hsc

ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল (অধ্যায়-২)

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

2k
Please, contribute by adding content to ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন : কোম্পানি আমল.
Content
Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

আনিস দুপুরে মধ্যনগর বাজারের একটি হোটেলে খাবার খেতে গেলে খাবারের মেন্যুতে শূকরের মাংস দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। এটি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয় যা বিদ্রোহের রূপ নেয়।

সিপাহি বিদ্রোহের
সাঁওতাল বিদ্রোহের
পলাশী বিদ্রোহের
পাইক বিদ্রোহের
নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

তাহিরপুর গ্রামের কিবরিয়া সাহেব একজন সম্ভ্রান্ত কৃষক। তিনি একটি কৃষক সমিতির সভাপতি। তিনি কৃষকদের এক সভায় বলেন, সমাজের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের প্রতিরোধমুখী হতে হবে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম কৃষকরাই আন্দোলন করেছিল।

নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

তাহিরপুর গ্রামের কিবরিয়া সাহেব একজন সম্ভ্রান্ত কৃষক। তিনি একটি কৃষক সমিতির সভাপতি। তিনি কৃষকদের এক সভায় বলেন, সমাজের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের প্রতিরোধমুখী হতে হবে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম কৃষকরাই আন্দোলন করেছিল।

Please, contribute by adding content to ওয়ারেন হেস্টিংস: নিয়ামক আইন (১৭৭৩ খ্রি.).
Content
Content added || updated By

Anglo Mysore War : Haydar Ali

অষ্টাদশ শতকের ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে অজ্ঞাত কুলশীল উচ্চাকাঙ্ক্ষী, দুঃসাহসিক ব্যক্তিদের আবির্ভাব লক্ষ করা যায়। এদের মধ্যে মহীশূরের হায়দার আলী, পাঞ্জাবের রঞ্জিৎ সিংহ, বাংলার আলিবর্দী খান অন্যতম। হায়দার আলী ১৭২১ খ্রিষ্টাব্দে বুদিকোটে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ফতে মোহাম্মাদ মহীশূরের এক সৈনিক ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর হায়দার আলীও এক ভাগ্যান্বেষী সৈনিক হিসেবে জীবন শুরু করেন। হায়দার আলী লেখাপড়া জানতো না। তবে তিনি অসীম সাহস, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন এবং অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। যে কারণে তিনি মহীশূরের সেনাপতি নঞ্জরাজের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। এ সময় তিনি হায়দ্রাবাদ এবং ত্রিচিনী পল্লিতে ফরাসি যুদ্ধে অংশ নিয়ে ইউরোপীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দে হায়দার আলী দিন্দিগুলের ফৌজদার পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। মূলত এখান থেকেই হায়দার আলীর ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ক্ষমতা গ্রহণ

মহীশূরের রাজ পরিবারের দুর্বলভার সুযোগে সেনাপতি নজবাজ ও তার প্রাতা দেবরাজ মহীশূরের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। রাজ্যের সবল ক্ষমতা তাদের হাতে কুক্ষিগত হয়। তাদের দুঃশাসনে জনসাধারণ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে, তার ওপর মারাঠা আক্রমণে মহীশূরের আচল অবস্থা সৃষ্টি করে। এই সুযোগে হায়দার আলী তার অশ্রয়দাতা নজরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। হায়দার আলী তার প্রশাসনিক দক্ষতাবলে শীগ্রই রাজ্যে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্যসমূহের ওপর আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট হন। ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বেদনুর, সুজা, কানারা, সাভানুর অঞ্চল দখল করে। এ সময় মারাঠা ও নিজাম রাজ্যের কিছু অংশ দখল করলে মারাঠাদের সাথে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দে পানি পথের তৃতীয় যুদ্ধে আহমদ শাহ আবদালীর নিকট মারাঠারা পরাজিত হলেও একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। মারাঠাদের পানির সাথে তুলনা করা যায়। পানিতে আঘাত করলে যেমন প্রতিগাত করে না, আঘাতের চিহ্নও থাকে না। সুতরাং মারাঠারা আবার মাধব রাও-এর নেতৃত্বে পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং দাক্ষিণাত্যে সাম্রাজ্য বিস্তারে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কিন্তু দক্ষিণ ভারতে বাধা ছিল মহীশূর রাজ্য এর শাসক হায়দার আলী সঙ্গত কারণেই মারাঠারা দক্ষিণ ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে গেলেই হায়দার আলীর সাথে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ

দক্ষিণ ভারতে পতনশীল মোগল সাম্রাজ্যের আধিপত্য নিয়ে ইংরেজ, ফরাসি, হায়দারাবাদের নিজাম, মারাঠা ও মহীশূর এই পঞ্চশক্তির মধ্যে শক্তি প্রদর্শন চলে। মহীশূরে হায়দার আলীর উত্থানে ইংরেজরা শঙ্কিত হয়ে পড়ে। মহীশূর রাজ্যের ক্ষমতা দখলের ব্যাপারে ফরাসিগণ হায়দার আলীকে সাহায্য করেছিল, সে কারণে উপমহাদেশে ইঙ্গ- ফরাসি যুদ্ধে হায়দার আলী তার মিত্র ফরাসিদের পক্ষ অবলম্বন করে। বিশেষ করে তৃতীয় কর্নাটকের যুদ্ধে হায়দার আলী ফরাসিদের সাহায্য করায় ইংরেজদের সাথে তার বিরোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। হায়দার আলী নিজের নিরাপত্তার জন্য হায়দারাবাদের নিজামের সাথে প্রতিরক্ষামূলক মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষর করেন। ফলে নিজাম ইংরেজ পক্ষ ত্যাগ করেন। এভাবে নিজাম ও হায়দার আলীর যৌথ বাহিনী কর্নাটক আক্রমণ করলে প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। ত্রিনোমালির যুদ্ধে হায়দার আলী ইংরেজদের নিকট পরাজিত হলে নিজাম হায়দার আলীর পক্ষ ত্যাগ করে এবং মাদ্রাজ সরকারের সাথে সন্ধি স্থাপন করেন। ইতোমধ্যে ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দে হায়দার আলী আকস্মিক মাদ্রাজ আক্রমণ করে মাদ্রাজ সরকারকে সন্ধি করতে বাধ্য করেন। এ সন্ধির শর্তানুযায়ী উভয়েই পরস্পরের বিজিত স্থানসমূহ, অধিকার করে, যুদ্ধ বন্দী ফেরত দেন এবং মহীশূর রাজ্য অপর কোনো শত্রু দ্বারা আক্রমণ হলে ইংরেজ সরকার হায়দার আলীকে সামরিক সাহায্য দিতে স্বীকৃত হন।

দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৮০-৮৪ খ্রি.)

মারাঠাগণ হায়দার আলীর রাজ্য আক্রমণ করলে পূর্ব শর্তানুযায়ী ইংরেজগণ হায়দার আলীকে সাহায্য না করায় তিনি ইংরেজদের ওপর রুষ্ট হন। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ফরাসিরা আমেরিকার পক্ষে যোগদান করলে ভারতবর্ষে ইংরেজরা ফরাসি অধিকৃত 'মাহে' বন্দরটি অধিকার করে নেয়। এ কারণে হায়দার আলী নিজামকে সঙ্গে নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং কর্নেল বেইলীকে পরাজিত করে আর্কট দখল করেন। এদিকে ওয়ারেন হেস্টিংস স্যার আয়ার কুটের অধীনে এক দল সৈন্য প্রেরণ করেন। উক্ত সেনাদল পোর্টোনোভার যুদ্ধে হায়দার আলীকে পরাজিত করেন (১৭৮১ খ্রি.)।। অন্য দিকে তাজ্ঞোরে হায়দার আলীর পুত্র টিপু সুলতানের হাতে কর্নেল ব্রেথওয়েট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ইত্যবসরে ফরাসি নৌ সেনাপতি সাফ্রেইন সসৈন্যে হায়দার আলীর সাহায্যে অগ্রসর হলে ইংরেজদের অবস্থা সংকটজনক হয়ে ওঠে। ১৭৮২ খ্রিষ্টাব্দে হায়দার আলী মৃত্যুবরণ করেন। অতঃপর তার সুযোগ্য পুত্র টিপু সুলতান ইংরেজদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি মাথুসকে সসৈন্যে বন্দী করতে সক্ষম হন। এদিকে ইউরোপে ইঙ্গ-ফরাসিদের মধ্যে ভার্সাই সন্ধি দ্বারা শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় উপমহাদেশেও ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। দেশপ্রেমিক টিপু সুলতান একাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান। অবশেষে ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মাদ্রাজ সরকার "ম্যাঙ্গোলোরের সন্ধি" স্থাপন করলে দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের অবসান ঘটে। এর ফলে উভয় পক্ষ বন্দী বিনিময় করেন এবং পরস্পরের বিজিত রাজ্য ফিরিয়ে দেন।

হায়দার আলীর চরিত্র ও কৃতিত্ব

সামান্য একজন সৈনিক হয়ে জীবন শুরু করে নিজের মেধা এবং কর্মদক্ষতা গুণে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা, ইংরেজদের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে জয় লাভ করা হায়দার আলীর পক্ষেই সম্ভব ছিল। তিনি মহীশূরকে একটি স্বাধীন রাজ্যের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিলেন। মন্টেস্কুর বিখ্যাত নীতি "স্বৈরতন্ত্র কেবলমাত্র সন্ত্রাস ও ভীতির দ্বারা কার্যকরী হয়" এই নীতি হায়দার আলী অনুসরণ করেন। ইংরেজ ঐতিহাসিকগণ হায়দার আলীর চরিত্র নানাভাবে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করলেও মহীশূরের জনগণ তাকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। ঐতিহাসিক ক্যাম্পবেল বলেন, "হায়দার আলী ছিলেন একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সম্ভবত ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত প্রতিভার অধিকারী যেকোনো ব্যক্তির ন্যায় প্রকৃতিপ্রদত্ত অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী।" হায়দার আলী নিরক্ষর ছিলেন। মহামতি আকবর ও মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহও নিরক্ষর ছিলেন কিন্তু তারা প্রকৃতি প্রদত্ত প্রতিভা ও পর্যবেক্ষণ দ্বারা জ্ঞান আহরণ করেন। হায়দার আলীও ছিলেন ঐ স্তরের প্রতিভাবান।

হেস্টিংসের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন

মারাঠা ও মহীশূর যুদ্ধের পর থেকে হেস্টিংস দারুন অর্থনৈতিক সংকটে পরেন। এ অবস্থায় যেকোনো অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনে হেস্টিংস আত্মনিয়োগ করেন। যার কারণে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। এ সকল অভিযোগের মধ্যে-

১। ব্রিটিশ সৈন্য ভাড়ায় খাটানোর অভিযোগ অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার সাথে ৪০ লক্ষ টাকার চুক্তিতে ১৭৭৪
খ্রিষ্টাব্দে রোহিলা যুদ্ধে হেস্টিংস ব্রিটিশ সৈন্য ভাড়ায় খাটান। অর্থের বিনিময়ে ব্রিটিশ সৈন্য ভাড়ায় খাটানোর জন্য ব্রিটিশদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। এ কারণে হেস্টিংসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনয়ন করা হয়। ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা ছিল হেস্টিংস-এর বিরাট ভুল।

২। রানি ভবানীর অভিযোগ: ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এবং ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্লাবনে ব্যাপক প্রাণহানী এবং ফসল বিনষ্টের ফলে রানি ভবানীর খাজনা দিতে বিলম্ব হয়। এ বিলম্বের কারণে হেস্টিংস তাকে জমিদারিচ্যুত করে জনৈক দুলাল রায়কে রাজশাহীর জমিদার নিযুক্ত করেন (১৭৭৪ খ্রি.)। ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে রানি ভবানী কলকাতা কাউন্সিলে অভিযোগ দাখিল করেন। অবশ্য পরে তাকে জমিদারি ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

৩। নন্দকুমারের ফাঁসি : বৈধ-অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন এবং পরিষদের অধিকাংশ সদস্যের অসন্তুষ্টির কারণে চারদিক থেকে হেস্টিংসের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসতে থাকে। এ সকল অভিযোগের মধ্যে ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজ নন্দকুমার কলিকাতা কাউন্সিলে এক পত্রে হেস্টিংসের বিরুদ্ধে মীর জাফরের স্ত্রী মুন্নী বেগমের নিকট থেকে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ আনয়ন করেন। পরিষদের সদস্যগণ নন্দকুমার কর্তৃক আনীত অভিযোগের তদন্ত দাবি করলে হেস্টিংস তা নাকচ করে দিয়ে পরিষদ ভেঙে দেন। হেস্টিংসও আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা নন্দকুমারের বিরুদ্ধে মোহনপ্রসাদ নামক ব্যক্তির দ্বারা সুপ্রিম কোর্টে জালিয়াতি অভিযোগ উত্থাপন করেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারে নন্দকুমারের ফাঁসি হয় (১৭৭৫ খ্রি.)। হেস্টিংস কর্তৃক নন্দকুমারের ফাঁসি ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করে। নন্দকুমারের বিচার নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা রয়েছে। কোনো কোনো মনীষীরা বলেছেন বিচার নিরপেক্ষ হয়েছে। আবার অনেকে বলেছেন বিচার কলঙ্কজনক হয়েছে। কলঙ্কজনক হয়েছে এইদিক থেকে যে, জালিয়াতির অপরাধে অপরাধী ব্যক্তিকে ইংল্যান্ডের আইনে ফাঁসির বিধান থাকলেও ভারতীয় আইনে এরূপ কোনো বিধান ছিল না। তারপরও রেগুলেটিং আইন মোতাবেক ভারতে যে সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হয়েছিল তা শুধু ইংরেজ কর্মচারী অপরাধীদের বিচার করার জন্য। কোনো ভারতীয়দের বিচার করার জন্য নয়। সেদিক থেকে বিচার করলে সুপ্রিম কোর্ট । কর্তৃক নন্দকুমারের ফাঁসি যুক্তিসঙ্গত হয়নি।

৪। চৈৎ সিংহের প্রতি অবিচারের অভিযোগ : মারাঠা ও মহীশূর যুদ্ধে কোম্পানির অনেক অর্থ নষ্ট হয়। ফলে কোম্পানি অর্থ সংকটে পতিত হয়। অর্থ সংকট দূর করতে হেস্টিংস হোক সেটা বৈধ কিংবা অবৈধ যেকোনো উপায় অবলম্বন করতে দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি এক সন্ধির মাধ্যমে অযোধ্যার নবাবের নিকট থেকে বারাণসীকে পৃথক করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন এবং চৈৎসিংহকে বারাণসীর জমিদার নিযুক্ত করেন। তখন থেকে চৈৎসিংহ কোম্পানিকে নিয়মিত বাৎসরিক কর প্রদান করত। কিন্তু হেস্টিংস তার কাছে নানা অজুহাতে অর্থ দাবি করেন। প্রথমে ফরাসি আক্রমণের মিথ্যা অযুহাতে ৫ লক্ষ টাকা গ্রহণ করেন। ২য় বারে জোর পূর্বক ২ লক্ষ টাকা এবং ২ হাজার অশ্ব দাবি করেন। অশ্ব প্রেরণে দেরি হলে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে চৈৎ সিংহের আত্মীয় নারায়ণকে বার্ষিক ৪০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে বারাণসীর জমিদারি অর্পণ করেন। চৈৎ সিংহের প্রতি হেস্টিংসের এরূপ নির্মম ব্যবহার ও নিষ্ঠুরতা ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে হেস্টিংসের চরিত্রকে ভীষণভাবে কলঙ্কিত করেছে।

৫। অযোধ্যার বেগমদের ওপর অত্যাচার: সুজাউদ্দৌলার স্ত্রী ও আসফ উদ্দৌলার মাতা অযোধ্যার বেগম নামে পরিচিত ছিলেন। হেস্টিংস অযোধ্যায় একদল সৈন্য প্রেরণ করে বেগমের ওপর অত্যাচার চালিয়ে ৭৬ লক্ষ টাকা আদায়সহ জোরপূর্বক স্বর্ণ-অলঙ্কার ছিনিয়ে নেন। ঐতিহাসিক লয়ালের মতে, হেস্টিংস কর্তৃক চরম নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে অযোধ্যার বেগমের নিকট অর্থ সংগ্রহ করা একটি নীচ প্রকৃতির কর্ম ব্যতীত আর কিছুই নয়।

এ সকল কর্ম দ্বারা বর্বরতার দিক থেকে হেস্টিংস ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করেন।

হেস্টিংসের পদত্যাগ ও ইম্পিচমেন্ট

হেস্টিংসের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ কমন্সসভায় উত্থাপিত হতে থাকে। যেমন- পরিষদের সাথে মত বিরোধ, রোহিলা যুদ্ধে ভাড়াটিয়া হিসেবে ব্রিটিশ সৈন্য অংশগ্রহণ, অন্যায়ভাবে নন্দ কুমারের ফাঁসি, চৈৎ সিংহের প্রতি অবিচার, রানি ভবানীকে জমিদারি চ্যুত, অযোধ্যার বেগমের সর্বস্ব লুণ্ঠন ইত্যাদি। এ সকল অভিযোগের মুখে ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পদত্যাগ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাকে ইম্পিচ করা হয়। ১৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ বছর পর্যন্ত হেস্টিংসের বিচার কার্যক্রম চলে। তাকে মানবজাতির শত্রু বলে অভিযুক্ত করা হয়। স্বদেশবাসীর কৃপায় হেস্টিংস মুক্তি পেলেও আত্মগ্লানিতে তিলে তিলে অবশেষে ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

হেস্টিংসের কৃতিত্ব বিচার

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের এক দুর্যোগময় মুহূর্তে হেস্টিংস বাংলার শাসনভার গ্রহণ করেন। ইতিহাসে তিনি একটি বিতর্কিত চরিত্র। ইংরেজ বাগ্মি মেকলে, বার্ক এবং ঐতিহাসিক মিল ও বেভারিজ তার চরিত্রের কঠোর সমালোচনা ও তীব্র নিন্দা করছেন। অন্যদিকে ড. স্মিথ সহ আধুনিক ঐতিহাসিকগণ ভারতবর্ষে ক্লাইভ প্রতিষ্ঠিত শিশু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করণে তাঁর বুদ্ধিমত্তা, সাহসিকতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সাংগঠনিক প্রতিভার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। পি.ই রবার্টসের মতে, "সম্ভবত হেস্টিংস ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ইংরেজ শাসক। কিছুটা নৈতিক দোষ থাকা সত্ত্বেও তিনি গতিশীল ও উর্বর মস্তিষ্ক, অক্লান্ত শক্তি এবং অটুট মনোবলের অধিকারী ছিলেন।" ভারতবর্ষে তিনি যা কিছু করছেন সবই ইংরেজ জাতির স্বার্থে করেছেন। তার পরও তাকে পদচ্যুতি, ইস্পিচমেন্ট এবং সাত বছরের বিচারের সম্মুখীন করা হয়। তাই তিনি মৃত্যুর পূর্বে দুঃখ করে বলেছিলেন, "আমি আপনাদের সবকিছু দিয়েছিলাম অথচ আপনারা আমাকে পুরস্কার স্বরূপ দিলেন আত্মসাতের অভিযোগ, অপমান এবং অবিশ্বাসের যাতনা।"

ভারতের ব্রিটিশ শাসনের এক ক্লান্তি লগ্নে হেস্টিংস শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তখন ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের প্রভাবে বাংলার অর্থনীতি বিপর্যস্ত। ইংরেজ কর্মচারীর দুর্নীতির রাহু গ্রাস, দ্বৈতশাসনের কুফলে চারদিকে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা। এ অবস্থা থেকে তিনি ব্রিটিশ ভারতকে উত্তরণ করতে সক্ষম হন। শাসক হিসেবে হেস্টিংসের অন্যতম সাফল্য হলো দ্বৈতশাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজস্ব আদায়ের ভার কোম্পানির কালেক্টর নামক কর্মচারীদের ওপর ন্যস্ত করা। অত্যাচার এবং উৎপীড়নের অভিযোগে ডেপুটি নায়েবের পদ দুটি বাতিল করে তিনি রেজা খান এবং সেতাব রায়কে বিচারের জন্য কলকাতায় প্রেরণ করেন।

