শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপের চিরাচরিত কুটির শিল্প, প্রাচীন অর্থনীতি, সামন্ততন্ত্র প্রভাবিত সমাজে পূর্বতন রাজতন্ত্র ও অভিজাত সম্প্রদায়ের সুযোগ-সুবিধার অবসান ঘটে। আবার নগর-জীবন, মধ্যবিত্ত প্রভাবিত সমাজ, উদারনৈতিক ভাবধারা, শ্রমিক সমস্যা ও অন্যান্য সামাজিক সমস্যার উদ্ভব ঘটে। নতুন শিল্পপতি, কারখানার মালিক, বিত্তশালী বণিকগণ পূর্ববর্তী অভিজাত শ্রেণির প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। কৃষিপ্রধান সমাজের বিলুপ্তি ঘটে এবং শিল্পভিত্তিক সমাজের উদ্ভব ঘটে। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে ও উনবিংশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডে যন্ত্রভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটলে শিল্পভিত্তিক পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্রের প্রসার দ্রুত হয়, যা এক শতকের মধ্যে ইউরোপের অন্যান্য দেশে প্রসার লাভ করে।
শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপে জনসংখ্যা ও নগর সভ্যতা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে যেমন কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক প্রশাসনের পরিবর্তন ঘটে, তেমনি অর্থনৈতিক প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পবিপ্লবের ফলে অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পণ্যসামগ্রী উৎপাদন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ফলে পুঁজিপতিরা একচেটিয়া বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও অধিক মুনাফা লাভের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বস্তুত উনবিংশ শতকে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উপনিবেশ বিস্তারের যে সংগ্রাম ও প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল, তার মূলে ছিল শিল্পবিপ্লবপ্রসূত পুঁজিপতিদের প্রভাব। পুঁজিপতি শ্রেণি নিজ নিজ দেশের সরকারকে শিল্পজাত পণ্যের বাজার সৃষ্টির জন্য ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারে উৎসাহ জোগায়। পুঁজিবাদের চরম পরিণতি হলো সাম্রাজ্যবাদ, যা উনবিংশ ও বিংশ শতকের শুরুতে প্রকট আকার ধারণ করে। অর্থাৎ পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তার অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অন্য জনগোষ্ঠীর ভূখণ্ড দখল করে যে পরদেশি শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয় তাকেই ঔপনিবেশিক শাসন বলে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী অন্যের ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে শাসন করলেও শিল্পবিপ্লবের ফলে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও চরিত্র ছিল ভিন্ন।
উনবিংশ শতাব্দীতে শিল্পবিপ্লবজনিত পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে ইউরোপের বাইরে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা নব উদ্যমে শুরু হয়। দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকট আকার ধারণ করে। পুঁজিবাদের প্রসারের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোতে যৌথ বণিক সংঘের প্রতিষ্ঠা হয়, যাদের উপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ফলে বণিক সংঘগুলোর মালিক ও অংশীদারগণ পুঁজি সঞ্চয় করে স্ফীত হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম উল্লেখ করা যায়। শুধু শিল্পবিপ্লবজনিত পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য ইউরোপীয় দেশগুলো উপনিবেশ বিস্তারের নীতি গ্রহণ করেনি। বরং এর পেছনে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক উদ্দেশ্যও বিদ্যমান ছিল। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ব্যাখ্যায় বলা যায়, সাম্রাজ্যের বিশালতার উপরই দেশের শক্তি, মর্যাদা ও গৌরবের মানদণ্ড নির্ভর করে। এ মনোবৃত্তিই ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উপনিবেশ বিস্তারের প্রতিযোগিতা ভীব্রতর করে। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের মনোভাব তাদের উপনিবেশ স্থাপনে আগ্রহী করে তোলে। প্রত্যেক দেশের উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার জীবিকার সন্ধানে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো সাম্রাজ্য বিস্তারের নীতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর উপনিবেশ বিস্তার২০
