hsc

ভারতবর্ষে আগত ইউরোপীয় কোম্পানিসমূহ (১.১)

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

13

Europeans Companies Arrived in India

ভারতীয় উপমহাদেশের অতুল ঐশ্বর্যের কারণেই প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষের সাথে পাশ্চাত্য দেশগুলোর বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। ক্রুসেডের (ধর্মযুদ্ধ) পর ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগরের উপর আরবগণ প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে এবং ভারতীয় বাণিজ্যে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আরবদের নিকট থেকে জোনোয়া, ভেনিস, ফ্লোরেন্স প্রভৃতি নগরের ব্যবসায়ীগণ পণ্য ক্রয় করে ইউরোপের সর্বত্র বিক্রি করত। ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তুরস্ক কনস্টান্টিনোপল অধিকার করে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করলে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে উপমহাদেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সমগ্র ইউরোপ মহাদেশে ভারতীয় সামগ্রী বিশেষ করে মসলিন, মসলা, সোনা-রুপা, মৃৎশিল্পের চাহিদা ছিল আকাশ ছোঁয়া। এ অবস্থায় তারা নতুন পথের সন্ধান করতে থাকে। তাছাড়া ভারতবর্ষে আরবীয়দের একচেটিয়া প্রাধান্য খর্ব করাও ইউরোপীয়দের উদ্দেশ্য ছিল। অধিকন্তু রেনেসাঁর ফলে অজানাকে জানবার ইচ্ছায় নতুন পথের সন্ধান করতে ইউরোপীয়রা উদ্বুদ্ধ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতবর্ষে (জম্মুদ্বীপ) আসার জলপথ আবিষ্কারের লক্ষ্যে ১৪৮৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রখ্যাত পর্তুগিজ নাবিক বার্থোলোমিউ দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ আবিষ্কার করে সমুদ্রপথে প্রাচ্য দেশে আসার নতুন পথের সন্ধান দেন। স্পেনের রানি ইসাবেলার নির্দেশে ভারতের সাথে ব্যবসার জন্য বাণিজ্যিক পথ আবিষ্কার করতে গিয়ে ১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে কলম্বাস আটলান্টিকের পথে আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেন।

১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা ইউরোপ থেকে ভারতবর্ষে সরাসরি আসার জলপথ আবিষ্কার করে যেমন ইতিহাস রচনা করলেন তেমনি ইউরোপীয়দের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করলেন। ভাস্কো-দা-গামা আরবীয় নাবিকদের সহায়তায় উত্তমাশা অন্তরীপ (দক্ষিণ এশিয়া) পরিভ্রমণ করে ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম উপকূলস্থ কালিকট বন্দরে উপস্থিত হন (২৭ মে, ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে)। তখন ভারতীয় উপমহাদেশে লোদী বংশের সিকান্দার লোদীর রাজত্বকাল (১৪৮৯-১৫১৭ খ্রি.) ছিল। তার দরবারে উপস্থিত হয়ে তিনি বাণিজ্য প্রার্থনা করেন। ভাস্কো-ডা-গামার আবিষ্কৃত পথ ধরেই ইউরোপীয় সামুদ্রিক জাতিগুলো ভারতবর্ষে আসতে থাকে। এভাবেই নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করে দেন ভাস্কো-ডা-গামা। অবশ্য ১৫০২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দ্বিতীয়বার বাণিজ্য জাহাজ নিয়ে কালিকট বন্দরে এসেছিলেন এবং সেখান থেকে কোচিনে গিয়ে পর্তুগিজ কুঠি নির্মাণ করেছিলেন। পর্তুগিজ তথা ইউরোপীয় জাতিগুলোর ভারতবর্ষে আসার ক্ষেত্রে ভাস্কো-দা-গামার অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

