hsc

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি (অধ্যায়-৪)

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.9k

ভারতবর্ষের সর্বশেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। তখন থেকে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালকে বাংলাদেশের ইতিহাসে পাকিস্তানি আমল বলা হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বিতর্কিত দ্বি-জাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। একমাত্র ধর্ম ব্যতীত দুই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও আচার-অনুষ্ঠানের ছিল বিরাট ব্যবধান। অথচ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক মনোভাবের জন্য বিচ্ছিন্ন দুই অঞ্চলকে একত্রিত করে একটি রাষ্ট্র গঠন করা হয়, যার পরিণতি শুভ হয়নি। পরবর্তী ইতিহাস সে প্রমাণ বহন করে।

১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবে পাকিস্তানের যে রূপরেখা গ্রহণ করা হয়েছিল তাতে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের কথা ছিল। লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক এ.কে. ফজলুল হক বলেছিলেন, "বাংলার শাসন ক্ষমতা কোনো মতেই কোনো কাল্পনিক ও অজানা কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের হাতে তুলে দিতে পারি না।" মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কিন্তু প্রথম থেকেই অখণ্ড পাকিস্তানের চিন্তায় বিভোর ছিলেন। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম লীগের দিল্লি কনভেনশনে সুকৌশলে লাহোর প্রস্তাব সংশোধনপূর্বক Independent states-এর স্থলে state করে এককেন্দ্রিক পাকিস্তান কাঠামো গ্রহণ করা হয়। এর ব্যাখ্যায় মি. জিন্নাহ বলেন, state শব্দটি ভুলক্রমে states হয়েছে। এভাবে তৎকালীন রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের দোলা চলে শেষ পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বহুরকম পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ১৫০০ মাইল দূরত্ব ব্যবধানে দুটি ভূখণ্ড নিয়ে একটি রাষ্ট্র 'পাকিস্তান' জন্ম লাভ করে। জন্মলগ্ন থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক চক্র পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে। আর তারই প্রথম নজির লক্ষ করা যায় বাঙালির মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়ার হীন প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। কিন্তু তাদের সে প্রচেষ্টা সফল হতে দেয়নি বাংলার দামাল ছেলেরা।

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি -ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও:

ইউনিসেফ জাতিসংঘের একটি অঙ্গসংস্থা। সারা বিশ্বের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংস্থাটি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

রাজশাহীর জামালপুর এলাকায় ১০ বছরের আইনুল তার ৩ জন বন্ধুকে নিয়ে সকালে বালি দিয়ে উঁচু স্তম্ভ নির্মাণের চেষ্টা করে বারবার ব্যর্থ হয়। অবশেষে একজন পলিথিনের ব্যাগে পানি নিয়ে এসে বালু ভিজিয়ে উঁচু স্তম্ভ তৈরি করে, স্তম্ভে ফুল ও পতাকা গুঁজে দেয়। এ কাজটি করে যেন তারা মুক্তির আনন্দ পায়।

নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

জনাব ইমতিয়াজ স্যার ক্লাসে বলেন, ঢাকার বাইরে এই নারীই সর্বপ্রথম ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন। তিনি আরো বলেন, এই নারী প্রায় ৩০০ ছাত্রী নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় হাজির হন। অবশেষে ভাষা আন্দোলনের জন্য তিনি সংসারও হারিয়েছেন।

Political Situation of East Bengal

পাকিস্তান লাভের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকচক্র পূর্ব বাংলার প্রতি ব্যাপক বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ-এর গভর্নর জেনারেল পদ গ্রহণ করেন। তিনি লিয়াকত আলী খানকে প্রধানমন্ত্রী এবং খাজা নাজিমউদ্দিনকে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী করে মন্ত্রিসভা গঠন করেন। পাকিস্তানের অধিবাসীদের শতকরা ৫৬ জনের বাস পূর্ব বাংলায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় গভর্নর জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী দুটি পদের একটিও কোনো পূর্ব বাংলার লোককে দেওয়া হয়নি। পাকিস্তানের রাজধানী করা হয় করাচিতে। পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয় ইসলামাবাদে। দেশ রক্ষায় ৩টি বাহিনীর সদর দপ্তরও করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে।

ভারতবর্ষ ভাগ করার সময় শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতাকে দু'ভাগে ভাগ করার দাবি করেন। তাদের যুক্তি ছিল যে, বার্লিন শহরকে যদি দু' জার্মানির মধ্যে ভাগ করা সম্ভব হয়, তাহলে কলকাতাকে কেন পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ভাগ করা যাবে না? তাছাড়া বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় যখন বাংলা ভাগ করার দাবি জানিয়েছে এবং সংখ্যালঘিষ্ঠ দল সরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে তখন তারা সম্পূর্ণ কলকাতা পেতে পারে না। কিন্তু কেন্দ্রীয় লীগ কর্তৃপক্ষ সীমানা বণ্টনের ব্যাপারে হক সাহেব ও সোহরাওয়ার্দীকে কথাবার্তা বলতে না দিয়ে ওয়াসিমকে উকিল নিযুক্ত করেন। মি. ওয়াসিম লীগের হাই কমান্ডের নির্দেশক্রমে র‍্যাডক্লিক কমিশনের সম্মুখে কলকাতার ওপর কোনো দাবি উত্থাপন করলেন না।

কলকাতা মহানগরী পূর্ব বাংলার সম্পদ দিয়ে গড়ে উঠেছিল। সুতরাং কলকাতার প্রতি পাকিস্তানের দাবি যথাযথ ছিল। কিন্তু লীগ কর্তৃপক্ষ কলকাতার দাবির প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাননি। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, (১) কলকাতা বিভক্ত হলে এবং এর একাংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে সেখানে পাকিস্তানের রাজধানী স্থাপনের দাবি উঠতে পারে। এ দাবি পূরণ করা হলে বাংলার মুসলমানগণ পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সুযোগ-সুবিধা পাবে এবং তাদের ভবিষ্যৎ উন্নতির পথ সুগম হবে, সেটা হতে দেওয়া যায় না। (২) শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক শক্তি কেন্দ্র কলকাতা থাকায় তার প্রভাব বেড়ে যাবে। সুতরাং কলকাতা রাজধানী হলে লীগ কর্তৃপক্ষের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থে জাতীয় স্বার্থ নষ্ট হলো। লীগ কর্তৃপক্ষ কলকাতা ভাগ করার ব্যাপারে নিরব থাকার ফলে বহু সরকারি সম্পদ থেকে পূর্ব বাংলা বঞ্চিত হলো। সব কিছু পিছনে রেখে পাকিস্তান সরকার ঢাকায় চলে আসল। কলকাতার দাবি ত্যাগ করলে পূর্ব বাংলাকে ৩৩ কোটি টাকা দেবার কথা ছিল তাও পাওয়া গেল না। পাকিস্তান সরকার ভারতকে কলকাতা দিয়ে বিনিময়ে পূর্ব পাঞ্জাব ও লাহোর পেয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করল।

