তোমার শৈশবের কোন কোন দিকে মিল খুঁজে পাও তা নিজের খাতায় । |
Read more