The English Company Gets Dewani-1765
১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিম পরাজিত হলে বাংলার সিংহাসনে পুতুল সরকার হিসেবে আবার মীরজাফর আসীন হয়। এক বছরের মাথায় (১৭৬৫) মীরজাফরের মৃত্যু হলে তার নাবালক পুত্র নজিমউদ্দৌলা কোম্পানির আশ্রিতা হিসেবে সিংহাসনে বসেন। প্রকৃতপক্ষে তখন থেকে সমস্ত ক্ষমতা কোম্পানির হাতে চলে যায়।
এ সময় ক্লাইভ দ্বিতীয়বার শাসনভার গ্রহণ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দূর করে স্থিতিশীলতা আনার জন্য বাদশাহ শাহ আলমের নিকট থেকে দেওয়ানি লাভের চেষ্টা করেন। এই লক্ষ্যে ক্লাইভ অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার সাথে 'এলাহাবাদের প্রথম সন্ধি' স্থাপন করেন (আগস্ট ১৭৬৫)। এই সন্ধি মতে নবাব সুজাউদ্দৌলা রাজ্য ফিরে পান বিনিময়ে কোম্পানিকে ৫০ লক্ষ টাকা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং কোরা ও এলাহাবাদ অঞ্চলের দেওয়ানি ছেড়ে দেন। এরপর 'এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধি' (আগস্ট ১৭৬৫) দ্বারা বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে সন্ধি স্থাপন করেন।
এই সন্ধি দ্বারা কোরা ও এলাহাবাদ যা কোম্পানি অযোধ্যার নবাবের নিকট থেকে পেয়েছিল তা বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমকে ছেড়ে দেয়। বিনিময়ে বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলম কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্বের স্বত্ব স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেন। এই দেওয়ানি লাভ ছিল কোম্পানির বিরাট বিজয়। এতদিন কোম্পানি মীরজাফর ও মীর কাশিমের সঙ্গে চুক্তি বলে বর্ধমান, মেদিনীপুর, চট্টগ্রাম ও চব্বিশ পরগনার রাজস্ব ভোগ করত। এখন তারা গোটা বাংলার রাজস্বের অধিকারী। কোম্পানি নবাবের কৃপাপ্রার্থী বণিক কোম্পানি থেকে এক লাফে রাজস্বের অধিকারী হয়ে বাংলার উপর প্রকৃত আধিপত্য বিস্তার করে। সুতরাং দেওয়ানি লাভ ছিল কোম্পানির চূড়ান্ত সাফল্য।
দেওয়ানি লাভের গুরুত্ব
ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারে তৃতীয় এবং চূড়ান্ত পর্ব ছিল দেওয়ানি লাভ। মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এ দুটি দিক থেকে ইংরেজদের জন্য বাংলায় দেওয়ানি লাভ ছিল অত্যন্ত গুরুত্ববহ। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
রাজনৈতিক গুরুত্ব:
প্রথমত, ইংরেজদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে উঠে আসার প্রধান সিঁড়ি ছিল দেওয়ানি লাভ।
দ্বিতীয়ত, দেওয়ানি লাভের ফলে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার পরোক্ষভাবে বাংলার সার্বভৌম ক্ষমতা গ্রহণ করে। বস্তুতপক্ষে দেওয়ানি লাভ করে ইংরেজ কোম্পানি তাদের দখলকৃত ক্ষমতাকে আইনগত বৈধতা প্রদান করে।
তৃতীয়ত, দেওয়ানি লাভ ছিল ইংরেজদের নিকট রাজনৈতিক বিজয়। এর ফলে বাংলার নবাব ও সম্রাট ক্ষমতা শূন্য হয়ে ইংরেজদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়। নবাব নামে মাত্র সিংহাসনে বসে থাকেন। সবকিছু পরিচালনা করত ইংরেজরা।
চতুর্থত, দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে কোম্পানি শুধু রাজস্ব অধিকারই লাভ করেনি; বরং নাবালক নাজিমউদ্দৌলার সাথে সন্ধির ফলে পরোক্ষভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতাও কোম্পানি লাভ করে। কোম্পানি নিজেদের স্বার্থে প্রশাসনিক ক্ষমতা সরাসরি হাতে না নিয়ে নবাবের হাতে রাখে। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ছিল কোম্পানির হাতে। নবাব ছিল নামে মাত্র। ক্লাইভ নিজেই স্বীকার করেছেন যে, দেওয়ানির মাধ্যমে কোম্পানি বাংলার সকল ক্ষমতার উৎসে পরিণত হয়।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব:
প্রথমত, দেওয়ানি লাভ ছিল ইংরেজদের বিরাট অর্থনৈতিক বিজয়। দেওয়ানি লাভ ছিলো কোম্পানি ভারতে অর্থনৈতিক শোষণের বিরাট হাতিয়ার। দেওয়ানি লাভ প্রসঙ্গে লর্ড ক্লাইভ বলেছেন, "বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব পাওয়া যাবে তা এত বেশি হবে যে, সম্রাট ও বাংলার নবাবের নির্ধারিত সমস্ত ব্যয় পরিশোধ করেও কোম্পানির হাতে আয় থাকবে ১২ কোটি টাকা (১৭৬৫-৬৬ খ্রি.)।"
দ্বিতীয়ত, কোম্পানি দেওয়ানি লাভের ফলে কোম্পানির কর্মচারীরা বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার সুযোগ পায়। নদীর পানির মতো এদেশ থেকে তারা অর্থ পাচার করতে থাকে।
তৃতীয়ত, দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি ইউরোপ থেকে রৌপ্য আনা বন্ধ করে দেয়। কারণ বাংলা থেকে তারা যে পরিমাণ রাজস্ব পেত তা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছিল। দেওয়ানি লাভকে তারা মাছের তেলে মাছ ভাজাতে সুবর্ণ সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করে।
চতুর্থত, পলাশীর যুদ্ধের পর কোম্পানি যে লুণ্ঠন শুরু করেছিল, দেওয়ানি লাভের মধ্য দিয়ে সে লুণ্ঠনের পথ আরও প্রশস্ত ও গতিশীল হয়।
পঞ্চমত, অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন ইংল্যান্ডের মূলধনের একটি বিরাট অংশ গড়ে ওঠে বাংলা থেকে প্রেরিত অর্থের দ্বারা। এই মূলধনের সাহায্যে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব ঘটে। কেননা শিল্পবিপ্লব শব্দটি ব্যবহারকারী ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়েনবি শিল্পবিপ্লবের সময়কাল উল্লেখ করেছেন ১৭৬০ থেকে ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দ। সুতরাং ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে বাংলা থেকে পাচার করা সম্পদের সাহায্যে ইংল্যান্ডের মূলধন গড়ে ওঠেছে এবং এই মূলধনের দ্বারা ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব ঘটে থাকতে পারে তা অনুমান করলে ভুল হবে না।
Read more