পর্তুগিজদের আগমন

দুঃসাহসী পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-ডা-গামার আবিষ্কৃত পথ ধরে পর্তুগিজরা এ উপমহাদেশে আসতে শুরু করে। ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগিজরা সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে আগমন করে। এ সময় আরব বণিকদের সাথে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে এবং পর্তুগিজদের পক্ষে সাফল্য আসে। ফ্রান্সিসকো ডি আলমিডা ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম পর্তুগিজ প্রতিনিধি বা গভর্নর (১৫০৫-১৫০৯ খ্রি.)। আলবুকার্ক দ্বিতীয় গভর্নর নিযুক্ত হন (১৫০৯-১৫১৫ খ্রি.)। আলবুকার্ক পর্তুগিজ গভর্নরদের মধ্যে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। তার সুযোগ্য নেতৃত্বের ফলেই পর্তুগিজগণ ভারতীয় উপমহাদেশে খুবই শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজন্যবর্গের দুর্বলতার সুযোগে আলবুকার্ক উপমহাদেশে পর্তুগিজ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। এ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি বিজয়পুরের সুলতানের নিকট থেকে গোয়া দখল করে একটি বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন এবং ক্রমশ শক্তি বৃদ্ধি করেন। অতঃপর তিনি মালাক্কা এবং হুরমুজ দখল করে কোচিনে একটি শক্তিশালী বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করেন। তিনি ভারতবর্ষে একটি স্থায়ী পর্তুগিজ সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি পর্তুগিজদের ভারতীয় রমণীদের বিয়ে করার নির্দেশ দেন। ভারতবর্ষে পর্তুগিজ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে তিনি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেন। ১৫১৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর পরবর্তী পর্তুগিজ প্রতিনিধিরা অল্পদিনের মধ্যেই ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকূলের কালিকট, চৌল, কোচিন, বোম্বাই, সিংহল, হুগলী ও বঙ্গদেশে শক্তিশালী বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে এবং কুঠিগুলো দুর্গে পরিণত করে। ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তারা চট্টগ্রামে ও সাতগাঁও-এ শুল্ক ঘাঁটি নির্মাণ করে। হুগলীতে ১৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দে তারা উপনিবেশ গড়ে তোলে। এরপর উড়িষ্যা এবং বাংলায় কিছু অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন তার 'ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী' বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় পর্তুগিজদের ৪১টি বাড়ি ছিল। ইসলামপুর, শরাফতগঞ্জ ও নবাবপুরে ছিল তাদের বসতি।

পর্তুগিজদের পতন: ভারতবর্ষে পর্তুগিজদের অবস্থান স্থায়ী হয়নি। তাদের অত্যাচার, নির্যাতন এবং ইংরেজ ও ওলন্দাজদের উত্থানে তাদের পতন শুরু হয়। নিম্নে পর্তুগিজদের পতনের প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো-
প্রথমত, ১৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর পর্তুগিজদেরকে বাংলার সাতগাঁ নামক স্থানে বসতি স্থাপন এবং ব্যবসায়-বাণিজ্য করার অনুমতি প্রদান করেন। তারা কালক্রমে দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে ওঠে। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে তারা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে অন্যায়ভাবে অধিক শুল্ক আদায়, দাস ব্যবসায় লিপ্ত, ভারতীয়দের জোরপূর্বক খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত, সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের দুজন ক্রীতদাসকে অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত হয়। ফলে সম্রাট শাহজাহান ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে তাদের হুগলী থেকে বিতাড়িত করেন। এরপর তাদের পতন শুরু হয়।
দ্বিতীয়ত, পর্তুগাল ও স্পেন মিলিত হয়ে ওলন্দাজ ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে ইউরোপে ১৫৮৮ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধে পর্তুগালের অনেক অর্থ ক্ষয় হয়। ফলে পর্তুগালের মতো ছোট দেশের পক্ষে দূরপ্রাচ্যের রাজ্যের ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে; যা তাদের পতনের অন্যতম কারণ।
তৃতীয়ত, আলবুকার্কের পরে পর্তুগিজ সরকার অপর কোনো সুদক্ষ শাসনকর্তাকে ভারতবর্ষে প্রেরণ করতে পারেনি, যিনি পর্তুগিজ শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন; যা তাদের পতন ডেকে আনে।
চতুর্থত, পর্তুগিজদের অনুকরণে ওলন্দাজ, দিনেমার, ইংরেজ ও ফরাসি প্রভৃতি ইউরোপীয় বণিকরা ভারতবর্ষে আসতে থাকে। তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় পর্তুগিজরা টিকে থাকতে পারেনি।
পঞ্চমত, স্বদেশ থেকে আর্থিক সাহায্যের অভাবে পর্তুগিজ কোম্পানি তাদের নিয়ম-শৃঙ্খলা হারিয়ে ফেলে। তারা অর্থ অভাবে নানান অবৈধ কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ে। মুঘল সম্রাট আকবর তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে পর্তুগিজরা পিছুটান দেয়।
ষষ্ঠত, পর্তুগিজরা কেবল ব্যবসায়-বাণিজ্যই করত না, তারা এদেশের জমিদার ও প্রভাবশালী বারোভূঁইয়াদের সেনাবাহিনীতে চাকরি করত। আবার সুযোগ পেলেই জুলুম, নির্যাতন, লুণ্ঠন করত। পর্তুগিজ সৈন্যরা জোর করে এদেশের মেয়েদের বিবাহ করত। এসকল কর্মকাণ্ডই তাদের পতন ডেকে আনে।