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উপনিবেশ স্থাপনের তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি, বরং এ সময় স্পেন, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের প্রাচীন ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ক্রমশ ভেঙে পড়ছিল। একমাত্র ইংল্যান্ডই তার ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বজায় রেখে উত্তরোত্তর আয়তন বৃদ্ধি করে যেতে থাকে। ১৭৮৩ থেকে ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে ইংল্যান্ডের উপনিবেশ বিস্তারের একাধিপত্যের যুগ বলা যায়।
বিশ্বের দুটি অঞ্চল আফ্রিকা ও এশিয়ায় ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শোষণের নগ্নতা বিশেষভাবে প্রকটিত হয়। দাসত্ব থেকে মুক্ত নিগ্রো দাসদের পুনর্বাসনের জন্য প্রায় সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশ ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে বণ্টিত হয়ে যায়। এশিয়া ভূখণ্ডে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের প্রভাব প্রচণ্ডভাবে দেখা দেয়। উত্তরে রাশিয়া এক বিশাল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, যার বিস্তৃতি ছিল উরাল পর্বতমালা থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত। দক্ষিণে ব্রিটেন ভারত ও বার্মায় সাম্রাজ্য বিস্তার করে এবং ফ্রান্স ইন্দোচীনের এক বৃহদংশ কুক্ষিগত করে। পারস্য ও মধ্য এশিয়া ইউরোপীয়দের প্রভাবাধীন অঞ্চলে র প্রভাবাধীন ও পরিণত হয়।
পর্তুগিজ ও স্পেনীয় উপনিবেশ
আধুনিক যুগের কাছাকাছি সময়েও স্পেন ও পর্তুগাল নৌবিদ্যার পারদর্শিতাকে কাজে লাগিয়ে শোষণমূলক ও ভূবাসনমূলক উপনিবেশ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে। দেশ দুটি মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করে। যদিও ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারের আধিপত্যে তারা তাদের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে পারেনি।
ইংল্যান্ডের উপনিবেশ
আমেরিকার উপনিবেশগুলো ইংল্যান্ড হারালেও ইংল্যান্ডের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। সপ্তদশ শতকে ওলন্দাজ আবিষ্কারকগণ সর্বপ্রথম অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রতি সভ্য জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সেখানে উপনিবেশ স্থাপনে কোনো রাষ্ট্রই সফল হয়নি।
অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে ইংরেজ নাবিক ও আবিষ্কারক ক্যাপ্টেন কুক কর্তৃক অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড আবিষ্কৃত হয়। ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ৯টি জাহাজে ইংরেজ অপরাধীদের সর্বপ্রথম এ নতুন আবিষ্কৃত অঞ্চলে পাঠানো হয়। ধীরে ধীরে অস্ট্রেলিয়া বাসস্থানের উপযোগী হয়। ৬টি উপনিবেশ সেখানে প্রতিষ্ঠিত হলে সমগ্র অস্ট্রেলিয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
আমেরিকার উপনিবেশগুলো ইংল্যান্ড হারালেও ইংল্যান্ডের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। সপ্তদশ শতকে ওলন্দাজ আবিষ্কারকগণ সর্বপ্রথম অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রতি সভ্য জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সেখানে উপনিবেশ স্থাপনে কোনো রাষ্ট্রই সফল হয়নি।
অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে ইংরেজ নাবিক ও আবিষ্কারক ক্যাপ্টেন কুক কর্তৃক অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড আবিষ্কৃত হয়। ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ৯টি জাহাজে ইংরেজ অপরাধীদের সর্বপ্রথম এ নতুন আবিষ্কৃত অঞ্চলে পাঠানো হয়। ধীরে ধীরে অস্ট্রেলিয়া বাসস্থানের উপযোগী হয়। ৬টি উপনিবেশ সেখানে প্রতিষ্ঠিত হলে সমগ্র অস্ট্রেলিয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
