স্নায়ুযুদ্ধ - পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব (অধ্যায়-৭)

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.3k

উইনস্টন চার্চিল (Winston Churchill 1874-1965) (১৮৭৪-১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ):
ইংরেজ রাজনীতিবিদ ও লেখক ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিক পরিচিত। প্রথম জীবনে তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সদস্য হলেও ধীরে ধীরে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও দক্ষতা দ্বারা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হন। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পূর্বে যেসব সম্মেলনের আয়োজন করা হয় সেখানে তিনি কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। তিনি শুধু রাজনীতিবিদ বা সুবক্তাই ছিলেন না, তার লেখার প্রভূত সম্ভার ইংরেজি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে আত্মজৈবনিক রচনার জন্য সাহিত্যে নোবেল পান। তাকে যুক্তরাজ্য ও বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

অনেকে মনে করেন, ফুলটন বক্তৃতায় চার্চিলের বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীতে ঠাণ্ডাযুদ্ধের সূচনা হয়। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে বিবিসি'র এক জরিপে তিনি সর্বকালের সেরা ব্রিটেনবাসী হিসেবে মনোনীত হন।'

বার্নার্ড বারুচ (Bernard Baruch 1870-1965) (১৮৭০-১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ): বার্নার্ড বারুচ ১৯শে আগস্ট ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার সাউথ ক্যারোলিনায় জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় তিনি একজন অর্থসংস্থানকারী ও স্টক বিনিয়োগকারী ছিলেন। যদিও তিনি রাজনৈতিক পরামর্শক ও বিবৃতি প্রদানকারী হিসেবে বেশি খ্যাতি অর্জন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসনের জাতীয় প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি পরাজিত জার্মানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে সহযোগিতা সৃষ্টির মাধ্যমে League of Nations সৃষ্টির উপর জোর দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে হ্যারি এস. ট্রমান তাকে জাতিসংঘের আণবিক শক্তি কমিশনে মার্কিন প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন।

পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি 'বারুচ প্ল্যান' পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও রাশিয়া কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি 'স্নায়ুযুদ্ধ' শব্দটি ব্যবহার করলে শব্দটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তিনি ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে জুন ৯৪ বছর বয়সে নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে মারা যান।

স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াই আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক অতিশয় আলোচিত বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এর শুরু ও অবসান হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে। উক্ত সময়কালে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও রাষ্ট্রনায়করা স্নায়ুর এক ভয়াবহ চাপের মধ্যে ছিলেন বলে একে স্নায়ুযুদ্ধ বলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন ছিল সারা বিশ্বের মানুষ।

তখন দুটি বৃহৎ শক্তির (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া) নেতৃত্বে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল বিশ্বের প্রায় সব দেশ। পুঁজিবাদী শিবিরের নেতৃত্বে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সমাজতান্ত্রিক শিবিরের নেতৃত্বে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুই বৃহৎ শক্তির শক্তি-দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে স্নায়ুযুদ্ধের মাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী রাজনীতি ও স্নায়ুযুদ্ধ অনেকটা সমার্থক। বৃহৎ দুটি শক্তি ও তাদের আদর্শপুষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের উত্থান-পতন, সন্দেহ, উত্তেজনা সবকিছুর মূলে কখনো পরোক্ষ আবার কখনো প্রত্যক্ষভাবে স্নায়ুযুদ্ধ কাজ করত। অদ্যাবধি স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব থেকে বিশ্ববাসী পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। সম্প্রতি সিরিয়া সংকট নিয়ে মার্কিন-রাশিয়া সম্পর্কের টানাপড়েন স্নায়ুযুদ্ধের নতুন রূপ। বিশ্ব রাজনীতির পূর্বরূপ ও পরিবর্তিত রূপ এবং এর প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভে এ অধ্যায়ের বিষয়গুলো শিক্ষার্থীকে সহায়তা করবে।

  • ট্রুম্যান তত্ত্ব
  • মার্শাল পরিকল্পনা;
  • ন্যাটো
  • ওয়ারশ জোট;
  • দাঁতাত;
  • কেন্নান থিসিস;
  • কিউবা সংকট;
  • গ্লাসনস্ত;
  • পেরেস্ত্রৈকা;
  • ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি
  • ন্যাম;
  • দ্বিমেরুবাদ;
  • ফুলটন বক্তৃতা;
  • বার্লিন অবরোধ;
  • WARSAW;
  • SEATO;
  • MEDO

স্নায়ুযুদ্ধ - পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

Concept of Cold War

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই এপ্রিল অভিজ্ঞ কূটনীতিক বার্নাড বারুচ কলম্বিয়ায় এক ভাষণে সর্বপ্রথম স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াই (Cold War) শব্দটি প্রয়োগ করেন। তিনি তার ভাষণে মার্কিন-সোভিয়েত সম্পর্কের ব্যাপারে বলেন, "আমরা আর প্রতারিত হতে চাই না, এখন আমরা স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যে আছি।" স্নায়ুযুদ্ধ বলতে

স্নায়ুযুদ্ধ: পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব

প্রকৃতপক্ষে কোনো যুদ্ধের অবস্থা বোঝায় না। যুদ্ধ কথাটা ব্যবহার করা হচ্ছে অথচ কোনো যুদ্ধ নেই। স্নায়ুযুদ্ধের কৌশল হলো একটা উত্তেজনা বা উদ্বেগ বিরাজমান থাকে, যা স্নায়ুর উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। যারা যুদ্ধের সাথে জড়িত তারা সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না কিন্তু আচার-আচরণের মাধ্যমে যুদ্ধের একটা আবহ তৈরি করছে। সংক্ষেপে বলা যায়, যুদ্ধও নয় শান্তিও নয়, আবার যুদ্ধের অনুপস্থিতিও নয়-এমন একটা গুমট ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশই স্নায়ুযুদ্ধ। সম্পর্কের উত্থান-পতন, সন্দেহ-উত্তেজনা সবকিছুর মূলে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে স্নায়ুযুদ্ধ কাজ করত। মতবিরোধ বা পারস্পরিক তিক্ততা যখন মীমাংসার পর্যায়ে থাকে না তখন পরস্পর বিরোধী পক্ষ অস্ত্র প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধের অবসানের জন্য অগ্রসর হলে আমরা তাকে যুদ্ধ বলি। স্নায়ুযুদ্ধের বেলায় সশস্ত্র সংঘর্ষের পরিস্থিতি বিরাজমান থাকলেও কোনো পক্ষই প্রকাশ্য সংঘাতের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না এবং নানা কৌশলে যুদ্ধ এড়িয়ে যায়। আবার উত্তেজনাময় পরিবেশ তৈরিতে কোনো পক্ষই দ্বিধা করছে না। বিবদমান রাষ্ট্রের মধ্যে এ রেষারেষির প্রতিক্রিয়া সমগ্র আন্তর্জাতিক সমাজের উপর পড়ে এবং সারা বিশ্বে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কাজেই স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াইকে অস্বস্তিকর বা অনভিপ্রেত শান্তি বলা যেতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্ব রাজনীতির দুই পরাশক্তির (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া) নেতৃত্বে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো সামরিক ও অর্থনৈতিক জোট গঠনের মাধ্যমে শক্তির ভারসাম্য গড়ে তোলে, যার জন্য এক পক্ষের উপর অন্য পক্ষের প্রত্যক্ষ সামরিক আক্রমণের আশঙ্কা দূরীভূত হয়। ফলে দুই পরাশক্তির নেতৃত্বাধীন দুই শিবিরের মধ্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক লড়াই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যা স্নায়ুযুদ্ধ নামে পরিচিত।