হেস্টিংস রাজস্ব বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করেন। তিনি রাজস্বের ভার কালেক্টর নামে ইংরেজ কর্মচারীদের ওপর ন্যস্ত করেন। রাজস্ব বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে এবং সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য রাজকোষ মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করেন। রাজস্ব বোর্ড গঠন করেন। রাজকোষকে সমৃদ্ধশালী করতে ভূমিরাজস্ব পাঁচ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি অবৈধ উপায়ে অর্থ আত্মসাৎ, নন্দ কুমারের ফাঁসি, চৈৎ সিংহের প্রতি অবিচার, অযোধ্যার বেগমের প্রতি দুর্ব্যবহার, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি কাজের জন্য তিনি নিন্দিত ও নন্দিত উভয়ই হয়েছেন।

পিটের ভারত শাসন আইন-১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দ (Pitts Indian Government Act- 1784 AD)

১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে রেগুলেটিং আইনের দোষ-ত্রুটি সংশোধনের জন্য ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট ভারতীয়দের জন্য একটি আইন প্রণয়ন করেন। যা ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে পিটের ভারত শাসন আইন নামে খ্যাত। রেগুলেটিং আইন ১১ বছর বলবৎ থাকার পর উইলিয়াম পিট এই আইন প্রণয়ন করলেন। এ আইন দ্বারাই হেস্টিংসকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নরের পথ থেকে (১৭৭২ নিয়োগ) গভর্নর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। রেগুলেটিং অ্যাক্ট ১৭৭৩ অনুযায়ী কোম্পানির ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। হেস্টিংস ভারতবর্ষে কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। যা ইংল্যান্ড পার্লামেন্ট সমর্থন করতে পারেনি। রেগুলেটিং বা নিয়ামক আইনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ইংল্যান্ডের সচেতন জনসাধারণের চোখে পড়ে। তাছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশে কোম্পানি প্রশাসনিক দুর্নীতির কথা হেস্টিংস নিজেই স্বীকার করেছেন। এ সকল কারণে রেগুলেটিং আইনের ত্রুটিগুলো সংশোধন করে কোম্পানির ওপর ব্রিটিশ সরকারের ক্ষমতা সুস্পষ্ট এবং সুদৃঢ় করার জন্য ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে পিটের ভারত শাসন আইন প্রণীত হয়।

পিটের ভারত শাসন আইনের ধারাসমূহ: ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম পিট কর্তৃক প্রণয়নকৃত ভারত শাসন আইনের প্রধান ধারাগুলো তুলে ধরা হলো-

(১) এই আইন দ্বারা ছয়জন প্রিভি কাউন্সিলারকে নিয়ে গঠিত (বোর্ড অব কন্ট্রোল) নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের ওপর কোম্পানির সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। মূলত তিনি ভারত বিষয়ক মন্ত্রীতে পরিণত হন।

(২) এ আইনে কোম্পানির তিনজন ডাইরেক্টর দ্বারা গঠিত একটি সিক্রেট কমিটির মাধ্যমে বোর্ড অব কন্ট্রোলের গোপন নির্দেশ ও সিদ্ধান্ত কোম্পানির ভারতস্থিত কর্মচারীদের নিকট প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

(৩) এ আইনের দ্বারা বোর্ড অব কন্ট্রোল ও সিক্রেট কমিটির সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা সংশোধন করার ক্ষমতা থেকে অংশীদার সভাকে বঞ্চিত করা হয়।

(৪) এ ধারায় উল্লেখ করা হয়, ভারতের শাসনকার্যে গভর্নর জেনারেলকে একজন সেনাপতি ও দুজন কাউন্সিলার করবে।

(৫) গভর্নর জেনারেলকে ভারতের সকল প্রেসিডেন্সির কার্যকলাপ তদারক ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। ফলে মুম্বাই ও মাদ্রাজ সরকারের ওপর বাংলা প্রেসিডেন্সির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। কেননা গভর্নর জেনারেল ছিলেন মূলত বাংলা প্রেসিডেন্সির প্রধান। ফলে ভারতের সকল প্রেসিডেন্সিতে একই রকম প্রশাসনিক নিয়ম-কানুন গড়ে ওঠে। ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে একটি অতিরিক্ত আইন প্রণয়ন করে বিশেষ ক্ষেত্রে কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করার এবং প্রধান সেনাপতির পদ গ্রহণ করার ক্ষমতা গভর্নর জেনারেলকে প্রদান করা হয়েছিল।

(৬) পিটের ভারত শাসন আইনে এ ঘোষণাও বিধিবদ্ধ করা হয় যে, "রাজ্য জয় ও সাম্রাজ্য বিস্তার ইংল্যান্ডের জাতীয় মর্যাদা ও নীতির বহির্ভূত।"

১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পিটের ভারত শাসন আইন কার্যকর থাকে। তৎকালীন ইংল্যান্ড ও ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় এ আইনের কার্যকারিতা অনস্বীকার্য। এ আইনের দ্বারা রেগুলেটিং আইনের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সংশোধিত করে : গভর্নর জেনারেলের মর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় এবং মাদ্রাজ ও মুম্বাই প্রেসিডেন্সি দুটির ওপর কলকাতা প্রেসিডেন্সির কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। ভারতীয় সাম্রাজ্য সম্পর্কে কোম্পানির সার্বভৌম ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে তা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওপর ন্যস্ত করা হয়।

পিটের ভারত শাসন আইনের ত্রুটি: উইলিয়াম পিটের ভারত শাসন আইন একেবারে ত্রুটিমুক্ত ছিল না। এ আইনের ত্রুটির মধ্যে-

প্রথমত, ভারতীয় সাম্রাজ্য পার্লামেন্টের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলেও ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কোম্পানি তার স্বাধীন বাণিজ্য নীতি চালিয়ে যায় এবং দ্বৈতশাসন নীতি প্রবর্তিত হয়।

দ্বিতীয়ত, কোম্পানি ও বোর্ডের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে কোম্পানি ভারতের শাসনকার্য পরিচালনায় উদাসীন হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, ডাইরেক্টর সভাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বোর্ড অব কন্ট্রোলকে দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে বোর্ড ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার নিয়ন্ত্রণে ছিল। অপরপক্ষে ভারতের শাসন সংক্রান্ত ব্যাপারে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার কোনো দায়িত্ব ছিল না।

পিটের ভারত শাসন আইনের গুরুত্ব ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষমতা কোম্পানির নিকট থেকে ব্রিটিশ সরকার গ্রহণের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮৫৮ পর্যন্ত পিটের ভারত শাসন আইনের কার্যকারিতা ছিল। তৎকালীন ইংল্যান্ড এবং ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় পিটের ভারত শাসন আইনের ভূমিকা অপরিসীম

প্রথমত, এ আইনের দ্বারা ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে রেগুলেটিং আইনের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করা হয়।

দ্বিতীয়ত, গভর্নরকে গভর্নর জেনারেল পদে উন্নীত করে মর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়।

তৃতীয়ত, মাদ্রাজ ও মুম্বাই প্রেসিডেন্সি দুটির ওপর কলকাতা প্রেসিডেন্সির কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়।

চতুর্থত, ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায় একজন মন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। তিনিই ভারত বিষয়ক মন্ত্রীতে পরিণত হন।

পঞ্চমত, এ আইন দ্বারা পর রাজ্য গ্রাস নীতি বাতিল করা হয়। ভারতীয় সাম্রাজ্য সম্পর্কে কোম্পানির সার্বভৌম ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে তা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওপর ন্যস্ত করা হয়।

ভারতীয় সাম্রাজ্য সম্পর্কে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলেও ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কোম্পানি স্বাধীনভাবেই বাণিজ্য নীতি চালিয়ে যান। কোম্পানি ও বোর্ডের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগিতে কোম্পানি ভারতের শাসনকার্য পরিচালনায় উদাসীন হয়ে পড়ে।

Content added By

Lord Cornwallis (1786-1793 AD)

১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস পদত্যাগ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে স্যার জন ম্যকফারসন এক বছরের জন্য অস্থায়ীভাবে ভারতবর্ষে গভর্নর জেনারেল পদে নিযুক্ত হন। ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিশ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং পার্লামেন্ট কর্তৃক বিশেষ ক্ষমা নিয়ে ভারতবর্ষে আগমন করেন। ভারতবর্ষের তদানীন্তন রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে কর্ণওয়ালিশের ন্যায় একজন অভিজ্ঞ শাসকের প্রয়োজন ছিল। সম্ভ্রান্ত বশোদ্ভূত, আমেরিকা স্বাধীনতা যুদ্ধে সফল সেনাপতি এবং পিটের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে তার সুনাম ছিল। তার (১৭৮৬-১৭৯৩) শাসনকাল রাজ্য বিস্তার অপেক্ষা সংস্কারমূলক কাজের জন্য বিখ্যাত। বর্তমান ভারতের শাসনতন্ত্রের ভিত্তি অনেকটা তারই রচনা। লর্ড কর্ণওয়ালিশের সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডের অনুকরণে ভারতের শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ তিনি ইংল্যান্ডের আইন ও শাসনব্যবস্থাকে শ্রেষ্ঠ ও আদর্শ মনে করতেন। তার সংস্কার কার্যাবলির মধ্যে- (১) কোম্পানির কর্মচারীদের দুর্নীতি দমন (২) বিচার বিভাগ সংস্কার (৩) বাণিজ্য সংস্কার এবং (৪) ভূমি সংস্কার ছিল অন্যতম।

কর্মচারীদের দুর্নীতি দমন

ভারতবর্ষে আগমন করে তিনি কোম্পানির কর্মচারীদের স্বজনপ্রীতি এবং দুর্নীতি দেখে ব্যথিত হন। কর্মচারীগণ কোম্পানির স্বার্থ ভুলে গিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালনা করত এবং অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করত। অবৈধ উপায়ে অর্থ যাতে উপার্জন করতে না হয় সে জন্য কর্ণওয়ালিশ তাদের বেতন বৃদ্ধি করলেন, কর্মচারীদের নিজ নিজ সম্পত্তির হিসাব কোম্পানির নিকট দাখিল করতে বাধ্য করলেন। শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার জন্য 'Cornwallis Code' বা কর্ণওয়ালিশ বিধি প্রণয়ন করেন এবং ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের গোড়াপত্তন করেন।

বিচার বিভাগ সংস্কার

বিচার বিভাগের সংস্কার কর্ণওয়ালিশের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। তিনি বিচার বিভাগকে রাজস্ব বিভাগ থেকে পৃথক করেন। সদর নিজামৎ তত্ত্বাবধানে তিনি ৪টি (কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, পাটনা ও ঢাকায়) ভ্রামাণ্য বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এসব বিচারালয়ে ফৌজদারি বিচারকার্য সম্পন্ন করা হতো। নিষ্ঠুর দণ্ডাদেশ বিলুপ্ত করলেও নরহত্যার অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির উপযুক্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়। ঐতিহাসিক পি.ই রবার্টস বলেন, "দেওয়ানি ও ফৌজদারি সংক্রান্ত বিচার সম্পর্কে হেস্টিংস যে সকল ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন কর্ণওয়ালিশ তা সম্পন্ন করেন"। কর্ণওয়ালিশ প্রদেশগুলোকে জেলায় এবং জেলাগুলোকে থানায় রূপান্তর করেন। প্রত্যেক থানায় একজন দারোগা নিযুক্ত করেন। জেলার সর্বময় কর্তা ছিলেন জেলা প্রশাসক। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে পুলিশ বিভাগের ওপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা অর্পণ করেন। ফলে ইতঃপূর্বে স্থানীয় জমিদারের ওপর শাস্তি শৃঙ্খলার যে দায়িত্ব ছিল তা খর্ব হয়। তিনি ভারতে আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন।

বাণিজ্য সংস্কার

বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে কর্ণওয়ালিশ কালেক্টরগণকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবসায়-বাণিজ্যের অংশ গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কোম্পানির কালেক্টর ব্যতিরেকে কর্ণওয়ালিশ সরাসরি দেশীয় বণিকদের নিকট থেকে মালামাল সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু করেন এবং দেশীয় বণিকদের ওপর যেকোনো অত্যাচারের প্রতি তিনি কড়া নজর রাখেন।

কর্ণওয়ালিশের কৃতিত্ব

লর্ড কর্ণওয়ালিশের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ঐতিহাসিক টনসন ও গ্যারেট বলেছেন, "কর্ণওয়ালিশ ছিলেন ভারতের সর্বপ্রথম সৎ ও সততার অটল গভর্নর। তিনি যে আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তার ফলে পরবর্তীকালে অপর কোনো গভর্নর সেই সততার আদর্শ চ্যুত হতে সাহসী হননি।" তিনি আত্মপ্রত্যয়, কর্তব্যনিষ্ঠা, নম্রতা, ধৈর্য, অধ্যবসায়, উদারতা ও মিত্র সুলভ ব্যবহার প্রভৃতি গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি এদেশে ইংলিশ আইন-কানুন প্রবর্তন করেছিলেন। ঐতিহাসিক ভি.ডি মহাজন বলেছেন, "ওয়ারেন হেস্টিংস কর্তৃক যদি ভারতবর্ষে বেসামরিক শাসনব্যবস্থার গোড়াপত্তন করা হয়ে থাকে তাহলে লর্ড কর্ণওয়ালিশ কর্তৃক তার সৌধ নির্মিত হয়েছিল।"

Content added By

Permanent Settlement-1793

লর্ড কর্ণওয়ালিশের (১৭৮৬-৯৩) শাসনামলে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য সংস্কার হচ্ছে ১৭৯৩ সালের ২২ মার্চ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। যা বাংলার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ভূমি রাজস্ব নিলামে তুলে দেওয়া হতো এবং যে ব্যক্তি সর্বোচ্চ রাজস্ব দিতে স্বীকার করতেন তাকে ৫ বছরের জন্য জমির বন্দোবস্ত দেওয়া হতো। কিন্তু তাতে জমি উন্নয়ন, খাজনা ইত্যাদি বিষয়ে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। পাঁচসালা বন্দোবস্তের কুফল প্রতিকারের উদ্দেশ্যে হেস্টিংস একসালা বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেছিলেন। তাতে সমস্যা আরও বৃদ্ধি পায়।
এরূপ জমিদারির অস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সরকার, জমিদার ও প্রজা সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ অসুবিধা দূর করার জন্য কর্ণওয়ালিশ যে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে খ্যাত।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের উদ্দেশ্য

জমির অস্থায়ী বন্দোবস্ত দূর করার লক্ষ্যে ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল নিম্নরূপ-

(ক) জেলা কালেক্টরের ১৭৮৭-১৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে সংগৃহীত তথ্যভিত্তিক সুপারিশ।

(খ) কর্ণওয়ালিশ ইংল্যান্ডের জমিদার পরিবারভুক্ত থাকায় তিনি চেয়েছেন ভারতবর্ষেও একটি জমিদার শ্রেণির উদ্ভব হোক।

(গ) কর্ণওয়ালিশের রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্য ছিল এদেশে রাজভুক্ত জমিদার শ্রেণির উদ্ভাবন করা। এর ফলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম হ্রাস পাবে এবং তারা ব্রিটিশদের Collaborator হিসেবে কাজ করবে।

(ঘ) কোম্পানির রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যস্ততা কমবে, তাতে শাসনকার্যে যথেষ্ট সময় দেওয়া যাবে।

(ঙ) সর্বোপরি কোম্পানির অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে কর্ণওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

জমিজমার স্থায়ী বন্দোবস্তের লক্ষ্যে লর্ড কর্ণওয়ালিশ ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে জমিদারের সাথে দশসালা বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন।
দশসালা বন্দোবস্তের সাথে সাথে তিনি এ প্রতিশ্রুতিও দিলেন যে, কোম্পানির ডাইরেক্টর সভার অনুমোদন লাভ করতে পারলে এ বন্দোবস্তকেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হবে। ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে ১৯ সেপ্টেম্বর ডাইরেক্টর সভার অনুমোদন এসে পৌঁছলে লর্ড কর্ণওয়ালিশ সবদিক বিবেচনা করে প্রচলিত দশসালা বন্দোবস্তকে ১৭৯৩ সালে ২২ মার্চ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ততে পরিণত করেন।

এখানে উল্লেখ্য যে লর্ড কর্ণওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের উদ্ভাবক ছিলেন না। ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে পিটের ইন্ডিয়া অ্যাক্টে কোম্পানির প্রতি এ সম্পর্কে নির্দেশ ছিল। তবে একথা সত্য কর্ণওয়ালিশ যদি এ বিষয়ে নিজে সিদ্ধান্ত না নিতেন তবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু নাও হতে পারত।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যায় এবং দু বছর পরে বারাণসীতে প্রবর্তিত হয়। এ ব্যবস্থায় জমিদারগণ চিরদিনের জন্য জমির মালিক হলেন এবং রাজস্ব স্থায়ী করে দেওয়া হলো। নির্দিষ্ট খাজনা প্রদান করে জমিদারগণ পুরুষানুক্রমে জমি ভোগ দখল করবার অধিকার পায়। খাজনা বাকি পড়লে জমির অংশবিশেষ বিক্রয় করে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়। কৃষকরা নিম্ন পর্যায়ের রায়েত পরিণত হলো, জমির ওপর থেকে অধিকার চিরতরে বাঞ্চিত হলো। নাজরানা ও বিক্রয় ফি বাতিল করা হলো।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুফল

১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিশ কর্তৃক প্রবর্তীত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অনেক সুফল ছিল। উল্লেখযোগ্য সুফলগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো-

১। জমির মূল্য ও উৎপাদন বৃদ্ধি: জমিদারগণ জমির স্থায়ী মালিক এবং খাজনার পরিমাণ নির্ধারিত হওয়ায় জমিদাররা জমি উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেন। পতিত জমিতে চাষাবাদের ব্যবস্থা করেন। এতে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়।

২। কোম্পানির বজেট প্রণয়নে সুবিধা: জমিদারদের রাজস্বের পরিমাণ সুনির্দিষ্ট হওয়ায় কোম্পানি তার আয় সম্পর্কে সুনিশ্চিত হয়। ফলে কোম্পানির বাৎসরিক বাজেট প্রণয়নসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সুবিধা হয়।

৩। পূর্বের ভূমি রাজস্বের কুফল দূরীকরণ: এ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হবার ফলে ইতঃপূর্বে প্রবর্তিত বাৎসরিক পাঁচসালা কিংবা দর্শসালা বন্দোবস্তের যে সকল দোষ-ত্রুটি ছিল সেগুলো দূরীভূত হয়।

৪। ব্রিটিশ সরকারের জনপ্রিয়তা ও স্থায়িত্ব লাভ: এ ব্যবস্থায় ব্রিটিশ সরকারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ভারতীয় প্রদেশগুলো সমৃদ্ধি ও প্রগতির পথে অগ্রসর হয়।

৫। জমিদারের আয়বৃদ্ধি : জমিদারগণ জমির স্থায়ী মালিক হওয়ায় এক-তৃতীয়াংশ জমি যা পূর্বে জঙ্গলময় ছিল তা আবাদ হয়। ফলে জমিদারের আয় বৃদ্ধি পায়। ইতোপূর্বে গত পঁচিশ বছর ধরে অস্থায়ী রাজস্ব ব্যবস্থার যে কুফল ছিল তা দূরীভূত হয়।

৬। রাজভুক্ত জমিদার শ্রেণির উদ্ভব: জমিদারশ্রেণি কোম্পানির নির্ভরযোগ্য সমর্থনে পরিণত হয়। ফলে জমিদার শ্রেণি ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহসহ সকল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় থাকে। ঐতিহাসিক সিনকার এ প্রসঙ্গে বলেন, "চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অর্থনৈতিক কুফল রাজনৈতিক সুফল দ্বারা পরিমার্জিত হয়।”

৭। ব্রিটিশ সরকারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়: এ ব্যবস্থায় ব্রিটিশ সরকারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ভারতীয় প্রদেশগুলো সমৃদ্ধি ও প্রগতির পথে অগ্রসর হয়।

৮। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সৃষ্ট বিত্তশালী ব্যক্তিরা এদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যেমন- খাল খনন, বিদ্যালয় ও চিকিৎসালয় স্থাপন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারীতে প্রজাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা, গ্রাম-গঞ্জে শিল্প-কারখানা স্থাপন করে জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা করা ইত্যাদি।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কুফল

লর্ড কর্ণওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ত্রুটিমুক্ত ছিল না। বিভিন্ন দিক থেকে তার কুফল পরিলক্ষিত হয়। এ সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১। জমি জরিপ না করে রাজস্ব নির্ধারণ জমি জরিপ না করে রাজস্ব নির্ধারণ করায় রাজস্বের পরিমাণ অত্যধিক হয় এবং জমিদারির প্রকৃত সীমা নির্ধারণ না হওয়ায় অসংখ্য মামলা মোকদ্দমা সৃষ্টি হয়।

২। সূর্যাস্ত আইন: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অন্যতম কুফল হচ্ছে 'সূর্যাস্ত আইন' (Sun Set Law) প্রবর্তন। নির্দিষ্ট দিনে সূর্য উদয় থেকে সূর্যাস্তের মধ্যে নির্ধারিত রাজস্ব ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির নিকট জমিদারদের প্রদান করতে হতো, অন্যথায় তাদের জমিদারি নিলামে তুলে অনাদায়ী রাজস্ব আদায় করে নেওয়া হতো। যে আইনের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা ব্রিটিশ সরকার গ্রহণ করেছিলেন তাই ইতিহাসে সূর্যাস্ত আইন নামে খ্যাত। এই আইনের ফলে অনেক প্রাচীন জমিদার তাদের জমিদারি হারায়।

৩। ইংরেজ সরকারের রাজস্ব ক্ষতি: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থায় জমির মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পায়নি। জমিদারগণ সরকারকে যে পরিমাণ জমি থেকে রাজস্ব দিতেন ৩৭,৫০,০০০ পাউন্ড; সেই পরিমাণ জমি থেকে তারা প্রজাদের নিকট থেকে আদায় করত ১,৩০,০০,০০০ পাউন্ড।

৪। জমি উন্নয়ন ব্যাহত কর্ণওয়ালিশ আশা করছিলেন জমির উন্নতি হবে কিন্তু সে আশা পূর্ণ হয়নি। জমিদারগণ জমির উন্নয়নে চেষ্টা না করে পাইক গোমস্তাদের হাতে জমিদারি ছেড়ে দিয়ে শহরে গিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করে।

৫। পাইক গোমস্তাদের অত্যাচার: জমিদারদের অনুপস্থিতিতে পাইক-গোমস্তরা নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য রায়তগণকে নানাভাবে উৎপীড়ন করতে থাকে, ফলে প্রজাদের দুর্দশা চরমে পৌঁছায়। এ ব্যবস্থায় এক প্রকার সামন্ত প্রথার সৃষ্টি হয়।

৬। রায়েতদের ওপর জমিদারের আইনি অত্যাচার কোম্পানিকে নিয়মিত রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থতার জন্য জমিদাররা
রায়েতকে দায়ী করেন। তাই জমিদারদের হাতকে শক্তিশালী করার জন্য ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে 'হপ্তম আইন' পাস করে রায়েতদের স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি জমিদাররা দখল করার ক্ষমতা পান।

৭। মুসলমানরা অপূরণীয় ক্ষতির স্বীকার: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে মুসলমান শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা জমিদারি হারায়, হিন্দুরা জমিদারি শুরু করে। উইলিয়াম হান্টার বলেছেন, "গত ৭৫ বছরের মধ্যে বঙ্গের মুসলমান পরিবারগুলোর অস্তিত্ব পৃথিবীর বুক হতে মুছিয়া গিয়াছে, নতুবা ইংরেজদের সৃষ্ট নতুন বণিক সমাজের নিচে এ সময় ঢাকা পড়িয়া রহিয়াছে।"

৮। রায়েতদের দুর্দশা চরমে পৌঁছে: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দ্বারা জমিতে জমিদারের মালিকানাস্বত্ব স্বীকার করা হয় কিন্তু রায়েতের দখলীস্বত্ব স্বীকার করা হয় না। ফলে রায়েত ভূমি দাসে পরিণত হয়। কথায় কথায় জমি থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হয়। তারা মানবেতর জীবনযাপন করতে থাকে। রায়েত তথা কৃষকদের সর্বনাশ করার জন্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অপেক্ষা আর কোনো উত্তম ব্যবস্থা ছিল না। ইস্টিনকারের মতে, "চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারের স্বার্থ রক্ষা হয়, রায়েতদের স্বার্থহানি ঘটে। নতুন জমিদারদের দয়ার ওপর তাদের নির্ভর করতে হয়। তারা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করত কিন্তু ফল ভোগ করত জমিদাররা।"

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সংস্কার

অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা কিছুটা গুরুত্ব উপলব্ধি হলেও সামগ্রিকভাবে জনসাধারণের কাছে এ ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এ বন্দোবস্তের মারাত্মক ক্ষতির দিক বিবেচনা করে বিভিন্ন সময় আইন পাস করে তা সংস্কার বা সংশোধন করতে হয়েছে।

১। রাজস্ব আইন: ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড ক্যানিং রায়েতদের স্বার্থে রাজস্ব আইন পাস করে অন্যভাবে রায়েতদের উচ্ছেদ করা বা খাজনা বৃদ্ধি করা বন্ধ করে দিলেন।

২। প্রজাস্বত্ব আইন: ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গদেশ প্রজাস্বত্ব আইন পাস করে রায়েত তথা প্রজাদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করা হয়।

৩। রায়তি স্থিতিবানস্বত্ব আইন: ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে এ আইন পাস করে জমিস্বত্ব বিক্রয়ের অধিকার রায়েতদের দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাতিল করে রায়েত বা প্রজাদের সাথে সরাসরি জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।

Content added By

Lord Wellesly: Subsidary Alliance Policy (1798-1805 AD)

জনশোরের পর লর্ড ওয়েলেসলি ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন (১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি ছিলেন বিদ্বান, প্রতিভাবান এবং ঘোর সাম্রাজ্যবাদী শাসক।কোম্পানি শাসনের এক চরম দুর্যোগময় মুহূর্তে যখন মহীশূরে টিপু সুলতানের উত্থান, হায়দারাবাদের নিজামের যুদ্ধ প্রস্তুতি, মালব রাজাদের ইংরেজ বিরোধী কর্মসূচি, কাবুলের জামান শাহ ও ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের ভারত বিজয়ের পরিকল্পনা এবং কোম্পানির অর্থনৈতিক শোচনীয় অবস্থা তখন তিনি শাসনভার গ্রহণ করেন।
সাম্রাজ্যবাদী শাসক লর্ড ওয়েলেসলির নীতি ছিল ভারতবর্ষে ইংরেজ সাম্রাজ্য বিস্ত ার। এছাড়া তিনি মনে করতেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শক্তি, প্রতিপত্তি ও প্রভাব বিস্তার করতে পারলেই ভারতবাসীর কল্যাণ হবে। এ কারণে পূর্ববর্তী শাসক জনশোরের নিরপেক্ষ নীতি বর্জন করে দুটি সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করেন-

১। অধীনতামূলক মিত্র নীতি

২। অগ্রসর নীতি।

অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidary Alliance Policy)

ওয়েলেসলি ভারতবর্ষে পদার্পণ করে বিদেশিদের সাহায্য লাভে ভারতীয়দের ব্যকুলতা লক্ষ করেই এ নীতি গ্রহণ করেন। এ নীতিতে বলা হয়-

(ক) যে সকল ভারতীয় রাজন্যবর্গ অধীনতামূলক মিত্রতা নীতিতে আবদ্ধ হবেন তারা ব্রিটিশ সরকারের অনুমতি ব্যতীত অপর কোনো রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কিংবা সন্ধি স্থাপন করতে পারবে না।

(খ) যারা এ নীতিতে আবদ্ধ হবেন তাদের রাজ্যে একদল ইংরেজ সৈন্য পালন করবে এবং তাদের ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য নগদ অর্থ বা রাজ্যের এক অংশ ইংরেজদেরকে ছেড়ে দেবে।

(গ) মিত্রতাবদ্ধ দেশীয় রাজ্য হতে একমাত্র ইংরেজ ব্যতীত সকল ইউরোপীয়দের বিতাড়িত করতে হবে।
উপরিউক্ত শর্তাদির বিনিময়ে অধীনতামূলক মিত্রতায় আবদ্ধ দেশসমূহের নিরাপত্তার দায়িত্ব ব্রিটিশ সরকার বহন করবে।

এই মিত্রতা নীতিতে যারা স্বাক্ষর প্রদান করেন তারা হলেন হায়দ্রাবাদের নিজাম, অযোধ্যার নবাব, মারাঠা নেতা পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও, ভোসলা, সিন্ধিয়া, তাঞ্জোর, সুরাট এবং কর্নাটকের নবাবগণ। একমাত্র মহীশূরের টিপু সুলতান এই মিত্রতা নীতি ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সমর প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। লর্ড ওয়েলেসলির এ মিত্রতা নীতির নিরাপত্তার বিনিময়ে দেশীয় রাজাদের স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা হরণ করেন। এ মিত্রতা নীতি ভারতবর্ষে ইংরেজ সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন

করে। হায়দ্রাবাদের দুর্বল নিজাম সর্বপ্রথম এ নীতি গ্রহণ করে ব্রিটিশ সরকারের নিকট রাজনৈতিক স্বাধীনতা জলাঞ্জলি দেন। এ নীতি গ্রহণ করতে রাজি না হওয়ায় ইংরেজ কোম্পানির সাথে মহীশূরের ব্যঘ্র নামে খ্যাত টিপু সুলতানের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে টিপু সুলতানকে পরাজিত ও নিহত করে মহীশূর ইংরেজ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। মারাঠা শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠলে একইভাবে মারাঠাদের পরাজিত করে মারাঠা সাম্রাজ্য ইংরেজরা অধিকার করে। ভারতবর্ষের বেশ কিছু ছোট ছোট রাজ্য যেমন- তাঞ্জোর, সুরাট ও কর্ণাট বল প্রয়োগ করে তাদের অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি গ্রহণে বাধ্য করেন। অযোধ্যার মতো বড় রাজ্যও ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির নিকট মাথানত করতে বাধ্য হয়। এভাবে লর্ড ওয়েলেসলি একের পর এক ভারতের শক্তিশালী রাজ্যগুলোকে পদানত করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

ওয়েলেসলির অগ্রসরনীতি

তার অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি এবং অগ্রসর নীতি কোনো পৃথক নীতি নয়। একই উদ্দেশ্যে তিনি এ নীতি দুটি প্রয়োগ করেন। মূলত তিনি বড় শক্তিগুলোর প্রতি অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর প্রতি অগ্রসর নীতি প্রয়োগ করে ব্রিটিশ প্রাধান্য স্থাপনে সচেষ্ট হন। কুশাসনের অযুহাতে তিনি অযোধ্যা দখল করেন।

লর্ড ওয়েলেসলির সংস্কার

লর্ড ওয়েলেসলি রাজ্যগ্রাসের পাশাপাশি কিছু সংস্কারমূলক কাজও করেছিলেন। নিম্নে তাঁর উল্লেখযোগ্য সংষ্কার সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

(ক) কৃষি সংস্কার: কৃষির উন্নতির জন্য বিশেষ করে মালাবারের যে অংশ ইংরেজদের অধিকারে আসে সেখানে তিনি জমি জরিপ কাজে ড. ফ্রান্সিস বুকাননকে নিযুক্ত করেন। এদেশের কৃষি ব্যবস্থা সম্পর্কেও তিনি বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছেন যার ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সময় ভারত সরকার কৃষি সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেছিল।

(খ) বিচার সংস্কার: বিচার ব্যবস্থায় তিনি বেশ কিছু সংস্কার করেন। যেমন- (১) কোর্ট ফি পুনরায় চালু করেন (২) আপিল করার
নিয়মকানুনও আগের চেয়ে কঠিন করেন এবং সহকারী জজের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। দেউয়ানি মামলার ভার এদের হাতে ন্যস্ত করেন। (৩) রায়েতদের উচ্ছেদ করবার ও তাদেরকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়ে জমিদারদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন।

(গ) শিক্ষা সংস্কার: লর্ড ওয়েলেসলি ভারতবর্ষে ইংরেজ কর্মচারীদের শিক্ষার জন্য কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ামে একটি কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব করেন। কিন্তু বোর্ড অব ডাইরেক্টরস-এর অনুমোদন না দেওয়ায় পরে তা ভারতীয় শিক্ষা কলেজে পরিণত হয়।

লর্ড ওয়েলেসলির কৃতিত্ব বিচার

ওয়েলেসলি ছিলেন ইংল্যান্ডের অভিজাত সম্প্রদায়ের চূড়ামনি এবং উচ্চ শিক্ষিত। ভারতবর্ষ সম্পর্কে তিনি সর্বাপেক্ষা বেশি জ্ঞান রাখতেন। তিনি যখন ভারতে আসেন তখন তার বয়স ছিল ৩৭ বছর। ওয়েলেসলি ছিলেন মনে-প্রাণে সাম্রাজ্যবাদী। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিস্তার হলে ভারতবাসীর মঙ্গল হবে। এজন্য তিনি ভারতীয় রাজাদের হয় উচ্ছেদ, নতুবা ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। যা তার অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি প্রমাণ বহন করে। ছলেবলে কৌশলে ভারতে ব্রিটিশ শক্তিকে সর্বাত্মক করাই ছিল তার মূলনীতি। সে জন্য বলা হয় লর্ড ক্লাইভ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন, হেস্টিংস তা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন, আর ওয়েলেসলি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যপারেও তিনি মনোযোগী ছিলেন। তিনি ইউরোপীয়দের জন্য কলকাতায় “ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ" প্রতিষ্ঠা করেন। যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে কোম্পানির আর্থিক মন্দা দেখা দিলে তিনি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে উৎসাহিত করেন। ১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে কোম্পানির বোর্ড অব ডাইরেক্টর তার এ ব্যবস্থা অনুমোদন না করে তাঁকে স্বদেশে ডেকে পাঠান।

Content added By

Anglo Mysore War : Tipu Sultan

টিপু সুলতানের পিতা হায়দার আলী ১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দে মহীশূরের ক্ষমতা দখল করেন। অল্পকালের মধ্যেই তিনি মহীশূরকে ভারতবর্ষের একটি শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত করেন। ইংরেজদের সাথে হায়দার আলীর যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সময় তাঁর আকস্মিক স্বাভাবিক মৃত্যু হলে মহীশূরের হাল ধরেন তার সুযোগ্য পুত্র টিপু সুলতান।
পিতার অসমাপ্ত কাজ অর্থাৎ ইংরেজদের সাথে পিতার চলমান দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ তিনি চালিয়ে যেতে থাকেন এবং বেদনোর ও ব্যাঙ্কানোর অধিকার করেন। অবশেষে ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মনিটর মাধ্যমে দ্বিতীয় মহীশূর যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু টিপু সুলতান ইংরেজদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠেন।

টিপু সুলতান স্পষ্ট অনুধাবন করেছিলেন ইংরেজ শক্তি ভারতবর্ষের যেকোনো শক্তির পক্ষে আতঙ্কিত এবং অধিক বিপদের কারণ। তাই তিনি ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তিনি ফ্রান্স, মরিশাস, কাবুল প্রভৃতি দেশের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন। এর ফলে ইংরেজরা তাকে একনম্বর ভয়ানক শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন।

ভারতে ইংরেজ প্রভুত্ব স্থাপন করতে হলে টিপুকে পরাজিত করা ছাড়া বিকল্প পথ নেই। সে সময় সমগ্র ভারতে টিপু সুলতানের রাজ্য ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধশালী। টিপু সুলতান ভারতে ইংরেজদের প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় শক্তি ফরাসিদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করেন। পাশাপাশি তুরস্কের সুলতানের সাহায্য কামনা করেন। টিপু সুলতান ফ্রান্সের বিপ্লবী দল "জ্যাকোসিন ক্লাবের" সদস্য ছিলেন। টিপু সুলতান শ্রীরঙ্গপত্তমে "স্বাধীনতা বৃক্ষ” নামে একটি গাছের চারা রোপণ করেন যা তার স্বাধীনচেতা মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তিনি ইউরোপীয় সামরিক বাহিনীর অনুকরণে এবং ফরাসি সমরবিদদের তত্ত্বাবধানে একটি আধুনিক সামরিক বাহিনী গঠন করেন, তিনি একটি আধুনিক নৌবাহিনীও গঠন করেছিলেন।

টিপু সুলতানের এ সকল প্রস্তুতি এবং স্বাধীনচেতা মনোভাব ভারতের নতুন ইংরেজ গভর্নর জেনারেল কর্ণওয়ালিস আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি টিপুর রাজ্যের ওপর দৃষ্টি দেন। কেননা কর্ণওয়ালিস-এর কাছে মনে হয়েছিল যে, ইংরেজদের স্বার্থে বিশেষ করে মসনা ও চন্দন কাঠের জন্য 'মালাবা' ইংরেজদের দখলে নেওয়া প্রয়োজন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ইংরেজ উপনিবেশ বিস্তারের জন্য কালিকট ও ক্যানন বন্দর দখল করা খুবই জরুরি ছিল। তাছাড়া এ পথ দিয়ে ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় সাথে নৌযোগাযোগ সবচেয়ে সহজ হবে। অন্যদিকে, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্রিটেন পরাজিত হয়ে আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ হারিয়ে কর্ণওয়ালিস তথা ইংরেজরা বিষণ্ণ। তাই কর্ণওয়ালিস সদ্য ভারতে এসে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিপূরণের জন্য টিপুর সমৃদ্ধ রাজ্য জয়ের পরিকল্পনা করেন।

তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ

লর্ড কর্ণওয়ালিশের শাসনকালে টিপু সুলতানের সাথে তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাঙ্গলোরের সন্ধি দ্বারা দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের অবসান ঘটলেও উভয়ের মধ্যে সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি। টিপু সুলতান উপলব্ধি করলেন যে, আজ হোক কাল হোক ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ হবেই। তাই তিনি গোপনে ফ্রান্স, কনস্টান্টিনোপল এবং মারিসারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন। বিচক্ষণ কর্ণওয়ালিশ টিপু সুলতানকে বাদ দিয়ে নিজাম ও মারাঠাদের সাথে মিত্র সংঘ গঠন করলে টিপু রুষ্ট হন। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে টিপু সুলতান ইংরেজদের মিত্র রাজ্য ত্রিবাঙ্কর আক্রমণ করলে কর্ণওয়ালিশ তার মিত্রদের নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ একবছর অবরোধের পর টিপু সুলতান পরাজিত হন। ইংরেজদের সাথে শ্রীরঙ্গপওমের সন্ধি করতে বাধ্য হন। সন্ধির শর্ত অনুযায়ী টিপু সুলতান তার রাজ্যের অর্ধেক এবং ৩ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা ইংরেজদের দিতে বাধ্য হন। ইংরেজ তার মিত্রদের মধ্যে উক্ত অর্ধেক রাজ্য ভাগ করে নেন

চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ

তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের পরাজয়কে চূড়ান্ত বলে মেনে নিতে পারেনি টিপু সুলতান। টিপুর স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং সমর সজ্জায় সন্দিহান হয়ে ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ওয়েলেসলি টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূরে যুদ্ধের ঘোষণা দেন। ইংরেজ এবং নিজামের সম্মিলিত বাহিনী দুই দিক থেকে টিপুর রাজ্য আক্রমণ করেন। নিজাম বাহিনীর নেতৃত্ব দেন লর্ড ওয়েলেসলির ভ্রাতা আর্থার ওয়েলেসলি এবং ইংরেজবাহিনীর নেতৃত্ব দেন সেনাপতি হ্যারিস। স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক টিপু সুলতান বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে যুদ্ধ ক্ষেত্রেই নিহত হন। এই দেশপ্রেমিক বীর যোদ্ধাকে পরাজিত ও নিহত করে ইংরেজরা স্বস্তি পেল। টিপুর রাজ্য তিন ভাগ করে দুই ভাগ ইংরেজ ও নিজামের মধ্যে বণ্টিত হলো এবং বাকি অংশ মহীশূরের রাজাকে ফিরিয়ে দেওয়া হলো যার নিকট থেকে হায়দার আলী রাজ্য দখল করেছিলেন।

টিপু সুলতানের কৃতিত্ব বিচার

ভারতবর্ষে টিপু সুলতান একটি নাম, একটি ইতিহাস। ইংরেজদের আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার্থে তিনি যে বীরত্ব এবং নির্ভীকতার প্রমাণ রেখে গেছেন তা ভারতবর্ষের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশীয় কাপুরুষ শাসকদের ব্রিটিশ তোষণনীতির ফলে সেদিন তার প্রচেষ্টা সফল হয়নি, তথাপিও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি স্বাধীনতা অর্জনের চেতনায় যে বীজ বপন করে যান তা পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের প্রতিটি স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রেরণা যুগিয়েছে। বীরত্বের জন্য তাকে 'মহীশূরের ব্যাঘ্র' আখ্যা দেওয়া হয়। তাকে ভারতীয় উপমহাদেশের 'আশার শেষ রশ্মি' বলা হয়। একজন বীর যোদ্ধা ও সুশাসক হিসেবে টিপু কৃতিত্ব অর্জন করেন। তিনি পিতা হায়দার আলীর সাথে ইংরেজদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে জয় লাভ করে খ্যাতি লাভ করেন। কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূরের যুদ্ধে তার ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে। তার মূল লক্ষ্য ছিল এ দেশের মাটি থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করা। টিপু নিজে বলতেন "শৃগালের মতো একশ বছর রাজত্ব করা অপেক্ষা সিংহের মতো একদিন রাজত্ব করা অনেক সম্মানজনক।" তিনি একজন সুশাসক হিসেবেও যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় তৎকালীন মহীশূরে কৃষির ব্যাপক উন্নতি, বাণিজ্যিক প্রসার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। তার সেনাবাহিনীর সমর সজ্জা ও যোগ্যতা তৎকালীন পৃথিবীর যেকোনো দেশের সাথে তুলনা করা যেত। ইংরেজরা তার জনপ্রিয়তায় ঈষান্বিত হয়ে তার চরিত্র নানাভাবে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছে। ইংরেজ ঐতিহাসিক পি.ই.রবার্ট তাকে 'নৃশংস বর্বর' বলে বর্ণনা করেছেন। আলফ্রেড লায়ালের মতে, "টিপু সুলতান ছিলেন অশিক্ষিত ও ধর্মান্ধ।" কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবনে টিপু সরল, বিদ্বান, অনাড়ম্বর এবং ধর্মীয় উদারতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি উর্দু, ফারসি এবং কানাড়ি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। ভারতবর্ষের মাটিতে যে ক'জন দেশপ্রেমিক অমর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে টিপু সুলতান নিঃসন্দেহে অন্যতম।

Content added By

Lord Cornwalis (1805 AD)

লর্ড ওয়েলেসলির সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি ইংল্যান্ড কর্তৃপক্ষের মনপুত না হওয়ায় তাঁকে স্বদেশে ডেকে পাঠানো হয়। অতঃপর ১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিসকে দ্বিতীয়বার ভারতের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত করা হয়। এই বিচক্ষণ, রাজনীতিবিদ সাম্রাজ্যবাদ নীতির পরিবর্তে নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করেন। তিনি মারাঠা, সিন্ধিয়া ও হোলকারের সাথে শান্তি স্থাপনের উদ্যোগী হন। কিন্তু কার্যকর করার পূর্বেই তিনি ১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে, স্যার জর্জ বার্লো বা উইলিয়াম বেন্টিংক (১৮০৫-১৮০৭ খ্রি.), লর্ড মিন্টো (১৮০৭-১৮১৩ খ্রি.), লর্ড ময়রা বা হোস্টিংস (১৮১৩-১৮২৩ খ্রি.), লর্ড আর্মহাস্ট (১৮২৩-১৮২৮ খ্রি.) এবং লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। এদের মধ্যে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক উপমহাদেশের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

Content added By

Lord William Bentinck: Reforms (1828-1835 AD)

প্রথম বারে (১৮০৫-০৭) গভর্নর থাকাকালীন অবস্থায় ভেলোরের সিপাহী বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হলে তাকে স্বদেশে ফিরে যেতে হয়। ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড আর্মহাস্ট স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক দ্বিতীয় বারের মতো গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হয়ে ভারতবর্ষে আসেন। তিনিই ভারতবর্ষের প্রথম গভর্নর জেনারেল, যিনি মনে করতেন প্রজাদের কল্যাণ বিধান শাসকের প্রধান কর্তব্য। তিনি একজন শান্তিপ্রিয় এবং উদারনৈতিক শাসক ছিলেন। উদারপন্থি বেন্টিংক সাম্রাজ্য বিস্তার অপেক্ষা সংস্কারের দিকে আত্মনিয়োগ করেন। একজন সংস্কারক হিসেবে তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হয়ে আছেন।

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক-এর সংস্কারসমূহ
(Lord William Bentinck's Reforms)
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক ছিলেন ভিক্টোরিয়া যুগের মূর্ত প্রতীক। তাঁর সংস্কারসমূহকে নিম্নলিখিত চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়-

১। অর্থনৈতিক সংস্কার: প্রথম ব্রহ্মযুদ্ধের ব্যয়ভারে কোম্পানির অর্থনৈতিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করলে তিনি কোম্পানির অর্থনৈতিক কাঠামোকে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বোর্ড অব ডাইরেক্টরের নিকট থেকে ব্যয় সংকোচন ও যুদ্ধনীতি পরিত্যাগের নির্দেশ নিয়ে কতগুলো পন্থা গ্রহণ করেন-

(ক) অতিরিক্ত কর্মচারী ছাঁটাই করেন।

(খ) শান্তির সময় সামরিক কর্মচারীদের যে অর্ধেক ভাতা (Half battle) দেওয়া হতো তা তিনি উঠিয়ে দেন।

(গ) উচ্চ শ্রেণির বেসরকারি কর্মচারীদের বেতন হ্রাস করেন।

(ঘ) কোম্পানির কর্মচারীদের দক্ষতা ও কার্যকলাপ সম্পর্কে গোপন সংবাদ নেওয়ার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।

(ঙ) কর্ণওয়ালিশের প্রাদেশিক আপীল কোর্টগুলো বাতিল করে জমি জরিপের ব্যবস্থা করে রাজস্ব বৃদ্ধি করেন।

(চ) মালবে উৎপন্ন আফিং-এর উপর শুল্ক ধার্য করেন

(ছ) মাদ্রাজে জমির রায়তওয়ারী বন্দোবস্ত এবং যুক্ত প্রদেশে ভূমির বন্দোবস্ত করে কোম্পানির আয় বৃদ্ধি করেন।

এ সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করে কোম্পানির ঘাটতি পূরণ করে বাৎসরিক ১৫ লক্ষ টাকা উদ্বৃত্ত করতে সক্ষম হন।

২। প্রশাসনিক সংস্কার: প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্যে-

(ক) কর্ণওয়ালিসের প্রবর্তিত প্রাদেশিক বিচারালয়গুলো তুলে দিয়ে জেলা কালেক্টরের ওপর ফৌজদারি মামলার বিচারের ভার অর্পণ করেন

(খ) জেলাগুলো একত্রিত করে ১০টি বিভাগ গঠন করেন এবং প্রতি বিভাগের দায়িত্ব বিভাগীয় কমিশনারের উপর ন্যস্ত করেন।

(গ) পূর্বে বিচার ব্যবস্থার কোনো দায়িত্বপূর্ণ পদে ভারতীয়দের নিয়োগ দেওয়া হতো না। বেন্টিংক এই নিয়ম পরিবর্তন করে ভারতীয়দের উচ্চ পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন।

(ঘ) ভারতীয়দের জন্য সাবজজের পদ সৃষ্টি করেন।

(ঙ) ফরাসি ভাষার পরিবর্তে তিনি আদালতে দেশীয় ভাষার প্রচলন করেন।

চ) বেন্টিংক ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় জুরি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং ভারতীয়দের জুরির সদস্য নিযুক্ত করেন।
এ সমস্ত সংস্কারের ফলে শাসনব্যবস্থা সুস্থ ও কার্যকর হয়ে ওঠে।

৩। সামাজিক সংস্কার বেন্টিংকের সামাজিক সংস্কার ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। তার সামাজিক সংস্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

(ক) সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ: বহু প্রাচীনকাল থেকে এদেশে হিন্দু সমাজে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। এই প্রথা অনুযায়ী স্বামী মারা গেলে স্বামীর চিতায় জীবন্ত স্ত্রীকে পুড়ে মারা হতো। এ প্রথা দুটি উপায়ে কার্যকর করা হতো-

(১) সহমরণ (মৃত স্বামীর সাথে স্ত্রীকে একই চিতায় পুড়িয়ে মারা) এবং

(২) অনুমরণ (বিদেশে স্বামীর মৃত্যু হলে অনুকরণে চিতায় পুড়ে স্ত্রীকে মারা)।

এ অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে রাজা রামমোহন রায় দ্বারকানাথ ঠাকুরকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। লর্ড বেন্টিংক তা সমর্থন করে ১৭ নং রেজুলেশন আইন দ্বারা ১৮২৯ সালে এই প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

(খ) গঙ্গায় সন্তান বিসর্জন নিষিদ্ধ তৎকালীন হিন্দুরীতি অনুযায়ী দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য সন্তানকে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়ার যে প্রথা ছিল, আইন পাশ করে তিনি তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন।

(গ) শিশু হত্যা: লর্ড বেন্টিংক সংস্কার পন্থি হিন্দু নেতাদের সহযোগিতায় বিবাহ দিতে অসুবিধা ও শিশুকে গলা টিপে হত্যা চিরতরে নিষিদ্ধ করলেন।

(ঘ) বর্গী দমন: বেন্টিংকের অপর কৃতিত্ব ছিল বর্গী দস্যুদের দমন। মোগলদের পতনের যুগে বর্গীদের প্রকোপ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পায়। লুঠ, অত্যাচার, পথিকদের ফাঁস দিয়ে হত্যা করে সর্বস্ব লুঠ করে জনজীবন অতিষ্ঠিত করে তুলত। বেন্টিংক স্লীম্যানকে বর্গী দমনে নিয়োগ করেন। স্লীম্যান বর্গীদের সাংকেতিক ভাষা আয়ত্ত করে ফেরিঙ্গরা নামক এক বর্গী সর্দারকে বন্দী করে গোপন আস্তানা জেনে ১৫০০ বর্গী কৌশলে হত্যা করে ও অনেককে বন্দী করে বর্গী দমন করেন।

৪। শিক্ষা সংস্কার: ভারতীয় উপমহাদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন লর্ড বেন্টিংকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ১৮১৩ সালের সনদ অনুযায়ী কোম্পানি ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য বৎসরে ১ লক্ষ টাকা ব্যয় করত। এই অর্থ কেবল মাত্র সংস্কৃত, ফরাসি প্রভৃতি প্রাচ্য ভাষা শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হতো। ১৮৩৩ সালে লর্ড বেন্টিংক এই অর্থ ইংরেজি শিক্ষার জন্য ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিলে ভারতে দুটি দলের উদ্ভব হয়। এক দল প্রাচ্য ভাষা শিক্ষার জন্য এই অর্থ ব্যয়ের পক্ষপাতী ছিল। এই দলের প্রধান সমর্থক ছিলেন পণ্ডিত উইলসন। অন্য দল পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন। এই দলের সমর্থক ছিলেন লর্ড মেকেল, আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়। লর্ড বেন্টিংক এ দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে শোষোক্ত দলের মত গ্রহণ করেন এবং, পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্য সরকারি অর্থ মঞ্জুর করেন।

১-১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে বেন্টিংক-এর চেষ্টায় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও মুম্বাই-এর এলিফ্রস্টোন ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠিত * হয়। মোট কথা তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার বাধা দূর হয় এবং ভারত রাসীরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠে।

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক-এর কৃতিত্ব বিচার

বেন্টিংক একমাত্র গভর্নর জেনারেল যিনি ভারতীয়দের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করে উল্লেখযোগ্য অবিস্মরণীয় সংস্কার সাধন করেন। একজন উঁচু দরের সংস্কারক হিসাবে তিনি ভারতের ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে আছেন। রাজ্য বিস্তার অপেক্ষা শিক্ষা-দীক্ষার উন্নতি, কুসংস্কার দূরীকরণ, বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং জনকল্যাণমূলক কার্যকলাপের জন্য ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে আছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শাস্তির গৌরব যুদ্ধের কৃতিত্ব অপেক্ষা অধিক উজ্জ্বল। ম্যাকেল বলেন, "বেন্টিংক প্রাচ্যদেশীয় স্বৈরতন্ত্রবাদের মধ্যে তাঁর শাসন নীতির দ্বারা ব্রিটিশের স্বাধীনতা ও * গণতন্ত্রবাদের বীজ অনুপ্রবেশ করান।"

Content added By

Charter Act of 1833 AD

১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রবর্তিত সনদ আইনের মেয়াদ ২০ বছর শেষ হলে লর্ড বেন্টিংক ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিকট সনদের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য আবেদন জানান। এ সময় ব্রিটিশ জনসাধারণ ভারতীয় উপমহাদেশে কোম্পানির দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষকে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সোচ্চার হয়। এ অবস্থায় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সংস্কার সাধনের মাধ্যমে কোম্পানির সনদ আরও ২০ বছর বৃদ্ধি করে কোম্পানিকে সরাসরি পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণাধীন করে। এ আইন ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে পাস হয়। তাই এটি ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দের "সনদ আইন" নামে পরিচিত। এ আইনের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারসমূহ দ্বারা (১) কোম্পানির একচেটিয়া ক্ষমতা খর্ব করা হয়। (২) যেকোনো ইংরেজ এদেশে এসে বসবাস করার অধিকার পায়। (৩) গভর্নর জেনারেল অব বেঙ্গলের পরিবর্তে গভর্নর জেনারেল অব ইন্ডিয়া করা হয়। (৪) চীন দেশের বাণিজ্য অধিকার খর্ব করা হয়। (৫) বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতিকে ভারত বিষয়ক মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। (৬) ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের ভেতর মাল চলাচলের ওপর শুল্ক লোপ করা হয়। (৭) চা ও কফি উৎপাদনের জন্য চা বাগিচা স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হয়। (৮) জল সেচ ব্যবস্থার উন্নতির চেষ্টা করা হয় এবং (৯) ভারতীয় সেনাদলে বেত্রাঘাত দ্বার। দণ্ড প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়।

Content added By

Sir Charles Metcalfe (1835 AD)

দীর্ঘ সাত বছর শাসন করার পর লর্ড বেন্টিংক পদত্যাগ করলে ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে স্যার চার্লস মেটকাফ উপমহাদেশের অস্থায়ী গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। তিনি মাত্র এক বছর ভারত শাসন করেন। তার এই এক বছর শাসনামলের মধ্যে আলোড়নকারী ঘটনা ছিল ভারতীয় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রদান। এ কাজের জন্য ভারতীয়রা তাকে সাধুবাদ জানালেও ব্রিটিশ সরকারের বিরাগভাজন হন। ব্রিটিশ সরকার তার এ ধরনের উদারনীতির কঠোর সমলোচনা করেন। ফলে তিনি ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে পদত্যাগ করে স্বদেশে ফিরে যান।

Content added By

Lord Auckland (1836-1842 AD)

স্যার চার্লস মেটফাকের পর ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড অকল্যান্ড ভারতের গভর্নর নিযুক্ত হন। তিনি কৃষি ও শিক্ষার সংস্কার করে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করেন। পূর্বে শুধু ইংরেজি ভাষা শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তিদানের প্রচলন ছিল। অকল্যান্ড এ ব্যবস্থার বিলোপসাধন করে আরবি, ফারসি সকল ভাষার শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তিদানের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তিনি ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারি বাধ্যবাধকতার বিলোপসাধন করে সকলের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন।

লর্ড অকল্যান্ডের শাসনামলে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো তাঁর "ব্যর্থ আফগান নীতি" ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়ার প্ররোচনায় পারস্য আফগানিস্তানের মধ্যবর্তী হিরাত আক্রমণ করলে অকল্যান্ড সীমান্ত সম্পর্কে ভীত ও সন্ত্রস্ত্র হয়ে পড়েন। তিনি ইংল্যান্ডের কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে আফগানিস্তানের সাথে সম্ভাব বজায় রাখার জন্য ক্যাপ্টেন বার্নেসের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে বাণিজ্য মিশন প্রেরণ করেন। এ মিশন প্রেরণে অকল্যান্ডের উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানকে রাশিয়ার প্রভাব মুক্ত রাখা। কিন্তু এ মিশন ব্যর্থ হলে অকল্যান্ড শাহ সুজা এবং রণজিৎ সিংহের সাথে ত্রিশক্তি চুক্তি সম্পাদিত করে সম্মিলিত বাহিনী নিয়ে আফগানিস্তানের দিকে অগ্রসর হন। আফগানিস্তানের আমির দোস্ত মুহম্মদকে পরাজিত ও সিংহাসনচ্যুত করে কান্দাহার, গজনী এবং কাবুল অধিকার করেন। তিনি শাহ সুজাকে কাবুলের সিংহাসনে বসান। অকল্যান্ড কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া সরকার স্বাধীনতা প্রিয় আফগান জাতি সহজে মেনে নিতে পারল না। তারা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করল এবং অতর্কিত আক্রমণ করে ইংরেজ বাহিনীর অধিনায়ক বার্নেসকে হত্যা করে। ব্রিটিশ বাহিনী পরাজয়ের মুখে অপমানজনক সন্ধিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। আফগান যুদ্ধে অকল্যান্ডের ভ্রান্ত নীতির ফলেই ইংরেজ বাহিনী বিধ্বস্ত হয় এবং এ কারণে তিনি পদত্যাগ করেন।

Content added By

Lord Ellenborough (1842-1844 AD)

অকল্যান্ডের পদত্যাগের পর লর্ড এলেনবরা ভারতের গভর্নর নিযুক্ত হন। ইংরেজদের ব্যর্থতার গ্লানি গুছাতে এলেনবরা আফগানিস্তান জয় করলেও প্রাকৃতিক প্রতিকূল অবস্থার জন্য ইংরেজরা এদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে মিয়ানী ও দাবোর যুদ্ধে সিন্ধুর আমীরগণকে পরাজিত করে সিন্ধু বিজয় এবং গোয়ালিয়র দখল তার উল্লেখযোগ্য অবদান। এছাড়া আইন পাস করে দাসত্ব প্রথা রহিত, লটারি খেলা নিষিদ্ধ, যোগ্যতার ভিত্তিতে ভারতীয়দের নিয়োগ, দারোগাদের ভাতা বৃদ্ধি এবং পদোন্নতির ব্যবস্থা করে সুনাম অর্জন করেন। অবশ্য পার্লামেন্টের নির্দেশে (১৮৪৪ খ্রি.) তাকে পদত্যাগ করতে হয়।