ওলন্দাজদের আগমন

ইউরোপের বণিক জাতিগুলোর মধ্যে পর্তুগিজদের পরেই হল্যান্ডের (নেদারল্যান্ড) অধিবাসী ওলন্দাজদের (ডাচ) ভারতবর্ষে আগমন ঘটে। তারা ভারতবর্ষে বাণিজ্য উপলক্ষ্যে ১৬০২ খ্রিষ্টাব্দে ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (United East India Company) গঠন করে। কোম্পানির সনদ অনুযায়ী যুদ্ধবিগ্রহে যোগদান, সন্ধি স্থাপন, দুর্গ নির্মাণ প্রভৃতি অধিকার লাভকরে। ১৬৪১ খ্রিষ্টাব্দে তারা পর্তুগিজদের নিকট থেকে মালাক্কা অধিকার করে এবং ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজদের সিংহল থেকে বিতাড়িত করে। এ বিজয়ের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দ্বীপগুলোর ওপর ওলন্দাজদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতে তাদের প্রধান ঘাঁটি ছিল মাদ্রাজ উপকূলে নাগাপট্টম এবং বাংলায় প্রধান ঘাঁটি ছিল চুঁচুড়ায়। ঢাকায় তারা কুঠি স্থাপন করেছিল ১৬৬৩ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান মিটফোর্ট হাসপাতালের কাছে। তেজগাঁওয়ে তাদের একটি বাগানবাড়ি ছিল। ঐতিহাসিক টেলর উল্লেখ করেছেন, "১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় ৩২টি ওলন্দাজ পরিবার ছিল। পিটারসন কোয়েনই ছিলেন ভারতবর্ষে ওলন্দাজ শক্তির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।”

ওলন্দাজদের পতন: স্পেনীয়দের সাথে দ্বন্দ্ব ওলন্দাজদের পতনের প্রধান কারণ। তাছাড়া ওলন্দাজগণ ভারতবর্ষ অপেক্ষা মালয় দ্বীপপুঞ্জে আধিপত্য বিস্তারে বেশি মনোযোগী হন। এ সুযোগে ইংরেজগণ ভারতবর্ষে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকলে ওলন্দাজরা টিকে থাকতে না পেরে ইংরেজদের নিকট সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে স্বদেশে ফিরে যায় (এম. হাসান দানীর 'ঢাকা' বইতে উল্লেখ করেছেন, নারিন্দায় খ্রিষ্টান কবরস্থানে ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দের কুঠি প্রধান ডি ল্যাংহিটের কবরটিই এখন ঢাকায় ওলন্দাজদের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে টিকে আছে)।

দিনেমারদের আগমন ও পতন

দিনেমার বণিকগণ (ডেনমার্কের অধিবাসী) ১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (Danish East India Company) গঠন করে ভারতবর্ষে বাণিজ্য করতে উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে তানজোর জেলার ট্রাঙ্কুভার এবং ১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার উত্তরে শ্রীরামপুরে তারা বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন। কিন্তু ব্যবসায় সুবিধা করতে না পারায় ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে ১২,৫০,০০০ রুপিতে ইংরেজদের নিকট তাদের বাণিজ্য কুঠি বিক্রি করে এ উপমহাদেশ থেকে চলে যায়।

