পাঠ-৮.৩: বিশ্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির প্রভাব।

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

19

আন্তর্জাতিক রাজনীতির চরিত্র প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব যত দিন ছিল বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির চেহারা এক রকম ছিল। মহাশক্তিধর সোভিয়েত ইউনিয়নের বাস্তব অস্তিত্ব না থাকায় শক্তি রাজনীতির তীব্রতা এখন পূর্বের মতো নেই। নিজ নিজ প্রভাবাধীন এলাকাকে সম্প্রসারিত করা ও আন্তর্জাতিক সমাজে ভাবমূর্তি বাড়িয়ে তোলার উদগ্র বাসনা আজ মস্কো বা ওয়াশিংটন কারোরই নেই। আবার ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বেপরোয়াভাবে অস্ত্র উৎপাদনের প্রবণতাও সোভিয়েত রাশিয়া বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের মধ্যেই অনুপস্থিত। নিরস্ত্রীকরণে জন্য আজ সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কুণ্ঠিত নয়। এর কারণ হলো প্রবল পরাক্রান্ত প্রতিযোগীর ক্ষমতার লড়াইয়ের আসরে অনুপস্থিতি। কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির প্রভাব আজ বিশ্ব রাজনীতিতে দৃশ্যমান একটি বিষয়।

বিলুপ্ত হওয়ার পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল দুই পরাশক্তির একটি; কমিউনিস্ট বিশ্বের নেতা। আজ তার কোনো অস্তিত্ব নেই। রাশিয়া তার স্থলাভিষিক্ত হলেও তাকে এখন পরাশক্তি আখ্যায়িত করা যায় না। উত্তরাধিকার সূত্রে সে কেবল পুরনো সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু সমরাস্ত্র পেয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসনটি লাভ করেছে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলোর প্রভাব ও আগ্রাসন থেকে সযত্নে রক্ষা করাই ছিল রাশিয়ার লক্ষ্য ও ব্রত। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সমাজতন্ত্রের মতবাদ অক্লান্ত পরিশ্রমে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচার করে আসছিল। ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন কমিয়ে নিজেকে সামরিক শক্তিতে অপরাজেয় করে তুলছিল। ইউনিয়ন বিলুপ্ত হওয়ায় রাশিয়ার সে ক্ষমতার দাপট আর নেই। বিশ্ব রাজনীতিতে মতাদর্শগত লড়াই না থাকায় অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রগুলোতে সে প্রভাববলয় বা শৃঙ্খলও আজ নেই।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির প্রভাব ইউরোপীয় রাজনীতিতে বেশি মাত্রায় দৃশ্যমান। দুই জার্মানি একত্রিত হয়ে যাওয়ায় ইউরোপকে কেন্দ্র করে শক্তি-দ্বন্দ্ব অতীতের মতো আর নেই। পূর্ব জার্মানি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী একটি উপগ্রহ রাষ্ট্র। পূর্ব জার্মানির অভ্যন্তরীণ কল্যাণের ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে খুব বেশি মাথা ঘামাত তা নয়। পূর্ব জার্মানিতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আসন সুদৃঢ় করা এবং তাকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সম্প্রসারণবাদকে সংযত করাই ছিল তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য, অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য পূর্ব জার্মানি ছিল হাতিয়ারস্বরূপ। সে কারণে ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবেশ মাঝে মাঝে উত্তপ্ত হয়ে উঠত। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ও কমিউনিস্ট শাসনের অবসান হওয়ায় আজ শক্তি-দ্বন্দ্ব স্তিমিত হয়ে পড়েছে। দুই জার্মানি একত্রীকরণের ফলে ইউরোপের অন্যতম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

আমেরিকার বিষফোঁড়া ছিল সাম্যবাদ; আর সোভিয়েত ইউনিয়নের বিষফোঁড়া ছিল পুঁজিবাদ। আজ রাশিয়া পুঁজিবাদকে অসহ্য মনে না করে বরং লালন করছে। আদর্শগত দ্বন্দ্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাজিত; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তার দোসররা জয়ী। জয়ী হওয়ার সুবাদে আজ বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। তবে একক শক্তি হিসেবে আমেরিকাই এখন বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্তা। আজ রাশিয়া আর পরাশক্তির ভূমিকায় নেই। বরং ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো বৃহৎ শক্তি মাত্র। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সামরিক জোট ন্যাটোর অ্যাসোসিয়েট সদস্য এখন রাশিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ওয়ারস জোট আজ মৃতপ্রায়। রাশিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এখন পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে। পূর্ব ইউরোপীয় দেশ, যেগুলো এককালে অনুগ্রহ রাষ্ট্র ছিল, তারাও ন্যাটোর সদস্য পদ লাভ করেছে। কাজেই দেখা যায়, স্নায়ুযুদ্ধকালীন সৃষ্ট সামরিক জোটগুলোর বিলুপ্তি বা সম্প্রসারণ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির সমার্থক।

পৃথিবীতে কোন দেশ কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে তা নির্ধারিত হবে সামরিক শক্তির চেয়ে অর্থনৈতিক শক্তির দ্বারা। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এ কথাই প্রমাণ করে যে, শুধু সামরিক শক্তির দ্বারা বিশ্বের বুকে সাময়িকভাবে প্রাধান্য বিস্তার করা যায়- দীর্ঘস্থায়ীভাবে নয়। দীর্ঘস্থায়ী করতে দরকার শক্তিশালী অর্থনীতি। অর্থনৈতিক ক্ষমতাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশে সহায়তা করেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির প্রভাব তৃতীয় বিশ্বের (শিল্পে অনুন্নত যে সমস্ত দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো স্বাধীনভাবে গড়ে উঠতে পারেনি, অন্যের উপর নির্ভরশীল তা-ই তৃতীয় বিশ্ব) রাজনীতি ও অর্থনীতিতে লক্ষণীয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের প্রবণতা লক্ষ করে অনেক বিজ্ঞজন শক্তি-সাম্য থাকা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করতে শুরু করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির কারণে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অর্থব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টায় লিপ্ত। ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এ আগ্রাসনকে নয়া উপনিবেশবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির কারণে পৃথিবীর মানচিত্রে অনেক জাতি রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়, যা একটি ইতিবাচক দিক। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়, যে রাষ্ট্রগুলোতে পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ও আদর্শ প্রতিষ্ঠিত ছিল সেগুলোতে পুঁজিবাদের প্রভাব লক্ষ করা যায়। কমিউনিস্ট চিন্তাধারার পতন আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে খুবই তাৎপর্যময় ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সব সময়েই বিশ্বের তিনটি অঞ্চল (পশ্চিম ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়া) গুরুত্ব পেয়ে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী রূপই পরিলক্ষিত হয়, যা অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ। তার কর্তৃত্বসুলভ আচরণে আজ আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, লিবিয়া, ইরাক ও ইরান তটস্থ। তবে একটি পর্যায় পর্যন্ত হয়তো মার্কিন প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত থাকবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংযত আচরণ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির প্রভাবে ইতিবাচক হবে; আর অসংযত আচরণের পরিণাম কী হবে তা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তবে একক শক্তি হিসেবে মার্কিন প্রাধান্য হয়তো বেশি দিন থাকবে না। কারণ বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান আত্মপ্রকাশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আবার আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে কি না তা সময় বলে দেবে। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকায় আমরা প্রত্যাশা করি, বর্তমান রাশিয়া আবার বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠুক।

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...