পাঠ-৫.২: মুসোলিনির উত্থান

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

14

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতালি

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শতধাবিচ্ছিন্ন ইতালি ভিয়েনা চুক্তির (১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দ) শর্তাদি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে ঐক্যবদ্ধ হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঐক্য হলেও জাতীয় জীবনে কোনো প্রকার উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করা ইতালির পক্ষে সম্ভব হয়নি। আপাতদৃষ্টিতে ঐক্যবদ্ধ হলেও বিভিন্ন অংশের স্থানীয় স্বার্থপরতা ও প্রাদেশিক মনোবৃত্তি ইতালীয় জাতির দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে অন্তরায় ছিল। জাতীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাদের মধ্যে ছিল অনুপস্থিত। - ইতালীয়রা অধিকাংশই ছিল অশিক্ষিত ও হুজুগপ্রিয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কার্যকরী করার মতো অধ্যবসায়, বিচক্ষণতা ও নিরপেক্ষতা তাদের মধ্যে ছিল না।

জাতির এরূপ অক্ষমতার সাথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কুফল যোগ হওয়ার ফলে ইতালিতে এক দারুণ অব্যবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালির যে স্বার্থনাশ হয়েছিল, সে তুলনায় প্যারিসের শান্তি সম্মেলন থেকে প্রাপ্তি ছিল যৎসামান্য। ফলে শাস্তি সম্মেলন কর্তৃক স্থাপিত ব্যবস্থা ইতালীয়দের মনে অসন্তোষের জন্ম দেয়। ইতালীয়দের এরূপ মনোভাবের ফলে যুদ্ধোত্তর সমস্যাপ্রসূত অভাব-অনটন, বেকারত্ব ও আর্থিক দুরবস্থা সমগ্র ইতালিতে এক অরাজকতার সৃষ্টি করে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ধর্মঘট লেগেই থাকত। এরূপ পরিস্থিতিতে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রচারের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। রাশিয়ার ন্যায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দ্বারা ইতালীয়রা মুক্তি পাবে- এরূপ ধারণা তাদের মনে জাগরিত হতে থাকে। এ সময়ের স্লোগান ছিল 'লেনিন দীর্ঘজীবী হোন', 'রাজার পতন হোক' ইত্যাদি। বিপ্লবী পন্থায় রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র স্থাপনের আগ্রহ সর্বত্র পরিলক্ষিত হতে থাকে। কৃষকরা বহু স্থানে জমিদারের জমি দখল করে নেয়, জমিদারের খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। শিল্পপতিরা মজুরি হ্রাসের দাবি অথবা শ্রমিকদের অধিক সময় কাজ করার কথা ব্যক্ত করে। এরূপ পরিস্থিতিতে কোনো কোনো এলাকায় শ্রমিকরা শিল্পকারখানা পরিচালনার ভার নিজেরা গ্রহণ করে। কিছুদিন পরেই তারা বুঝতে পারে, জোর-জবরদস্তি করে এগুলো দখল যত সহজ, পরিচালনা ততটা সহজ নয়। অনভিজ্ঞ কৃষক ও মজদুররা বুঝতে পারল যে, কৃষক-মজদুরের সরকার স্থাপন ও পরিচালনা সহজ বিষয় নয়। প্রচলিত সংসদীয় শাসনব্যবস্থা যেমন দেশের নানাবিধ সমস্যা সমাধানে সক্ষম হয়নি, কৃষক-মজদুরের পরিচালিত সরকারও শাসনকার্যে অনুরূপ সক্ষম হবে না। এ উপলব্ধি থেকেই ইতালীয়রা পুনরায় একটি কার্যকর শাসনব্যবস্থার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। শিক্ষিত শ্রেণি ও যুবসমাজ ইতালির অভ্যন্তরীণ অবস্থায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। তারা সরকারের আমূল পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেয়। নতুন শাসনব্যবস্থায় দেশ পরিচালিত হোক, এ রকম আকাঙ্ক্ষা সেনাবাহিনীর মধ্যে জাগরিত হয়। এরূপ পরিস্থিতি ও পটভূমিকায় ফ্যাসিস্ট দলের উত্থান অতি সহজ হয়। জাতীয় জীবনকে পুনরুজ্জীবিত করার ও শাসনব্যবস্থায় সংহতি আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করে রাজনৈতিক মঞ্চে ফ্যাসিবাদের উদ্যোক্তা মুসোলিনির আবির্ভাব ঘটে।

