hsc

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক: সংস্কারসমূহ (১৮২৮–১৮৩৫ খ্রি.) (২.৮)

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

7

Lord William Bentinck: Reforms (1828-1835 AD)

প্রথম বারে (১৮০৫-০৭) গভর্নর থাকাকালীন অবস্থায় ভেলোরের সিপাহী বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হলে তাকে স্বদেশে ফিরে যেতে হয়। ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড আর্মহাস্ট স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক দ্বিতীয় বারের মতো গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হয়ে ভারতবর্ষে আসেন। তিনিই ভারতবর্ষের প্রথম গভর্নর জেনারেল, যিনি মনে করতেন প্রজাদের কল্যাণ বিধান শাসকের প্রধান কর্তব্য। তিনি একজন শান্তিপ্রিয় এবং উদারনৈতিক শাসক ছিলেন। উদারপন্থি বেন্টিংক সাম্রাজ্য বিস্তার অপেক্ষা সংস্কারের দিকে আত্মনিয়োগ করেন। একজন সংস্কারক হিসেবে তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হয়ে আছেন।

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক-এর সংস্কারসমূহ
(Lord William Bentinck's Reforms)
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক ছিলেন ভিক্টোরিয়া যুগের মূর্ত প্রতীক। তাঁর সংস্কারসমূহকে নিম্নলিখিত চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়-

১। অর্থনৈতিক সংস্কার: প্রথম ব্রহ্মযুদ্ধের ব্যয়ভারে কোম্পানির অর্থনৈতিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করলে তিনি কোম্পানির অর্থনৈতিক কাঠামোকে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বোর্ড অব ডাইরেক্টরের নিকট থেকে ব্যয় সংকোচন ও যুদ্ধনীতি পরিত্যাগের নির্দেশ নিয়ে কতগুলো পন্থা গ্রহণ করেন-

(ক) অতিরিক্ত কর্মচারী ছাঁটাই করেন।

(খ) শান্তির সময় সামরিক কর্মচারীদের যে অর্ধেক ভাতা (Half battle) দেওয়া হতো তা তিনি উঠিয়ে দেন।

(গ) উচ্চ শ্রেণির বেসরকারি কর্মচারীদের বেতন হ্রাস করেন।

(ঘ) কোম্পানির কর্মচারীদের দক্ষতা ও কার্যকলাপ সম্পর্কে গোপন সংবাদ নেওয়ার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।

(ঙ) কর্ণওয়ালিশের প্রাদেশিক আপীল কোর্টগুলো বাতিল করে জমি জরিপের ব্যবস্থা করে রাজস্ব বৃদ্ধি করেন।

(চ) মালবে উৎপন্ন আফিং-এর উপর শুল্ক ধার্য করেন

(ছ) মাদ্রাজে জমির রায়তওয়ারী বন্দোবস্ত এবং যুক্ত প্রদেশে ভূমির বন্দোবস্ত করে কোম্পানির আয় বৃদ্ধি করেন।

এ সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করে কোম্পানির ঘাটতি পূরণ করে বাৎসরিক ১৫ লক্ষ টাকা উদ্বৃত্ত করতে সক্ষম হন।

২। প্রশাসনিক সংস্কার: প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্যে-

(ক) কর্ণওয়ালিসের প্রবর্তিত প্রাদেশিক বিচারালয়গুলো তুলে দিয়ে জেলা কালেক্টরের ওপর ফৌজদারি মামলার বিচারের ভার অর্পণ করেন

(খ) জেলাগুলো একত্রিত করে ১০টি বিভাগ গঠন করেন এবং প্রতি বিভাগের দায়িত্ব বিভাগীয় কমিশনারের উপর ন্যস্ত করেন।

(গ) পূর্বে বিচার ব্যবস্থার কোনো দায়িত্বপূর্ণ পদে ভারতীয়দের নিয়োগ দেওয়া হতো না। বেন্টিংক এই নিয়ম পরিবর্তন করে ভারতীয়দের উচ্চ পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন।

(ঘ) ভারতীয়দের জন্য সাবজজের পদ সৃষ্টি করেন।

(ঙ) ফরাসি ভাষার পরিবর্তে তিনি আদালতে দেশীয় ভাষার প্রচলন করেন।

চ) বেন্টিংক ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় জুরি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং ভারতীয়দের জুরির সদস্য নিযুক্ত করেন।
এ সমস্ত সংস্কারের ফলে শাসনব্যবস্থা সুস্থ ও কার্যকর হয়ে ওঠে।

৩। সামাজিক সংস্কার বেন্টিংকের সামাজিক সংস্কার ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। তার সামাজিক সংস্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

