Origin of Cold War
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্বে ও অব্যবহিত পরে পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা
প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি, যুগোশ্লাভিয়া,
আলবেনিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, সমস্যাজড়িত সমগ্র ইউরোপ ক্রমশ
সমাজতান্ত্রিক ব্লকের দিকে ধাবিত হবে। এ উপলক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপের দিকে তার শক্তি বৃদ্ধি
করবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন বুঝতে পারে যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন শক্তির
প্রতিযোগিতায় অনেক এগিয়ে গিয়েছে এবং অচিরেই সমগ্র ইউরোপের উপরও রাশিয়া আধিপত্য ও প্রাধান্য
লাভ করবে। এতে কেবল শক্তি-সাম্যই বিনষ্ট হবে না, সোভিয়েত সম্প্রসারণবাদ ভয়াবহ আকার ধারণ
করবে। এরূপ অবস্থা থেকেই মার্কিনিদের মনে সোভিয়েতবিরোধী মনোভাব দানা বাঁধতে শুরু করে। ফলে
স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন
করতে শুরু করে। যুদ্ধকালীন সহযোগিতা পর্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। মার্কিন পুঁজিবাদী শিবিরের সামরিক,
অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে তা প্রকটভাবে প্রতিফলিত হয়।
স্নায়ুযুদ্ধের সূচনার জন্য কোন শক্তি মূলত দায়ী সে সম্পর্কে সঠিক কোনো মন্তব্য করা দুষ্কর। দুটি প্রধান বৃহৎ শক্তি বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হলেও স্নায়ুযুদ্ধের সূচনায় অন্যান্য রাষ্ট্রের ভূমিকাও ছোট করে দেখা যাবে না। মার্কিন পর্যালোচকগণ স্নায়ুযুদ্ধের সূচনার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে দায়ী করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্প্রসারণবাদী আগ্রাসনকে প্রতিরোধ বা প্রতিহত করতে গিয়েই স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়, তা না হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল ভাবতে শুরু করত।
অনেকে মনে করেন, ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মার্চ 'ফুলটন' বক্তৃতায় চার্চিলের মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীতে ঠাণ্ডাযুদ্ধের সূচনা হয়। চার্চিল তার বক্তৃতায় বলেন, কেউ এ কথা বলতে পারে না, ভবিষ্যতে সোভিয়েত রাশিয়া ও মিত্ররা কী করবে। তার মতে, সোভিয়েত ইউনিয়ন বলপ্রয়োগের ভাষা ছাড়া কোনো ভাষা বোঝে না।' সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রতিহত করার জন্য চার্চিল ইংরেজ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রাতৃত্বমূলক ঐক্যের তত্ত্ব প্রচার করেন। চার্চিলের বক্তৃতার রেশ ধরেই 'ট্রুম্যান তত্ত্ব' ও 'মার্শাল পরিকল্পনা' তৈরি করা হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান প্রচার করতে থাকেন যে, ইউরোপের দেশসমূহে গণতন্ত্র বিপন্ন এবং তা উদ্ধার করার দায়িত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।
পুঁজিবাদ সম্পর্কে সোভিয়েত ইউনিয়নের ধারণা এবং কমিউনিজম সম্পর্কে মার্কিন ও ব্রিটিশ আতঙ্ক স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম কারণ। ইউরোপের রাজনৈতিক অঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাব সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনো সহজভাবে মেনে নেয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের বদ্ধমূল, ধারণা ছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন তারl
স্নায়ুযুদ্ধ: পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব
শক্তিকে খর্ব করতে বদ্ধপরিকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তি-সাম্য রক্ষার জন্য ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা এপ্রিল 'ন্যাটো' সামরিক জোট গঠন করলে সোভিয়েত ইউনিয়নও পাল্টা ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মে 'ওয়ারস জোট' গঠন করে সমুচিত জবাব দেয়। সুতরাং স্নায়ুযুদ্ধের সূচনার জন্য এককভাবে কাউকে দায়ী করা যায় না। এ দায়ভার বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোকেই গ্রহণ করতে হবে। নিচে স্নায়ুযুদ্ধের কারণগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-প্রথমত: স্নায়ুযুদ্ধের মুখ্য কারণ হলো বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যে পরস্পর সম্প্রীতির অভাব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে তিন বৃহৎ শক্তি ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কোনো প্রকার সৌহার্দ ও সম্প্রীতিমূলক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল না। শুধু যুদ্ধকালীন সাময়িকভাবে তিন বৃহৎ শক্তির মধ্যে আঁতাত গঠিত হয়। যুদ্ধ শেষে সকল সহযোগিতার পরিসমাপ্তি ঘটে।
দ্বিতীয়ত: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শগত দ্বন্দ্ব স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম কারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ব্যাপক আদর্শিক রাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধী বলে মনে করে। অপরপক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মডেলকে ধনীদের শোষণের হাতিয়ার ও সাম্যবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে। এরূপ আদর্শগত বিরোধী মনোভাব স্নায়ুযুদ্ধের সূচনায় সহায়ক হয়।
