Reform Movements
পলাশীর যুদ্ধের পর বাঙালি জাতি এক চরম অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনে নানা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে বাঙালি জাতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যায়। বাঙালি জাতির এ চরম দুর্দিনে আবির্ভাব ঘটে কয়েকজন মনীষীর। যারা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে অধঃপতনে নিমজ্জিত বাঙালি জাতির মধ্যে নবজাগরণের সৃষ্টি করে। আর এই নবজাগরণের ফলেই বাংলার মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটিয়ে আধুনিক যুগের সূচনা হয়। ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে সনদ আইন এবং ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজা রামমোহন রায়ের সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাতের মধ্য দিয়ে এর পরিপূর্ণ অগ্রগতি লক্ষ করা যায়।
রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩ খ্রি.) [Raja Ram Mohan Roy (1772-1833 AD)]
বাংলা তথা ভারতে নবজাগরণের ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান অপরিসীম। তিনি ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২২ মে হুগলী জেলার আরামবাগ মহকুমার রাধানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রামকান্ত রায় জমিদার এবং মাতা তারিনী দেবী গৃহিণী। বাল্যকালে ফারসি ও আরবি ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি তিব্বত গিয়ে বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তিনি এক ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। হিন্দুধর্মের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী সমালোচনা করে তিনি খ্যাতি লাভ করেন।
সমাজের সংস্কারপন্থী ব্যক্তিদের নিয়ে ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে 'আত্মীয় সভা' গঠন করে সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু করেন। দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, কালীনাথ রায় প্রমুখ উক্ত সভায় যোগদান করেন। ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পৌত্তলিকতা সম্পর্কে বিতর্কে জয়লাভ করেন। 'একেশ্বরবাদ হিন্দুশাস্ত্রসম্মত এবং ধর্মের সঙ্গে মানবতাবাদ অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত'- এই মত রাজা রামমোহন রায় ঘোষণা করেন।

পিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতায় ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ব্রহ্মসভা স্থাপন করেন। ব্রহ্মসভার দ্বারা সকল একেশ্বরবাদীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। পরের বছর অর্থাৎ ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের মাধ্যমে হিন্দু সমাজের অমানবিক বর্বর প্রথা 'সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ আইন' পাস করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। নারী মুক্তির লক্ষ্যে স্ত্রী শিক্ষা বিস্তার, বিধবাদের স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন।
সমাজ সংস্কারের পক্ষে মতামত প্রকাশের জন্য তিনি "সংবাদ কৌমুদী" পত্রিকা প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ১ লক্ষ টাকা পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্য ব্যয় করতে অনুরোধ করেন। এভাবে দেখা যায়, নবজাগরণের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাতি তারকা রামমোহনের প্রভাব রয়েছে। এ কারণে তাকে "আধুনিক ভারতের জনক" বলা হয়।
রবীঠাকুর তাকে 'ভারত পথিক' আখ্যায়িত করেছেন। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টলে এ মহান ব্যক্তির মৃত্যু হয়
পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১ খ্রি.) [Pandit Ishwar Chandra Vidyasagar (1820-1891 AD)]
রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর শুকিয়ে যাওয়া সমাজ সংস্কারের হাল ধরেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি বিদ্যাসাগর নামেই পরিচিত। তিনি কলকাতার মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শ্রী ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতার একজন দোকান কর্মচারী। মাতা ভগবতী দেবী। গ্রামের পাঠশালায় পাঠ সমাপ্ত করে আট বছর বয়সে গ্রামের বাড়ি থেকে পিতার সঙ্গে পদব্রজে কলকাতায় গমন করেন। সেখানে ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুন সরকারি সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজে একাদিক্রমে বারো বছর অধ্যয়নকালে ব্যাকরণ, কাব্য, বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায়, অলঙ্কার 'ও জ্যোতিষ শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে এসব বিষয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি 'বিদ্যাসাগর' উপাধি লাভ করেন। অধ্যয়ন শেষে ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ ডিসেম্বর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগে হেড পণ্ডিত পদে যোগদান করেন। এখানে পাঁচ বছর তিন মাস অধ্যাপনা করার পর ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ৪
এপ্রিল সংস্কৃত কলেজে সহকারী সম্পাদক পদে যোগদান করেন। পরে এ কলেজে তিনি সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক পদ গ্রহণ করেন (১৮৫০)। ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উক্ত কলেজের অধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করেন। তিনি সংস্কৃত কলেজে ইংরেজি শিক্ষা আবশ্যককরণ সহ শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা (১৮৫১), ব্যাকরণ কৌমুদীর ৪টি খণ্ড (১৮৫৩-১৮৬২), বর্ণ পরিচয় (১৮৫৫) প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য তাকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়। তাঁর পূর্ববর্তী লেখকদের গদ্য সাহিত্য ও ছন্দে মাধুর্যের অভাব ছিল। বিদ্যাসাগরের হাতেই বাংলা গদ্যের মুক্তি সূচিত। তাঁর অন্যতম সংস্কার বিধবা বিবাহ চালু (১৮৫৬), বহু বিবাহ প্রথা বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ। দান-দাক্ষিণ্যের জন্যও তার সমান খ্যাতি রয়েছে। প্রবাসী মাইকেল মধুসূদনও তাঁর দানের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
Read more