১৯৪৫-৪৬ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অবদানের জন্যই মুসলিম লীগ জয়লাভ করে। -- ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলার সংসদীয় নেতা হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি অবিভক্ত বাংলার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন অবিভক্ত বাংলার বিপক্ষে, একক পাকিস্তান অর্জনের পক্ষে। দেশ বিভাগের পর দেখা যায়, লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান করা হয়। কিন্তু ক্ষমতালোভী মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহ নিজেই পাকিস্তানের 'গভর্নর জেনারেল হন। এর ফলে ব্রিটিশ সরকার নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকে এর ন্যায্য সম্পদ ও পাওনা থেকে বঞ্চিত করেছিল।
: ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ এপ্রিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সার্বভৌম স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্রের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বাংলার মুসলিম লীগ সম্পাদক আবুল হাসিম এবং কংগ্রেস প্রধান শরত বসু ও কিরণ শঙ্কর রায় এই প্রস্তাব পূর্ণ সমর্থন করেন। বৃহৎ বাংলা রাষ্ট্রের এই প্রস্তাব 'বসু সোহরাওয়ার্দী প্রস্তাব' নামে খ্যাত।

আওয়ামী লীগের জন্ম (Born of Auame League)

ব্রিটিশদের কাছ থেকে দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য উপমহাদেশে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে কংগ্রেসের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মুসলমান নেতৃবৃন্দের সাথে কংগ্রেস নেতাদের সম্পর্কের অবনতি হলে ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর নবাব স্যার সলিমুল্লাহর উদ্যোগে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানে তত্ত্বগতভাবে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে গভর্নর জেনারেলের হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। মুসলিম লীগ নেতাদের অগণতান্ত্রিক আচরণ, দমননীতি, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সীমাহীন বৈষম্য, বাংলা ভাষার অবমাননা ইত্যাদির কারণে অনেক মুসলিম লীগের নেতারা মর্মাহত হন। এ সময় নির্ভীক, দৃঢ় প্রত্যয়ী, স্বাধীনচেতা এবং গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগ সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সুশৃঙ্খলভাবে ও আইনসম্মত উপায়ে আন্দোলন করার জন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তা করেন। এই চিন্তা-ভাবনা থেকে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ২৩-২৪ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে এক কর্মী সম্মেলন হয়। ৩০০ জন শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধি তাতে অংশগ্রহণ করেন। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' (জনগণের মুসলিম লীগ) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সংগঠনটির প্রথম সভাপতি- মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে (বিশিষ্ট যুব নেতা ও পরবর্তীকালে বাঙালি জাতির জনক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি) যুগ্ম সম্পাদক করে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। ২৪ জুন ঢাকার আরমানিটোলায় আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম থেকেই আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ দলটি গঠনের মাধ্যমে বিরোধী রাজনীতিতে যে শূন্যতা ছিল তা পূরণ হয়। মুসলিম লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের কুশাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে অচিরেই দলটি জনগণের আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়। জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী মুসলিম লীগ অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক চেতনায় বিশ্বাসী ছিল। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দিয়ে 'আওয়ামী লীগ' নাম ধারণ করে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য এর দ্বার খুলে দেওয়া হয়।

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

Economical Situation of East Bengal

নবগঠিত পাকিস্তানের ৫৬% বাসিন্দা এবং সম্প্রদায়ের সিংহভাগ পূর্ব বাংলার হওয়া সত্ত্বেও রাজধানী স্থাপন করা হয় ঢাকার পরিবর্তে মি. জিন্নাহর জন্মস্থান করাচিতে। করাচিকে রাজধানী করার সিংহভাগ খরচের যোগান দিয়েছিল পূর্ব বাংলা। অথচ অকৃতজ্ঞ পাকিস্তান সরকার এর বিনিময় পূর্ব পাকিস্তানের ওপর শোষণ, নির্যাতন চালাতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি। পাকিস্তান জন্মের শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর তাদের অর্থনৈতিক শোষণ শুরু হয়। সকল প্রকার কল-কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব বাংলাকে তারা কলোনি বা উপনিবেশে পরিণত করে।

সময়কালব্যয়ের বিবরণপূর্ব পাকিস্তানপশ্চিম পাকিস্তান
১৯৪৮-১৯৫৫শিক্ষাখাতে ব্যয়২৪০ কোটি টাকা১৫৩০ কোটি টাকা
১৯৫৫-১৯৬৭শিক্ষাখাতে ব্যয়৭৯৭ মিলিয়ন রুপি২০৮৪ মিলিয়ন রুপি
১৯৪৭-১৯৫৫উন্নয়ন খাতে ব্যয়৫১৪.৭ মিলিয়ন টাকা১৪৯৬.২ মিলিয়ন টাকা
১৯৫৫-১৯৬০অর্জিত আয়১১,৩৩,৮০,০০০ টাকা৫০০ কোটি টাকা
১৯৬০-১৯৬৫অর্জিত আয়২২,২৩০ মিলিয়ন টাকা৬,৪৮০ মিলিয়ন টাকা
১৯৪৭-১৯৬৭রাজধানী উন্নয়নে ব্যয়২৫০ মিলিয়ন টাকা৩,০০০ মিলিয়ন টাকা

এরূপ বৈষম্যের ফলে শিক্ষা, ব্যবসায়-বাণিজ্যে, শিল্প উৎপাদন, কৃষিসহ অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে পূর্ব পাকিস্তান কয়েকগুণ পিছিয়ে পড়ে।