ইংরেজদের আগমন

ভারতবর্ষে বিপুল ঐশ্বর্য সম্পর্কে ইংরেজরা পূর্ব থেকে অবগত ছিলেন। সর্বোপরি পর্তুগিজ, ওলন্দাজ ও দিনেমারদের বাণিজ্য উপলক্ষ্যে ভারতবর্ষে আগমনের কথা জেনে রানি প্রথম এলিজাবেথের সময় ইংরেজ বণিকদের মনে প্রাচ্যদেশে বাণিজ্য করার অদম্য আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ বণিকরা প্রাচ্যের সহিত বাণিজ্য করার উদ্দেশে "ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (East India Company) নামে একটি বণিক সংঘ গঠন করে। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর এ সমিতিকে রানি এলিজাবেথ ১৫ বছরের বাণিজ্য সনদ প্রদান করেন। এই সমিতির মূলধন ছিল ৭০,০০০ পাউন্ড। সদস্য সংখ্যা ছিল রানি এলিজাবেথ সহ ২৪ জন। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে 'ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' নামে অপর একটি বণিক সংঘ রাজার অনুমতিপত্র নিয়ে ভারতে আগমন করে। শীঘ্রই একই দেশের দুটি কোম্পানির মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অতঃপর ১৭০৮ খ্রিষ্টাব্দে উভয় কোম্পানি মিলিত হয়ে 'The United Company of Marchants of England Trading to the East Indies' নামে আখ্যায়িত হয়। এই সম্মিলিত কোম্পানিই ভারতবর্ষের ইতিহাসে 'ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' নামে সু-পরিচিত। এই কোম্পানিই সময়ের ব্যবধানে বণিকের মানদণ্ড শাসকের রাজদণ্ডে পরিণত করে। অথচ সেদিন কেউই চিন্তা করেনি যে, এই বণিক সম্প্রদায়ই একদিন এদেশের ভাগ্যবিধাতা হবে।

১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্স ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের সুপারিশ নিয়ে ভারতবর্ষে আগমন করেন এবং মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতি নিয়ে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে। এ সময় পর্তুগিজদের সাথে ইংরেজদের সংঘর্ষ হয়। শেষ পর্যন্ত ইংরেজরা জয়লাভ করে। ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের দূত হিসাবে ১৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে স্যার টমাসরো মোগল দরবারে আগমন করে ৩ বছর অবস্থান করে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিকট থেকে কতগুলো বাণিজ্যিক সুবিধা লাভ করেন। স্যার টমাসরো অত্যন্ত দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি বিলাতের কর্তৃপক্ষকে এই মর্মে পরামর্শ দেন যে, "এ দেশের মানুষের স্বভাব তিনি যা বুঝেছেন তা হলো, তারা ভীতি প্রদর্শন ও বল প্রয়োগ ছাড়া অন্য কিছুর দ্বারা বশীভূত হয় না। সুতরাং কোম্পানির উচিত প্রয়োজন মতো তরবারি ব্যবহার করা।" তার নীতি ছিল "আবেদন ও বল প্রয়োগ" যা পরবর্তীকালে ইংরেজদের ভারত শাসননীতিতে লক্ষণীয়।

১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ ও পর্তুগিজদের মধ্যে এক চুক্তির মাধ্যমে স্বদেশে উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন হয়। অতঃপর ঐ বছরই ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস পর্তুগিজ রাজকন্যা ক্যাথরিন ব্রাগাঞ্জকে বিবাহ করে যৌতুক হিসেবে পর্তুগিজদের নিকট থেকে মুম্বাই শহরটি লাভ করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চার্লস-এর নিকট থেকে উক্ত শহরটি বাৎসরিক ১০ পাউন্ডের বিনিময়ে ইজারা গ্রহণ করে। কিন্তু পরে তা কোম্পানি পঞ্চাশ হাজার পাউন্ডে ক্রয় করে নেয়।
১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে মুম্বাই-এর ইংরেজ কর্তৃপক্ষের সাথে সম্রাট আওরঙ্গজেবের এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উক্ত চুক্তি মোতাবেক জব চার্নক বঙ্গদেশে আসার অনুমতি লাভ করেন এবং ভাগীরথী নদীর তীরে সুতানটি, কালিকট এবং গোবিন্দপুর এই তিনটি গ্রাম ক্রয় করে কলকাতা নগরীর গোড়াপত্তন করেন। এ সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের নামানুসারে ফোর্ট উইলিয়াম নামে একটি দুর্গ তৈরি করেন। এভাবে কলকাতা, মাদ্রাজ এবং মুম্বাই তিনটি শহরেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফরাসিদের আগমন