(ক) সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ: বহু প্রাচীনকাল থেকে এদেশে হিন্দু সমাজে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। এই প্রথা অনুযায়ী স্বামী মারা গেলে স্বামীর চিতায় জীবন্ত স্ত্রীকে পুড়ে মারা হতো। এ প্রথা দুটি উপায়ে কার্যকর করা হতো-

(১) সহমরণ (মৃত স্বামীর সাথে স্ত্রীকে একই চিতায় পুড়িয়ে মারা) এবং

(২) অনুমরণ (বিদেশে স্বামীর মৃত্যু হলে অনুকরণে চিতায় পুড়ে স্ত্রীকে মারা)।

এ অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে রাজা রামমোহন রায় দ্বারকানাথ ঠাকুরকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। লর্ড বেন্টিংক তা সমর্থন করে ১৭ নং রেজুলেশন আইন দ্বারা ১৮২৯ সালে এই প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

(খ) গঙ্গায় সন্তান বিসর্জন নিষিদ্ধ তৎকালীন হিন্দুরীতি অনুযায়ী দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য সন্তানকে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়ার যে প্রথা ছিল, আইন পাশ করে তিনি তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন।

(গ) শিশু হত্যা: লর্ড বেন্টিংক সংস্কার পন্থি হিন্দু নেতাদের সহযোগিতায় বিবাহ দিতে অসুবিধা ও শিশুকে গলা টিপে হত্যা চিরতরে নিষিদ্ধ করলেন।

(ঘ) বর্গী দমন: বেন্টিংকের অপর কৃতিত্ব ছিল বর্গী দস্যুদের দমন। মোগলদের পতনের যুগে বর্গীদের প্রকোপ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পায়। লুঠ, অত্যাচার, পথিকদের ফাঁস দিয়ে হত্যা করে সর্বস্ব লুঠ করে জনজীবন অতিষ্ঠিত করে তুলত। বেন্টিংক স্লীম্যানকে বর্গী দমনে নিয়োগ করেন। স্লীম্যান বর্গীদের সাংকেতিক ভাষা আয়ত্ত করে ফেরিঙ্গরা নামক এক বর্গী সর্দারকে বন্দী করে গোপন আস্তানা জেনে ১৫০০ বর্গী কৌশলে হত্যা করে ও অনেককে বন্দী করে বর্গী দমন করেন।

৪। শিক্ষা সংস্কার: ভারতীয় উপমহাদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন লর্ড বেন্টিংকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ১৮১৩ সালের সনদ অনুযায়ী কোম্পানি ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য বৎসরে ১ লক্ষ টাকা ব্যয় করত। এই অর্থ কেবল মাত্র সংস্কৃত, ফরাসি প্রভৃতি প্রাচ্য ভাষা শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হতো। ১৮৩৩ সালে লর্ড বেন্টিংক এই অর্থ ইংরেজি শিক্ষার জন্য ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিলে ভারতে দুটি দলের উদ্ভব হয়। এক দল প্রাচ্য ভাষা শিক্ষার জন্য এই অর্থ ব্যয়ের পক্ষপাতী ছিল। এই দলের প্রধান সমর্থক ছিলেন পণ্ডিত উইলসন। অন্য দল পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন। এই দলের সমর্থক ছিলেন লর্ড মেকেল, আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়। লর্ড বেন্টিংক এ দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে শোষোক্ত দলের মত গ্রহণ করেন এবং, পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্য সরকারি অর্থ মঞ্জুর করেন।

১-১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে বেন্টিংক-এর চেষ্টায় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও মুম্বাই-এর এলিফ্রস্টোন ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠিত * হয়। মোট কথা তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার বাধা দূর হয় এবং ভারত রাসীরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠে।

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক-এর কৃতিত্ব বিচার

বেন্টিংক একমাত্র গভর্নর জেনারেল যিনি ভারতীয়দের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করে উল্লেখযোগ্য অবিস্মরণীয় সংস্কার সাধন করেন। একজন উঁচু দরের সংস্কারক হিসাবে তিনি ভারতের ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে আছেন। রাজ্য বিস্তার অপেক্ষা শিক্ষা-দীক্ষার উন্নতি, কুসংস্কার দূরীকরণ, বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং জনকল্যাণমূলক কার্যকলাপের জন্য ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে আছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শাস্তির গৌরব যুদ্ধের কৃতিত্ব অপেক্ষা অধিক উজ্জ্বল। ম্যাকেল বলেন, "বেন্টিংক প্রাচ্যদেশীয় স্বৈরতন্ত্রবাদের মধ্যে তাঁর শাসন নীতির দ্বারা ব্রিটিশের স্বাধীনতা ও * গণতন্ত্রবাদের বীজ অনুপ্রবেশ করান।"

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...