মুসোলিনির ক্ষমতা দখল

ফ্যাসিবাদের প্রবর্তক বেনিতো মুসোলিনির জন্ম হয় ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর ইতালিতে। তার বাবা ছিলেন একজন কর্মকার। শিক্ষা শেষে স্কুলশিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। সামরিক প্রশিক্ষণ এড়াতে তিনি সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে যান। দেশে ফিরে তিনি সমাজতন্ত্রী দলে যোগ দেন এবং ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে অভান্তি (Avanti) নামে একটি সমাজতন্ত্রী পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালির যোগদান সমর্থন করাকে কেন্দ্র করে তিনি পার্টি ও পত্রিকা থেকে বহিষ্কৃত হন। এ সময় নিজে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে ইতালির যুদ্ধে যোগদানের পক্ষে জনমত গঠন করতে থাকেন। এ সময় তিনি এ বিষয়ে বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিতে থাকেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে মিলান শহরে যুদ্ধফেরত সৈনিক ও বেকার যুবকদের এক সম্মেলন আহ্বান করেন। এ সম্মেলন থেকে এক আধা-সামরিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন, যার নাম দেন 'ফ্যাসিস্ট'। ফ্যাসিস্ট শব্দটি মূলত ল্যাটিন 'Fascio' শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো বল বা শক্তি। আবার এর অন্য অর্থ হচ্ছে আঁটি বা গুচ্ছ। দলের নামকরণের মাধ্যমে মুসোলিনি সকলকে বুঝিয়ে দেন যে, তার দল শক্তি বা বল দ্বারা পরিচালিত হবে। ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনির মতবাদই ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ হলো একটি স্বতন্ত্র বিশ্বাস। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে ব্যক্তিসত্তার কোনো মূল্য নেই। রাষ্ট্র জাতি ও সমাজ থেকে অভিন্ন এক সংগঠন। ফ্যাসিবাদের মূলমন্ত্র হলো 'রাষ্ট্রই সকল ক্ষমতার আধার'। ফ্যাসিবাদের মূল লক্ষ্য ছিল-

১. ইতালির প্রাচীন ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার;
২. রাষ্ট্রের মর্যাদা বৃদ্ধি করা;
৩. সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা;
৪. ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষা করা;
৫. অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার অবসান ও কঠোর নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠা করা;
৬. একটি আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।

মুসোলিনি ফ্যাসিবাদী আন্দোলনকে একটি জাতীয় আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ফ্যাসিবাদের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। যুবসমাজ ও যুদ্ধফেরত সৈনিকরা ফ্যাসিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ফ্যাসিবাদকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ইতালির বৃহৎ পুঁজিপতিরা বিপুল অর্থ প্রদানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের ভিতকে মজবুত করতে থাকেন। যেকোনো আন্দোলন দমন করার জন্য ফ্যাসিস্টদের ব্যবহার করা হয়। ফ্যাসিস্টরা মিত্রশক্তি কর্তৃক প্রতিশ্রুত ফিউম বন্দর ইতালিকে না দেওয়ার বিষয়টিকে প্রচারণার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক দুর্দশাকে কাজে লাগিয়ে তারা শিক্ষিত বেকার, শ্রমিক ও ক্ষেতমজুরদের সমর্থন লাভে সক্ষম হয়। মুসোলিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা থেকে দেশকে মুক্ত করবেন এবং কমিউনিজম দূর করবেন। মুসোলিনি ফ্যাসিবাদের সমর্থক অর্থাৎ ফ্যাসিস্টদের কালো পোশাকে সজ্জিত ও সামরিক কায়দায় প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলেন। যার ফলে ফ্যাসিস্টদের মধ্যে সৈনিকসুলভ মনোবৃত্তি ও যুদ্ধস্পৃহা বৃদ্ধি পায়। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ফ্যাসিস্টরা গ্রামl