ওয়েকফিল্ডের নেতৃত্বে ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে নিউজিল্যান্ডে ইংরেজ উপনিবেশ স্থাপিত হয়। কানাডার কুইবেক ছিল সর্ববৃহৎ এবং অধিবাসীরা ছিল ফরাসি। স্বভাবতই কুইবেকবাসীরা ছিল ব্রিটিশবিরোধী। ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে কুইবেক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। কানাডা ছিল সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত আমেরিকার সন্নিকটে। আমেরিকার প্রভাবাধীন হতে পারে- এ আশঙ্কায় ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড নর্থ 'কুইবেক Act' পাস করে কুইবেকের জনসাধারণকে ধর্মীয় ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন। ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে কানাডা ডোমিনিয়নের মর্যাদা লাভ করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পায়।
কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার ন্যায় ভারতবর্ষে ইংরেজ অপরাধীদের নির্বাসনজনিত সমস্যা বা শাসতান্ত্রিক সমস্যার উদ্ভব হয়নি। ২০০ বছর ধরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু বণিকদের হাতে ভারতের শাসনভার ছেড়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয় বিবেচনা করে ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে Regulating Act ও ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে পিটের ইন্ডিয়া Act রচনা করে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কোম্পানির রাজ্যে রাজনৈতিক বিষয় পরিচালনার দায়িত্ব পায়। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তার কোম্পানির ভারতস্থ কর্মচারীদের দায়িত্ব ও প্রচেষ্টার ফলেই হয়েছিল।
পলাশী (১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) ও বক্সারের (১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) যুদ্ধের ফলে ভারতে ইংরেজদের অধিকার ক্রমশ বিস্তার লাভ করতে থাকে। পরবর্তী একশ বছর ব্রিটিশ আধিপত্যের অগ্রগতি অব্যাহত থাকে। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তৃত্বের অবসান হয় এবং ভারতের শাসনভার ইংল্যান্ডের রানি ও পার্লামেন্টের হাতে অর্পিত হয়। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড বার্মা অধিকার করে ভারত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে।
ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে পশ্চিমে অরেঞ্জ রিভার থেকে পূর্বে নাটাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিংহল, বার্মার উপকূলাঞ্চল, সিঙ্গাপুর, মালাক্কা প্রভৃতি স্থান দখল করে ইংল্যান্ড ভবিষ্যৎ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত করে। ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড ফিজি দ্বীপপুঞ্জ দখল করে সেখানে উপনিবেশ স্থাপন করে।
হল্যান্ডের উপনিবেশ
১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে ওলন্দাজরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জাভা দ্বীপপুঞ্জ দখল করে উপনিবেশ স্থাপন করে। তাদের শাসনাধীনে জাভার জনসংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। তারা প্রচুর মূলধন বিনিয়োগ করে জাভার অর্থনৈতিক জীবনে রূপান্তর ঘটায়।
আমেরিকার উপনিবেশ
ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতায় আমেরিকাও যোগ দেয়। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জের সাথে আমেরিকার স্বার্থ জড়িত ছিল। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে সামোয়া দ্বীপপুঞ্জ আমেরিকা দখল করে। এরপর ফিলিপাইন, গুয়াম ও ক্যারোলাইন দ্বীপপুঞ্জ আমেরিকার দখলে চলে যায়।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো দক্ষিণ আমেরিকায় উপনিবেশ বিস্তারে উদ্যোগী হয়। কিন্তু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র 'মনরো নীতি' প্রয়োগ করে দক্ষিণ আমেরিকায় ইউরোপীয়দের উপনিবেশ স্থাপন নিষিদ্ধ করে দেয়। তথাপি দক্ষিণ আমেরিকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্রিটেনের অবদান ছিল সর্বাধিক।
ফ্রান্সের উপনিবেশ
অষ্টাদশ শতকে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতে ফরাসি সাম্রাজ্য স্থাপনের আশা বিনষ্ট হয়। নেপোলিয়নীয় যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে আরও কিছু রাজ্য ফ্রান্সকে হারাতে হয়। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম দ্বীপপুঞ্জের কতিপয় দ্বীপ, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের কিছু অঞ্চল ছাড়া ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বলতে অবশিষ্ট আর কিছুই ছিল না। কিন্তু তৃতীয় নেপোলিয়নের শাসনামলে ফরাসি সাম্রাজ্যবাদ নতুন উদ্যমে শুরু হয়। ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে আফ্রিকার অন্তর্গত আলজিয়ার্স, অতঃপর আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ও সেনেগাল, ফরাসি সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দের পর আনাম, কম্বোজ, টলকিন ও নিউ ক্যালেডিনার দ্বীপপুঞ্জ ফরাসি অধিকারে আসে।
সুতরাং উপনিবেশ স্থাপনে ফ্রান্সও অনগ্রসর ছিল না।
রুশ উপনিবেশ
এশিয়ার ভূখণ্ডে রাশিয়ার বিস্তৃতি ছিল সর্বাধিক, লক্ষ্য ছিল সমুদ্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপন করা। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ফলে ইউরোপে রাশিয়ার সম্প্রসারণের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে রাশিয়া এশিয়ার দিকে নজর দেয়। ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে রাশিয়া পারস্য, চীন ও মধ্য এশিয়ায় উপনিবেশ স্থাপনে প্রয়াস নেয়। দক্ষিণাভিমুখে অগ্রসর হয়ে রাশিয়া কাস্পিয়ান সাগরীয় অঞ্চল দখল করে ভারত সীমান্তে এসে পৌঁছে। রুশ সাম্রাজ্যের অগ্রগতি ব্রিটেনের ভারতীয় সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বিপন্ন করে তোলে। ফলে ইঙ্গ-রুশ সম্পর্কে সংকট সৃষ্টি হয়।
কিন্তু পূর্বদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়ার সম্প্রসারণ অত্যন্ত সহজেই হয়। চীন সাম্রাজ্যের তাইপিং বিদ্রোহ এবং ব্রিটেন-ফ্রান্স যুদ্ধ বন্ধের শর্তানুসারে আমুর নদী পর্যন্ত চীনের একটি অংশ রাশিয়া লাভ করে। ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়া ভ্লাদিভস্টকে নৌবন্দর প্রতিষ্ঠা করে কোরিয়ার সন্নিকটে এসে উপস্থিত হয়। ফলে জাপান-রুশ সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং সুদূর প্রাচ্য সমস্যার সৃষ্টি হয়। উনবিংশ শতাব্দীতে রাশিয়া ইউরোপের অন্যতম ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করে।
ঔপনিবেশিক বিস্তারের ফলাফল
(ক) ইউরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রসার দক্ষিণ আফ্রিকা, আমেরিকা, সাইবেরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপিত হলে সেখানে ইউরোপীয় সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে। এ অঞ্চলের অধিবাসীদের অধিকাংশই ছিল ইউরোপিয়ান এবং এদের মাতৃভাষা ছিল ইংরেজি। স্থানীয় অধিবাসীরা ইউরোপীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও আচার-আচরণ গ্রহণ করে কালক্রমে ইউরোপীয় ভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। তারা খ্রিষ্টধর্মও গ্রহণ করে।
কিন্তু এশিয়ায় ও উত্তর আফ্রিকায় ইউরোপীয় সভ্যতা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়। কেননা এতদঞ্চল পাশ্চাত্য সভ্যতার সংস্পর্শে আসার পূর্বেই উন্নত মানের সভ্যতা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান ছিল। এতদঞ্চলে ইউরোপীয় সভ্যতা প্রবর্তন করা হলেও তাদের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ থাকে। তবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার ফলে এসব অঞ্চলের সামাজিক আচার-আচরণ ও রাজনৈতিক আদর্শের বিবর্তন ঘটে।
(খ) অর্থনৈতিক শোষণ: ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর উপনিবেশ বিস্তারের মূলে ছিল শিল্পবিপ্লব। মাতৃভূমির অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতি দৃষ্টি রেখেই উপনিবেশগুলোকে শোষণ করা হয়েছিল। অবশ্য কোনো কোনো উপনিবেশে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছিল।
(গ) উপনিবেশিক সংঘাত: ইউরোপের বাইরে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারের ফলে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর
মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত দেখা দেয়। মিশর ও সুদানকে নিয়ে ইঙ্গ-ফ্রান্স যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ইতালি-ফ্রান্স, ইঙ্গ-রুশ, রুশ-জাপান ও জার্মানি-ফ্রান্সের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিবাদ তীব্র হয়; যা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারের এক নগ্নরূপ।
প্রধান শব্দসমূহের ব্যাখ্যা
- ম্যানর প্রথা: মধ্যযুগে ইংল্যান্ডের কৃষিব্যবস্থায় ম্যানর পদ্ধতি চালু ছিল, যা ছিল ফিউডাল সামন্ততন্ত্রের মূলভিত্তি। যে প্রথার মাধ্যমে একটি গ্রামের সব জমি একত্রে চাষ করে নিজেদের প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন করা হয়, তা-ই ম্যানর প্রথা বা পদ্ধতি। এক বা একাধিক গ্রাম নিয়ে ম্যানর গঠিত হতো।। বেড়াই ম্যানরের সীমানা নির্ধারণের মাপকাঠি ছিল। জীবজন্তুর হাত থেকে রক্ষার জন্য ম্যানরের চতুর্দিকে বেড়া দেওয়া হতো। ভূস্বামী বা লর্ডরা ম্যানরের প্রশাসন পরিচালনা করত। ম্যানরের চাষিরা ভূমিদাস ছিল।
- সামন্ততন্ত্র: সামন্তপ্রথার উদ্ভব মধ্যযুগের ইউরোপের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। শুধু ইউরোপেই সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ঘটেনি। সমগ্র ইউরোপসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে এ প্রথার লক্ষণ লক্ষ করা যায়। খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকে ফ্রান্সে সামন্তপ্রথার উদ্ভব ঘটেছিল। প্রাচীন দাস শ্রমনির্ভর আর্থসামাজিক অবস্থা যখন ভেঙে পড়েছিল, তখন সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ঘটে। ইংরেজি Feudalism (ফিউডালিজম) এর বাংলারূপ সামন্ততন্ত্র বা সামন্তপ্রথা। ল্যাটিন Feodalis (ফিউডালিস) এবং ফরাসি Feodalite (ফেডাডিত) শব্দ থেকে ফিউডালিজম শব্দের উৎপত্তি। সামন্ততন্ত্র মূলত একটি সরকারব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় স্থানীয় ভূ-স্বামীদের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীভূত ছিল।
- টিউডর শাসন: ১৪৮৫-১৬০৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের রাজতান্ত্রিক শাসনই টিউডর শাসন নামে পরিচিত। উক্ত শাসনামলে রেনেসাঁর প্রভাব থাকায় মানুষের মনোজগতে এক আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। টিউডর শাসনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো স্বেচ্ছাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থা স্বেচ্ছাতন্ত্র স্থাপনের অনুকূল ছিল।
- রেনেসাঁ: 'রেনেসাঁ' শব্দের অর্থ পুনর্জন্ম বা পুনর্জাগরণ। কিন্তু সাধারণত ১৫ শতকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রাচীন গ্রিক বিদ্যার চর্চা নতুন করে শুরু হওয়ার কারণে মানুষের চিন্তা ও মনোজগতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়, তাকেই রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণ বলে অভিহিত করা হয়। কিন্তু ব্যাপক অর্থে মানুষের বুদ্ধি, বিবেক ও ব্যক্তিত্বের বিকাশকে রেনেসাঁ বলা হয়।
- স্টুয়ার্ট যুগ: ১৬০৩ থেকে ১৭১৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে স্টুয়ার্ট যুগ বলা হয়। ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক মেকলে রচিত 'ইংল্যান্ডের ইতিহাস' ও ট্রাভেলিয়ান রচিত ইংল্যান্ডে সামাজিক ইতিহাসের স্টুয়ার্ট যুগের জনজীবনের এক চমৎকার আলেখ্য পাওয়া যায়। স্টুয়ার্ট যুগে ইংল্যান্ডে লোকসংখ্যা ছিল পঞ্চাশ-ষাট লাখ। স্টুয়ার্ট যুগে ইংল্যান্ডের অধিবাসীরা বিভিন্ন রকমের আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত থাকত। তবে পল্লিবাসীর অধিকাংশ দরিদ্র জীবন যাপন করত।
- দরিদ্র আইন: সাধারণত দরিদ্রদের জন্য প্রণীত আইনকে দরিদ্র আইন বলা হয়। মূলত দারিদ্র্য দূরীকরণ
