The World After The Cold War

সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি একদলীয় সাম্যবাদী রাষ্ট্র, যার অস্তিত্ব ছিল ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ১৯১৭খ্রিষ্টাব্দে রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক দর্শনের ভিত্তিতে সোভিয়েত ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সোভিয়েত ঐক্য স্নায়ুযুদ্ধের যুগে পৃথিবীর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মডেল হিসেবে বিবেচিত হলেও বেশিদিন এ আদর্শ টিকে থাকতে পারেনি। ১৯৫৬-১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এ ইউনিয়নের প্রজাতন্ত্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১৫টিতে। এগুলো হলো-(১) আর্মেনিয়া প্রজাতন্ত্র, (২) আজারবাইজান প্রজাতন্ত্র, (৩) বেলারুশ প্রজাতন্ত্র, (৪) এস্তোনিয়া প্রজাতন্ত্র, (৫) জর্জিয়া প্রজাতন্ত্র, (৬) কাজাখস্তান প্রজাতন্ত্র, (৭) কিরঘিজস্তান প্রজাতন্ত্র, (৮) লাটভিয়া প্রজাতন্ত্র, (৯) লিথুয়ানিয়া প্রজাতন্ত্র, (১০) মলদোডিয়া প্রজাতন্ত্র, (১১) রাশিয়া প্রজাতন্ত্র, (১২) তাজিকিস্তান প্রজাতন্ত্র, (১৩) তুর্কমেনিস্তান প্রজাতন্ত্র, (১৪) ইউক্রেন প্রজাতন্ত্র, (১৫) উজবেকিস্তান প্রজাতন্ত্র।'
স্নায়ুযুদ্ধকালে দৃশ্যত বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বিমেরুকরণ শক্তিব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র নিজ অঞ্চলে অধিক নিরাপত্তা লাভের আশায় বৃহৎ দুই শক্তি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত শক্তিবলয়ে প্রবেশ করে। আশির দশকের শেষভাগে স্নায়ুযুদ্ধ পরিস্থিতিতে শিথিলতা এলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আবার নতুন রূপ পায়। কাজেই স্নায়ুযুদ্ধ সৃষ্টি যেমন তাৎপর্যপূর্ণ, এর অবসানও তাৎপর্যপূর্ণ। স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিশ্ব রাজনীতি ও স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতির মধ্যে বিস্তর প্রভেদ লক্ষণীয়। তবে নতুন বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখনো
পুরোপুরি বিকশিত হয়নি; বিকশিত না হলেও এটা দৃশ্যমান যে, বিশ্ব রাজনীতি এককেন্দ্রিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাস স্থিতিশীল কোনো বিষয় নয়, নিয়তই পরিবর্তনশীল। এ রকম একটি বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীর জ্ঞানচর্চা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসের হালনাগাদ তথ্য জানতে সহায়ক হবে।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব -প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
Fall of Soviet Union
বিংশ শতাব্দীর প্রথম 'দিকে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিজমের উত্থান ইতিহাসের একটি আলোচিত বিষয়। আবার বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে কমিউনিজমের পতন একটি বিস্ময়কর ঘটনাও বটে। কমিউনিজমের পতনের মধ্য দিয়ে প্রায় চার যুগ চলতে থাকা স্নায়ুযুদ্ধেরও অবসান হয়। রাশিয়ায় কমিউনিজমের উত্থান সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া দুষ্কর।
আবার এর পতন বা বিলুপ্তি সম্পর্কে সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়াও কঠিন। কেননা এটি সাম্প্রতিক বিষয়; সাম্প্রতিক বিষয় বলে এর ইতিহাস এখনো স্থিত হয়নি। এটা সত্য যে, কমিউনিজমের পতনের মধ্য দিয়ে মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের অবসান হয়। তবে এতে বিশ্ব রাজনীতিতে পুঁজিবাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। অর্থাৎ আদর্শগত শক্তি-দ্বন্দ্ব এখন এককেন্দ্রিকতার দিকে ধাবমান।
লেনিনের নেতৃত্বে কার্ল মার্কসের সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিক দর্শনের ভিত্তিতে যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সৃষ্টি হয় তার যৌবনকাল ছিল স্ট্যালিনের শাসনামল পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ক্রুশ্চেভ বা ব্রেজনেভের শাসনামল থেকেই রাশিয়ায় কমিউনিজম নানা কারণে পতনের দিকে ধাবিত হয়।
ভৌগোলিক পরিসীমায় রাশিয়া সাম্রাজ্যের পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধকালীন পৃথিবীর কমিউনিস্ট (সাম্যবাদী বা সমাজতন্ত্রী) রাষ্ট্রগুলোর মডেল ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। মূল চারটি প্রজাতন্ত্র নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের উৎপত্তি হলেও ১৯৫৬-৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ ভেঙে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রজাতন্ত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হলে ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ১১টি নিজেদের মধ্যে CIS সৃষ্টি করে। ৩টি বাল্টিক রাষ্ট্র CIS-এ যোগ দেয়নি। CIS-এর পূর্ণরূপ Commonwealth of Independent States, বাংলা অর্থ 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের কমনওয়েলথ'। তুর্কমেনিস্তান CIS-এর সহযোগী সদস্য।
স্নায়ুযুদ্ধের অবসান তথা সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিজমের পতন এবং পরাশক্তির ভাঙনের অনেক কারণ বিদ্যমান। এ কারণসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
প্রথমত: সাম্যবাদ বা কমিউনিজমের আদর্শ অন্তঃসারশূন্য। সাম্যবাদী বা কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, দক্ষতা, উৎপাদন প্রভৃতি বিষয়কে প্রচারণায় জোর দেওয়া হয়। এ আদর্শে বিশ্বাসীকে শিক্ষা দেওয়া হয় যে, তোমরা আদর্শের জন্য কাজ কর, অর্থের জন্য নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়া শুধু আদর্শের জন্য কাজ করা ভোগবাদী যুগে মানবচরিত্রের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি প্রজন্মকে এ আদর্শের দ্বারা অর্থাৎ ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে ভবিষ্যৎ সুখ-শান্তির জন্য আত্মত্যাগের মহিমায় সম্মোহিত করে রাখা সম্ভব, কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সম্ভব নয়। মানুষের জীবনে ভোগই চরম কথা নয়; মানসিক প্রশান্তির জন্য ত্যাগেরও প্রয়োজন পড়ে। এটা মহত্তর। কিন্তু অনেক ত্যাগের পরও যখন দেখা গেল ভবিষ্যৎ সুখ-সমৃদ্ধি দুরাশা, তখন কমিউনিজমে বিশ্বাসীদের বিশ্বাসে চিড় ধরে। সাধারণ জনগণ, যাদের আন্দোলনের ফসল রুশ বিপ্লব- তারা যখন দেখল নেতৃস্থানীয় পলিটব্যুরোর সদস্যরা ভোগ-বিলাসে জীবন যাপন করছেন; শ্রেণিগত অসাম্য কমিউনিজমের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় নেতৃবৃন্দের প্রতি তথা কমিউনিজমের প্রতি তাদের মোহমুক্তি ঘটে। তারা নেতৃবৃন্দকে হিংসার চোখে দেখতে ও ঘৃণা করতে শুরু করে। কমিউনিজম যে ধরনের সুখ-শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা ছয় যুগেও পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বৃহত্তর জনগণ এ আদর্শ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় যে ধরনের আদর্শ বিরাজ করার কথা ছিল, নেতৃবৃন্দ তা থেকে বিচ্যুত হওয়ায় জনগণের মধ্যে ক্ষোভের উদ্রেক হয়। কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় লক্ষ্যসমূহ অর্জনের পথ রুদ্ধ, যা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়, ফলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভের কারণ হয়। কমিউনিস্ট শাসকরা ক্ষমতা নিজের হাতে ধরে রাখতে ছিলেন বদ্ধপরিকর এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছার নীতি চর্চা করলে জনগণের মনে এ আদর্শ সম্পর্কে সন্দেহ জাগতে
শুরু করে।
দ্বিতীয়ত: কমিউনিজমের বিপরীত পুঁজিবাদের শক্তিকে কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের যথার্থভাবে বুঝতে অক্ষমতা কমিউনিজমের ধ্বংস ডেকে আনে। কমিউনিস্ট আদর্শকে রক্ষার জন্য অবিরাম সতর্ক ব্যবস্থা রাখার প্রয়োজন ছিল। পলিটব্যুরোর নেতৃবৃন্দ তা ভুলে গিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। পুঁজিবাদী শক্তির কমিউনিজমের বিরুদ্ধে অনবরত প্রচারণা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য-সন্ত্রাস সাম্যবাদের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। পুঁজিবাদী শক্তির কূটনীতির সফলতার কাছে রাশিয়ার সাম্যবাদের কূটনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছিল দুর্বল, যা কমিউনিজমের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
তৃতীয়ত: লেনিন বা স্ট্যালিনের শাসনামলে তাদের অবদানের দ্বারা কমিউনিজমে বিশ্বাসী সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে যে কর্মস্পৃহা ও স্বাজাত্যবোধ ছিল তা ক্রুশ্চেভ ও ব্রেজনেভের শাসনামলে হ্রাস - পায়। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতির উপর মতাদর্শ যতই গুরুত্ব পাক জাতীয় স্বার্থই প্রাধান্য পাবে। ক্রুশ্চেভও ব্রেজনেভের শাসনামলে শাসনব্যবস্থার অসমতা ও শিথিলতার সুযোগে জাতীয় স্বার্থই প্রাধান্য পেতে শুরু করে। ইউনিয়নভুক্ত অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের মানুষের মাঝে সূক্ষ্ম জাতীয়তাবোধ কার্যকর হয়। কমিউনিজমের আদর্শ ইউনিয়নভুক্ত সকলের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। রুশরা যে বিশেষ শ্রেণির মর্যাদা পেত, স্লাভ বা ইউক্রেন, বেলারুশের জনগণ সে মর্যাদা পেত না, যা কমিউনিজমের পতনের একটি কারণ।
চতুর্থত: শাসক নেতৃবৃন্দ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ায় এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত কারণে কমিউনিজমের পতন ঘটে। শাসক শ্রেণির পক্ষপাতিত্ব এবং কমিউনিজমের আদর্শ থেকে বিচ্যুতি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তিকে ত্বরান্বিত করে। সর্বহারা শ্রেণি বা শ্রমিক শ্রেণি থেকে স্ট্যালিনের পর আর সে রকম নেতৃত্ব সৃষ্টি না হওয়ায় কমিউনিজমের আদর্শ এ শ্রেণিকে আকর্ষণ করতে পারেনি।
পঞ্চমত: সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক স্থবিরতা এর বিলুপ্তির কারণ। পুঁজিবাদের প্রচারণার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের মতো শক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো সোভিয়েত ইউনিয়নের ছিল না। ভারী শিল্পে বেশি গুরুত্বদান, আণবিক গবেষণা ও সমরাস্ত্র নির্মাণে সাধ্যাতীত খরচ রাশিয়াকে অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ধাবিত করে। অপ্রতুল খাদ্য উৎপাদন সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণের মাঝে হতাশার সৃষ্টি করে এবং তারা পুঁজিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কমিউনিজমের আদর্শকে চাঙ্গা করতে বা ধরে রাখতে যোগ্য নেতৃত্ব ছিল না, যা পতনের অন্যতম কারণ।
ষষ্ঠত: বলশেভিক বিপ্লবের দ্বারা যে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা পায়, তা আমলাতন্ত্রের প্রতি অতি নির্ভরশীলতার কারণে বিকৃত রূপ ধারণ করে। ফলে ষাটের দশকের প্রজন্ম এবং নেতৃত্ব পুরনো নেতৃত্বের ত্যাগ-তিতিক্ষার গল্প শুনেছে; কিন্তু বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখতে পায় বিস্তর পার্থক্য। তাই ভোগবাদী আদর্শই তাদের আকর্ষণ করলে তারা কমিউনিজমের আদর্শ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাই সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের বিকৃতি সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির একটি কারণ।
সপ্তমত: কমিউনিজমের আদর্শে আদর্শবান নেতাদের পশ্চিমা বিশ্বের আদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির কারণ। মার্কিনিদের ষড়যন্ত্রে নেতৃত্বের একটি অংশ যে জড়িত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় Problems of Communism' জার্নালে। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত সর্বশেষ সংখ্যায় মন্তব্য করা হয়-'উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।' এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সোভিয়েত বিশেষজ্ঞ জর্জ কেনানের প্রায় অর্ধশতাব্দী পূর্বের ভবিষ্যদ্বাণীটি প্রণিধানযোগ্য, "যদি কখনো কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দলের একতা ও কার্যকারিতায় ভাঙনের সৃষ্টি করে, তবে সোভিয়েত রাশিয়া রাতারাতি অন্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তিশালী থেকে অন্যতম দুর্বল ও শোচনীয় জাতীয় সমাজে পরিণত হতে পারে।" কাজেই সাম্যবাদের উপরিকাঠামো শক্ত হলেও অন্তর্নিহিত কাঠামো ছিল দুর্বল।
