শিল্পবিপ্লবের ফলে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সর্বক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। শিল্পবিপ্লব ব্রিটেনের সর্বক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন নিয়ে আসে। এ বিষয়ে হারভার্ড স্কলার আর. টি. গিল মত প্রকাশ করেন যে, "অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে ইংল্যান্ডেই আধুনিক অর্থনীতির জন্ম হয়।"
শিল্পবিপ্লবের ফলাফলকে বিস্তৃত অর্থে। থ তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
(১) অর্থনৈতিক অবস্থা;
(২) সামাজিক অবস্থা;
(৩) রাজনৈতিক অবস্থা।
১। অর্থনৈতিক অবস্থা
শিল্পবিপ্লবের ফলে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বিভিন্ন রকম অর্থনৈতিক ফলাফল লক্ষ করা যায়। উল্লেখযোগ্য
ফলাফল নিম্নরূপ:
শিল্পবিপ্লবকালে যন্ত্রপাতির আবিষ্কার হওয়ায় ব্রিটেনের অর্থনীতিতে উৎপাদনক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মাত্র চল্লিশ বছরের ব্যবধানে ব্রিটেনের কয়লা উৎপাদন দশ গুণ বৃদ্ধি পায়। ১৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে পিগ লৌহের উৎপাদন ছিল ৬৮,০০০' টন। কিন্তু ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে এটি বৃদ্ধি পেয়ে ১৩,৪৭,০০০ টনে উন্নীত হয়। ১৭৮১ থেকে ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কাঁচা তুলা আমদানি সাড়ে এগার গুণ বৃদ্ধি পায়, যার মাধ্যমে ব্রিটেনের বস্ত্রশিল্পের উৎপাদনক্ষমতার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। অধ্যাপক ডব্লিউ হফম্যান-এর মতে, "ব্রিটেনের শিল্প উৎপাদন ১৯০ বছরে ৭০ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল।"
শিল্পবিপ্লবের ফলে শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য কৃষির উন্নয়ন ব্যাহত হয়। বিপ্লবকালে শিল্পখাত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত লোকসংখ্যার সংকুলান দিতে আরম্ভ করে। ফলে অধিকতর কৃষি-জনসংখ্যা কাজের জন্য শহরে বা শিল্পাঞ্চলে ভিড় করতে থাকে। ফলে কৃষিতে শ্রমিক সমস্যা দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ব্রিটেনে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে যেখানে কৃষিতে ৭৭% লোক নিয়োজিত ছিল, সেখানে ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে তা ২৮%-এ. নেমে আসে। ফলে মোট জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে।
নতুন নতুন আবিষ্কার শিল্পবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করতে সমর্থ হয়। নতুন আবিষ্কারের ফলে যাতায়াত ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হয়। আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শিল্পবিপ্লব ধনাত্মক ভূমিকা পালন করে। হস্তচালিত যন্ত্রপাতির পরিবর্তে শক্তিচালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হওয়ায় শিল্পের কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হয়। মানুষের দৈহিক শক্তির পরিবর্তে যান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার শুরু হয়।
শিল্পবিপ্লবের ফলে বৈদেশিক বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়ের প্রকৃতির আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। তুলা ও পশমের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের কাঁচামালের জন্য এবং উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য ব্রিটেন বৈদেশিক বাজারের উপর ব্যাপকহারে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ব্রিটেনে খাদ্যাভাব দেখা দিলে খাদ্যের জন্য ব্রিটেনকে প্রচুর কয়লা ও শিল্পজাত দ্রব্য রপ্তানি করতে হয়। এভাবে আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ বিপুল হারে বৃদ্ধি পায়।
