hsc

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ (অধ্যায়-৬)

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.5k

Declaration of Independence of Bangladesh and War of Liberation

ব্রিটিশ শাসন-শোষণের ১৯০ বছর এবং পাকিস্তানের শাসন-শোষণ ও বঞ্চনার ২৪ বছরের চূড়ান্ত জবাব ছিল ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭০-এর নির্বাচনে জয়লাভ করলেও বাঙালিদের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। পাকিস্তান শাসকচক্র আলোচনা ভেঙে দিয়ে গণহত্যা শুরু করায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো চিন্তা করেননি। ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মূলত বঙ্গবন্ধুর এ স্বাধীনতা ঘোষণার কারণেই ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে প্রতি বছর যথাযথ মর্যাদায় উদ্যাপিত হয়। দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহিদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় অর্জন হয়। আজ আমরা বিশ্বের বুকে স্বাধীন বাঙালি জাতির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ - মো. এনায়েত হোসেন (কাজল)স্যার এর লেখা বই

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়
কলকাতা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়

Background of Declaration of Independence and Declaration of Independent of Bangladesh

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে ইয়াহিয়া খান টালবাহানা শুরু করে। প্রথমে তিনি ৩ মার্চ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের তারিখ নির্ধারণ করেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে পাকিস্তানি শাসকচক্র সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, যে করেই হোক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের মসনদে বসতে দেওয়া হবে না। তারা ষড়যন্ত্র শুরু করে। এই ষড়যন্ত্রের হোতা ছিলেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো। আরও ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা খান আবদুল কাইয়ুম, পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পপতিগণ, আমলা এবং সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ। ষড়যন্ত্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১ মার্চ জাতিকে স্তম্ভিত করে ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করলেন, আগামী ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত থাকবে। বাঙালি জাতির জন্য এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। স্তম্ভিত হয়ে গেল বাঙালি জাতি। কোনো কারণ ছাড়াই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর সাথে পরামর্শ না করেই জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত ঘোষণায় বাঙালি জাতি ক্ষোভে ফেটে পড়ে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণাই বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। মূলত এখান থেকে বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত হয়। ৯ মার্চের জনসভায় মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী দৃপ্তকণ্ঠে পাকিস্তানি শাসকচক্রকে বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করে নেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। অন্যথায় তিনি তাদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার শাসনভার গ্রহণের কথা ঘোষণা করলে ইয়াহিয়া খান ঐ দিন বিকালে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনার জন্য ঢাকা আসেন। ২২ মার্চ আসেন জুলফিকার আলী ভুট্টো।

ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টোর মধ্যে চলে প্রহসনের দীর্ঘ আলোচনা। ইয়াহিয়া গোপন আলোচনার নামে কালক্ষেপণ, আলোচনার অন্তরালে ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে টিক্কা খান (পূর্ব বাংলার নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর) পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভারী অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে জমা করতে থাকে। সাংবাদিকরা আলোচনার অগ্রগতি জানতে চাইলে ইয়াহিয়া খান সুকৌশলে বলেন, আলোচনা সন্তোষজনক। পাকিস্তান সৈন্যবাহিনীর উচ্চপদস্থ জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক "উইটনেস টু সারেন্ডার" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ২০ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পূর্ববাংলার গভর্নর টিক্কা খান, লেফটেনেন্ট জেনারেল খাদিম হোসেন ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী "অপারেশন সার্চলাইট" বা বাঙালির ওপর নৃশংস হত্যাকাণ্ড পরিচালনার নীল নকশা প্রস্তুত করেন।

অপারেশন সার্চলাইটের আওতায় নিম্নোক্ত পরিকল্পনা নেওয়া হয়:

১ একযোগে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন শুরু হবে।
২. সর্বাধিক সংখ্যক রাজনীতিক, ছাত্রনেতা, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার চরমপন্থিদের গ্রেফতার করতে হবে। বিশেষ সার্ভিস গ্রুপের এক প্লাটুন কমান্ডো সৈনিক শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি আক্রমণ ও তাকে গ্রেফতার করবে।
৩. ঢাকার অপারেশন শত ভাগ সফল করতে হবে। এজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দখল করতে হবে।
৪. সেনানিবাসের নিরাপত্তা অবশ্য নিশ্চিত করতে হবে।
৫. যাবতীয় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে।
৬. ইপিআর সৈনিকদের নিরস্ত্র করে তদস্থলে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকদের পাহারায় নিয়োগ করতে হবে।
৭. প্রথম পর্যায়ে এ অপারেশনের এলাকা হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেট চিহ্নিত করা হবে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেটে প্রয়োজনে বিমানযোগে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

