পাঠ ৬.১: জাতিসংঘ গঠনের পটভূমি

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

18

পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা নতুন কিছু নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগের ফসল হলো UNO বা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ, যাকে আমরা জাতিসংঘ হিসেবে জানি। যুদ্ধকালীন মিত্রশক্তিবর্গের রাষ্ট্রনেতারা তাদের আলোচনা বৈঠকে ও ঘোষণাপত্রগুলোতে কতগুলো নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এ সম্মেলনগুলোতে শুধু সমরনীতিবিষয়ক সিদ্ধান্ত হয়নি, কতগুলো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছিল। যার ফল হিসেবে জাতিসংঘের উদ্ভব। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা ছিল আন্তর্জাতিক সংগঠনের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। বিশ্ব ইতিহাসের এক দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার আশার আলো প্রজ্বালন করে জাতিসংঘের জন্ম। এর আগে আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থায় কোনো সংগঠনই জাতিসংঘের মতো এত ব্যাপক বিস্তৃতি ও পরিধি নিয়ে মানবজাতির কল্যাণে আত্মপ্রকাশ করেনি। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের চার বছরের নিরলস প্রচেষ্টার ফসল হলো জাতিসংঘ।

লন্ডন ঘোষণা, ১৯৪১: জাতিসংঘের জন্মের সূচনা ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুন লন্ডনের জেমস প্রাসাদে। এ সময় জার্মানির নাৎসি আক্রমণের ভয়ে ইউরোপের মিত্রদেশের নেতৃবৃন্দ এবং অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। এসব দেশের নেতৃবৃন্দ চিরস্থায়ী শান্তির জন্য আগ্রাসনমুক্ত পৃথিবী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে 'লন্ডন ঘোষণায়' স্বাক্ষর করেন।

আটলান্টিক সনদ, ১৯৪১: দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল 'আটলান্টিক সনদ'। অক্ষশক্তির ক্রমাগত আক্রমণে যখন
মিত্রশক্তি কোণঠাসা, তখন (১৪ই আগস্ট, ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ) আটলান্টিক মহাসাগরে আগস্টা নামক যুদ্ধজাহাজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল মিলিত হয়ে আটলান্টিক সনদ স্বাক্ষর করেন। উক্ত সনদে যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে বিজয়ী ও বিজিত সকল জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও সীমানা সম্পর্কে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। স্থায়ী শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে আক্রমণকারীদের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাব আটলান্টিক সনদে গৃহীত হয়।

ওয়াশিংটন সম্মেলন, ১৯৪২: ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন
রুজভেল্ট ওয়াশিংটনে যে সম্মেলন আহ্বান করেন তাতে চীন, ব্রিটেন ও সোভিয়েত রাশিয়াসহ ২৬টি দেশ আটলান্টিক সনদকে অনুমোদন দেয়। আটলান্টিক সনদের ঘোষণাপত্রই 'জাতিসংঘ ঘোষণা' নামে পরিচিতি লাভ করে। আটলান্টিক সনদের ঘোষণাপত্রে বলা হয় যে, সনদে স্বাক্ষরকারী সকল রাষ্ট্র অক্ষশক্তির জোটের (জাপান, জার্মানি ও ইতালি) বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তি ও মানবিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যবহার দ্বারা অক্ষশক্তির পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। কেউ পৃথকভাবে Sett শত্রুর সাথে যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তি করবে না।

১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে কাসাব্লাংকায় চার্চিল ও রুজভেল্টের যে সম্মেলন হয় তা ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পরবর্তী পদক্ষেপ। এ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় যে, ইতালি বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ না করলে সিসিলির দিক থেকে ইতালিকে আক্রমণ করা হবে। একই বছর পূর্বোক্ত নেতৃবৃন্দের সাথে চীনের চিয়াং কাইসেক কায়রোতে মিলিত হন। এতে সিদ্ধান্ত হয়, জাপানকে তার বিজিত স্থানসমূহ প্রত্যর্পণে বাধ্য করা হবে। কোরিয়াকে স্বাধীনতাদানের বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পায়।

মস্কো সম্মেলন, ১৯৪৩: জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার অন্যতম পদক্ষেপ হলো ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরের মস্কো
সম্মেলন। এটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রীদের সম্মেলন। নাৎসি জার্মানির পরাজয়ের পর যে সকল সমস্যা উদ্ভবের আশঙ্কা ছিল তা-ই ছিল আলোচনার বিষয়। নাৎসিদের যুদ্ধকালীন অত্যাচার ও নিপীড়নের জন্য তাদের শাস্তি প্রদানের কথা আলোচনায় স্থান পায়।