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

Constitutional Situation of East Bengal

স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তান সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে তা কার্যকরী হয়নি। কেননা প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে গভর্নর জেনারেলের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। সে হিসেবে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীর পরিবর্তে গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর হাতেই ছিল সমস্ত ক্ষমতা। লিয়াকত আলি ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক প্রধান। স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তানি আমলাদের ক্ষমতা ও দাপট অনেক বেড়ে যায়। সে কারণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনৈতিক নেতাদের অপেক্ষা আমলাদের ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মোহাম্মদ আলী জিন্নার মৃত্যু হলে গভর্নর জেনারেল হন খাজা নাজিম উদ্দিন। এর পর লিয়াকত আলী খান আততায়ীর হাতে নিহত হলে আমলা গোলাম মোহাম্মদ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন (অক্টোবর ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দ) তার প্রভাবে আমলা ইস্কান্দার মীর্জা ও সেনাবাহিনী অত্যধিক ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। ফলে পাকিস্তানের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ভাবধারা ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। রাজনৈতিক নেতারা কোণঠাসা হতে থাকে। তারা আমলা ও সেনাবাহিনীর অনুগ্রহের পাত্রে পরিণত হয়। পাকিস্তানের প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল চৌধুরী মোহাম্মদ আলী এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চীফ সেক্রেটারি আজিজ আহম্মেদ রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীদের পাত্তাই দিতেন না। তাদের গণতন্ত্রের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা ছিল না। এভাবেই পাকিস্তানি রাজনীতি থেকে গণতন্ত্রের বিদায় ঘটে এবং আমলা ও সেনা নির্ভর স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। যার ফলাফল ছিল অত্যন্ত বেদনাবিধূর, পরবর্তী ইতিহাস তাই প্রমাণ করে।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাঙালিরা পাকিস্তানকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধশালী করার জন্য আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে; কিন্তু বাঙালিদের এ উদার মনোভাবকে পাকিস্তানি শাসকচক্র কোনো দিনই শ্রদ্ধার চোখে দেখেনি বরং তারা সব সময় বাঙালিকে তাদের অধীনস্থ প্রজা হিসেবে রাখতে চেয়েছে, দেখতে চেয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই পাকিস্তানি শাসকচক্র পূর্ব বাংলার প্রতি চরম অবহেলা ও বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে।

১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ৪২,০০০ কর্মকর্তার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যা ছিল ২,৯০০ জন। করাচিতে রাজধানী হওয়ায় ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বাঙালিদের পক্ষে সেখানে গিয়ে ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি লাভ করা সম্ভব ছিল না। উপরন্তু ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি না দেওয়ায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বাঙালি ছাত্র/ছাত্রীদের সাফল্য লাভ সহজ ছিল না। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম পাকিস্তানে গেজেটেড কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ৩,৭০৮ জন, পূর্ব পাকিস্তানে এর সংখ্যা ছিল ১,৩৩৮ জন এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে নন-গেজেটেড কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২৬,৩১০ ও ৮২,৯৪৪ জন।

নিম্নে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রশাসনিক ক্ষেত্রের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো-

ক্রমিক নংখাতপশ্চিম পাকিস্তানিবাঙালি
০১প্রেসিডেন্টের সচিবালয়৮১%১৯%
০২দেশরক্ষা৯১.৯%৮.১%
০৩শিল্প৭৪.৩%২৫.৭%
০৪স্বরাষ্ট্র৭৭.৩%২২.৭%
০৫তথ্য৭৯.৯%২০.১%
০৬শিক্ষা৭২.৭%২৭.৩%
০৭স্বাস্থ্য৮১%১৯%
০৮আইন৬৫%৩৫%
০৯কৃষি৭৯%২১%

১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের এ পরিসংখ্যান থেকে বাঙালিদের প্রতি চরম বৈষম্যমূলক আচরণ লক্ষ করা যায়। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, হাসপাতাল, ডাকঘর, টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, বিদ্যুৎ প্রভৃতি ক্ষেত্রেও সীমাহীন বৈষম্য বিরাজমান ছিল।

এছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% বাস ছিল পূর্ব বাংলায়। আর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ছিল হাজার বছরের ঐতিহ্য। অপরদিকে বিভিন্ন ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতি মিলিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের ৪৪% জনসংখ্যা ছিল। এই ৪৪% এর মধ্যে উর্দুভাষী ছিল মাত্র ৪%। বাস্তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষা ও সুসমৃদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার চক্রান্তে পাকিস্তানি শাসকচক্র লিপ্ত হয়।

দলীয় কাজ: ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান স্বাধীন হলেও পূর্ববাংলা ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের একটি উপনিবেশ। এ বিষয়ের ওপর একটি দলিল বিতর্ক আয়োজন করবে শিক্ষক সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করবে।

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

Perspective of Language Movement of 1952

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একটি মাইলফলক। বাঙালির সভ্যতা ও সংস্কৃতির উজ্জ্বল ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার যে ষড়যন্ত্র পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী এঁটেছিল তা '৫২-এর ভাষা আন্দোলনের রক্তের বিনিময়ে বাঙালিরা প্রতিহত করেছে। এই ভাষা আন্দোলনই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি যেমন রচনা করে তেমনি পরবর্তীকালে বহু ঘটনার উৎস হিসেবে জাতিকে প্রেরণা যুগিয়েছে।

কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে প্রথম তার ভাষাকে ধ্বংস করতে হয়। এই তাত্ত্বিকতায় বিশ্বাসী হয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিশেষ করে পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য বাঙালির সভ্যতা সংস্কৃতি ধ্বংস করতে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরক্ষণেই বাঙালির ভাষার ওপর হাত দেয়। অফিস-আদালতে ইংরেজি ও উর্দু ব্যবহৃত হতে থাকে।

এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে যে মহান আন্দোলন শুরু হয় তাই ভাষা আন্দোলন নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। বদরউদ্দীন উমর প্রণীত, "পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি" নামক গ্রন্থ স্বাধীনতার পূর্বে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ (১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ঘোষণা পত্রে) বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিশ্রুতি ছিল এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পূর্বে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষাকে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণ করার দাবি করেন তার উল্লেখ আছে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম থেকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অবহেলা ও প্রবঞ্চনা শুরু হয়। পাকিস্তানের ২৫ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই সত্যটি স্পষ্ট হয় যে, পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিল ঔপনিবেশিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রবঞ্চনা ও নির্যাতনের এক করুণ ইতিহাস।