২০ মার্চ সরকার পূর্ব পাকিস্তানের সৈন্যদের অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। বোয়িং ৭০৭ বিমানটি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও রসদ নিয়ে ঢাকা আসে। পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানের পর্যাপ্ত সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র বোঝাই করা জাহাজ "সোয়াত" চট্টগ্রাম বন্দরে অপেক্ষা করতে থাকে। সব প্রস্তুতির শেষে ২৫ মার্চ রাতকে গণহত্যার জন্য বেছে নেওয়া হয় এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীকে ঢাকা শহরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ- মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই

Content added By

Declaration of Independence of Bangabandhu and Arrest

পৃথিবীতে দু'টি দেশে স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৪ সালে এবং অন্যটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ।

২৫ মার্চ দিবাগত রাতে হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা শুরু হলে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার ঘোষণাটি শেখ মুজিবুর রহমান ইংরেজিতে দিয়েছিলেন যাতে বিশ্ববাসী বুঝতে পারেন।

Declaration of Independence of Bangabandhu

This may be my last message, from today Bangladesh is Independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.

Joy Bangla

Sk. Mujibur Rahman

26th March, 1971

[সূত্র: হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ দলিলপত্র তৃতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়।
এর বাংলা অনুবাদ হলো- "ইহাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছে, যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ কর। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।"

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার এ ঘোষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট দলিলেও উল্লেখ আছে।
জয় বাংলা

শেখ মুজিবুর রহমান

২৬শে মার্চ, ১৯৭১

মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন তার ম্যাসাকার গ্রন্থে (পৃ.-২৪) বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে লিখেছেন, "The
Pakistani Army has attacked police lines at Rajarbagh and East Pakistan Head quarters at Pilkhana at midnight. Gather strength to resist and prepare for a war of independence. [Massacre by Robert Payne (page-24) The Macmillan company newyork] (পাকিস্তান সামরিক বাহিনী মাঝ রাতে রাজারবাগের পুলিশ লাইন এবং পিলখানায় পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস-এর হেড কোয়ার্টারে আক্রমণ করেছে। প্রতিরোধ করার জন্য এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য শক্তি সঞ্চয় করুন।) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এ ঘোষণাটি তখন ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে ২৬ মার্চ (শুক্রবার) প্রথম প্রহরে হয়েছিল। এজন্যই ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা বার্তাটি সে রাতেই ওয়‍্যারলেস যোগে চট্টগ্রাম জেলার আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় পরিষদ সদস্য এম. এ. হান্নানের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এম. এ. হান্নান এবং চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা অনুবাদ করেন। অতঃপর এম. এ. হান্নান ২৬ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র থেকে একবার এবং সন্ধ্যা ৭টায় কালুরঘাট 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার দ্বিতীয়বার ঘোষণাটি প্রচার করেন।

এম. এ. হান্নান কর্তৃক প্রচারিত ঘোষণাটির অনুবাদ হলো-

আমি (এম. এ. হান্নান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ও তাঁর নামে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আপনারা যারা এ গোপন রেডিও হতে আমার এ ঘোষণা-শুনছেন তারা অন্যদের নিকট এ বাণী প্রচার করবেন। আর যার নিকট যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করুন এবং দেশকে মুক্ত করুন।
পরদিন অর্থাৎ ২৭ মার্চ ঐ বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সন্ধ্যাকালীন অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি প্রচার করেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। ইংরেজিতে প্রদত্ত তার প্রচারটি ছিল- The Government of the sovereign state of Bangladesh. On behalf of our Great Leader the Supreme Commander of Bangladesh Sheikh Mujibur Rahman. We hereby proclaim the independence of Bangladesh and that the Government headed by Sheikh Mujibur Rahman has all ready been formed. It is further proclaimed that Sheikh Mujibur Rahman is the sole leader of the elected representatives of seventy five million people of Bangladesh, and the Government headed by him is the only legitimate Government of the people of the Independent sovereign state of Bangladesh, which is legally and constitutionally formed, and is worthy of being recognized by all the Government of the world: I therefore, appeal on behalf of our Great leader Sheikh Mujibur Rahman to the Governments of all the democratic countries of the world, specially the big powers and the neighbouring countries to recognizes the legal Government of Bangladesh and take effective steps to stop immediately the awful genocide that has been carried on by the army of occupation from pakistan.