তেহরান সম্মেলন, ১৯৪৩: ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের কূটনৈতিক
নেতৃবৃন্দ একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের অভিপ্রায়সংবলিত ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন। এ ঘোষণায় বলা হয়, এ সংগঠন সকল শান্তিপ্রিয় দেশের সার্বভৌম সমতার নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বৃহৎ-ক্ষুদ্র সকল শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্রই এ সংগঠনের সদস্য পদ লাভ করার অধিকারী হবে। নভেম্বরে রাশিয়ার স্ট্যালিনের সাথে চার্চিল ও রুজভেল্ট তেহরানে মিলিত হয়ে সকল রাষ্ট্রকে সংগঠনে যোগদানের ব্যাপারে একটি বিবৃতি দেন। তারা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, তাদের বিবৃতি বিশ্বে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে।

ডাম্বারটন ওকস সম্মেলন, ১৯৪৪ ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের (২১শে আগস্ট থেকে ৭ই অক্টোবর পর্যন্ত)
ওয়াশিংটনের নিকট 'ডাম্বারটন ওকসে' যে সম্মেলন হয় তাতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ব্রিটেনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। এটি ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতিমূলক বিশেষ সম্মেলন। জাতিসংঘের রূপরেখা ও কাঠামো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও নিরাপত্তা পরিষদের একক বিরোধিতার প্রস্তাব অর্থাৎ Veto প্রয়োগের অধিকার নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। তবে, ডাম্বারটন ওকসের সম্মেলনের প্রস্তাবানুযায়ী বিশ্ব সংগঠনের নামকরণ করা হয় UNO (United Nations Organisation) বা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ, যা জাতিসংঘ হিসেবে ব্যাপক পরিচিত।

ইয়াল্টা সম্মেলনে, ১৯৪৫: ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে ইয়াল্টা সম্মেলনে (৪-১১ই ফেব্রুয়ারি) নিরাপত্তা
পরিষদে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা ও ভোটদান পদ্ধতি নিয়ে স্ট্যালিন, চার্চিল ও রুজভেল্ট আলোচনা করেন। পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা অর্পণের সিদ্ধান্ত হয়। সানফ্রান্সিসকো শহরে এ তিন রাষ্ট্রনেতা পুনরায় মিলিত হয়ে ওকসের প্রস্তাবানুযায়ী UN-এর সনদ রচনার সিদ্ধান্ত নেন। ২৬শে জুন উক্ত শহরে ৫১টি দেশের অর্থাৎ পৃথিবীর ৮০% মানুষের প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেন।
সানফ্রান্সিসকো সম্মেলন, ১৯৪৫ সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন ও ফ্রান্সের
ঐক্যবদ্ধ চাপের ফলে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা স্বীকার করে নেওয়া হয়। উপস্থিত সকল রাষ্ট্রই জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষর করে। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে অক্টোবর সকল প্রতিনিধি রাষ্ট্রের এক মহাসম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সংগঠন জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা ১৯৩। বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য।
উপর্যুক্ত পটভূমিকায় বলা যায়, বিশ্বের বৃহৎ শক্তি ও নেতৃবৃন্দের দীর্ঘ কূটনৈতিক কর্মতৎপরতার ফসল হলো জাতিসংঘ, যার সূচনা 'লন্ডন ঘোষণার' মধ্য দিয়ে এবং পরিসমাপ্তি 'সানফ্রান্সিসকোর' মহামিলনের মধ্য দিয়ে। এর গঠনপ্রক্রিয়ার সাথে বৃহৎ শক্তিবর্গের যুদ্ধকালীন কূটনৈতিক তৎপরতা ও ভূমিকা লক্ষণীয়।

জাতিসংঘের উদ্দেশ্য

জাতিসংঘ সনদের ১ নং ধারায় এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। যুদ্ধ ও যুদ্ধভীতি থেকে মুক্ত একটি
আন্তর্জাতিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। নিচে উদ্দেশ্যসমূহ তুলে ধরা হলো:

১। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। শান্তির প্রতি ভীতি প্রদর্শনের প্রতিরোধ ও নির্মূলকল্পে যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ।
২। সকল জাতির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন। মানুষের অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত মর্যাদা হবে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের নীতি। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
৩। যুদ্ধের মূলোৎপাটনের জন্য ব্যাপকভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
৪। উপর্যুক্ত উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য জাতিসংঘকে সকল জাতির কার্যকলাপের সমন্বয়সাধনের কেন্দ্রে পরিণত করা।

জাতিসংঘের লক্ষ্যসমূহ

আগামী দিনের মানুষ যেন যুদ্ধ ও ধ্বংসের ভয়াবহ পরিণতি থেকে মুক্ত হয়ে এক সুন্দর ও সংঘাতমুক্ত পৃথিবী গড়তে পারে, সে অঙ্গীকার নিয়ে এর লক্ষ্যসমূহ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
১। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করা।
২। মৌলিক মানবাধিকার এবং সকল মানুষের সমানাধিকারের উপর আস্থা স্থাপন।
৩। যেকোনো সন্ধি ও আন্তর্জাতিক আইনের অন্যান্য সূত্র থেকে উদ্ভূত সকল বাধ্যবাধকতা ন্যায়-নীতি ও সম্মানের সাথে পালন করা।
৪। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, যেখানে ব্যাপক স্বাধীনতার পরিমণ্ডলের মধ্যে সামাজিক প্রগতি ও উন্নতি সুনিশ্চিত হয়।

জাতিসংঘের নীতিসমূহ

জাতিসংঘ সনদে ৭টি নীতির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। সকল সদস্য রাষ্ট্র নীতিগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের কাজকর্ম করবে বলে নীতিতে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
১। জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র সার্বভৌম ক্ষমতার নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। (তবে এ নীতিতে নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্যের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে)।
২। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র অন্য সদস্য রাষ্ট্রের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সনদে সংযোজিত বাধ্যবাধকতাসমূহ বিশ্বস্ততার সাথে প্রয়োগ করবে।
৩। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা যাতে ব্যাহত না হয়, আন্তর্জাতিক সমস্যাসমূহ নিষ্পত্তি করবে।। ত না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখেই শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের
৪। প্রতিটি রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকবে।
৫। সকল কাজের ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্র জাতিসংঘকে সাহায্য করবে।
৬। যারা জাতিসংঘের সদস্য নয়, তারা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে।
৭। জাতিসংঘ কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
সুতরাং বলা যায়, উপর্যুক্ত নীতি সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তরিকতার সাথে পালন করলে জাতিসংঘের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব।

জাতিসংঘের গঠন

প্রধানত ৬টি সংস্থা নিয়ে জাতিসংঘ গঠিত। যথা-
১। সাধারণ পরিষদ;
২। নিরাপত্তা পরিষদ;
৩। অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ;
৪। অছি পরিষদ;
৫। আন্তর্জাতিক আদালত এবং
৬। সচিবালয়।

জাতিসংঘের অধীন বা সহযোগী সংস্থার সংখ্যা ১৪; যেমন- ইউএনইপি (UNEP), ইউএনডিপি (UNDP), আংকটাড (UNCTAD), শিশু তহবিল (ইউনিসেফ-UNICEF), জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ব খাদ্য পরিষদ ইত্যাদি।
জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থা ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ১৭টি। যেমন- আইএলও (ILO), ডব্লিউএইচও (WHO), আইএমএফ (IMF), আইডিএ (IDA), ইউনেস্কো (UNESCO), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), বিশ্ব পোস্টাল ইউনিয়ন (UPU) ইত্যাদি।
সাধারণ পরিষদের গঠন: জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে সাধারণ পরিষদ গঠিত। বিশ্বের যেকোনো
শান্তিকামী রাষ্ট্র জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্য হতে পারে। প্রতিবছর একবার সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র ৫ জন সদস্য পাঠাতে পারে। কিন্তু প্রতিনিধি ৫ জন পাঠালেও সদস্য রাষ্ট্রের ভোটদানের অধিকার থাকে একটি। আন্তর্জাতিক শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সাধারণ পরিষদে তা আলোচনা করা হয়। নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের কাছে জোর সুপারিশ করে। সাধারণ পরিষদে বিশ্বের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনের প্রয়োজন হয়। সাধারণ পরিষদের সম্মতি ছাড়াও প্রস্তাবটি কার্যকরি করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের উপর নির্ভর করতে হয়। তবে বিশ্বশান্তি বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোনো বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হলে তা সাধারণ পরিষদে আলোচনা করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে উপযুক্ত সিদ্ধান্তের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটের মাধ্যমে তা কার্যকর করা যাবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে আরও কার্যকরী করার জন্য কয়েকটি রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক সংস্থাকে পর্যবেক্ষকের মর্যাদা দিয়েছে। এর মধ্যে সুইজারল্যান্ড, ভ্যাটিকান, পিএলও উল্লেখযোগ্য।

