বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন একটি তীব্র প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে। আন্দোলনের সাফল্যও পর্যায়ক্রমিকভাবেই হয়। আন্দোলনের পথিকৃৎদের অগ্রদূত ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। তার দেখানো পথ অনুসরণ করে বাকিরা আন্দোলন করেন। মহাত্মা গান্ধী ও মার্টিন লুথার কিং জীবদ্দশায় সামগ্রিক সাফল্যের অর্জন দেখে যেতে পারেননি। ম্যান্ডেলা ও টুটু মোটামুটিভাবে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সামগ্রিক সাফল্য দেখার সুযোগ পেয়েছেন। মহৎ উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোনো আন্দোলন ব্যর্থ হয় না। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সাফল্য ও অর্জন নিচে তুলে
ধরা হলো:
প্রথমত: বর্ণবাদ যে মানবতাবিরোধী তা বিশ্বকে জানাতে আন্দোলনকারীরা সমর্থ হয়। ফলে বিশ্বজনমত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে যৌক্তিক বলে মেনে নিয়ে তা রোধে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে চাপ প্রয়োগ করে। ফলে বর্ণবাদে বিশ্বাসী শ্বেতাঙ্গ সরকার নমনীয় হতে বাধ্য হয়।
দ্বিতীয়ত: শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সংবিধান থেকে নিগ্রোদের বঞ্চিত করে রাখার জন্য যেসব বর্ণবৈষম্যমূলক নীতি ছিল তা রহিত করা হয়।
তৃতীয়ত: বর্ণবাদের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকায় যে অর্থনৈতিক অবরোধ চলছিল, তা প্রত্যাহার করা হয়। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি আসে।
চতুর্থত: সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের সংবিধানে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার দিয়ে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। আমেরিকায়ও শ্বেতকায়-অশ্বেতকায় সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ণবিদ্বেষ সৃষ্টিকারী ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী আইনগুলো বাতিল করা হয়, যা মানুষে মানুষে সাম্য সৃষ্টি করে। এটাই বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
পঞ্চমত: মার্টিন লুথার কিং-এর স্বপ্ন পূরণ হয়। সাদা-কালোর ভেদাভেদ বর্তমানে এত প্রকট নয়, যা আছে তা হলো মানুষের মনোচৈতন্যগত পার্থক্য। এখন আইনগত আর কোনো পার্থক্য নেই। আজ তথাকথিত দাস এবং দাস মালিকদের সন্তানরা সমান। একত্রে বসেই খাওয়াদাওয়া করে। নিপীড়নমূলক আইন দ্বারা দীর্ঘদিন বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে অধিকারবঞ্চিত করে রাখা যায় না তা আন্দোলনের দ্বারা প্রমাণিত। দৃশ্যমান সাফল্য হলো-
কালো গাত্রবর্ণের বারাক ওবামা আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। কৃষ্ণবর্ণের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছিলেন। এগুলোই এ আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
তবে এখনো বর্ণবিদ্বেষ পুরোপুরি দূর হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রচ্ছন্নভাবে বর্ণবাদ বিরাজমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে, চাকরিতে বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানে পরিসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যে ফরম পূরণ করতে হয় তাতে বর্ণ পরিচয়ের উল্লেখ করতে হয়। প্রাক-পরিচিতিতে এশিয়ান আমেরিকান, আফ্রিকান আমেরিকান ইত্যাদি উল্লেখ করে এটাই বোঝানো হয় যে, আপনি আমেরিকান নাগরিক হলেও মর্যাদাশীল মার্কিনি নন। সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে মার্কিন মিডিয়া Black প্রেসিডেন্ট হিসেবেই অভিহিত করে।
প্রধান শব্দসমূহের ব্যাখ্যা
Explanation of Key Words
- বর্ণবাদ: বর্ণবাদ হলো কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি ভিন্ন গাত্রবর্ণের কারণে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বৈষম্যমূলক আচরণনীতি। সংখ্যালঘিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গশাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণকায়দের প্রতি অমানবিক বৈষম্যমূলক আচরণনীতি বর্ণবাদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। স্থানীয় ভাষায় এই বর্ণবাদকে Apartheid বলা হতো।