The guiding principle of the new state will be first neutrality second peace and third friendship to all and enmity to none. May Allah help us. Joy Bangla. ১৯৭১ সালে প্রচারিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁর ঘোষণাকে তাঁর নির্দেশ হিসেবে গণ্য করে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ- মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই

Content added By

Genocide and Torsor- 1971

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বড় ধরনের একটি জনযুদ্ধ। নয় মাসের যুদ্ধ হলেও এর পরিধি, এর নৃশংসতা ও ঘটনা ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পৃথিবীতে এরূপ নৃশংস ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাসে বিশ্ববিবেককে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে সেটি হচ্ছে গণহত্যা ও নির্যাতন। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালে বাঙালির ওপর গণহত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সে গণহত্যাকে পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র হলোকাষ্টের সাথে তুলনা করা যায়। একমাত্র হলোকাষ্টকে বাদ দিলে পৃথিবীর ইতিহাসে এরূপ গণহত্যা ও নির্যাতনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। এমনকি ১২৫৮ সালে হালাকুখান বাগদাদে যে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ছিলেন তাকেও স্নান করে দেয়।

অপারেশন সার্চলাইট: অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একযোগে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বসে 'অপারেশন সার্চলাইট' (গণহত্যার নীল নকশা) প্রণয়ন করা হয়। এ নীল নকশা প্রণয়নে ছিলেন- মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও খাদেম হোসেন। বস্তুত, এটা ছিল বাঙালি নিধনের জন্য জঘন্যতম কাপুরুষোচিত এক অভিযান।
অপারেশন সার্চলাইটের আওতায় নিম্নোক্ত পরিকল্পনা নেওয়া হয়:

১. একযোগে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন শুরু হবে।
২. সর্বাধিক রাজনীতিক, ছাত্রনেতা, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার চরমপন্থিদের গ্রেফতার করতে হবে। বিশেষ সার্ভিস গ্রুপের এক প্লাটুন কমান্ডো সৈনিক শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি আক্রমণ ও তাকে গ্রেফতার করবে।
৩. ঢাকার অপারেশন শতভাগ সফল করতে হবে। এজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দখল করতে হবে।
৪. সেনানিবাসের নিরাপত্তা অবশ্য নিশ্চিত করতে হবে।
৫. যাবতীয় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। টেলিফোন, একচেঞ্জ, রেডিও, টিভি, টেলিপ্রিন্টার সার্ভিস, বৈদেশিক কনস্যুলেটসমূহের ট্রান্সমিটার বন্ধ করে দিতে হবে।
৬. ইপিআর সৈনিকদের নিরস্ত্র করে তদস্থলে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকদের পাহারায় নিয়োগ করতে হবে।
৭. প্রথম পর্যায়ে এ অপারেশনের এলাকা হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেট চিহ্নিত করা হবে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেটে প্রয়োজনে বিমানযোগে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