শিল্পবিপ্লবের ফলে পুঁজি ও শ্রমের মধ্যে নতুন সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। পুঁজিপতি এবং শ্রমিকের মধ্যে নতুন ধরনের বা পরিবর্তিত সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। পূর্বে পুঁজিপতির পুঁজির পরিমাণ ছিল স্বল্প; শ্রমিকরাও ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে কাজ করত বলে কখনো মালিকের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারত না। শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংগঠিত হওয়ার পর পুঁজিপতি ও শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক পরোক্ষ ও গৌণ হয়ে পড়ে। শ্রমিকদের মধ্যে শ্রেণি চেতনার উন্মেষ ঘটে। বহুসংখ্যক শ্রমিক একত্রে সংগঠিত হয়ে তাদের অভাব-অভিযোগ সম্পর্কে আলোচনা করে শ্রমিক সংঘ প্রতিষ্ঠা করে এবং একে মালিকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে নেয়। কাজের ন্যায্য মজুরি, শ্রম সময় হ্রাস, চিকিৎসা, পেনশন, ভাতা ইত্যাদি ছিল আন্দোলনের মুখ্য উপাদান। ইংল্যান্ডের জীবনযাত্রার মান বেড়ে যায় এবং সমাজজীবনে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্যের ব্যবধান বাড়তে থাকে। বিভিন্ন শ্রেণির সংঘাত ও দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র তৈরি করে, যা ইংল্যান্ডের আর্থসামাজিক অবস্থায় গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসে।
২। সামাজিক অবস্থা
শিল্পবিপ্লবের ফলে ব্রিটেনের সমাজব্যবস্থায় অনেক ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। পূর্বে সমাজ সামন্ত ও প্রজা শ্রেণিতে বিভক্ত থাকলেও শিল্পবিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডে বুর্জোয়া ও শ্রমিক শ্রেণিতে বিভক্ত হয়। বুর্জোয়াদের মধ্যে ধনী, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তে স্তর বিন্যাসিত হয়। নিচে প্রধান কয়েকটি পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হলো:
অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে শিল্পবিপ্লব শুরু হলে বেকার নারী-পুরুষ শহরের দিকে ধাবিত হতে থাকে। সারা শহর লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। অথচ এসব লোকের সকলের কর্মসংস্থান মেলেনি। জনসংখ্যার আধিক্যহেতু বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি শহরে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা ছাড়া এবং না খেয়ে অনেকে অকালে মৃত্যুবরণ করে। জনসংখ্যার স্থানান্তর তাই প্রথম দিকে শহরাঞ্চলে অস্থিরতার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
শিল্পবিপ্লবের যুগে জনসংখ্যা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ সময়ের মধ্যে ব্রিটেনের লোকসংখ্যা এক মিলিয়ন বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী ৫০ বছরে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন এবং ১৮০০ থেকে ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ১০ মিলিয়নের বেশি লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। মায়ার ও বল্ডউইন-এর মতে, "শিল্পবিপ্লবের সাথে কৃষি ও যাতায়াতব্যবস্থাও উন্নত হয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি পায় বলে এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে লাভজনকভাবে কাজে খাটানো সম্ভবপর হয়েছিল।"
অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে শহরে কর্মহীন লোকের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা কলকারখানায় কাজ নিতে শুরু করে। কারখানায় এ শিশু শ্রমিকরা সারা দিন কাজ করার ফলে তাদের মধ্যে অপুষ্টি এবং বাসগৃহে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে হৃদ্যতার অভার দেখা দেয়। গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন লোকেরা যখন শহরের বস্তি এলাকায় বসবাস আরম্ভ করে, তখন যুবক-যুবতী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের মধ্যে দৈহিক ও অসামাজিক কার্যকলাপ, দুর্নীতি ও কলুষতা অনুপ্রবেশ করে। এভাবে শিল্পবিপ্লব শহরাঞ্চলে বিশেষত শিল্পাঞ্চলে সামাজিক মূল্যবোধ হ্রাস করার ব্যাপারে পরোক্ষভাবে হলেও দায়ী। শিল্পবিপ্লবের ফলে বিবাহিত মেয়েরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। তাদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল; প্রথমত, বাসগৃহে বসে জীবিকার জন্য স্বামীর অপেক্ষা করা, অর্থাৎ স্বামীর মজুরির উপর নির্ভরশীলতা। দ্বিতীয়ত, বাড়ি ত্যাগ করে কলকারখানায় পেটের দায়ে কাজ করে খাওয়া। যেহেতু স্বামীর মজুরি পরিবার প্রতিপালনের জন্য যথেষ্ট ছিল না, সেহেতু অনেক বিবাহিত মেয়ে শিল্পে কাজ করতে বাধ্য হতো। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় ছিল, একদিকে ঘরের বাচ্চা ছেলেমেয়েদের দেখাশোনার সমস্যা এবং অন্যদিকে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরলে আহারের ব্যবস্থা করা। এ অবস্থা পারিবারিক অশান্তির সৃষ্টি করে। ইংল্যান্ডের সামাজিক স্তরবিন্যাসে শিল্পবিপ্লব নতুন মেরুকরণ ঘটায়। পূর্বে কৃষিভিত্তিক সামন্ত সমাজ লর্ড ও প্রজা এ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত থাকলেও বিপ্লবের ফলে সমাজ বুর্জোয়া ও শ্রমিক শ্রেণিতে বিভক্ত হয়।
বুর্জোয়াদের মধ্যে আবার ধনী, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের মানুষ ছিল।
শিল্পবিপ্লব অনেক অকল্যাণ সৃষ্টি করলেও এর দরুন কিছু কিছু কল্যাণেরও জন্ম হয়। কলকারখানায় চাকরির ফলে শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়। কর্মদক্ষতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে গৃহ-শিল্পের তুলনায় শ্রমিকের উপার্জন বৃদ্ধি পায়। ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত হয়। তবে একথা ঠিক যে, পূর্বের তুলনায় শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলেও পুঁজিপতিদের জীবনযাত্রার মানের মতো এটি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়নি।
শ্রমিকদের যাতে অকল্যাণ না হতে পারে তার প্রতি লক্ষ রেখে ব্রিটিশ সরকার আইন পাস করে। ফলে পরবর্তীকালে শিশুশ্রমের অমঙ্গল থেকে দেশ রক্ষা পায়। আবার শ্রমিকদের কল্যাণের দিকে লক্ষ রেখে 'সরকার তাদের প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্বারোপ করে। এভাবে দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিক্সে দরুন ব্রিটেনে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। তদুপরি সরকার আইন পাসের মাধ্যমে শ্রমিকদের বাসস্থানের পরিবেশ সুন্দর এবং শিল্প-কারখানা থেকে আলাদা করে দেয়। এভাবে শিল্পবিপ্লবের শেষ দিকে শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার কিছুটা হলেও উন্নয়ন ঘটে।.
৩। রাজনৈতিক অবস্থা
শিল্পবিপ্লবের ফলে ব্রিটেনে কিছু রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছিল। পুঁজিপতিদের নেতৃত্ব দখলের সাথে সাথে তাদের অনুকূলে রাজনৈতিক ভারসাম্য অবস্থা চলে আসে। উদ্দেশ্য ছিল, পার্লামেন্টে শ্রমিকের সম্বন্ধে কোনো কথা থাকতে পারবে না। অবশ্য এতে শ্রমিকদের উদ্যোগ পুরোপুরি ব্যাহত হয়নি। তারা একত্রে বসবাস ও কাজ করত বলে নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে পারত। পর্যায়ক্রমে শ্রমিক শ্রেণি সচেতন হয়ে ওঠে এবং ব্রিটিশ ট্রেড ইউনিয়নের সূত্রপাত হয়। শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে সমাজতন্ত্রের ভাবধারা জনপ্রিয় হতে শুরু করে। তারা চার্টিস্ট আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিল্পবিপ্লব ভূস্বামীদের হাত থেকে পুঁজিপতিদের নিকট রাজনৈতিক ক্ষমতা স্থানান্তরে সাহায্য করে। অর্থনৈতিক ক্ষমতা পুঁজিপতিদের নিকট থাকার ফলেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থা ভেঙে ব্রিটেনে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার উন্মেষ ঘটে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার দ্যোতক হিসেবে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বিকাশ ব্রিটেনে আরম্ভ হয়। এভাবে শিল্পবিপ্লব ব্রিটেনের রাজনৈতিক কাঠামোতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনয়ন করে।
ব্রিটেনে সর্বপ্রথম শিল্পবিপ্লব সংঘটিত হওয়ার কারণ
বিভিন্ন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে ব্রিটেনে সর্বপ্রথম দ্রুত শিল্পোন্নয়ন সম্ভব হয়েছিল। শিল্পোন্নয়নের জন্য যেসব শর্ত অর্থাৎ আনুষঙ্গিক বা পার্শ্ব পরিস্থিতির দরকার, তা ব্রিটেনের ছিল।
ব্রিটেন ছাড়া, ঐ সময়ে ইউরোপে নেতৃস্থানীয় দেশ ফ্রান্স, জার্মানি, হল্যান্ড ও স্পেন উন্নত ছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে না হলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ফ্রান্স ব্রিটেনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। কিন্তু ফ্রান্স অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। কারণ ফরাসি বিপ্লবের পর দেশের শিল্প ও বাণিজ্য শোচনীয় ক্ষয়ক্ষতি ও মারাত্মক অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়। ফ্রান্সের ব্যাংক ব্যবস্থা অনুন্নত ছিল। এটি দেশে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত সঞ্চয়কে একত্রীভূত করে বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছিল। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে তখনকার সামন্তবাদ, ভূমিদাসপ্রথা এবং ব্যাংক ব্যবস্থা বাধা হিসেবে কাজ করে।
জার্মানির অবস্থাও ভালো ছিল না। জার্মানি ছিল তার চতুর্দিকে অবস্থিত কতগুলো দেশের যুদ্ধক্ষেত্র। ঐসব দেশ তাদের অস্ত্র পরীক্ষার জন্য জার্মানিকে মাঠ হিসেবে ব্যবহার করত। এতে জার্মানির প্রচুর সময় ও অর্থ অপচয় হতো। তা ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মূলধনের অপ্রতুলতাও জার্মানিতে ছিল।
অন্যদের তুলনায় হল্যান্ডের অবস্থা ভালো ছিল। দেশে পর্যাপ্ত মূলধন ছিল। ব্যাংক ব্যবস্থা ছিল অগ্রগামী। হল্যান্ডের বাণিজ্য জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার উপযুক্ত ছিল। কিন্তু হল্যান্ড সর্বদাই উপনিবেশ দখলের দিকে নজর দেওয়ায় বৈদেশিক বাজার ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অগ্রগতি লাভ করতে পারেনি। স্পেনেও বিভিন্ন ধরনের সমসাময়িক সমস্যা ছিল। সামরিক তোড়জোড় ছাড়াও দেশটি নানাবিধ ধর্মীয় কুসংস্কার ও কোন্দলের কেন্দ্র ছিল। দেশে প্রচলিত রোমান ক্যাথলিক ধর্ম উন্নয়নের পথে অন্তরায় ছিল। ফলে স্পেনের শিল্পোন্নয়নের সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছিল।
উপর্যুক্ত কারণে ব্রিটেনের, সমসাময়িক দেশগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নে অগ্রসর হতে পারেনি। কিন্তু ব্রিটেনে স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, হল্যান্ড ইত্যাদি দেশের তুলনায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনুকূল পরিবেশ বিরাজমান থাকায় শিল্পবিপ্লব প্রথম ইংল্যান্ডে দ্রুত হয়।
শিল্পবিপ্লবের অনুকূল পরিস্থিতিসমূহ
যেসব কারণ ও শক্তি ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবকে সহায়তা ও অগ্রমুখী করেছিল তা নিচে বর্ণনা করা হলো:
১। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্রিটেনের
অনুকূলে ছিল। শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সরকারের পক্ষে করা সম্ভব ছিল। দেশে জীবন ও সম্পত্তির পূর্ণ আইনগত নিরাপত্তা ছিল। আর উপনিবেশগুলো ব্রিটেনের জন্য প্রচুর কাঁচামাল ও শিল্পের প্রাথমিক দ্রব্য জোগানে ধনাত্মক ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হয়েছিল।
ব্রিটেনের ভৌগোলিক অবস্থান শিল্পের জন্য খুবই সহায়ক ছিল। এর উপকূলবর্তী পোতাশ্রয় তৈরির চমৎকার স্থান এবং নদীগুলো অভ্যন্তরীণ পরিবহনে যথেষ্ট সহায়ক ছিল। আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তরাংশে ইউরোপের উপকূলে ব্রিটেন অবস্থিত বলে এটি উত্তর ইউরোপের সাথে সহজেই যোগাযোগ স্থাপন করতে পারত এবং যেকোনো বাজারে পণ্য বিক্রি করার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী অনুকূল পরিবেশ। কঠোর পরিশ্রমের ক্ষেত্রে নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু অনুকূল ছিল। বৈদেশিক আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য শক্তিশালী নৌবহর ও বৈদেশিক বাণিজ্যের উপযোগী সুসংগঠিত উন্নত বাণিজ্য পরিবেশ ব্রিটেনের ছিল।
ব্রিটেনের জলবায়ু ছিল নাতিশীতোষ্ণ। ফলে ইংরেজরা কঠোর পরিশ্রম করতে পারত। শ্রমিকরা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সম্ভাব্য আক্রমণের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য নৌবহর ও যুদ্ধজাহাজে সাহসিকতার সাথে কাজ করতে পারত। তাছাড়া অনুকূল আবহাওয়া ও জলবায়ুর জন্য শ্রমিকরা শিল্পে প্রচুর সময় কাজ করতে পারত।
২। সামাজিক পরিবেশ। ব্রিটেনের সামাজিক জীবনযাত্রা ছিল সকল প্রকার কুসংস্কারমুক্ত। ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকায় সাধারণ মানুষ নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী পেশা গ্রহণ করতে পারত। এতে উৎপাদনের উপকরণসমূহের সুষ্ঠু বণ্টনের পথ সুগম হয়। অন্য দেশের মতো ব্রিটেনে শ্রেণিবৈষম্য প্রকট ছিল না। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির হৃদ্যতা বিরাজমান থাকায় শিল্পোন্নয়নে কোনো সামাজিক বাধার সৃষ্টি হতো না।