অষ্টমত: মিখাইল গর্বাচেভ ও ইয়েলৎসিনের উত্থানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ত্বরান্বিত হয়। উপরিউক্ত কারণগুলোর সামষ্টিক ক্রিয়ায় যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের জনমানুষের আদর্শ কল্পবিলাস, তখন গর্বাচেভের সংস্কার কর্মসূচির দ্বারা তারা অনুপ্রাণিত হয়। বৃহৎ প্রজাতন্ত্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের পুনর্গঠনমূলক কর্মসূচি সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনকে আরও সহজ করে। এ দুই নেতা পুঁজিবাদের সৃষ্ট কি না তা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং কমিউনিজমে ধস নামার পেছনে কোনো একক কারণকে চিহ্নিত করা দুরূহ ব্যাপার। ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণে উপর্যুক্ত কারণগুলোর কোনটি মুখ্য বা কোনটি গৌণ তা বেরিয়ে আসবে।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব -প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
Birth of New States
১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে যে সর্বহারা একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার প্রভাব রাশিয়ার সীমা ছাড়িয়ে অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে জর্জিয়া, বেলারুশ, ইউক্রেন ও তুর্কমেনিস্তান রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত হয়েছিল। ১৯৪০-৪১ খ্রিষ্টাব্দে বাল্টিক রাষ্ট্র এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া এবং পরবর্তীকালে মলদোভিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হয়। ৩১শে ডিসেম্বর ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির পূর্ব পর্যন্ত ১৫টি প্রজাতন্ত্র এর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে গণ্য হতে শুরু করে।
আশির দশকের মাঝামাঝি নাগাদ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এ পরিবর্তন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গর্বাচেভের সংস্কার প্রবর্তনে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ শুরু হলে তা প্রতিহত করার জন্য তিনি গ্লাসনস্ত (স্বাধীন মতামত ও সমালোচনা করার অধিকার) ও পেরেন্দ্রৈকা (অর্থনৈতিক পুনর্গঠন) কর্মসূচি গ্রহণ করেন। কিন্তু তার উদারনৈতিক কর্মসূচি ভাঙন রোধ করতে পারেনি। যে কঠোর সামরিক শৃঙ্খলা সোভিয়েত সমাজজীবনে চলছিল, তার প্রতি বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের জনগণ বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে শুরু করে। আস্তে আস্তে সোভিয়েত সমাজব্যবস্থার সমস্ত অংশেই বিক্ষোভ দানা বাঁধে। তার উদারনৈতিক নীতির প্রভাবে প্রজাতন্ত্রগুলোতে জাতিগত সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাই কমিউনিজমের বিলুপ্তির সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নেরও বিলুপ্তি ঘটে। অর্থাৎ যে কারণগুলোর সামষ্টিক প্রতিক্রিয়ায় সাম্যবাদের পতন ঘটে, প্রায় একই রকম পটভূমিকায় স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের উদ্ভব ঘটে। পেরেস্ত্রৈকা অর্থাৎ অর্থনৈতিক পুনর্গঠননীতি উদারনৈতিকতার সাথে যুক্ত হয়ে প্রজাতন্ত্রগুলোর বিভক্তিকে ত্বরান্বিত করে। কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও নীতির পরিবর্তন স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের উদ্ভবের প্রধান কারণ।
বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসংগতি ও বৈষম্য কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দুর্বল করেঃte W যা প্রকারান্তরে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের উদ্ভবকে প্রভাবান্বিত করে। । পশ্চিমা ভোগবাদ তাদের আকর্ষণ করে।
কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভক্তি, বিভ্রান্তি ও শৈথিল্যের সুযোগ নিয়ে প্রজাতন্ত্রের জনগণ ভোগবাদে আকৃষ্ট হয়; অর্থাৎ পুঁজিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। গর্বাচেভের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কর্মসূচিকে তারা সাদরে গ্রহণ করে এবং ইউনিয়নমুক্ত হওয়ার প্রয়াস নেয়; সফলও হয়। গর্বাচেভের সংস্কারসমূহে উদ্বুদ্ধ হয়ে শুরু থেকে বাল্টিক প্রজাতন্ত্র জনপ্রিয় ফ্রন্ট গঠন করে। রাশিয়ান প্রজাতন্ত্র ফ্রন্টকে সহ্য করার ইঙ্গিত দিলে এতে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্যান্য প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা ঘোষণা করতে সাহসী হয়ে ওঠে। পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সেখানকার বিপ্লবের প্রভাবে প্রজাতন্ত্রগুলো অনুপ্রাণিত হয়।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে গর্বাচেভের বক্তব্য ছিল 'শান্তির কোনো বিকল্প নেই।' সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ২৭তম কংগ্রেসে তিনি বলেন, "বর্তমান দুনিয়া হচ্ছে জটিল, বিচিত্র এবং গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক প্রবণতা ও স্ববিরোধিতার দ্বারা বিভক্ত।" আসলে মিখাইল গর্বাচেভ অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন তার জন্য শান্তি বজায় রাখা জরুরি ছিল। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া তার কোনো বিকল্প ছিল না। তার কর্মকাণ্ড প্রজাতন্ত্রগুলোকে স্বাধীনতা ঘোষণায় অনুপ্রাণিত করে।

ইতিমধ্যে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সর্বব্যাপী প্রাধান্য ক্ষুণ্ণ হতে শুরু করে। বিভিন্ন অঞ্চলের নির্বাচনে বিভিন্ন দল অংশগ্রহণ করতে ও কমিউনিস্টদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরবর্তী সময়ে জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট শোভার্দনাদজে কমিউনিস্ট দলের বাইরে নির্বাচন করেন। ইউক্রেন, বেলারুশ ও লিথুয়ানিয়ায় নির্বাচন কমিউনিস্টদের প্রভাব ক্ষুণ্ণ হওয়ার সংকেত দেয়। এস্তোনিয়া ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই মার্চ লিথুয়ানিয়াও স্বাধীনতা
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব
ঘোষণা করে। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের শেষ নাগাদ লাটভিয়া, জর্জিয়া ও আর্মেনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। গর্বাচেভ এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণাকে 'অগণতান্ত্রিক উপায়ে বের হয়ে আসা' আখ্যায়িত করেন। তাই শিথিল কনফেডারেশন গঠনের উদ্যোগ নেন এবং প্রজাতন্ত্রগুলোকে কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু প্রজাতন্ত্রগুলো জাতি-রাষ্ট্র মর্যাদায় বিশ্বাস করত বলে তার উদ্যোগে কেউ সাড়া দেয়নি।
গর্বাচেভের নীতি যেমন কট্টর কমিউনিস্টদের পছন্দ হয়নি, তেমনি দ্রুত উদারনীতি কার্যকর করতে বিশ্বাসী রুশ প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনেরও পছন্দ হয়নি। গর্বাচেভ ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে সাধারণ জরুরি স্বার্থবিজড়িত বিষয় (প্রতিরক্ষা, আয়-ব্যয়, নীতিনির্ধারণ) নিয়ে ২০শে আগস্ট গণভোটের ব্যবস্থা করেন। উদ্দেশ্য ছিল ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে শিথিল সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করা। কিন্তু ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে আগস্ট গণভোটের পূর্বদিন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে কট্টর কমিউনিস্টরা নজরবন্দি করে রাখে। যদিও ইয়েলৎসিন ও উদারপন্থি জনগণের সহায়তায় তিনি মুক্ত হন এবং পুনরায় ক্ষমতায় বসেন। কিন্তু আলমা আতার বৈঠকে ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ১১টি নিজেদের মধ্যে শিথিল কনফেডারেশন (CIS) গঠনের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে স্বাধীন হয়ে যায়।
সামরিক অভ্যুত্থানের ব্যর্থতা যাদের ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করে, তারা বাস্তববাদী ছিলেন। তারা পূর্বে প্রস্তাবিত ইউনিয়ন চুক্তি বাতিল করে দেন এবং ঘোষণা করেন যে, দেশটি এখন থেকে 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের ইউনিয়ন' বলে অভিহিত হবে, প্রজাতন্ত্রের নয়। ২৪শে আগস্ট ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে ইউক্রেন স্বাধীনতা ঘোষণা করলে শিথিল কনফেডারেশন প্রতিষ্ঠা আর হয়নি। এর কারণ হলো ইউক্রেনের স্বাধীনতা ঘোষণার দুই সপ্তাহের মধ্যে রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তান ছাড়া বেলারুশ, উজবেকিস্তান, আজারবাইজান, তাজিকিস্তান প্রভৃতি প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা ঘোষণা করে। পশ্চিমা বিশ্ব অতি দ্রুত এদের স্বীকৃতি দিয়ে দেয়। শেষোক্তগুলোর স্বাধীনতা ঘোষণার পেছনে স্থানীয় কমিউনিস্টদের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যাপারটি বেশি কাজ করেছে। কাজেই দেখা যায়, অভ্যুত্থানের পূর্বেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের বিষয়টি চূড়ান্তই ছিল। ইয়েলৎসিন ছিলেন প্রচণ্ড কমিউনিস্টবিরোধী। তিনি খুব দ্রুত সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবর্তন করা শুরু করলে সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভাঙন ত্বরান্বিত হয়। ইয়েলৎসিন সুযোগ বুঝে গর্বাচেভের কাঁধে দোষ চাপিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন-প্রক্রিয়াকে চূড়ান্তভাবে সমাপ্ত করেন। তবে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থাৎ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর ইন্ধন, সহযোগিতায় স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের উদ্ভব তথা কমিউনিস্ট শাসনের অবসান হয়। বিশ্বের ৭২ বছরের পুরনো একটি পরাশক্তির পতন হয়। ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে যে ১১টি নিজেদের মধ্যে CIS সৃষ্টি করে, সেগুলো হলো- আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, জর্জিয়া, কাজাখস্তান, কিরঘিজেস্তান, মলদোভিয়া, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, ইউক্রেন ও উজবেকিস্তান।
লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া CIS-এ যোগ দেয়নি।
CIS (Commonwealth of Independent States)
১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির পর স্বাধীনতাপ্রাপ্ত ১৫টি রাষ্ট্রের (সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত) মধ্যে ১১টি তাদের অর্থনীতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের তাগিদে নিজেদের মধ্যে যে কনফেডারেশন গঠন করে তার নাম CIS |
CIS ভুক্ত ১১টি রাষ্ট্রের নাম ও স্বাধীনতার তারিখ নিচে প্রদর্শন করা হলো:
| ক্রমিক নং | স্বাধীন দেশের নাম | স্বাধীনতা অর্জনের তারিখ |
| ০১ | আজারবাইজান | ২৩শে সেপ্টেম্বর, ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০২ | জর্জিয়া | ৯ই মার্চ, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৩ | রাশিয়া | ১১ই জুন, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৪ | উজবেকিস্তান | ২০শে জুন, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৫ | মলদোভিয়া | ২৩শে জুন, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৬ | ইউক্রেন | ১৬ই জুলাই, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৭ | বেলারুশ | ২৭শে জুলাই, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৮ | তাজিকিস্তান | ২৫শে আগস্ট, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৯ | আর্মেনিয়া | ২৩শে আগস্ট, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ১০ | কাজাখস্তান | ২৫শে অক্টোবর, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ১১ | কিরঘিজস্তান | ১১ই ডিসেম্বর, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
এই ১১টি রাষ্ট্র ছিল CIS-এর পূর্ণাঙ্গ সদস্য।
| ১২ | তুর্কমেনিস্তান | ২২শে আগস্ট, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ | সহযোগী সদস্য |
| ১৩ | লিথুয়ানিয়া | ১১ই মার্চ, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ | এ তিনটি বাল্টিক |
| ১৪ | এস্তোনিয়া | ৩০শে মার্চ, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ | রাষ্ট্র CIS-এ |
| ১৫ | লাটভিয়া | ৪ই মে, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ | যোগ দেয়নি |
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
আন্তর্জাতিক রাজনীতির চরিত্র প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব যত দিন ছিল বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির চেহারা এক রকম ছিল। মহাশক্তিধর সোভিয়েত ইউনিয়নের বাস্তব অস্তিত্ব না থাকায় শক্তি রাজনীতির তীব্রতা এখন পূর্বের মতো নেই। নিজ নিজ প্রভাবাধীন এলাকাকে সম্প্রসারিত করা ও আন্তর্জাতিক সমাজে ভাবমূর্তি বাড়িয়ে তোলার উদগ্র বাসনা আজ মস্কো বা ওয়াশিংটন কারোরই নেই। আবার ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বেপরোয়াভাবে অস্ত্র উৎপাদনের প্রবণতাও সোভিয়েত রাশিয়া বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের মধ্যেই অনুপস্থিত। নিরস্ত্রীকরণে জন্য আজ সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কুণ্ঠিত নয়। এর কারণ হলো প্রবল পরাক্রান্ত প্রতিযোগীর ক্ষমতার লড়াইয়ের আসরে অনুপস্থিতি। কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির প্রভাব আজ বিশ্ব রাজনীতিতে দৃশ্যমান একটি বিষয়।