ভাষার দাবি নিয়ে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট 'তমদ্দুন মজলিশ' নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এ সংগঠনের অপর সদস্যদ্বয় হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম (তৎকালীন এস. এম. হলের ভিপি এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) এবং শামসুল আলম (এস. এম. হলের সমাজসেবা সম্পাদক)। তমদ্দুন মজলিশই সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম ও আইন আদালতের ভাষা করার পক্ষে দাবি উত্থাপন করে প্রচার-প্রচারণা চালায়। ১৫ সেপ্টেম্বর এ সংগঠনটি 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু' নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে এই প্রতিষ্ঠানটি নূরুল হক ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে প্রথম 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি' গঠন করে। ক্রমান্বয়ে অনেক অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল সংগঠন এ আন্দোলনে যোগ দেয়। নেতৃস্থানীয় বাঙালি পণ্ডিতগণ উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে মত দেন। বহুভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, "পাকিস্তানের কোনো অংশেই উর্দু স্থানীয় ভাষা ছিল না, আমাদের যদি দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ করার প্রয়োজন হয় তবে আমরা উর্দুর কথা বিবেচনা করতে পারি।" ২ মার্চ দেশের ছাত্রসমাজ বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। এবার আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুদ্দিন আলম। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নতুন কমিটির উদ্যোগে আন্দোলন বেগবান হয়। এ পরিষদের নতুন কমিটির আহ্বানে ১১ মার্চ ধর্মঘট পালিত হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্বপাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা। ধর্মঘটের পক্ষে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' পতাকাযুক্ত ছবি, শ্লোগানসহ মিছিল করার সময় পুলিশের লাঠিচার্জে অনেকে আহত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ ও কাজী গোলাম মাহবুব সহ

অনেকেই গ্রেফতার হন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৩-১৫ মার্চ শুধু ঢাকা নয়, দেশের সর্বত্র ধর্মঘট পালিত হয়। তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৫ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। উক্ত আলোচনা সভায় ৮ দফা চুক্তিনামা স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্তসমূহ ছিল নিম্নরূপ:

১। ২৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮ হইতে বাংলা ভাষা প্রশ্নে যাহাদিগকে গ্রেফতার করা হইয়াছে তাহাদিগকে অবিলম্বে মুক্তি দান করা হইবে।

২। পুলিশ কর্তৃক অত্যাচারের অভিযোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তদন্ত করিয়া এক মাসের মধ্যে এই বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করিবেন।

৩। ১৯৪৮-এর প্রথম সপ্তাহে পূর্বপাকিস্তান সরকারের ব্যবস্থাপক সভায় বেসরকারি আলোচনার জন্য যে দিন নির্ধারিত হইয়াছে সেই দিন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করবার জন্য পাকিস্তান গণপরিষদে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পরীক্ষা দিতে উর্দুর সমমর্যাদা দানের জন্য একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে।

৪। এপ্রিল মাসে ব্যবস্থাপক সভায় এই মর্মে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে যে, প্রদেশের সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজি উঠিয়া যাওয়ার পরই বাংলা তাহার স্থলে সরকারি ভাষা রূপে স্বীকৃত হইবে। ইহা ছাড়া শিক্ষার মাধ্যমও হইবে বাংলা। তবে সাধারণভাবে স্কুল, কলেজগুলোতে অধিকাংশ ছাত্রের মাতৃভাষার মাধ্যমেই শিক্ষাদান করা হইবে। ব্যবস্থা

৫। আন্দোলনে যাহারা অংশগ্রহণ করিয়াছেন তাহাদের কাহারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে না।

৬। সংবাদপত্রের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হইবে।

৭। ২৯ ফেব্রুয়ারি হইতে পূর্বপাকিস্তান যে সকল স্থানে ভাষা আন্দোলনের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হইয়াছে সেখান হইতে তাহা প্রত্যাহার করা হইবে।

৮। সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনার পর আমি এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হইয়াছি যে, এই আন্দোলন রাষ্ট্রের দুশমন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় নাই।

খাজা নাজিমউদ্দিন আলোচনা সভায় স্বীকার করেন যে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কোনো স্বদেশ বিরোধী চক্রান্ত নয়। আন্দোলনকারীদের দাবি যথার্থ। তিনি উক্ত চুক্তিনামায় নিজ হাতে লেখেন যে, He was satisfied that the movement was not inspired by enemies of the state.

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

Provincial Assembly in Language Movement : Dhirendranath Dutt

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর ডিসেম্বর মাসে করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে পূর্ব বাংলার গণপরিষদ সদস্য কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদে ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির দাবি করেন। এ প্রস্তাব একজন হিন্দু সদস্যের নিকট থেকে আসে তাই মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পান। তারা এই প্রস্তাবকে দেশের সংহতি ও অখণ্ডতা বিনষ্টের প্রয়াস বলে মন্তব্য করেন। বির্তকের পর ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আনীত প্রস্তাবে ভোট দেওয়া হয়। পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগ দলীয় বাঙালি মুসলমান সদস্যগণ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেন। স্বাভাবিকভাবেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব অগ্রাহ্য হয়।

দাবি অগ্রাহ্য হলে ১১ মার্চ, ১৯৪৮ পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মঘট পালিত হয়। সর্বত্র বিক্ষোভ, শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২০০ জন আহত এবং ৬৯ জন বন্দী হয়। এ প্রস্তাব প্রসঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বলেন, "পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা এবং একটি সাধারণ ভাষার মাধ্যমে ঐক্যসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা থেকে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য।" তিনি আরও বলেন যে, উপমহাদেশের কোটি কোটি মুসলমানদের দাবির ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছে। পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র। তাই পাকিস্তানের ভাষা মুসলমানদের ভাষা। উর্দু ভাষা হওয়া উচিত, অন্য কোনো ভাষা নয়।

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

Movement of 1948 : Role of General Masses and Students

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বললেন, 'Urdu and only urdu shall the state language of Pakistan' (উর্দু এবং শুধু উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা)। উভয় ক্ষেত্রে ছাত্ররা 'না, না' বলে প্রতিবাদ জানায়। উল্লেখ্য যে, তখন পাকিস্তানের ৫৬% লোকের মাতৃভাষা বাংলা, উর্দু কোনো অঞ্চলেরই মাতৃভাষা ছিল না। নিচে একটি ছকের মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষার শতকরা হার দেখানো হলো-

ভাষাশতকরা হার
বাংলা৫৬.৪০%
পাঞ্জাবি২৮.৫৫%
সিন্দি৫.৪৭%
পশতু৩.৪৮%
উর্দু৩.২৭%
বেলুচি১.২৯%
ইংরেজি০.০২%
অন্যান্য১.৫২%