অপারেশন সার্চলাইটের নীল নকশা অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং এক রাতেই নারী, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে এক লক্ষ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আলোচনা শেষ না করে ২৫ মার্চ সন্ধ্যে সাতটায় বিমানযোগে হঠাৎ ঢাকা ত্যাগ করেন। ঢাকা ত্যাগ করার পূর্বে বাঙালিদের আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য সৈন্যদেরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে যান। সৈন্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, 'আমি এদেশের মানুষ চাই না, মাটি চাই।' ইয়াহিয়া খানের নির্দেশ পেয়ে গভর্নর টিক্কা খান তার অধীনস্থ সৈন্যদের নিয়ে ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা শহরের নিরীহ, নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর ট্যাঙ্ক, মেশিন গান, মর্টার ও অন্যান্য ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় মানব ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। হানাদারবাহিনী প্রথমেই হামলা চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও ইকবাল হলে (বর্তমান জহিরুল হক হল)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম আক্রমণের কারণ হলো, পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকাগার বলা হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। পাকিস্তানি সৈন্যরা রকেট হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় হল দুটিতে। পরে রুমে রুমে তল্লাশি চালিয়ে ছাত্রদের গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। শত শত ছাত্রদের লাশ সেদিন এ দুটি হলের সিঁড়িতে, বারান্দায় স্তূপ হয়েছিল। সৈন্যদের আদেশ দেওয়া হয়েছিল দুটি ছাত্রাবাসের একটি প্রাণীও যেন বেঁচে না থাকে এবং ঘটলোও তাই। দারোয়ান, সুইপার এবং আবাসিক শিক্ষকদেরও একইভাবে হত্যা করা হয়। মোট ১১ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয়। তাদের অধিকাংশ ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের। রোকেয়া হলে ছাত্রীদের নির্মম পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। পিলখানায় অবস্থিত ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর ব্যারাকের (বাঙালিদের নিয়ে তৈরি সীমান্ত রক্ষী-বাহিনী- বর্তমান বিজিবি) সকল প্রাণীকেও হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ফলে পিলখানা জ্বলে উঠল। চলল গণহত্যা। যারা আত্মত্মসমর্পণ করল তাদেরকেও মেরে ফেলা হলো। একইভাবে ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা চলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে, পুরান ঢাকায়, তাঁতিবাজার, শাখারি পট্টি, কচুক্ষেত, মিরপুর, রায়ের বাজার, ধানমন্ডিসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত উক্ত সামরিক অভিযানের নাম 'Operation search light' অপারেশন সার্চলাইটের হত্যাযজ্ঞ কেবল ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না; কুমিল্লা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বগুড়া, সৈয়দপুর, সিলেটসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন শহরে ও জনপদে তাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড চলে। বাঙালির ইতিহাসে এ রাত 'কালরাত' নামে পরিচিত। এ রাতে প্রায় এক লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। হত্যাকাণ্ড চলছে এমন এক সময়ে টিক্কা খানকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কেন এতো মানুষকে হত্যা করছেন? জবাব দিয়েছিলেন, আমি মানুষ নিয়ে ভাবছি না, ভাবছি দেশকে নিয়ে (উৎস: ম্যাসাকার- রবার্ট পেইন পৃ.-৭৮)। রাত দেড়টার দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিশেষ একটি কমান্ডো গ্রুপ ধানমন্ডি ৩২ নং বাড়ি থেকে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। পরের দিন সকাল থেকে চারদিক এক থম থমে পরিবেশ বিরাজ করে। যে মানুষগুলো ঢাকা শহরকে প্রাণ চঞ্চল করে রাখত, যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা উচ্ছ্বসতায় ভরে রাখত ক্যাম্পাস, সেই ছাত্ররা দলে দলে

চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে রইল। যারা বেঁচে ছিল তারা তো নির্বাক, তার ওপর সমগ্র মহানগরীতে কারফিউ জারি করা হয়। মাঝে মাঝে সেনাবাহিনীর গাড়ির শব্দ ভেসে আসছে। নেই পাখিদের কোনো কোলাহল। ঢাকার শহর যেন নিরব, নিস্তব্ধ এক মৃত্যুপুরী। অবরুদ্ধ ঢাকাবাসীর ভীতসন্ত্রস্ত মানুষের মনের মণি কোঠায় বারবার একটি প্রশ্ন উঁকি মারছে, তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু কোথায়? তিনি বেঁচে আছেন তো? নানা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় অতিবাহিত হয়। কেউ জানে না বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু কোথায়? সন্ধ্যায় বেতারের মাধ্যমে পূর্ববাংলার মানুষ জানতে পারে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। পৃথিবীতে অনেক হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস থাকলেও নিরহ নিরস্ত্র ঘুমান্ত মানুষকে গণহত্যার ইতিহাস পাওয়া যায় না। যা সংগঠিত করেছিল পাক হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ রাতে। সম্প্রতিকালে ২৫ মার্চে গণহত্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যা অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য।

গণহত্যার চেয়ে আরও জঘন্য হচ্ছে এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের খবর যাতে কেউ জানতে না পারে সেজন্য বাংলাদেশ থেকে বিদেশি সব সাংবাদিকদের বের করে দেওয়া হয়। সমস্ত প্রচার মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়। দেশব্যাপী চলে শুধু কারফিউর তাণ্ডবদাহ। এত কিছুর পরও সাইমন ড্রিং-এর মতো কয়েকজন অতি সাহসী সংবাদিক ঢাকা শহরের নারকীয় হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের চিত্র অতি গোপনে ওয়াশিংটন পোস্ট ও লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফের মাধ্যমে বিশ্বকে জানিয়ে দেন। সাইমন ড্রিং-এর পাঠানো তথ্যচিত্র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মূল্যবান উপাদান।