অধ্যাপক ফ্রাংকেলের মতে, "স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডাযুদ্ধ বলতে গণতান্ত্রিক মতাদর্শ ও সাম্যবাদ এবং তাদের প্রবক্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধের সাথে জড়িত সকল ঘটনাকে বোঝায়।"

অধ্যাপক ফ্রিডম্যানের মতে, "স্নায়ুযুদ্ধ হলো যুদ্ধের একটি নতুন কৌশল। স্নায়ুযুদ্ধ এমন একটি পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যেখানে যুদ্ধ না হলেও যুদ্ধের জন্য সকল প্রস্তুতি চলতে থাকে।""

অর্থাৎ ঠাণ্ডাযুদ্ধ এমন এক অবস্থা, যেখানে প্রকৃত যুদ্ধের আশ্রয় গ্রহণ না করেও অত্যন্ত বিরোধপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায়। ঠাণ্ডাযুদ্ধকে এক প্রকার যুদ্ধহীন যুদ্ধ বলা যায়। স্নায়ুযুদ্ধে দুটি শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র পরস্পরের স্নায়ুতে সংগোপনে একে অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব পোষণ করে, যুদ্ধের মাধ্যমে যার বহিঃপ্রকাশ কোনো ক্রমেই ঘটে না।

স্নায়ুযুদ্ধ - পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই

Content added By

Origin of Cold War

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্বে ও অব্যবহিত পরে পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা
প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি, যুগোশ্লাভিয়া,
আলবেনিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, সমস্যাজড়িত সমগ্র ইউরোপ ক্রমশ
সমাজতান্ত্রিক ব্লকের দিকে ধাবিত হবে। এ উপলক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপের দিকে তার শক্তি বৃদ্ধি
করবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন বুঝতে পারে যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন শক্তির
প্রতিযোগিতায় অনেক এগিয়ে গিয়েছে এবং অচিরেই সমগ্র ইউরোপের উপরও রাশিয়া আধিপত্য ও প্রাধান্য
লাভ করবে। এতে কেবল শক্তি-সাম্যই বিনষ্ট হবে না, সোভিয়েত সম্প্রসারণবাদ ভয়াবহ আকার ধারণ
করবে। এরূপ অবস্থা থেকেই মার্কিনিদের মনে সোভিয়েতবিরোধী মনোভাব দানা বাঁধতে শুরু করে। ফলে
স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন
করতে শুরু করে। যুদ্ধকালীন সহযোগিতা পর্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। মার্কিন পুঁজিবাদী শিবিরের সামরিক,
অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে তা প্রকটভাবে প্রতিফলিত হয়।

স্নায়ুযুদ্ধের সূচনার জন্য কোন শক্তি মূলত দায়ী সে সম্পর্কে সঠিক কোনো মন্তব্য করা দুষ্কর। দুটি প্রধান বৃহৎ শক্তি বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হলেও স্নায়ুযুদ্ধের সূচনায় অন্যান্য রাষ্ট্রের ভূমিকাও ছোট করে দেখা যাবে না। মার্কিন পর্যালোচকগণ স্নায়ুযুদ্ধের সূচনার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে দায়ী করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্প্রসারণবাদী আগ্রাসনকে প্রতিরোধ বা প্রতিহত করতে গিয়েই স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়, তা না হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল ভাবতে শুরু করত।

অনেকে মনে করেন, ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মার্চ 'ফুলটন' বক্তৃতায় চার্চিলের মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীতে ঠাণ্ডাযুদ্ধের সূচনা হয়। চার্চিল তার বক্তৃতায় বলেন, কেউ এ কথা বলতে পারে না, ভবিষ্যতে সোভিয়েত রাশিয়া ও মিত্ররা কী করবে। তার মতে, সোভিয়েত ইউনিয়ন বলপ্রয়োগের ভাষা ছাড়া কোনো ভাষা বোঝে না।' সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রতিহত করার জন্য চার্চিল ইংরেজ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রাতৃত্বমূলক ঐক্যের তত্ত্ব প্রচার করেন। চার্চিলের বক্তৃতার রেশ ধরেই 'ট্রুম্যান তত্ত্ব' ও 'মার্শাল পরিকল্পনা' তৈরি করা হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান প্রচার করতে থাকেন যে, ইউরোপের দেশসমূহে গণতন্ত্র বিপন্ন এবং তা উদ্ধার করার দায়িত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।
পুঁজিবাদ সম্পর্কে সোভিয়েত ইউনিয়নের ধারণা এবং কমিউনিজম সম্পর্কে মার্কিন ও ব্রিটিশ আতঙ্ক স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম কারণ। ইউরোপের রাজনৈতিক অঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাব সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনো সহজভাবে মেনে নেয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের বদ্ধমূল, ধারণা ছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন তারl

স্নায়ুযুদ্ধ: পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব

শক্তিকে খর্ব করতে বদ্ধপরিকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তি-সাম্য রক্ষার জন্য ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা এপ্রিল 'ন্যাটো' সামরিক জোট গঠন করলে সোভিয়েত ইউনিয়নও পাল্টা ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মে 'ওয়ারস জোট' গঠন করে সমুচিত জবাব দেয়। সুতরাং স্নায়ুযুদ্ধের সূচনার জন্য এককভাবে কাউকে দায়ী করা যায় না। এ দায়ভার বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোকেই গ্রহণ করতে হবে। নিচে স্নায়ুযুদ্ধের কারণগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-প্রথমত: স্নায়ুযুদ্ধের মুখ্য কারণ হলো বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যে পরস্পর সম্প্রীতির অভাব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে তিন বৃহৎ শক্তি ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কোনো প্রকার সৌহার্দ ও সম্প্রীতিমূলক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল না। শুধু যুদ্ধকালীন সাময়িকভাবে তিন বৃহৎ শক্তির মধ্যে আঁতাত গঠিত হয়। যুদ্ধ শেষে সকল সহযোগিতার পরিসমাপ্তি ঘটে।

দ্বিতীয়ত: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শগত দ্বন্দ্ব স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম কারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ব্যাপক আদর্শিক রাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধী বলে মনে করে। অপরপক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মডেলকে ধনীদের শোষণের হাতিয়ার ও সাম্যবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে। এরূপ আদর্শগত বিরোধী মনোভাব স্নায়ুযুদ্ধের সূচনায় সহায়ক হয়।