বিলুপ্ত হওয়ার পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল দুই পরাশক্তির একটি; কমিউনিস্ট বিশ্বের নেতা। আজ তার কোনো অস্তিত্ব নেই। রাশিয়া তার স্থলাভিষিক্ত হলেও তাকে এখন পরাশক্তি আখ্যায়িত করা যায় না। উত্তরাধিকার সূত্রে সে কেবল পুরনো সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু সমরাস্ত্র পেয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসনটি লাভ করেছে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলোর প্রভাব ও আগ্রাসন থেকে সযত্নে রক্ষা করাই ছিল রাশিয়ার লক্ষ্য ও ব্রত। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সমাজতন্ত্রের মতবাদ অক্লান্ত পরিশ্রমে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচার করে আসছিল। ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন কমিয়ে নিজেকে সামরিক শক্তিতে অপরাজেয় করে তুলছিল। ইউনিয়ন বিলুপ্ত হওয়ায় রাশিয়ার সে ক্ষমতার দাপট আর নেই। বিশ্ব রাজনীতিতে মতাদর্শগত লড়াই না থাকায় অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রগুলোতে সে প্রভাববলয় বা শৃঙ্খলও আজ নেই।
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির প্রভাব ইউরোপীয় রাজনীতিতে বেশি মাত্রায় দৃশ্যমান। দুই জার্মানি একত্রিত হয়ে যাওয়ায় ইউরোপকে কেন্দ্র করে শক্তি-দ্বন্দ্ব অতীতের মতো আর নেই। পূর্ব জার্মানি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী একটি উপগ্রহ রাষ্ট্র। পূর্ব জার্মানির অভ্যন্তরীণ কল্যাণের ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে খুব বেশি মাথা ঘামাত তা নয়। পূর্ব জার্মানিতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আসন সুদৃঢ় করা এবং তাকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সম্প্রসারণবাদকে সংযত করাই ছিল তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য, অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য পূর্ব জার্মানি ছিল হাতিয়ারস্বরূপ। সে কারণে ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবেশ মাঝে মাঝে উত্তপ্ত হয়ে উঠত। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ও কমিউনিস্ট শাসনের অবসান হওয়ায় আজ শক্তি-দ্বন্দ্ব স্তিমিত হয়ে পড়েছে। দুই জার্মানি একত্রীকরণের ফলে ইউরোপের অন্যতম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
আমেরিকার বিষফোঁড়া ছিল সাম্যবাদ; আর সোভিয়েত ইউনিয়নের বিষফোঁড়া ছিল পুঁজিবাদ। আজ রাশিয়া পুঁজিবাদকে অসহ্য মনে না করে বরং লালন করছে। আদর্শগত দ্বন্দ্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাজিত; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তার দোসররা জয়ী। জয়ী হওয়ার সুবাদে আজ বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। তবে একক শক্তি হিসেবে আমেরিকাই এখন বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্তা। আজ রাশিয়া আর পরাশক্তির ভূমিকায় নেই। বরং ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো বৃহৎ শক্তি মাত্র। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সামরিক জোট ন্যাটোর অ্যাসোসিয়েট সদস্য এখন রাশিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ওয়ারস জোট আজ মৃতপ্রায়। রাশিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এখন পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে। পূর্ব ইউরোপীয় দেশ, যেগুলো এককালে অনুগ্রহ রাষ্ট্র ছিল, তারাও ন্যাটোর সদস্য পদ লাভ করেছে। কাজেই দেখা যায়, স্নায়ুযুদ্ধকালীন সৃষ্ট সামরিক জোটগুলোর বিলুপ্তি বা সম্প্রসারণ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির সমার্থক।
পৃথিবীতে কোন দেশ কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে তা নির্ধারিত হবে সামরিক শক্তির চেয়ে অর্থনৈতিক শক্তির দ্বারা। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এ কথাই প্রমাণ করে যে, শুধু সামরিক শক্তির দ্বারা বিশ্বের বুকে সাময়িকভাবে প্রাধান্য বিস্তার করা যায়- দীর্ঘস্থায়ীভাবে নয়। দীর্ঘস্থায়ী করতে দরকার শক্তিশালী অর্থনীতি। অর্থনৈতিক ক্ষমতাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশে সহায়তা করেছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির প্রভাব তৃতীয় বিশ্বের (শিল্পে অনুন্নত যে সমস্ত দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো স্বাধীনভাবে গড়ে উঠতে পারেনি, অন্যের উপর নির্ভরশীল তা-ই তৃতীয় বিশ্ব) রাজনীতি ও অর্থনীতিতে লক্ষণীয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের প্রবণতা লক্ষ করে অনেক বিজ্ঞজন শক্তি-সাম্য থাকা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করতে শুরু করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির কারণে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অর্থব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টায় লিপ্ত। ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এ আগ্রাসনকে নয়া উপনিবেশবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির কারণে পৃথিবীর মানচিত্রে অনেক জাতি রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়, যা একটি ইতিবাচক দিক। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়, যে রাষ্ট্রগুলোতে পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ও আদর্শ প্রতিষ্ঠিত ছিল সেগুলোতে পুঁজিবাদের প্রভাব লক্ষ করা যায়। কমিউনিস্ট চিন্তাধারার পতন আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে খুবই তাৎপর্যময় ঘটনা।
যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সব সময়েই বিশ্বের তিনটি অঞ্চল (পশ্চিম ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়া) গুরুত্ব পেয়ে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী রূপই পরিলক্ষিত হয়, যা অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ। তার কর্তৃত্বসুলভ আচরণে আজ আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, লিবিয়া, ইরাক ও ইরান তটস্থ। তবে একটি পর্যায় পর্যন্ত হয়তো মার্কিন প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত থাকবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংযত আচরণ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির প্রভাবে ইতিবাচক হবে; আর অসংযত আচরণের পরিণাম কী হবে তা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তবে একক শক্তি হিসেবে মার্কিন প্রাধান্য হয়তো বেশি দিন থাকবে না। কারণ বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান আত্মপ্রকাশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আবার আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে কি না তা সময় বলে দেবে। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকায় আমরা প্রত্যাশা করি, বর্তমান রাশিয়া আবার বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠুক।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কারণে ইউরোপের যে সকল অঞ্চল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাববলয়ে এসেছিল, তন্মধ্যে সাবেক ১১টি (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া বাদ দিয়ে, এগুলো সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে ইউনিয়নভুক্ত হয়) স্বাধীন দেশ অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো সোভিয়েত সৈন্যবাহিনী দ্বারা নাৎসি কবলমুক্ত হয়। ফলে পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশই সোভিয়েত রাশিয়ার ধ্যানধারণা অনুযায়ী সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠন করে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রুশিয়ার উত্তরাংশ (পূর্ব জার্মানি), পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, যুগোশ্লাভিয়া, আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া প্রভৃতি দেশ। যেসব এলাকা রাশিয়ার সাথে যুক্ত হয় তার জনসংখ্যা ছিল আড়াই কোটি; আর যেগুলোতে রাশিয়ার তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৯ কোটি।
পূর্ব ইউরোপের এ বিশাল ভূভাগ ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাজনিত কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের নিকট অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই দেখা যায়, ইউরোপীয় রণাঙ্গনে যুদ্ধের শেষের দিকে সোভিয়েত বাহিনী অতি দ্রুত বার্লিন ও প্রাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখলে নেয়। এর অল্পকাল পরেই পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের 'লৌহ যবনিকা'র সূত্রপাত হয়। এ যবনিকার অন্তরালে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল:
প্রথমত: সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যকার সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করা। এ অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহে বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার প্রতিষ্ঠা করা। জনগণকে এমনভাবে দীক্ষিত ও প্রভাবিত করা, যাতে যুদ্ধের সময় তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের তাঁবেদার ও মিত্র হিসেবে থাকে।
দ্বিতীয়ত: রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোকে পশ্চিমের পরিবর্তে রাশিয়ামুখী করে গড়ে তোলা, পশ্চিমের প্রভাবমুক্ত রাখা।
তৃতীয়ত: এ অঞ্চলের সম্পদ ব্যবহার করে রাশিয়ার অর্থনৈতিক পুনর্গঠন করা এবং অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করা।
পাঁচটি পর্যায়ে রাশিয়া উপর্যুক্ত নীতি বাস্তবায়ন করে:
প্রথম পর্যায়: প্রথম পর্যায়ে নাৎসি আক্রমণ ও উৎপীড়ন থেকে মুক্ত করে এতদঞ্চলে কিছুটা জনপ্রিয়তা লাভকরে। নিজেদের শাসন চাপিয়ে না দিয়ে প্রত্যেক দেশে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করে (পোল্যান্ড ছাড়া)। ধীরে ধীরে তারা কমিউনিস্টদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকে; যাতে তারা পুঁজিপতিদের হটিয়ে নিজেরা রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করতে পারে।
বসিয়ে নাৎসিবিরোধী দল নিয়ে কোয়ালিশন দ্বিতীয় পর্যায় : এ পর্যায়ে স্থানীয় কমিউনিস্টদের ক্ষমতায় না বসিয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা করে।
তৃতীয় পর্যায়: তৃতীয় পর্যায়ে রুশরা পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহে স্থানীয় কমিউনিস্ট ছাড়া সকলকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে। তবে সব দেশে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি। অ-কমিউনিস্টদের কলঙ্কিত করা এ পর্যায়ে শুরু হয়। যেমন- রুমানিয়ার কৃষক দলের নেতা 'মানিউ'-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়।
চতুর্থ পর্যায়: এ পর্যায়ে তারা স্থানীয় কমিউনিস্টদের সরিয়ে তাদের তাঁবেদারদের ক্ষমতায় বসায়। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শাসককে অপসারণ করা হয়; মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়। এভাবে মোট ৪টি পর্যায়ে পূর্ব ইউরোপীয় দেশে নীতির বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়।
পঞ্চম পর্যায়: রুশরা পূর্ব ইউরোপের তাঁবেদার রাষ্ট্রসমূহে কৃষক শ্রেণি, ক্যাথলিক চার্চ ধ্বংস করার কাজে হাত দেয়। রাশিয়া নিজ নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রসমূহে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে।
উপর্যুক্ত নীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে প্রতিক্রিয়া হয়, সে প্রতিক্রিয়াই পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পতনকে নিম্নলিখিতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়:
প্রথমত: মতাদর্শিক চেতনার চেয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রাধান্য। পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া যে নীতি গ্রহণ করে তার সাথে পূর্ব ইউরোপীয় জনগণের আন্তরিক সম্পৃক্ততা ছিল না। আবার জনপ্রিয় নেতাদের অপসারণ করে তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা জনভিত্তি পায়নি। যে কারণে যুগোশ্লাভিয়ার টিটো কমিউনিস্ট হয়েও মস্কোর তাঁবেদার হননি।
দ্বিতীয়ত: হাঙ্গেরির জননেতা রাজকের মৃত্যুদণ্ড, চেকোস্লোভাকিয়ার মানস্কি ও ক্লিমেনসিকে ফাঁসি প্রদান- এ গর্হিত কাজগুলো পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্র পতনের একটি কারণ। জনপ্রিয় নেতাদের এ করুণ পরিণতি রাশিয়া তথা সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্রোধের জন্ম দেয়।