২৫ শে মার্চ ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ও বড় বড় শহরগুলোতে যে নির্বিচারে গণহত্যা-নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগ শুরু হয়েছিল তা ১৬ ই ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে। এই দীর্ঘ ৯ মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যায় ৩০ লাখেরও বেশি বাঙালি প্রাণ হারায়। যা পৃথিবীর ইতিহাসে হলোকাস্টের পরে সর্বোচ্চ গণহত্যা। গণহত্যার পাশাপাশি আড়াই লক্ষের বেশি মা-বোন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সবকিছু ফেলে শরণার্থী হয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নেয় এক কোটি বাঙালি এবং প্রায় ছয় কোটি বাঙালি নিজ দেশে দীর্ঘ ২৫৮ দিন অবরুদ্ধ জীবন অতিবাহিত করে। সর্বত্র আতঙ্কগ্রস্ত থেকেছে কখন কী ঘটে যায় তার জন্য। এক কথায় সাড়ে সাত কোটি বাঙালির কারো মনেই শান্তি ছিল না, ছিল না স্বস্তি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ- মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই

Content added By

Resistance of Bangali People

দেশে যখন গণহত্যা চলছে তখন ভারত সরকারের সহায়তায় সাবেক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, সাবেক ই.পি.আর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র, যুবক, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী প্রভৃতি সম্প্রদায় থেকে আগ্রহী লোকদের নিয়ে দেশকে পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয়। তাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহ প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে প্রকাশ্য ও গেরিলা পদ্ধতিতে পাকবাহিনীর উপর একের পর এক আঘাত হানতে থাকে।

২৫ মার্চের বর্বরতার প্রতিবাদে ২৬ মার্চ থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী গঠনের মাধ্যমে বাংলার সর্বত্র তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়; যা আধুনিক বাংলার ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ নামে পরিচিত। দেশের বিভিন্ন স্থানে সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কুল, কলেজ, গ্রামের খেলার মাঠ, ফুটবল গ্রাউন্ডে প্রভৃতি স্থানে সামরিক এবং আদা সামরিক বাহিনীর সদস্যগণ মুক্তিদ্ধোদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। স্কুল-কলেজের ছাত্র, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, শিক্ষক, কৃষক ও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিবাহিনী রাস্তায় গাছ কেটে হানাদার বাহিনীর চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সড়ক কেটে, ব্রিজ উড়িয়ে পাকবাহিনীর চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। প্রথম মুক্তিবাহিনীর বিদ্রোহের সূচনা হয় চট্টগ্রাম

থেকে। এতে অংশগ্রহণ করেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, আনসার, যুব সম্প্রদায় ও হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। এরই অনুকরণে দেশের সর্বত্র বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৯ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। চট্টগ্রাম বন্দরে অপেক্ষমান পাকিস্তানি অস্ত্র বোঝাই জাহাজ 'সোয়াতের' অস্ত্র যাতে খালাস হয়ে হানাদার বাহিনীর হাতে না পৌঁছাতে পারে সেজন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী। কিন্তু অস্ত্রশস্ত্রের অভাবে সে প্রতিরোধ ভেঙে যায়। অতঃপর রামগড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু তাও ভেঙে যায়। এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে ভারত থেকে যে সামান্য অস্ত্র সাহায্য পাওয়া গিয়েছিল তা দিয়েও প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এ সময় যুদ্ধের বাস্তব অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে মেজর রফিকুল ইসলাম বলেন, "আমাদের সৈন্যরা ভীষণ অসহায় অবস্থায় যুদ্ধ করছিল। আমাদের গোলাবারুদ সরবরাহ ছিল খুবই কম। কেউ আহত হলেও তার প্রাথমিক চিকিৎসা কিংবা তাকে অন্যত্র স্থানান্তরের তেমন কোনো ব্যবস্থা আমাদের ছিল না। আমরা যোগাযোগ এবং পরিবহনের অভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি বেশি।" হানাদার বাহিনী মে মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এসময় পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের কতিপয় লোকদের নিয়ে গঠন করে রাজাকার বাহিনী, শান্তি কমিটি, আল-বদর ও আল-শামস। পাকবাহিনী এবং তাদের দোষরদের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রায় এক কোটি বাঙালি প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। 'এত লোকের পুনর্বাসন করা ভারতের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সেই শরণার্থীরা কী ধরনের মানবেতর জীবনযাপন করেছে সেই লোমহর্ষক কাহিনী বিভিন্ন লেখক, সাংবাদিক তাদের লেখনীতে প্রকাশ করেছেন। এত বিপুল সংখ্যক মানুষ ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় বিশ্ববাসীর কাছে পাকিস্তানের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়; যার ফলে যে সকল দেশ পাকিস্তানকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা তা প্রত্যাহার করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ- মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই

Content added By

Bengali Leaders Take Shelter in India and Run the Liberation War

২৫ মার্চ কালরাতে পাকহানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট প্রভৃতি নারকীয় তাণ্ডব দেখে বাঙালি নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্যবৃন্দ তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান, মাওলানা ভাসানী, তোফায়েল আহমদ, শেখ ফজলুল হক মনি সহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেখানে তারা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তারা ভারতের প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন। এদিকে পাকহানাদার বাহিনী ও তার দোসর আল-বদর, রাজাকার এবং আল-শামস বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সবকিছু ছেড়ে, সবকিছু রেখে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে।

প্রতিদিন এভাবে শরণার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো অসহায় মানুষের ভীরে জনাকীর্ণ হয়ে পড়ে। বাড়তি লোকের চাপ সামলাতে ভারত সরকার হিমশিম খেয়ে যায়। এমতাবস্থায় বাঙালি নেতৃবৃন্দ শরণার্থীদের দেখভাল করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারা ভারত সরকারের সাহায্য প্রার্থনা করেন। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন, মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় উক্ত নেতৃবৃন্দের অবদান অপরিসীম। এছাড়া উক্ত নেতৃবৃন্দ ভারত থেকে একদিকে যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় সহায়ক ভূমিকা রেখেছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষে বহির্বিশ্বের কাছে জনসমর্থন আদায়ে ভূমিকা রেখেছেন। এসবের পেছনে ভারত সরকারের ত্যাগ ও সহমর্মিতা অতুলনীয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ- মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই

Content added By

Formation of Bangladesh Government and Oath Taking Ceremony of Mujibnagar Government

প্রবাসী বাংলাদেশের সরকার গঠন (Formation of Bangladesh Government)
১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল তাজউদ্দিন আহমদ, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম দিল্লি গিয়ে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং পরিস্থিতি জানিয়ে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু তখন বাংলাদেশে কোনো আনুষ্ঠানিক সরকার না থাকায় আইনগত অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তখন তাজউদ্দিন আহমেদ নিজেকে প্রধানমন্ত্রী এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। ইন্দিরা গান্ধী এই অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। তাজউদ্দীন সাত দিন দিল্লিতে অবস্থান করে কলকাতায় ফিরে আসেন। সেখানে অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ যারা বাংলাদেশ থেকে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি তাদের সাথে আলোচনা করে একটি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করেন। এ সময় বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ পূর্বের ধারণ করা রেকর্ডকৃত একটি বাণী শিলিগুড়ি বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করার ব্যবস্থা করেন। এই ট্রান্সমিটারের নাম দেওয়া হয় 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র'। তাজউদ্দিন আহমেদের রেকর্ডকৃত উক্ত বাণীটি ছিল, "২৫ মার্চ মাঝ রাতে ইয়াহিয়া খান তার রক্তলোলুপ সাজোয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর লেলিয়ে দিয়ে যে নরহত্যাযজ্ঞ শুরু করেন তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।"

মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠান (Oath Taking ceremony of Mujibnagar Government)
বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরের ভবের পাড়া গ্রামের আম্রকাননে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারাই স্বাধীন বাংলার প্রথম মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়, যা ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। ১১ এপ্রিল "স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র" থেকে তাজউদ্দিন আহমেদ এই নতুন মন্ত্রিসভার কথা ঘোষণা করেন এবং এই মন্ত্রিসভা ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করে। শপথ বাক্য পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলী। শপথ গ্রহণের ২৪ ঘণ্টা পর পাকিস্তান বাহিনী বোমাবর্ষণ করে মেহেরপুর দখল করে নেয়। ফলে মুজিবনগর সরকারের সদর দপ্তর কলকাতার ৮ নং থিয়েটার হলে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৭১ সালের ২২শে ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার মুজিবনগর থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়।
মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা হলেন-

১। প্রেসিডেন্ট - বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী)

২। উপ-রাষ্ট্রপতি - সৈয়দ নজরুল ইসলাম (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং পদাধিকারবলে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান)

৩। প্রধানমন্ত্রী - তাজউদ্দিন আহমেদ

৪। অর্থমন্ত্রী - এম. মনসুর আলী

৫। স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ, পুনর্বাসন, কৃষি ও আইনমন্ত্রী - এ.এইচ.এম. কামরুজ্জামান