সাধারণ পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলি জাতিসংঘ সনদ সাধারণ পরিষদকে নানাবিধ কার্যসম্পাদনের ক্ষমতা প্রদান করেছে। যেমন- (ক) নির্বাচনমূলক, (খ) অর্থ সম্পর্কিত, (গ) সুপারিশমূলক, (ঘ) নির্বাহীসংক্রান্ত, (৫) শান্তির জন্য ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা, (চ) সহযোগী সংস্থা গঠন, (ছ) রিপোর্ট গ্রহণ ও পর্যালোচনা, (জ) উদ্যোগ গ্রহণ, (ঝ) আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা ইত্যাদি।
নিরাপত্তা পরিষদের গঠন: জাতিসংঘের মূল বিভাগ হলো নিরাপত্তা পরিষদ। জাতিসংঘের সব কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য নিরাপত্তা পরিষদকে জাতিসংঘের মেরুদণ্ড বলা হয়। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা ছিল ৫টি স্থায়ী ও ৬টি অস্থায়ী রাষ্ট্র। জাতিসংঘ প্রয়োজনীয়তার তাগিদে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করে। ফলে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩১শে আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র ৬টির স্থলে ১০টি হয়। ফলে ৫টি সদস্য স্থায়ী ও ১০টি অস্থায়ী রাষ্ট্রের সমন্বয়ে নিরাপত্তা পরিষদ গঠিত হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য ২ বছরের জন্য নির্বাচিত নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র আছে যাদের ভেটো ক্ষমতা আছে। বিশ্বের আলোচিত কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যদি কোনো একটি স্থায়ী রাষ্ট্র ভেটো প্রদান করে তাহলে সেটি আর অগ্রসর হতে পারে না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও চীন।

নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলি জাতিসংঘের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্রস্থল নিরাপত্তা
পরিষদ। নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই জাতিসংঘ নিজেকে একটি অত্যধিক ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থায় পরিণত করেছে; যেমন- (ক) শাস্তিভঙ্গ, ভীতি প্রদর্শন এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা;
(খ) আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা; (গ) আঞ্চলিক বন্দোবস্তবিষয়ক ক্ষমতা; (ঘ) অছিবিষয়ক ক্ষমতা
(ঙ) নতুন সদস্য গ্রহণবিষয়ক ক্ষমতা; (চ) সদস্য বহিষ্কারবিষয়ক ক্ষমতা; (ছ) নির্বাচনমূলক ক্ষমতা;
(জ) মিলিটারি স্টাফ কমিটি গঠন।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ: আন্তর্জাতিক শাস্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন।
দেশের আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন বা সমৃদ্ধিসাধনের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ গঠিত হয়েছে। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একদিকে উত্তেজনা প্রশমন, অস্ত্রের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, নিরস্ত্রীকরণ, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ মীমাংসা, শাস্তি বিঘ্নকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেমন প্রয়োজন তেমনি এ উদ্যোগ সফল করার জন্য প্রয়োজন সমগ্র মানবজাতির অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক জীবনের বিকাশ ও অগ্রগতি। ধ্বংস ও যুদ্ধ প্রতিরোধ করার জন্য এবং মানবজাতির স্থায়ী কল্যাণসাধনের জন্য গঠনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করাও একান্ত আবশ্যক। এ কারণেই জাতিসংঘের গঠনমূলক উদ্যোগ ও কার্যক্রমের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ন্যূনতম মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়নে এ পরিষদ অবদান রেখে চলেছে।

অছি পরিষদ: জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিশেষ বিবদমান রাষ্ট্র বা অঞ্চলসমূহের প্রশাসনিক বিন্যাস, শাস্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা অছি পরিষদের দায়িত্ব। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে লীগ অব নেশন্সের ম্যান্ডেটভুক্ত ১১টি দেশের দায়িত্ব নিয়ে এ পরিষদের কার্যক্রম শুরু হয়। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যবর্গ ও সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে অছি পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে অছি পরিষদের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