Content added By

Lord Hardinge (1845-1848 AD)

লর্ড এলেনবরার পর লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। তিনি শান্তিপ্রিয় এবং সংস্কারক হিসেবে পরিচিতি ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজের জন্য ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জল স্থান দখল করে আছে। তাঁর সংস্কারের মধ্যে সতীদাহ প্রথা নিরসনে ব্যাপক প্রচার, শিশু হত্যা নিষিদ্ধ এবং ভারতে প্রথম রেল লাইনের পরিকল্পনা অন্যতম। ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ভারতীয় জনসাধারণের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতি করেন। (তার নামে বাংলাদেশের পাবনা জেলায় পদ্মা নদীর ওপর ১.৮ কি.মি. দৈর্ঘ্য ইস্পাত নির্মিত হার্ডিঞ্জ রেল সেতু নির্মিত হয়। ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে উক্ত, সেতুটি তৈরির প্রস্তাব করা হয় এবং ৪ মার্চ ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে উদ্বোধন করা হয়।) লর্ড হার্ডিঞ্জের প্রচেষ্টায় গঙ্গার খাল খনন এবং শিক্ষা বিস্তারের ব্যাপক কর্মসূচি গৃহীত হয়। উড়িষ্যার পার্বত্য খোন্দজাতির মধ্যে প্রচলিত নরবলি প্রথা নিষিদ্ধ আইন পাস করে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

Content added By

Lord Dalhousie (1848-1856 AD)

লর্ড হার্ডিঞ্জের পর লর্ড ডালহৌসি ৩৬ বছর বয়সে ভারতের গভর্নর নিযুক্ত হন। একজন সাম্রাজ্যবাদী, সংস্কারক ও উচ্চাভিলাষী শাসক হিসেবে তাঁর শাসনামল ভারতের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। এক্ষেত্রে একমাত্র লর্ড ওয়েলেসলির সাথে তার তুলনা চলে। উপমহাদেশে তার নীতি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃত সাধন। ড. মজুমদার বলেছেন, “লর্ড ডালহৌসির শাসনকাল বহু ভারতীয় রাজ্যের উৎখাতের এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারের জন্য উল্লেখযোগ্য। তার সাম্রাজ্যবাদ নীতিকে ৩টি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: (১) প্রত্যক্ষ যুদ্ধের দ্বারা রাজ্য বিস্তার (২) স্বত্ব বিলোপ নীতির প্রয়োগ দ্বারা রাজ্য বিস্তার এবং (৩) কু-শাসনের অযুহাতে রাজ্য অধিকার।
(১) প্রত্যক্ষ যুদ্ধের দ্বারা রাজ্য বিস্তার: লর্ড ডালহৌসি ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় শিখ যুদ্ধ দ্বারা পাঞ্জাবের শিখরাজ্য এবং ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় ব্রহ্ম যুদ্ধ দ্বারা ব্রহ্মদেশের অন্তর্গত পেগু রাজ্য অধিকার করেন।

দ্বিতীয় শিখ যুদ্ধ: এ যুদ্ধের কারণ হিসেবে বলা যায়- প্রথমত, ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড ডালহৌসি
প্রথম শিখ যুদ্ধের পরাজয়ের গ্লানি শিখরা ভুলতে পারেনি, দ্বিতীয়ত, পাঞ্জাবের শাসন পরিচালনার ব্যাপারে লর্ড হার্ডিঞ্জের প্রবর্তিত ব্যবস্থা শিখরা মেনে নিতে পারেনি। ফলে শিখরা বিদ্রোহী হন এবং আফগান জাতি সুযোগ বুঝে শিখদের সাথে হাত মেলান। এ কারণেই লর্ড ডালহৌসি দ্বিতীয় শিখ যুদ্ধের ঘোষণা দেন।

১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি এডওয়ার্ডস এবং নেপিয়ার-এর নেতৃত্বে দুটি বিশাল বাহিনী পর পর ঝিলাম নদীর তীরে বিলিয়ানওয়ালা এবং চীনাব নদীর তীরে গুজরাট শহরের উপকূলে সংঘটিত যুদ্ধে শিখদের সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করেন। শেরসিংহ সহ অন্যান্য শিখ নেতৃবৃন্দ আত্মসমর্পণ করলে দ্বিতীয় শিখ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। এর ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সীমা সমগ্র পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্তানের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

দ্বিতীয় ব্রহ্ম যুদ্ধ : ১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ব্রহ্ম যুদ্ধের পর থেকেই বর্মিদের সাথে ইংরেজদের সম্পর্ক খারাপ হয়। বর্মির ব্রহ্ম রাজ ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে আভা হতে ব্রিটিশ রেসিডেন্টকে বিতাড়িত এবং ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে বর্মিদের হাতে কতিপয় ব্রিটিশ বণিক লাঞ্চিত হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় ইঙ্গ ব্রহ্ম যুদ্ধ শুরু হয়। অতি অল্প সময়ের মধ্যে রেঙ্গুন, পোম এবং পেগু ব্রিটিশদের অধীনে চলে আসে। ব্রহ্মরাজ ডালহৌসির সাথে সন্ধি স্থাপন করলে সমগ্র পেগু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।

(২) স্বত্ববিলোপ নীতি: সাম্রাজ্যবাদী লর্ড ডালহৌসি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারে যে কয়টি পন্থা অবলম্বন করেন তার মধ্যে
স্বত্ববিলোপ নীতি (Doentrine of Lapse policy) সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। স্বত্ববিলোপ নীতির মূল কথা ছিল, ব্রিটিশের আশ্রিত বা অনুগৃহীত কোনো দেশীয় রাজ্যের রাজা অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে এবং তার রাজবংশে কোনো উত্তরাধিকারী না থাকলে সে রাজ্য সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হবে। কোনো দত্তক বা পালিত পুত্রের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রাচীন হিন্দু রীতি অনুযায়ী পুত্রহীন রাজা বা রাজবংশের রাজ্য রক্ষা করার জন্য দত্তক পুত্র গ্রহণ কোম্পানি কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছিল। কিন্তু লর্ড ডালহৌসি এ নীতির দ্বারা দেশীয় রাজ্যগুলোর দত্তক পুত্র গ্রহণের দাবি অস্বীকার করে তা সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করার ঘোষণা দেন।

স্বত্ব বিলোপ নীতি গ্রহণ করে লর্ড ডালহৌসি ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সাতারা, ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে সম্ভলপুর, ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে নাগপুর, ঝাঁসি এবং পরে ভগৎ, উদয়পুর, কর্নাটক, তাঞ্জোর এবং কারাউলী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভুক্ত করেন। (অবশ্য কারাউলী ইংরেজদের মিত্র রাজ্য বিধায় পরে এটিকে ফেরত দেওয়া হয়)। পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাও এর মৃত্যুর পর তার দত্তক পুত্র নানা সাহেবের (ধুন্দ পন্থ) বৃত্তি বন্ধ করে দিয়ে এ রাজ্যগুলোও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।

উক্ত নীতি প্রয়োগ করে রাজ্য গ্রাসকরণে দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। যার ফলে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহে ঝাঁসির রানি ও অন্যান্য রাজন্যবর্গ ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। লর্ড ডালহৌসির স্বত্ব বিলোপ নীতিকে ঐতিহাসিক কেয়ি 'নিষ্ঠুর' হিসেবে অভিহিত করেছেন।

(৩) কু-শাসনের অজুহাতে রাজ্য দখল: লর্ড ডালহৌসি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও কু-শাসনের অজুহাতে ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে
অযোধ্যা রাজ্যটিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। ড. এম.এন সেন বলেন "অযোধ্যার নবাব পরিবারের প্রতি বর্বরোচিত ব্যবহার ও নিষ্ঠুর আচরণ ব্রিটিশ জাতির মর্যাদায় কলঙ্ক লেপন করেছে। হায়দ্রাবাদের নিজামের নিকট থেকে 'বেরাব' প্রদেশটি কেড়ে নিয়ে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।"

লর্ড ডালহৌসির সংস্কারমূলক কার্যাবলি

লর্ড ডালহৌসি একজন সাম্রাজ্যবাদী শাসক হিসেবে চিহ্নিত হলেও রাজ্য শাসন ও সামাজিক সংস্কারে তার অবদান অনেকখানি। তার সম্পর্কে ইংরেজ ঐতিহাসিক স্যার রিচার্ড টেম্পল বলেন, "শাসক হিসেবে ইংল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ যে সমস্ত বিখ্যাত ব্যক্তিকে এদেশ শাসন করতে প্রেরণ করেন তাদের মধ্যে কেহই ডালহৌসিকে অতিক্রম করতে পারেন নি।" ভারতে তাঁর আট বছর শাসনামলে উপমহাদেশের ইতিহাসকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে এক নতুন যুগের সৃষ্টি করে'। পার্সিভ্যাল স্পিয়ার তাকে আধুনিক ভারতের প্রতিষ্ঠাতা বলে অভিহিত করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য সংস্কার হচ্ছে-
শাসন সংস্কার: ডালহৌসি শুধু একজন সাম্রাজাবাদী শাসক ছিলেন না। তিনি একজন শ্রেষ্ঠ শাসকও ছিলেন। শাসন অবস্থায় তিনি বেশ কিছু সংস্কার করেছিলেন। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার অন্যতম কৃতিত্ব হলো বাংলাদেশের জন্য একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর বা ছোট লাট নিযুক্ত করা। এতে গভর্নর জেনারেলের কাজের চাপ কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। ডালহৌসি ভারতীয় উপমহাদেশে সুষ্ঠ শাসন প্রবর্তনের জন্য সমগ্র ভারতকে কতকগুলো জেলায় বিভক্ত করেন এবং জেলার বেসামরিক কর্মচারীদের বিভাগীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।

সামাজিক সংস্কার: সমাজ সংস্কারে লর্ড ডালহৌসি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে। তাঁর আগমনের পূর্বে ভারতীয় হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অকৃত্রিম সাহায্য ও সহযোগিতায় লর্ড ডালহৌসি হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাস করেন। অপর এক আইন পাস করে তিনি ধর্মান্তরিত ভারতবাসীকে পৈত্রিক সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেন।

প্রযুক্তির প্রবর্তন: লর্ড ডালহৌসিকে ভারতীয় রেলপথের জনক বলা হয়। ভারতে রেলপথ নির্মাণের জন্য তিনি বিখ্যাত রেলপথ স্মারকলিপি রচনা করেন এবং ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে উপমহাদেশে তিনি সর্বপ্রথম রেল লাইন চালু করেন। বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফের তার স্থাপন এবং ডাক বিভাগ প্রবর্তন করেন। ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা থেকে আগ্রা পর্যন্ত ভারতের প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপন করে আধুনিক প্রযুক্তির প্রবর্তন করা হয়। সর্বত্র রাস্তাঘাট নির্মাণ, পয়ঃপ্রণালি খনন প্রভৃতি জনহিতকর কাজের জন্য তিনি 'পূর্ত বিভাগ' (Public works department) স্থাপন করেন। এ সময় কলকাতা হতে পেশোয়ার পর্যন্ত 'গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড' নির্মিত হয়। ভারতে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে ডালহৌসির অবদান অপরিসীম।

পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন: লর্ড ডালহৌসি তাঁর প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনা দ্বারা ভারতবর্ষে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি বোর্ড অফ কন্ট্রোলের প্রেসিডেন্ট স্যার উডের সাহায্যে শিক্ষা বিষয়ক এক পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন। যা উডের ডেসপ্যাচ- ১৮৫৪ নামে পরিচিত। একে এ দেশের বর্তমান প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। উড সাহেবের নির্দেশনায় ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষা বিষয়ক নির্দেশপত্র প্রণীত হয়। এ নির্দেশপত্র কয়েকটি সুপারিশ করে। সুপারিশগুলো হলো-

১. লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে প্রেসিডেন্সি শহরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। এগুলো শুধুমাত্র পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং কোনো শিক্ষাদান কার্যক্রম গ্রহণ করবে না।
২. উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক পর্যায়ের কলেজগুলোকে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধিত হতে হবে।
৩. প্রতি প্রদেশে শিক্ষা বিভাগ থাকবে।
৪. শিক্ষক প্রশিক্ষকণের জন্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হবে।
৫. শিক্ষা বিস্তার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বীকৃতি দিতে হবে যদি তা যথাযথ মানসম্মত হয়।

৬. বিভিন্ন প্রদেশের শিক্ষা কার্যক্রম সমন্বয় করার জন্য ভারতে একজন শিক্ষা মহাপরিচালক থাকবেন।

উডের ডেসপ্যাচ অনুযায়ী ডালহৌসি জন শিক্ষা দপ্তর সৃষ্টি করে বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বেসরকারি স্কুল কলেজসমূহে তিনি সরকারি অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করেন। এর মধ্যে কলকাতা, মাদ্রাজ ও মুম্বাইয়ে ১৮৫৭খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। একমাত্র নারী শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কাউন্সিলের সদস্য বেথুন সাহেব কলকাতায় বেথুন মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তার শাসনামলে ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি সর্বশেষ সনদপ্রাপ্ত হন। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রাপ্ত সনদের মেয়াদ শেষ হলে উক্ত সনদ প্রদান করা হয়। এই সনদ বলে ভারতীয়রা সর্বপ্রথম উচ্চ পদে নিয়োগ লাভের অধিকার পায়। বাংলাদেশ শাসনে লেফটেন্যান্ট গভর্নর বা ছোটলাট পদ এ সনদে স্বীকৃত হয়।

লর্ড ডালহৌসির কৃতিত্ব বিচার

লর্ড ডালহৌসি ভারতের গভর্নর জেনারেলদের মধ্যে সম্ভবত সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। জনৈক ঐতিহাসিক বলেছেন, “ডালহৌসির 'পূর্ববর্তী আমলে কেউ ছিলেন শাসক, কেউ ছিলেন বিজেতা, কেউ ছিলেন নির্মাতা, আবার কেউবা ছিলেন সংস্কারক, কিন্তু লর্ড ডালহৌসি একাই ছিলেন সর্ব কৃতিত্বের অধিকারী।" যুদ্ধ পরিচালনায় তিনি ছিলেন প্রাচ্যের একজন আব্রাহাম লিংকন, শান্তি স্থাপনে তিনি ছিলেন আরও বেশি বিখ্যাত।

Content added By

Movements Against the English

পলাশীর যুদ্ধে জয়ের ফলে উপমহাদেশে ইংরেজরা দু'শ বছরের মোগল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত করে। শুরু থেকেই ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদ নীতি এবং নির্যাতন ও নিপীড়নে এদেশীয় রাজা-প্রজা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সিপাহি ও জনতা সকলের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব দানা বাঁধতে থাকে। পুঞ্জীভূত ক্ষোভের ফলে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে সৃষ্টি হয় খণ্ড খণ্ড বিদ্রোহ। প্রাথমিক পর্যায়ের এ সকল বিদ্রোহের মধ্যে অন্যতম ছিল-

১। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০-১৮০০ খ্রি.)।
২। কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩ খ্রি.)।
৩। বালাকী শাহের বিদ্রোহ (১৭৯১-১৭৯২ খ্রি.)।
৪। হাজী শরিয়তউল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন (১৮১৮-১৮৬২ খ্রি.)।
৫। ওহাবী ও শহিদ তিতুমীরের আন্দোলন ১৮২২-১৮৩১ খ্রি.)।
৬। সাঁওতাল বিদ্রোহ। (১৮৫৪ - ১৮৫৬ খ্রি.)
৭। নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ (১৮৬০ খ্রি.)।
৮। মহাবিদ্রোহ বা ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৮৫৭ খ্রি.)।

ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০-১৮০০ খ্রি.) [Revolt of Fakirs and Sannasies (1760–1800 AD)]

ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রাথমিক বিদ্রোহগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম হলো ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ। ফকিরগণ ছিল সুফি সম্প্রদায়ভুক্ত সংসারত্যাগী। দিনাজপুর জেলার বলিয়াদী গ্রামে ফকিরদের আস্তানা ছিল। শাহজাদা সুজা যখন বাংলার সুবেদার ছিলেন তখন তিনি ফকির ধর্মগুরু শাহ সুলতান হাসানি মাদিয়া বরহানাকে কয়েকটি বিশেষ অধিকার উল্লেখ করে সনদ দান করেন। এর ফলে তাদের প্রভাব বেড়ে যায়। উরশ বা বাৎসরিক উৎসবে তারা পাণ্ডুয়া, দিনাজপুর ও মহাস্থানগড়ের দরগায় মিলিত হতো। প্রথমদিকে তারা ভিক্ষা করলেও পরে তারা জোরপূর্বক নজরানা আদায় করতে আরম্ভ করে।
অপরদিকে, সন্ন্যাসীগণ ছিল আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত হিন্দু সংসারত্যাগী কিন্তু তারা আধ্যাত্মিক সাধনা থেকে বিচ্যুত হয়ে জাগতিক সুখভোগে লিপ্ত হয়। বাৎসরিক স্নানোৎসবে তারা মহাস্থান, চিলমারি, সিংজানি (ময়মনসিংহ) লাঙ্গলবন্দ (নারায়ণগঞ্জ) মিলিত হতো।

অষ্টাদশ শতকের রাজনৈতিক অস্থিরতায় ফকির-সন্ন্যাসী সামরিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে থাকলে তাদের সাথে দরিদ্র কৃষক, সম্পত্তিহারা জমিদার ও বেকার সৈন্যদল যোগ দেয়। ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিমের পক্ষে প্রায় ৫০০০ ফকির-সন্ন্যাসী যোগ দিয়েছিল। ফকির-সন্ন্যাসীদের ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবের অন্যতম কারণ ছিল- (১) ইংরেজ কর্তৃক ফকির-সন্ন্যাসীদের অবাধ চলাফেরায় বাধা দান। (২) ভিক্ষা ও মুষ্টি সংগ্রহ নিষিদ্ধ। (৩) ফকির সন্ন্যাসীদের দস্যু আখ্যায়িত করা। (৪) তাদের বিরুদ্ধে জমিদারদের লেলিয়ে দেওয়া প্রভৃতি। ফকির বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন মজনু শাহ মাস্তান, তার সহযোগী ছিল মুসা শাহ্, চেরাগ আলী, পরাগ শাহ, সোবহান শাহ, মাদার বকশ, করিম শাহ, নুরুল মোহম্মদ, জরিশাহ ও রওশন শাহ প্রমুখ। সন্ন্যাসী দলের নেতৃত্ব দেন ভবানী পাঠক, তার সহযোগী ছিল দেবী চৌধুরানী।
১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে সন্ন্যাসীগণ বর্ধমান জেলায় প্রথম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সরাসরি সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ফকিরগণ বরিশালে এবং ঢাকার ইংরেজ কোম্পানির কুঠি আক্রমণ করে দখল করে। অবশ্য পরে ইংরেজগণ তা পুনরুদ্ধার করে। ঐ বছর সন্ন্যাসীরা রাজশাহীর কোম্পানি ফেক্টরির অধিকর্তা বেনটেকে হত্যা করে। ফকির-সন্ন্যাসীদের কর্মকাণ্ডে আতঙ্কিত হয়ে ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৬৭ ও ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মজনু শাহকে আক্রমণ করে। মজনু শাহ সে আক্রমণ প্রতিহত করে সেনাপতি হার্টল ও লে. কিথসহ অনেক ইংরেজ সৈন্য তার হাতে নিহত হয়। এ সাফল্যে ফকির-সন্ন্যাসীদের সাহস ও মনোবল আরও বেড়ে যায়। ১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে ফকির মজনু শাহ সমগ্র উত্তর বাংলায় এক বড় রকমের ব্রিটিশ বিরোধী তৎপরতা আরম্ভ করেন। ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে মজনু শাহ ২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজশাহী আক্রমণ করেন। তার নেতৃত্বে ফকিরগণ বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় কর্মতৎপরতা চালায়। মধুপুর জঙ্গলে ফকিরদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। জমিদারগণ তাদের আক্রমণে সর্বদা ভীত থাকত।