- এএনসি (ANC): আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসকে সংক্ষেপে এএনসি African National Congress (ANC) বলা হয়। এই পার্টির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতা, বহুজাতীয়তা ও অহিংসা। প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলা তার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে এএনসির সামনের সারির নেতা ছিলেন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন এবং কালো মানুষদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয় 'এএমসি। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে দক্ষিণ আফ্রিকায় এএনসির বিজয়ের ফলে নেলসন ম্যান্ডেলা রাষ্ট্রপতি পদে অভিষিক্ত হন। এতে দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষের জাতীয় মুক্তি অর্জিত হয়, বর্ণবাদের বিলুপ্তি ঘটে।
- দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়ন ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের ৩১শে মে কেপ কলোলি, নাটাল, ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট- এ চারটি ব্রিটিশ উপনিবেশের মিলনে গঠন করা হয় দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়ন। দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়নের প্রথম গভর্নর জেনারেল হন ভাইকাউন্ট ব্লাডস্টোন এবং প্রধানমন্ত্রী হন জেনারেল বোথা। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে ইউনিয়নটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
- সত্যাগ্রহ আন্দোলন সত্যাগ্রহ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর প্রতিষ্ঠিত একটি দর্শন এবং অহিংস প্রতিরোধের অনুশীলন। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী সত্যাগ্রহের চর্চা করেছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের অধিকার প্রতিষ্ঠায়। তার এই তত্ত্ব নেলসন ম্যান্ডেলার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, মার্টিন লুথার কিংয়ের আন্দোলন প্রভৃতিতে প্রভাব ফেলে। যারা সত্যাগ্রহের চর্চা করেন তাদের সত্যাগ্রহী বলা হয়।
- রাওলাট আইন: ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই মার্চ সিডিশন কমিশনের সুপারিশ মোতাবেক ব্রিটিশ সরকার সন্ত্রাসবাদ দমনমূলক এই কুখ্যাত আইন প্রণয়ন করে। এই আইনে জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার হরণ করা হয়। সরকারবিরোধী যেকোনো প্রচারকার্যকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হয় এবং কোনো রকম সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানা ও বিনা বিচারে গ্রেপ্তার ও যত দিন খুশি আটক রাখার অবাধ ক্ষমতা এবং ঘরবাড়ি তল্লাশির অধিকার সরকারকে দেওয়া হয়। এ আইনের মাধ্যমে ভারতীয়দের ন্যায়বিচার লাভের অধিকার সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়া হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। মহাত্মা গান্ধী এই কুখ্যাত আইন বাতিলের দাবিতে সর্বভারতীয় আন্দোলনের ডাক দেন। গান্ধীজির ডাকে দেশব্যাপী বিক্ষোভ-হরতাল পালিত হয়।
- আরএসএস রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘকে সংক্ষেপে আরএসএস বলা হয়। আরএসএস-এর উগ্রপন্থি শিখ নথুরাম গডসের হাতে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে জানুয়ারি গান্ধীজি নিহত হন। হত্যার সময় গান্ধীজি বিরলা ভবন মাঝে রাত্রিকালীন পথসভা করছিলেন। সাথে ছিলেন একজন মৌলবাদী হিন্দু, যার সাথে চরমপন্থি হিন্দু মহাসভার যোগাযোগ ছিল। হিন্দু মহাসভা পাকিস্তানিদের অর্থ সাহায্য দেওয়ার প্রস্তাব করে ভারতকে দুর্বল করার জন্য গান্ধীজীকে দোষারোপ করে। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে গান্ধীর হত্যাকারীদের ফাঁসি দেওয়া হয়।