তৃতীয়ত: পূর্ব ইউরোপের কৃষকরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কৃষকরা নিজের জমি নিজের দখলে রাখতে চায়। কমিউনিজম শাসনে আবাদযোগ্য জমি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে খামারব্যবস্থা চালু করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক সমাজতন্ত্রের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন হয়; যা এর পতনকে ত্বরান্বিত করে।
চতুর্থত: পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ মানুষ ছিল ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী, যাদের উপর কমিউনিস্ট প্রচারণা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। উপরন্তু রুশ তাঁবেদার সরকার ক্যাথলিক চার্চ ধ্বংস করলে ধর্মানুরাগী খ্রিষ্টানরা সমাজতন্ত্রকে সুনজরে দেখেনি, যা পতনের অন্যতম কারণ।
পঞ্চমত: পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশেই সমাজতন্ত্রের মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একদলীয় সোভিয়েত নীতি প্রবর্তিত থাকায় কমিউনিস্ট পার্টি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র বিলুপ্তির পূর্বেই সেখানে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে।
ষষ্ঠত: হেলসিংকি সম্মেলন ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির শক্ত অবস্থান পূর্ব ইউরোপ থেকে সমাজতন্ত্র বিলুপ্তির কারণ। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে হেলসিংকিতে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তাতে রাশিয়া পূর্ব ইউরোপের তাঁবেদার সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রগণকে পূর্ব ইউরোপে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেয়। সেটাই পরবর্তী সময়ে পূর্ব ইউরোপীয় ভিন্নমতাবলম্বীদের সোভিয়েত কবলমুক্ত হওয়ার মদদ জোগায়, যার ফল হলো ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের গণজাগরণ।
এ সুযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মিত্ররা পূর্ব ইউরোপে আর্থিক, রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ইউরোপকে নিজের অর্থনীতির সাথে যুক্ত করা এবং সোভিয়েত প্রভাবাধীন কমিউনিজমের প্রসার রোধ করা। মূলত প্রলোভন দেখিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্ররা পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণজাগরণ ঘটাতে সক্ষম হয়; যার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের প্রভাববলয় ধ্বংস হয়ে যায়।
সপ্তমত: সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট বহির্বিশ্বে তার সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে পারেনি। শিল্প পরিচালনায় অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণে জনগণ পূর্ব ইউরোপের স্বৈরশাসনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে।
উপরিউক্ত কারণগুলোকে পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার সাম্রাজ্য ধ্বংসের জন্য দায়ী হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।। তবে গর্বাচেভের শত্রুরা মনে করে, তিনিই পূর্ব ইউরোপকে হারানোর জন্য দায়ী। কেননা সংস্কার কর্মসূচি, গ্লাসনস্ত (স্বাধীন মতামত ও সমালোচনা করার অধিকার) ও পেরেস্ত্রৈকা (অর্থনৈতিক পুনর্গঠন) প্রয়োগের ফলে এবং পূর্ব ইউরোপ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের দরুন সে দেশগুলোতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে। পূর্ব ইউরোপীয় বিপ্লবের ধরন দেখে মনে করা যেতে পারে যে, অত্যধিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দীর্ঘ সময়ের প্রতিরোধক হিসেবে কার্যকরী নয়। এ ধরনের ক্ষমতার দ্বারা অসন্তোষকে সাময়িক দমিয়ে রাখা সম্ভব, তবে দীর্ঘস্থায়ী কখনো নয়। এরূপ ক্ষমতা নেতৃবৃন্দকে কখনো বৈধ করে না। পূর্ব ইউরোপে বিপ্লব এসেছে জনগণের ইচ্ছা ও দৃঢ়তা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে, যা ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণ-উত্থান।
Poland
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের প্রথম আক্রমণের শিকার হয় পোল্যান্ড। রাশিয়ার দ্বারা পোল্যান্ড মুক্ত হয়। কিন্তু যুদ্ধকালীন ইয়াল্টা সম্মেলনে (১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) স্থির হয়েছিল যে, নাৎসি শাসনমুক্ত ইউরোপকে স্বনির্বাচিত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অধীন করা হবে। কিন্তু গণতন্ত্র সম্পর্কে রাশিয়া ও পশ্চিমা জোটের ধারণাগত পার্থক্য ছিল। পশ্চিমা গণতন্ত্রের আদর্শে রাশিয়া বিশ্বাসী ছিল না। নাৎসি নিপীড়ন থেকে মুক্ত করার পুরস্কার হিসেবে রাশিয়া পোল্যান্ডে নিজ মতাদর্শের সরকার স্থাপন করে। পোল্যান্ডের অভিজাত ও বিত্তবানরা হিটলারের সৈন্যবাহিনীকে সহায়তা করায় নির্বাসিত পোল সরকারের প্রতি রাশিয়া অসন্তুষ্ট হয়। তাই যুদ্ধোত্তর পোল্যান্ডে নির্বাসিত পোল সরকার ঢুকতে পারেনি। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে কৃষক পার্টির নেতা মিকোলাজাস্কি কমিউনিস্টদের কাছে পরাজিত হয়ে নিপীড়নের ভয়ে দেশ ত্যাগ করেন।
স্ট্যালিনবাদ উচ্ছেদের যুগে পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে উদারনীতির সরকার প্রবর্তিত হয়। পোল্যান্ডে এ উদার মনোভাবকে অক্টোবরের বসন্ত বলা হয়। পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট দল এ সময় স্বাধীনচেতা ও উদারনৈতিক পার্টি সদস্য দ্বারা পরিচালিত হতো। কিন্তু ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে পোল্যান্ডে রাশিয়ার অর্থনৈতিক শোষণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়। রাশিয়ার নেতৃবৃন্দ পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে কিছুটা সুবিধাদানে রাজি হন। পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট দল থেকে মস্কোর প্রতি সহানুভূতিশীল কয়েকজন নেতাকে সরিয়ে অক্টোবর মাসে গোমুলকাকে মর্যাদার সাথে ক্ষমতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। এছাড়া মস্কো পোল্যান্ডের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না বলে রাজি হয়। পোল্যান্ডে সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে রকসোভস্কিকে প্রত্যাহার করে নেয়। পোল্যান্ডের অনুকূলে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সমন্বিত করা হয়।
এদিকে পোল্যান্ডে স্বাধীন শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন বিভিন্ন দাবিতে গণজাগরণ সৃষ্টি করে। জাহাজের ডকইয়ার্ডের শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। তাদের আন্দোলনের মূল দাবি ছিল, কৃষকের প্রতি অবহেলা করা যাবে না এবং সোভিয়েত বিরোধিতা প্রাধান্য পায়। শ্রমিকদের রাজনৈতিক দলের নাম হয় সলিডারিটি (সংহতি) এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত আন্দোলনের নাম হয় Solidarity Movement। খুব দ্রুত আন্দোলন জনপ্রিয়তা পেতে থাকলে সরকার দমননীতির আশ্রয় নেয়। এ সময় সলিডারিটি ও কৃষক পার্টির মৈত্রী হলে পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট দল গণবিচ্ছিন্ন দলে পরিণত হয়। সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণ থেকে পুরোপুরি মুক্তিলাভের জন্য পোল্যান্ড পূর্ব ইউরোপে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নেয়।
১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে কোনোরূপ পূর্ব পরিস্থিতি ছাড়াই লেস ওয়ালেসা পোল্যান্ডের রাজনীতিতে শ্রমিক দলের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। খুব দ্রুত এ সাহসী নেতা জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তার রাজনৈতিক জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা তাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি এনে দেয়। ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নোবেল শাস্তি পুরস্কার লাভ করেন। পশ্চিমা বিশ্ব তার উত্থানে সহযোগিতা করে। তার সলিডারিটি আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল পোল্যান্ডকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্ত করা। জনগণকে প্রস্তুত করে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা লাভ। সলিডারিটির উত্থানে যেসব বৈশিষ্ট্য সহায়ক ভূমিকা নেয় তা হলো- অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদার নীতি প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি, ব্যক্তিগত মালিকানায় উৎপাদনে উৎসাহদান এবং বৈদেশিক মূলধন পোল্যান্ডের শিল্প ও বাণিজ্যে বিনিয়োগ।

ওয়ালেসার জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্ররোচনায় পোল্যান্ডে সামরিক শাসন জারি করা হয়; তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। কারাগারে তার অনশন বিশ্বের দৃষ্টি কাড়ে। তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে থাকে। লেনিন ডকইয়ার্ডের শ্রমিক আন্দোলনে সরকার ভীত হয়ে পড়ে। পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো আশির দশকের শেষ দিকে পোল্যান্ডে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে। দেশের সংকট আরো ঘনীভূত হয়। কর্তৃপক্ষ সলিডারিটির সাথে গোলটেবিল আলোচনায় বসতে রাজি হয়। আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, ওয়ালেসাকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং তার দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। কারাগার থেকে মুক্তি পেলে তিনি জাতীয় নেতার মর্যাদা লাভ করেন। নির্বাচনে তিনি অংশ না নিলেও তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভকরে। সলিডারিটির নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। এভাবেই লেস ওয়ালেসার নেতৃত্বে পোল্যান্ড থেকে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে কমিউনিস্ট শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং উদারনৈতিক শাসন প্রবর্তিত হয়। পোল্যান্ড আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য।
Hungary
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবে হাঙ্গেরিতে সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ববর্তী পাঠে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণ কীভাবে হয়েছিল তার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। পূর্ব ইউরোপের এ বিশাল অঞ্চল সোভিয়েত প্রভাববলয়ে থাকার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা (ফ্রান্স, ইংল্যান্ড) এ অঞ্চল শোষণ করার সুযোগ পায়নি। তাদের কাছে সোভিয়েত প্রভাবাধীন এ অঞ্চল সব সময় প্রলোভনের বস্তু ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের প্রচেষ্টা ছিল কীভাবে এ উর্বর অঞ্চল উন্মুক্ত করা যায়। তারা স্পষ্টই উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এতদঞ্চল থেকে স্বার্থ উদ্ধার সম্ভব নয়। তাই তারা অতি সূক্ষ্মভাবে এতদঞ্চলে সোভিয়েতবিরোধী গণজাগরণ সৃষ্টিতে মদদ দেয়।
পোল্যান্ডের আন্দোলনের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে হাঙ্গেরিও ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে আগস্ট আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিস্ট শাসন থেকে মুক্তি ও সোভিয়েত বিরোধিতা। পোল্যান্ডের মতো রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পেতে রাশিয়া হাঙ্গেরিতে ব্যর্থ হয়। কেননা হাঙ্গেরির অধিবাসীরা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানায় এবং পরিস্থিতি কমিউনিস্ট নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিদ্রোহী আন্দোলনকারীরা কমিউনিস্ট দলকে ভেঙে দিতে, ওয়ারস চুক্তি পরিত্যাগ করতে এবং সোভিয়েত শাসনের শেষ নিদর্শন নির্মূল করতে উদ্যোগ নেয়। স্ট্যালিনবাদ উচ্ছেদনীতির ফলে ইতিপূর্বে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বিতাড়িত ইমের নেগির নেতৃত্বে জনপ্রিয় সরকার ক্ষমতায় বসে। নেগি সরকার ছিল জোটনিরপেক্ষ নীতিতে বিশ্বাসী, ফলে ওয়ারস চুক্তি পরিত্যাগ করে এবং সোভিয়েতবিরোধী 'মেনডিসকে' মুক্তি দেয়। এদিকে রাশিয়ার ইন্ধনে স্ট্যালিনপন্থি 'রকোসির' নেতৃত্বে নেগি সরকারের পতন হয়। এতে হাঙ্গেরির জনগণ আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বুদ্ধিজীবীরাও ব্যক্তিস্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনে যোগ দেন। এ আন্দোলন কমিউনিস্ট ও প্রতিক্রিয়াশীলবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়, কমিউনিস্টরা হামলার শিকার হয়। কমিউনিস্ট মতাদর্শবিরোধী এ আন্দোলন যাতে পূর্ব ইউরোপে প্রসারিত না হয় সেজন্য সোভিয়েত সৈন্যবাহিনী হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করে পুনরায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। কমিউনিস্ট নেতা 'জানেস কাদার' প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার স্থাপন করেন।

