পাঠ-১.৬ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা।

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

50

অন্য জনগোষ্ঠীর ভূখণ্ড দখল করে যে পরদেশি শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয় তাকেই উপনিবেশিক শাসন বলা হয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগেও বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠী অন্য ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে শাসন করতো। তবে ঐ সময়ের শাসন ছিল বিভিন্ন রাজা বা বাদশাহদের। তেমন কোনো বাণিজ্যিক বা পুঁজি গঠন বা সঞ্চয়ী পরিকল্পনা তাতে ছিল না। কেননা, সেই সময়ে বাণিজ্য ও পুঁজি তৈরির অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সচল ছিল না। তবে বিদেশি শাসন পনের-ষোল শতকের পর নতুন লক্ষ্য ও চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হয় যখন দখলকৃত ভূখণ্ডের সম্পদ আহরণের মাধ্যমে দখলকারী দেশ ও শাসক গোষ্ঠীসমূহ নিজ দেশে পুঁজির বিকাশ সহজে ঘটাতে সক্ষম হয়। সেই লক্ষ্য নিয়ে সতের-আঠারো শতক পরবর্তী সময়ে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে ইউরোপের বেশ কিছু দেশ প্রথমে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রবেশ করে। তবে শেষ পর্যন্ত তারা সেখানে শাসন ক্ষমতা দখল করে নেয়। ইতিহাসে আধুনিক যুগের বিদেশি দখলদারী শাসনকেই উপনিবেশিক শাসন নামে অভিহিত করা হয়। নিজেদের নগরসমূহের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্যে পুঁজির আদি সঞ্চয়নের লক্ষ্যেই এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে এসব উপনিবেশ স্থাপন করা হয়। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ, ফরাসি ও ডেনমার্কের বণিকগণ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে প্রথমে বিভিন্ন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে। হল্যান্ড ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাচ্যের দেশ ইন্দোনেশিয়ায় উপনিবেশ স্থাপন করে। সতের শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই কোম্পানি আফ্রিকা মহাদেশের রুয়ান্ডা, এলমিন ও কাভোকর্সো দখল করে। এ সময়ে পর্তুগিজ ও স্পেনিশগণও আফ্রিকা মহাদেশে ঘাঁটি স্থাপন করতে থাকে। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে রানি এলিজাবেথ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

রানি এলিজাবেথ

অনুমোদন দেন। এ কোম্পানি ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মসনদ দখলের মাধ্যমে ভারতবর্ষে ইংরেজ কোম্পানির উপনিবেশ স্থাপন শুরু হয়। ইংরেজরা সতের শতকেই উপনিবেশ স্থাপনে ওলন্দাজদের পেছনে ফেলে দিতে সক্ষম হয়। মার্কিন মুল্লুকে তাদের উপনিবেশ স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ফ্রান্সের বণিক সমিতির সঙ্গেও ইংরেজদের দ্বন্দ্ব তীব্র হতে থাকে। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ফরাসি উপনিবেশ ছিল। এ ছাড়া আফ্রিকা মহাদেশেও ফরাসিদের বাণিজ্যকুঠি ছিল। ফরাসি ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আঠারো শতকে ভারতে উপনিবেশ স্থাপনে সচেষ্ট ছিল। তবে ১৭৫৬-৬৩ খ্রিস্টাব্দের সাত বছরব্যাপী যুদ্ধে ইংরেজরা ফরাসিদের পরাজিত করার মাধ্যমে উপনিবেশ বিস্তারে এগিয়ে যায়। উপনিবেশ নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে যায়। বিশেষত ১৭৭৫ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ একদিকে শিল্প বিপ্লবের উত্থান, অন্যদিকে ইউরোপে সামন্ত-রাজনৈতিক শাসনের অস্তগামী অবস্থা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের উত্থান, জার্মানি ও ইতালি রাষ্ট্রের একত্রীকরণ ইউরোপের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। যদিও ১৭৭৫-১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন মুল্লুকে ১৩টি কলোনিতে ব্রিটেনের কর্তৃত্বের অবসান ঘটে, তথাপিও ব্রিটিশরা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে উপনিবেশের বিস্তার ঘটিয়ে তাদের শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়। ক্যারিবীয় সাগর এবং ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ফরাসিদের বেশির ভাগ কলোনিই ইংরেজরা দখল করে নেয়। যে কারণে উনিশ শ শতকের শুরুকে ফরাসি উপনিবেশের পরিসমাপ্তি বলে অভিহিত করা হয়। ইংরেজরা হল্যান্ডের উপনিবেশগুলো দখল করে নেয়। উল্লেখযোগ্য উপনিবেশগুলো হচ্ছে শ্রীলংকা (১৭৯৫-৯৬), জাভা (১৮১১), দক্ষিণ আফ্রিকা (১৭৯৫-১৮০৬), ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি। উনিশ শতকের শুরুর দিকে স্পেনের উপনিবেশ ছিল সবচেয়ে বেশি। স্পেনের

