hsc

জাতিসংঘ এবং বিশ্বশান্তি (অধ্যায়-৬)

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.6k

United Nations and World Peace

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের ছয়টি প্রধান অঙ্গের অন্যতম জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বা United Nations Security Council (UNSC)। নিরাপত্তা পরিষদ ১৫ সদস্য নিয়ে গঠিত; এর মধ্যে স্থায়ী সদস্য ৫টি এবং অস্থায়ী সদস্য ১০টি দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী পাঁচ পরাশক্তি চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ী সদস্য।নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্য যেকোনো সিদ্ধান্তে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু বিতর্ক প্রতিরোধ বা শেষ করতে পারে না। এছাড়াও ১০টি অস্থায়ী সদস্য আছে, যারা নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে ২ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। নিরাপত্তা পরিষদের কাজ জাতিসংঘ সনদ দ্বারা সংজ্ঞায়িত। কোনো আন্তর্জাতিক শান্তির হুমকি পরিস্থিতির তদন্ত, বিবাদের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পদ্ধতির সুপারিশ, সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সমুদ্র, বাতাস,

ডাক ও রেডিও যোগাযোগ ছিন্ন করা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা, এমনকি সামরিক আক্রমণের ক্ষমতাও রাখে। নিরাপত্তা পরিষদ সাধারণ পরিষদের নতুন মহাসচিব এবং নতুন সদস্য দেশ অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করে থাকে। নিরাপত্তা পরিষদ ঐতিহ্যগতভাবে কেবল সামরিক নিরাপত্তার বিষয়টি দেখে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শত্রুভাবাপন্ন দেশ-অঞ্চল-জাতি-সম্প্রদায়ের মধ্যকার বিরোধ নিয়ন্ত্রণ ও সমাধান করতে জাতিসংঘের অধীনে বহুজাতিক কূটনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর ব্যবহারকে প্রচলিত অর্থে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বলা হয়ে থাকে। জাতিসংঘ পরিচালিত কার্যক্রমসমূহের মধ্যে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমই বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে প্রশংসিত হয়েছে। জাতিসংঘের দুই ধরনের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম রয়েছে- পর্যবেক্ষক দল ও শান্তিরক্ষা বাহিনী। এর মধ্যে পর্যবেক্ষকগণ সশস্ত্র থাকেন না। তারা বিবদমান গ্রুপ, গোষ্ঠী, জাতি, অঞ্চলের মধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিবাদ নিরসন ও শান্তি স্থাপন তদারক করেন। অন্যদিকে শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা শুধু আত্মরক্ষার কাজে হালকা অস্ত্র ব্যবহার করেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের প্রতীক হলো নীল শিরস্ত্রাণ।

শান্তিরক্ষা কার্যক্রম সাধারণত নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক গৃহীত হয়ে থাকে। জাতিসংঘের মহাসচিব এ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। এখানে উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না; শুধু সংকটকালে শাস্তি স্থাপনের কাজ করে। বহুল প্রশংসিত এ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক স্বীকৃতি ও সাফল্য অর্জন করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভবিষ্যৎ যুদ্ধ পরিহারের উদ্দেশ্যে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভার্সাই সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। এ সন্ধির অঙ্গ হিসেবে একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে জাতিপুঞ্জ আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে প্রথমে আন্তর্জাতিক এ সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বৃহৎ রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের কারণে তা ফলপ্রসূ হয়নি। লীগ অকার্যকর থাকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ বিভীষিকা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষকে বেশি মাত্রায় উদ্বিগ্ন করে তোলে। যুদ্ধকালীন রণকৌশল নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে মারাত্মক যুদ্ধের হাত থেকে বিশ্বকেমুক্ত রাখার লক্ষ্যে বৃহৎ শক্তিগুলো কূটনৈতিক পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রাখে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরির লক্ষ্যে অগ্রণী ভূমিকা নেন। তাদের ঐকান্তিক ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় জাতিসংঘের ভিত রচিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় সাত দশক নানা সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে জাতিসংঘ টিকে আছে। আন্তর্জাতিক ইতিহাস খুব দ্রুত পটপরিবর্তন করে। ইতিহাসের পথপরিক্রমায় জাতিসংঘের কার্যক্রম কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিষ্ফল হলেও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এর উদ্যোগ ও অবদান অস্বীকার করা যায় না। জাতিসংঘের গঠনপ্রক্রিয়ার ইতিহাস ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এর অবদান সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা থাকা উচিত। কেননা, ঐতিহ্যবাহী এ সংগঠন সৃষ্টির ইতিহাসে ক্ষুদ্র বাংলাদেশের ভূমিকা না থাকলেও বর্তমানে জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের বিস্ময়কর অবদান আছে।

জাতিসংঘ এবং বিশ্বশান্তি মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

আলকরা গ্রামে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যে কলহ বিবাদের নিষ্পত্তির জন্য গ্রামের মুরুব্বীরা মিলে Peace নামক সংগঠন গড়ে তোলে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই Peace সংস্থাটি প্রভাবশালীদের হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয় এবং গ্রামে শান্তি বিঘ্নিত হয়।

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

আলকরা গ্রামে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যে কলহ বিবাদের নিষ্পত্তির জন্য গ্রামের মুরুব্বীরা মিলে Peace নামক সংগঠন গড়ে তোলে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই Peace সংস্থাটি প্রভাবশালীদের হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয় এবং গ্রামে শান্তি বিঘ্নিত হয়।

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও।

মেজর জেনারেল সাকিল আহমদের নেতৃত্বে সম্প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দল আফ্রিকার একটি দেশে গমন করেছেন। তারা একটি বৃহৎ সংস্থার পতাকাবাহী গাড়িতে করে দেশটির বিভিন্ন স্থানে টহল দিচ্ছেন। সমস্যাসংকুল স্থানে রাস্তাঘাট সংস্কার, দুঃস্থদের সেবা প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম অত্যন্ত নিপুণভাবে সম্পন্ন করছেন।

নিরাপত্তা কার্যক্রম
মানবাধিকার কার্যক্রম
শান্তিরক্ষা কার্যক্রম
সংস্কার কার্যক্রম

পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা নতুন কিছু নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগের ফসল হলো UNO বা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ, যাকে আমরা জাতিসংঘ হিসেবে জানি। যুদ্ধকালীন মিত্রশক্তিবর্গের রাষ্ট্রনেতারা তাদের আলোচনা বৈঠকে ও ঘোষণাপত্রগুলোতে কতগুলো নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এ সম্মেলনগুলোতে শুধু সমরনীতিবিষয়ক সিদ্ধান্ত হয়নি, কতগুলো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছিল। যার ফল হিসেবে জাতিসংঘের উদ্ভব। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা ছিল আন্তর্জাতিক সংগঠনের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। বিশ্ব ইতিহাসের এক দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার আশার আলো প্রজ্বালন করে জাতিসংঘের জন্ম। এর আগে আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থায় কোনো সংগঠনই জাতিসংঘের মতো এত ব্যাপক বিস্তৃতি ও পরিধি নিয়ে মানবজাতির কল্যাণে আত্মপ্রকাশ করেনি। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের চার বছরের নিরলস প্রচেষ্টার ফসল হলো জাতিসংঘ।

লন্ডন ঘোষণা, ১৯৪১: জাতিসংঘের জন্মের সূচনা ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুন লন্ডনের জেমস প্রাসাদে। এ সময় জার্মানির নাৎসি আক্রমণের ভয়ে ইউরোপের মিত্রদেশের নেতৃবৃন্দ এবং অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। এসব দেশের নেতৃবৃন্দ চিরস্থায়ী শান্তির জন্য আগ্রাসনমুক্ত পৃথিবী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে 'লন্ডন ঘোষণায়' স্বাক্ষর করেন।

আটলান্টিক সনদ, ১৯৪১: দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল 'আটলান্টিক সনদ'। অক্ষশক্তির ক্রমাগত আক্রমণে যখন
মিত্রশক্তি কোণঠাসা, তখন (১৪ই আগস্ট, ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ) আটলান্টিক মহাসাগরে আগস্টা নামক যুদ্ধজাহাজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল মিলিত হয়ে আটলান্টিক সনদ স্বাক্ষর করেন। উক্ত সনদে যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে বিজয়ী ও বিজিত সকল জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও সীমানা সম্পর্কে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। স্থায়ী শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে আক্রমণকারীদের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাব আটলান্টিক সনদে গৃহীত হয়।

ওয়াশিংটন সম্মেলন, ১৯৪২: ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন
রুজভেল্ট ওয়াশিংটনে যে সম্মেলন আহ্বান করেন তাতে চীন, ব্রিটেন ও সোভিয়েত রাশিয়াসহ ২৬টি দেশ আটলান্টিক সনদকে অনুমোদন দেয়। আটলান্টিক সনদের ঘোষণাপত্রই 'জাতিসংঘ ঘোষণা' নামে পরিচিতি লাভ করে। আটলান্টিক সনদের ঘোষণাপত্রে বলা হয় যে, সনদে স্বাক্ষরকারী সকল রাষ্ট্র অক্ষশক্তির জোটের (জাপান, জার্মানি ও ইতালি) বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তি ও মানবিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যবহার দ্বারা অক্ষশক্তির পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। কেউ পৃথকভাবে Sett শত্রুর সাথে যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তি করবে না।

১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে কাসাব্লাংকায় চার্চিল ও রুজভেল্টের যে সম্মেলন হয় তা ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পরবর্তী পদক্ষেপ। এ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় যে, ইতালি বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ না করলে সিসিলির দিক থেকে ইতালিকে আক্রমণ করা হবে। একই বছর পূর্বোক্ত নেতৃবৃন্দের সাথে চীনের চিয়াং কাইসেক কায়রোতে মিলিত হন। এতে সিদ্ধান্ত হয়, জাপানকে তার বিজিত স্থানসমূহ প্রত্যর্পণে বাধ্য করা হবে। কোরিয়াকে স্বাধীনতাদানের বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পায়।

মস্কো সম্মেলন, ১৯৪৩: জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার অন্যতম পদক্ষেপ হলো ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরের মস্কো
সম্মেলন। এটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রীদের সম্মেলন। নাৎসি জার্মানির পরাজয়ের পর যে সকল সমস্যা উদ্ভবের আশঙ্কা ছিল তা-ই ছিল আলোচনার বিষয়। নাৎসিদের যুদ্ধকালীন অত্যাচার ও নিপীড়নের জন্য তাদের শাস্তি প্রদানের কথা আলোচনায় স্থান পায়।

তেহরান সম্মেলন, ১৯৪৩: ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের কূটনৈতিক
নেতৃবৃন্দ একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের অভিপ্রায়সংবলিত ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন। এ ঘোষণায় বলা হয়, এ সংগঠন সকল শান্তিপ্রিয় দেশের সার্বভৌম সমতার নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বৃহৎ-ক্ষুদ্র সকল শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্রই এ সংগঠনের সদস্য পদ লাভ করার অধিকারী হবে। নভেম্বরে রাশিয়ার স্ট্যালিনের সাথে চার্চিল ও রুজভেল্ট তেহরানে মিলিত হয়ে সকল রাষ্ট্রকে সংগঠনে যোগদানের ব্যাপারে একটি বিবৃতি দেন। তারা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, তাদের বিবৃতি বিশ্বে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে।

ডাম্বারটন ওকস সম্মেলন, ১৯৪৪ ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের (২১শে আগস্ট থেকে ৭ই অক্টোবর পর্যন্ত)
ওয়াশিংটনের নিকট 'ডাম্বারটন ওকসে' যে সম্মেলন হয় তাতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ব্রিটেনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। এটি ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতিমূলক বিশেষ সম্মেলন। জাতিসংঘের রূপরেখা ও কাঠামো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও নিরাপত্তা পরিষদের একক বিরোধিতার প্রস্তাব অর্থাৎ Veto প্রয়োগের অধিকার নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। তবে, ডাম্বারটন ওকসের সম্মেলনের প্রস্তাবানুযায়ী বিশ্ব সংগঠনের নামকরণ করা হয় UNO (United Nations Organisation) বা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ, যা জাতিসংঘ হিসেবে ব্যাপক পরিচিত।

ইয়াল্টা সম্মেলনে, ১৯৪৫: ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে ইয়াল্টা সম্মেলনে (৪-১১ই ফেব্রুয়ারি) নিরাপত্তা
পরিষদে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা ও ভোটদান পদ্ধতি নিয়ে স্ট্যালিন, চার্চিল ও রুজভেল্ট আলোচনা করেন। পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা অর্পণের সিদ্ধান্ত হয়। সানফ্রান্সিসকো শহরে এ তিন রাষ্ট্রনেতা পুনরায় মিলিত হয়ে ওকসের প্রস্তাবানুযায়ী UN-এর সনদ রচনার সিদ্ধান্ত নেন। ২৬শে জুন উক্ত শহরে ৫১টি দেশের অর্থাৎ পৃথিবীর ৮০% মানুষের প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেন।
সানফ্রান্সিসকো সম্মেলন, ১৯৪৫ সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন ও ফ্রান্সের
ঐক্যবদ্ধ চাপের ফলে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা স্বীকার করে নেওয়া হয়। উপস্থিত সকল রাষ্ট্রই জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষর করে। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে অক্টোবর সকল প্রতিনিধি রাষ্ট্রের এক মহাসম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সংগঠন জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা ১৯৩। বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য।
উপর্যুক্ত পটভূমিকায় বলা যায়, বিশ্বের বৃহৎ শক্তি ও নেতৃবৃন্দের দীর্ঘ কূটনৈতিক কর্মতৎপরতার ফসল হলো জাতিসংঘ, যার সূচনা 'লন্ডন ঘোষণার' মধ্য দিয়ে এবং পরিসমাপ্তি 'সানফ্রান্সিসকোর' মহামিলনের মধ্য দিয়ে। এর গঠনপ্রক্রিয়ার সাথে বৃহৎ শক্তিবর্গের যুদ্ধকালীন কূটনৈতিক তৎপরতা ও ভূমিকা লক্ষণীয়।

জাতিসংঘের উদ্দেশ্য

জাতিসংঘ সনদের ১ নং ধারায় এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। যুদ্ধ ও যুদ্ধভীতি থেকে মুক্ত একটি
আন্তর্জাতিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। নিচে উদ্দেশ্যসমূহ তুলে ধরা হলো:

১। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। শান্তির প্রতি ভীতি প্রদর্শনের প্রতিরোধ ও নির্মূলকল্পে যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ।
২। সকল জাতির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন। মানুষের অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত মর্যাদা হবে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের নীতি। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
৩। যুদ্ধের মূলোৎপাটনের জন্য ব্যাপকভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
৪। উপর্যুক্ত উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য জাতিসংঘকে সকল জাতির কার্যকলাপের সমন্বয়সাধনের কেন্দ্রে পরিণত করা।

জাতিসংঘের লক্ষ্যসমূহ

আগামী দিনের মানুষ যেন যুদ্ধ ও ধ্বংসের ভয়াবহ পরিণতি থেকে মুক্ত হয়ে এক সুন্দর ও সংঘাতমুক্ত পৃথিবী গড়তে পারে, সে অঙ্গীকার নিয়ে এর লক্ষ্যসমূহ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
১। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করা।
২। মৌলিক মানবাধিকার এবং সকল মানুষের সমানাধিকারের উপর আস্থা স্থাপন।
৩। যেকোনো সন্ধি ও আন্তর্জাতিক আইনের অন্যান্য সূত্র থেকে উদ্ভূত সকল বাধ্যবাধকতা ন্যায়-নীতি ও সম্মানের সাথে পালন করা।
৪। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, যেখানে ব্যাপক স্বাধীনতার পরিমণ্ডলের মধ্যে সামাজিক প্রগতি ও উন্নতি সুনিশ্চিত হয়।

জাতিসংঘের নীতিসমূহ

জাতিসংঘ সনদে ৭টি নীতির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। সকল সদস্য রাষ্ট্র নীতিগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের কাজকর্ম করবে বলে নীতিতে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
১। জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র সার্বভৌম ক্ষমতার নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। (তবে এ নীতিতে নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্যের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে)।
২। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র অন্য সদস্য রাষ্ট্রের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সনদে সংযোজিত বাধ্যবাধকতাসমূহ বিশ্বস্ততার সাথে প্রয়োগ করবে।
৩। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা যাতে ব্যাহত না হয়, আন্তর্জাতিক সমস্যাসমূহ নিষ্পত্তি করবে।। ত না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখেই শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের
৪। প্রতিটি রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকবে।
৫। সকল কাজের ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্র জাতিসংঘকে সাহায্য করবে।
৬। যারা জাতিসংঘের সদস্য নয়, তারা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে।
৭। জাতিসংঘ কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
সুতরাং বলা যায়, উপর্যুক্ত নীতি সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তরিকতার সাথে পালন করলে জাতিসংঘের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব।

জাতিসংঘের গঠন

প্রধানত ৬টি সংস্থা নিয়ে জাতিসংঘ গঠিত। যথা-
১। সাধারণ পরিষদ;
২। নিরাপত্তা পরিষদ;
৩। অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ;
৪। অছি পরিষদ;
৫। আন্তর্জাতিক আদালত এবং
৬। সচিবালয়।

জাতিসংঘের অধীন বা সহযোগী সংস্থার সংখ্যা ১৪; যেমন- ইউএনইপি (UNEP), ইউএনডিপি (UNDP), আংকটাড (UNCTAD), শিশু তহবিল (ইউনিসেফ-UNICEF), জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ব খাদ্য পরিষদ ইত্যাদি।
জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থা ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ১৭টি। যেমন- আইএলও (ILO), ডব্লিউএইচও (WHO), আইএমএফ (IMF), আইডিএ (IDA), ইউনেস্কো (UNESCO), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), বিশ্ব পোস্টাল ইউনিয়ন (UPU) ইত্যাদি।
সাধারণ পরিষদের গঠন: জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে সাধারণ পরিষদ গঠিত। বিশ্বের যেকোনো
শান্তিকামী রাষ্ট্র জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্য হতে পারে। প্রতিবছর একবার সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র ৫ জন সদস্য পাঠাতে পারে। কিন্তু প্রতিনিধি ৫ জন পাঠালেও সদস্য রাষ্ট্রের ভোটদানের অধিকার থাকে একটি। আন্তর্জাতিক শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সাধারণ পরিষদে তা আলোচনা করা হয়। নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের কাছে জোর সুপারিশ করে। সাধারণ পরিষদে বিশ্বের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনের প্রয়োজন হয়। সাধারণ পরিষদের সম্মতি ছাড়াও প্রস্তাবটি কার্যকরি করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের উপর নির্ভর করতে হয়। তবে বিশ্বশান্তি বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোনো বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হলে তা সাধারণ পরিষদে আলোচনা করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে উপযুক্ত সিদ্ধান্তের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটের মাধ্যমে তা কার্যকর করা যাবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে আরও কার্যকরী করার জন্য কয়েকটি রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক সংস্থাকে পর্যবেক্ষকের মর্যাদা দিয়েছে। এর মধ্যে সুইজারল্যান্ড, ভ্যাটিকান, পিএলও উল্লেখযোগ্য।

সাধারণ পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলি জাতিসংঘ সনদ সাধারণ পরিষদকে নানাবিধ কার্যসম্পাদনের ক্ষমতা প্রদান করেছে। যেমন- (ক) নির্বাচনমূলক, (খ) অর্থ সম্পর্কিত, (গ) সুপারিশমূলক, (ঘ) নির্বাহীসংক্রান্ত, (৫) শান্তির জন্য ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা, (চ) সহযোগী সংস্থা গঠন, (ছ) রিপোর্ট গ্রহণ ও পর্যালোচনা, (জ) উদ্যোগ গ্রহণ, (ঝ) আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা ইত্যাদি।
নিরাপত্তা পরিষদের গঠন: জাতিসংঘের মূল বিভাগ হলো নিরাপত্তা পরিষদ। জাতিসংঘের সব কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য নিরাপত্তা পরিষদকে জাতিসংঘের মেরুদণ্ড বলা হয়। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা ছিল ৫টি স্থায়ী ও ৬টি অস্থায়ী রাষ্ট্র। জাতিসংঘ প্রয়োজনীয়তার তাগিদে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করে। ফলে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩১শে আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র ৬টির স্থলে ১০টি হয়। ফলে ৫টি সদস্য স্থায়ী ও ১০টি অস্থায়ী রাষ্ট্রের সমন্বয়ে নিরাপত্তা পরিষদ গঠিত হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য ২ বছরের জন্য নির্বাচিত নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র আছে যাদের ভেটো ক্ষমতা আছে। বিশ্বের আলোচিত কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যদি কোনো একটি স্থায়ী রাষ্ট্র ভেটো প্রদান করে তাহলে সেটি আর অগ্রসর হতে পারে না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও চীন।

নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলি জাতিসংঘের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্রস্থল নিরাপত্তা
পরিষদ। নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই জাতিসংঘ নিজেকে একটি অত্যধিক ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থায় পরিণত করেছে; যেমন- (ক) শাস্তিভঙ্গ, ভীতি প্রদর্শন এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা;
(খ) আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা; (গ) আঞ্চলিক বন্দোবস্তবিষয়ক ক্ষমতা; (ঘ) অছিবিষয়ক ক্ষমতা
(ঙ) নতুন সদস্য গ্রহণবিষয়ক ক্ষমতা; (চ) সদস্য বহিষ্কারবিষয়ক ক্ষমতা; (ছ) নির্বাচনমূলক ক্ষমতা;
(জ) মিলিটারি স্টাফ কমিটি গঠন।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ: আন্তর্জাতিক শাস্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন।
দেশের আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন বা সমৃদ্ধিসাধনের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ গঠিত হয়েছে। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একদিকে উত্তেজনা প্রশমন, অস্ত্রের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, নিরস্ত্রীকরণ, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ মীমাংসা, শাস্তি বিঘ্নকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেমন প্রয়োজন তেমনি এ উদ্যোগ সফল করার জন্য প্রয়োজন সমগ্র মানবজাতির অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক জীবনের বিকাশ ও অগ্রগতি। ধ্বংস ও যুদ্ধ প্রতিরোধ করার জন্য এবং মানবজাতির স্থায়ী কল্যাণসাধনের জন্য গঠনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করাও একান্ত আবশ্যক। এ কারণেই জাতিসংঘের গঠনমূলক উদ্যোগ ও কার্যক্রমের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ন্যূনতম মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়নে এ পরিষদ অবদান রেখে চলেছে।

অছি পরিষদ: জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিশেষ বিবদমান রাষ্ট্র বা অঞ্চলসমূহের প্রশাসনিক বিন্যাস, শাস্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা অছি পরিষদের দায়িত্ব। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে লীগ অব নেশন্সের ম্যান্ডেটভুক্ত ১১টি দেশের দায়িত্ব নিয়ে এ পরিষদের কার্যক্রম শুরু হয়। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যবর্গ ও সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে অছি পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে অছি পরিষদের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

আন্তর্জাতিক আদালত

International Court of Justice
জাতিসংঘের মুখ্য বিচার প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক আদালত। আন্তর্জাতিক সমাজের আইনগত বিরোধ মীমাংসার জন্য এটি একটি স্থায়ী বিচার সংস্থা। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে এর প্রধান কার্যালয়। আন্তর্জাতিক আদালতের কাজ হলো তার নিকট পেশকৃত বিরোধসমূহ আন্তর্জাতিক আইনানুসারে মীমাংসা করা। আন্তর্জাতিক আদালতের এখতিয়ার তিন ভাগে বিভক্ত; যথা- (ক) স্বেচ্ছাধীন, (খ) আবশ্যিক ও (গ) পরামর্শমূলক এখতিয়ার। ১৫ জন বিচারক নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত গঠিত, যারা ৯ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। আন্তর্জাতিক আদালতের এখতিয়ার বিস্তৃত। নিরপেক্ষ বিচার সুনিশ্চিত করতে না পারায় 'কিছু কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আদালতের সমালোচনা লক্ষণীয়।

সচিবালয়

The Secretariat

জাতিসংঘের বিশাল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়। সকল প্রশাসনিক কাজ সচিবালয় থেকেই পরিচালিত হয়। এর প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বলা হয় মহাসচিব যা সেক্রেটারি জেনারেল। নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে সাধারণ পরিষদ কর্তৃক পাঁচ বছরের জন্য মহাসচিব নির্বাচিত হন। তবে মহাসচিব নির্বাচনের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সর্বসম্মতির প্রয়োজন হয়। কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্র ভেটো প্রয়োগ করলে সাধারণ পরিষদের কাছে ঐ নাম প্রস্তাব করা যায় না। মহাসচিবের কাজের পরিধি অনেক বিস্তৃত। শুধু প্রশাসনিক কাজ সম্পাদন ছাড়াও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় তার ক্ষমতা ও দায়িত্ব অনেক। তিনি পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান বা মোড়ল। কোনো কোনো মহাসচিব জাতিসংঘের মুখ্য প্রশাসকের ভূমিকা অতিক্রম করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের এক মুখ্য নির্ধারকে পরিণত হয়েছেন। তারা তাদের কর্মকাণ্ডের দ্বারা মানবজাতির আশ্বাসের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছেন। তবে মহাসচিবের ভূমিকা তার বিচক্ষণতা, নিরপেক্ষতা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা এবং বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রের সহযোগিতার উপর অনেকটা নির্ভরশীল।
জাতিসংঘের প্রথম মহাসচিব হলেন নরওয়ের ট্রিগভেলি এবং বর্তমান অর্থাৎ নবম মহাসচিব হলেন পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও গুতেরেস। তৃতীয় মহাসচিব ছিলেন বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের নাগরিক উ থান্ট। কাজেই এশিয়া মহাদেশ থেকে দু'বার মহাসচিব নির্বাচিত হওয়া কম গৌরবের কথা নয়।

এ যাবৎ দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতিসংঘের মহাসচিবগণের তালিকা"

নামদেশের নামদায়িত্ব পালনের সময়
ট্রিগভেলিনরওয়ে২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১০ নভেম্বর, ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
দ্যাগ হ্যামারশোল্ডসুইডেন১০ এপ্রিল, ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
উ থান্টমিয়ানমার৩০ নভেম্বর, ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১ জানুয়ারি, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
কুট ওয়ার্ল্ডহেইমঅস্ট্রিয়া১ জানুয়ারি, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১ জানুয়ারি, ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
জ্যাভিয়ের পেরেজ দ্য কুয়েলারপেরু১ জানুয়ারি, ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১ জানুয়ারি, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
ড. বুট্রোস বুট্রোস ঘালিমিশর১ জানুয়ারি, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১ জানুয়ারি, ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
কফি আনানঘানা১ জানুয়ারি, ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১ জানুয়ারি, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
বান কি মুনদক্ষিণ কোরিয়া১ জানুয়ারি, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত
আন্তোনিও গুতেরেসপর্তুগাল১ জানুয়ারি, ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান

জাতিসংঘ এবং বিশ্বশান্তি মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ও সমতার নীতির উপর জাতিসংঘের সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘ পৃথিবীর বৃহৎ সংগঠন। এর আঙ্গিক যেমন বড়, তেমনি এর আবর্তও বড়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় এর উদ্ভব। জাতিসংঘ উদ্ভবের পেছনে বৃহৎ শক্তির ভূমিকা প্রাধান্য পেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ছিল বৃহৎ শক্তি। বিশ্ব পরিস্থিতি ও রাজনীতি এ দু'শক্তির দ্বারা বহুলাংশে পরিচালিত হতো। যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ামকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ করে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়স্তা হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেবিশ্ব নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তাদের এ উপলব্ধি এবং পরবর্তীকালে তাদের আন্তরিক ভূমিকা জাতিসংঘ সৃষ্টির সূচনা করে। 'লন্ডন ঘোষণা'র মাধ্যমে তাদের মহৎ উদ্যোগের প্রতিফলন ঘটে। জার্মান নাৎসি বাহিনীর বোমাবর্ষণের আতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। তাদের লন্ডনস্থ জেমস প্রাসাদের আলোচনার সারাংশ 'লন্ডন ঘোষণায়' (১২ই জুন, ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দ) প্রকাশ পায়। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রচিত এ ঘোষণায় আগ্রাসনমুক্ত পৃথিবী এবং সবার জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাপূর্ণ বিশ্ব সৃষ্টির প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

জার্মান বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণে যখন মিত্রশক্তি কোণঠাসা এবং জার্মানি রাশিয়া আক্রমণ করে বসে তখন যুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণ করতে রুজভেল্ট ও চার্চিল আটলান্টিক মহাসাগরে একটি জাহাজে মিলিত হন। তাদের পারস্পরিক সিদ্ধান্ত 'আটলান্টিক সনদ' নামে পরিচিত; যাতে যুদ্ধোত্তর বিশ্বে মিত্রপক্ষের রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎ নীতি কী রকম হওয়া উচিত তা প্রাধান্য পায়।

যুদ্ধকালীন ৩টি বিখ্যাত সম্মেলনে বৃহৎ শক্তির ভূমিকায় জাতিসংঘ উদ্ভবের প্লাটফর্ম তৈরি হয়। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত 'মস্কো সম্মেলন' এর একটি। মস্কো সম্মেলনে বৃহৎ চার শক্তির (যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া ও চীন) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পর 'চতুর্জাতি ঘোষণা' প্রকাশ পায়; যাতে যুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণ, পরাজিত শত্রুর বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রাধান্য পায়। জার্মানির নৃশংসতার বিষয়ে চার বৃহৎ রাষ্ট্র ঐকমত্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়, যা বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার বহিঃপ্রকাশ। সিদ্ধান্ত হয় যে, জার্মানিকে অভিযুক্ত করে ন্যুরেমবার্গে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি বাস্তবায়ন করা হবে।

বৃহৎ তিন শক্তির (ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া) অংশগ্রহণে ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর-ডিসেম্বরে তেহরানে যে সম্মেলন হয় তাতে সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় বিষয়ই প্রাধান্য পায়। বিশ্বের তিন নেতা (মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট স্ট্যালিন ও ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল) সমগ্র বিশ্বের কাছে যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটা ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। যুদ্ধ ও শান্তির সময় এ তিন রাষ্ট্র একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। মূলত ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত 'ইয়াল্টা সম্মেলনে' যুদ্ধোত্তর শাস্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ব্রিটেন প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ইয়াল্টা সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছিল। রুজভেল্ট চাচ্ছিলেন খুব দ্রুত রাশিয়ার সাথে উদ্ভূত সমস্যা দূর করে যত দ্রুত সম্ভব ঐকমত্যে পৌঁছে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার কাজ শেষ করতে। ব্রিটেনের লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় সমস্যা সমাধানের কৌশল আবিষ্কার করা। রাশিয়ার মনোভাব ছিল, অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ব্যাপারে অপরাপর বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর সাহায্য ও সহযোগিতার ব্যাপারে নিশ্চিত আশার বাণী আদায় করা। ইয়াল্টা সম্মেলনে বৃহৎ শক্তিগুলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ গঠন-সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।

উপরের আলোচনা থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, জাতিসংঘের জন্মবৃত্তান্তের সাথে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর
চিন্তাধারা, আদর্শ ও চেতনা বিবর্তিত হতে হতে জাতিসংঘে এসে সাংগঠনিকভাবে রূপায়িত হয়েছে। এর উদ্ভবে সহযোগিতা করেছেন পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ। বৃহৎ শক্তির অবদানকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। সূচনা পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সোভিয়েত রাশিয়ার দক্ষ, নিপুণ ও পারদর্শী নেতৃবৃন্দ জাতিসংঘের গঠনকাজে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছাড়া জাতিসংঘ সনদের মতো জটিল বিষয় এত দ্রুত প্রস্তুত করা সম্ভব হতো না। বৃহৎ শক্তিবর্গের সদিচ্ছা ছাড়া এবং তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি না হলে জাতিসংঘের মতো একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক সংগঠনের উদ্ভব এত দ্রুত হতো কি না সন্দেহ।

স্থায়ী সদস্যের নাম স্থির করার আগে 'সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনে' দীর্ঘ বিতর্ক চলে। বৃহৎ শক্তিবর্গের এরূপ ধারণা জন্মেছিল যে, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ব্যাপারে ঐকমত্যে উপনীত হতে না পারলে তাদের প্রচেষ্টা বাস্তব রূপ লাভ করতে পারবে না। তাই বৃহৎ শক্তিবর্গকে এক জায়গায় এনে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে স্থায়ী সদস্যপদের নিয়ম রাখা হয়। বলা বাহুল্য, এ ব্যবস্থা প্রবর্তনের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকাই ছিল বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তিকে পরাজিত করে যারা সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও কূটনৈতিক সুচতুরতা প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল, তারাই পুরস্কারস্বরূপ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে ওয়াশিংটনের 'ডাম্বারটন ওকসের' সম্মেলনে তিন বৃহৎ শক্তির সাথে চীনেরও ভূমিকা ছিল। মূলত এ সম্মেলনেই বিশ্ব সংগঠনের নাম স্থির করা হয় UN অর্থাৎ সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল 'সানফ্রান্সিসকো' শহরে বৃহৎ তিন রাষ্ট্র মিলিত হয়ে জাতিসংঘ সনদ রচনা করে। কাজেই জাতিসংঘের গঠনপ্রক্রিয়ার সাথে বৃহৎ তিন রাষ্ট্রের ভূমিকাই ছিল অধিক। প্রতিষ্ঠাকালীন দীর্ঘ চার বছর বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে শক্তি-দ্বন্দ্ব থাকলেও তা প্রকট হয়নি। প্রতিষ্ঠার অল্পদিনের মধ্যেই বৃহৎ শক্তিগুলোর রাজনৈতিক আদর্শ শক্তি-দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। সমতার নীতি ধারণ করে এটা প্রতিষ্ঠিত হলেও বৃহৎ শক্তিগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সাথে এ নীতি অনেক সময় অনুসরণ করেনি। নতুন রাষ্ট্রের সদস্যভুক্তি নিরাপত্তা পরিষদের অর্থাৎ বৃহৎ শক্তির ইচ্ছাধীন থাকায় সদস্য অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে তারা হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সহযোগিতার প্রশ্নে বৃহৎ শক্তিগুলো বরাবর অধিক ভূমিকা রাখে। বৃহৎ শক্তিগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাষ্ট্রে সহযোগিতা দিয়ে বিশ্ব মানবতার কল্যাণে ও দুর্গতি লাঘবে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। সদস্যভুক্ত সকল রাষ্ট্রের জাতিসংঘে প্রদেয় চাঁদার পরিমাণ সমান নয়। বৃহৎ ও উন্নত রাষ্ট্রগুলোর চাঁদার পরিমাণ ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে বেশি। কাজেই অর্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বৃহৎ শক্তির ভূমিকা মুখ্য। জাতিসংঘ সনদেই বৃহৎ শক্তিগুলোকে অর্থাৎ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে অধিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। সনদে বলা হয়, নিরাপত্তা পরিষদের মূলকাজ আন্তর্জাতিক শাস্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। শাস্তিরক্ষা কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

জাতিসংঘ সৃষ্টির সময়ের বৃহৎ শক্তির মধ্যে শক্তি সাম্য না থাকলেও তাদের একটি জায়গায় মিল ছিল। তারা ছিল মিত্রশক্তিভুক্ত দেশ। সময়ের পটপরিক্রমায় বিশ্বে আরও নতুন নতুন শক্তির উদ্ভব হয়েছে। অক্ষশক্তিভুক্ত দেশ ও উদীয়মান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোকে বৃহৎ শক্তিগুলোর সাথে জাতিসংঘের কর্মকাণ্ডে সমান সুযোগ দিলে সংস্থাটি আরও গতিশীল ও কার্যকরী হতো।

জাতিসংঘ এবং বিশ্বশান্তি মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য জাতিসংঘই হলো ইতিহাসের প্রথম ও প্রকৃত আন্তর্জাতিক সংগঠন। সংগত কারণেই এর অঙ্গীকার ছিল বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। জন্মলগ্ন থেকে প্রায় সাত দশক জাতিসংঘকে অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। দুই পরাশক্তির (রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র) অসহিষ্ণুতার শিকার হয়ে জাতিসংঘ প্রায় অকার্যকর হতে বসেছিল। কিন্তু শান্তি স্থাপনে জাতিসংঘ ও তৃতীয় বিশ্বের পাহাড়সমান সমস্যা সমাধানে এর আন্তরিকতাপূর্ণ ভূমিকা একে জিইয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন কতিপয় মহাসচিব। মহাসচিবদের ভূমিকা এর অস্তিত্বকেই অর্থবহ করেনি বরং বিশ্ববাসীর কাছে জাতিসংঘের গ্রহণযোগ্যতাকে বহুমাত্রিকতা দান করেছে।

মানবজাতির কল্যাণ ও বিকাশের নিমিত্তে যে অবিরাম কাজকর্ম চলছে তার কেন্দ্রস্থল জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, যা জাতিসংঘ সনদে উল্লেখ আছে। শান্তি ও নিরাপত্তাবিধান জাতিসংঘের একটি চলমান ও প্রশংসনীয় কর্মকাণ্ড। যুদ্ধের করাল গ্রাস থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্ত করার যে লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভব হয়েছিল, সে লক্ষ্যে জাতিসংঘ এখনো মোটামুটি সফল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় ভয়াবহ কোনো যুদ্ধের মুখোমুখি এখন পর্যন্ত বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ হয়নি, যা জাতিসংঘের এক বিরাট সাফল্য। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে জাতিসংঘ বিশেষ শান্তিরক্ষা মিশন প্রেরণ করে থাকে। শান্তিরক্ষা হলো এমন একটি কৌশল যা বিরোধ নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। শান্তিরক্ষার প্রকৃতিতে ভিন্নতা আছে। শান্তিরক্ষা সাধারণত সংঘাতপূর্ণ স্থানে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার সহযোগিতাকে বোঝায়। শাস্তি সৃষ্টি হলো দু'পক্ষের সংঘাত নিরসনের পদ্ধতি আর শান্তি তৈরি হলো সংঘাত-পরবর্তী সময়ের শাস্তি প্রতিষ্ঠার মিশন। নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ অনুযায়ী মহাসচিবের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শান্তিরক্ষা মিশনগুলো কাজ করে থাকে। তবে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম আদৌ সামরিক প্রকৃতির নয়।

যদিও জাতিসংঘের কোনো চার্টারে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের স্পষ্ট উল্লেখ নেই; তবে ষষ্ঠ-সপ্তম অধ্যায়ে শান্তির জন্য হুমকি, শান্তির জন্য আশা ও আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে কার্যক্রমসংক্রান্ত সুপারিশ আছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংগঠিত ও তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ প্রতিরোধ, সংকোচন, তীব্রতা হ্রাস ইত্যাদি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ বলপ্রয়োগ ও কূটনৈতিক পদ্ধতির মধ্যবর্তী স্থানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অবস্থান।

জাতিসংঘের প্রথম শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসরাইল ও আরব রাষ্ট্রসমূহ থেকে বিরোধপূর্ণ এলাকায় পর্যবেক্ষণের জন্য সৈন্য প্রেরণের মাধ্যমে। সাধারণত বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের উত্তেজনা প্রশমনে, যুদ্ধবিরোধী চুক্তি তদারকি ও কার্যকর করা, স্থিতাবস্থা বজায় রাখা, গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচন পরিচালনা প্রভৃতি উদ্দেশ্যে শান্তিরক্ষা বাহিনী প্রেরণ করা হয়ে থাকে।

জাতিসংঘের সাফল্য

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ একটি স্বেচ্ছামূলক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার উপর এর সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তারক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা অনেকাংশে প্রশংসার দাবি রাখে। ইন্দোনেশিয়া, লিবিয়া, নামিবিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্র জাতিসংঘের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার ফলেই স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করছে। লাওস, কঙ্গো ও কোরিয়ায় শান্তিরক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করে সেখানে শান্তি স্থাপন জাতিসংঘের বিরাট একটি সাফল্য। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সুয়েজ এলাকা থেকে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ইসরাইল, ফ্রান্স, ও ব্রিটেন সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করলে জাতিসংঘ তার জরুরি বাহিনী মোতায়েন করলে সুয়েজ সংকটের অবসান ঘটে। পাক-ভারত যুদ্ধ (১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় অবসান হয়। আরব-ইসরাইল যুদ্ধবিরতি (১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ) জাতিসংঘের অন্যতম সফল প্রয়াস। লেবানন, ইসরাইল ও ফিলিস্তিন সংকট ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের ফলে স্তিমিত হয়। গ্রিস-তুরস্ক বিরোধ জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় নিষ্পত্তি হয়, যা জাতিসংঘের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ইসরাইলের দখলদার বাহিনীকে লেবাননের সিডন এলাকা থেকে ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ** এপ্রিল মাসে অপসারণ করা জাতিসংঘের প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার ফলেই সম্ভব হয়েছিল। জাতিসংঘের মহৎ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং নিয়মিত তদারকির ফলে সোয়াজিল্যান্ড, ক্যামেরুন প্রভৃতি অছি এলাকা স্বাধীনসার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করতে সক্ষম হয়। ইরাক-ইরান দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে জাতিসংঘের মাধ্যমে।

মারণাস্ত্র তৈরি ও আণবিক শক্তি প্রতিযোগিতায় যাতে বিশ্ব আর কোনো ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় যুদ্ধের সম্মুখীন না হয় সেজন্য জাতিসংঘ নিরস্ত্রীকরণ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তিবর্গকে আলোচনায় বসিয়ে ন্যূনতম নীতিতে ঐকমত্যে পৌছতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বিশ্ব সংস্থার উদ্যোগ ছাড়া বৃহৎ শক্তিসমূহকে আলোচনার টেবিলে বসানো সম্ভব হয়ে উঠত না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানের পথ উন্মুক্ত হয়, জাতিসংঘ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। অনগ্রসর রাষ্ট্রসমূহের জনগোষ্ঠীকে আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বাস্থ্য, কারিগরি ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে সংস্থাটি। দুস্থ, দুর্দশাগ্রস্ত ও নির্যাতিত আর্তমানবতার কল্যাণে জাতিসংঘ সর্বদাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। আর্মেনিয়া, হাইতি প্রভৃতি দেশে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের পর জাতিসংঘ ব্যাপক ত্রাণ ও সাহায্য কর্মসূচি গ্রহণ করে। আফগানিস্তান ও ইরাকে সাহায্য কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।

শান্তিরক্ষায় জাতিসংঘের কর্মতৎপরতা ও সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিক নোবেল কমিটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তারক্ষায় জাতিসংঘের উপস্থিতি ও প্রচেষ্টা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের শেষ ভরসা। জাতিসংঘ অকার্যকর হলে বিশ্বকে আরও ভয়াবহ শঙ্কা ও ধ্বংসের মুখোমুখি ঠেলে দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানবজাতি পরস্পর আলোচনা, পরামর্শ, ঐক্য ও সহযোগিতার আশ্রয়স্থল হারিয়ে আরও বেশি অনিশ্চয়তা ও সংকটে নিপতিত হবে। জাতিসংঘের অকার্যকারিতা সমস্যার কোনো সমাধান নয়, বরং সমস্যা সমাধানের পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়ারই নামান্তর হবে।

জাতিসংঘের উল্লেখযোগ্য কার্যকলাপ

১। সোভিয়েত-ইরান বিরোধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সোভিয়েত সৈন্য অপসারিত হয়নি- এমন একটি অভিযোগ নিরাপত্তা পরিষদে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে জানুয়ারি করা হয়। সৈন্য অপসারিত হওয়ার পরও অভিযোগ প্রত্যাহার না হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন নিরাপত্তা পরিষদ বর্জন করে।
২। বার্লিন অবরোধ: ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমা দেশগুলো পূর্বানুমতি ছাড়া অভিন্ন জার্মান মুদ্রা চালু করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের যোগাযোগব্যবস্থা অবরুদ্ধ করে রাখে। ফলে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির যোগাযোগব্যবস্থা বহির্দেশের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পশ্চিম বার্লিনে খাদ্যদ্রব্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্য আকাশপথে, পাঠাতে বাধ্য হয়। নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত চতুর্শক্তির আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা করতে হয়।
৩। ইন্দোনেশীয় সংকট ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে নেদারল্যান্ডস তার উপনিবেশ ইন্দোনেশিয়াকে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে একটি চুক্তি করেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে নেদারল্যান্ডস ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে তা অস্বীকার করে ইন্দোনেশিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ করে। ভারত বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করলে মীমাংসার জন্য ১৮ দফা উদ্ভাবন করা হয়। ফলস্বরূপ নেদারল্যান্ডস ইন্দোনেশিয়াকে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা প্রদান করতে বাধ্য হয়।

৪। আরব-ইসরাইল বিরোধ: ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে প্যালেস্টাইনকে বিভক্ত করে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এতে আরব-ইসরাইল বিরোধ সংঘর্ষে রূপ নেয়। মিশর সুয়েজ খাল ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয়করণ করলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স মিশবের উপর ক্ষিপ্ত হয় এবং ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে আরব-ইসরাইল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য সমস্যা আন্তর্জাতিক রূপ ধারণ করে। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় এ সংকট সৃষ্টি হলে জাতিসংঘকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এ সময় মধ্যপ্রাচ্যে জরুরি ভিত্তিতে জাতিসংঘ বাহিনী পাঠালে সাময়িকভাবে মধ্যপ্রাচ্য সংঘর্ষ স্তিমিত হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে আরব-ইসরাইল সমস্যার পরিসমাপ্তি এখনো হয়নি।

৫। ফকল্যান্ড যুদ্ধ: আর্জেন্টিনার পূর্ব উপকূলে ৪৮০ কিলোমিটার দূরে ফকল্যান্ড দ্বীপগুলো অবস্থিত। উপকূলের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় এই দ্বীপগুলোকে আর্জেন্টিনা নিজেদের বলে দাবি করে। আর্জেন্টিনীয়রা এগুলোকে 'মালবিনাস দ্বীপপুঞ্জ' নামে ডাকে। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে এই দ্বীপগুলোতে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশদের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই এই দ্বীপগুলোর উপর আর্জেন্টিনার দাবি ব্রিটিশরা উপেক্ষা করে। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে আর্জেন্টিনা এই দ্বীপগুলো আবারও নিজেদের বলে দাবি তোলে। এই দ্বীপের সমস্যা সমাধানের জন্য জাতিসংঘের মধ্যস্থতা আহ্বান করে। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ এ ব্যাপারে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করে। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটেন এই দ্বীপগুলো আর্জেন্টিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে কিন্তু একসাথে নয় ধীরে ধীরে। তাছাড়া শর্ত দেয়, এই দ্বীপগুলো আর্জেন্টিনার অধীনে দিলেও এর প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব থাকবে ব্রিটেনের উপর। এই শর্তাবলি আর্জেন্টিনা মেনে নেয়নি। এজন্য ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের মার্চের দিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট লেওপোলদো গালতিয়েরি দ্বীপগুলো দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। আর্জেন্টিনার উপকূলে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ থেকে ব্রিটিশ শাসন বিতাড়িত করার জন্য আর্জেন্টাইন সরকার ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকারকে একটি চরমপত্র প্রদান করে। ফলে দ্বীপটি নিজেদের দখলে রাখার জন্য উভয় পক্ষই প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আর্জেন্টিনা ৩টি যুদ্ধজাহাজ ও ১০,০০০ সৈন্যের সমাবেশ ঘটায় এবং ব্রিটেন তা প্রতিহত করার জন্য ২০টি যুদ্ধজাহাজ, সহযোগী নৌযান ও ৬,০০০ সৈন্য প্রেরণ করে। তাছাড়া ব্রিটেন ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে ২০০ মাইল পরিধির মধ্যে কোনো বিদেশি শক্তির অবস্থান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধে ইউরোপীয় শক্তিগুলো ব্রিটেনের পক্ষ নেয় এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো আর্জেন্টিনার পক্ষ নেয়। পূর্ব ফকল্যান্ডের সান কার্লোস বন্দরে ২০শে মে মধ্যরাতে ব্রিটিশরা আক্রমণ শুরু করে। মূলত ২১শে মে থেকে ২৮শে মে পর্যন্ত যুদ্ধ চরম পর্যায়ে পৌছে। এই সময় ব্রিটিশ সরকার জল, স্থল ও আকাশপথে আর্জেন্টাইন বাহিনীর উপর হামলা করে। জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পেরু দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রদান করলেও ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। এই যুদ্ধে আর্জেন্টাইন বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় হয়। ফলে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশরা দখল করে নেয়।

৬। ইরাক-কুয়েত সমস্যা: ইরাক বিনা উসকানিতে কুয়েতের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই
নভেম্বর দখল করে নেয়। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই জানুয়ারি জাতিসংঘ ইরাককে তাদের সৈন্য কুয়েত থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ প্রদান করে। ইরাকের সাথে আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং ইরাক কুয়েতকে তাদের ১৯তম প্রদেশ বলে দাবি করে। শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী কুয়েতকে ইরাকি দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করে। জাতিসংঘে এ সংকট নিরসনে ১২টি প্রস্তাব গৃহীত হয়।এছাড়া ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ কসোভোয় অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক মিশন, সিয়েরালিওনে পর্যবেক্ষক মিশন, পূর্ব তিমুরে সামরিক প্রশাসন গড়ে তোলা, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে অর্গানাইজড মিশন প্রেরণ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

জাতিসংঘের ব্যর্থতা

জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সহযোগিতা ও আন্তরিকতার অভাব থাকলে সেক্ষেত্রে জাতিসংঘের সফলতায় বিঘ্ন সৃষ্টি হতে বাধ্য। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ নানাবিধ জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার কারণেও জাতিসংঘের মহান ব্রত পালনে অসুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদে বৃহৎ শক্তির ভেটো ক্ষমতা জাতিসংঘকে পঙ্গু করে রেখেছে। সামরিক শক্তির অভাবে জাতিসংঘ তার শান্তি ও নিরাপত্তারক্ষার সর্বাত্মক প্রস্তাবকেও কার্যকর করতে সক্ষম হয় না। তাছাড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একমেরুকরণ প্রবণতার কারণে একক বৃহৎ শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতাপ ও প্রভাবের প্রতিক্রিয়া জাতিসংঘের ভূমিকার উপর নিপতিত হয়েছে বলা যায়।

বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তারক্ষায় সম্মিলিত জাতিসংঘের অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি বিশ্বের শান্তিকামী
মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ভরসা ও আশ্রয়স্থল হিসেবে জাতিসংঘের ব্যর্থতা এর মর্যাদা ও গৌরবকে অনেক ক্ষেত্রে স্নান করে দিয়েছে। সংঘাত ও সংঘর্ষে, আক্রমণ ও নির্যাতনে জাতিসংঘকে আজ আশ্রয় ও ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। জাতিসংঘের উপস্থিতিতেই বিশ্বের অনেক অঞ্চলে আজ অন্যায় ও অবিচার চলছে। বৃহৎ রাষ্ট্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে আক্রমণ করতে, মানবাধিকারকে পদদলিত করতে কুণ্ঠিত হচ্ছে না। জাতিসংঘ অসহায় নির্বাক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বৃহৎ শক্তি জাতিসংঘকে কোনো তোয়াক্কা করছে না। জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও সাফল্য সম্পর্কে আজ বিশ্ব জনমনে ব্যাপক সংশয় ও অনাস্থা দেখা দিয়েছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা আজ সুদূরপরাহত। বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ আজ আণবিক মারণাস্ত্রের ভয়াবহতায় ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্নে চরম অশান্তি ও উৎকণ্ঠায় সময় অতিক্রম করছে। ফিলিস্তিন সমস্যা, ইন্দোচীন সমস্যা, লেবাননের গৃহযুদ্ধ, ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম, আফগান সমস্যা, ইরাক সমস্যা, আফ্রিকার বর্ণবাদী সমস্যা, শরণার্থী সমস্যা, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মানবাধিকারের অবাধ ও নির্লজ্জ লঙ্ঘন, বুভুক্ষু ও নির্যাতিত-নিপীড়িত মানবতার করুণ আর্তনাদ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ইস্যুকে সুদূরপরাহত করে রেখেছে। বিশ্বজুড়ে চলছে আধিপত্যবাদের এক নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। বৃহৎ পরাশক্তি রাষ্ট্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। শক্তির জোরে সবল রাষ্ট্র ক্ষমতাহীন দুর্বল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অনবরত হস্তক্ষেপ করে চলছে; নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে তাদের তাঁবেদার সরকার বসাচ্ছে।

জাতিসংঘের ব্যর্থতার কারণে জার্মানি, ইয়েমেন দীর্ঘদিন পূর্ব ও পশ্চিমে এবং উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত হয়ে অবস্থান করেছে। কোরিয়া আজও বিভক্ত রয়েছে। ইসরাইল বিশ্বজনমতের সকল আবেদন উপেক্ষা করে বেপরোয়াভাবে প্যালেস্টাইনের উপর বর্বরোচিত হামলা ও দখলদারিত্ব অব্যাহত রেখেছে। ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব আবাসভূমির ন্যায়সংগত দাবি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং তাদের উপর নানা রকম নির্যাতন ও নিপীড়ন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহ আজ বৃহৎ শক্তির করাল গ্রাসে আবদ্ধ। ১৯৭৭-৮৭ খ্রিষ্টাব্দে বৃহৎ শক্তিবর্গের মদদপুষ্ট ভিয়েতনাম বাহিনী যখন কম্বোডিয়া দখল করল, জাতিসংঘ তখন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে ফকল্যান্ড সমস্যার সমাধান এবং ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ, দমনের নামে লিবিয়ার উপর মার্কিন জঙ্গি বিমান হামলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সার্ব বাহিনী কর্তৃক বসনিয়ায় মানব-ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞে জাতিসংঘের রহস্যজনক নীরব ভূমিকা বিশ্বজনমতকে হতবাক করেছে। সোমালিয়া, রুয়ান্ডাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা এ সংস্থার প্রতি বিশ্বের শান্তিকামী জনগণকে বিক্ষুব্ধ করেছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই অত্যন্ত স্বেচ্ছাচারমূলকভাবে আফগানিস্তান দখল করে নেয়। আফগানিস্তান সরকারকে উৎখাত করে যেখানে তাঁবেদার পুতুল সরকার বসানো হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এরূপ নির্লজ্জ ও গুরুতর অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি।

আফগানিস্তানের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সহযোগিতায় মিথ্যা অভিযোগে ইরাক আক্রমণ করে। ইরাক দখলের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের নিকট ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগের কোনো সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি। তথাপি ইরাকের উপর চালানো হয় ব্যাপক দখলদারী অভিযান, হত্যা করা হয় নিরীহ সাধারণ জনগোষ্ঠীকে, ধ্বংস করা হয় ঘরবাড়ি, অফিস-আদালতসহ ব্যাপক জাতীয় সম্পদ। এ ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের ভূমিকা ছিল অসহায়ের মতো। সাধারণ জনগোষ্ঠী ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের নিকট জাতিসংঘের অস্তিত্ব তখন নিতান্তই অর্থহীন হয়ে পড়ে।

জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মৌলিক অধিকারকে পদদলিত করে বলপ্রয়োগের অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার নামে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হরণ করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে আধিপত্যবাদ ও নৈরাজ্যবাদ। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তারক্ষায় জাতিসংঘের এহেন ভূমিকা ও ব্যর্থতা পর্যবেক্ষণ করে বিশ্বের শান্তিকামী ও সচেতন জনমনে আজ প্রশ্ন জেগেছে- শান্তি প্রতিষ্ঠার মহান ব্রতে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ কি এভাবে ব্যর্থতার গ্লানি বহন করতে করতে শেষ পর্যন্ত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ভাগ্যকেই বরণ করে নেবে?

জাতিসংঘের ব্যর্থতার কারণ

জাতিপুঞ্জের ধ্বংসাবশেষের পর বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তাকে অধিকতর নিশ্চয়তাদানের লক্ষ্যে গড়ে ওঠা জাতিসংঘ আজ অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। নিচে জাতিসংঘের ব্যর্থতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

প্রথমত: জাতিসংঘের ব্যর্থতার উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে এর গঠন কাঠামোর ত্রুটি, সদস্যদের মধ্যে ন্যায়বোধ ও সাম্যনীতির অভাব। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, সকল সদস্য রাষ্ট্র জাতিসংঘের অভ্যন্তরে সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার অধিকারী। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদে পাঁচটি বৃহৎ রাষ্ট্রের স্থায়ী আসনের ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের একক ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারকে জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী ব্যবস্থা বলা যায়।

দ্বিতীয়ত: নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণে পাঁচটি বৃহৎ সদস্য রাষ্ট্রের সকলে একমত হওয়া আবশ্যক। যেকোনো এক সদস্য দ্বিমত পোষণ করে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করলে অন্য সকলে একমত হলেও কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। এরূপ ভেটো ক্ষমতা বৃহৎ শক্তির হাতে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহকে নিয়ন্ত্রণ করা ও তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির অন্যতম অস্ত্রস্বরূপ। ভেটো ক্ষমতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তাবিধানে বহুবিধ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে না।

তৃতীয়ত: সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত হলেও এর প্রকৃত কোনো কার্যকরী ক্ষমতা নেই বললেই চলে। সাধারণ পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরাপত্তা পরিষদের মুখাপেক্ষী। সাধারণ পরিষদ কোনো সিদ্ধান্তকে বাস্তব রূপ দিতে পারে না। সাধারণ পরিষদের এরূপ অক্ষমতার কারণে তাকে অনেক ক্ষেত্রেই শুধু নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে হয়।

চতুর্থত: জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো সামরিক বাহিনী না থাকায় আন্তর্জাতিক বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে কোনো রাষ্ট্র জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা বা অগ্রাহ্য করলে জাতিসংঘ কোনোরূপ বলপ্রয়োগমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। সাধারণ সদস্য রাষ্ট্রের সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে বিলম্ব বা জটিলতার উদ্ভব ঘটায়।

পঞ্চমত: বৃহৎ শক্তিসমূহের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে তাদের সদিচ্ছার অভাব বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তাবিধানে জাতিসংঘের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।

ষষ্ঠত: আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো কোনো সময় বৃহৎ কোনো রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব স্বার্থ ও আঞ্চলিক প্রভাব-প্রতিপত্তি রক্ষার জন্য ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নির্লজ্জভাবে হস্তক্ষেপ করছে। এর ফলে অন্যান্য রাষ্ট্রও পরবর্তী সময়ে জড়িয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। জাতিসংঘের মহান শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষামূলক প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে তোলে।

সপ্তমত: আর্থিক সংকটে নিপতিত হয়ে জাতিসংঘ বর্তমানে অনেক সাহায্য ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। জাতিসংঘে এর পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। সদস্যরা ঠিকমতো চাঁদা প্রদান করছে না। অর্থাভাবে জাতিসংঘ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
উপর্যুক্ত ব্যর্থতার কারণে জাতিসংঘ তার মহান ভাবমূর্তি অনেকখানি হারাতে বসেছে। জাতিসংঘ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে সত্য কিন্তু তার মহা সনদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আজ সুদূরপরাহত। ব্যর্থতার পথে সকল প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে জাতিসংঘ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তারক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের তা' একান্ত কামনা। জাতিসংঘের সফলতা মানবজাতির সফলতা।

জাতিসংঘকে অধিকতর কার্যকর করার ব্যবস্থা.

বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে অক্টোবর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু নানাবিধ কারণে জাতিসংঘের গৌরব-মর্যাদা আজ ভূলুণ্ঠিত। জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এমতাবস্থায় জাতিসংঘের সাফল্য ও কার্যকারিতা সম্পর্কে অনেকের মনে সংশয় দেখা দিয়েছে। নিচে জাতিসংঘকে অধিকতর সফল ও কার্যকর করার জন্য কয়েকটি ব্যবস্থা বা উপায় সম্পর্কে সুপারিশ করা হলো-

১। জাতিসংঘের সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করে এর অভ্যন্তরে সকল সদস্য রাষ্ট্রের সমান মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২। নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত হওয়া উচিত। সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর করতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা প্রয়োজনবোধে বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

৩। নিরাপত্তা পরিষদে বৃহৎ রাষ্ট্রের একক ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করতে হবে। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের অধিকাংশ সদস্যের সমর্থনই যথেষ্ট। সাধারণ পরিষদের সমর্থন অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করা হলে সে অনুযায়ী স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
৪। সকল সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামরিক জোট ও চুক্তিসমূহ বাতিল করতে হবে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক সংস্থা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনক্রমে গঠন করা যেতে পারে।
৫। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অধিকতর কার্যকর করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের নিজস্ব সামরিক বাহিনী গঠন একান্ত আবশ্যক। নিরাপত্তা পরিষদ ও সশস্ত্র কাউন্সিলের সম্মতিক্রমে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে পরস্পরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। জাতিসংঘের পূর্বসম্মতি ছাড়া কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রে তার সামরিক বাহিনী পাঠাতে পারবে না।
৭। জাতিসংঘের আদর্শ ও নীতিমালা যাতে সকল সদস্য রাষ্ট্র মেনে চলে তার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনো রাষ্ট্র জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী কোনো কার্যকলাপে লিপ্ত হলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সম্মিলিত শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ নীতি পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা চাই।
৮। জাতিসংঘের সফলতা নির্ভর করে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সদিচ্ছা, সহযোগিতা ও আন্তরিক কর্মপ্রচেষ্টার উপর। সকল সদস্য'রাষ্ট্রকে আন্তরিকতার সাথে জাতিসংঘের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে।
৯। জাতিসংঘের মহাসচিবের পদমর্যাদা ও ক্ষমতার পুনর্মূল্যায়ন করা আবশ্যক। মহাসচিবের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে জাতিসংঘের নেতৃত্বদানে তার ক্ষমতাকে অর্থবহ করে তোলা আবশ্যক।
১০। অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কার্যপরিধি আরও বিস্তৃত করা আবশ্যক।
১১। অনুন্নত ও দরিদ্র দেশসমূহে জাতিসংঘের সাহায্য ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে। মানবতার কল্যাণেই জাতিসংঘের সার্থকতা নিহিত রয়েছে।
১২। জাতিসংঘকে বর্তমান আর্থিক সংকটের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অনাবশ্যক ব্যয় পরিত্যাগ করতে হবে। সকল সদস্য যাতে বার্ষিক চাঁদা সময়মতো পরিশোধ করে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জাতিসংঘকে আর্থিক দিক থেকে আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের নিজস্ব আয়ের উৎস খুঁজে বের করতে হবে।

উল্লিখিত ব্যবস্থাসমূহ সঠিকভাবে কার্যকর করতে পারলে জাতিসংঘ তার বর্তমান দুর্বলতা, অক্ষমতা ও দৈন্যদশা অনেকখানি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। সকল বাধা-বিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে জাতিসংঘ যেদিন মানবতার কল্যাণসাধন, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তাবিধানে আরও অধিকতর কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে, সেদিনই জাতিসংঘ গঠনের প্রকৃত সার্থকতা উপলব্ধি করা যাবে। মোটকথা, বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় জাতিসংঘকে সকল আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে।

জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ

যাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ১৩৬তম সদস্য হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জাতিসংঘের উল্লেখ করার মতো কোনো ভূমিকা ছিল না। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ও বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তুর সহযোগিতায় জাতিসংঘের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। জাতিসংঘ বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পগুলোতে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, সমমর্যাদা ও সাম্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে বৈদেশিক কার্যক্রম নির্ধারণ করেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মহত্ত্ব ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ যে ভূমিকা রেখেছে তার স্বীকৃতিও পেয়েছে। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ করে। ১লা জুন, ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ ১ মাসের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬-৮৭ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সাবেক স্পিকার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে জাতিসংঘের কার্যপ্রণালিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার আমাদের গৌরবান্বিত করেছে। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দিলে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করে। সর্বোপরি বাংলাদেশ জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী বিশ্বশান্তি রক্ষা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধ, বিবাদের শান্তিপূর্ণ সমাধান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন জাতির আত্মত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল থেকে এসব বাস্তবায়নের চেষ্টা করে আসছে।

শান্তিরক্ষা কাজে বাংলাদেশ

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘের শান্তি মিশন শুরু হয়। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তিরক্ষা মিশনের দেখাশোনার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের নিয়মিত অংশগ্রহণ ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু হয়। ইরাক-ইরান যুদ্ধের শেষের দিকে UNIMOG-এর পর্যবেক্ষক হিসেবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশের আমন্ত্রণ ও অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত গৌরবের। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সক্রিয় অংশীদার। বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘের কার্যক্রমের সাথে বাংলাদেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং অত্যন্ত সাফল্যের সাথে এ মহান দায়িত্ব পালন করে আসছে। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে উপসাগরীয় যুদ্ধে যৌথ বাহিনীতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ত্বরান্বিত করে। এর পর থেকে বিশ্বব্যাপী বহুজাতিক বাহিনী ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ব্যাপক হারে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অফিসার ও সৈন্য প্রেরণ শুরু হয়। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যোগ দেয়। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে শান্তি মিশনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে বিগত ২৪ বছরে বাংলাদেশের ভূমিকা দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

বাংলাদেশ চলমান ১৫টি মিশনের মধ্যে ১৪টি মিশনসহ মোট ৫৪টি শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করেছে। ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল সর্বোচ্চ সৈন্য প্রেরণকারী দেশ। জনবলের দিক থেকে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সবার শীর্ষে। শান্তি মিশনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের মিশনকর্মীরা সংশ্লিষ্ট দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে যেমন অবদান রাখছেন, তেমনি আমাদের সংস্কৃতিকে বহির্বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ এ যাবৎ প্রায় ১,২৮,৫৪৫ জন সদস্য পাঠিয়েছে।

বাংলাদেশ যেসব শান্তি মিশন সমাপ্ত করেছে

সময়কালমিশনের নামদেশমিশনের উদ্দেশ্যবাংলাদেশ কর্তৃক প্রেরিত সৈন্য
খ্রিষ্টাব্দ ১৯৮৮-১৯৯১ইউনাইটেড নেশনস ইরান-ইরাক মিলিটারি অবজারভার গ্রুপ (UNIIMOG)ইরান-ইরাকইরান-ইরাক যুদ্ধের অবসান৩১
১৯৮৮-১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস গুড অফিসেস মিশন ইন আফগানিস্তান অ্যান্ড পাকিস্তান (UNGOMAP)আফগানিস্তানসোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের অবসান০২
১৯৮৯-১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস ট্রানজিশন অ্যাসিস্ট্যান্স গ্রুপ (UNTAG)নামিবিয়ানামিবিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধের অবসান২৫
১৯৯১-১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দকম্বোডিয়া (UNAMIC) ইউনাইটেড নেশনস অ্যাডভান্স মিশন ইনকম্বোডিয়াভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পারস্পরিক দ্বন্দ্বের অবসান১০০২
১৯৯১-১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস অ্যাঙ্গোলা ভেরিফিকেশন মিশন-১ (UNAVEM-I)অ্যাঙ্গোলাঅ্যাঙ্গোলার গৃহযুদ্ধের অবসান০৯
১৯৯১-২০০৩ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস ইরাক-কুয়েত অবজারভেশন মিশন (UNIKOM)ইরাক-কুয়েতউপসাগরীয় যুদ্ধের অবসান৮,২৩৮
১৯৯২-১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস প্রটেকশন ফোর্স (UNPROFOR)বসনিয়া, মেসিডোনিয়া, হার্জগোভিনাযুগোস্লাভিয়া যুদ্ধের অবসান১,৪২৩
১৯৯২-১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস অপারেশন ইন মোজাম্বিক (ONUMOZ)মোজাম্বিকমোজাম্বিকের গৃহযুদ্ধের অবসান২,৫২২
১৯৯২-১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস অপারেশন ইন সোমালিয়া-1 (UNOSOM-I)সোমালিয়াসোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের অবসান০৭
১৯৯৩-১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস অপারেশন ইন সোমালিয়া-11 (UNOSOM-II)সোমালিয়াসোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের অবসান১,৯৬৭
১৯৯২-১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস ট্রানজিশনাল অথরিটি ইন কম্বোডিয়া (UNTAC)কম্বোডিয়াভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পারস্পরিক দ্বন্দ্বের অবসান১,০০২
১৯৯২-১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস মিশন ইন হাইতি (UNMIH)হাইতিহাইতির সামরিক শাসনের অবসান২,১২৫
১৯৯২-১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস অ্যাসিস্ট্যান্স মিশন ফর রুয়ান্ডা (UNAMIR)রুয়ান্ডারুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধের অবসান১,০১২
১৯৯৩-২০০৯ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস অবজারভার মিশন ইন জর্জিয়া (UNOMIG)জর্জিয়াআবখাজিয়া যুদ্ধের অবসান১৩১
১৯৯৩-১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস অবজারভার মিশন ইন উগান্ডা-রুয়ান্ডা (UNOMUR)রুয়ান্ডারুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধের অবসান২০
১৯৯৪-২০০০ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস মিশন অব অবজারভারস ইন তাজিকিস্তান (UNMOT)তাজিকিস্তানতাজিকিস্তানের গৃহযুদ্ধের অবসান8০
১৯৯৫-১৯৯৭খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস অ্যাঙ্গোলা ভেরিফিকেশন মিশন-II (UNAVEM-II)অ্যাঙ্গোলাঅ্যাঙ্গোলার গৃহযুদ্ধের অবসান৪৭৯
১৯৯৬-২০০২ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস মিশন অব অবজারভারস ইন প্রিভলাকা (UNMOP)ক্রোয়েশিয়াপ্রিভলাকার আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের অবসান১,৪২৩
১৯৯৯-২০০৫ খ্রিষ্টাব্দUNAMET/UNTAET/UNMISETপূর্ব তিমুর, ইন্দোনেশিয়াপূর্ব তিমুর ও ইন্দোনেশিয়ার দ্বন্দ্বের অবসান১,৩৮৫
১৯৯৯-২০০৫ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস মিশন ইন সিয়েরা লিওন (UNAMSIL)সিয়েরালিওনসিয়েরালিওনের গৃহযুদ্ধের অবসান১১,৯৪৪
২০০৭-২০১০ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস মিশন ইন দ্য সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক অ্যান্ড শাদ (MINURCAT)শাদদারফুর সংঘর্ষ ও শাদের গৃহযুদ্ধের অবসান৫৭
২০০৭-২০১০ খ্রিষ্টাব্দইউনাইটেড নেশনস অবজারভার মিশন ইন সুদান (UNOMIS)সুদানসুদানের দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের অবসান৮,৭৭১

Explanation of Key Words

  • লন্ডন ঘোষণা (London Proclamation): জাতিসংঘের জন্মের সূচনা ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুন লন্ডনের জেমস প্রাসাদে। এ সময় জার্মানির নাৎসি আক্রমণের ভয়ে ইউরোপের মিত্রদেশের নেতৃবৃন্দ এবং অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। এসব দেশের নেতৃবৃন্দ চিরস্থায়ী শান্তির জন্য এবং আগ্রাসনমুক্ত পৃথিবী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সভার আয়োজন করেন। উক্ত সভার ঘোষণাসমূহই লন্ডন ঘোষণা নামে পরিচিত হয়।
  • আটলান্টিক সনদ (Atlantic Charter): দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে নিউফাউন্ডল্যান্ডের আর্জেন্টিনা
    উপসাগরে মার্কিন ক্রুজার 'অগাস্টা' এবং ব্রিটিশ জাহাজ 'প্রিন্স অব ওয়েলসে' অনুষ্ঠিত বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল কতিপয় মৌল নীতি সম্পর্কে একমত হয়ে যে বিবৃতি প্রদান করেন, সেটিই আটলান্টিক সনদ নামে খ্যাত। এই চুক্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা প্রতিহতকরণ, জনগণের অধিকারের সমর্থন প্রভৃতি বিষয়ের চুক্তি হয়।। য়। এই চুক্তিতে জার্মানি ও ইতালির হয়। এই দু বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ১৫টি দেশ সমর্থন দান করে।
  • মস্কো সম্মেলন (Moscow Conference): ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুলাই মস্কোয় জার্মানির বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত লড়াইয়ের বিষয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ব্রিটেনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এতে দুই পক্ষ পরস্পরকে সহায়তাদানের বিষয়ে, সব মিত্রের সম্মতি ছাড়া জার্মানির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না চালানোর বিষয়ে এবং তার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি অথবা শান্তিচুক্তি সম্পাদন না করার বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল। মস্কো সম্মেলনে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়। এজন্য মস্কো সম্মেলনকে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার তৃতীয় পদক্ষেপ বলা হয়।
  • তেহরান সম্মেলন (Tehran Conference): ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে নভেম্বর থেকে ১লা ডিসেম্বর
    পর্যন্ত সময়ে পারস্যের (ইরান) রাজধানী তেহরানে মিত্রশক্তি জোটের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্ট্যালিন, চার্চিল ও রুজভেল্ট উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে ফ্রান্সে মিত্রবাহিনীর অবতরণ, জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত আক্রমণের বিষয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া জাপানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সোভিয়েতের অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধ শেষে শান্তিরক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের কথা বলা হয়।
  • ইয়াল্টা সম্মেলন (Yalta Conference): জাতিসংঘ সনদের আর্টিকেল ২৭-এ সন্নিবেশিত নিরাপত্তা
    পরিষদের ভোটিং ব্যবস্থা সম্পর্কে বিধিবিধান। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ফ্রেব্রুয়ারিতে এই সম্মেলনে স্ট্যালিন, চার্চিল ও রুজভেল্ট আলোচনা করেন। সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে ভেটো ক্ষমতা প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
  • চতুর্থ জাতি ঘোষণা: ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে মস্কো সম্মেলনে বৃহৎ চার শক্তিধর রাষ্ট্রের (যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন,
    রাশিয়া ও চীন) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পর চতুর্থ জাতি ঘোষণা প্রকাশিত হয়। চতুর্থ জাতি ঘোষণায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণ, পরাজিত শত্রুর বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারণ ও বিশ্বব্যাপী শাস্তি প্রতিষ্ঠা প্রাধান্য পায়। জার্মানির নৃশংসতা নিয়ে চার বৃহৎ রাষ্ট্র ঐকমত্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়, যা বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার বহিঃপ্রকাশ। চতুর্থ জাতি ঘোষণায় সিদ্ধান্ত হয়, জার্মানিকে অভিযুক্ত করে ন্যুরেমবার্গ বিচারের মাধ্যমে শাস্তি বাস্তবায়ন করা হবে।
  • ইউনেস্কো: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দারিদ্র্য নিরসনকল্পে জাতিসংঘের বেশ কতকগুলো অঙ্গসংগঠন গড়ে ওঠে। এসব বিশেষ সংস্থার মধ্যে 'জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা' (UNESCO) অন্যতম। UNESCO-এর পূর্ণরূপ হলো- United Nations Educational Scientific and Cultural Organization. বিশ্ব ঐতিহাসিক স্থাপনা আবিষ্কার ও সংরক্ষণে UNESCO গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
  • আংকটাড: বাণিজ্য, অর্থায়ন, প্রযুক্তি পুঁজি বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রের সঙ্গে উন্নয়নসংশ্লিষ্ট ইস্যুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনার জন্য এই সংস্থা জাতিসংঘ ব্যবস্থায় কেন্দ্রবিন্দুরূপে কাজ করে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাণিজ্য, পুঁজি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সুবিধাকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়া। পাশাপাশি বিশ্বায়নের ফলে উদ্ভূত নতুন চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় এবং সমতার ভিত্তিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে সংযুক্ত হতে সাহায্য করা। বর্তমানে আংকটাড তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে অনেকখানি সফলতা অর্জন করেছে।
  • ডাম্বারটন ওকস (Dumbarton Oaks): ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সোভিয়েত
    ইউনিয়নের সাথে চীন ডাম্বারটন ওকসের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে। উক্ত সম্মেলনে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়। সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংগঠনের নাম স্থির হয় United Nations (জাতিসংঘ)।
  • শক্তি-ভারসাম্য: শক্তিসাম্য বা শক্তি-ভারসাম্য একটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কভিত্তিক ব্যবস্থা, যেটি
    আন্তর্জাতিক শাস্তি রক্ষা করার ক্ষেত্রে কাজ করে। এর মাধ্যমে কোনো গ্রুপ বা রাষ্ট্রীয় জোট অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। শক্তি-ভারসাম্যের মাধ্যমে কিছু সমশক্তিধর রাষ্ট্র জোট করে শাস্তিকে সুরক্ষা দিতে পারে। উনিশ শতকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য ছিল Balance of Power। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে লীগ অব ন্যাশনসের প্রতিষ্ঠা হওয়ায় এই পুরনো কূটনৈতিক ব্যবস্থা পরিত্যক্ত হয়।
  • ভেটো: কোনো কিছু অমান্য করা বা না মানার নামই ভেটো। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ (UNO) প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী মিত্রপক্ষের ৫টি শক্তিধর রাষ্ট্র; যথা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, চীন ও ফ্রান্স। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় এ ৫টি রাষ্ট্র যেকোনো সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা লাভ করে। এ ৫টি রাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য বিধায় নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী। জাতিসংঘের যেকোনো সিদ্ধান্ত নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে এ ৫টি রাষ্ট্রের যেকোনো রাষ্ট্রের ভেটো প্রয়োগে সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে না। জাতিসংঘের গঠনপ্রক্রিয়ায় ৫টি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র Veto প্রয়োগের ক্ষমতা সংরক্ষণের সুযোগ পায়।
  • ইউনিসেফ: জাতিসংঘের অধীন একটি সহযোগী সংস্থার নাম ইউনিসেফ (UNICEF), যার পূর্ণরূপ হলো- United Nations International Children's Emergency Fund.. অর্থাৎ শিশুদের কল্যাণে গঠিত শিশু তহবিলের নামই ইউনিসেফ।

জাতিসংঘ এবং বিশ্বশান্তি মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...