ও শহরে অবস্থিত তাদের বিরোধী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের বাড়িঘর আক্রমণ করতে থাকে। বাম সংগঠনগুলোর অফিস তছনছ ও পত্রিকার অফিসে হামলা চালনো শুরু করে। সমাজতন্ত্রীদের বিভিন্ন সভা-সমিতি আক্রমণ করে ভেঙে দেওয়া হয়। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ফ্যাসিস্টরা ৩৫টি আসন লাভ করে। মুসোলিনি বুঝতে পারেন, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন। ফলে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েলের কাছে তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের দাবি জানান এবং রোম অভিযানের হুমকি দেন। ইতিমধ্যে মুসোলিনি তার হাজার হাজার ফ্যাসিস্ট সমর্থক নিয়ে রোমের উদ্দেশে যাত্রা করলে রাজা ভয় পেয়ে যান। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে অক্টোবর রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল মুসোলিনিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। মুসোলিনি ফ্যাসিস্ট পোশাক পরিহিত (কালো জামা ও টুপি) অবস্থায় রোমের সরকারি প্রাসাদে প্রবেশ করেন। এভাবে বল ও শক্তি প্রয়োগের দ্বারা ইতালিতে ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতা দখল করে।

ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের কারণ

বহুবিধ কারণে ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে। নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১। ইতালির গণতন্ত্রের দুর্বলতা গণতন্ত্রের দুর্বলতা ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের অন্যতম কারণ। ক্যাভুরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ইতালিতে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় তাকে প্রকৃত গণতন্ত্র বলা যায় না। সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটদানের যোগ্যতা নির্ধারিত হওয়ায় ইতালিতে অনেক মানুষের ভোটাধিকার ছিল না। সাধারণ মানুষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে ছিল। সরকার গঠনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ না থাকায় তারা গণতন্ত্র ও সরকার সম্পর্কে নিস্পৃহ থাকে, যার সুযোগ গ্রহণ করে ফ্যাসিস্টরা।
২। দক্ষিণ ইতালির অনগ্রসরতা দক্ষিণ ইতালির অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা এবং এ ব্যাপারে সরকারের নির্লিপ্ততা ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের আরেকটি কারণ। ইতালির একত্রীকরণের সময় থেকে উত্তর ইতালির তুলনায় দক্ষিণ ইতালি ছিল শিল্পে অনগ্রসর। তাছাড়া মাফিয়াদের উৎপাত ও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ দক্ষিণ ইতালির জনগণের জীবনযাত্রাকে থমকে দিয়েছিল। কিন্তু একত্রীকরণের পর থেকে কোনো সরকারই উন্নয়নবৈষম্যের অবসান ও অন্যান্য সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসেনি; যার সুযোগ গ্রহণ করে মুসোলিনি দক্ষিণ ইতালিতে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেন; যা মুসোলিনি বা ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতালাভে সাহায্য করে।
৩। রাজনৈতিক মতানৈক্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্ব থেকে ইতালির রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো ঐক্য ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য আরও বৃদ্ধি পায়। সমাজতন্ত্রী ও ক্যাথলিক দল ইতালির প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের তীব্র বিরোধী ছিল। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে শাসক উদারতন্ত্রী দল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা ইস্যুতে মতবিরোধ দেখা দেয়; যা জনসাধারণকে ইতালির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশাগ্রস্ত করে তোলে; যার সুযোগ পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে ফ্যাসিস্টরা।
৪। পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতা ইতালি ছিল ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী একটি দেশ। অথচ ভূমধ্যসাগরের উপর ইতালির কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ভূমধ্যসাগর নিয়ন্ত্রণ করত ফ্রান্স ও ব্রিটেন। ইতালির ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি, শিল্পায়ন ও উপনিবেশ স্থাপনের জন্য প্রয়োজন ছিল ভূমধ্যসাগরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। একত্রীকরণ-পরবর্তী সরকারগুলোর ভূমধ্যসাগরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থতাকে কাজে লাগান মুসোলিনি। তিনি এজন্য সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতিকে দায়ী করেন এবং আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের সমর্থন লাভ করেন, যা মুসোলিনি বা ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতা লাভে সাহায্য করে।