১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে সন্ন্যাসীরা রংপুরে সিপাহিদের যুদ্ধে পরাজিত করে ক্যাপ্টেন টম্সকে হত্যা করে। সন্ন্যাসীরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ চালাত। প্রতি দলে একজন নায়কের অধীনে প্রায় পাঁচ থেকে সাত হাজার নাগা সন্ন্যাসী থাকত। ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ডস ও সার্জেন্ট মেজর ডগলাস ৩০০ সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করতে এসে নিহত হন।
বঙ্কিম চন্দ্রের 'দেবী চৌধুরানী' নামক উপন্যাসে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বর্ণনা পাওয়া যায়। এ উপন্যাসে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী বাংলায় সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বিখ্যাত নায়ক ও নায়িকা। দেবী চৌধুরানী নৌকায় থাকতেন এবং বহু বেতনভোগী অনুচর রাখতেন। তার অনুচরগণ অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত থাকত। মজনু শাহের রনকৌশল ছিল অতর্কিত আক্রমণ এবং নিরাপদে পালায়ন। ইংরেজদের ক্রমাগত আক্রমণে তারা বাংলা বিহার ত্যাগ করে মহারাষ্ট্রের দিকে চলে যেতে বাধ্য হয় এবং এক পর্যায় তাদের বিদ্রোহ থেমে যায়।

ব্যর্থতার কারণ: ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে ফকির-সন্ন্যাসী প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করে। নানান কারণে ফকির সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। নিম্নে এ বিদ্রোহ ব্যর্থতার প্রধান প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো-

(ক) দলীয় কোন্দল: ফকির নেতা মজনু শাহ ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করলে ফকিরদের মধ্যে দলীয় কোন্দল সৃষ্টি হয়।
(খ) ইংরেজদের শক্তি বৃদ্ধি: ফকির সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে ইংরেজরা শক্তি বৃদ্ধি করলে ফকিরগণ ইংরেজদের কাছে বিভিন্ন স্থানে পরাজিত হতে থাকে। ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে তারা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়।
(গ) বাঙালি জনসাধারণের অসহযোগিতা: মজনু শাহ ও ভবানী পাঠক বাঙালি ছিল না, সুতরাং তারা বাঙালিদের খুব একটা সহযোগিতা পায়নি। তাছাড়া তারা বন-জঙ্গলে আস্তানা গড়ত ফলে সাধারণ মানুষের সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
(ঘ) ফকির ও সন্ন্যাসীদের পরস্পর কলহ ফকির ও সন্ন্যাসীরা পৃথক পৃথকভাবে তাদের অভিযান চালাত এবং প্রায়ই তারা পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত হতো।
(ঙ) জাতীয়তা বোধের অভাব: ফকির ও সন্ন্যাসীরা নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। দেশ রক্ষা বা জাতীয়তাবোধ তাদের লক্ষ্য ছিল না। যার ফলে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে উক্ত বিদ্রোহ সম্পূর্ণরূপে থেমে যায়।

কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩ খ্রি.) [Peasants Revolt (1783 AD)]

বাংলার কৃষকরা যুগের পর যুগ অবহেলিত, অত্যাচারিত। তাই বলে তারা সবসময় অত্যাচার ও অবিচার নীরবে সহ্য করেনি। ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই বিদ্রোহের কারণ ছিল কোম্পানি সরকারের রাজস্ব নীতি। ওয়ারেন হেস্টিংস তার অনুচর দেবী সিংহকে রংপুর ও পূর্ণিয়া জেলার রাজস্ব ঠিকাদারী দিয়েছিলেন। দেবী সিংহ এবং তার সহকারী হরেরামের কর আদায় অত্যাচার চরমে উঠলে দিনাজপুর ও রংপুরের হিন্দু ও মুসলমান কৃষক সংঘবদ্ধ হয়ে ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যা ইতিহাসে কৃষক বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন নুরুদ্দীন। বিদ্রোহী কৃষকরা তাকে নবাব উপাধিতে ভূষিত করে। ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ২২ ফেব্রুয়ারি পাটগ্রামে বিদ্রোহী কৃষকদের সঙ্গে লে. ম্যাকডোনাল্ডের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ সৈন্যের এক ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ইংরেজদের কামানের আঘাতে বিদ্রোহী ছত্রভঙ্গ হয় এবং অনেকেই হতাহত হয়।

বিদ্রোহের কারণ অনুসন্ধানে দেবী সিংহের অতিরিক্ত কর আদায়ের লোমহর্ষকর চিত্র ফুটে উঠলে তাকে অপসারণ করা হয়। হেস্টিংসকে আইনের মুখামুখি করা হয়। ব্রিটিশ সরকার রংপুর জেলায় রাজস্ব আদায়ে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, কৃষক বিদ্রোহের ৫ জন নেতাকে নির্বাসন দণ্ড দেওয়া হয়। ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে কৃষক বিদ্রোহ বাংলার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর আদর্শই পরবর্তীকালে বাঙালিদের প্রতি ইংরেজদের নানা অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে প্রেরণা যুগিয়েছে।

বালাকী শাহের বিদ্রোহ (১৭৯১-১৭৯২ খ্রি.) [Revolt of Balaki Shae (1791-1792 AD)]

বালাকী শাহের নেতৃত্বে ১৭৯১-৯২ খ্রিষ্টাব্দে বাখেরগঞ্জ জেলার কৃষকগণ ইংরেজ শাসক ও জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যা ইতিহাসে 'বালাকী শাহের বিদ্রোহ' নামে পরিচিত। বালাকী শাহ ছিলেন সুফি সম্প্রদায় ভুক্ত একজন ফকির নেতা। বালাকী শাহের বিদ্রোহের সাথে ফকির বিদ্রোহের পার্থক্য ছিল এই যে, ফকির বিদ্রোহ ছিল নিজস্ব স্বার্থ উদ্ধারে অনেকটা ইংরেজ সরকারের হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ। আর বালাকী শাহের বিদ্রোহ ছিল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম। ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে ৫০০০ সশস্ত্র শিষ্য নিয়ে বালাকী শাহ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি চন্দ্রদ্বীপ (বর্তমান বরিশাল) ও সলিমাবাদের অনেক অত্যাচারী তালুকদার, জমিদার ও ইজারাদারদের বন্দী করেন। সুবন্দিয়ার গ্রামে তিনি শাহবন্দর নামে একটি মাটির দুর্গ নির্মাণ করেন। ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বালাকী শাহ পরাজিত ও বন্দী হন। তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন করে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

পাইক বিদ্রোহ (১৮১৭ খ্রি.) [Revolt of Paik (1817 AD)]

১৮১৭ সালে পাইকরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ইতিহাসে এ বিদ্রোহ পাইক, বিদ্রোহ নামে পরিচিত। পাইকরা বিদ্রোহী হয়ে বাহারামপুরের পুলিশ ঘাঁটি ও সরকারি কার্যালয়গুলোর উপর আক্রমণ চালায়, শহরের যাবতীয় বাড়িঘরগুলো জ্বালিয়ে দেয় এবং সরকারি খাজাঞ্চিখানা লুট করে। পাইক বিদ্রোহীরা প্রায় একশত ইংরেজকে হত্যা করে। এ অবস্থায় উড়িষ্যায় কিছুদিনের জন্য ইংরেজ শাসন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

Content added By

Hazi Shariatullah and Faraizi Movement-1818-1862

পলাশীর প্রান্তে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হলে জাতির জীবনে এক মহাদুর্যোগ নেমে আসে। বিশেষ করে মুসলমান সমাজ জীবনে কুসংস্কার ও ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ অনুপ্রবেশ করে তাদের নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে ফেলে। এ সময় মুসলমানদের নৈতিক শক্তি পুনরুদ্ধার করবার জন্য বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের আবির্ভাব ঘটে। তাদের মধ্যে হাজী শরীয়তউল্লাহ্ অন্যতম। অধঃপতিত মুসলিম সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে তিনি আন্দোলনে নেমে পড়েন। তার এই সংস্কার পন্থী আন্দোলন ইতিহাসে 'ফরায়েজি আন্দোলন' নামে খ্যাত। 'ফরায়েজি' শব্দটি এসেছে ফরজ বা অবশ্যকরণীয় শব্দ থেকে। ইসলামের বিধি-বিধান হুকুম আহকাম পালন দ্বারা শেরক ও বিদাত থেকে দূরে থেকে মুসলমানদের জীবনে নব জাগরণ সৃষ্টিই ছিল এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য।

হাজী শরীয়তউল্লাহ

হাজী শরীয়তউল্লাহ ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে মাদারীপুর মহকুমার শামাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন (বর্তমান মাদারীপুর জেলা)। তার বয়স যখন আট বছর তখন পিতা আবদুল জলীল তালুকদার মৃত্যুবরণ করেন। অতঃপর চাচা আমিন উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে পালিত হন। তিনি কলকাতা ও হুগলী জেলার ফুরফুরাতে শিক্ষালাভ করেন। ১৮ বছর বয়সে হজ পালন করতে গিয়ে বিশ বছর আরবদেশে অবস্থান করেন। সেখানে আলেমদের নিকট বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যয়ন করে ইসলামি জ্ঞান লাভ করেন। ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে দেশে ফিরে এসে মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের আদর্শ স্থাপনের উদ্দেশ্যে ফরায়েজি আন্দোলন শুরু করেন।

ঐ সময় বাংলার মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। তারা হিন্দু প্রভাবিত হয়ে কবর পূজা, পীর পূজা, মনসা পূজা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিব পূজায় লিপ্ত হয়েছিল। তাছাড়া

বৈষম্য ও শোষণমূলক ব্রিটিশ নীতির ফলে বাংলার মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পরে। এখানে উল্লেখ্য যে, হাজী শরীয়তউল্লাহ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয় বরং ধর্মীয় কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।
ধর্মান্তকরণের পূর্বে এদেশের অধিকাংশ মুসলমানই ছিলেন হিন্দু, বৌদ্ধ বা প্রকৃতি উপাসক। মুসলিম শাসনের রাজনৈতিক প্রভাব, পীর ফকিরদের আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাব ইত্যাদি কারণে স্থানীয় অধিবাসীগণ মামলাসন সার্গ রীদিন হন। কিন্তু মুসলমান হলেও তাদের মধ্যে অসংখ্য পূব ধর্মজাত অমুসলিম আচার-অনুষ্ঠান বিদ্যমান ছিল।

ফরায়েজি আন্দোলন: ফরায়েজি আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল দুটি- ১। ধর্মীয় ব্যাপারে মুসলমানদের সচেতন করা এবং ২। ব্রিটিশদের এদেশ থেকে বিতাড়িত করা। এ লক্ষ্যে হাজী শরীয়তউল্লাহ বাংলার পল্লিতে পল্লিতে ঘুরে অধঃপতিত মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রচার করতে থাকেন। তিনি মুসলমান কর্তৃক অনৈসলামিক কার্যাবলিকে মহাপাপ ঘোষণা করেন। ঐ পাপকে তিনি দু' ভাগে বিভক্ত করেন- ১। কবর পূজা, পীর পূজা, সেজদা দেওয়া প্রভৃতিকে শেরক এবং ২। গাজী কালুর প্রশস্তি গাওয়া, পঞ্চপীরের, পীর বদল, খাজা-খিজিরের দোহাই দেওয়া, ভেরা ভাসানো, জারিগান গাওয়া, মহরম শোক প্রভৃতিকে বে'দাত বলে ঘোষণা করেন। তিনি 'পীর' ও 'মুরিদের' পরিবর্তে 'ওস্তাদ' ও 'সাগরেদ' ব্যবহার করতেন। তিনি তাজিয়া নির্মাণ মুহররম, পালন, মারসিয়া প্রভৃতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি বিবাহ উৎসবকে অনাড়ম্বরভাবে পালনের পরামর্শ দেন। বিবাহে হিন্দু আচার-রীতি যেমন- উলু দেওয়া, গায়ে হলুদ, আলপনা, নারকেল ভাঙা ইত্যাদিকে বর্জন করতে নির্দেশ দেন। তিনি শিশুর জন্ম উপলক্ষে উৎসব পালন, নামকরণ (আকিকা) এবং চল্লিশা (শিশু জন্মের ৪০ দিন পরে যে নাভীর সুতা ফেলতে হয়) এসব অনুষ্ঠানের ঘোর বিরোধী ছিলেন।
হাজী শরীয়তউল্লাহ ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষকে 'দারুল হবর' বা 'বিধর্মীর রাজ্য' বলে ঘোষণা করেন। তিনি ফতোয়া দেন যে, এ দেশে জুমুয়া ও ঈদের নামাজ বিধিসম্মত নয়। তিনি অত্যাচারী জমিদার ও নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। এজন্য হিন্দু জমিদারদের সঙ্গে তার সংঘাত বাধে। বাংলার কৃষকগণ দলে দলে তার সাথে যোগদান করতে থাকে। ঢাকা, বরিশাল, পাবনা, ময়মনসিংহে প্রভৃতি জেলায় তার সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল। জেমস ওয়াইজ বলেন "হিন্দু জমিদারগণ ফরায়েজি আন্দোলনের বিস্তৃতিতে ভয় পেয়ে গেলেন। কারণ এ সংস্কার আন্দোলন মুসলমানদেরকে একতাবদ্ধ করেছিল। ১৮৪০ সালে যোগ্য পুত্র দুদু মিয়ার হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়ে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন।

দুদু মিয়া

১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে হাজী শরীয়তউল্লাহর মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র মহসীনদ্দীন আহমদ ওরফে দুদু মিয়া ফরায়েজি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দে দুদু মিয়া মাদারীপুর মহকুমা (বর্তমান মাদারীপুর জেলা) জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও পিতার ন্যায় হজব্রত পালনের জন্য মক্কায় গমন করেন এবং দেশে ফিরে এসে পিতার স্থানে ইসলামের শুদ্ধি আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তার প্রচেষ্টায় এই আন্দোলন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। যে কারণে কতিপয় ঐতিহাসিক তাকে ফরায়েজি আন্দোলনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলে বর্ণনা করেছেন।

যোগ্য সংগঠক দুদু মিয়া ফরায়েজি আন্দোলনকে গতি সঞ্চয়ের জন্য পূর্ব বাংলাকে কয়েকটি অঞ্চলে বা হুলকায় বিভক্ত করে প্রত্যেক অঞ্চলে একজন প্রতিনিধি বা খলিফা নিযুক্ত করেন। ফরায়েজিদের ওপর কোনো স্থুলকায় আক্রমণ বা অত্যাচার হলে অন্য সকল কেন্দ্র থেকে তাদের সাহায্য করা হতো। তিনি মুসলমান প্রজাদের উপর আরোপিত বিভিন্ন বেআইনী কর (দুর্গা পূজা করা, কালিপূজা করা) প্রদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। তিনি প্রচার করেন যে, "জমি আল্লাহর দান, সুতরাং জমিদারদের কর ধার্য করার অধিকার নাই" দুদু মিয়া তার সাংগঠনিক কর্ম তৎপরতা দ্বারা অতি অল্প সময়ের মধ্যে মুসলিম সমাজে বিশেষ প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। বিবাদ মিটানোর জন্য প্রধান ফরায়েজিদের নিয়ে আদালত প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার প্রতিহত করার জন্য জামালউদ্দিন মোল্লা নামে একজন নির্ভীক লাঠিয়ালের সাহায্যে এক শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন।

ফরায়েজিদের উত্থান জমিদার ও নীলকররা সুনজরে দেখেনি। অত্যাচারী জমিদারদের প্রতিহত করার লক্ষ্যে ১৮৪১ সালে কানাইপুরের জমিদারদের বিরুদ্ধে এবং ১৮৪২ সালে ফরিদপুরের জমিদারদের বিরুদ্ধে অভিযান করে শক্তিশালী জমিদার মদন ঘোষকে হত্যা করে সাফল্য অর্জন করেন। ঐ বছর মদন ঘোষকে হত্যার অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার ১১৭ জন ফরায়েজিকে বন্দী করে, এদের মধ্যে ২২ জনের ৭ বছর করে কারাদণ্ড হয়। কিন্তু দুদুমিয়ার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তার জনপ্রিয়তা এত বৃদ্ধি পায় যে, তাকে "ত্রাণকর্তা" হিসেবে স্বাগত জানায়।

Content added By

Wahabi Movement: Titumeer (1782-1831 AD)

পূর্ববঙ্গে ফরায়েজি আন্দোলনের ন্যায় ঊনবিংশ শতকে পশ্চিমবঙ্গে ওহাবী আন্দোলন নামে আর একটি সংস্কার আন্দোলন আরম্ভ হয়। এ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আরবের আবদুল ওয়াহাব (১৭০৩-১৭৭৮ খ্রি.)। ভারতে এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রায় বেরিলির সৈয়দ আহমদ (১৭৮৬-১৮৩১ খ্রি.)। তিনি আরবের ওহাবীদের ন্যায় ভারতবর্ষে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন শুরু করলে তিতুমীর তার শিষ্য হন এবং আন্দোলনের প্রধান নায়ক হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ইংরেজ শাসনবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎ, সংস্কারক ও ধর্মীয় চিন্তাবিদ তিতুমীর ছিলেন একজন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী।

তিতুমীরের প্রথম জীবন: তিতুমীরের আসল নাম মীর নিসার আলী খান। তিনি ১৭৮২ সালে ২৪ পরগনার বারাসাত মহকুমার চাঁদপুর গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
পিতা সৈয়দ হাসান আলী ছিলেন একজন ভদ্র কৃষক। মাতা রোকেয়া বেগম ছিলেন একজন গৃহিণী (বাল্যকালে জ্বর হলে নিসার আলীকে শিউলী পাতার রস খাওয়ানো হতো, সেই তিক্ত রস অতি সহজে পান করত বলে তার মা নাম রাখেন তিতুমিয়া পরে দাঁড়ায় তিতুমীর) তিতুমীর বাল্যকালে গ্রামের হাজী লিয়াকতউল্লাহ বিদ্যালয়ে বাংলা, আরবি ও ফারসি পড়েন। তিনি মল্লযুদ্ধ, অসি চালানো আয়ত্ত করেন। শারীরিক কলাকৌশল ও বীরত্বের জন্য তিনি বাল্যকাল থেকেই খ্যাতি অর্জন' করেন। তিনি ১৮২০ সালে স্থানীয় প্রভাবশালী মুন্সী আমির আলির কন্যা বিবাহ করেন। অপ্রতিদ্বন্দ্বী পালোয়ান থাকায় নদীয়ার জমিদারের অধীনে প্রথম জীবনে একজন লাঠিয়াল হিসেবে চাকরি গ্রহণ করেন।

জমিদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এই সময়ে হিন্দু জমিদার ও ইংরেজ কর্মচারীগণ প্রজাদের উপর অপরিসীম অত্যাচার করত। তাদের অত্যাচার এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছল যে, কৃষ্ণদেব রায় নামে একজন হিন্দু জমিদার মুসলমান প্রজাদের দাড়ির উপর মাথাপিছু আড়াই টাকা হারে কর ধার্য করতে ইতস্তত করলেন না। মুসলমান এই কর দিতে অস্বীকার করল। তিতুমীর জমিদারের অত্যাচার বন্ধ করার জন্য মুসলমানদের সংঘবদ্ধ হতে আহ্বান করেন। এতে জমিদাররা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। গোবরডাঙ্গার জমিদার কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় ও পূর্ণিয়ার জমিদার কৃষ্ণরায় দলবলে আক্রমণ করলে তিতুমীরের নিকট পরাজিত ও বিতাড়িত হয়।