ও ভিক্ষাবৃত্তি রোধকল্পে চতুর্দশ শতাব্দী হতে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইংল্যান্ডে যেসব আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয় সেগুলোকেই দরিদ্র আইন বলা হয়। টিউডর যুগ থেকে ইংল্যান্ডের প্রশাসন দরিদ্রদের রিলিফ প্রদানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৬০১ খ্রিষ্টাব্দে রানি এলিজাবেথের প্রাথমিক দরিদ্র আইনে বলা হয় যে, অকর্মক্ষম দরিদ্রকে রিলিফ দেওয়ার জন্য প্রত্যেক প্যারিশে (শ্রমাগার) দরিদ্র রেট ধার্য করতে হবে এবং যে কর্মক্ষম ব্যক্তি কাজ করতে অস্বীকার করবে তাকে শাস্তি প্রদান করা হবে। পরবর্তীতে এলিজাবেথীয় আইন সংশোধন ও সম্প্রসারণ করা হয়। এতে বলা হয়, কাজের জন্য কর্মক্ষম বেকার ব্যক্তিকে শ্রমাগার বা 'ওয়ার্ক হাউজ'-এ পাঠাতে হবে। ওয়ার্ক হাউজ তার জন্য কাজের ব্যবস্থা করবে। তবে তার বাড়ির কাছে কাজ দিতে হবে। শস্যের মূল্য ও পরিবারের সদস্যসংখ্যার ভিত্তিতে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হতো। যারা নির্ধারিত হারের কম পারিশ্রমিক পাবে তাদেরই শুধু রিলিফ দেওয়ার ব্যবস্থা এ আইনের মাধ্যমে করা হয়। - ফালি: ইংল্যান্ডের কৃষিব্যবস্থা ছিল সামন্ততান্ত্রিক। এ সামন্ততান্ত্রিক কৃষিব্যবস্থায় সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হতো। কৃষির খণ্ড খণ্ড জমির নাম ফালি, যা ছড়ানো ছিটানো থাকত অর্থাৎ সুবিন্যস্ত ছিল না। এক একর বা অর্ধএকর ভূমি নিয়ে একেকটি ফালি গঠিত হতো।
- খোলা মাঠ পদ্ধতি: শিল্পবিপ্লব-পূর্ববর্তী ইংল্যান্ডের কৃষকরা তিন বছর পর পর ৩টি ফসল উৎপাদন করত। প্রথম বছর গম, দ্বিতীয় বছর বার্লি এবং তৃতীয় বছর জমি ফেলে রাখা হতো। ফলে বছরে কেবল এক-তৃতীয়াংশ ভূমি কৃষিকাজে ব্যবহৃত হতো। বাকি অংশ খোলা থাকত। যাকে খোলা মাঠ পদ্ধতি বলা হতো। এই খোলা মাঠ পদ্ধতিতে কৃষিকাজ ছিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রবর্তনের একটি প্রতিবন্ধক।
- আর্থার ইয়াং: কৃষি ও পশুপালনে নতুন পদ্ধতি চালু করার জন্য আর্থার ইয়াং নামের একজন কৃষি বিশেষজ্ঞ ইংল্যান্ডের সর্বত্র প্রচারণা চালান, যার ফলে কৃষকরা সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করে। পার্লামেন্টের আইন দ্বারা এবং আর্থার ইয়াং-এর প্রচারণায় ক্ষুদ্র জমির ফালিগুলোকে একত্রিত করে বৃহৎ খামারে রূপান্তরিত করা হয়, যা কৃষি উৎপাদনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন বয়ে আনে।
- বেড়া আন্দোলন: ষোড়শ শতকে কৃষি বেড়া আন্দোলন কৃষিবিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করে, যা শিল্পক্ষেত্রে পরিবর্তনের ব্যাপারে সহায়তা করে। ইংল্যান্ডের উদ্বৃত্ত কৃষিব্যবস্থা শিল্পবিপ্লবে যথেষ্ট সহায়তা করে। ফলে শিল্পবিপ্লবের গতি ত্বরান্বিত হয়।
- টেক অফ ইংল্যান্ডের কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে যখন কারখানাভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠে, তাকে শিল্পবিপ্লবের সূচনাকাল বলে ধরে নেওয়া হয়। উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ Rostow শিল্পের এ অবস্থাকে Take off (টেক অফ) বলে অভিহিত করেছেন। ইংল্যান্ডের শিল্পের ক্ষেত্রে সূচনাকাল বা Take off নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ লক্ষ করা যায়। ঐতিহাসিক Nef টেক অফকে ১৫৪০-১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দ এবং ঐতিহাসিক টয়েনবি ১৭৪০-৮০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শিল্পবিপ্লবের সময়কাল বলে মত দিয়েছেন।
- পুঁজিবাদ ইউরোপীয় শিল্পবিপ্লবের ফলে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসারতার মাধ্যমে সামন্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে যে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে তাই পুঁজিবাদ। যেখানে সম্পত্তির উপর ব্যক্তি মালিকানা স্বীকৃত। উৎপাদন ও বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানা থাকে না। অবাধ প্রতিযোগিতা ও শ্রেণি শোষণ বিদ্যমান পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্র হচ্ছে এমন এক ব্যবস্থা যেখানে শিল্প ও অন্যান্য আইনগত প্রতিষ্ঠানসমূহ এমন একটি স্তরে উপনীত হয় যাতে অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষ উৎপাদনের উপকরণগুলোর মালিকানা থেকে বঞ্চিত হয়ে দিনমজুরে পরিণত হয়।
