সমাজতন্ত্রের আদর্শ বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ও মানব-ইতিহাসকে প্রভাবান্বিত করেছে। সমাজতন্ত্র একটি। মতাদর্শ। ধনী-গরিবের পার্থক্য দূরীকরণ, অনাহারী মানুষের যন্ত্রণা দূর, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি প্রদান ইত্যাদি বিষয় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ যেমন সুগম করে, তেমনি এগুলো পূরণে ব্যর্থতা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শকে অনাদৃত করেছে। মানবজাতির ইতিহাসে শ্রেণি সংগ্রাম একটি আলোচিত বিষয়। শ্রেণিবৈষম্য দূর করে শ্রেণিগত সাম্য প্রতিষ্ঠাই সাম্যবাদের বৈশিষ্ট্য ছিল। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহে সাম্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় ঐ রাষ্ট্রগুলোতে পুঁজিবাদ বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র পতনে প্রত্যক্ষ যে ফলাফল লক্ষণীয় তার আলোকেই এর প্রভাব ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বা সাম্যবাদের চিন্তাধারার অর্থাৎ মতাদর্শের শিবির, অন্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী শিবির। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি (পাঠ: ৮.৩-এ বর্ণিত) ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের পতন সমকালীন হওয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর প্রভাব লক্ষণীয়। ইতিমধ্যে সমাজতন্ত্র পতনের তিন দশক অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। উক্ত সময়ের পুরোপুরি প্রভাব ও ফলাফল
ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন। কেননা এটি রাজনৈতিক ইতিহাসের সাম্প্রতিক বিষয়।
ইউরোপকে কেন্দ্র করে পূর্বে যে জটিল রাজনৈতিক মেরুকরণ হয়েছিল, সমাজতন্ত্র পতনের ফলে বর্তমানে তা অনুপস্থিত। নতুন করে স্থিতি-সাম্য পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে গড়ে উঠছে। পূর্ব ইউরোপের কোনো কোনো দেশে কমিউনিস্টরা নতুন নামে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করলেও একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতার ক্ষমতাচর্চা বর্তমানে নেই। কমিউনিস্টরা পূর্ণাঙ্গরূপে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখন আর রাখে না। অর্থাৎ তাদের ক্ষমতার দাপট স্তিমিত পর্যায়ে, যা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পতনের অন্যতম প্রভাব বলা যায়।
সমাজতন্ত্র যেসব রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সে রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে কখনো সবল ছিল না (পূর্ব জার্মানি ব্যতীত)। যে রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের তাঁবেদার ছিল সেগুলো সাম্যবাদী মতাদর্শ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেনি। আবার যেগুলো রাশিয়া নিজ দখলে নিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, সে রাষ্ট্রগুলো চাপিয়ে দেওয়া মতবাদকে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করেনি। ঐ রাষ্ট্রগুলোতে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রসারিত হওয়ার মূল কারণ ছিল শ্রমিক অসন্তোষ। মূলত শ্রমিক অসন্তোষের জন্যই প্রথম দিকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ঐসব দেশে শ্রমিকদের দ্বারা আদৃত হয়। কিন্তু সকল ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় এবং পুঁজিবাদের চাকচিক্যে ঐসব দেশের জনগণ এ মতাদর্শ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো থেকে সমাজতন্ত্রের পতন সমসাময়িক বিধায় এর প্রভাব ও ফলাফলের সাদৃশ্য বিদ্যমান। নিম্নলিখিতভাবে তা ব্যাখ্যা করা যায়:
প্রথমত: সমগ্র বলকান অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য সোভিয়েত ইউনিয়নের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। শক্তির ব্যাপক বিকাশ রাশিয়া এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছিল; যা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অনুকূলেই ছিল। বর্তমানে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে।
দ্বিতীয়ত: পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক বলয়ে আবদ্ধ রাষ্ট্রগুলো আজ অন্য রাষ্ট্রের কাছে উন্মুক্ত। সমাজতন্ত্র চর্চাকালীন অর্থাৎ পতনের পূর্ব পর্যন্ত এ রাষ্ট্রগুলো এক ধরনের রক্ষণশীলতার মোড়কে আবৃত ছিল। আজ এগুলোতে উদারনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বিভিন্ন দেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠছে। এককালের অজানা রাষ্ট্রগুলো আজ জানার আওতায় আসছে।
তৃতীয়ত: বৃহৎ দুই শিবিরের মধ্যে যে মতাদর্শগত লড়াই চলে আসছিল এবং যা স্নায়ুযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল, তা বর্তমানে নেই। সাম্যবাদের সাথে পুঁজিবাদের দ্বন্দ্বের অবসান হয়েছে। তবে পুঁজিবাদ বনাম পুঁজিবাদের দ্বন্দ্ব অথবা পুঁজিবাদ বনাম মৌলবাদের (ইসলাম) দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। সমাজতন্ত্র পতনের ফলেই এ নতুন দ্বান্দ্বিকতার সৃষ্টি।
চতুর্থত: বিশ্ব রাজনীতি থেকে দ্বিমেরুকরণবাদের অবসান হয়েছে। শক্তি-সাম্য যা আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচিত বিষয়, তা বর্তমানে নেই। শীতল দ্বীমেরুকরণ পদ্ধতির অবসান সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র পতনের ফল।
পঞ্চমত: সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহকে কেন্দ্র করে যে অস্ত্রব্যবসা রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ করত, তা আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। অর্থাৎ সকল ক্ষেত্রেই আজ এককেন্দ্রিকতার প্রভাব লক্ষণীয়। সবকিছুর নিয়ন্তা আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
ষষ্ঠত: সমাজতন্ত্রের পতন হওয়ায় আজ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে তৎপর হয়ে উঠছে। অস্ত্রব্যবসা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে। বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তি-সাম্য বর্তমানে অনুপস্থিত। তবে যে বাণিজ্য লড়াই শুরুর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো (জাপান বনাম ই. ইউ. অথবা জাপান বনাম যুক্তরাষ্ট্র অথবা যুক্তরাষ্ট্র বনাম ই. ইউ.) আবার স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে কি না তা হয়তো পরবর্তী দশকে দেখা যাবে।
সপ্তমত: যৌথ নিরাপত্তা ধারণাটি বর্তমানে পরিত্যক্ত হতে চলেছে। ওয়ারস সামরিক জোটের কার্যক্রমে আর গতিশীলতা নেই। বরং এটি মৃতপ্রায় সংগঠনে পরিণত হয়েছে। পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও আজ ন্যাটোর সদস্য পদ লাভের জন্য উৎসুক।
অষ্টমত: রাষ্ট্রগুলো থেকে সমাজতন্ত্র বিদায় নেওয়ায় রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সম্পর্ক ও নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদারনীতিবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পূর্বে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে তিক্ত সম্পর্ক ছিল তা বর্তমানে নেই। রাজনীতির জটিলতা অনেকটা কমেছে। বলকান রাষ্ট্রগুলোতে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে।
নবমত: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মতাদর্শগত লড়াইকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়েছিল তার প্রকটতা কমেছে। সমাজতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের ইন্ধনে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে যে অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজমান ছিল তা বর্তমানে নেই। এ দেশগুলোতে আজ রাজনৈতিক পরিবেশ মোটামুটি স্থিতিশীল। মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলো, যেগুলোতে আগে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল, সে রাষ্ট্রগুলো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত হলে এতদঞ্চলের উন্নয়নে আরও অধিক ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
Read more