৬। পররাষ্ট্র মন্ত্রী - খন্দকার মোশতাক আহমেদ

৭। সেনাবাহিনী প্রধান - কর্নেল (অব.) আতাউল গনি ওসমানী

৮। চিফ অব স্টাফ - কর্নেল (অব.) আবদুর রব

৯। ডেপুটি চিফ অব স্টাফ - গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার

(এদের মধ্যে ২-৫ এই জাতীয় চার নেতার নাম ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩ নভেম্বর জেলখানায় এই জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সে কারণে প্রতি বছর ৩ নভেম্বর জেল হত্যা দিবস পালন করা হয়।)

মানচিত্র দেখে মুক্তাঞ্চল এবং একই সঙ্গে নিরাপদ ও কলকাতার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ আছে এমন একটি স্থানে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজনের লক্ষ্যে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার আম্রকানন নির্বাচন করা হয়। ১৭ এপ্রিল বেলা ১১ টায় বৈদ্যনাথ তলায় মন্ত্রিসভার অভিষেক অনুষ্ঠান হয়। একজন তরুণ সিভিল অফিসার তওফিক ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে কতিপয় মুক্তিযোদ্ধা এলাকাটির নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৭ এপ্রিল সকাল ১১.১০ মিনিটে অভিষেক অনুষ্ঠান শুরু হয়। এই অনুষ্ঠানে মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ, গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, শতাধিক ভারতীয় ও বিদেশি সাংবাদিক ও প্রচার মাধ্যমকর্মী এবং স্থানীয় অধিবাসী ও কিছু সংখ্যক 'মুক্তিযোদ্ধা' উপস্থিত ছিলেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত (আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি) পরিবেশনের সাথে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আব্দুল মান্নান। গার্ড অব অনার শেষে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ এবং প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী একটি ছোট্ট মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন। নতুন রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র বা স্বাধীনতার সনদ পাঠ করেন আওয়ামী লীগের চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী। নবগঠিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাম হলো 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ'। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম একে একে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তে আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। সেই কলঙ্কময় ঘটনার ২১৪ বছর পর পলাশীরই নিকটবর্তী স্থানে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য পুনরায় উদিত হলো। বৈদ্যনাথ তলার নামকরণ করা হলো মুজিবনগর।

বিপ্লবী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পটভূমি ব্যাখ্যা করেন। তারা নতুন রাষ্ট্রের জন্য সহানুভূতি, সাহায্য ও স্বীকৃতি কামনা করেন।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of independence)

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় গঠিত হলে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র' শীর্ষক গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ৪র্থ পৃষ্ঠায় উক্ত ঘোষণা ইংরেজিতে লিপিবদ্ধ আছে। ঘোষণা সংক্রান্ত অংশের বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ-
মুজিবনগর, বাংলাদেশ
১০ এপ্রিল, ১৯৭১
যেহেতু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত একটি শাসনতন্ত্র রচনার অভিপ্রায়ে প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এবং
যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ তাদের ১৬৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে ১৬৭ জনই আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এবং
যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান একটি শাসনতন্ত্র রচনার জন্য ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ তারিখে, শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান করেন।
এবং
যেহেতু আহুত এই পরিষদ স্বেচ্ছাচার এবং বেআইনীভাবে পালনের অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন।
এবং
যেহেতু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তাদের প্রতিশ্রুতি পালনের পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চলাকালে একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
এবং
যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্যে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
এবং
যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনা করিয়াছে এবং এখনো বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নির্যাতন চালাইতেছে।
এবং
ও নানাবি যেহেতু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অন্যায় যুদ্ধ, গণহত্যা ও নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার চালিয়ে বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একত্র হয়ে একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে ও নিজেদের সরকার গঠন করতে সুযোগ করে দিয়েছে।
এবং
যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাদের বীরত্ব, মানসিকতা ও বিপ্লবী কার্যক্রমের দ্বারা বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডের ওপর তাদের কর্তৃক প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছেন।