তৃতীয়ত: বিশ্বযুদ্ধের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া দুটি বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। সমগ্র ক্ষমতা এ দুটি শক্তিধর রাষ্ট্রের নিকট কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করে। প্রতিযোগিতার লড়াইয়ে উভয়ই নিজ নিজ শক্তি বৃদ্ধির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ফলে শুরু হয় পরস্পর ঠাণ্ডা লড়াই বা স্নায়ুযুদ্ধ। স্নায়ুযুদ্ধের সূচনার জন্য মারণাস্ত্রের উৎপাদন ও তা প্রয়োগের আশঙ্কা অনেকখানি দায়ী বলা যায়। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র আণবিক শক্তির অধিকারী ছিল। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত ইউনিয়ন আণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যকে খর্ব করে দেয়। পরবর্তী পর্যায়ে দুটি পরাশক্তিই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ আণবিক ও হাইড্রোজেন বোমা তৈরিতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। এরূপ প্রতিযোগিতামূলক শক্তি সঞ্চয় গরম যুদ্ধ বা সর্বাত্মক যুদ্ধ না ঘটালেও স্নায়ুযুদ্ধকে উত্তপ্ত রাখতে সাহায্য করে।

চতুর্থত: যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম আণবিক শক্তির অধিকারী হওয়ায় বিশ্বে তার মর্যাদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কিছুদিনের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নও একই ধরনের অস্ত্র উৎপাদন করায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উভয়ই সমমর্যাদাসম্পন্ন হয়ে পড়ে। ফলে উভয়ে পরস্পর মর্যাদার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। শক্তির প্রতিযোগিতায় অন্তরে একে অপরকে পরাহত করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে থাকে। প্রকাশ্য যুদ্ধ না হলেও শুরু হয় ঠাণ্ডা লড়াই।

পঞ্চমত: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান গ্রিসকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। তার লক্ষ্য ছিল গ্রিসে কমিউনিস্ট প্রভাব প্রতিরোধ করা এবং নিজের স্বার্থের অনুকূল সরকার প্রতিষ্ঠিত রাখা। সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিজমের প্রভাব থেকে যুদ্ধোত্তরকালে পশ্চিম ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক পুনর্গঠনমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যা মার্শাল পরিকল্পনা নামে খ্যাত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবে উপলব্ধি করে যে, ইউরোপের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ব্যতীত সাম্যবাদের প্রসার রোধ করা কোনো অবস্থায়ই সম্ভব নয়। সাম্যবাদ প্রতিরোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক হাতিয়ার প্রয়োগ করে, যা স্নায়ুযুদ্ধের কারণ।

ষষ্ঠত: বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রসার ও বিকাশ আন্তর্জাতিক বিশ্বে রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাত্রা বৃদ্ধি করে। প্রযুক্তিগত আবিষ্কার মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও আচার-আচরণকে প্রভাবিত করে। প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে মানসিক ও ক্ষমতার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্রসমূহ যুদ্ধে লিপ্ত না হলেও এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে জড়িয়ে যায়।

সপ্তমত: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তিলাভ করে স্বাধীনতা অর্জন করে। কর্তৃত্বের এ শূন্যতা পূরণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। ফলে স্নায়ুযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।

অষ্টমত: ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সিয়াটো চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার কারণে স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা আরও বেশি প্রকাশ পায়। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক জোটের এক শৃঙ্খল তৈরি করে বলা যায়। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ন্যাটো গঠিত হয়। জোটের প্রধান লক্ষ্য ছিল ১২টি রাষ্ট্রের নিরাপত্তারক্ষা, সোভিয়েত আক্রমণ প্রতিহত করা ও কমিউনিজমের প্রসার রোধ।

নবমত: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ন্যাটো গঠনে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিঃসন্দেহে খানিকটা ভীত হয়ে পড়ে। এরই কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার অনুসারী পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহকে একত্রিত করে ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারসোতে 'ওয়ারস জোট' গঠন করে। ওয়ারস চুক্তির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সদস্য দেশগুলোকে ন্যাটোর ভয়ভীতি থেকে রক্ষা করা। এভাবে পারস্পরিক পাল্টা জোট গঠনে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বিরাজমান বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে। ফলে স্নায়ুযুদ্ধাবস্থা চলতে থাকে।

মূলত স্নায়ুযুদ্ধের মূলে ছিল পরাশক্তিদ্বয়ের পারস্পরিক অসংগতি, জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও আদর্শগত মতভেদ।

স্নায়ুযুদ্ধ - পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই

Content added By

ঠিক কখন থেকে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছিল তা বলা কঠিন। তবে হঠাৎ করেই এটার সূচনা হয়নি বা থেমেও যায়নি। কেউ কেউ মনে করেন, ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের বলশেভিক বিপ্লবের পর থেকে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর এর বাস্তব রূপ প্রকাশ পায়। কারও মতে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ফুলটন বক্তৃতায় চার্চিলের মন্তব্যই - স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করে। এ প্রসঙ্গে মার্কিন কূটনীতিক চার্লস রোলস বলেন, "স্নায়ুযুদ্ধের ঘটনাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনার মাধ্যমে চিহ্নিত করা যায় না। ট্রুম্যান নীতি ও মার্শাল পরিকল্পনার সময় থেকেই মার্কিন-রাশিয়া বিরোধ ঠাণ্ডাযুদ্ধে পরিণত হয়েছে।"

স্নায়ুযুদ্ধ: পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব

স্নায়ুযুদ্ধের সূচনাকাল (১৯৪৫-৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসান পর্যন্ত একে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্বাভাবিক ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দুই দশক বজায় ছিল। এ দুই দশক স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতর যুগ হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ প্রথম পর্যায় ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বা 'দাঁতাত' (১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দ)-এর পূর্ব পর্যন্ত। প্রথম পর্যায়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দুই বৃহৎ শক্তির প্রভাববলয় সৃষ্টির প্রবণতা লক্ষণীয়। সামরিক জোট, পাল্টা সামরিক জোট গঠনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।

প্রথম পর্যায় (১৯৪৫-৬৩ খ্রিষ্টাব্দ)