মাত্র ৪% লোকের ভাষা ছিল উর্দু। গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী একটি দেশের রাষ্ট্রভাষা হবে সেটি যে ভাষায় বেশি লোক কথা বলে। কিন্তু মি. জিন্নাহ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর কোনো প্রকার শ্রদ্ধা না দেখিয়েই ঘোষণা দিলেন এবং রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনলেন। বস্তুত মি. জিন্নাহ এ সময় বাঙালি বিদ্বেষী পাকিস্তানি আমলাদের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। মি. জিন্নার বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র প্রতিনিধিদের নিকট থেকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বাঙালি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে বাঙালিকে আত্ম পরিচয় থেকে বঞ্চিত করে পাকিস্তানি আজ্ঞাবহ করে রাখার এটাই ছিল প্রথম পদক্ষেপ। ছাত্ররা কিছুতেই এ ষড়যন্ত্র মেনে নিতে পারেনি। ছাত্ররা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে। ২ মার্চ, ১৯৪৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হলে প্রতিষ্ঠিত সর্বদলীয় সংগঠন 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' দুটি দাবির জন্য আন্দোলন চালায়- (১) বাংলা ভাষা হবে পূর্ব বাংলার শিক্ষার বাহন এবং অফিস-আদালতের - ভাষা (২) পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা এবং উর্দু।

১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ইন্তেকাল করেন। তার স্থলে গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন উর্দুভাষী খাজা নাজিমউদ্দিন (১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮)। অত্যন্ত দুর্বল ব্যক্তিত্বহীন খাজা নাজিমউদ্দিনের সমস্যা সমাধান অপেক্ষা সমস্যা সৃষ্টির ব্যাপারে বিশেষ কৃতিত্ব ছিল। তারপরও ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য হওয়ায় সকলেই আশা করছিল যে, খাজা নাজিমউদ্দিন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। ১৯৫০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান গণপরিষদে আলী জিন্নাহর সুর ধরে ঘোষণা দিলেন, 'উর্দুই হবে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা।' এর প্রতিবাদে পূর্ব বাংলা ছাত্র সমাজ প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পরে। ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে, খাজা নাজিম উদ্দীন প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। মার্কিন লেখক তার সম্পর্কে বলেন, "দুর্বল চিত্তের অধিকারী খাজা নাজিমউদ্দিন বাংলার স্বার্থকে তুলে ধরতে ব্যর্থ হন।" তিনি নূরুল আমিনকে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করেন এবং ২ এপ্রিল, ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত উক্ত পদে বহাল থাকেন। পূর্ব বাংলার জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি (১৯৫০) ও ভাষা আন্দোলন তার সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

Language Movement of '52: Role of General Masses and Students in The Movement of 21st February

প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দীন ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় জিন্নাহর ভাষণের পুনরাবৃত্তি করেন 'উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হইবে'। এই ঘোষণা যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-জনতা বারুদের মতো জ্বলে উঠল। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে- ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় বাংলা ভাষার দাবিতে ছাত্র ধর্মঘট, ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সভা, ৪ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল, ধর্মঘট ও ছাত্র বিক্ষোভ প্রদর্শনের তারিখ নির্ধারিত হয়। ভাষা আন্দোলনকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার দাবিতে সারা পূর্ব বাংলায় ধর্মঘট ও শোভাযাত্রার আহ্বান করা হয়। এদিকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন সংগ্রাম পরিষদের যৌথ কর্মসূচিতে বিচলিত হয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ দিনের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেন।

আন্দোলনের কর্মসূচি মোতাবেক ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ছাত্ররা ঢাকায় পিকেটিং শুরু করে। সকাল ৯টায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন চত্বরে সমবেত হতে থাকে। সকাল ১০টায় বটতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে বিরাট জনসভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত হয় এবং ১০ জন করে একটি দল মিছিল করবে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'। হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রথম দলটি মেডিকেল কলেজের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ বাধা দেয়, কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। ছাত্রদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রথমে লাঠিচার্জ, এবং কাদুনে গ্যাস ব্যবহার করে। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে সমবেত হয়ে গণপরিষদের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে পুলিশ মিছিলের ওপর গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে আবদুস সালাম, আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার ঘটনা স্থলে শহিদ হন। এভাবেই রক্তঝরা একুশের সৃষ্টি হয়। সে সময় গণপরিষদের অধিবেশন চলছিল। গুলির খবর পেয়ে আবদুর রশিদ তর্কবাগীশসহ কয়েকজন সদস্য অধিবেশন ত্যাগ করে ঘটনাস্থলে চলে আসেন। এ সময় কারারুদ্ধ শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দিন আহমেদ ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে কারা অভ্যন্তরে অনশন পালন করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি হরতাল আহ্বান করা হয় এবং ৩০ হাজার লোকের অংশগ্রহণে মেডিকেল হোস্টেলে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর পরেই গণবিক্ষোভে সারা শহর তপ্ত হয়ে ওঠে। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্ত শহিদ মিনার তৈরি করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি শহিদ শফিউর রহমানের পিতা প্রথম শহিদ মিনার উদ্বোধন করেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি অনশনের কারণে বাধ্য হয়ে ফরিদপুর জেল থেকে শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান মুসলিম লীগ ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কর্তৃক যৌথ বিবৃতিতে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিশ্রুতি দেন। রক্তঝরা ২১ ফেব্রুয়ারি যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করেছিল তার ওপর নতি স্বীকার করে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ৯ মে, ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের গণপরিষদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে পাকিস্তানেরl

দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়। সংবিধানের ২১৪ (১) অধ্যায়ে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে লেখা হয়- 214 (1) The state language of Pakistan Shall be Urdu and Bengali (২১৪(১) উর্দু এবং বাংলা হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা)। ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬ সালে সরকারিভাবে প্রথম শহিদ দিবস পালিত হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারির দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়, যা আজও চলমান।

ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য (Significance of language movement)

বাঙালি জাতীয়তাবোধ জাগরণে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য অপরিসীম। আন্দোলন করে কিভাবে ন্যায্য অধিকার ছিনিয়ে আনতে হয় তার শিক্ষা দিয়েছে '১৯৫২'। নিম্নে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য উল্লেখ করা হলো:

১। এ আন্দোলন শুধু ভাষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবেই বিবেচিত হয় না, বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের পথিকৃৎ হিসেবেও বিবেচিত হয়।

২। একুশের ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বাঙালিরা সর্বপ্রথম নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।