এ সময় হাঙ্গেরির ঘটনাপ্রবাহ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত হলেও সুয়েজ সংকটের কারণে কোনো সুরাহা হয়নি। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে হাঙ্গেরি প্রসঙ্গটি সাধারণ পরিষদের সভায় উত্থাপন করা হলে ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি তথ্য অনুসন্ধানী দল গঠন করে রিপোর্ট করতে বলা হয়। রিপোর্টে বলা হয়, কাদার সরকার সামরিক হস্তক্ষেপের ফলেই ক্ষমতা লাভ করেছে। কিন্তু রাশিয়ার ন্যায় বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেনি। উপরন্তু অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে নেগিকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
হাঙ্গেরির অভ্যুত্থান সম্পর্কে রাশিয়ার বক্তব্য হচ্ছে- এটি পাশ্চাত্য রাষ্ট্রগোষ্ঠীর চক্রান্তে একটি ফ্যাসিস্ট প্রতিবিপ্লব। পরবর্তীকালের হাঙ্গেরির ঘটনাপ্রবাহ খুব নাটকীয়। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে ক্রুশ্চেভের পতনের পর থেকে হাঙ্গেরির শাসননীতিতে অনেক পরিবর্তন আসে। স্ট্যালিন যুগের সহানুভূতিহীন একপক্ষীয় নীতির স্থলে * সহানুভূতিশীল নীতি কার্যকর হয়। ফলে যে সকল বুদ্ধিজীবী পূর্বে কমিউনিস্ট শাসন ভয়ে সমর্থন করতেন, তারা শাসকবর্গ থেকে বিছিন্ন হতে শুরু করেন। লেখক সংঘে ভাঙন ধরে, সাংবাদিকরা অধিক অবাধ রিপোর্ট প্রকাশের দাবি জানান। এ সময় গর্বাচেভের সংস্কারনীতি ঘোষিত হলে হাঙ্গেরির ঘটনাপ্রবাহ খুব দ্রুততার সাথে ঘটতে থাকে। হাঙ্গেরিতে পরিবর্তন আবশ্যক, সেটা সবাই বুঝলেও কীভাবে আসবে তা নিয়ে মতবিরোধ ছিল। এর মূলে ছিল ভঙ্গুর অর্থনীতি। অর্থনৈতিক সংস্কার দিয়ে এ অবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়; কমিউনিস্ট দলের নিয়ন্ত্রণের শিথিলতাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের বসন্তকালে হাঙ্গেরির অবস্থা অত্যন্ত অনিশ্চিত ও নাজুক হয়ে পড়ে। শাসক কাদারও অবস্থার উন্নতির জন্য সঠিক কোনো সমাধান দিতে পারেননি। অবশেষে অন্যান্যের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কাদার দলীয় বৈঠক করতে বাধ্য হন। প্রতিপক্ষ তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে। 'গ্রসজ'-এর নেতৃত্বে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন হয়নি।
১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে সর্বদলীয় বৈঠকে ক্ষমতা হস্তান্তর ও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়। নতুন শাসনতন্ত্র রচনার কাজ আইন মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়। দল-মত-নির্বিশেষে সকলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়। হাঙ্গেরিই প্রথম পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে বহুদলীয় গণতন্ত্র পদ্ধতি চালু করে। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট 'জোরস' হাঙ্গেরিকে 'জনগণের প্রজাতন্ত্রের' স্থলে শুধু 'প্রজাতন্ত্র' বলে সরকারিভাবে ঘোষণা দেন। এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় দেশটি কমিউনিস্ট শাসন ও সোভিয়েতমুক্ত হয়। বর্তমানে হাঙ্গেরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগী সদস্য।
রুমানিয়া
Romania
পূর্ব ইউরোপীয় বিপ্লবের হিংসাত্মক রূপ পরিচালিত হয় রুমানিয়ায়। রুমানিয়ার শাসক এককভাবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করতেন। স্ট্যালিনদের দলীয় পলিটব্যুরোর চরম ক্ষমতার চেয়েও নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ছিল রুমানিয়ার শাসক চসেঞ্চুর। এজন্য ইউরোপীয় অন্যান্য দেশের ক্ষমতা বদলের চিত্র আর রুমানিয়ার ক্ষমতা বদলের চিত্র ভিন্ন। ইউরোপীয় বিপ্লবের চরম নিষ্ঠুর রূপ রুমানিয়ায় পরিলক্ষিত হয়। অন্যান্য দেশে বিপ্লবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা ধারাবাহিকতা ছিল। ১৯৫৬ বা ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হয়, যার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৮৯-৯১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। কিন্তু রুমানিয়ার স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তাই এটাকে বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান বলা যায়। যদিও সে দেশের জনগণ এটাকে 'ডিসেম্বরের অলৌকিক ব্যাপার' বলে মনে করে।

রুমানিয়ায় সোভিয়েত কর্তৃত্ব পূর্ববর্তী ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর পটভূমিকার মতোই প্রতিষ্ঠিত হয়। কমিউনিস্ট শাসক চসেন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নের সৃষ্ট হলেও বিদেশনীতিতে তিনি রাশিয়ার ন্যায় সহাবস্থানে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি চীনা কমিউনিজমে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং গুরুত্ব দিতে থাকেন। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্ব কমিউনিস্ট সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটিতে রাশিয়া ও রুমানিয়ার পার্থক্য স্পষ্ট হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও চেকোস্লোভাকিয়ায় হস্তক্ষেপ রুমানিয়া সমর্থন করেনি। রুমানিয়া পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী হয়ে ওঠে। চসেস্কুর এসব ধৃষ্টতা দেখে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা অনেকেই শঙ্কিত ছিলেন, যেকোনো সময় রুমানিয়ায় হাঙ্গেরির মতো সোভিয়েত সেনাবাহিনী প্রবেশ করবে। বরং উল্টোটাই ঘটে। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের জুনে রুমানিয়া-রাশিয়া ২০ বছরের মৈত্রী চুক্তি সম্পাদিত হয়। সম্ভবত হাঙ্গেরির তিক্ত অভিজ্ঞতায় রাশিয়া রুমানিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি।
রুমানিয়ার কমিউনিস্ট শাসন আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিতভাবে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে ডিসেম্বর অবসান হয়। চার দশকেরও অধিককাল যাবৎ চলতে থাকা চসেস্কুর শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে নিষ্ঠুর পরিণতির মধ্য দিয়ে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে 'টিমিসোয়ায়' যে গণ-অসন্তোষ শুরু হয় তা ঐদিনই রুমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে চরম আকার ধারণ করে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিকোলাই চসেন্ধু সরকার ও রুমানিয়ার কমিউনিস্ট দলের পতন ঘটায়। এ ধরনের একটি গণজাগরণ কয়েক সপ্তাহ পূর্ব পর্যন্তও ছিল কল্পনাতীত।
২২শে ডিসেম্বর সকাল ১১টায় চসেস্কু হেলিকপ্টারযোগে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় অফিস ত্যাগ করলে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী পার্টি অফিস দখল করে নেয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে 'জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট' গঠন করা হয়। যাদের নিয়ে এ ফ্রন্ট গঠন করা হয় তার নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক দলীয় আমলা ইলিয়েন্ধু ও অন্যান্য ভিন্নমত পোষণকারী নেতা। দীর্ঘদিনের কমিউনিস্ট শাসক চসেন্ধু সস্ত্রীক পালিয়ে যাওয়ার সময় 'জাতীয় মুক্তিফ্রন্টের' কর্মীদের হাতে ধরা পড়েন। মুক্তিফ্রন্টের একজন মুখপাত্র জনসমক্ষে বিচারের অঙ্গীকার করেন। ২৫শে ডিসেম্বর ঘোষণা করা হয় যে, একটি গোপন সামরিক আদালতে চসেস্কুর বিচার সম্পন্ন হয়েছে, তাদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তা সাথে সাথে কার্যকর করা হয়েছে। দ্রুতগতিতে তার বিচার ও মৃত্যুদণ্ড রহস্যময় বিষয়। এ ব্যাপারে জাতীয় মুক্তিফ্রন্টের ব্যাখ্যায় বলা হয়, অনেকগুলো জীবন রক্ষা পেয়েছে। চসেন্ধুর প্রতি অনুগতদের শিক্ষা দিতেই এ গর্হিত কর্মটি করা হয়েছে।
চসেস্কুর প্রতি জনতার রুদ্ররোষের কারণ হিসেবে বলা যায় যে, তিনি স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে সরকারি উচ্চ পদসমূহে পরিবারের লোকজনকে বসিয়েছিলেন। ক্ষমতাকে বংশানুক্রমিক করার ব্যবস্থা জনরোযাগ্নি ও তার নিষ্ঠুর পরিণতির কারণ।
পূর্ব ইউরোপের বিপ্লবের দ্বারা নির্বাচিত ৩টি দেশে ক্ষমতার পালাবদল শুধু ঘটেনি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কমিউনিস্ট শাসনের অবসান হলেও কোনো কোনো দেশে নতুনরূপে সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কাজেই কমিউনিজম পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে তা নয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এসব দেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কারণ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমাতাসুলভআচরণ তাদের ইউরোপের মূলধারায় প্রবেশের সুযোগ দেয়নি, বিশেষ করে রুমানিয়াকে।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
সমাজতন্ত্রের আদর্শ বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ও মানব-ইতিহাসকে প্রভাবান্বিত করেছে। সমাজতন্ত্র একটি। মতাদর্শ। ধনী-গরিবের পার্থক্য দূরীকরণ, অনাহারী মানুষের যন্ত্রণা দূর, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি প্রদান ইত্যাদি বিষয় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ যেমন সুগম করে, তেমনি এগুলো পূরণে ব্যর্থতা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শকে অনাদৃত করেছে। মানবজাতির ইতিহাসে শ্রেণি সংগ্রাম একটি আলোচিত বিষয়। শ্রেণিবৈষম্য দূর করে শ্রেণিগত সাম্য প্রতিষ্ঠাই সাম্যবাদের বৈশিষ্ট্য ছিল। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহে সাম্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় ঐ রাষ্ট্রগুলোতে পুঁজিবাদ বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র পতনে প্রত্যক্ষ যে ফলাফল লক্ষণীয় তার আলোকেই এর প্রভাব ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বা সাম্যবাদের চিন্তাধারার অর্থাৎ মতাদর্শের শিবির, অন্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী শিবির। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি (পাঠ: ৮.৩-এ বর্ণিত) ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের পতন সমকালীন হওয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর প্রভাব লক্ষণীয়। ইতিমধ্যে সমাজতন্ত্র পতনের তিন দশক অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। উক্ত সময়ের পুরোপুরি প্রভাব ও ফলাফল
ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন। কেননা এটি রাজনৈতিক ইতিহাসের সাম্প্রতিক বিষয়।
ইউরোপকে কেন্দ্র করে পূর্বে যে জটিল রাজনৈতিক মেরুকরণ হয়েছিল, সমাজতন্ত্র পতনের ফলে বর্তমানে তা অনুপস্থিত। নতুন করে স্থিতি-সাম্য পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে গড়ে উঠছে। পূর্ব ইউরোপের কোনো কোনো দেশে কমিউনিস্টরা নতুন নামে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করলেও একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতার ক্ষমতাচর্চা বর্তমানে নেই। কমিউনিস্টরা পূর্ণাঙ্গরূপে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখন আর রাখে না। অর্থাৎ তাদের ক্ষমতার দাপট স্তিমিত পর্যায়ে, যা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পতনের অন্যতম প্রভাব বলা যায়।
সমাজতন্ত্র যেসব রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সে রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে কখনো সবল ছিল না (পূর্ব জার্মানি ব্যতীত)। যে রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের তাঁবেদার ছিল সেগুলো সাম্যবাদী মতাদর্শ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেনি। আবার যেগুলো রাশিয়া নিজ দখলে নিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, সে রাষ্ট্রগুলো চাপিয়ে দেওয়া মতবাদকে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করেনি। ঐ রাষ্ট্রগুলোতে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রসারিত হওয়ার মূল কারণ ছিল শ্রমিক অসন্তোষ। মূলত শ্রমিক অসন্তোষের জন্যই প্রথম দিকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ঐসব দেশে শ্রমিকদের দ্বারা আদৃত হয়। কিন্তু সকল ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় এবং পুঁজিবাদের চাকচিক্যে ঐসব দেশের জনগণ এ মতাদর্শ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো থেকে সমাজতন্ত্রের পতন সমসাময়িক বিধায় এর প্রভাব ও ফলাফলের সাদৃশ্য বিদ্যমান। নিম্নলিখিতভাবে তা ব্যাখ্যা করা যায়:
প্রথমত: সমগ্র বলকান অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য সোভিয়েত ইউনিয়নের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। শক্তির ব্যাপক বিকাশ রাশিয়া এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছিল; যা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অনুকূলেই ছিল। বর্তমানে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে।