সেহেতু সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পক্ষে যে রায় দিয়েছেন, সে মোতাবেক আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য বিবেচনা করে আমরা বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি এবং এতদ্বারা পূর্বাহ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি-
এবং
এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন এবং রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক হবেন। রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমা প্রদর্শনসহ সর্বপ্রকারের প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী হবেন।
তিনি একজন প্রধানমন্ত্রী ও প্রয়োজনবোধে মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন, রাষ্ট্রপ্রধানের কর ধার্য ও অর্থ ব্যয়ের এবং গণপরিষদের অধিবেশন আহ্বান ও মুলতবির ক্ষমতা থাকবে এবং বাংলাদেশের জন্যে আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্যে অন্যান্য সকল ক্ষমতারও তিনি অধিকারী হবেন।
বাংলাদেশে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা কাজে যোগদান করতে না পারেন অথবা তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রদত্ত সকল ক্ষমতা উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করবেন।

আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের স্বাধীনতার এ ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকরী বলে গণ্য হবে। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার জন্যে আমরা অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে ক্ষমতা দিলাম। এবং রাষ্ট্রপ্রধান ও উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করলাম।

সারসংক্ষেপ

টিক্কা খান: টিক্কা খান হলেন পূর্ব বাংলায় নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর। মূলত ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে গণহত্যা পরিচালনা করার জন্য তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন অপারেশন সার্চলাইট-এর পরিকল্পনাকারী। ইয়াহিয়া খানের নির্দেশ পালন করে এই টিক্কা খান বাংলার বুকে গণহত্যা চালায়। টিক্কা খান বেলুচিস্তানের কসাই নামে কুখ্যাত।
২৫ মার্চ গণহত্যা (অপারেশন সার্চলাইট): ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মার্চ বাঙালির ইতিহাসে 'কালরাত' নামে পরিচিত। এই
রাতে ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে গর্ভনর টিক্কা খান, লেফটেনেন্ট জেনারেল খাদেম হোসেন ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী অধীনস্থ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে গণহত্যা পরিচালনা করে। ২৫ মার্চ এক রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগসহ বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ চালিয়ে প্রায় এক লক্ষ ঘুমন্ত বাঙালিকে হত্যা করে। যে নীল নকশার মাধ্যমে এ হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করা হয় তাই অপারেশন সার্চলাইট। ২৫ মার্চ রাতেই গণহত্যার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। ২৫ মার্চের ন্যায় এত দুর্বিষহ রাত বাঙালিদের জাতীয় জীবনে কখনো আসেনি।

মুজিবনগর: কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত মেহেরপুর মহকুমার (বর্তমান জেলা) বৈদ্যনাথ তলার অন্তর্গত ভবের পাড়া একটি ছায়া নিবিড় গ্রাম। এরই বর্তমান নাম মুজিবনগর। এখানেই ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করেন। তখন স্থানটির নামকরণ করা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম অনুযায়ী মুজিবনগর। আর এখানে সরকার গঠন করার কারণে এ সরকারের নামকরণ করা হয় "মুজিবনগর সরকার"। একাধিক কারণে স্থানটি অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী।

মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ শুরু হয় পাকিস্তান হতে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান লাভ করে। ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকবাহিনী নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। ফলে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ চলে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর। কারণ পাকবাহিনীর অত্যাচারের প্রতিবাদে দেশকে দখলদার মুক্ত করতে ছাত্রজনতা, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, সেনাবাহিনীর সদস্য, ইপিআর, পুলিশ সদস্য দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করেন। মুজিবনগর সরকারের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত হয়ে সেক্টর কমান্ডারদের নেতৃত্বে বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এ ৯ মাস যুদ্ধে ৩০ লক্ষ লোক প্রাণ হারান। প্রায় ২ লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারান। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন এবং অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। অবশেষে মুক্তিবাহিনী মিত্রবাহিনীর সহায়তায় ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন। ফলে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।

আম্রকানন: আম্রকানন বলতে সাধারণত আম গাছের বাগানকে বুঝায়। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এই আম্রকানন মূলত দুটি কারণে বিখ্যাত। প্রথম কারণ- ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। দু'শত বছরের ব্রিটিশ শাসন শোষণে উপমহাদেশ আবদ্ধ হয়। দ্বিতীয় কারণ হলো- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল বর্তমান মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরের আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করা হয়। মুজিবনগর সরকার নামে খ্যাত এই সরকার ১৭ এপ্রিল ঐ আম্রকাননেই শপথ বাক্য গ্রহণ করে এবং একই স্থান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর প্রান্তরে যে আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল ২১৪ বছর পর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুজিবনগরের আম্রকাননে আবার স্বাধীনতার সূর্য উদিত হলো।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ- মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...