তৃতীয়ত: বিশ্বযুদ্ধের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া দুটি বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। সমগ্র ক্ষমতা এ দুটি শক্তিধর রাষ্ট্রের নিকট কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করে। প্রতিযোগিতার লড়াইয়ে উভয়ই নিজ নিজ শক্তি বৃদ্ধির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ফলে শুরু হয় পরস্পর ঠাণ্ডা লড়াই বা স্নায়ুযুদ্ধ। স্নায়ুযুদ্ধের সূচনার জন্য মারণাস্ত্রের উৎপাদন ও তা প্রয়োগের আশঙ্কা অনেকখানি দায়ী বলা যায়। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র আণবিক শক্তির অধিকারী ছিল। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত ইউনিয়ন আণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যকে খর্ব করে দেয়। পরবর্তী পর্যায়ে দুটি পরাশক্তিই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ আণবিক ও হাইড্রোজেন বোমা তৈরিতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। এরূপ প্রতিযোগিতামূলক শক্তি সঞ্চয় গরম যুদ্ধ বা সর্বাত্মক যুদ্ধ না ঘটালেও স্নায়ুযুদ্ধকে উত্তপ্ত রাখতে সাহায্য করে।
চতুর্থত: যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম আণবিক শক্তির অধিকারী হওয়ায় বিশ্বে তার মর্যাদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কিছুদিনের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নও একই ধরনের অস্ত্র উৎপাদন করায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উভয়ই সমমর্যাদাসম্পন্ন হয়ে পড়ে। ফলে উভয়ে পরস্পর মর্যাদার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। শক্তির প্রতিযোগিতায় অন্তরে একে অপরকে পরাহত করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে থাকে। প্রকাশ্য যুদ্ধ না হলেও শুরু হয় ঠাণ্ডা লড়াই।
পঞ্চমত: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান গ্রিসকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। তার লক্ষ্য ছিল গ্রিসে কমিউনিস্ট প্রভাব প্রতিরোধ করা এবং নিজের স্বার্থের অনুকূল সরকার প্রতিষ্ঠিত রাখা। সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিজমের প্রভাব থেকে যুদ্ধোত্তরকালে পশ্চিম ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক পুনর্গঠনমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যা মার্শাল পরিকল্পনা নামে খ্যাত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবে উপলব্ধি করে যে, ইউরোপের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ব্যতীত সাম্যবাদের প্রসার রোধ করা কোনো অবস্থায়ই সম্ভব নয়। সাম্যবাদ প্রতিরোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক হাতিয়ার প্রয়োগ করে, যা স্নায়ুযুদ্ধের কারণ।
ষষ্ঠত: বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রসার ও বিকাশ আন্তর্জাতিক বিশ্বে রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাত্রা বৃদ্ধি করে। প্রযুক্তিগত আবিষ্কার মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও আচার-আচরণকে প্রভাবিত করে। প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে মানসিক ও ক্ষমতার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্রসমূহ যুদ্ধে লিপ্ত না হলেও এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে জড়িয়ে যায়।
সপ্তমত: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তিলাভ করে স্বাধীনতা অর্জন করে। কর্তৃত্বের এ শূন্যতা পূরণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। ফলে স্নায়ুযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।
অষ্টমত: ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সিয়াটো চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার কারণে স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা আরও বেশি প্রকাশ পায়। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক জোটের এক শৃঙ্খল তৈরি করে বলা যায়। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ন্যাটো গঠিত হয়। জোটের প্রধান লক্ষ্য ছিল ১২টি রাষ্ট্রের নিরাপত্তারক্ষা, সোভিয়েত আক্রমণ প্রতিহত করা ও কমিউনিজমের প্রসার রোধ।
নবমত: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ন্যাটো গঠনে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিঃসন্দেহে খানিকটা ভীত হয়ে পড়ে। এরই কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার অনুসারী পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহকে একত্রিত করে ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারসোতে 'ওয়ারস জোট' গঠন করে। ওয়ারস চুক্তির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সদস্য দেশগুলোকে ন্যাটোর ভয়ভীতি থেকে রক্ষা করা। এভাবে পারস্পরিক পাল্টা জোট গঠনে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বিরাজমান বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে। ফলে স্নায়ুযুদ্ধাবস্থা চলতে থাকে।
মূলত স্নায়ুযুদ্ধের মূলে ছিল পরাশক্তিদ্বয়ের পারস্পরিক অসংগতি, জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও আদর্শগত মতভেদ।
স্নায়ুযুদ্ধ - পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই
Read more