৫। ভার্সাই সন্ধিতে ইতালির অপ্রাপ্তি: ভার্সাই সন্ধিতে ইতালির অপ্রাপ্তি মুসোলিনি বা ফ্যাসিস্টদের উত্থানের
অন্যতম কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইতালি ছিল জার্মানির নেতৃত্বাধীন ত্রিপক্ষীয় চুক্তির সদস্য। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইতালি প্রথমে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে। পরে মিত্রপক্ষের সাথে গোপন চুক্তির ভিত্তিতে মিত্রপক্ষের হয়ে যুদ্ধে অংশ নেয়, যাতে যুদ্ধ শেষে পুরস্কারস্বরূপ ইতালিকে কতগুলো এলাকা ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল। ফলে প্যারিস সম্মেলনে ইতালি ট্রিয়েস্ট, ডালমাশিয়া, ফিউম ও আফ্রিকার কিছু জার্মান উপনিবেশ দাবি করে। ইউরোপের বিভিন্ন শক্তি বিভিন্ন এলাকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিরোধিতায় ইতালিকে শূন্যহাতে সম্মেলন থেকে ফিরতে হয়, যা ইতালীয়দের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও অপমানবোধের জন্ম দেয়। ইতালীয়রা মনে করে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অর্থ ও রক্তের বিনিময়ে ইতালি কিছু পায়নি, যার জন্য তারা ক্ষমতাসীন সরকার, ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে দায়ী বলে মনে করে। এটি ইতালিতে উগ্র জাতীয়তাবাদের জাগরণ ঘটায়। উগ্র জাতীয়তাবাদীরা প্রচার করতে শুরু করে যে, বর্তমান উদারপন্থি সরকার ইতালিবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে অক্ষম; যার সুযোগ গ্রহণ করে মুসোলিনি ইতালিতে ক্ষমতা দখল করেন।

৬। অর্থনৈতিক সংকট: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের কারণ। এ সময় অর্থনৈতিক সংকট ভয়াবহ রূপ লাভ করে। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও আয় না বাড়ায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। বহু কলকারখানা বন্ধ ও যুদ্ধফেরত সৈনিক ছাঁটাইয়ের ফলে বেকারত্ব তীব্রতর হয়। ফলে ধর্মঘট, অরাজকতা ও দেশব্যাপী অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ দুর্দশা মোকাবিলায় তৎকালীন উদারপন্থি সরকার চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়।

৭। সমাজতন্ত্রভীতি সমাজতন্ত্রভীতি ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের আরেকটি কারণ। অর্থনৈতিক সংকটের সুযোগে সমাজতান্ত্রিক দল প্রচার করতে শুরু করে যে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই মুক্তির একমাত্র পথ। এ সময় ইতালিতে সমাজতন্ত্রীদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। সমাজতান্ত্রিক পত্রিকা অভান্তি শ্রমিক ও কৃষকদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। ফলে কৃষকরা জমিদারদের জমি ও শ্রমিকরা মালিকদের কলকারখানা দখল করতে শুরু করে। এতে ইতালীয় বুর্জোয়াদের মধ্যে সমাজতন্ত্রভীতির সৃষ্টি হয়। তারা উদারতন্ত্রী সরকারের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।

