দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ও সমতার নীতির উপর জাতিসংঘের সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘ পৃথিবীর বৃহৎ সংগঠন। এর আঙ্গিক যেমন বড়, তেমনি এর আবর্তও বড়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় এর উদ্ভব। জাতিসংঘ উদ্ভবের পেছনে বৃহৎ শক্তির ভূমিকা প্রাধান্য পেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ছিল বৃহৎ শক্তি। বিশ্ব পরিস্থিতি ও রাজনীতি এ দু'শক্তির দ্বারা বহুলাংশে পরিচালিত হতো। যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ামকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ করে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়স্তা হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেবিশ্ব নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তাদের এ উপলব্ধি এবং পরবর্তীকালে তাদের আন্তরিক ভূমিকা জাতিসংঘ সৃষ্টির সূচনা করে। 'লন্ডন ঘোষণা'র মাধ্যমে তাদের মহৎ উদ্যোগের প্রতিফলন ঘটে। জার্মান নাৎসি বাহিনীর বোমাবর্ষণের আতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। তাদের লন্ডনস্থ জেমস প্রাসাদের আলোচনার সারাংশ 'লন্ডন ঘোষণায়' (১২ই জুন, ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দ) প্রকাশ পায়। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রচিত এ ঘোষণায় আগ্রাসনমুক্ত পৃথিবী এবং সবার জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাপূর্ণ বিশ্ব সৃষ্টির প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
জার্মান বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণে যখন মিত্রশক্তি কোণঠাসা এবং জার্মানি রাশিয়া আক্রমণ করে বসে তখন যুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণ করতে রুজভেল্ট ও চার্চিল আটলান্টিক মহাসাগরে একটি জাহাজে মিলিত হন। তাদের পারস্পরিক সিদ্ধান্ত 'আটলান্টিক সনদ' নামে পরিচিত; যাতে যুদ্ধোত্তর বিশ্বে মিত্রপক্ষের রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎ নীতি কী রকম হওয়া উচিত তা প্রাধান্য পায়।
যুদ্ধকালীন ৩টি বিখ্যাত সম্মেলনে বৃহৎ শক্তির ভূমিকায় জাতিসংঘ উদ্ভবের প্লাটফর্ম তৈরি হয়। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত 'মস্কো সম্মেলন' এর একটি। মস্কো সম্মেলনে বৃহৎ চার শক্তির (যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া ও চীন) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পর 'চতুর্জাতি ঘোষণা' প্রকাশ পায়; যাতে যুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণ, পরাজিত শত্রুর বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রাধান্য পায়। জার্মানির নৃশংসতার বিষয়ে চার বৃহৎ রাষ্ট্র ঐকমত্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়, যা বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার বহিঃপ্রকাশ। সিদ্ধান্ত হয় যে, জার্মানিকে অভিযুক্ত করে ন্যুরেমবার্গে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি বাস্তবায়ন করা হবে।
বৃহৎ তিন শক্তির (ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া) অংশগ্রহণে ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর-ডিসেম্বরে তেহরানে যে সম্মেলন হয় তাতে সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় বিষয়ই প্রাধান্য পায়। বিশ্বের তিন নেতা (মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট স্ট্যালিন ও ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল) সমগ্র বিশ্বের কাছে যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটা ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। যুদ্ধ ও শান্তির সময় এ তিন রাষ্ট্র একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। মূলত ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত 'ইয়াল্টা সম্মেলনে' যুদ্ধোত্তর শাস্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ব্রিটেন প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ইয়াল্টা সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছিল। রুজভেল্ট চাচ্ছিলেন খুব দ্রুত রাশিয়ার সাথে উদ্ভূত সমস্যা দূর করে যত দ্রুত সম্ভব ঐকমত্যে পৌঁছে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার কাজ শেষ করতে। ব্রিটেনের লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় সমস্যা সমাধানের কৌশল আবিষ্কার করা। রাশিয়ার মনোভাব ছিল, অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ব্যাপারে অপরাপর বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর সাহায্য ও সহযোগিতার ব্যাপারে নিশ্চিত আশার বাণী আদায় করা। ইয়াল্টা সম্মেলনে বৃহৎ শক্তিগুলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ গঠন-সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।