প্রথম পর্যায়ে ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতাদর্শিক সমাজতান্ত্রিক শিবিরের উদ্ভব, ট্রুম্যান নীতি, মার্শাল পরিকল্পনা, বার্লিন সংকট, ন্যাটো জোট, ওয়ারস চুক্তি, ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি, কিউবা সংকট প্রভৃতি বিষয় পৃথিবীতে ঠাণ্ডাযুদ্ধের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
স্নায়ুযুদ্ধের প্রারম্ভিক পর্যায়ে আমরা ট্রম্যান তত্ত্বের পরিচয় পাই। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সাম্যবাদের প্রসার ঘটতে শুরু করলে গণতন্ত্রের পরিত্রাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রমাদ গোনে। তাই তাদের রাজনীতির প্রচারে এটাই প্রাধান্য পেতে শুরু করে যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বনিয়ন্ত্রণবাদী রাষ্ট্র। সর্বনিয়ন্ত্রণবাদী রাষ্ট্র স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করতে উদ্যত। সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্প্রসারণবাদে ভীত হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে যে তত্ত্ব প্রকাশ করেন তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় ঐক্য রক্ষার নামে অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অজুহাত বের করা, যা ট্রুম্যান তত্ত্ব নামে খ্যাত।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটেন গ্রিস থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলে আমেরিকা গ্রিস-তুরস্ক সংকটে হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়। গ্রিসে সাম্যবাদী তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে আমেরিকা গ্রিসের জাতীয় ঐক্য রক্ষার অজুহাতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। আমেরিকার সাফল্য স্নায়ুযুদ্ধকে তীব্র করে তোলে।
আমেরিকার পররাষ্ট্রসচিব জর্জ মার্শাল ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ঘোষণা করলেন, বাইরের সাহায্য না পেলে ইউরোপের ভেঙে পড়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। ইউরোপীয়রা তাদের নিজেদের করণীয় ঠিক করবে। তারা আমেরিকার কাছ থেকে সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করলে তা তারা পাবে। এটা মার্শাল পরিকল্পনা নামে খ্যাত। মার্শালের ঘোষণার ১২ দিন পর ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ বৈঠকে বসলে সোভিয়েত প্রতিনিধি বলেন, "বাইরের বৃহৎ কোনো শক্তি ইউরোপের অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করলে এর ফল ভালো হবে না।" ইউরোপের অ-কমিউনিস্ট ১৬টি রাষ্ট্র আমেরিকার কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আমেরিকার সাহায্য ইউরোপে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করলেও স্নায়ুযুদ্ধকে যথেষ্ট উসকানি দিয়েছিল।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম ইউরোপের চেকোস্লোভাকিয়া কমিউনিস্টদের দখলে চলে গেলে আমেরিকাসহ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো চিন্তিত হয়ে পড়ে। এ বছর সোভিয়েত রাশিয়া বার্লিন অবরোধ করলে আমেরিকাl

বার্লিনবাসীকে বাঁচানোর জন্য আকাশ থেকে খাদ্য ফেলে সাহায্য করে। এসব পটভূমিকায় ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ৪ই এপ্রিল আমেরিকা সামরিক জোট 'ন্যাটো' (NATO: North Atlantic Treaty Organization) গঠন করে। মূলত সোভিয়েত-ভীতি থেকেই ন্যাটোর সৃষ্টি। সোভিয়েত ইউনিয়নও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে অপরাপর কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর সাথে ওয়ারস চুক্তি ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মে স্বাক্ষর করে। উদ্দেশ্য পূর্ব ইউরোপে তার সাম্রাজ্যকে সুসংহত করা। এভাবে ধাপে ধাপে স্নায়ুযুদ্ধের গভীরতা ও পরিধি বাড়তে থাকে।

১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে স্নায়ুযুদ্ধ এশিয়ায় প্রবেশ করে। এ সময় চীনে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিজম-ভীতি থেকে চীনের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দিতে বিরত থাকে; সোভিয়েত রাশিয়া স্বীকৃতি দিলে সাম্যবাদী দুই রাষ্ট্রের ঐক্য হওয়ায় স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোরিয়ার তাৎপর্য বাড়তে থাকলে স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মোড় নেয়। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের কায়রো সম্মেলনে স্থিরীকৃত ছিল যে, কোরিয়া বিদেশি নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পাবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের কাছ থেকে কোরিয়াকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। আমেরিকা কোরিয়ার উপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করলে একটা ফয়সালায় গিয়ে কোরিয়া সমস্যার সমাধান হয়, কোরিয়ার উপর ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃত্ব বজায় থাকবে। পরে ৩৮° অক্ষরেখা অনুযায়ী কোরিয়া দু'ভাগে বিভক্ত হয়। দক্ষিণাংশে দক্ষিণ কোরিয়া- যাতে আমেরিকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উত্তরাংশে উত্তর কোরিয়া- যাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি চীনের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার পক্ষে অনুকূল নয়। তাই চীনও কোরিয়ার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করলে তিন বৃহৎ শক্তির স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। স্নায়ুযুদ্ধ প্রত্যক্ষ যুদ্ধের রূপ নিলে আমেরিকা কোরিয়ায় নাজেহাল হয়। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে কোরিয়ায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বারা প্রত্যক্ষ যুদ্ধের অবসান হলেও স্নায়ুযুদ্ধ এখনো চলমান।

১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়ার স্ট্যালিনের মৃত্যু হলে স্নায়ুযুদ্ধ কিছুটা স্তিমিত হতে শুরু করে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হন উদার মনের আইজেনহাওয়ার। তখন থেকেই দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। যার দরুন ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিন ও জেনেভা সম্মেলন নামে দু-দুটি সম্মেলন হয়। জেনেভা সম্মেলনে আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের নির্বিচারে উৎপাদন ও ব্যবহারের কোনো যৌক্তিকতা নেই। উভয় দেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রচেষ্টা চালাবে। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে স্নায়ুযুদ্ধের আরেকটি রূপ খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমেরিকার নেতৃত্বে গঠিত SEATO এবং মধ্যপ্রাচ্য প্রতিরক্ষা সংগঠন MEDO ন্যাটোর সাথে যুক্ত হলে স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা হ্রাসের বদলে বৃদ্ধি পায়। ট্রুম্যান তত্ত্বের মতো আইজেনহাওয়ার মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য সব রকম সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে রাশিয়া আবার সামরিক জোট WARSAW (ওয়ারস) গঠনের মাধ্যমে নিজের প্রভাববলয় বাড়াতে উদ্যোগ নেয়। কাজেই স্নায়ুযুদ্ধ তীব্র করতে শুধু আমেরিকা এককভাবে দায়ী নয়। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানি দু'ভাগ

স্নায়ুযুদ্ধ: পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব

হয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এক ভাগ 'জার্মান যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র' (GFR), যা পশ্চিম জার্মানি নামে পরিচিত। অন্য অংশ 'জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র' (GDR), যা পূর্ব জার্মানি নামে পরিচিতি পায়। স্নায়ুযুদ্ধের ফলে অতীতের ঐক্যবদ্ধ জার্মানি আবার বিভক্ত হয়।

১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে কেন্নান থিসিস ঘোষণা করলে স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মোড় নেয়। কেন্নানের সংযম তত্ত্বের মূলকথা ছিল, সোভিয়েত সামরিক ক্ষমতা হ্রাসের দিকে। এমতাবস্থায় বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন নতিস্বীকারে বাধ্য হবে। জোরগলায় কেন্নান তত্ত্ব প্রচারের অন্যতম কারণ ছিল, ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কৌশল আয়ত্ত করায় সংযত আচরণের মাধ্যমে সোভিয়েতকে চাপে রাখা।