৩। একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশের প্রথম গণসচেতনতা এবং পরবর্তীকালে শাসকচক্রের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।

৪। ভাষা আন্দোলনের মধ্যে বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ সুপ্ত ছিল।

৫। ১৯৫৬ ও ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের সংবিধানে বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম ভাষার মর্যাদা লাভ করার পর থেকে এর উন্নয়নের জন্য বাংলা একাডেমি, বাংলা উন্নয়ন বোর্ড ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়।

৬। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র এঁটেছিল তা ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে রুখে দিয়েছিল বলেই পরবর্তীতে অন্যান্য অনেক ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা বাঙালিদের পক্ষে সম্ভব হয়।

৭। একুশের রক্তদানের ফলে যে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকশিত হয় তা থেকেই জন্ম নেয় একুশ দফার দাবি। একুশের প্রতীক 'একুশ দফা' প্রণয়ন করে প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী বাঙালি নেতৃবৃন্দ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে।

৮। ৫২ যে আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিল ৭১-এর স্বাধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে তা সমাপ্তি রচিত হয়। ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে আন্দোলনের প্রেরণা যুগিয়েছিল ভাষা আন্দোলন। ভাষার জন্য জীবনদানের ইতিহাস বিশ্বে বিরল।

৯। মাতৃভাষা রক্ষার জন্য বাঙালিরা জীবন দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সে কারণেই জাতীয় সীমানা পেরিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করেছে।

১০। ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ ও দায়িত্ববোধের প্রকৃত নিদর্শনের প্রতি সম্মান ও স্বীকৃতি জানাতে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে ইউনেস্কো।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব (Importance of language movement is the development of bengalee nationalism)

১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলন পূর্বপাকিস্তানের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অবহেলা ও বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে এটি ছিল বাঙালি জাতির প্রথম প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রেরণা; জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের মাইল ফলক। বস্তুত ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলে। ভাষা আন্দোলনের সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নও জড়িয়ে পড়ে। যেমন কেন্দ্রীয় গণপরিষদে পূর্বপাকিস্তানের জনসংখ্যানুপাতিক আসন সংখ্যা দাবি করা হয়। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন দাবি করা হয়, কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে বাঙালিদেরকে অধিক সংখ্যায় নিয়োগের দাবি উচ্চারিত হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান ঘটানোর দাবি করা হয়। বাংলা ভাষার প্রশ্নে মুসলিম লীগের বৈরী মনোভাবের কারণে এই দল থেকে গণতন্ত্রী দল, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ প্রভৃতি নতুন দলের সৃষ্টি হওয়ায় পূর্ববাংলায় মুসলিম লীগের প্রাধান্য ক্ষুণ্ণ হয়। ফলে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে এই দলের চরম ভরাডুবি হয়।

ভাষা আন্দোলন প্রথম পর্যায়ে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল। কিন্তু কালক্রমে এটি রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে। অনেক রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদ এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ফলে পূর্ববাংলার স্বাধিকারের চিন্তা-চেতনা শুরু হয়। পরবর্তী আন্দোলনসমূহে ভাষা আন্দোলন প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ভাষা আন্দোলন একধরনের প্রাদেশিকতাবাদের জন্ম দেয়। ভাষা আন্দোলন জাতীয় জাগরণের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় ও উপনিবেশ থেকে মুক্তির সূচনা ঘটায়। জাতিকে সকল কর্মকাণ্ডে ঐক্যবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করে। যখনই পূর্ববাংলার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো দাবি উচ্চারণ করা হয়েছে তখনই পূর্ববাংলাবাসীর সমর্থন অর্জন করেছে।

ভাষা আন্দোলন ছাত্রসমাজকে প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক শক্তিতে রূপায়িত করে। ছাত্ররা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্র রাজনীতি শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনের মাত্র দুমাসের মধ্যে পূর্ববাংলায় ছাত্র ইউনিয়ন নামে ছাত্র সংগঠন জন্মলাভ করে। পরবর্তী আন্দোলনসমূহে তাই দেখা যায় ছাত্রসমাজই ছিল মূল চালিকাশক্তি। যেকোনো সরকারের যেকোনো অন্যায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ উচ্চারণ করে ছাত্রসমাজ। ভাষা আন্দোলন ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক, কর্মচারী প্রভৃতি সকল পেশার লোকদের মধ্যে ঐক্যের যে ঐতিহ্য সৃষ্টি করে, পরবর্তী আন্দোলনসমূহে আমরা তাঁর পুনরাবৃত্তি অবলোকন করি।

ভাষা আন্দোলনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এই যে এর সাথে জড়িত নেতৃবৃন্দ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবর্তন করেন। ফলে পূর্ববাংলার হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। আওয়ামী মুসলিম লীগ নামের দলটি মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ গ্রহণ করে সকল ধর্মের মানুষের নিকট অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। ফলে পরবর্তী আন্দোলনসমূহে নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের হাতেই চলে যায়।

পরিশেষে বলা যায় যে, ভাষা আন্দোলন বাঙালি জনগণের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মাতৃভাষাকে আপন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য এ সময় পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজ জীবন বিলিয়ে দিতেও দ্বিধা করেনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হতেই শাসকদের কাছ হতে পূর্ববাংলার জনগণ কোনো সহানুভূতি পায়নি। তাই হয়েছে প্রতিবাদমুখর; হয়েছে সংঘবদ্ধ। শেষ পর্যন্ত তাদের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে। মায়ের ভাষাকে রক্ষা করেছে বুকের রক্ত দিয়ে। এ ঘটনা পূর্ববাংলার জনগণের মনের শক্তিকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অধিকার আদায়ের সব আন্দোলনে ভাষা আন্দোলন প্রসূত একুশের চেতনা সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। একুশের চেতনায় সংঘবদ্ধ বাঙালি জাতির স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে স্বাধীনতার দাবি অতঃপর মুক্তিযুদ্ধ। এ ধারাবাহিকতায় বীরবাঙালি মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়।

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

Martyrs Language of Movement Introduction and Contribution

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজপথে জীবন উৎসর্গ করে যে সকল বাংলা মায়ের দামাল সূর্য সন্তানরা আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা রক্ষা করেছিলেন তাদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েক জনের জন্ম পরিচয় এবং অবদান তুলে ধরা হলো-

ভাষা শহিদ রফিকউদ্দিন আহমদ (১৯২৬-১৯৫২)