মক্কায় গমন ও সৈয়দ আহমদ শহীদের শিষ্যত্ব গ্রহণ: ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে তিতুমীর মক্কায় হজ করতে গিয়ে মুক্তি সংগ্রামের পথ-প্রদর্শক সৈয়দ আহমদ ওয়াহাবী আদর্শে দীক্ষিত হন। ওয়াহাবী আন্দোলনের মূল কথা ছিল 'ইসলামের শুদ্ধিকরণ'। তিতুমীর ১৮২৭ সালে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে ওয়াহাবী আদর্শের ভিত্তিতে ইসলামের বাণী প্রচার করেন। তিতুমীরের জীবনী লেখক বিহারীলাল সরকারের মতে, “তিনি (তিতুমীর) প্রচার করতে থাকেন যে, আল্লাহর গুণাবলি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা চলবে না এবং কুরআন হাদিসে যে সমস্ত উৎসবের অনুমতি নেই তা পালন করা যাবে না।" তিতুমীর তার আন্দোলনের নাম দেন 'শরিয়ত-ই-মুহাম্মদী'। স্বেচ্ছাচার ও অত্যাচারমূলক শাসন নির্মূল করে একটি আদর্শ ভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম করা ছিল তার আন্দোলনের উদ্দেশ্য। তিতুমীর প্রচার করতে থাকেন যে, মুসলমানদের হাত থেকে ইংরেজরা ভারতের রাজশক্তি কেড়ে নিয়ে ভারতবর্ষকে দার-উল হারাবে পরিণত করেছে, ওয়াহাবীরা ভারতবর্ষকে দার-উল ইসলামে পরিণত করতে চান। অবহেলিত ও শোষিত কৃষক দরিদ্র শ্রেণি মুক্তির সম্ভাবনা অনুভব করে তিতুমীরের আন্দোলনে শরিক হতে থাকে। ইছামতী নদীর উপত্যকা অঞ্চলে ২০/১৪ মাইল পরিধির মধ্যে গ্রামবাসীদের উপর তিতুমীরের প্রভাব স্থাপিত হয়। এই সময় থেকেই নীলকর ও অত্যাচারী জমিদারদের সাথে রাজস্ব, জরিমানা ইত্যাদি নিয়ে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়।

তিতুমীরের সাথে ইংরেজদের সংঘর্ষ: তিতুমীর আশঙ্কা করেন যে, শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ইংরেজদের সংঘাত অবশ্যম্ভাবী। এজন্য তিনি ২৪ পরগনার নারকেলবাড়িয়া গ্রামে ভরতপুরের জাঠদের অনুকরণে ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে ২৩ অক্টোবর বাঁশ দিয়ে এক সুরক্ষিত কেল্লা তৈরি করেন এবং প্রচুর অস্ত্র সংগ্রহ করেন। তিতুমীর নিজেকে 'বাদশাহ' ঘোষণা করেন। ভাগিনেয় গোলাম মাসুমকে প্রধান সেনাপতি, মুইজুদ্দিন বিশ্বাসকে উজীর, ফকির মিস্কিন শাহ গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বে এবং সজ্জন গাজীকে তিতুমীরের দেহরক্ষী নিযুক্ত করেন। তিনি স্থানীয় জমিদারদিগকে পরাজিত করে চব্বিশ পরগানা, নদীয়া এবং ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ নিয়ে একটি স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন। প্রথম দিকে ইংরেজ কর্তৃপক্ষ তিতুমীরের বিদ্রোহকে আমল দেননি। পরে নদীয়া জেলার ম্যাজিস্ট্রেটের রিপোর্ট পাওয়ার পর বারাসতের ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারকে ১২০ জন সিপাহী, স্থানীয় নীলকুঠি এবং জমিদারের বরকন্দাজসহ তিতুমীরের বিরুদ্ধে অভিযানের আদেশ দেন। ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে ১৫ নভেম্বর সংঘর্ষে ১০ জন সিপাহী ও ৩ জন তীরন্দাজ ঘটনাস্থলে নিহত হন। আলেকজান্ডার কোনোরকম প্রাণ নিয়ে পালায়ন করেন। বারাসতের এই ঘটনা 'বারাসাত বিদ্রোহ' নামে পরিচিত। এই জয়ের ফলে তিতুমীরের শক্তি ও সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়বার, নদীয়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এডওয়ার্ড ২৫০ জন পুলিশ বেশ কিছু হাতী এবং নিলকুঠি সাহেবদের সম্মিলিত ৩০০ সৈন্য বাহিনী নারকেল বাড়িয়ার তিতুমীরের ১০০০ জন বিদ্রোহী বাহিনীর কাছে শোচনীয় পরাজয় বরণ করেন (১৭ নভেম্বর ১৮৩১ খ্রি.)। ম্যাজিস্ট্রেট এডওয়ার্ড নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বাঁচান। এই পরাজয় ইংরেজদের টনক নড়ল। অতঃপর কর্তৃপক্ষ কলকাতা থেকে দশম পদাতিক বাহিনীকে কর্নেল স্টুয়াটের নেতৃত্বে প্রেরণ করেন। উক্ত বাহিনী বারাসাতের ভারপ্রাপ্ত জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারের সাথে মিলিত হয়ে তিতুমীরের নারকেল বাড়িয়ার বাঁশের কেল্লা আক্রমণ করেন। তিতুমীরকে আত্মসমর্পণে আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু তিতুমীর ও তার অনুসারীরা বীরবিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকে, হঠাৎ এক কামানের আঘাতে বাঁশের কেল্লা উড়ে যায়। তিতুমীর তার ৬০ জন অনুচরসহ শহিদ হন (১৯ নভেম্বর ১৮৩১)। ইংরেজরা তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা দখলে নিয়ে জীবিত বিদ্রোহীদের বিচারের মুখোমুখি করেন। সেনাপতি গোলাম মাসুমকে কেল্লার সামনে ফাঁসি, ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এভাবেই তিতুমীরের আন্দোলনের অবসান হয়। তিতুমীরের প্রজা আন্দোলন ছিল একটি ঘনবিপ্লব। তিতুমীরের আন্দোলন ব্যর্থ হলেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের অত্যাচার-অবিচার ও অপমানের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম জলন্ত দৃষ্টান্ত। তিতুমীরই প্রথম ব্যক্তি যিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে সরাসরি শহিদ হন। (সর্বকালের ২০ শ্রেষ্ঠ বাঙালির মধ্যে বিবিসির জরিপে তার স্থান ১১তম)। অন্যায় ও অত্যাচারীর সাথে আপস না করে সংগ্রাম করে জীবন বিসর্জন দিয়ে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তা যুগে যুগে স্বাধীনতাকামীদের প্রেরণা যুগিয়েছে যা ১৮০ বছর পর ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বার্থক হয়।

সাঁওতাল বিদ্রোহ-১৮৫৬ (Revolt of Santal-1856)

বিহারের ভাগলপুর জেলা থেকে বীরভূম পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় এক আদিম জাতির বসবাস ছিল। যারা ইতিহাসে সাঁওতাল নামে পরিচিত। কৃষিনির্ভর এই জনগোষ্ঠীর ইংরেজি শাসন বিরোধী অভ্যুত্থানকে 'সাঁওতাল বিদ্রোহ বলা হয়। ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ৩০ জুন গোক্কা ও বীরসিংহ নামের সাঁওতাল গোষ্ঠী প্রধানের ওপর উৎপীড়নের প্রতিবাদে প্রায় ছয় হাজার সাঁওতাল ভাগানিডিহি নামক স্থানে সমবেত হয় এবং ইংরেজদের বিতাড়িত করে 'সত্য যুগ' প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এর পর সাঁওতালরা নির্বিচারে ইংরেজ হত্যা ও লুটপাট শুরু করে। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সিধু ও কানহু নেতৃত্বে ৬০ হাজার সাঁওতাল বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজদের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয় এবং সাঁওতালদের পরাজয় ঘটে। এ বিদ্রোহে প্রায় ২৫ হাজার সাঁওতাল নিহত হয় এবং কয়েক হাজার গ্রাম ধ্বংস হয়। সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এক নজির স্থাপন করেছিল।

নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রজাদের বিদ্রোহ-১৮৬০ (People's revolt against Nilkars-1860)

অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের ফলে ইউরোপে নীলের ব্যবহার বেড়ে যায়। অন্যদিকে, আমেরিকার উপনিবেশগুলো স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর ইংরেজ বণিকদের সেখানকার নীলের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। এই দু'কারণে ইংরেজরা বাংলাদেশকে নীল চাষের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেয়। ইংরেজ বণিকরা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নীলের কারখানা বা নীল কুঠি স্থাপন করে। একচেটীয়া ব্যবসা করতে শুরু করে। ফরিদপুর, যশোর, ঢাকা, পাবনা, রাজশাহী, নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলায় নীল চাষ হতো। ১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ ৬৪০০০ মন নীল উৎপন্ন হয় এবং ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তা দ্বিগুণ হয়। কোম্পানি শাসনকালে নীলকরগণ প্রজাদের ওপর জোর জবরদস্তি করে সর্বোৎকৃষ্ট জমিতে নীল চাষে বাধ্য করত এবং বেধে দেওয়া দামে তা বিক্রি করতে হতো। ১৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দে নীলের যে মূল্য নির্ধারিত করেছিল অর্ধশতাব্দী পরেও কৃষকদেরকে সেই মূল্যে নীল বিক্রি করতে বাধ্য করত। জীবনযাত্রার ব্যয় ও নীল চাষের খরচ বৃদ্ধি বিবেচনা করা হতো না। নীলকরগণ নীল চাষিদেরকে দাদন বা অগ্রিম টাকা দেবার প্রথা প্রচলন করে। দাদন দিত বিঘা প্রতি ২ টাকা এবং বাকি টাকা নীলের ফসল সরবরাহের সময় পরিশোধ করত। কোনো কৃষক দাদন নিতে ও চুক্তি পত্রে স্বাক্ষর করতে কিংবা নীল চাষে অনিচ্ছুক হলে তার উপর চলত অমানবিক নির্যাতন। নীলকরদের অন্ধকার কুঠরিতে মাসের পর মাস বন্দী করে রাখা হতো। দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণে সেই অমানবিক নির্যাতনে চিত্র ফুটে ওঠে। এ প্রসঙ্গে যোগেশচন্দ্র বাগল বলেছেন, “নীলচাষিরা নীল করদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে কোনো লাভ হতো না। ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে নীলকর কমিশন মন্তব্য করেন, "ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট স্বভাবতই তার স্বদেশবাসী ইংরেজ নীলকরের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করত। নীলচাষিদের হত্যা করলেও নীলকরদের কোনো শাস্তি হতো না। নদীয়ার নীলকর জেমন হোয়াইট একজন নীলচাষিকে হত্যা করলে উচ্চ আদালতের বিচারে তাকে কোনো শাস্তি পেতে হয়নি।

নীলকরদের বিরুদ্ধে নীল চাষিদের প্রতিবাদ: নীলকরদের বিরুদ্ধে নীল চাষিরা সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে যশোরে, পাবনা, রাজশাহী ও রংপুরের কৃষকরা একতাবদ্ধ হয়ে প্রতিজ্ঞা করেন কোনো অবস্থায় তারা আর নীল চাষ করবে না। অবস্থা বুঝে ছোট লাট জন স্যার পিটার গ্রান্ট ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে চুক্তি ভঙ্গের অপরাধে কৃষককে দণ্ড প্রদানের এক আইন পাস করেন। এই আইনের দোহাই দিয়ে নীলকররা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে নদীয়া জেলার ২৭টি গ্রামের কৃষকগণ নীলকরদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। নীলকরদের বিরুদ্ধে কৃষকদের বিপ্লব এরূপ প্রবল আকার ধারণ করে যে, সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং মন্তব্য করেন যে, ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে নীল সংকটের সময় তিনি যেরূপ উৎকণ্ঠিত হন ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লি পতনের সংবাদেও তিনি সেরূপ উৎকণ্ঠিত হননি। হাজার হাজার নীল চাষিদের আন্দোলনের মুখে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে নীল চাষ সংক্রান্ত নীল কমিশন গঠন করা হয়। নীল কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকার নীল চাষ কৃষকদের সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন বলে আদেশ জারি করে। উপমহাদেশে নীল বিদ্রোহ ছিল একটি সফল আন্দোলন।.

Content added By

Liberation War-1857 AD

পটভূমি (Background)

লর্ড ক্যানিং-এর শাসনামলে (১৮৫৬-১৮৬২ খ্রি.) ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত মহাবিদ্রোহ একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এ বিদ্রোহ এত ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল যে একে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলা হয়। এই মহাবিদ্রোহের আঘাতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রায় ভেস্তে যেতে ছিল। নানা কারণে এ বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে ব্রিটিশদের মনে এ বিদ্রোহ ভয়ের উদ্রেক সৃষ্টি করে। এ বিদ্রোহের পরেই ব্রিটিশদের টনক নড়ে। তারা অতি দ্রুত ভারতীয় শাসন ভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিকট থেকে মহারানি ভিক্টোরিয়ার এক ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরাসরি ব্রিটিশ সরকার গ্রহণ করে (১৮৫৮ খ্রি.)। ফলে একশত বছরের কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা এ সংগ্রামকে 'সিপাহি বিদ্রোহ' নামে অভিহিত করলেও ভারতীয় ঐতিহাসিকদের মতে এটি ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম। কেননা ব্যারাকপুরের সিপাহি অসন্তোষের মধ্য দিয়ে এ সংগ্রামের সূত্রপাত হলেও তা অতি দ্রুত ভারতবর্ষের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে। এ সংগ্রামের নামকরণে বিতর্কে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বলা হয় সিপাহিদের সাথে জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের গুরুত্ব অনুধাবন করে একে 'সিপাহি বিদ্রোহ' বা 'প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ' না বলে বরং ভারতীয় উপমহাদেশের 'মহাবিদ্রোহ' বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এই মহাবিদ্রোহের পথ ধরেই উপমহাদেশের জনগণ ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়।

মহাবিদ্রোহের কারণ

কোনো বিপ্লব বা সংগ্রাম যেমন একদিনে একটিমাত্র কারণে সংঘটিত হয় না। তেমনি ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পশ্চাতেও অনেক দিনের অনেক কারণ বিদ্যমান ছিল। নিম্নে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের প্রধান কারণসমূহ আলোচনা করা হলো-

রাজনৈতিক কারণ: ব্রিটিশ আধিপত্য বিস্তারের সূচনালগ্ন থেকেই ভারতীয়রা ব্রিটিশ বিরোধী ছিল। বিশেষ করে ব্রিটিশদের সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি ভারতীয় রাষ্ট্রগুলো মেনে নিতে পারছিল না। ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতানীতি দ্বারা হায়দ্রাবাদ রাজ্য গ্রাস করেন। লর্ড ডালহৌসি স্বত্ববিলোপ নীতি গ্রহণ করে সাতারা, নাগপুর, ঝাসি প্রভৃতি রাজ্য দখল করে। নানা সাহেবের ভাতা বন্ধ করে, কুশাসনের অভিযোগে ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে অযোধ্যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করে। সম্রাট বাহাদুর শাহকে দিল্লির রাজপ্রসাদ থেকে বিতাড়িত করে। এ রকম প্রভৃতি আচরণে রাজন্যবর্গ, সিপাহি এবং জনসাধারণকে উত্তেজিত করে তোলে।

এছাড়া লর্ড কর্ণওয়ালিশ অষ্টাদশ শতকে যে শাসন সংস্কার করেছিলেন তার ফলে অনেক ভারতীয় উচ্চ পদ থেকে বঞ্চিত - হন এবং সংখ্যাও হ্রাস করা হয়। ফলে ভারতীয়দের মনে ব্রিটিশদের প্রতি বিদ্বেষ ও বিতৃষ্ণা বহুগুণ বেড়ে যায়, যা পুঞ্জিভূত হয়ে মহা বিদ্রোহের রূপ নেয়।

অর্থনৈতিক কারণ: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের লাগামহীন অর্থনৈতিক শোষণ। ১৭৫৭ সালের পলাশীর লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে সম্পদের যে অপহরণ শুরু হয়েছে তার ফলে সমৃদ্ধশালী ভারতবর্ষে দারিদ্র্য নেমে আসে। বিভিন্ন উপায়, বিভিন্ন অযুহাতে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন যে অর্থ আত্মত্মসাৎ ও পাচার করছে তাতে ভারতবর্ষ ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হয়। যা থেকে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কোম্পানির ভূমি রাজস্ব নীতির ফলে এদেশের একদা সমৃদ্ধ কৃষককুল, বণিক ও মহাজনদের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে এবং ভূমিহীন কৃষকে পরিণত হয়। সমসাময়িক দার্শনিক কার্ল মার্কস ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে বলেছেন-

১। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ভারতীয় কৃষকদের উপর জমিদার ও রাজস্ব আদায়কারী শক্তির যুগ্ম শোষণ।
২। কৃষকদের উপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো।

৩। সেচ ব্যবস্থা ও স্থানীয় শিল্প ধ্বংস।

৪। ব্রিটিশ পণ্যের ভারতীয় বাজার দখল ও কৃষকদের উপর বিবিধ অত্যাচারমূলক আইন কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং পরিত্রাণের আশায় মহাবিদ্রোহের সামিল হয়।

সামাজিক কারণ: ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন "ভারতের সকল শ্রেণির মানুষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন"। ইংরেজরা ভারতবাসীকে নীচুজাত ও বর্বর বলে অভিহিত করত, তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে চাইত না। খ্রিষ্টান ধর্মযাজকগণ প্রকাশ্যে হিন্দুদের মূর্তিপূজা ও সামাজিক সংস্কারাদির নিন্দা করত। ব্রিটিশরা তাদের আবাসিক স্থানে লিখে রাখত "এখানে কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।" ব্রিটিশদের এ সকল কর্মকাণ্ডে ভারতীয়রা আহত হন এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সামাজিক সংস্কার, রেলপথ, টেলিফোন আবিষ্কার, পরোক্ষভাবে ব্রিটিশের জন্য যা সৃষ্টি করা হয়েছিল তা ভারতবাসী উপলব্ধি করতে পারে।

ধর্মীয় কারণ: ইংরেজ শাসকদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে যেমন- খ্রিষ্টান যাজকদের হিন্দু ও মুসলমানদেরকে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা, ক্রিমিয়ার যুদ্ধে যোগদানের জন্য হিন্দুদের সমুদ্র পাড়ি দিতে বাধ্য করা, ভারতে খ্রিষ্টান মিশনারীদের প্রকাশ্যে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচার। ১৮৫০ সালের আইনের মাধ্যমে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণকারীকে পৈত্রিক সম্পত্তিতে অধিকার প্রভৃতি ইংরেজ শাসকদের ধর্মীয় ব্যাপারে এরূপ কর্মকাণ্ডের ফলে ভারতীয়দের মনে এ আশঙ্কার জন্ম দেয় যে, ইংরেজ শাসনে তারা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য। ফলে ভারতীয়দের মনে বিদ্রোহ দানা বাধতে থাকে।