ইউরোপ মহাদেশের বণিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বশেষে আগমন করেন ফরাসিরা। ১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুই-এর রাজত্বকালে তার মন্ত্রী কোলবাটের সহযোগিতায় "ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি" গঠিত হয়। ১৬৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রাঁসোয়াক্যার (Francois Carron) এর নেতৃত্বে তারা সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। পরের বছর মসলিমপট্টমে দ্বিতীয় বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। (ঢাকায় ফরাসিদের স্মৃতি বহন করে পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জ এলাকাটি। ঢাকার নায়েব নাজিম নওয়াজিশ খান ১৭২৬ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসিদের গঞ্জ বসানোর অনুমতি দিলে তারা একটি আবাস গড়ে তোলে যা ফরাশগঞ্জ নামে পরিচিত)। ১৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খান ফরাসিদের বাংলার চন্দননগরে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণের অনুমতি দেন। কালক্রমে তারা পণ্ডিচেরী, মাহে এবং কালিকট প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করে। ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পার্থক্য এই যে, ফরাসি কোম্পানি ছিল ফরাসি সরকারের বাণিজ্য বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন। পক্ষান্তরে ইংরেজ কোম্পানি ছিল বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত। ইংরেজ কোম্পানি শুধুমাত্র উপমহাদেশেই বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং উপনিবেশ স্থাপনে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ফরাসিরা উপমহাদেশের বাইরে মাদাগাস্কার দ্বীপেও বাণিজ্য ও উপনিবেশ স্থাপনে মনোযোগী হয়। যে কারণে উপমহাদেশের বাণিজ্যে ফরাসিদের ভাটা পড়ে।

১৭২০ খ্রিষ্টাব্দের পর ফরাসি কোম্পানির অবস্থা উন্নতি হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ১৭২১ খ্রিষ্টাব্দে মরিসাস দ্বীপে, ১৭২৫ খ্রিষ্টাব্দে মাহে, ১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে কারিকরে কুঠি স্থাপন করে। ফরাসিরা পণ্ডিচেরীতে প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলে। এখানে তারা একটি দুর্গ নির্মাণ করে। এ দুর্গে কিছু সংখ্যক ভারতীয় সৈন্যও নিযুক্ত করে। ১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দে যোসেফ ডুপ্লে পণ্ডিচেরীর শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়। ডুপ্লে নেতৃত্বে ফরাসিরা ভারতে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে এবং ভারতবর্ষে ফরাসি সাম্রাজ্য স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে।

পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমার, ইংরেজ ও ফরাসিদের ন্যায় সুইডেনের বণিক সম্প্রদায় The Swedish East India Company, The Astrian East India Company প্রভৃতি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গঠন করে ভারতবর্ষে বাণিজ্য করতে আসে। গ্রিকরাও ভারতবর্ষে এসেছিল। জেমস টেলর উল্লেখ করেছেন, কলকাতায় গ্রিক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা 'আগিরি' ঢাকায় বসবাস করতেন এবং ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পরলোকগমন করেন। ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন উল্লেখ করেছেন, ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় ২১টি গ্রিক পরিবার ছিল। লবণ ও পাটের কারবার করে তারা বেশ অর্থ উপার্জন করেছিল। ঢাকায় তারা একটি গির্জাও তৈরি করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি.এস.সি চত্বরে একটি গ্রিক কবর আজও তাদের স্মৃতি বহন করে। সে যাই হোক, বাণিজ্যের ব্যাপক প্রতিযোগিতার মধ্যে ইংরেজ এবং ফরাসি ব্যতীত সকল ইউরোপীয় বণিক সম্প্রদায় বাণিজ্য গুটিয়ে যার যার দেশে ফিরে যান।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...