দ্বিতীয়ত: পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক বলয়ে আবদ্ধ রাষ্ট্রগুলো আজ অন্য রাষ্ট্রের কাছে উন্মুক্ত। সমাজতন্ত্র চর্চাকালীন অর্থাৎ পতনের পূর্ব পর্যন্ত এ রাষ্ট্রগুলো এক ধরনের রক্ষণশীলতার মোড়কে আবৃত ছিল। আজ এগুলোতে উদারনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বিভিন্ন দেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠছে। এককালের অজানা রাষ্ট্রগুলো আজ জানার আওতায় আসছে।
তৃতীয়ত: বৃহৎ দুই শিবিরের মধ্যে যে মতাদর্শগত লড়াই চলে আসছিল এবং যা স্নায়ুযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল, তা বর্তমানে নেই। সাম্যবাদের সাথে পুঁজিবাদের দ্বন্দ্বের অবসান হয়েছে। তবে পুঁজিবাদ বনাম পুঁজিবাদের দ্বন্দ্ব অথবা পুঁজিবাদ বনাম মৌলবাদের (ইসলাম) দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। সমাজতন্ত্র পতনের ফলেই এ নতুন দ্বান্দ্বিকতার সৃষ্টি।
চতুর্থত: বিশ্ব রাজনীতি থেকে দ্বিমেরুকরণবাদের অবসান হয়েছে। শক্তি-সাম্য যা আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচিত বিষয়, তা বর্তমানে নেই। শীতল দ্বীমেরুকরণ পদ্ধতির অবসান সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র পতনের ফল।
পঞ্চমত: সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহকে কেন্দ্র করে যে অস্ত্রব্যবসা রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ করত, তা আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। অর্থাৎ সকল ক্ষেত্রেই আজ এককেন্দ্রিকতার প্রভাব লক্ষণীয়। সবকিছুর নিয়ন্তা আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
ষষ্ঠত: সমাজতন্ত্রের পতন হওয়ায় আজ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে তৎপর হয়ে উঠছে। অস্ত্রব্যবসা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে। বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তি-সাম্য বর্তমানে অনুপস্থিত। তবে যে বাণিজ্য লড়াই শুরুর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো (জাপান বনাম ই. ইউ. অথবা জাপান বনাম যুক্তরাষ্ট্র অথবা যুক্তরাষ্ট্র বনাম ই. ইউ.) আবার স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে কি না তা হয়তো পরবর্তী দশকে দেখা যাবে।
সপ্তমত: যৌথ নিরাপত্তা ধারণাটি বর্তমানে পরিত্যক্ত হতে চলেছে। ওয়ারস সামরিক জোটের কার্যক্রমে আর গতিশীলতা নেই। বরং এটি মৃতপ্রায় সংগঠনে পরিণত হয়েছে। পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও আজ ন্যাটোর সদস্য পদ লাভের জন্য উৎসুক।
অষ্টমত: রাষ্ট্রগুলো থেকে সমাজতন্ত্র বিদায় নেওয়ায় রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সম্পর্ক ও নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদারনীতিবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পূর্বে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে তিক্ত সম্পর্ক ছিল তা বর্তমানে নেই। রাজনীতির জটিলতা অনেকটা কমেছে। বলকান রাষ্ট্রগুলোতে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে।
নবমত: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মতাদর্শগত লড়াইকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়েছিল তার প্রকটতা কমেছে। সমাজতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের ইন্ধনে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে যে অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজমান ছিল তা বর্তমানে নেই। এ দেশগুলোতে আজ রাজনৈতিক পরিবেশ মোটামুটি স্থিতিশীল। মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলো, যেগুলোতে আগে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল, সে রাষ্ট্রগুলো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত হলে এতদঞ্চলের উন্নয়নে আরও অধিক ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
Collaps of Berlin Wall
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, বার্লিন সমস্যা তারই একটি অংশ। বার্লিন সমস্যার শুরু যুদ্ধোত্তর যুগেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ঐক্যবদ্ধ জার্মানির রাজধানী বার্লিন সোভিয়েত বাহিনীর দখলে চলে যায়। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে এপ্রিল থেকে সমগ্র বার্লিনের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা সোভিয়েত সেনাধ্যক্ষ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। ইয়াল্টা ও পটসডাম চুক্তি অনুযায়ী জার্মানিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। সে উদ্দেশ্যে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী (যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স) ও রাশিয়া অধিকৃত ৪টি অঞ্চলে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য একটি মিত্রপক্ষীয় নিয়ন্ত্রণ কমিশন নিযুক্ত করে। উল্লেখ্য যে, জার্মানিকে উল্লিখিত ৪টি রাষ্ট্র চার ভাগে ভাগ করে নিজেদের মতো করে শাসন করে আসছিল। নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সদর দপ্তর বার্লিনে অবস্থিত হওয়ায় পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর সৈন্যরা বার্লিনে প্রবেশ করে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে পশ্চিমা শক্তি নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে অসহযোগিতার কারণে কমিশনের কার্যক্রমে ভাটা পড়ে।

ইতিপূর্বে জার্মানির পশ্চিমাংশকে মিত্রত্রয় ত্রিপক্ষীয় এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। অর্থাৎ দখলি স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে শক্তিবর্গ জার্মানিকে এরূপ করার কারণ সাম্যবাদভীতি। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর আশঙ্কা ছিল, সোভিয়েতের সাম্যবাদের আদর্শ পশ্চিমাংশে প্রসার লাভ করতে পারে। প্রসার ঘটলে রাশিয়া জার্মানিকে বিরোধী ঘাঁটিতে পরিণত করবে।
ভূরাজনৈতিক কারণে জার্মানির গুরুত্ব মিত্রজোটের কাছে যেরূপ ছিল, রাশিয়ার কাছেও তদ্রূপ ছিল। দুই শক্তিশিবিরের এরূপ প্রতিযোগিতার ফলে জার্মানিকে অর্থনৈতিকভাবে একই এলাকা হিসেবে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২০শে জুন ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমাংশের নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রত্রয় তাদের অধিকৃত এলাকায় মুদ্রাব্যবস্থার সংস্কার করে নতুন মুদ্রা 'মার্ক' চালু করে। মুদ্রাব্যবস্থা প্রবর্তনের দ্বিতীয় দিনে সমগ্র বার্লিনে সোভিয়েত রাশিয়া মুদ্রাব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২৩শে জুন থেকে তা কার্যকর হবে বলে ঘোষণা করে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পশ্চিমা শক্তিবর্গ সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘোষণাকে অবৈধ ও বাতিল বলে ঘোষণা দিয়ে তাদের প্রবর্তিত মুদ্রা সংস্কার ব্যবস্থাকে কার্যকরী করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্থনীতি পৃথকীকরণের পশ্চিমাদের ব্যবস্থা অকার্যকর করতে উদ্যোগ নেয়। পূর্ব বার্লিনের সাথে যোগাযোগের পথ অবরুদ্ধ করে রাখে; যা প্রথম বার্লিন সংকটের জন্ম দেয়। এ অবরোধের উদ্দেশ্য ছিল, বার্লিনের পশ্চিমাংশের বেসামরিক জনগণের উপর অমানসিক চাপ সৃষ্টি করা, যাতে পশ্চিমা শক্তি বার্লিন ত্যাগে বাধ্য হয়।
এ সময় পূর্ব বার্লিনের সোভিয়েত সেনাধ্যক্ষ 'সকলোভস্কি' পশ্চিমা শক্তিবর্গকে বার্লিন ছেড়ে যাওয়ার দাবি জানান। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তি-জোট যথেষ্ট দৃঢ়তার পরিচয় দেয় এবং বার্লিনে তাদের অধিকার ধরে রাখতে সংকল্পবদ্ধ হয়। পশ্চিম বার্লিনের জনসাধারণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিমান থেকে প্রচুর খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করে এক বিরাট পরিকল্পনা কার্যকর করে, যা ইতিহাসে বিরল। মার্কিনিদের এ মনোভাবই প্রমাণ করে, সোভিয়েত চাপ যতই হোক নতিস্বীকার করা যাবে না।
৬ই জুলাই ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমা শক্তিবর্গ বার্লিনে তাদের প্রবেশাধিকারের বৈধতা আছে বলে দাবি জানায়। জবাবে রাশিয়া জানায় যে, পশ্চিমা শক্তি ইয়াল্টা ও পটসডাম চুক্তি লঙ্ঘন করে পশ্চিমাংশে সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে মুদ্রাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। অবশেষে বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত হয়। রাশিয়া ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করলে এর কোনো সুষ্ঠু সমাধান হয়নি। ফলে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে পশ্চিমা শক্তিবর্গ নবসংস্কারকৃত জার্মান মার্ক জার্মানির পশ্চিমাংশের একমাত্র বৈধ মুদ্রা বলে চালু করে।
অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বর নরম হয়। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে যোগাযোগব্যবস্থার উপর অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। এভাবে প্রথম বার্লিন সংকটের মীমাংসা হয়। দশ বছর চলার পর দ্বিতীয় বার্লিন সংকটের উদ্ভব হয়। ১০ই জুলাই, ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে পূর্ব জার্মান নেতা "ওয়াল্টার উলব্রিখত' বক্তৃতায় বলেন, "জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের মধ্যে অবস্থিত পশ্চিম জার্মানি ঠাণ্ডা লড়াইয়ের একটি দ্বীপ।"' সোভিয়েত ইউনিয়ন এ সময় বার্লিনে পশ্চিমা শক্তিবর্গের অধিকারের বিরুদ্ধে প্রবল সমালোচনা করা শুরু করে। পটসডাম চুক্তির স্থিতাবস্থা বজায় না রাখার জন্য রাশিয়া পশ্চিমাদের দোষ দেয়। পশ্চিম বার্লিন উন্মুক্ত নগরী বলে দাবি করে। রাশিয়া চরমপত্রের মাধ্যমে পশ্চিমাদের ছয় মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানায়। দ্বিতীয় বার্লিন সংকটটি 'সময়সীমাসংক্রান্ত সংকট' নামে অভিহিত।
১৬ই ডিসেম্বর ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে আটলান্টিক পরিষদে বিষয়টি উত্থাপিত হলে বলা হয়, কোনো রাষ্ট্রেরই আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘনের অধিকার নেই। বার্লিন সমস্যার যৌথভাবে সমাধান হওয়া উচিত। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ক্রুশ্চেভ আলোচনায় বসতে রাজি হন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোটামুটিভাবে বার্লিন নিয়ে আর বড় কোনো সংকটের উদ্ভব হয়নি।
১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসন বার্লিন সফর করলে বার্লিন সংকট আবার চাঙ্গা হয়। জনসন পশ্চিমা জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাত্রার প্রতি বার্লিনবাসীকে প্রলোভন দেখালে পূর্ব বার্লিনবাসী দারুণভাবে আকৃষ্ট হয়। হাজার হাজার পূর্ব জার্মান নাগরিক পাশ্চাত্যে চলে যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে পশ্চিম বার্লিনের দিকে ধাবিত হতে থাকে। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ইতিমধ্যে পশ্চিম ও পূর্ব বার্লিনের মানুষের মধ্যে জীবনযাত্রার মানে বেশ পরিবর্তন ও পার্থক্য দৃশ্যমান হয়ে গিয়েছিল। তাদের পূর্ব বার্লিনে ফিরে আসার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও কোনো কাজ হয়নি। বরং পূর্ব বার্লিনবাসী আরও অধিক হারে পশ্চিমের দিকে পালাতে থাকে। এ ধরনের বহুসংখ্যক লোকের বহির্গমন রোধকল্পে পূর্ব জার্মান সরকার ১২ই আগস্ট পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মধ্যকার সীমারেখা বন্ধ করে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরামর্শে নাগরিকদের বহির্গমন ঠেকানোর জন্য পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের সীমারেখা বরাবর ১৫৫ কি.মি. দীর্ঘ সিমেন্টের দেয়াল দিয়ে পৃথক করে ফেলে। এটাই হলো বার্লিন প্রাচীর নির্মাণের পটভূমির ইতিহাস। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ক্রিসমাসের (এদিন দুই জার্মানির মতৈক্য হয়) পূর্ব পর্যন্ত বার্লিনের দুই অংশের বাসিন্দারা কেউ কারও মুখ দেখেনি।
গর্বাচেভের উত্থানের পূর্ব পর্যন্ত বার্লিন সমস্যার জট আর খোলেনি। গর্বাচেভ ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের জুনে পশ্চিম জার্মানি সফর করতে গেলে রাশিয়া-পশ্চিম জার্মানি যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়। তাতে বলা হয়, সকল জাতি ও দেশের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার আছে। ফলে জার্মানির জাতি-রাষ্ট্র সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের কঠোর নীতির পরিবর্তে নমনীয় নীতি চালু হলে এবং ইউরোপীয় বিপ্লবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পূর্ব জার্মানিবাসী ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই নভেম্বর জাতি বিভক্তির প্রতীক বার্লিন দেয়াল ভেঙে ফেলে, যা জার্মানির একত্রীকরণের পথকে সুগম করে। তিন যুগেরও অধিককাল যে দেয়াল একটি শহর তথা একটি জাতি এবং একটি রাষ্ট্রকে পৃথক করে রেখেছিল, ভেঙে ফেলার মধ্য দিয়ে তার অবসান হয়। রক্তের সাথে রক্তের, ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের, মেয়ের সাথে মায়ের মিলন ঘটে।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