৮। বুর্জোয়া শ্রেণির সমর্থন: বুর্জোয়া শ্রেণির সমর্থন মুসোলিনির ক্ষমতালাভে সাহায্য করে। মুসোলিনি
ফ্যাসিস্ট বাহিনী গঠন করে ফ্যাসিস্ট স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা সমাজতন্ত্রীদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও ধর্মঘট ভেঙে দিতে থাকেন। শৃঙ্খলাকে ফ্যাসিস্ট দলের মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে বুর্জোয়ারা মনে করতে থাকে, মুসোলিনির নেতৃত্বে গঠিত ফ্যাসিস্টরা ইতালিকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে রক্ষা করতে পারবে। তারা মুসোলিনির সমর্থনে এগিয়ে আসে। রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েলও পরোক্ষভাবে ফ্যাসিস্ট দলের প্রতি আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। এ সকল কারণ ইতালিতে ফ্যাসিবাদ ও মুসোলিনির উত্থানের পটভূমি তৈরি করে।

মুসোলিনির একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

মুসোলিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও এককভাবে দেশ পরিচালনার মতো রাজনৈতিক শক্তি তার দলের ছিল না। তাই তিনি কিছুদিন লিবারেল শক্তির সাথে যৌথভাবে সরকার পরিচালনা করেন। তার গঠিত প্রথম সরকারেই তিনি বেশ কিছুসংখ্যক পরিচিত রাজনীতিবিদকে অংশগ্রহণ করতে আহ্বান জানান। এরা উদার বুর্জোয়া ও ক্যাথলিকবাদী ছিলেন। তিনি রাজতন্ত্রও অব্যাহত রাখেন। যদিও রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল নামে মাত্র রাজা ছিলেন। তার নির্বাহী কোনো ক্ষমতা ছিল না। ধীরে ধীরে ইতালিতে ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে নতুন নির্বাচনি আইন অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নতুন নিয়মানুযায়ী নির্বাচনে আপেক্ষিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দলের জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন লাভ করার বিধান করা হয়। বিরোধীদের জন্য প্রচারণার কোনো সুযোগ না রেখে নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় সন্ত্রাসী পরিবেশে। ফ্যাসিস্টরা নিজেদের পক্ষে ৪৩ মিলিয়ন ভোট সংগ্রহ করে, যা বিরোধীদের চেয়ে ৮ মিলিয়ন বেশি। সংসদের অধিবেশন বসলে বিরোধীরা সরকারের ফ্যাসিস্ট চরিত্র উন্মোচনের চেষ্টা করে। বিরোধী সমাজতন্ত্রী নেতা মাত্তেওতি এক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করলে ১০ই জুন ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে ফ্যাসিস্ট দুমিনির নেতৃত্বে তাকে অপহরণ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মুসোলিনি ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা জানুয়ারি সংসদে সকল ক্ষমতা ফ্যাসিবাদীদের দিতে হবে বলে স্লোগান দেন। গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে বিক্ষোভ, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। সকল বিরোধী দল, তাদের সংগঠনের মুখপত্র, পত্র-পত্রিকা, সরকারবিরোধী যেকোনো ব্যক্তি ও সংস্থাকে বিচারের সম্মুখীন করা ইত্যাদি সম্পর্কে জরুরি ফ্যাসিস্ট আইন ঘোষিত হয়। ইতালিকে সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়। বিরোধীদের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে জেলে পাঠানো হয়। অনেকেই দেশত্যাগে বাধ্য হন। পরবর্তীকালে জার্মানিতে হিটলারের ক্ষমতায় আরোহণ ও দেশি-বিদেশি বন্ধুলাভের ফলে তার শক্তি আরও বৃদ্ধি পায়, যা ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