সামরিক কারণ: ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহের প্রধানতম কারণ ছিল সামরিক তথা সিপাহিদের মধ্যে অসন্তোষ। কোম্পানির অধীনে ভারতীয় সিপাহি সেনারা সর্বক্ষেত্রে নিগৃহীত ছিল। ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ সেনার তুলনায় ভারতীয় সেনাদের বেতন ভাতা ছিল যৎ সামান্য। পদোন্নতি ছিল না, সীমাহীন আনুগত্য এবং নিষ্ঠাপূর্ণভাবে কর্তব্য কাজে প্রাণ বিপন্ন করলেও পুরস্কার বা উচ্চ পদে নিয়োগের সুযোগ ছিল না। জানা যায় ৩ লক্ষ ১৫ হাজার ৫০০ জন ভারতীয় সৈনিকের জন্য বছরে ব্যয় হতো ৯৮ লক্ষ পাউন্ড। অথচ ৫১,৩১৬ জর্ন ইউরোপীয় সেনাদের পেছনে খরচ হতো ৫৬ লক্ষ ৬০ হাজার পাউন্ড। ভারতীয় সেনাদের বিভিন্ন বিপজ্জনক যুদ্ধে সামনে ঢাল স্বরূপ ব্যবহার করত। ইউরোপীয় অফিসার ভারতীয় সেনাদের 'নিগার' কালা আদমী, শুয়ার বলে গালি দিত। খাবার-দাবার বাসস্থানেও ছিল চরম বৈষম্য।
কোম্পানির সীমাহীন বৈষম্যমূলক আচরণে দেশীয় সৈন্যদের মনকে যখন বিষাক্ত করে তোলে ঠিক তখন কয়েকটি সামরিক সংস্কারকে কেন্দ্র করে সিপাহিদের মধ্যে আগুন জ্বলে ওঠে। ১৮৫৬ সালে লর্ড ক্যানিং এক আইনের মাধ্যমে দেশীয় সিপাহিদের প্রয়োজনে দূরদেশে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন যা হিন্দু ধর্মের উপর প্রভাব পড়ে। ১৮৫৫ সালে মহরমের মিছিলের উপর নিষেধাজ্ঞায় মুসলিম সেনারা উত্তেজিত হন। সিপাহিদের কপালে তিলক কাটা নিষিদ্ধকরণ, দাড়ি কামানো এবং প্রতীক বিশেষ চামড়ার নতুন পাঞ্জী গ্রহণে সিপাহিরা বিক্ষুদ্ধ হন।

এনফিল্ড রাইফেল ও ব্যারাকপুরে বিদ্রোহ: সিপাহিদের মধ্যে উল্লিখিত বিভিন্ন কারণে যখন অসন্তোষ পুঞ্জীভূত তখন এনফিল্ড রাইফেল নামক এক প্রকার বন্দুক ব্যবহার অশান্তির বারুদে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই বন্দুকের বিশেষ ধরনের গুলি বা টোটা দাঁত দিয়ে ছিড়ে বন্দুকে পুরতে হতো। অনেকের ধারণা কার্তুজটিকে পিচ্ছিল রাখার জন্য এতে গরু এবং শুকরের মিশ্রিত চর্বি ব্যবহার করা হতো। এ দুটি প্রাণীর মাংস হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মে নিষিদ্ধ থাকায় তাদের মনে ধর্ম নাশের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। ব্যারাকপুরের সেনাছাউনিতে মঙ্গল পাণ্ডে নামক এক সৈনিক উত্তেজিত হয়ে তার ঊর্ধ্বতন ইংরেজ অফিসারকে আক্রমণ করেন। (এ অপরাধে ২৯ মার্চ, ১৮৫৭ খ্রি. সামরিক আদালতে মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসি হয়)। এর পর পরই বিদ্রোহ বিভিন্ন স্থানে সিপাহিদের ছাউনিতে (উ. প্রদেশ ৯০টির মধ্যে ৭৫টিতে) দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এর সাথে সাধারণ মানুষ যোগ দিলে সামরিক বিদ্রোহ পরিণত হলো মহাবিদ্রোহে। হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন এবং কারাগার থেকে বন্দী সিপাহিদের মুক্ত করে বিদ্রোহী সিপাহিগণ এবং দিল্লি পৌঁছে মোগল বংশের দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে সম্রাট বলে ঘোষণা করেন (১১ই মে)।

মহাবিদ্রোহ দমন

প্রথম দিকে বিদ্রোহিদের প্রচণ্ড আক্রমণে ব্রিটিশরা কোণঠাসা হলেও শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের শক্তিবৃদ্ধি, সেনাপতিদের কর্মদক্ষতা, শিখ ও নেপালী সৈনিকদের সহযোগিতা এবং দেশীয় রাজন্যবর্গের সহযোগিতায় ইংরেজরা জয়লাভ করতে সক্ষম হয়। চার মাস অবরুদ্ধ থাকার পর স্যার জন লরেন্স দিল্লি উদ্ধার করেন। বৃদ্ধ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে বন্দী করে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠান (বর্তমান বার্মা), তার দুই পুত্র ও পৌত্রগণকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পাঁচ মাস যুদ্ধ করে প্রধান সেনাপতি স্যার কলিন ক্যাম্পবেল বিদ্রোহীদের পরাজিত করে লক্ষ্ণৌ উদ্ধার করেন। লক্ষ্ণৌ-এর বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অযোধ্যার নবাবের বেগম। কানপুরের নানা সাহেব যুদ্ধ কৌশলে অনেক ইংরেজ সৈন্যকে হত্যা করলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে না পেরে নেপালে পলায়ন করেন এবং সম্ভবত সেখানেই মারা যান। বিদ্রোহীদের অনেকে নেপালে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ফলে কানপুর ইংরেজদের অধিকারে আসে। ক্যম্পবলের চেষ্টায় রোহিলাখণ্ড ব্রিটিশদের অধিকারে আসে।

লক্ষ্মীবাঈয়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। দেশপ্রেমিক আহম্মদ উল্লাহ, তাতিয়াতপি প্রমুখ ইংরেজদের হাতে শাহাদৎবরণ করেন। বিদ্রোহে ঢাকায় নিহত সৈনিকদের সমাধিস্থ করা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে।
নিহত সৈনিকদের স্মরণের জন্যই ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের শাসনভার গ্রহণের ঘোষণাপত্রটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বসে পাঠ করা হয়। তখন রানির নামানুযায়ী স্থানটির নাম 'ভিক্টোরিয়া পার্ক' রাখা হয়। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহের শতবার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে উক্ত ভিক্টোরিয়া পার্ক নাম পরিবর্তন করে শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ-এর নামানুসারে 'বাহাদুর শাহ পার্ক' রাখা হয়। বর্তমানে পার্কটি ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহে নিহত সৈনিকের স্মৃতি বহন করে যাচ্ছে। প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী এখানে বেড়াতে আসে এবং মহাবিদ্রোহের নিহত সৈনিকদের স্মৃতিচারণ করেন।

মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে বিপ্লব ভারতের ইতিহাসে এক বড় ধরনের বিপ্লব এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ বিপ্লবের উৎপত্তি সিপাহিদের অসন্তোষের মধ্যে থাকলেও এর পেছনে জনসাধারণের সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল। এ বিপ্লব ছিল দীর্ঘ দিনের প্রস্তুতির ফল। সশস্ত্র বিদ্রোহ হিসেবে এ বিদ্রোহ আরম্ভ হলেও এর প্রকৃতি এতটাই গতিময় ও ব্যাপক ছিল যে, এটা শীঘ্রই স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়। দাসত্বের শৃঙ্খল হতে মুক্তিলাভের জন্য জনসাধারণ এ বিপ্লবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল বিধায় এ সংগ্রামকে জাতীয় সংগ্রামও বলা যায়। কোনো কোনো দিক থেকে এই বিপ্লবকে ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) সাথে তুলনা করা যায়। ফরাসি বিপ্লব যেমন প্যারিস হতে সূচিত হয়ে সমগ্র ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়েছিল তেমনি সিপাহি বিদ্রোহও ব্যারাকপুর থেকে সূচিত হয়ে সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি ছিল মুসলিম হিন্দু নির্বিশেষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রলয়ঙ্ককরী প্রতিবাদ।

মহাবিদ্রোহে ব্যর্থতার কারণ

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বা মহাবিদ্রোহ প্রথম দিকে সাফল্যের দিকে এগোলেও শেষ পর্যন্ত নানা কারণে এ বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতার উল্লেখযোগ্য কারণগুলো নিম্নরূপ:

১। বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পরিচালিত বিদ্রোহ: বিদ্রোহীদের কোনো সামগ্রিক পরিকল্পনা ও সংগঠন ছিল না। ছিল না কোনো
আদর্শ ও একতা। একটি কেন্দ্র থেকে এই বিদ্রোহ পরিচালিত হয়নি। বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পরিচালিত বিদ্রোহ অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহও ব্যর্থ হয়। বিদ্রোহীদের মধ্যে বীরত্বের অভাব না থাকলেও শৃঙ্খলার যথেষ্ট অভাব ছিল।

২। অঞ্চলভিত্তিক বিদ্রোহ: বিদ্রোহ ভীষণ আকার হলেও তা ছিল অঞ্চলভিত্তিক। আঞ্চলিক সীমানা ডিঙিয়ে বিদ্রোহ বৃহত্তর পরিসরে অনুপ্রবেশ করতে পারেনি ফলে বিপ্লব ব্যর্থ হয়।

৩। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ভারতীয় সেনাবাহিনীর দক্ষতা ও অস্ত্র-শস্ত্রের তুলনায় ইংরেজ সেনাবাহিনীর দক্ষতা ও অস্ত্র-শস্ত্র শ্রেষ্ঠ ছিল। আর যারা শ্রেষ্ঠ তারা জয়লাভ করবেই এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।

৪। জাতীয় নেতৃত্বের অভাব এটা ছিল বিদ্রোহীদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। বিদ্রোহীদের মধ্যে উপযুক্ত নেতা বা সেনাপতি ছিল না। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নেতার নেতৃত্বে বিদ্রোহ পরিচালিত হয়। কারো সাথে কোনো যোগাযোগ বা যোগাযোগ রক্ষার কোনো চেষ্টা করা হয়নি। ফলে জাতীয় নেতৃত্বও গড়ে ওঠেনি, যে কারণে উক্ত বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়।

৫। বিজিত অঞ্চলে শাসন প্রতিষ্ঠায় অক্ষম বিভিন্ন স্থানে ইংরেজ শাসন উচ্ছেদ করে কী ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা দরকার সে সম্পর্কে বিদ্রোহীদের কোনো ধারণা ছিল না। ইংরেজদের উচ্ছেদের পর অনেকেই মনে করেছে কাজ শেষ হয়ে গেছে। ইংরেজদের পাল্টা আক্রমণ ঠেকানোর জন্য কোনো রক্ষাকবজ তাদের ছিল না।

৬। দিল্লি পতন ও বাহাদুর শাহের বন্দী: ভারতের স্বাধীনতার প্রতীক বাহাদুর শাহ বন্দী তথা দিল্লি পতনের ফলে সিপাহী ও জনসাধারণের মনোবল ভেঙে যায়। ভারতের স্বাধীনতার প্রতীক বাহাদুর শাহ বন্দী হলে অনেকের কাছে বিদ্রোহ পরিচালনা নিস্ফল মনে হয়।

৭। ভারতের বিরাট অঞ্চল বিদ্রোহ থেকে মুক্ত: পাঞ্জাব, বাংলা, মাদ্রাজ ও মুম্বাইয়ের মতো বৃহৎ অংশ বিদ্রোহ থেকে মুক্ত থাকায় ইংরেজরা সেনা ও রসদ আনার সুযোগ পায়। তাছাড়া দেশীয় অনেক রাজারা বিদ্রোহ থেকে দূরে থেকে নিজের সিংহাসন রক্ষায় মগ্ন থাকেন। যার কারণে বিদ্রোহ সফল হয়নি।

মহাবিদ্রোহের ফলাফল

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে এ বিদ্রোহের ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূর প্রসারী। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১। প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের এটিই ছিল প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম।
২। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা এ আন্দোলন আধুনিক জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। এ বিদ্রোহের আদর্শ, পরিকল্পনা, নেতাদের বীরত্ব, অদম্য সাহসিকতা ও দেশপ্রেম ভারতীয়দের মনে গভীর রেখাপাত করে যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা যুগিয়েছিল।
৩। কোম্পানি রাজত্বের অবসান এবং ব্রিটিশ সরকারের শাসনের সূত্রপাত: এ আন্দোলনে ব্রিটিশ সরকার ভারত নীতি ও শাসনকার্যের ব্যাপারে বিরাট পরিবর্তন আনে। পার্লামেন্ট কর্তৃক 'ভারতের উৎকৃষ্টতর শাসনব্যবস্থা বিধান' (Act for the Better Government for India) পাশ হয়। ভারতের গভর্নর জেনারেল 'ভাইসরয়' বা রাজপ্রতিনিধি উপাধি লাভ করেন।
৪। ব্রিটিশ সরকারের রাজ্য বিস্তার নীতি পরিত্যাগ: মহারানী এক ঘোষণা পত্রে বলেন, "ব্রিটিশের আর রাজ্য বিস্তার করার ইচ্ছা নেই, দেশীয় রাজাদের সঙ্গে সন্ধি রক্ষা সহ সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন।" স্বত্ব বিলোপ নীতি চিরদিনের জন্য রহিত করা হলো।
৫। বিপ্লব এড়াতে সতর্ক: ভবিষ্যতে সিপাহী বিপ্লবের মতো বিপদ যাতে হতে না পারে তার জন্য ইউরোপীয় সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধিসহ তোপখানার ভার ইংরেজ সৈন্যদের অধীনে রাখা হলো।

৬। ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলো: ব্রিটিশরা মনে করে এ আন্দোলনের জন্য মুসলমানরা
দায়ী। কারণ তারা মুঘল সাম্রাজ্যের লুপ্ত গৌরব উদ্ধার করতে চেয়েছিল। সুতরাং বিপ্লব ব্যর্থ হবার পর মুসলমানদের উপর চলে ব্যাপক দমন নীতি। এই দমননীতি প্রায় ৫০ বছর স্থায়ী হয়।
৭। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ: ভারতবর্ষের সিপাহী, কৃষক, জনতা ও রাজন্যবর্গ ঐক্যবদ্ধ হয়েই ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে
বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যদিও সংগত কারণে বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় তথাপিও উক্ত ঐক্য আরও মজবুত হয়। হিন্দু-মুসলমান তাদের বিদ্বেষ পরিহার করে তাদের মূল শত্রুকে চিনতে পারে। পরবর্তী যেকোনো ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জাতীয়তাবোধ সৃষ্টিতে এ ঐক্য কাজে লাগে।
ড. আর সি মজুমদারের মতে, "একাধিক কারণে এ বিপ্লব ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি যুগ সন্ধিক্ষণের সূচনা করে।"

সারসংক্ষেপ

নিয়ামক আইন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে উপমহাদেশে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় বিধি-বিধান মেনে চালার জন্য দেওয়া একটি ফরমান। ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী লর্ড নর্থ নিয়ামক আইন প্রণয়ন করেন। ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে এ আইন প্রণয়ন করা হয়।

অযোধ্যা নীতি: ওয়ারেন হেস্টিংস কর্তৃক অযোধ্যা প্রদেশটি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য নীতি গ্রহণ করেন। এ নীতি অনুযায়ী হেস্টিস মুঘল সম্রাট শাহ আলমের নিকট থেকে কারা ও এলাহাবাদ কেড়ে নিয়ে বাৎসরিক ৫০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলাকে প্রদান করে। যাতে মারাঠা যুদ্ধে অযোধ্যাকে তিনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত: পাঁচসালা এবং একসালা ভূমি বন্দোবস্তের সংস্কার রূপই হচ্ছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। ভূমি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনয়নে এবং সঠিকভাবে রাজস্ব আদায়ের জন্য লর্ড কর্ণওয়ালিশ ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ভূমি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে স্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেছিলেন তাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এ ব্যবস্থার সুফল এবং কুফল উভয়ই ছিল।

অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি: ওয়েলেসলি ভারতবর্ষে পদার্পণ করে বিদেশিদের সাহায্য লাভে ভারতীয়দের ব্যকুলতা লক্ষ করেই এ নীতি গ্রহণ করেন। এ নীতিতে বলা হয়- (ক) যে সকল ভারতীয় রাজন্যবর্গ অধীনতামূলক মিত্রতা নীতিতে আবদ্ধ হবেন তারা ব্রিটিশ সরকারের অনুমতি ব্যতীত অপর কোনো রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কিংবা সন্ধি স্থাপন করতে পারবে না। (খ) যারা এ নীতিতে আবদ্ধ হবেন তাদের রাজ্যে একদল ইংরেজ সৈন্য পালন করবে এবং তাদের ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য নগদ অর্থ বা রাজ্যের এক অংশ ইংরেজদেরকে ছেড়ে দেবে। (গ) মিত্রতাবদ্ধ দেশীয় রাজ্য হতে একমাত্র ইংরেজ ব্যতীত সকল ইউরোপীয়দের বিতাড়িত করতে হবে।

টিপু সুলতান: মহীশূরের শাসনকর্তা হায়দার আলীর পুত্র টিপু সুলতান। পিতার মৃত্যুর পর তিনি মহীশূরের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করে দেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তার সাথে ইংরেজদের ইঙ্গ-মহীশূর ২য়, ৩য় এবং ৪র্থ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই জীবন দেন। তাকে ভারতীয় উপমহাদেশে 'আশার শেষ রশ্মি' বলা হয়।

সতীদাহ প্রথা : বহু প্রাচীনকাল থেকে হিন্দু সমাজে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত একটি প্রথা। এটি একটি অমানবিক প্রথা। এ প্রথা অনুযায়ী কোনো স্বামী মারা গেলে তার চিতায় জীবন্ত স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারা হতো। সহমরণ এবং অনুমরণ এই দুটি উপায়ে তা কার্যকর করা হতো। আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায় লর্ড বেন্টিংক-এর সহযোগিতায় এ অমানবিক প্রথা উচ্ছেদ করেন।

বর্গী: ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলে বসবাসকারী এক দল দস্যু। এরা মগ নামেও পরিচিত। মুঘলদের দুর্বলতায় এদের প্রকোপ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পায়। লুঠতরাজ, হত্যা, অত্যাচার করে জনজীবন অভিষ্ঠিত করে তোলে। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক এদের দমন করেন।

স্বত্ববিলোপ নীতি: লর্ড ডালহৌসির বাজ্য গ্রাসের একটি কৌশল। এ নীতিতে বলা হয় ব্রিটিশদের আশ্রিত বা অনুগ্রহীত কোনো দেশীয় রাজা অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে এবং তার রাজবংশে কোনো উত্তরাধিকারী না থাকলে সে রাজ্য সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভূক্ত হবে। কোনো দত্তক বা পালিত পুত্রের অধিকার স্বীকৃত দেওয়া হবে না। এ নীতি গ্রহণ করে তিনি, সাতারা, সম্ভলপুর, নাগপুর, ঝাঁসি প্রভৃতি রাজ্য ব্রিটিশ সম্রাজ্যভুক্ত করেন।

ফকির। মুসলিম সংসার ত্যাগী একশ্রেণির সাধক। তাদের স্বাধীন কাজে বাধা দেওয়ার কারণে তারা সর্বপ্রথম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

সন্ন্যাসী: হিন্দু সংসার ত্যাগী একশ্রেণির হিন্দু সাধক। ফকিরদের ন্যায় তাদের স্বাধীন কালে বাধা দেওয়া ফকিরদের সাথে মিলিত হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুগপৎ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যদিও ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় তথাপিও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পথম বিদ্রোহ হিসেবে এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।

ওহাবী আন্দোলন: পূর্ববঙ্গের ফরায়েজী আন্দোলনের ন্যায় পশ্চিম বঙ্গে উনবিংশ শতকে ওহাবী আন্দোলন নামে একটি সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আরবদেশের আবদুল ওহাব। ভারতে এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সৈয়দ আহমেদ। এর অন্যতম শিষ্য ছিলেন তিতুমীর। তিতুমীরই প্রথম ভারতীয় যিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে শহিদ হন।

এনফিল্ড রাইফেল। এক ধরনের বিশেষ বন্দুক। এই বন্দুকের গুলি বা টোটা দাঁত দিয়ে ছিড়ে বন্দুকে পুরতে হতো। কার্তুজটিকে পিচ্ছিল রাখার জন্য এতে তথাকথিত গরু ও শুকরের মিশ্রিত চর্বি ব্যবহার করা হতো। যা মুসলমান এবং হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে। ফলে মঙ্গল পাণ্ডে নামে ব্যারাকপুরের এক সিপাহী বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং এ বিদ্রোহ ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। যা ইতিহাসে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহ নামে পরিচিত।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...