আন্তর্জাতিক আদালত

International Court of Justice
জাতিসংঘের মুখ্য বিচার প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক আদালত। আন্তর্জাতিক সমাজের আইনগত বিরোধ মীমাংসার জন্য এটি একটি স্থায়ী বিচার সংস্থা। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে এর প্রধান কার্যালয়। আন্তর্জাতিক আদালতের কাজ হলো তার নিকট পেশকৃত বিরোধসমূহ আন্তর্জাতিক আইনানুসারে মীমাংসা করা। আন্তর্জাতিক আদালতের এখতিয়ার তিন ভাগে বিভক্ত; যথা- (ক) স্বেচ্ছাধীন, (খ) আবশ্যিক ও (গ) পরামর্শমূলক এখতিয়ার। ১৫ জন বিচারক নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত গঠিত, যারা ৯ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। আন্তর্জাতিক আদালতের এখতিয়ার বিস্তৃত। নিরপেক্ষ বিচার সুনিশ্চিত করতে না পারায় 'কিছু কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আদালতের সমালোচনা লক্ষণীয়।

সচিবালয়

The Secretariat

জাতিসংঘের বিশাল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়। সকল প্রশাসনিক কাজ সচিবালয় থেকেই পরিচালিত হয়। এর প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বলা হয় মহাসচিব যা সেক্রেটারি জেনারেল। নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে সাধারণ পরিষদ কর্তৃক পাঁচ বছরের জন্য মহাসচিব নির্বাচিত হন। তবে মহাসচিব নির্বাচনের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সর্বসম্মতির প্রয়োজন হয়। কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্র ভেটো প্রয়োগ করলে সাধারণ পরিষদের কাছে ঐ নাম প্রস্তাব করা যায় না। মহাসচিবের কাজের পরিধি অনেক বিস্তৃত। শুধু প্রশাসনিক কাজ সম্পাদন ছাড়াও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় তার ক্ষমতা ও দায়িত্ব অনেক। তিনি পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান বা মোড়ল। কোনো কোনো মহাসচিব জাতিসংঘের মুখ্য প্রশাসকের ভূমিকা অতিক্রম করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের এক মুখ্য নির্ধারকে পরিণত হয়েছেন। তারা তাদের কর্মকাণ্ডের দ্বারা মানবজাতির আশ্বাসের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছেন। তবে মহাসচিবের ভূমিকা তার বিচক্ষণতা, নিরপেক্ষতা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা এবং বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রের সহযোগিতার উপর অনেকটা নির্ভরশীল।
জাতিসংঘের প্রথম মহাসচিব হলেন নরওয়ের ট্রিগভেলি এবং বর্তমান অর্থাৎ নবম মহাসচিব হলেন পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও গুতেরেস। তৃতীয় মহাসচিব ছিলেন বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের নাগরিক উ থান্ট। কাজেই এশিয়া মহাদেশ থেকে দু'বার মহাসচিব নির্বাচিত হওয়া কম গৌরবের কথা নয়।

এ যাবৎ দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতিসংঘের মহাসচিবগণের তালিকা"

নামদেশের নামদায়িত্ব পালনের সময়
ট্রিগভেলিনরওয়ে২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১০ নভেম্বর, ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
দ্যাগ হ্যামারশোল্ডসুইডেন১০ এপ্রিল, ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
উ থান্টমিয়ানমার৩০ নভেম্বর, ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১ জানুয়ারি, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
কুট ওয়ার্ল্ডহেইমঅস্ট্রিয়া১ জানুয়ারি, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১ জানুয়ারি, ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
জ্যাভিয়ের পেরেজ দ্য কুয়েলারপেরু১ জানুয়ারি, ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১ জানুয়ারি, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
ড. বুট্রোস বুট্রোস ঘালিমিশর১ জানুয়ারি, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১ জানুয়ারি, ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
কফি আনানঘানা১ জানুয়ারি, ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১ জানুয়ারি, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
বান কি মুনদক্ষিণ কোরিয়া১ জানুয়ারি, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
আন্তোনিও গুতেরেসপর্তুগাল১ জানুয়ারি, ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান

জাতিসংঘ এবং বিশ্বশান্তি মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...