সুয়েজ সংকটকে কেন্দ্র করে মিশর স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মিশর থেকে ব্রিটিশ বাহিনী সরে এলে এবং রাশিয়া মিশরকে সমর্থন দিলে দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে উত্তেজনা আবার বৃদ্ধি পায়। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশ জয়ের লক্ষ্যে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠায়, আমেরিকা এ যাত্রায় পিছিয়ে পড়ে। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিন সমস্যা আবার স্নায়ুযুদ্ধকে সংকটাপন্ন করে তোলে। অবশেষে ক্যাম্প ডেভিড আলোচনার মাধ্যমে নিরস্ত্রীকরণের পরিকল্পনা গৃহীত হলে এবং সামরিক খাতে ব্যয় কমানোর প্রসঙ্গ প্রাধান্য পেলে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন ইউ-টু অনুসন্ধানী বিমান রাশিয়া গুলি করে ভূপাতিত করলে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা আবার বৃদ্ধি পায়। কিউবা সংকটকে কেন্দ্র করে (১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দ) আবার উভয় বৃহৎ শক্তি যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের মধ্য দিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইতিমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি নিহত হলে এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ক্রুশ্চেভক্ষমতাচ্যুত হলে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা হ্রাস পেতে শুরু করে।

স্নায়ুযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায় (১৯৬৪-৮৯ খ্রিষ্টাব্দ)

দুই বৃহৎ শক্তির শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্নায়ুযুদ্ধের চেহারা পাল্টে যায়। বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের এ ধারণা জন্মে যে, পারমাণবিক বোমা আদৌ কল্যাণজনক নয়। উভয় পক্ষই বিবাদ অবসানের প্রতি নজর দেয়। তারা অনুভব করতে শুরু করে যে, যুদ্ধ মানবজাতির জন্য কেবল অকল্যাণ ও ধ্বংসই ডেকে আনবে। তাই তারা পরস্পর বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের মধ্যে যে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাকে যুক্তরাষ্ট্র দাঁতাত এবং রাশিয়া শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নামে অভিহিত করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়া উভয়ই সহ-অবস্থানের নীতি অনুসরণের দিকে অগ্রসর হয়। বিশ্ব রাজনীতিতে ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করে। তবে এ কথা সত্য যে, স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা হ্রাস মানে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান নয়। যা হোক, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রথম পদক্ষেপ। হলো ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে আংশিক পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা বন্ধের চুক্তি সম্পাদন। তারা উভয়ই আরও সিদ্ধান্ত নেয় যে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির যাতে অবনতি না হয়, সেদিকে তারা সতর্ক নজর রাখবে। ষাটের দশকে এসে দুই বৃহৎ পরাশক্তি ও তাদের অনুগামীদের বোধোদয় হয় যে, নির্বিচারে অস্ত্র উৎপাদন নিরাপত্তার গ্যারান্টি নয়। ফলে NATO-র সদস্যরা সামরিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার পথ পরিহার করে নিজেদের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে নজর দেয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা পারস্পরিক বন্ধুত্বের সহায়ক হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্র রাষ্ট্রগুলো (ফ্রান্স, ব্রিটেন, পশ্চিম জার্মানি) এ নীতি গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ দেয়। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ এ ব্যবস্থার সূত্রপাত হলেও সত্তরের দশকে তা ব্যাপকতা ও পরিপুষ্টতা পায়। উল্লিখিত দেশগুলো এ সময় অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ার কাজে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে, সাম্যবাদের সম্প্রসারণের ভীতি তাদের বিচলিত করতে পারেনি। ফলে ওয়াশিংটন ও মস্কো যাবতীয় বিরোধ (যেগুলো স্নায়ুযুদ্ধকে পরিপুষ্ট করে) মিটিয়ে ফেলার জন্য আলোচনায় বসাকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে। অবশ্য এ সময় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ পারমাণবিক অস্ত্র রোধে বলিষ্ঠ ও কঠোর পদক্ষেপ নেয়, যার দরুন উভয় দেশ অস্ত্রোৎপাদনের প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসতে উদ্যোগী হয়। স্নায়ুযুদ্ধের সৃষ্টিতে বা জিইয়ে রাখতে বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের রাষ্ট্রপ্রধানদের যেমন একটি ভূমিকা ছিল, তেমনি এর তীব্রতা হ্রাসে বা অবসানে রাষ্ট্রপ্রধানদের দৃষ্টিভঙ্গির একটা ভূমিকা ছিল। সত্তর দশকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন এ দশককে আলাপ-আলোচনার দশক বলে অভিহিত করেন। ফলে রাশিয়ার সাথে আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত হয়। তারা বুঝতে পারে যে, স্নায়ুযুদ্ধের পেছনে সামরিক অস্ত্রসমূহ উত্তেজনা ছড়ায়। তাই অস্ত্রসমূহ সীমিতকরণে উভয় রাষ্ট্রই রাজি হয়। এ আলোচনা SALT (Strategic Arms Limitation Talks) নামে পরিচিত। পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডের সক্রিয় উদ্যোগে পোল্যান্ডের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তিনি কমিউনিস্ট ব্লকের সাথে একটি নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ্রহ দেখান। ফলে বার্লিনকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল, যা স্নায়ুযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল তা অনেকটা কমে যায়। পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। বলাবাহুল্য, ইউরোপের স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্রস্থল ছিল জার্মানি ও পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহ। সত্তর দশকের মাঝামাঝি চুক্তি সম্পাদন ও ভাব বিনিময়ের ফলে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে হেলসিংকি সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার অনুগামী রাষ্ট্রগুলো সর্বাধিক গোপনীয়তা অনুসরণ করে চলত। বিশেষ করে উদারপন্থি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে তারা এড়িয়ে চলত এবং এ কারণে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেখা দিত। হেলসিংকি সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশে প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সহযোগিতাকে সম্প্রসারিত করার প্রচেষ্টা চালানো হবে এবং সাংবাদিকরা বিনা বাধায় সংবাদ সংগ্রহ করতে পারবেন। এ সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপে প্রদত্ত সামরিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সাহায্য কমিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। হেলসিংকি সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপে আমেরিকার প্রভাব কমানো।

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ পরাশক্তিদ্বয়ের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ অনেকটা কমে আসে। আশির দশকে সল্ট-টু স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলে স্নায়ুযুদ্ধের ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। যদিও ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে আফগানিস্তানে সোভিয়েতের হস্তক্ষেপকে কেন্দ্র করে স্নায়ুযুদ্ধ আবার নতুন মাত্রা পায়। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়ন, কম্পুচিয়ায় সোভিয়েত মিত্র ভিয়েতনামের আগ্রাসন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের বর্বর নীতি, নিকারাগুয়ায় কন্ট্রা বিদ্রোহীদের মার্কিন সাহায্য, 'লিবিয়ায় মার্কিন বিমান হামলা ইত্যাদি ঘটনা বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের মধ্যে পুনরায় স্নায়ুযুদ্ধ সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

স্নায়ুযুদ্ধ - পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই

Content added By

End of Cold War

প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র ছিল অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথিকৃৎ। কমিউনিজমের অস্তিত্ব স্নায়ুযুদ্ধের জন্মদান করে, বিপরীতে পুঁজিবাদের অস্তিত্ব স্নায়ুযুদ্ধকে ত্বরান্বিত ও পুষ্ট করে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের পথিকৃৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিজম রোধ করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায় এবং অবশেষে তারই বিজয় অর্জিত হয়। প্রায় অর্ধশতাব্দীকালব্যাপী যে স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্ববাসীকে চরম স্নায়ুচাপে রেখেছিল, তার অবসানের পর বিশ্ববাসী তা থেকে মুক্তি পায়।

কোনো পরিস্থিতিই বিশ্বে চিরস্থায়িত্ব লাভ করে না। সময়ের পরিক্রমায় নিয়মের অধীনেই স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভমাল্টায় এক শীর্ষ বৈঠকে স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের সরকারি ঘোষণা দেন।১০

স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতির এক স্বল্পস্থায়ী অধ্যায়। উৎপত্তি ও অবসানের মধ্যে ৪৫ বছরের ব্যবধান। এ সময়ে স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে রেখেছিল। স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব ছিল ব্যাপক। বৃহৎ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে এর সূত্রপাত হলেও বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রই এর প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে আরেকটি ভয়ংকর যুদ্ধ যেকোনো মুহূর্তে সংঘটিত হতে পারে- এমন একটা কটা পরিস্থিতি স্নায়ুযুদ্ধ সৃষ্টি করেছিল।

স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের কারণসমূহ
Causes of the End of the Cold War

প্রথমত: দুই পরাশক্তির মানসিকতার পরিবর্তন হলে তারা বুঝতে পারে, বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার দিয়ে শান্তি, নিরাপত্তা বা জয় কোনোটাই অর্জন করা যাবে না। ফলে অস্ত্র উৎপাদন হ্রাস, পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস থেকে দূরে সরে এলে স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পথ সুগম হয়।

দ্বিতীয়ত: স্নায়ুযুদ্ধ সৃষ্টিতে যেমন কতগুলো জোটের ভূমিকা ছিল, তেমনি এর অবসানেও জোটের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম-এর ভূমিকা স্নায়ুযুদ্ধ অবসানে সহায়ক হয়। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য ছিল শতাধিক। ন্যামের সম্মেলনগুলোতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির জন্য বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের সমালোচনা করা হতো। এদের নির্বাসনের জন্য শান্তিকামী মানুষকে সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানালে স্নায়ুযুদ্ধের মদদদাতারা নিরুৎসাহ হয়ে পড়ে। এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো স্নায়ুযুদ্ধের রঙ্গমঞ্চ থেকে সযত্নে নিজেদের সরিয়ে রাখে। ফলে স্নায়ুযুদ্ধ গতিহারা হয়ে অবসানের পথে ধাবিত হয়।

তৃতীয়ত: বৃহৎ রাষ্ট্রের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য স্নায়ুযুদ্ধের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে রাখলেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হওয়ায় দ্বিমেরুবাদের অবসান ঘটে। তাদের মধ্যে তিক্ততা, সন্দেহ ও অবিশ্বাস কমতে শুরু করলে স্নায়ুযুদ্ধের পরিবেশগত পরিমণ্ডল দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সাম্যবাদী রাষ্ট্রের মধ্যে সংহতির অভাব দেখা দেয়। ফলে স্নায়ুযুদ্ধ অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে পরিণত হয়।

চতুর্থত: সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ নীতিতে পরিবর্তন এলে স্নায়ুযুদ্ধের অবাসন ত্বরান্বিত হয়। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে মিখাইল গর্বাচেভ ক্ষমতা গ্রহণ করে অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কারের লক্ষ্যে গ্লাসনস্ত (উদার নীতি) ও পেরেস্ত্রৈকা (পুনর্গঠন) কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ফলে তার উদারনীতি কর্মসূচি পশ্চিমা বিশ্বে সমাদৃত হলে স্নায়ুযুদ্ধের আবহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমতে শুরু করে। এদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে সাম্যবাদের অসারতা জনগণের কাছে প্রকাশ পায়। স্নায়ুযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো যে শক্তিশালী অর্থব্যবস্থার প্রয়োজন, তা সোভিয়েত নেতারা প্রস্তুত করতে পারেননি। ফলে সাম্যবাদ কিছুটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং রুশরা উদার নীতিবাদের প্রতি আনুগত্য দেখাতে শুরু করলে সোভিয়েত ইউনিয়নের অতীত অহমে ভাটা পড়ে, যা স্নায়ুযুদ্ধকে অবসানের দিকে ধাবিত করে।

পঞ্চমত: আমেরিকার অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন স্নায়ুযুদ্ধকে দুর্বল করে ফেলে। অমেরিকার অর্থনীতির বিরাট অংশ সমরাস্ত্র প্রস্তুতে ব্যয় হতো। এদিকে জাপান শিল্পোন্নয়নে অগ্রসর হলে আমেরিকা জাপানকে অনুসরণ করে শিল্পোন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে। সামরিকীকরণ থেকে শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হওয়া স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের একটি কারণ।

ষষ্ঠত: মতাদর্শগত বিভেদ, যা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে অনাস্থা, অবিশ্বাসের সৃষ্টি করেছিল, তা ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। বৃহৎ রাষ্ট্রদ্বয় তাদের অনুগামী রাষ্ট্রগুলোকে পুতুলের মতো ব্যবহার করলেও সময় গড়ানোর, সাথে সাথে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আনুগত্যের মাত্রা কমে যায়। রাশিয়া মানেই প্রতিক্রিয়াশীল আর আমেরিকা বলতেই প্রগতিশীল, এ ধারণায় চিড় ধরলে স্নায়ুযুদ্ধের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসে।

সপ্তমত: উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো বৃহৎ রাষ্ট্রদ্বয়ের দ্বারস্থ হতো উন্নয়নের উপাদান পাওয়ার আশায়। উন্নয়নের উপাদানের পরিবর্তে তারা সমরাস্ত্র পেত। সময়ের পরিক্রমায় বিকাশশীল রাষ্ট্রগুলোর কাছে বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। এসব রাষ্ট্রের কাছে রাশিয়া বা আমেরিকার গুরুত্ব, উপযোগিতা হ্রাস পেতে শুরু করলে স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতাও কমতে শুরু করে।

এটা সত্য যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর স্নায়ুযুদ্ধের আপাত অবসান হয়। তবে এটাও সত্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতির একক নিয়ন্তা হয়ে উঠছে। বিশ্ব রাজনীতির শক্তি-সাম্য এখন আর নেই। বর্তমান রাজনীতির যে ধারা, ভবিষ্যৎ ইতিহাস হয়তো শক্তি-সাম্যের জন্যই স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়টাকে উৎকৃষ্ট বলে মনে করে স্মরণ করবে। বর্তমানে স্নায়ুযুদ্ধ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহে অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হচ্ছে। পূর্বের স্নায়ুযুদ্ধ ছিল সামরিক ও আদর্শগত। এখন স্নায়ুযুদ্ধ পুঁজিগত। তাই বলা যায়, স্নায়ুযুদ্ধের ধারণার পরিবর্তন ঘটেনি, রূপ পাল্টেছে মাত্র। বর্তমানে জাপান-আমেরিকা বিরোধ, পাকিস্তান-ভারত বিরোধ, উত্তর কোরিয়া-দক্ষিণ কোরিয়া বিরোধ, ইসরাইল-ইরান বিরোধ, রাশিয়া-ইউক্রেন বিরোধ ও উত্তেজনা স্নায়ুযুদ্ধের নতুন স্বরূপ বলা যায়। ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা পুনরায় স্নায়ুযুদ্ধকে উসকে দিচ্ছে। ৮ই নভেম্বর ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে (শনিবার) বার্লিন প্রাচীর পতনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে জার্মানিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ বলেন, "পৃথিবী আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে।"

স্নায়ুযুদ্ধ: পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব

কাজেই দেখা যায়, স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বিমেরুকরণবাদের প্রভাব ছিল। দুই বৃহৎ শক্তির সাম্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্রনীতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রগুলো সর্বদা তটস্থ থাকত। অন্ধ অনুসরণ করায় বৃহৎ শক্তিগুলো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ পেত, যা স্নায়ুযুদ্ধকে জিইয়ে রাখত।

রাশিয়ার ক্ষমতায় গর্বাচেভের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে রক্তক্ষয়ী কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই। এজন্য সব কৃতিত্ব তারই প্রাপ্য; যার স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর রাশিয়া ইউরোপের পরাশক্তির ভূমিকা পালনে অগ্রসর হলেও পূর্বের ন্যায় শক্তিশালী না হওয়ায় স্নায়ুযুদ্ধের টান-টান উত্তেজনা প্রশমিত হতে শুরু করে। রাশিয়ার গর্বাচেভ-পরবর্তী নেতৃবৃন্দ পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে এবং সাম্যবাদের পরিসমাপ্তি ঘোচানোর কাজে বেশি ব্যস্ত। রাশিয়া মার্কিনি ধাঁচের অর্থনীতি চালু করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতামূলক নীতি গ্রহণ করায় স্নায়ুযুদ্ধের উপযোগিতা হ্রাস পেতে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার যে তিক্ত সম্পর্ক ছিল তা এখন আর নেই। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নয়, ব্রিটেনের সাথেও সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেছেন। অদ্যাবধি স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব থেকে বিশ্ববাসী সম্পূর্ণ মুক্ত না হলেও এর তীব্রতা পূর্বের মতো আর নেই। তবে বর্তমানে সিরিয়া সংকটকে কেন্দ্র করে ভ্লাদিমির পুতিনের প্রেসিডেন্ট আসাদের পক্ষাবলম্বনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার উষ্ণ সম্পর্কে পুনরায় ফাটল ধরেছে এবং স্নায়ুযুদ্ধ আবার পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন কর্তৃক সেনাবাহিনীকে পারমাণবিক বোমা প্রস্তুত রাখার নির্দেশ বিশ্বকে আবার স্নায়ুযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ দ্বীপকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের উষ্ণতা হ্রাস পেয়ে এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে যে ভাষায় হুঁশিয়ারি দিচ্ছে তা স্নায়ুযুদ্ধের নতুন মাত্রার বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। বিশেষ করে সিরিয়াকে কেন্দ্র করে এবং সালিসবারিতে রুশ গুপ্তচর ও তাঁর মেয়েকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা নিয়ে পরাশক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। সিরিয়ায় যা ঘটছে তা থেকে বুঝা যায় স্নায়ুযুদ্ধ সময়কালীন পরিস্থিতির সাথে এখনকার উত্তেজনার মিল রয়েছে। সৌদিকে ইঙ্গিত করে জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনি গুতেরেস বলেছেন, "প্রতিহিংসার শীতল যুদ্ধ ফিরে আসছে।"

প্রধান শব্দসমূহের ব্যাখ্যা

Explanation of Key Words

ট্রুম্যান তত্ত্ব (Truman doctrine): মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই মার্চ ঘোষণা করেন যে, "মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য হলো এমন এক আন্তর্জাতিক পরিবেশ গঠন করা, যার মাধ্যমে সকল জাতি বলপ্রয়োগ ছাড়াই বসবাস করতে পারবে।" তিনি আরও বলেন, "ইউরোপের গণতন্ত্র বিপন্ন এবং তা উদ্ধার করার দায়িত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।" তার এরকম ঘোষণাই ইতিহাসে ট্রুম্যান ডকট্রিন (তত্ত্ব) নামে পরিচিত, যা রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে আরও ফাটল ধরায়।

মার্শাল পরিকল্পনা (Marshall Plan): ট্রুম্যান তত্ত্বের সূত্র ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব জর্জ মার্শাল ১৯৪৭
খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় বলেন, যেখানে দারিদ্র্য, হতাশা ও লোকসংখ্যা বেশি সেখানেই কমিউনিজম শাখা-প্রশাখা ছড়ায়। দরিদ্রতা দূর করতে না পারলে ইউরোপকে কমিউনিজমের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না। এজন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের জন্য তিনি সাহায্যের প্রস্তাব করেন। তার এ বক্তব্যের জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে সাড়ে ৫ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দেয়। তার বক্তব্য ও করণীয় ইতিহাসে মার্শাল পরিকল্পনা নামে পরিচিত।

ন্যাটো (NATO): NATO-এর পূর্ণরূপ হলো North Atlantic Treaty Organization. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত আধিপত্যের ভীতি থেকে ইউরোপের ১১টি দেশের সাথে ২০ বছরের জন্য আত্মরক্ষামূলক যে সামরিক চুক্তি সম্পাদন করে তারই নাম NATO, যা ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বলা হয়, চুক্তিভুক্ত কোনো দেশ আক্রান্ত হলে এ আক্রমণকে সদস্যভুক্ত দেশ নিজেদের উপর আক্রমণ বলে গণ্য করবে।

ওয়ারস জোট (Warsaw Pact): ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মে মাসে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারসতে
আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, রুমানিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মিত্রতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সাহায্যের অঙ্গীকারে ওয়ারস জোট গঠিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী সদস্যভুক্ত কোনো দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সবাই মিলে তার সর্বাত্মক সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে। সত্তরের দশকের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মতভেদের কারণে আলবেনিয়া এই সংস্থার সদস্য পদ ত্যাগ করে। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পর ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়।