উপরের আলোচনা থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, জাতিসংঘের জন্মবৃত্তান্তের সাথে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর
চিন্তাধারা, আদর্শ ও চেতনা বিবর্তিত হতে হতে জাতিসংঘে এসে সাংগঠনিকভাবে রূপায়িত হয়েছে। এর উদ্ভবে সহযোগিতা করেছেন পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ। বৃহৎ শক্তির অবদানকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। সূচনা পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সোভিয়েত রাশিয়ার দক্ষ, নিপুণ ও পারদর্শী নেতৃবৃন্দ জাতিসংঘের গঠনকাজে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছাড়া জাতিসংঘ সনদের মতো জটিল বিষয় এত দ্রুত প্রস্তুত করা সম্ভব হতো না। বৃহৎ শক্তিবর্গের সদিচ্ছা ছাড়া এবং তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি না হলে জাতিসংঘের মতো একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক সংগঠনের উদ্ভব এত দ্রুত হতো কি না সন্দেহ।
স্থায়ী সদস্যের নাম স্থির করার আগে 'সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনে' দীর্ঘ বিতর্ক চলে। বৃহৎ শক্তিবর্গের এরূপ ধারণা জন্মেছিল যে, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ব্যাপারে ঐকমত্যে উপনীত হতে না পারলে তাদের প্রচেষ্টা বাস্তব রূপ লাভ করতে পারবে না। তাই বৃহৎ শক্তিবর্গকে এক জায়গায় এনে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে স্থায়ী সদস্যপদের নিয়ম রাখা হয়। বলা বাহুল্য, এ ব্যবস্থা প্রবর্তনের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকাই ছিল বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তিকে পরাজিত করে যারা সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও কূটনৈতিক সুচতুরতা প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল, তারাই পুরস্কারস্বরূপ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে ওয়াশিংটনের 'ডাম্বারটন ওকসের' সম্মেলনে তিন বৃহৎ শক্তির সাথে চীনেরও ভূমিকা ছিল। মূলত এ সম্মেলনেই বিশ্ব সংগঠনের নাম স্থির করা হয় UN অর্থাৎ সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল 'সানফ্রান্সিসকো' শহরে বৃহৎ তিন রাষ্ট্র মিলিত হয়ে জাতিসংঘ সনদ রচনা করে। কাজেই জাতিসংঘের গঠনপ্রক্রিয়ার সাথে বৃহৎ তিন রাষ্ট্রের ভূমিকাই ছিল অধিক। প্রতিষ্ঠাকালীন দীর্ঘ চার বছর বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে শক্তি-দ্বন্দ্ব থাকলেও তা প্রকট হয়নি। প্রতিষ্ঠার অল্পদিনের মধ্যেই বৃহৎ শক্তিগুলোর রাজনৈতিক আদর্শ শক্তি-দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। সমতার নীতি ধারণ করে এটা প্রতিষ্ঠিত হলেও বৃহৎ শক্তিগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সাথে এ নীতি অনেক সময় অনুসরণ করেনি। নতুন রাষ্ট্রের সদস্যভুক্তি নিরাপত্তা পরিষদের অর্থাৎ বৃহৎ শক্তির ইচ্ছাধীন থাকায় সদস্য অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে তারা হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সহযোগিতার প্রশ্নে বৃহৎ শক্তিগুলো বরাবর অধিক ভূমিকা রাখে। বৃহৎ শক্তিগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাষ্ট্রে সহযোগিতা দিয়ে বিশ্ব মানবতার কল্যাণে ও দুর্গতি লাঘবে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। সদস্যভুক্ত সকল রাষ্ট্রের জাতিসংঘে প্রদেয় চাঁদার পরিমাণ সমান নয়। বৃহৎ ও উন্নত রাষ্ট্রগুলোর চাঁদার পরিমাণ ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে বেশি। কাজেই অর্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বৃহৎ শক্তির ভূমিকা মুখ্য। জাতিসংঘ সনদেই বৃহৎ শক্তিগুলোকে অর্থাৎ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে অধিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। সনদে বলা হয়, নিরাপত্তা পরিষদের মূলকাজ আন্তর্জাতিক শাস্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। শাস্তিরক্ষা কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
জাতিসংঘ সৃষ্টির সময়ের বৃহৎ শক্তির মধ্যে শক্তি সাম্য না থাকলেও তাদের একটি জায়গায় মিল ছিল। তারা ছিল মিত্রশক্তিভুক্ত দেশ। সময়ের পটপরিক্রমায় বিশ্বে আরও নতুন নতুন শক্তির উদ্ভব হয়েছে। অক্ষশক্তিভুক্ত দেশ ও উদীয়মান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোকে বৃহৎ শক্তিগুলোর সাথে জাতিসংঘের কর্মকাণ্ডে সমান সুযোগ দিলে সংস্থাটি আরও গতিশীল ও কার্যকরী হতো।
জাতিসংঘ এবং বিশ্বশান্তি মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই