পাঠ-৪.৪: বলশেভিক বিপ্লবের ফলাফল

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

15

বলশেভিক বিপ্লব শুধু রাশিয়ার আর্থসামাজিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে সংঘটিত হয়নি, বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের অবসান ঘটিয়ে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংকল্পও ব্যক্ত করেছিল। তাই এ বিপ্লব রাশিয়াসহ সারা পৃথিবীর রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিংশ শতাব্দীতে সারা পৃথিবীর নির্যাতিত, অবহেলিত ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তিসংগ্রামে নিরন্তর প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল।

বলশেভিক বিপ্লবের ফলাফল ছিল নিম্নরূপ-

প্রথমত: বলশেভিক বিপ্লব রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দ্রুত উচ্ছেদ করে। জমি ও শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় এনে আধা-পুঁজিবাদী, আধা-সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করে।

দ্বিতীয়ত: বলশেভিক বিপ্লবের ফলে রাশিয়া থেকে জারতন্ত্র ও বুর্জোয়া গণতন্ত্র উচ্ছেদ হয়। রাশিয়ার কৃষক ও শ্রমিকের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত সোভিয়েত শাসনব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শ্রেণিভিত্তিক সমাজের পরিবর্তে শ্রেণিহীন, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা শুরু হয়'। প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বহারার একনায়কতন্ত্র।

তৃতীয়ত: বলশেভিক বিপ্লবের পূর্বে রাশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিকাশের পরও রাশিয়া ছিল ইউরোপের অন্যতম পিছিয়ে পড়া দেশ। বলশেভিক বিপ্লব শোষণব্যবস্থা উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়ে আনে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হওয়ার সামান্য কয়েক বছরের মধ্যে রাশিয়ায় ধনী ও গরিবের পার্থক্য কমে আসে। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা লাভ করে ক্রমেই উন্নত জীবনে প্রবেশ করে।

চতুর্থত: বলশেভিক বিপ্লবের পূর্বে রাশিয়ার প্রশাসন ছিল সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীভূত ও একনায়কতান্ত্রিক। বিপ্লবের ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রশাসনে কৃষক ও শ্রমিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। স্থানীয় প্রশাসন পরিকল্পনার দায়িত্ব অর্পিত হয় আঞ্চলিক সোভিয়েতের উপর।

পঞ্চমত: বিপ্লবের প্রাক্কালে রাশিয়ায় প্রায় ১৩০টির মতো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ছিল, যাদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ ছিল না। শিক্ষার হার এদের মধ্যে প্রায় অনুপস্থিত ছিল। বিপ্লবের পর দেশের সকল নাগরিক ও জাতিসত্তার শিক্ষা-সংস্কৃতির মানোন্নয়নের লক্ষ্যে গণশিক্ষার ব্যবস্থা চালু করা হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যে রুশ জাতি ছাড়াও অন্য জাতিগুলোও শিক্ষিত হয়ে ওঠে। জাতিগত বৈষম্য দূর হওয়ায় বিভিন্ন জাতির মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে ওঠে, যা উন্নত রুশ রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণে সাহায্য করে।

ষষ্ঠত: বিপ্লবের পর রাষ্ট্র তার প্রত্যেক নাগরিকের শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ফলে মানুষের ন্যূনতম মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

সপ্তমত: বলশেভিক বিপ্লব পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি সমাজতন্ত্রের ভাবধারায় আলোড়িত হয়। পূর্ব ইউরোপ, চীন, মঙ্গোলিয়া, উত্তর কোরিয়া ও কিউবায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবীব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন একটি প্রধান রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিণত হয়।

অষ্টমত: বলশেভিক বিপ্লব এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার পরাধীন দেশগুলোতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উপনিবেশের জনগণ স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য সংগ্রাম শুরু করে। ক্রমে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম। সমাজতন্ত্রের বেশকিছু মর্মবাণী ধারণ করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রচিন্তার বিস্তার ঘটে।
বস্তুত জারশাসিত রাশিয়ার সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সর্বত্র যে পচনের সূত্রপাত হয়েছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ ধাক্কায় তা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। বলশেভিকদের কৃষক-শ্রমিকবাদী নীতি, যুদ্ধের বিরোধিতা ও দক্ষ সাংগঠনিক তৎপরতা মানুষের মনে বিকাশ, প্রগতি ও উচ্চ আকাঙ্ক্ষার বাণী নিয়ে এসেছিল, যার ফল হচ্ছে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের বলশেভিক বিপ্লব।