জন্ম পরিচয়: রফিকউদ্দিন আহমদ ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর বলধার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবদুল লতিফ ছিলেন ঢাকার বাদামতলীস্থ কমার্শিয়াল প্রেসের মালিক। মাতা রাফিজা খাতুন গৃহিণী। রফিকউদ্দিন মানিকগঞ্জের 'বয়রা স্কুল' থেকে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাট্রিক পাস করে মানিকগঞ্জের 'দেবেন্দ্র কলেজে' ভর্তি হন। এ সময় তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রেস পরিচালনার দায়িত্ব নেন। তিনি পুনরায় পড়ালেখার জন্য জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। তখন তার বয়স ২৬ বছর।

যেভাবে শহিদ হলেন ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের আন্দোলনরত ছাত্রদের মধ্যে রফিকও ছিলেন। ছাত্রদের মিছিল ভঙ্গ করার জন্য পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। যে কারণে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ব্যারাকে আশ্রয় নেওয়ার জন্য রওয়ানা হন এ সময় পুলিশের গুলিতে রফিকের মাথার খুলি উড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তিনি মারা যান। মেডিকেল হোস্টেলের ১৭ নম্বর রুমের

পূর্বদিকে তার লাশ পড়েছিল। ছয় সাত জন ধরাধরি করে তার লাশ এনাটামি হলের পেছনের বারান্দায় এনে রাখেন। রাত ৩টায় সামরিক বাহিনীর প্রহরায় প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট ওবায়দুল্লাহর উপস্থিতিতে তার জানাজা পড়ান ঢাকার আজিমপুর মসজিদের ইমাম হাফেজ আবদুল গফুর। সংগোপনে আত্মীয়-স্বজনের অজান্তে আজিমপুর কবরস্থানের অসংরক্ষিত এলাকায় তাকে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। ভাষা শহিদদের মধ্যে তিনি প্রথম শহিদ হন। ১৪ মার্চ ১৯৫২ তারিখের দৈনিক আজাদ - এবং শহিদ দিবস সংখ্যা ১৯৫৪-র সাপ্তাহিক সৈনিক থেকে এ তথ্য জানা যায়। রফিকউদ্দিন আহমদ ও অন্যান্য ভাষা শহিদের আত্মত্যাগের ফলেই বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতি লাভ করে। তার শহিদ স্মৃতি পূর্ববঙ্গবাসীদের মনে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে এবং এ চেতনার ভিত্তিতেই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

ভাষা শহিদ আবুল বরকত (১৯২৭-১৯৫২)

জন্ম পরিচয়: ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে ১৬ জুন মুর্শিদাবাদের অন্তর্গত ভরতপুরের বাবলা গ্রামে আবুল বরকত জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম শামসুজ্জোহা, মাতা হাসিনা বেগম। বরকত তালিবপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে কৃতিত্বের সহিত মেট্রিক এবং বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে কৃতিত্বের সাথে আই. এ. পাস করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে চতুর্থ হয়ে বি.এ. অনার্স পাস করেন। অতঃপর স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে অধ্যয়ন করেন। তিনি ঢাকার পুরানা পল্টন লাইনে "বিষ্ণুপিয়া" ভবনে মামার সাথে মৃত্যুর শেষদিন পর্যন্ত ছিলেন।
তিনি কেবল ছাত্র হিসেবেই ভালো ছিলেন তা নয়; বরং স্বভাব চরিত্র ও ব্যবহার ছিল মার্জিত ও অমায়িক। শহিদ বরকত তমদ্দুন মজলিস কর্তৃক প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিকের মাধ্যমে এ মহান আন্দোলনের প্রেরণা পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। তমদ্দুন মজলিসের বিভিন্ন বৈঠকে তিনি অংশগ্রহণ করতেন। তবে আন্দোলনের কোনো প্রথম সারির নেতা ছিলেন না।

যেভাবে শহিদ হলেন বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২
সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙে বিক্ষোভপ্রদর্শনরত ছাত্রজনতার ওপর পুলিশ গুলি চালালে হোস্টেলের ১২ নম্বর শেডের বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হন আবুল বরকত। ঢাকা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ভর্তি অবস্থায় রাত ৮ ঘটিকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৪ মার্চ ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সরকারি তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, আজিমপুর মসজিদের ইমাম হাফেজ মোহাম্মদ আব্দুল গফুর আবুল বরকতের জানাজা পড়ান। সেই রাতেই তার আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে আজিমপুর গোরস্তানে তার লাশ সমাহিত করা হয়। আবুল বরকত মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শহিদদের অন্যতম একজন হলেন আবুল বরকত। মহান ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার শহিদ বরকতকে (মরণোত্তর) একুশে পদক প্রদান করে।

ভাষা শহিদ শফিউর রহমান (১৯১৮-১৯৫২)

জন্ম পরিচয়: ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কোন্নগরে শফিউর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাহবুবুর রহমান ছিলেন ঢাকার পোস্ট এন্ড টেলিগ্রাফ অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট। তিনি কলকাতা গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজ থেকে আই.কম পাস করে দারিদ্র্যের কারণে চব্বিশ পরগনা সিভিল সাপ্লাই অফিসে কেরানির চাকরি গ্রহণ করেন। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার তাজিমউদ্দিনের কন্যা আকিলা খাতুনের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। দেশবিভাগের পর পিতার সঙ্গে ঢাকায় এসে ঢাকা হাইকোর্টে হিসাবরক্ষণ শাখার কেরানি পদে যোগ দেন।
যেভাবে শহিদ হলেন: ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় নওয়াবপুর রোডে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এবং পূর্বদিনের পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ছাত্রজনতার বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ পুনরায় গুলিবর্ষণ করে। একটি গুলি শফিউরের পিঠে বিদ্ধ হয়। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। তার শরীরে অস্ত্রোপচার সফল না হওয়ায় সন্ধ্যা ৭ ঘটিকায় মৃত্যুবরণ করেন। কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে ঐ দিনই মধ্যরাতে আজিমপুর কবরস্থানে আবুল বরকতের পশ্চিম পাশে তাকে দাফন করা হয়। ১৪ মার্চ ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সরকারি তথ্য বিবরণী অনুযায়ী জানা যায়, প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট ওবায়দুল্লাহর উপস্থিতিতে আজিমপুর মসজিদের ইমাম মাওলানা আবদুল গফুর তাঁর জানাজা পড়ান। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার শফিউর রহমানকে (মরণোত্তর) একুশে পদক প্রদান করে।