ষোড়শ শতাব্দীর বেষ্টনী আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠলে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে কৃষিখাতে বেকার লোকের সংখ্যা বাড়ায় শ্রমিকরা শহরের দিকে কাজের জন্য ধাবিত হতে থাকে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারকে বিকল্প হিসেবে শিল্প উন্নয়নের দিকে হাত দিতে হয়। এই সমস্যাই-শিল্পোন্নয়নের ইতিবাচক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
৩। অনুকূল অর্থনৈতিক, পরিবেশ উপনিবেশগুলো থেকে পর্যাপ্ত মূলধন উপার্জন করার ফলে ব্রিটেনে মূলধনী ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এর পর থেকে ব্রিটেনের ব্যাংক ব্যবস্থা দ্রুতগতিতে শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে সহায়তা করে। উপনিবেশগুলো কাঁচামাল জোগান দিত এবং দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য বাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
ব্রিটেন উপনিবেশগুলো থেকে বাণিজ্য দ্বারা প্রচুর মুনাফা অর্জন করত। এই মুনাফা সঞ্চিত করার জন্য উন্নত ব্যাংক ব্যবস্থা ছিল। ব্যাংকের প্রচুর মূলধন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্পে বিনিয়োগের প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করত।
ব্রিটিশ সরকার প্রথমে শিল্প সংরক্ষণনীতি গ্রহণ করেছিল। ফলে তার পক্ষে দেশের সকল প্রকার দ্রব্যের চাহিদা মিটিয়ে উপনিবেশগুলোতে বৃহৎ ও বিস্তৃত বাজার ব্যবস্থার সৃষ্টি করা সম্ভব হয়; যা পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিণত হয়।
উন্নত ব্যাংক ব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সাথে উপার্জিত বৈদেশিক মুনাফা সঞ্চিত হতে থাকে। উপার্জিত মুনাফা একত্রিত হওয়ায় শিল্পোন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত মূলধন পাওয়া সহজতর হয়।
শিল্পবিপ্লব সৃষ্টিতে কৃষিবিপ্লবের অবদান সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি উন্নয়ন ব্যতীত শিল্পোন্নয়ন অসম্ভব। কারণ শিল্প সম্প্রসারিত হওয়ায় ক্রমবর্ধমান শহর ও শিল্প এলাকায় খাদ্যের চাহিদা এবং কারখানায় কৃষি কাঁচামালের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। কৃষির উন্নয়ন এ চাহিদা পূরণ করে থাকে। ব্রিটেনে কৃষিবিপ্লবের সাফল্যের হাত ধরেই শিল্পবিপ্লব সংঘটিত হয়।
৪। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও উন্নত পরিবহনব্যবস্থা: তখনকার সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার অগ্রগতিতে ব্রিটেন নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে। আধুনিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের ফলে ব্রিটেনের উৎপাদনক্ষেত্রে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত 'রয়াল একাডেমি' একটি অনন্য পথিকৃৎ। স্যার আইজাক নিউটন-এর অবদান থেকে নতুন নতুন আবিষ্কার সাধিত হতে থাকে। এসব আবিষ্কার ব্রিটেনে কারিগরি ও প্রযুক্তিবিদ্যার জন্ম দেয়। প্রযুক্তিবিদ্যা শিল্পবিপ্লবের পথকে কণ্টকমুক্ত করে আরও এগিয়ে দেয়।
ব্রিটেনের সমুদ্র উপকূল বন্দর তৈরির জন্য উপযোগী ছিল। ফলে অতি সহজে বাণিজ্যবহরে বিপুল পরিমাণ শিল্পদ্রব্য ওঠানামার অনুকূল পরিবেশ ছিল। দেশের অভ্যন্তরেও জিনিসপত্র ওঠা ও নামার জন্য নদীর উপকূল পর্যন্ত পরিবহনের সুবিধা ছিল। ব্রিটেনে খাল খনন, রেলপথ ও সড়ক নির্মাণ এবং বাষ্পচালিত জাহাজের উন্নয়নের ফলে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয়, যা শিল্পবিপ্লবের পথ সুগম করে।
ব্রিটেনের সমাজব্যবস্থা ছিল কুসংস্কারমুক্ত। ফলে কোনো উদ্যোক্তা শিল্প উন্নয়নের চিন্তা করলে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে একে অন্যকে বিভিন্ন দিক দিয়ে সহায়তা করত। তাদের মনোভাব ছিল পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ। এ সহায়তামূলক মনোভাবই ব্রিটেনে নতুন নতুন শিল্প স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই
Read more