Explanation of Key Words

  • বলশেভিক রুশ শব্দ 'বলশেভিনস্টভো' বা সংখ্যাগরিষ্ঠ থেকে বলশেভিক শব্দের উৎপত্তি। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেসে বিপ্লবপন্থি ও আপসকামীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লবপন্থিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং বলশেভিক নামে পরিচিত হয়। অন্য পক্ষ মেনশেভিক (সংখ্যালঘু বা 'মেনশিনস্টভো' শব্দ থেকে উদ্ভূত) নামে অভিহিত হয় এবং আলাদাভাবে সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। এই বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বেই ১৯১৭খ্রিষ্টাব্দে রুশ বিপ্লব সংঘটিত হয়। এই পার্টি পরবর্তীকালে 'রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি' থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি নামে রূপান্তরিত হয়।
  • ডুমা: জার শাসনামলে রাশিয়ার সংবিধানসভা অর্থাৎ আইনসভার নাম ছিল 'ডুমা'। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে লেনিনের আহ্বানে বলশেভিকরা তৃতীয় ডুমার নির্বাচনে প্রথম অংশ নেয়। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে লেনিনের মনোনীত রোমান মিলনভাস্কি ডুমার সদস্য নির্বাচিত হলে বলশেভিক আন্দোলনে গতিশীলতা আসে। ২৬শে ফেব্রুয়ারি জার নিকোলাস ডুমা বন্ধের নির্দেশ দিলে ডুমার সদস্যবৃন্দ তা অমান্য করেন। ১৫ই মার্চ ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে ডুমার সদস্যবৃন্দ প্রিন্স লভেভের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার গঠন করলে জারতন্ত্রের অবসান হয়। রুশ বিপ্লবের পর ডুমা ভেঙে দেওয়া হয়।
  • মেনশেভিক রুশ মেনশেভিক শব্দের অর্থ সংখ্যালঘিষ্ঠ। রুশ বিপ্লবের প্রাক্কালে ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে Russian Social Democratic Party গঠিত হয়। এ পার্টির নেতৃত্বের সবাই মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী ছিল। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনে পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের রণকৌশল নিয়ে দলটি দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন লেনিন আর সংখ্যালঘিষ্ঠ (মেনশেভিক) অংশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন মার্তন্ড ও প্লেখানভ।
  • নিহিলিজম ও নারোদনিক আন্দোলন উনিশ শতকের রাশিয়ায় সমাজ পরিবর্তনের জন্য জারবিরোধী
    অনেক গুপ্ত আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। গড়ে উঠেছিল গুপ্ত সংগঠন। এই সংগঠনসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নিহিলিজম ও নারোদনিক আন্দোলন। এই দুটি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল জার শাসনের অত্যাচার ও শোষণ থেকে দেশকে মুক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের মুক্তিসাধন। কিন্তু এসর আন্দোলন ব্যর্থ হলেও তাদের সংগ্রাম ভবিষ্যতের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিল।
  • লালফৌজ: ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই সেপ্টেম্বর রাশিয়াকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। কেরোনেস্কির প্রজাতান্ত্রিক সরকারকে লেনিন বিপ্লবের জন্য যথার্থ মনে করেননি। তাই তিনি পেট্রোগ্রাডে প্রত্যাবর্তন করে সশস্ত্র পন্থায় ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন। বলশেভিক পার্টির সশস্ত্র সমাজতন্ত্রীদের Red Gurd বা লালফৌজ বলা হতো। অক্টোবর মাসে রাশিয়ার ৬২টি শহরে প্রায় ২ লাখ লালফৌজ ক্ষমতা দখলের জন্য প্রস্তুত হয়।
  • এপ্রিল থিসিস: ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা এপ্রিল লেনিন প্রবাস থেকে পেট্রোগ্রাডে ফিরে আসেন এবং ৪ঠা এপ্রিল নিখিল রুশ সোভিয়েত কনফারেন্সে যেসব প্রস্তাবনা বা থিসিস হাজির করেন, সেগুলোই 'এপ্রিল থিসিস' নামে খ্যাত। এই থিসিসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল নিম্নরূপ: ১. বুর্জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদী অস্থায়ী রুশ সরকারের বিরোধিতা, ২. আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের (তখন প্রথম মহাযুদ্ধ চলমান) ধারণা প্রত্যাহার, ৩. সর্বহারা ও গরিব কৃষকদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, ৪. সোভিয়েত সরকার গঠন, ৫. পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের নির্মূলীকরণ, ৬. জমি জাতীয়করণ, ৭. সমস্ত ব্যাংককে একত্রীকরণের মাধ্যমে, সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণাধীনে একটি ব্যাংক গঠন, ৮. উৎপাদন ও বণ্টনের উপর সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ৯. পার্টির নাম পরিবর্তন করে কমিউনিস্ট পার্টি নামকরণ (তখন পর্যন্ত পার্টির নাম ছিল রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি) এবং ১০. আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট গঠন।
