Language Movement of '52: Role of General Masses and Students in The Movement of 21st February
প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দীন ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় জিন্নাহর ভাষণের পুনরাবৃত্তি করেন 'উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হইবে'। এই ঘোষণা যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-জনতা বারুদের মতো জ্বলে উঠল। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে- ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় বাংলা ভাষার দাবিতে ছাত্র ধর্মঘট, ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সভা, ৪ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল, ধর্মঘট ও ছাত্র বিক্ষোভ প্রদর্শনের তারিখ নির্ধারিত হয়। ভাষা আন্দোলনকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার দাবিতে সারা পূর্ব বাংলায় ধর্মঘট ও শোভাযাত্রার আহ্বান করা হয়। এদিকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন সংগ্রাম পরিষদের যৌথ কর্মসূচিতে বিচলিত হয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ দিনের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেন।

আন্দোলনের কর্মসূচি মোতাবেক ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ছাত্ররা ঢাকায় পিকেটিং শুরু করে। সকাল ৯টায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন চত্বরে সমবেত হতে থাকে। সকাল ১০টায় বটতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে বিরাট জনসভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত হয় এবং ১০ জন করে একটি দল মিছিল করবে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'। হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রথম দলটি মেডিকেল কলেজের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ বাধা দেয়, কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। ছাত্রদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রথমে লাঠিচার্জ, এবং কাদুনে গ্যাস ব্যবহার করে। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে সমবেত হয়ে গণপরিষদের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে পুলিশ মিছিলের ওপর গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে আবদুস সালাম, আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার ঘটনা স্থলে শহিদ হন। এভাবেই রক্তঝরা একুশের সৃষ্টি হয়। সে সময় গণপরিষদের অধিবেশন চলছিল। গুলির খবর পেয়ে আবদুর রশিদ তর্কবাগীশসহ কয়েকজন সদস্য অধিবেশন ত্যাগ করে ঘটনাস্থলে চলে আসেন। এ সময় কারারুদ্ধ শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দিন আহমেদ ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে কারা অভ্যন্তরে অনশন পালন করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি হরতাল আহ্বান করা হয় এবং ৩০ হাজার লোকের অংশগ্রহণে মেডিকেল হোস্টেলে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর পরেই গণবিক্ষোভে সারা শহর তপ্ত হয়ে ওঠে। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্ত শহিদ মিনার তৈরি করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি শহিদ শফিউর রহমানের পিতা প্রথম শহিদ মিনার উদ্বোধন করেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি অনশনের কারণে বাধ্য হয়ে ফরিদপুর জেল থেকে শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান মুসলিম লীগ ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কর্তৃক যৌথ বিবৃতিতে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিশ্রুতি দেন। রক্তঝরা ২১ ফেব্রুয়ারি যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করেছিল তার ওপর নতি স্বীকার করে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ৯ মে, ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের গণপরিষদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে পাকিস্তানেরl
দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়। সংবিধানের ২১৪ (১) অধ্যায়ে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে লেখা হয়- 214 (1) The state language of Pakistan Shall be Urdu and Bengali (২১৪(১) উর্দু এবং বাংলা হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা)। ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬ সালে সরকারিভাবে প্রথম শহিদ দিবস পালিত হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারির দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়, যা আজও চলমান।
ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য (Significance of language movement)
বাঙালি জাতীয়তাবোধ জাগরণে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য অপরিসীম। আন্দোলন করে কিভাবে ন্যায্য অধিকার ছিনিয়ে আনতে হয় তার শিক্ষা দিয়েছে '১৯৫২'। নিম্নে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য উল্লেখ করা হলো:
১। এ আন্দোলন শুধু ভাষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবেই বিবেচিত হয় না, বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের পথিকৃৎ হিসেবেও বিবেচিত হয়।
২। একুশের ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বাঙালিরা সর্বপ্রথম নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।
৩। একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশের প্রথম গণসচেতনতা এবং পরবর্তীকালে শাসকচক্রের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।
৪। ভাষা আন্দোলনের মধ্যে বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ সুপ্ত ছিল।
৫। ১৯৫৬ ও ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের সংবিধানে বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম ভাষার মর্যাদা লাভ করার পর থেকে এর উন্নয়নের জন্য বাংলা একাডেমি, বাংলা উন্নয়ন বোর্ড ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়।
৬। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র এঁটেছিল তা ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে রুখে দিয়েছিল বলেই পরবর্তীতে অন্যান্য অনেক ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা বাঙালিদের পক্ষে সম্ভব হয়।