সামরিক ক্ষমতা ভেঙ্গে পড়ে উনিশ শতকের বিশের দশকেই। ব্রাজিলে পর্তুগিজ কলোনি ব্রিটিশরা দখল করে নেয়। মাল্টা, শ্রীলংকা, মাওবিক, টগো ইংরেজদের হস্তগত হয়। এর ফলে উনিশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ড সবচেয়ে বেশি উপনিবেশে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। ফরাসি, ওলন্দাজ, স্পেন ও পর্তুগিজদের পেছনে ফেলে দিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশ তখন একচ্ছত্র হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ড এই সময়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে তাদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষতো তাদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। আফগানিস্তান, সিঙ্গাপুর (১৮১৯), দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অঞ্চল, চীন, জাপানেও প্রভুত্ব বিস্তারে সচেষ্ট ছিল ইংল্যান্ড। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু অঞ্চলে তাদের দখল অথবা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবীর প্রায় ১২০ মিলিয়ন মানুষ ব্রিটিশ উপনিবেশে বসবাস করতো, ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীন ১১ মিলিয়ন বর্গ কি.মি. জায়গা ছিল। এ কারণে ব্রিটেনে ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে উপনিবেশ মন্ত্রণালয় নামে একটি বিশেষ মন্ত্রণালয় স্থাপন করা হয়। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের পর ফ্রান্স উপনিবেশ স্থাপনে আবার মনোযোগ দেয়। ত্রিশবর্ষ ব্যাপী রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে আলজেরিয়া দখল করা হয়। তিউনিস ও মরক্কোতে ফরাসি উপনিবেশ স্থাপিত হয়। ষাটের দশকে পশ্চিম আফ্রিকা, সত্তরের দশকে ইন্দোচীন অঞ্চল, ভিয়েতনাম (১৮৫৪-১৮৬৪) দখল করে ফ্রান্স। কম্পুচিয়াতে প্রভাব প্রতিষ্ঠা, পলেনিজ দ্বীপপুঞ্জ (১৮৪২-৪৭); নতুন কালেডন (১৮৫৩) দ্বীপ দখল করা সম্ভব হয়। ১৮৬৯ সালে ফরাসিরা সুয়েজখাল খননের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সংযোগ সৃষ্টির ফলে ইউরোপীয়দের উপনিবেশ বিস্তার আরো সহজ হয়। ফ্রান্স উপনিবেশ বিস্তারে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করে। ঐ সময়ে হল্যান্ড তার কলোনি পুনরুদ্ধারে ইন্দোনেশিয়া ও জাভা অঞ্চলে তৎপর হয়ে ওঠে। তবে ইংরেজদের প্রতিরোধের মুখে তা খুব একটা সফল হয়নি।

উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকা, চীন, জাপান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্ত ারে তৎপর হয়ে ওঠে। রাশিয়াও ঐ সময় উপনিবেশ বিস্তারে সক্রিয় হয়। নবগঠিত জার্মানি (১৮৭০) এবং ইতালি (১৮৭০) রাষ্ট্রদ্বয়ও ঐ সময় তাদের বাজার সৃষ্টির জন্যে উপনিবেশ খোঁজায় মনোনিবেশ করে। ফলে ইউরোপের চিরায়ত এবং নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার বেশির ভাগই কলোনি তথা উপনিবেশ স্থাপনে উনিশ শতকের শেষ দিকে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এর মূলে ছিল শিল্প বিপ্লবের যুগে এই সব দেশ অন্য ভূখণ্ড থেকে দাস ব্যবসা, কাঁচামাল সংগ্রহ, সম্পদের পাচার ও নিজেদের দেশে ব্যবহারের ফলে যে বিপুল পরিমাণ পুঁজি ও সম্পদ লাভের সুযোগ পায় তাতে বহির্বাণিজ্য তথা উপনিবেশ স্থাপন জরুরি হয়ে পড়ে। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে প্রায় ১০ কোটি মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেশগুলো বিপুল পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয়েছে। এছাড়া কাঁচামালের পর্যাপ্ত যোগান, পণ্যদ্রব্যের বিক্রি, পুঁজির বিনিয়োগের ক্ষেত্র সৃষ্টি, অতিরিক্ত জনশক্তি, জীবিকা যোগানের ব্যবস্থা, নৌ ও জাহাজ শিল্পকে উৎপাদনশীল এবং লাভজনক করে তোলা, সোনা, রূপাসহ মূল্যবান সম্পদ লুটের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা, অসম বিনিময় হারের মাধ্যমে প্রভূত সম্পদের অধিকারী হওয়া ইত্যাদি উপায়ে ইউরোপীয় দেশগুলো, মূলত ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স নিজেদের দেশের শিল্প ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়। উপনিবেশগুলোর সম্পদ ও মানুষই সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের পণ্য রপ্তানির বাজারও ছিল এ সব উপনিবেশ। যুদ্ধের অস্ত্র উৎপাদন, কেনাবেচাতেও এ সব উপনিবেশের জনসম্পদ এবং সম্পদ যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ফলে ইউরোপের দেশগুলো উনিশ শতকে এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশে তাদের উপনিবেশে স্থায়ীভাবে শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) পর্যন্ত এই ব্যবস্থা অটুট ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে এশিয়া এবং আফ্রিকায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয়তাবাদের বিস্ফোরণ ঘটলে এক একটি দেশ স্বাধীনতা লাভকরতে থাকে, উপনিবেশবাদের পতন অনিবার্যভাবে ঘটতে থাকে। ইতিহাসে এটিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং স্বাধীনতার পর্ব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তানের পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব রাষ্ট্রসভায় আবির্ভূত হয়। এভাবে পৃথিবীতে প্রায় দেড় শতাধিক রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক অবস্থা থেকে মুক্তি লাভকরেছে। অবসান ঘটেছে উপনিবেশবাদের।

সারাংশ: আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে শিল্প বিপ্লব। এটি প্রথম শুরু হয় ইংল্যান্ডে। বয়ন শিল্পের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু হয়। শিল্প বিপ্লব গোটা সামন্ত অর্থনীতির অবশিষ্টকে সমূলে উৎপাটনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবদান রাখে। বয়ন শিল্পের প্রসার স্থল, জল, রেল, টেলিফোন ব্যবস্থা, খনিজ পদার্থের উত্তোলন এবং পণ্য উৎপাদনের পথ প্রশস্ত করেছে। ইংল্যান্ড থেকে শিল্প বিপ্লব ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে ইউরোপের অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের প্রসার, রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা এবং শিক্ষা সংস্কৃতিতে জ্ঞানের চর্চা, প্রযুক্তির উদ্ভাবন ইউরোপকে দু'শ বছরেই অভাবনীয় উন্নতি দিতে পেরেছে। ইউরোপের প্রভাবে অন্যান্য মহাদেশেও আধুনিক আর্থ- সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিল্প বিপ্লব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

শিল্প বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...