- ট্রেড ইউনিয়ন: শ্রমিকদের সাধারণ দাবিদাওয়া আদায় ও স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত সমিতি। ট্রেড ইউনিয়ন সাধারণত শ্রমিকদের উচ্চতর মজুরি, ন্যূনতম কাজের সময়, চাকরির স্থায়িত্ব, বোনাস, বিভিন্ন ভাতা, ছুটি বৃদ্ধি, চিকিৎসা, বাসস্থান, গ্রাচুইটি, পেনশন ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধার দাবিতে মালিক বা কর্তৃপক্ষের কাছে দাবিনামা পেশ করে এবং দাবিনামার ভিত্তিতে আন্দোলন করে। দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ঘেরাও, অবস্থান ধর্মঘট, পূর্ণ ধর্মঘট ইত্যাদিরও আশ্রয় নেওয়া হয়। প্রথম দিকে ট্রেড ইউনিয়ন সরকার ও মালিকদের দ্বারা স্বীকৃত ছিল না। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ট্রেড ইউনিয়ন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করতে শুরু করে। বর্তমানে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার শ্রমজীবী মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার।
- রেগুলেটিং অ্যাক্ট: ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে রেগুলেটিং অ্যাক্ট নামে একটি আইন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গৃহীত হয়। আইনটি প্রবর্তনের সাথে সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক বৈশিষ্ট্য লোপ পেয়ে রাজনৈতিক সংস্থায় পরিণত হয়।
- ইন্ডিয়া অ্যাক্ট: ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম পিট ইন্ডিয়া অ্যাক্ট প্রবর্তন করেন। এ আইনে কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার জন্য স্থায়ী নিয়মকানুন প্রবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রাজস্বব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রণয়ন করে কোম্পানির স্থায়ী রাজস্বপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করেন।
- কৃষিবিপ্লব: কৃষি সংগঠন ও কলাকৌশলের মাধ্যমে কৃষিতে মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হলে তাকে কৃষিবিপ্লব বলে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডে খোলা মাঠ পদ্ধতির চাষাবাদের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষাবাদ শুরু হয়, যা কৃষিক্ষেত্রে বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে। কৃষিক্ষেত্রে এরূপ ইতিবাচক পরিবর্তনই কৃষিবিপ্লব। কৃষির সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তনের জন্য ষোড়শ শতকে যে কৃষির বেড়া আন্দোলন শুরু হয়, তা-ই কৃষিবিপ্লবের ভিত্তি রচনা করে। কৃষিবিপ্লবের প্রভাবেই শিল্পবিপ্লব ঘটে।
- গোলাপের যুদ্ধ (১৪৫৫-১৪৮৫ খ্রিষ্টাব্দ): টিউডর যুগের রাজা ষষ্ঠ হেনরির সময়ে রাজপরিবারের দুই
শাখার মধ্যে সিংহাসন নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। এ বিবাদ যুদ্ধে রূপ নিয়ে 'দুই গোলাপের যুদ্ধ' নামে পরিচিতি পায়। কেননা বিদ্যমান দলের ইয়র্কপক্ষীয়রা 'শ্বেত গোলাপ' ও ল্যাংকাস্টারপক্ষীয়রা 'লাল গোলাপ' চিহ্নস্বরূপ ব্যবহার করত বলে এ যুদ্ধের এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। ৩০ বছরব্যাপী দুই গোলাপের যুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডের উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন চতুর্থ এডওয়ার্ড, পঞ্চম এডওয়ার্ড ও তৃতীয় রিচার্ড। - এনক্লোজার (Enclosure) আন্দোলন: ইংল্যান্ডের সামন্ততান্ত্রিক কৃষিব্যবস্থায় ম্যানরের জমিদাররা
অর্থাৎ ভূস্বামীরা বেড়া দিয়ে ম্যানরের সীমানা নির্ধারণ করত। বেড়া অর্থাৎ Enclosure বা বেষ্টনীর মাধ্যমে জমিদাররা ছোট ছোট ভূমিখণ্ডগুলো গ্রাস করত। অষ্টাদশ শতকে সাধারণ কৃষকরা জমির অধিকার পেতে বেড়া বা বেষ্টনীর বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে তোলে তা 'বেষ্টনীকরণ আন্দোলন' নামে খ্যাত। - ঔপনিবেশিক শাসন: সাম্রাজ্যবাদী শাসনই ঔপনিবেশিক শাসন। নিজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য জনগোষ্ঠীর ভূখণ্ড ছলেবলে বা কৌশলে দখল করে সেই দেশে যে ভিনদেশি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয় তা-ই ঔপনিবেশিক শাসন। শিল্পবিপ্লবপ্রসূত পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তার অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সবচেয়ে বেশি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে ইংল্যান্ড।
বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই
Read more