গণতান্ত্রিক সরকারের ব্যর্থতার ফলে ইতালির জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে হতাশার প্রতিফলন হচ্ছে ফ্যাসিবাদের উত্থান। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট, প্যারিস শান্তি সম্মেলন থেকে শূন্যহাতে ফিরে আসা এবং বুর্জোয়া শ্রেণির কমিউনিজমভীতি- এসবের সুযোগ গ্রহণ করেছিল ফ্যাসিস্টরা। তারা মানুষের সমর্থনলাভের জন্য রাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, ক্যাথলিকবাদ, নাস্তিকতা- যখন যেখানে যা প্রয়োজন তা-ই ব্যবহার করে। মুসোলিনি উদ্দেশ্য ও স্বার্থ হাসিলের জন্য নীতিবিবর্জিত, বিবেকশূন্য মানুষে পরিণত হন। মুসোলিনির এ বহুরূপী চরিত্র তুলনামূলকভাবে অনুন্নত রাজনীতিচর্চার দেশ ইতালির মানুষের কাছে দীর্ঘদিন অস্পষ্ট থেকে যায়।

মুসোলিনির নেতৃত্বে ইতালির অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন

মুসোলিনি ক্ষমতালাভের পর থেকে একনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সরকারব্যবস্থাকে ফ্যাসিকরণ শুরু করেন। পার্লামেন্টকে ফ্যাসিকরণ করা হয়। নির্বাচনসংক্রান্ত সংস্কার বিল পাস করিয়ে নেওয়া হয়, যাতে বলা হয়- নির্বাচনে যারা সর্বাধিক ভোট পাবে তারা পার্লামেন্টে তিন ভাগের দুই ভাগ আসন লাভকরবে। দাঙ্গা-হাঙ্গামার মাধ্যমে নির্বাচনে জয়ী পার্লামেন্টকে ফ্যাসিস্ট পার্লামেন্টে পরিণত করা হয়। মুসোলিনির অনুমতি ব্যতীত পার্লামেন্টে কোনো আইন পাস করা যাবে না বলে ঘোষণা করা হয়। আইন প্রণয়নকারী ঘোষণা প্রদানের ক্ষমতা মুসোলিনিকে অর্পণ করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সকল নির্বাচন বাতিল করে স্থানীয় সংস্থাগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ সমস্ত নীতির বিরোধীদের দমনের জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়। ফ্যাসিবাদী পত্রিকা ছাড়া অন্য সকল পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার শাসনবিরোধী ও ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করার জন্য অভ্রা নামে একটি গুপ্ত পুলিশ সংস্থা গঠন করা হয়। সামরিক ট্রাইব্যুনালে এদের বিচার করা হতো। এককথায় ইতালি থেকে সকল প্রকার উদারনীতি যেমন-রাজনীতি, মতামতের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নির্বাসিত হয়।

মুসোলিনি ক্ষমতা দখল করে সরকারি প্রশাসনযন্ত্রকে ফ্যাসিস্ট দলের মুঠোয় আনার জন্য 'ফ্যাসিস্ট গ্রান্ড কাউন্সিলের' হাতে সর্বময় ক্ষমতা অর্পণ করেন। মুসোলিনি এতে ইচ্ছামতো যেকোনো ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত বা পদচ্যুত করতে পারতেন। দশ হাজার ফ্যাসিস্ট শাখাকে গ্রান্ড কাউন্সিলের অনুরূপ প্রাদেশিক ফেডারেশনে পরিণত করা হয়। মুসোলিনি কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তিকে রাজা মহাসচিব নিয়োগ করতেন। একই প্রক্রিয়ায় মহাসচিব প্রাদেশিক সচিব এবং প্রাদেশিক সচিব স্থানীয় সচিব নিয়োগ করতেন। এভাবে উপর থেকে নিচের দিকে ফ্যাসিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতালির শিশু, কিশোর ও যুবকদের ফ্যাসিবাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য ৪-২০ বছরের যুবকদের ৪টি ক্যাডারে বিভক্ত করা হয়। এরা বালিল্লা বা অভান্ত গার্দিয়া বা জিওভানি ফ্যাসিস্ট প্রভৃতি সংগঠনের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করত। স্কোয়ান্ড্রিস্টি বা ফ্যাসিস্ট স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়মিত সেনাদলে ভর্তি করা হতো। ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে ফ্যাসিস্ট পার্টিকে ইতালির সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

হিটলার ও মুসোলিনির উত্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ স্যারে এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...