বিশ্ব ইতিহাসে জার্মান সমস্যা এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। জার্মান সমস্যা বিচ্ছিন্ন কোনো জাতীয় ঘটনা নয়; আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ে জার্মান একটি জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে বিরাজমান থাকলেও বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে এর বিভক্তির কারণে সমস্যার উদ্ভব হয়। সংকটের শুরু: হিটলারের নাৎসি বাহিনী পরাজিত হলে জার্মানিতে রাশিয়া ও ইঙ্গ-মার্কিন শক্তিজোট প্রবেশ করে। মূলত রাশিয়া ও পশ্চিমা শক্তির মধ্যে জার্মানকে কেন্দ্র করে যে মতাদর্শগত স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, সমস্যার শুরুও সেখান থেকেই। সংকটের উদ্ভবে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের বক্তব্যকে অনেকেই দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যুদ্ধোত্তর যুগে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরাজিত রাষ্ট্রের সাথে কী রকম আচরণ করা হবে তা ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের আটলান্টিক সনদে উল্লেখ ছিল। এতে বলা হয়, প্রত্যেক জাতিরই নিজ পছন্দমতো সরকার গঠনের অধিকার আছে, জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভৌগোলিক অবস্থার পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু চার্চিল ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মে ঘোষণা করেন যে, জার্মানির সাথে আচরণের বৈধ ভিত্তি হিসেবে কোনোভাবেই আটলান্টিক সনদকে ধর্তব্যে নেওয়া যাবে না। এ ঘোষণা থেকেই মূলত মিত্রশক্তিবর্গ (রাশিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র) পরাজিত জার্মানির সাথে আলাদা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে থাকে। রাশিয়ার সৈন্যবাহিনী জার্মানির রাজধানী বার্লিনে অবস্থান নেয়। সমগ্র বার্লিনের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা রাশিয়ার সেনাধ্যক্ষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। মিত্রশক্তির অন্য সদস্যরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রয়াস নেয়। মোটকথা, জার্মানি চতুর্শক্তির দ্বারা চার ভাগে ভাগ হয়ে শাসিত হতে থাকে। ফলে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য 'মিত্রপক্ষীয় নিয়ন্ত্রণ কমিশন' গঠন করা হয়। জার্মানির পশ্চিমাংশকে মিত্রত্রয় (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) ত্রিপক্ষীয় এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। এদের আশঙ্কা ছিল, বার্লিনের পূর্বাংশে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ থাকায় সেখানে যেভাবে সাম্যবাদের আদর্শ প্রসারিত হচ্ছে, তা পশ্চিমাংশেও প্রবেশ করতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জার্মানির গুরুত্ব বিজিত সকল শক্তির কাছে সমান ছিল। মিত্রশক্তি জোটের শক্তিত্রয় বার্লিনের পশ্চিমাংশে মুদ্রাব্যবস্থার সংস্কার করে নতুন মুদ্রা মার্ক চালু করলে বার্লিনকেন্দ্রিক স্নায়ুযুদ্ধ রাশিয়ার সাথে বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাশিয়াও সমগ্র বার্লিনে মুদ্রাব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিলে জার্মান সংকট আরও জটিল হয়।

১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত দখলকৃত পূর্বাংশে ফ্যাসিবাদবিরোধী দলসমূহ ও শ্রমিক সংঘকে রাজনীতি করার অনুমোদন দেওয়া হয়। পাঁচটি রাজ্য সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়; ১১টি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। ১৯৪৬-৪৭ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে পাঁচটি রাজ্য তাদের নিজ নিজ শাসনতন্ত্র রচনা করে। পশ্চিমাংশেও রাজনৈতিক দল গঠনের অনুমোদন ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে দেওয়া হয়। পশ্চিমাংশে ১৯৪৫-৪৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে অনেকগুলো রাজ্য গঠিত হয় এবং সেগুলোকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে জয়ী গণতান্ত্রিক দল নিয়োগকৃত সরকারের স্থলাভিষিক্ত হয়। উভয় অঞ্চলে একই রকম অর্থনৈতিক নীতি সম্পাদনের লক্ষ্যে মার্কিন প্রস্তাব রাশিয়া অগ্রাহ্য করলে জার্মানির মার্কিন ও ব্রিটিশ গভর্নর 'দ্বি-অঞ্চল চুক্তি' স্বাক্ষর করেন। সোভিয়েত তার দখলকৃত অঞ্চল পূর্বাংশে জার্মান অর্থনৈতিক কমিশন গঠন করে। ফলে জার্মান সংকট জটিলতর হয়। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসনতান্ত্রিকভাবে জার্মানি বিভক্ত না হলেও বাস্তবে জার্মানি ছিল মিত্রশক্তির দ্বারা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন একটা উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঞ্চল। শাসনতান্ত্রিকভাবে জার্মানি বিভক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই জুন অনুষ্ঠিত লন্ডন ইশতেহারের সুপারিশের ভিত্তিতে। পশ্চিমাঞ্চলের সামরিক গভর্নররা ১১টি রাজ্যের শাসকদের কাছে ফ্রাংকফুর্ট দলিলপত্র হস্তান্তর করেন। এতে গণপরিষদ গঠনের ফর্মুলা ও দখলদার বিধিসংক্রান্ত বিষয়ের উল্লেখ ছিল। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে সংসদীয় পরিষদ নির্বাহী কমিটির 'মৌলিক আইন' স্থির করে। বন হয় পশ্চিম জার্মানির রাজধানী। পশ্চিমাংশের শাসনতান্ত্রিক নাম হয় জার্মান ফেডারেল প্রজাতন্ত্র (Federal Republic of Germany), সংক্ষেপে এফআরজি। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের শাসনতন্ত্র পশ্চিম জার্মানিকে সামরিক দখলদারিত্বের কর্তৃত্ব থেকে মুক্তি দেয়। যদিও এফআরজি পূর্ণ সার্বভৌমত্ব পায় ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে।
এদিকে সোভিয়েত অধিকৃত অঞ্চলে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে সমাজতান্ত্রিক একতা দল (Socialist Unity Party) সোভিয়েত সামরিক কর্তৃপক্ষের সহায়তায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। একতা দল 'জার্মান জনগণের কংগ্রেস' গঠনের আহ্বান জানায়। এ লক্ষ্যে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়। পূর্বাংশের রাজধানী হয় বার্লিন এবং দেশের শাসনতান্ত্রিক নামকরণ করা হয় জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (German Democratic Republic), সংক্ষেপে জিডিআর, যা ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে কার্যকর হয়।
পশ্চিমাংশের ফেডারেল সরকার সামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কাজ শুরু করলেও সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত জিডিআর-এর শাসনকার্যে সামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ থেকে যায়।
জার্মানির একত্রীকরণের বিভিন্ন পর্যায়
১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে দুটি জার্মান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলেও ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝিতে তারা পরিপূর্ণ সার্বভৌমত্ব লাভকরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরাজিত জার্মানবাসী পুরনো জাতীয় একতার চেতনাকে সব সময় লালন করে এলেও উভয় শক্তির মতদ্বৈধের কারণে একত্রীকরণ-প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে। পুনরেকত্রীকরণের মূলনীতিতে বিশ্বাসী ছিল বলেই পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির সরকার একে অন্যকে স্বীকৃতি দিতে রাজি ছিল না। জার্মান ঐক্যের সমস্যার মূলে ছিল পশ্চিমা রাষ্ট্রজোট ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যকার পারস্পরিক অনাস্থা, অবিশ্বাস ও ভীতি। ঐক্যবদ্ধ জার্মানি যদি পশ্চিমা জোটে যোগ দেয় অথবা রাশিয়ার সাথে জোট বাঁধে, তবে ইউরোপের শক্তি-সাম্য বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এটাই ছিল তাদের পারস্পরিক সন্দেহ ও ভীতির মূল কারণ।
প্রথম পর্যায়: জার্মান ঐক্যের সমস্যাকে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাবমুক্ত করার জন্য ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়া প্রস্তাব করে যে, জার্মানি থেকে সকল বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার করা কর্তব্য। এ প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে জার্মান ঐক্যসংক্রান্ত অনেকগুলো দাবি পরস্পর কর্তৃক গৃহীত হলেও দুই জার্মানিকে সমপর্যায়ভুক্ত করা হয়নি। কেননা রাশিয়া এ সময় পূর্ব জার্মানিকে পৃথক স্বীকৃতির দাবি তোলে। পৃথকভাবে পূর্ব জার্মানি স্বীকৃতি পেলে ঐক্যপ্রক্রিয়া আরও বিলম্বিত হতো।
দ্বিতীয় পর্যায়: জার্মান ঐক্যের ব্যাপারে পরিস্থিতি জটিল হলে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপ বাড়তে থাকে। এ সমস্যার সমাধানের সহজ পথ ছিল শক্তি-দ্বন্দ্ব পরিহার করে শান্তির পথে অগ্রসর হওয়া। পোল্যান্ড এ সময় জার্মানি ও মধ্য ইউরোপকে আণবিক অস্ত্রবর্জিত এলাকা হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করে। পশ্চিম জার্মানি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র 'পাসিং টু' গ্রহণ করলে দুই জার্মানির ঐক্যের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। ন্যাটোর সাথে পশ্চিম জার্মানি ও ওয়ারসোর সাথে পূর্ব জার্মানি জোটবদ্ধ হয়। উভয় সামরিক সংস্থা ইউরোপের নিরাপত্তার স্বার্থে পরস্পর অনাক্রমণ চুক্তি সম্পাদন করলে জার্মানির ঐক্যের পথ সুগম হতো।
তৃতীয় পর্যায়: ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে উভয় জার্মানির শাসকদ্বয় (পশ্চিমের চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ড, পূর্বের প্রধানমন্ত্রী উইলি স্টুপ) সাক্ষাতে সম্মতি দিলে জার্মান ঐক্যের সম্ভাবনা দেখা দেয়। পারস্পরিক সংযুক্তির আকাঙ্ক্ষা তীব্র হওয়ায় রাশিয়ার 'লৌহ যবনিকা' জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। পূর্ব জার্মানির প্রেসিডেন্ট এরিক হোয়েনকার সংযুক্তির বিরোধী ছিলেন বলে তাকে অপসারণ করা হয়। পশ্চিমের প্রতি পূর্ব জার্মানির মানুষের আকর্ষণ এত বেশি ছিল যে, কয়েক হাজার মানুষ পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাড়ি জমায়। বহির্গমন রোধকল্পে সোভিয়েত পরামর্শে বার্লিন প্রাচীর দেওয়া হয়, যা জার্মান ঐক্যের প্রশ্নে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে। ঐক্যের ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনা চললেও পরাশক্তিগুলোর মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে তা বিলম্বিত হয়। দুই পরাশক্তির মধ্যে আন্তরিকতার অভাব ও ঝুঁকি নিতে অপারগতাই দুই জার্মানির ঐক্যপ্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে।
চতুর্থ পর্যায়: পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টিতে এ সময় সংস্কারবাদী নেতা মডারোকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ইতিমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে গর্বাচেভের আবির্ভাবে সমাজতন্ত্রের সংশোধনকল্পে যে সংস্কারনীতি গ্রহণ করা হয়, তা পূর্ব ইউরোপীয় বিপ্লবকে চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে ধাবিত করে। জার্মান বিভক্তির প্রতীক বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলা হলে দুই জার্মানির ঐক্যের পথে প্রধান বাধা দূর হয়। সীমানাসংক্রান্ত সমস্যা দূর করতে আরও এক বছর লাগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সীমারেখাই ঐক্যবদ্ধ জার্মানির সীমারেখা হবে বলে স্থির হয়।
পঞ্চম পর্যায়: ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে পূর্ব জার্মানিতে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে যে নির্বাচন হয় তাতে জার্মানির দ্রুত ঐক্যের পক্ষপাতী রক্ষণশীল দলগুলোর মৈত্রী জোট জয়লাভ করলে ঐক্যপ্রক্রিয়ায় গতি আসে। কিন্তু জার্মানির একত্রীকরণের জন্য প্রয়োজন ছিল চতুর্শক্তির ঐকমত্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া এই চতুর্শক্তি ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে মস্কোতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং ঐক্যবদ্ধ জার্মানি গঠনে তাদের মতামত ব্যক্ত করে। এই চুক্তিতে দুই জার্মানির প্রতিনিধিরাও স্বাক্ষর প্রদান করেন। ফলে জার্মানির একত্রীকরণে আর কোনো বাধা থাকল না। এই চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়।"
কাজেই দেখা যায়, জার্মানির একত্রীকরণে জার্মানিবাসীর ঐকান্তিকতা ও আগ্রহের কমতি ছিল না। বৃহৎ শক্তিগুলোর শক্তি-দ্বন্দ্বের কারণে জার্মানির একত্রীকরণ বিলম্বিত হয়। বিলম্ব হলেও জার্মান আজ একটি জাতি, একটি রাষ্ট্র, যার বর্তমান নাম Republic of Germany.