  • সিন্ডিকালিজম: এটি হলো ট্রেড ইউনিয়ন বা বাণিজ্য ও পেশাসংঘভিত্তিক সমাজবাদী মতবাদ। ফরাসি 'সিন্ডিকেট' শব্দ থেকে সিন্ডিকালিজমের উৎপত্তি। সিন্ডিকেট-এর অর্থ ট্রেড ইউনিয়ন বা বাণিজ্যসংঘ। এটি বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের একটি মতবাদ। এই মতবাদ অনুযায়ী সমাজবিপ্লব ও ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনের ভিত্তি হলো ট্রেড ইউনিয়ন। নৈরাজ্যবাদের সঙ্গে এর মিল আছে বলে অনেকে একে নৈরাজ্যবাদী সিন্ডিকালিজম নামেও অভিহিত করেন। মাইকেল বাকুনিন, জর্জ সোরেল প্রমুখ ছিলেন এই মতবাদের প্রবক্তা। এই মতবাদ শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক দল বা তার রাজনৈতিক ভূমিকার কথা অস্বীকার করে এবং পুঁজিবাদী শাসক-শোষকের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিবর্তে শিল্পকেন্দ্রিক কার্যকলাপ বা ধর্মঘট ইত্যাদিকে সমর্থন করে।
  • ফ্যাবিয়ান সোসাইটি রোমান জেনারেল কুইনটাস ফ্যাবিয়াস ম্যাক্সিমাসের নামানুসারে ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনে ফ্যাবিয়ান সোসাইটির জন্ম। বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, লেখক ও রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে এই সোসাইটি গড়ে ওঠে। ফ্যাবিয়ানরা মনে করে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংস্কার এবং সামাজিক ক্রমবিবর্তনের প্রক্রিয়াতেই পুঁজিবাদী সমাজের সমাজতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তর ঘটবে। এর জন্য বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তাকে তারা অস্বীকার করে।
  • মার্ক্সবাদ: কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের সম্মিলিত মতবাদই মার্ক্সবাদ। মার্ক্সবাদের মূল উৎস তিনটি, যথা- ১। জার্মান দর্শন, ২। ব্রিটিশ অর্থনীতি ৩। ফরাসি সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ মার্ক্সবাদের ভিত্তি। মার্ক্সবাদ অনুযায়ী অর্থনৈতিক কাঠামো বা উৎপাদন পদ্ধতি অনুযায়ীই সমাজকাঠামো গড়ে ওঠে। তারা দেখান যে, পুঁজিবাদী সমাজই শোষণমূলক সমাজের শেষ রূপ। পুঁজিবাদী সমাজের দ্বন্দ্ব অর্থাৎ পুঁজিপতি ও সর্বহারা শ্রেণির দ্বন্দ্বের ফলে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম হতে বাধ্য।
  • কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস প্রণীত কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো বা কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রকাশিত হয় ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে। এটিই ছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রথম কর্মসূচিভিত্তিক দলিল। এতে সমাজ বিকাশের অব্যর্থ নিয়ামকসমূহ, পুঁজিবাদ ধ্বংস করে সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠা, সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের তত্ত্ব ও কমিউনিস্টদের আন্দোলন কৌশল প্রভৃতি আলোচিত হয়। এই ইশতেহারেই ঘোষণা করা হয়, সর্বহারা শ্রেণির শৃঙ্খলা ছাড়া হারানোর কিছু নেই। এই ইশতেহারেই দুনিয়ার মজদুরদের এক হওয়ার কথা বলা হয়। আর এজন্যই একে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ দলিল বলে বিবেচনা করা হয়।
  • সাম্যবাদ কমিউনিজম সাম্যবাদ সমাজতন্ত্রের উচ্চতর পর্যায়। সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সাম্যবাদের পার্থক্য প্রকারগত নয় বরং মাত্রাগত। সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ে যৌথ খামার এবং সমবায়ী মালিকানা উভয়েরই অস্তিত্ব থাকে, কিন্তু সাম্যবাদী পর্যায়ে থাকে এক ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা- রাষ্ট্র বা সমগ্র জনগণের মালিকানা। সাম্যবাদী সমাজে জাতিতে জাতিতে তারতম্যেরও কোনো অস্তিত্ব থাকে না। উল্লেখ্য, সাম্যবাদী সমাজের উপরিউক্ত চিত্র এখনো তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ। বিশ্বের কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাম্যবাদে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হয়নি।
