পাঠ-৮.৬: বার্লিন প্রাচীরের অবসান।.

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

20

Collaps of Berlin Wall

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, বার্লিন সমস্যা তারই একটি অংশ। বার্লিন সমস্যার শুরু যুদ্ধোত্তর যুগেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ঐক্যবদ্ধ জার্মানির রাজধানী বার্লিন সোভিয়েত বাহিনীর দখলে চলে যায়। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে এপ্রিল থেকে সমগ্র বার্লিনের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা সোভিয়েত সেনাধ্যক্ষ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। ইয়াল্টা ও পটসডাম চুক্তি অনুযায়ী জার্মানিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। সে উদ্দেশ্যে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী (যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স) ও রাশিয়া অধিকৃত ৪টি অঞ্চলে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য একটি মিত্রপক্ষীয় নিয়ন্ত্রণ কমিশন নিযুক্ত করে। উল্লেখ্য যে, জার্মানিকে উল্লিখিত ৪টি রাষ্ট্র চার ভাগে ভাগ করে নিজেদের মতো করে শাসন করে আসছিল। নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সদর দপ্তর বার্লিনে অবস্থিত হওয়ায় পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর সৈন্যরা বার্লিনে প্রবেশ করে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে পশ্চিমা শক্তি নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে অসহযোগিতার কারণে কমিশনের কার্যক্রমে ভাটা পড়ে।

ইতিপূর্বে জার্মানির পশ্চিমাংশকে মিত্রত্রয় ত্রিপক্ষীয় এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। অর্থাৎ দখলি স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে শক্তিবর্গ জার্মানিকে এরূপ করার কারণ সাম্যবাদভীতি। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর আশঙ্কা ছিল, সোভিয়েতের সাম্যবাদের আদর্শ পশ্চিমাংশে প্রসার লাভ করতে পারে। প্রসার ঘটলে রাশিয়া জার্মানিকে বিরোধী ঘাঁটিতে পরিণত করবে।

ভূরাজনৈতিক কারণে জার্মানির গুরুত্ব মিত্রজোটের কাছে যেরূপ ছিল, রাশিয়ার কাছেও তদ্রূপ ছিল। দুই শক্তিশিবিরের এরূপ প্রতিযোগিতার ফলে জার্মানিকে অর্থনৈতিকভাবে একই এলাকা হিসেবে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২০শে জুন ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমাংশের নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রত্রয় তাদের অধিকৃত এলাকায় মুদ্রাব্যবস্থার সংস্কার করে নতুন মুদ্রা 'মার্ক' চালু করে। মুদ্রাব্যবস্থা প্রবর্তনের দ্বিতীয় দিনে সমগ্র বার্লিনে সোভিয়েত রাশিয়া মুদ্রাব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২৩শে জুন থেকে তা কার্যকর হবে বলে ঘোষণা করে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পশ্চিমা শক্তিবর্গ সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘোষণাকে অবৈধ ও বাতিল বলে ঘোষণা দিয়ে তাদের প্রবর্তিত মুদ্রা সংস্কার ব্যবস্থাকে কার্যকরী করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্থনীতি পৃথকীকরণের পশ্চিমাদের ব্যবস্থা অকার্যকর করতে উদ্যোগ নেয়। পূর্ব বার্লিনের সাথে যোগাযোগের পথ অবরুদ্ধ করে রাখে; যা প্রথম বার্লিন সংকটের জন্ম দেয়। এ অবরোধের উদ্দেশ্য ছিল, বার্লিনের পশ্চিমাংশের বেসামরিক জনগণের উপর অমানসিক চাপ সৃষ্টি করা, যাতে পশ্চিমা শক্তি বার্লিন ত্যাগে বাধ্য হয়।

এ সময় পূর্ব বার্লিনের সোভিয়েত সেনাধ্যক্ষ 'সকলোভস্কি' পশ্চিমা শক্তিবর্গকে বার্লিন ছেড়ে যাওয়ার দাবি জানান। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তি-জোট যথেষ্ট দৃঢ়তার পরিচয় দেয় এবং বার্লিনে তাদের অধিকার ধরে রাখতে সংকল্পবদ্ধ হয়। পশ্চিম বার্লিনের জনসাধারণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিমান থেকে প্রচুর খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করে এক বিরাট পরিকল্পনা কার্যকর করে, যা ইতিহাসে বিরল। মার্কিনিদের এ মনোভাবই প্রমাণ করে, সোভিয়েত চাপ যতই হোক নতিস্বীকার করা যাবে না।

৬ই জুলাই ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমা শক্তিবর্গ বার্লিনে তাদের প্রবেশাধিকারের বৈধতা আছে বলে দাবি জানায়। জবাবে রাশিয়া জানায় যে, পশ্চিমা শক্তি ইয়াল্টা ও পটসডাম চুক্তি লঙ্ঘন করে পশ্চিমাংশে সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে মুদ্রাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। অবশেষে বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত হয়। রাশিয়া ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করলে এর কোনো সুষ্ঠু সমাধান হয়নি। ফলে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে পশ্চিমা শক্তিবর্গ নবসংস্কারকৃত জার্মান মার্ক জার্মানির পশ্চিমাংশের একমাত্র বৈধ মুদ্রা বলে চালু করে।

অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বর নরম হয়। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে যোগাযোগব্যবস্থার উপর অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। এভাবে প্রথম বার্লিন সংকটের মীমাংসা হয়। দশ বছর চলার পর দ্বিতীয় বার্লিন সংকটের উদ্ভব হয়। ১০ই জুলাই, ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে পূর্ব জার্মান নেতা "ওয়াল্টার উলব্রিখত' বক্তৃতায় বলেন, "জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের মধ্যে অবস্থিত পশ্চিম জার্মানি ঠাণ্ডা লড়াইয়ের একটি দ্বীপ।"' সোভিয়েত ইউনিয়ন এ সময় বার্লিনে পশ্চিমা শক্তিবর্গের অধিকারের বিরুদ্ধে প্রবল সমালোচনা করা শুরু করে। পটসডাম চুক্তির স্থিতাবস্থা বজায় না রাখার জন্য রাশিয়া পশ্চিমাদের দোষ দেয়। পশ্চিম বার্লিন উন্মুক্ত নগরী বলে দাবি করে। রাশিয়া চরমপত্রের মাধ্যমে পশ্চিমাদের ছয় মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানায়। দ্বিতীয় বার্লিন সংকটটি 'সময়সীমাসংক্রান্ত সংকট' নামে অভিহিত।

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে আটলান্টিক পরিষদে বিষয়টি উত্থাপিত হলে বলা হয়, কোনো রাষ্ট্রেরই আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘনের অধিকার নেই। বার্লিন সমস্যার যৌথভাবে সমাধান হওয়া উচিত। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ক্রুশ্চেভ আলোচনায় বসতে রাজি হন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোটামুটিভাবে বার্লিন নিয়ে আর বড় কোনো সংকটের উদ্ভব হয়নি।

১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসন বার্লিন সফর করলে বার্লিন সংকট আবার চাঙ্গা হয়। জনসন পশ্চিমা জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাত্রার প্রতি বার্লিনবাসীকে প্রলোভন দেখালে পূর্ব বার্লিনবাসী দারুণভাবে আকৃষ্ট হয়। হাজার হাজার পূর্ব জার্মান নাগরিক পাশ্চাত্যে চলে যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে পশ্চিম বার্লিনের দিকে ধাবিত হতে থাকে। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ইতিমধ্যে পশ্চিম ও পূর্ব বার্লিনের মানুষের মধ্যে জীবনযাত্রার মানে বেশ পরিবর্তন ও পার্থক্য দৃশ্যমান হয়ে গিয়েছিল। তাদের পূর্ব বার্লিনে ফিরে আসার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও কোনো কাজ হয়নি। বরং পূর্ব বার্লিনবাসী আরও অধিক হারে পশ্চিমের দিকে পালাতে থাকে। এ ধরনের বহুসংখ্যক লোকের বহির্গমন রোধকল্পে পূর্ব জার্মান সরকার ১২ই আগস্ট পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মধ্যকার সীমারেখা বন্ধ করে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরামর্শে নাগরিকদের বহির্গমন ঠেকানোর জন্য পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের সীমারেখা বরাবর ১৫৫ কি.মি. দীর্ঘ সিমেন্টের দেয়াল দিয়ে পৃথক করে ফেলে। এটাই হলো বার্লিন প্রাচীর নির্মাণের পটভূমির ইতিহাস। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ক্রিসমাসের (এদিন দুই জার্মানির মতৈক্য হয়) পূর্ব পর্যন্ত বার্লিনের দুই অংশের বাসিন্দারা কেউ কারও মুখ দেখেনি।

গর্বাচেভের উত্থানের পূর্ব পর্যন্ত বার্লিন সমস্যার জট আর খোলেনি। গর্বাচেভ ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের জুনে পশ্চিম জার্মানি সফর করতে গেলে রাশিয়া-পশ্চিম জার্মানি যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়। তাতে বলা হয়, সকল জাতি ও দেশের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার আছে। ফলে জার্মানির জাতি-রাষ্ট্র সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের কঠোর নীতির পরিবর্তে নমনীয় নীতি চালু হলে এবং ইউরোপীয় বিপ্লবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পূর্ব জার্মানিবাসী ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই নভেম্বর জাতি বিভক্তির প্রতীক বার্লিন দেয়াল ভেঙে ফেলে, যা জার্মানির একত্রীকরণের পথকে সুগম করে। তিন যুগেরও অধিককাল যে দেয়াল একটি শহর তথা একটি জাতি এবং একটি রাষ্ট্রকে পৃথক করে রেখেছিল, ভেঙে ফেলার মধ্য দিয়ে তার অবসান হয়। রক্তের সাথে রক্তের, ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের, মেয়ের সাথে মায়ের মিলন ঘটে।

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...