দাঁতাত: যুদ্ধ কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলমান স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা শুরু করে। তারা পরস্পর বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে আগ্রহী হয়। বৃহৎ শক্তির মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠাকে যুক্তরাষ্ট্র দাঁতাত এবং রাশিয়া শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নামে অভিহিত করে। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করে। স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা হ্রাস পায়।

কেন্নান থিসিস: ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কেন্নান থিসিসের মূলকথা হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক ক্ষমতা হ্রাসের দিকে, এ অবস্থায় বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন নতিস্বীকারে বাধ্য হবে। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বেই যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র প্রস্তুতের প্রযুক্তি আবিষ্কার করায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে কৌশলগতভাবে চাপে রাখার এবং আধিপত্য বিস্তারের জন্যই কেন্নান থিসিস প্রকাশিত হয়।

কিউবা সংকট: ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সম্মতিক্রমে কিউবায় সামরিক মিসাইল স্থাপন করে। এই মিসাইল স্থাপন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। যার ফলে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপ আরও বাড়তে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা এবং সোভিয়েত-মার্কিন সম্পর্ক অত্যন্ত তিক্ত হয়ে ওঠে।

গ্লাসনস্ত গ্লাসনস্ত একটি রুশ শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ 'খোলা নীতি'। সাবেক সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ এই নীতির প্রবর্তক। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঘোষণা করেন যে, এখন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণ নির্ভয়ে খোলাখুলিভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারবে। পার্টি ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের প্রকাশ্য সমালোচনাও করতে পারবে। আর এজন্য গর্বাচেভ তার এই নীতিকে গ্লাসনস্ত নীতি বলে অভিহিত করেন। অবশেষে এই গ্লাসনস্ত নীতির কারণেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়।

পেরেস্ত্রৈকা: সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ কর্তৃক ঘোষিত অর্থনৈতিক সংস্কারনীতিই পেরেন্দ্রৈকা নীতি নামে খ্যাত। তিনি গ্লাসনস্ত অর্থাৎ খোলামেলা নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে উদারনৈতিক অর্থনীতি প্রবর্তনের জন্য এই নীতি গ্রহণ করেন। ফলে ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপীয় কমিউনিস্ট দেশসমূহে নয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গৃহীত হতে থাকে। ব্যক্তিমালিকানা, বুর্জোয়া কালচার প্রভৃতিকে আবার আহ্বান জানানো হয়। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে অচিরেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।

ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক চুক্তি। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ৫-১৭ই সেপ্টেম্বর ক্যাম্প ডেভিড নামক স্থানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিনের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি সম্পাদনের পর মিশরকে আরব লীগ ও ওআইসি থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বিরোধীদের রোষানলে পড়েন এবং ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।

ন্যাম: ন্যাম (NAM)-এর পূর্ণরূপ Non Aligned Movement। ন্যাম একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে পুরাতন যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে জন্ম হয় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ন্যামের। ন্যামের বর্তমান সদস্যসংখ্যা ১২০। স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে যখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশ সোভিয়েত অথবা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বলয়ে যোগ দিচ্ছিল তখন ন্যাম অত্যন্ত সফলতার সাথে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সূচনা ঘটায় এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দ্বিমেরুবাদ: স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশকে হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক ব্লক অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদী ব্লকের অধীনে বিবেচনা করে প্রচলিত নীতির নামই দ্বিমেরুবাদ। দ্বিমেরুবাদকে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শক্তিসাম্য হিসেবে দেখে থাকেন বলে দ্বিমেরুবাদকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার অন্যতম উপায় বলে বিবেচনা করেন। স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতায় দ্বিমেরুবাদ অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিরাজমান, যা বহুলভাবে একমেরুকরণ নামে পরিচিত

ফুলটন বক্তৃতা: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মার্চ ফুলটনে যে বক্তৃতা দেন তার প্রভাবেই পৃথিবীতে ঠাণ্ডাযুদ্ধের সূচনা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। তিনি তার বক্তৃতায় বলেন, "কেউ এ কথা বলতে পারবে না যে, ভবিষ্যতে সোভিয়েত রাশিয়া ও তার মিত্ররা কী করবে?" তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বলয় থেকে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে বের করে নিয়ে আসার জন্য ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রতিহত করার জন্য তিনি ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রাতৃত্বমূলক ঐক্যের তত্ত্ব প্রচার করেন।

বার্লিন অবরোধ: ট্রুম্যান তত্ত্ব ও মার্শাল পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের পদক্ষেপ হলো বার্লিন অবরোধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পর জার্মানির রাজধানী বার্লিনকে ৪ ভাগে ভাগ করে শাসন করছিল। আমেরিকা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড তাদের অধিকৃত পশ্চিম বার্লিনে সংযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নিলে রাশিয়ায় স্ট্যালিন ক্ষুব্ধ হয়ে পশ্চিমের সাথে পূর্বের সব ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করে দেন। এর ফলে পশ্চিম জার্মানির ৩ মিলিয়ন মানুষ খাদ্য সরবরাহের সংকটে পড়ে। এ অবরোধ প্রায় ১১ মাস ধরে চলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মিত্রপক্ষের বিমান ২,৭০,২৬৪ বার উড়ানোর মাধ্যমে পশ্চিম বার্লিনে ২২,৫০,০০০ টন খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়। ফলে স্ট্যালিন অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হন।

WARSAW: NATO-র পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মে কমিউনিস্ট দেশগুলো নিয়ে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারসতে যে চুক্তি স্বাক্ষর করে তা ওয়ারস (WARSAW) চুক্তি। এ চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ইউরোপের সোভিয়েত সমর্থনপুষ্ট সাম্রাজ্যকে সুসংহত করা এবং ন্যাটোর ভয়-ভীতি থেকে পূর্ব ইউরোপকে রক্ষা করা।

SEATO: মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার তার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের নীতি অনুসরণ করে কৌশল হিসেবে আলাপ-আলোচনাকে প্রাধান্য দেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিস্টবিরোধী নীতিকে সম্প্রসারণের জন্য যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি গঠনের উদ্যোগ নেন। এ লক্ষ্যে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই সেপ্টেম্বর ম্যানিলায় 'দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থা' (South East Asian Treaty Organization) গঠন করেন। এ চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল এসব অঞ্চলে কমিউনিস্ট চীনের প্রভাব রোধ এবং জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রভাবকে ধ্বংস করা।

MEDO: MEDO-এর পূর্ণরূপ হলো Middle. East Defence Organization. প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে ফেব্রুয়ারি এ সংস্থাটি গঠন করেন। MEDO এবং SEATO NATO-এর সাথে যুক্ত হলে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা সামরিক জোটের এক মাকড়সার জালে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে। ফলে স্নায়ুযুদ্ধ প্রশমনের পরিবর্তে তীব্র হয়ে ওঠে।

স্নায়ুযুদ্ধ - পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...