  • শ্বেত প্রতিবিপ্লবী: ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের বিপ্লব রাশিয়ার সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন সাধন করে। বিপ্লবকে স্তিমিত করে দিতে এবং পার্শ্ববর্তী অন্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহকে বিপ্লবের হাত থেকে রক্ষায় শ্বেত বিপ্লবীরা বিপ্লবের বিরোধিতা করে। এজন্য তাদের শ্বেত প্রতিবিপ্লবী বলা হয়। শ্বেত প্রতিবিপ্লবীদের ইন্ধন দেয় যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি রাষ্ট্র। এর ফলে সমাজতান্ত্রিক সরকার দারুণ সমস্যায় পড়ে। কিন্তু লেনিনের সুযোগ্য নেতৃত্বের ফলে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বিপদমুক্ত হয়।
  • সর্বহারার একনায়কত্ব বুর্জোয়া রাষ্ট্রশক্তিকে হটিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব। শোষকগোষ্ঠীর বাধা প্রতিহত করার জন্য, বিপ্লবের বিজয় সুসংহত করার জন্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার চক্রান্ত বানচাল করার জন্য সর্বহারা শ্রেণি তাদের একনায়কত্বকে ব্যবহার করে। সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের প্রধান কাজ সৃষ্টিশীল ও গঠনমূলক আর সেটি হলো ব্যাপক শ্রমজীবী জনগণকে সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ও মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করা।
  • জারতন্ত্র: আঠারো-উনিশ শতকে গোটা ইউরোপে কয়েকটি রাজবংশ দ্বারা স্বৈরশাসন প্রচলিত ছিল। রাশিয়ার রোমানভ বংশের রাজাদের জার (Czar বা Tsar) উপাধি ছিল। জারদের শাসনকে বলা হতো জারতন্ত্র (Czarist)। জারতন্ত্রের উদ্দেশ্য ছিল- কোনো পরিবর্তন নয়, স্থিতিশীল শাসন। জারদের নীতি ছিল- এক জার, এক চার্চ ও এক রাশিয়া। এরূপ প্রতিক্রিয়াশীল মতবাদের বিরুদ্ধে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সময় (১৮৫৫-১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দ) থেকেই রাশিয়ায় বৈপ্লবিক চিন্তার জাগরণ ঘটে। ১৯১৭
    খ্রিষ্টাব্দে জার নিকোলাসের পতনের মধ্য দিয়ে রোমানভ রাজবংশের ও জারতন্ত্রের অবসান ঘটে, প্রতিষ্ঠিত হয় রাশিয়ার প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকার।
  • প্রলেতারিয়েত প্রলেতারিয়েত শব্দের অর্থ ভূমিহীন বা সর্বহারা। রুশ বিপ্লবের প্রাক্কালে রাশিয়ার সমাজব্যবস্থায় কৃষকরা ছিল শোষণের শিকার। বিশেষ করে 'স্ট্রোলিপিন' ভূমি সংস্কার আইনের দ্বারা জোতদার শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের কারণে কৃষকদের ভূমি জোতদাররা ঋণের দায়বদ্ধতার অজুহাতে কুক্ষিগত করতে থাকে। ফলে কৃষকরা ভূমিহীন কৃষক অর্থাৎ সর্বহারা শ্রেণিতে পরিণত হয়। ভূমিহীন সর্বহারা কৃষকরাই প্রলেতারিয়েত।
  • শ্বেত সন্ত্রাস: লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা রাশিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ করলেও প্রতিবিপ্লবী শক্তিগুলো তা সহজে মেনে নেয়নি। জার শাসনামলের কতিপয় সেনাপতির নেতৃত্বে ও পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের ইন্ধনে প্রতিবিপ্লবীরা লেনিনের সরকারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালায়। তাদের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমই 'শ্বেত সন্ত্রাস'। লেনিন ট্রটস্কি ও স্ট্যালিনের সহযোগিতায় 'লাল সন্ত্রাসের' মাধ্যমে প্রতিবিপ্লবীদের চক্রান্ত থেকে দেশকে নিরাপদ করতে সক্ষম হন।
  • ব্রেস্ট-লিটডস্ক সন্ধি: রুশ বিপ্লবের পরপরই জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সন্ধির নাম ব্রেস্ট-লিটভস্ক সন্ধি। রুশ বিপ্লবের পূর্বে লেনিন শ্রমিকদের রুটি, কৃষকদের জমি ও সৈনিকদের যুদ্ধের পরিবর্তে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণ ও যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা ছিল তার প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক। তাই রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিপক্ষ জার্মানির সাথে উক্ত সন্ধি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে সরে আসে। উক্ত সন্ধির দ্বারা রাশিয়া তার লৌহ ও কয়লাশিল্পের অংশ হারায়। জার্মানিকে প্রচুর ক্ষতিপূরণ দিলেও রাশিয়া অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ লাভ করে।

বলশেভিক বিপ্লব-মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...