৭। একুশের রক্তদানের ফলে যে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকশিত হয় তা থেকেই জন্ম নেয় একুশ দফার দাবি। একুশের প্রতীক 'একুশ দফা' প্রণয়ন করে প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী বাঙালি নেতৃবৃন্দ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে।
৮। ৫২ যে আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিল ৭১-এর স্বাধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে তা সমাপ্তি রচিত হয়। ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে আন্দোলনের প্রেরণা যুগিয়েছিল ভাষা আন্দোলন। ভাষার জন্য জীবনদানের ইতিহাস বিশ্বে বিরল।
৯। মাতৃভাষা রক্ষার জন্য বাঙালিরা জীবন দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সে কারণেই জাতীয় সীমানা পেরিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করেছে।
১০। ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ ও দায়িত্ববোধের প্রকৃত নিদর্শনের প্রতি সম্মান ও স্বীকৃতি জানাতে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে ইউনেস্কো।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব (Importance of language movement is the development of bengalee nationalism)
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলন পূর্বপাকিস্তানের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অবহেলা ও বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে এটি ছিল বাঙালি জাতির প্রথম প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রেরণা; জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের মাইল ফলক। বস্তুত ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলে। ভাষা আন্দোলনের সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নও জড়িয়ে পড়ে। যেমন কেন্দ্রীয় গণপরিষদে পূর্বপাকিস্তানের জনসংখ্যানুপাতিক আসন সংখ্যা দাবি করা হয়। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন দাবি করা হয়, কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে বাঙালিদেরকে অধিক সংখ্যায় নিয়োগের দাবি উচ্চারিত হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান ঘটানোর দাবি করা হয়। বাংলা ভাষার প্রশ্নে মুসলিম লীগের বৈরী মনোভাবের কারণে এই দল থেকে গণতন্ত্রী দল, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ প্রভৃতি নতুন দলের সৃষ্টি হওয়ায় পূর্ববাংলায় মুসলিম লীগের প্রাধান্য ক্ষুণ্ণ হয়। ফলে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে এই দলের চরম ভরাডুবি হয়।
ভাষা আন্দোলন প্রথম পর্যায়ে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল। কিন্তু কালক্রমে এটি রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে। অনেক রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদ এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ফলে পূর্ববাংলার স্বাধিকারের চিন্তা-চেতনা শুরু হয়। পরবর্তী আন্দোলনসমূহে ভাষা আন্দোলন প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ভাষা আন্দোলন একধরনের প্রাদেশিকতাবাদের জন্ম দেয়। ভাষা আন্দোলন জাতীয় জাগরণের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় ও উপনিবেশ থেকে মুক্তির সূচনা ঘটায়। জাতিকে সকল কর্মকাণ্ডে ঐক্যবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করে। যখনই পূর্ববাংলার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো দাবি উচ্চারণ করা হয়েছে তখনই পূর্ববাংলাবাসীর সমর্থন অর্জন করেছে।
ভাষা আন্দোলন ছাত্রসমাজকে প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক শক্তিতে রূপায়িত করে। ছাত্ররা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্র রাজনীতি শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনের মাত্র দুমাসের মধ্যে পূর্ববাংলায় ছাত্র ইউনিয়ন নামে ছাত্র সংগঠন জন্মলাভ করে। পরবর্তী আন্দোলনসমূহে তাই দেখা যায় ছাত্রসমাজই ছিল মূল চালিকাশক্তি। যেকোনো সরকারের যেকোনো অন্যায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ উচ্চারণ করে ছাত্রসমাজ। ভাষা আন্দোলন ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক, কর্মচারী প্রভৃতি সকল পেশার লোকদের মধ্যে ঐক্যের যে ঐতিহ্য সৃষ্টি করে, পরবর্তী আন্দোলনসমূহে আমরা তাঁর পুনরাবৃত্তি অবলোকন করি।
ভাষা আন্দোলনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এই যে এর সাথে জড়িত নেতৃবৃন্দ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবর্তন করেন। ফলে পূর্ববাংলার হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। আওয়ামী মুসলিম লীগ নামের দলটি মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ গ্রহণ করে সকল ধর্মের মানুষের নিকট অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। ফলে পরবর্তী আন্দোলনসমূহে নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের হাতেই চলে যায়।
পরিশেষে বলা যায় যে, ভাষা আন্দোলন বাঙালি জনগণের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মাতৃভাষাকে আপন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য এ সময় পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজ জীবন বিলিয়ে দিতেও দ্বিধা করেনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হতেই শাসকদের কাছ হতে পূর্ববাংলার জনগণ কোনো সহানুভূতি পায়নি। তাই হয়েছে প্রতিবাদমুখর; হয়েছে সংঘবদ্ধ। শেষ পর্যন্ত তাদের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে। মায়ের ভাষাকে রক্ষা করেছে বুকের রক্ত দিয়ে। এ ঘটনা পূর্ববাংলার জনগণের মনের শক্তিকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অধিকার আদায়ের সব আন্দোলনে ভাষা আন্দোলন প্রসূত একুশের চেতনা সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। একুশের চেতনায় সংঘবদ্ধ বাঙালি জাতির স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে স্বাধীনতার দাবি অতঃপর মুক্তিযুদ্ধ। এ ধারাবাহিকতায় বীরবাঙালি মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়।
পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই
Read more