প্রভাব ও ফলাফল
বার্লিন প্রাচীরের অবসান ও জার্মানির একত্রীকরণের তাৎক্ষণিক প্রভাব ইউরোপের রাজনৈতিক ইতিহাসে লক্ষণীয়। তবে সুদূরপ্রসারী ফলাফলের প্রভাব ভবিষ্যৎ ইউরোপের রাজনীতিতে আরও বেশি পরিমাণ দৃশ্যমান হবে।
প্রথমত: জার্মানি একটি জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পর পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের শক্তিরূপে জার্মানি এখনো আত্মত্মপ্রকাশ করতে না পারলেও নিকট ভবিষ্যতে ইউরোপের এবং বিশ্বের একটি শক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তার অতীত ইতিহাস তা-ই বলে। তবে সামরিক দিক দিয়ে ইউরোপের প্রথম শক্তি জার্মানি এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে সে এখন - বিশ্বের তৃতীয় শক্তি, যা জার্মানি একত্রীকরণের একটি তাৎক্ষণিক ফল।
দ্বিতীয়ত: এককালের একঘরে জার্মানি আজ আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় অবদান রেখে বিশ্বের মূল শক্তিধারার সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, যা জার্মানির একত্রীকরণের ফলেই সম্ভব হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে জার্মানির অবস্থান বর্তমানে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের পরে।
তৃতীয়ত: সমীক্ষকদের ধারণা, জার্মানির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক উন্নয়নপ্রক্রিয়া অব্যাহত ও স্থিতিশীল থাকলে আগামী দশকে জার্মানি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পরাশক্তিগুলোর মাঝে অবস্থান নেবে; যা জার্মানি একত্রীকরণের একটি ইতিবাচক সাফল্য।
চতুর্থত: জার্মানির একত্রীকরণের ফলে প্রযুক্তিগত দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বিরাজমান শক্তি-জোটের প্রতি আবার হয়তো সামরিক হুমকির কারণ হতে পারে।
পঞ্চমত: জার্মানির একত্রীকরণ ইউরোপের সামগ্রিক জীবনযাত্রায় শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশ্ব শক্তি কাঠামোকে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে আন্দোলিত করছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন লাভের চেষ্টা জার্মানি ইতিমধ্যে ব্যক্ত করেছে। জার্মানি ছিল একসময় ইউরোপের পরাশক্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অপূরণীয় ক্ষতি পুষিয়ে উঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে আবার অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হয়। মিত্রশক্তির কূটকৌশলের ও শক্তিদ্বন্যের ফলে জার্মানি বিভক্ত হলেও ঐক্যবদ্ধ জার্মানি আবার শক্তিশালী হয়ে উঠবে। কেননা, জাতি-রাষ্ট্র জার্মানদের রয়েছে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনা। তাদের দেশপ্রেমে ও জাতীয়তাবোধে রয়েছে ঐক্যের সূর। তাই তারা শক্তিশালী শক্তিবর্গের দ্বারা নির্মিত বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ঐক্যবদ্ধ জার্মানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছে। অতীত অভিজ্ঞতাই বলে দেয়, জার্মানি আবার ইউরোপের শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান অচিরেই জানান দেবে।
জার্মানির এ সম্ভাব্য শক্তিকে সঠিক পথে ব্যবহার ও পরিচালিত করতে বিশ্বের বৃহৎ শক্তি যদি সহযোগিতা দেয়, তবে জার্মানির উন্নয়ন যেমন গতিশীল হবে, তেমনি সমগ্র বিশ্বের উন্নয়নে সহায়ক হবে।
প্রধান শব্দসমূহের ব্যাখ্যা
Explanation of Key Words
সিআইএস (CIS): সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সংস্থা CIS। এর পূর্ণরূপ
Commonwealth of Independent States. এটি গঠিত হয় ২১শে ডিসেম্বর ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে। সদস্যসংখ্যা '১২। এর সদস্য দেশ হলো রাশিয়া, আজারবাইজান, ইউক্রেন, বেলারুশ, মলদোভিয়া, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান, কিরঘিজস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও জর্জিয়া। সংস্থাটির সদর দপ্তর বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে অবস্থিত।
কনফেডারেশন: কতগুলো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র একত্রিত হয়ে কোনো সংস্থা গঠন করলে তাকে কনফেডারেশন বলে। স্নায়ুযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের ফলে শিথিল কনফেডারেশন গঠিত হয়।
কমনওয়েলথ: কমনওয়েলথ হলো সাবেক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত স্বাধীন ও আশ্রিত দেশসমূহ নিয়ে গঠিত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগঠন। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে কমনওয়েলথ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংস্থার প্রতীকী প্রধান ব্রিটেনের রানি। এর সদর দপ্তর মার্লবোরো হাউস, লন্ডন। প্রতিবছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় সোমবার কমনওয়েলথ দিবস পালিত হয়। এই সংস্থার সদস্য দেশের রাষ্ট্রদূতের পদবি হাইকমিশনার। সংস্থাটির বর্তমান সদস্য দেশ ৫৩টি।
ভোগবাদ: ভোগবাদ একটি দার্শনিক মতবাদ, যার দ্বারা পশ্চিমা বিশ্বের (পুঁজিবাদী বিশ্বের) জীবনব্যবস্থার কতিপয় দিক বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। মূলত অতিনিয়ন্ত্রিত সমাজতান্ত্রিক (সাম্যবাদী) দর্শনের চাপে পিষ্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণ ভোগবাদী আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করে। সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের এরূপ অত্যধিক ভোগবাদী মানসিকতার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন তড়িত গতিতে ভেঙে পড়ে।
স্যাটেলাইট স্টেট: যেকোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবাধীন অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রই স্যাটেলাইট স্টেট। এসব দেশ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীতিনির্ধারণের জন্য শক্তিশালী দেশের প্রতি অনুগত থাকে।
হেলসিংকি সম্মেলন: হেলসিংকি সম্মেলন বস্তুত পূর্ব ও পাশ্চাত্যের মধ্যে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সংলাপ ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি বহুজাতিক ফোরাম তৈরিতে সহায়তা করে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের ফলে উক্ত সম্মেলনই নব্বইয়ের শুরুর দিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তা Organization for Security and Co-operation in Europe হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
অক্টোবর বসন্ত: সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট স্ট্যালিনের শাসনামলের পর পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে উদারনীতির সরকার ক্ষমতায় আসে। পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট দল এ সময় স্বাধীনচেতা উদারনৈতিক নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত হতো। পোল্যান্ডের রাজনীতির ক্ষেত্রে এ উদার মনোভাবকে অক্টোবর বসন্ত বলা হয়
সংহতি আন্দোলন (Solidarity Movement): পোল্যান্ডের জাহাজ শ্রমিক নেতা লেস ওয়ালেসার নেতৃত্বে স্বাধীন শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন বিভিন্ন দাবিতে যে আন্দোলন শুরু করে সেটিই সলিডারিটি আন্দোলন। শ্রমিকদের রাজনৈতিক দলের নাম Solidarity এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত আন্দোলনের নাম হয় সলিডারিটি আন্দোলন বা সংহতি আন্দোলন। এ আন্দোলনের মূল দাবি ছিল- কৃষকদের প্রতি অবহেলা করা যাবে না। সোভিয়েত বলয় থেকে পোল্যান্ডকে মুক্ত করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল। তবে মূল উদ্দেশ্য ছিল পোল্যান্ডকে আর্থসামাজিক সংকট থেকে মুক্ত করার প্রয়াসে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা।
বলকান অঞ্চল: বলকান অঞ্চল বলতে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলকে বোঝায়। এর পূর্বে কৃষ্ণসাগর, পশ্চিমে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর, দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর। বলকান অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৫,৫০,০০০ বর্গকিলোমিটার। এ অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি লোকের বাস। বর্তমানে বলকান অঞ্চলে ১১টি রাষ্ট্র অবস্থিত। রাষ্ট্রগুলো হলো- আলবেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, বুলগেরিয়া, মন্টিনেগ্রো, গ্রিস, ম্যাসিডোনিয়া, সার্বিয়া, মলদোভিয়া, রুমানিয়া ও স্লোভেনিয়া।
পটসডাম চুক্তি: ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানির পটসডামে চার্চিল, ট্রুম্যান ও স্ট্যালিনের মধ্যে যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় তাই ঐতিহাসিক পটসডাম চুক্তি নামে পরিচিত। পটসডাম চুক্তিতে জার্মান অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, কোনিগসবার্গ শহর সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডে অবস্থিত জার্মানদের জার্মানিতে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়।
বার্লিন প্রাচীর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী মিত্রপক্ষ পরাজিত জার্মানিকে নিজেদের মধ্যে ৪ ভাগে ভাগ করে নেয়। সে হিসাবে জার্মানির পূর্বাংশে প্রতিষ্ঠিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়নকেন্দ্রিক সমাজতান্ত্রিক শাসন আর পশ্চিমাংশে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী শাসন। পুঁজিবাদী শাসনের প্রভাবে পশ্চিম জার্মানিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটে। পক্ষান্তরে পূর্ব জার্মানিতে কমিউনিস্ট শাসনের সমতার শৃঙ্খলাজনিত কঠোরতার কারণে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি গড়ে ওঠেনি। ফলে পূর্ব জার্মানিবাসী পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পশ্চিম জার্মানিতে পাড়ি দেওয়ার জন্য বার্লিনের দিকে ধাবিত হয়। এ বহির্গমন রোধকল্পে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরামর্শে পূর্ব জার্মানির GDR (German Democratic Republic) সরকার পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যে একটি কংক্রিটের দেয়াল তৈরি করে। ইতিহাসে এ দেয়ালই বার্লিন প্রাচীর নামে খ্যাত, যা ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ও ১৩ই আগস্ট মধ্যরাতে নির্মাণ করা হয়। এ প্রাচীরটি ছিল সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের বিভাজনরেখা এবং জার্মান জাতির বিভক্তির প্রতীক। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই নভেম্বর জার্মান জাতির বিভক্তির প্রতীক বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়।
অনুগ্রহ রাষ্ট্র: পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে (পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, যুগোশ্লাভিয়া, আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া) সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ও আদর্শ প্রতিষ্ঠিত ছিল বিধায় এ রাষ্ট্রগুলোকে সোভিয়েত ইউনিয়নের 'অনুগ্রহ রাষ্ট্র' বলা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এসব রাষ্ট্রে পুঁজিবাদের প্রভাব ও আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
Read more