- ফ্রিডম মার্চ: চাকরি, স্বাধীনতা প্রভৃতির দাবিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় একটি র্যালি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে, যা বিখ্যাত ফ্রিডম মার্চ নামে পরিচিত। এই র্যালি ওয়াশিংটন মনুমেন্ট থেকে শুরু হয়ে লিংকন মেমোরিয়াল হলে গিয়ে শেষ হয়। ফ্রিডম মার্চের এই সমাবেশে মার্টিন লুথার কিং 'I have a dream' নামক বিখ্যাত ভাষণ দেন। এ সমাবেশে প্রায় ৩ লক্ষ লোক অংশগ্রহণ করে।
- রিভোনিয়া ট্রায়াল বহুল আলোচিত রিভোনিয়া ট্রায়াল মামলায় নেলসন ম্যান্ডেলাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই আগস্ট সরকারি লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবাজির অভিযোগে ম্যান্ডেলার বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়। রিভোনিয়া ট্রায়ালের রায়ে ম্যান্ডেলাকে রোবেন দ্বীপে অন্তরীণ করা হয়।
- রোবেন কারাগার দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের
জন্য জীবনের ২৭ বছর কারাবরণ করেন। এ কারাভোগের ১৮ বছরই ছিলেন রোবেন দ্বীপের কারাগারে। রোবেন কারাগারে তিনি ৪৬৬ নং কয়েদি ছিলেন। এ কারাগারে থেকেই তিনি আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং 'A Long Walk to Freedom' এবং 'Conversations Myself' নামক দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি জ্ঞানচর্চার জন্য রোবেন দ্বীপকে কারাগার না বলে 'রোবেন বিশ্ববিদ্যালয়' বলতেন। - কুলি: কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত দক্ষিণ আফ্রিকায় উনিশ শতকে শ্বেতাঙ্গদের ঔপনিবেশিক শাসন ছিল। এ সময় রেলপথ নির্মাণসহ নতুন উপনিবেশে বিভিন্ন ধরনের ছোট কাজের জন্য ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারতবর্ষ থেকে শ্রমিক আমদানি করত। সে সূত্র ধরেই ভারতের কিছু মানুষ আফ্রিকায় অভিবাসী হয়। শ্বেতাঙ্গ ইংরেজরা ভারতীয়দের অবজ্ঞা করে 'কুলি' ডাকত। এমনকি মহাত্যা গান্ধী ব্যারিস্টার হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় গেলে তাকেও কুলি ব্যারিস্টার বলে সম্বোধন করত, যা ছিল শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবাদী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।
- নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস দক্ষিণ আফ্রিকার নাটালে মহাত্মা গান্ধীর কর্মস্থল ছিল। নাটালের অধিবাসীদের অধিকাংশই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ অধিবাসী। সেখানে প্রায় ৪ হাজার গুজরাটি মুসলমান ও কয়েকগুণ ভারতীয় অন্যান্য জাতি বসবাস করত। ভারতীয় নাগরিক ও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের অত্যাচার, অবিচার ও বর্ণবৈষম্য দেখে তিনি আন্দোলন শুরু করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসী ভারতীয়দের এবং কৃষ্ণাঙ্গদের বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ উদ্যোগকে কার্যকরী ও সাংগঠনিক রূপ দিতে তিনি ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে নাটালের এক বৃহৎ সভায় 'নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস' নামে একটি জাতীয় সমিতি গঠন করেন। তিনি হন এ সমিতির সভাপতি।
হরতাল: হরতাল গুজরাটি শব্দ, যার অর্থ প্রতি দরজায় তালা। সবকিছু বন্ধ বোঝাতে হরতাল শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। যানবাহন, হাট-বাজার, দোকানপাট, অফিস-আদালত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ করার নাম হরতাল। ধর্মঘট বা হরতাল কার্যকারণের ক্ষেত্রে প্রায় সমার্থক। দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে মহাত্মা গান্ধী সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে হরতাল প্রবর্তন করেন। মূলত ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের 'ভারত ছাড়' আন্দোলনের সময় থেকেই হরতালের বহুল ব্যবহার হয়ে আসছে।
বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই
Read more