ভাষা শহিদ আব্দুল জব্বার (১৯১৯-১৯৫২)

জন্ম পরিচয়: ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলাধীন গফরগাঁও উপজেলার পাচাইয়া গ্রামে আব্দুল জব্বার জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবদুল কাদের একজন কৃষক ছিলেন। স্থানীয় ধোপাঘাট কৃষিবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছুকাল অধ্যয়নের পর দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া ত্যাগ করে পিতাকে কৃষিকাজে সাহায্য করেন। ১৫ বছর বয়সে সকলের অজান্তে গৃহত্যাগ করে নারায়ণগঞ্জের জাহাজ ঘাটে এক ইংরেজ সাহেবের সহযোগিতায় একটি চাকরি নিয়ে বার্মায় চলে যান। সেখানে ১২ বছর অবস্থান করে দেশে ফেরেন।

যেভাবে শহিদ হলেন ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এসে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্রাবাসে গফরগাঁও নিবাসী হুরমত আলীর রুমে (২০/৮) ওঠেন। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনরত ছাত্রদের সাথে তিনি যোগ দেন। এ সময় পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে আব্দুল জব্বার আহত হন। ছাত্ররা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মহান ভাষা আন্দোলনে অনবদ্য ভূমিকার জন্য আব্দুল জব্বারকে বাংলাদেশ সরকার ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করেন।

ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শহিদ হলেন আবদুল জব্বার। তার আত্মাহুতিতে বাঙালিদের জাতীয় চেতনা ও দেশাত্মবোধ জাগ্রত হয়। এ চেতনার বলেই ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাঙালিরা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

ভাষা শহিদ আব্দুস সালাম (১৯২৫-১৯৫২)

জন্ম পরিচয়: ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া উপজেলার লক্ষ্মণপুর গ্রামে আব্দুস সালাম জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোহাম্মাদ ফাজিল মিয়া। আব্দুস সালাম কর্মজীবনে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সচিবালয়ের 'পিয়ন' হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঢাকার নীলক্ষেত ব্যারাকের ৩৬ বি নং কোয়ার্টারে ছিল তার বাস।
যেভাবে শহিদ হলেন বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন আব্দুস সালাম। ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ এলোপাতাড়িভাবে গুলি চালালে আব্দুস সালাম গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। দেড় মাস জীবনের সাথে সংগ্রাম করে ৭ এপ্রিল, ১৯৫২ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মহান ভাষা আন্দোলনে অনবদ্য ভূমিকার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করেন। ফেনী স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে ভাষা শহিদ সালাম স্টেডিয়াম রাখা হয়। দাগনভূঁইয়া উপজেলা মিলনায়তনের নাম পরিবর্তন করে ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে 'ভাষা শহিদ সালাম মিলনায়তন' রাখা হয়। তার নিজ গ্রাম লক্ষ্মণপুরের নাম পরিবর্তন করে 'সালাম নগর' রাখা হয়।

মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শহিদ আবদুস সালাম। তাঁর শহিদ স্মৃতি উত্তরকালে বাঙালির জাতীয় চেতনা ও দেশপ্রেম জাগ্রতকরণে দিশারি হিসেবে ভূমিকা পালন করে। এই চেতনার বলেই ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাঙালিরা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

ভাষা শহিদ অহিউল্লাহ (১৯৪৪-১৯৫২)

জন্ম পরিচয়: শিশু ভাষা শহিদ অহিউল্লাহ ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমান। ১৯৫২ সালে অহিউল্লাহ তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তেন। তখন তার বয়স মাত্র ৮ বছর। এই বয়সেই তিনি শহিদ হলেন।
যেভাবে শহিদ হলেন: ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নবাবপুর রোডে অনেক সৈন্য মোতায়েন ছিল। মূলত ২১ ফেব্রুয়ারি ঘটনার পর সরকার এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিল। অহিউল্লাহ মনের আনন্দে নবাবপুর রোডের পার্শ্বে খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে কাগজ চিবুচ্ছিল। আসলে গুলির শব্দ শুনে কৌতূহলবশত দেখতে এসেছিল। এ সময় একটি গুলি এসে বিদ্ধ হলে তার মাথার খুলি উড়ে যায়। পুলিশ অহিউল্লাহর লাশ গুম করে ফেলে। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় তার শাহাদতের খবর ছাপানো হয়। লাশ গুম করার কারণে কোথায় তাকে দাফন করা হয়েছে তা আজও জানা যায়নি। ভাষা আন্দোলনের মুখপাত্র সাপ্তাহিক সৈনিকের শহিদ দিবস সংখ্যায় ১৯৫৪ এর বর্ণনা মতে, শহিদ হওয়ার পর অহিউল্লাহর পকেটে একটুকরা কাগজ পাওয়া গিয়েছিলো। এতে খুব সুন্দর শৈল্পিক গুণসহ জীব-জন্তুর ছবি আঁকা ছিল। এ আঁকা থেকে প্রমাণ মেলে ভাষা শহিদ এ ছোট শিশুটি একাজে পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু একটি বুলেট তার সমস্ত সম্ভাবনা মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নিয়ে গেল।

ভাষা আন্দোলনে শহিদদের অবদান

বাঙালি জাতির জীবনে ভাষা শহিদদের অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে ভাষা শহিদদের আত্মদানের ফলে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়। ভাষা আন্দোলনের শহিদের স্মৃতি উত্তরকালে বাঙালির জাতীয় চেতনা ও দেশাত্মবোধ জাগ্রতকরণে দিশারি হিসেবে ভূমিকা পালন করে। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত আন্দোলন সংগ্রাম প্রতিটি স্তরে প্রেরণা যুগিয়েছিল ভাষা সৈনিকদের আত্মত্যাগ। ভাষা সৈনিকদের চেতনার বলেই ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাঙালিরা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। সুতরাং বাঙালি জাতি হিসেবে নিজেদেরকে বিশ্বের বুকে পরিচয় দিতে এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভাষা শহিদদের অবদান বাংলার ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে।

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

The Role of Women's in Language Movement

বাঙালির অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সকল আন্দোলন-সংগ্রামে নারী সমাজের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। ভাষা আন্দোলনেও তার ব্যতিক্রম নয়। পঞ্চাশের দশকে রক্ষণশীল সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তারা বিক্ষোভ মিছিল এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সমাবেশস্থলে যোগ দেন। আহত ছাত্রদের চিকিৎসার জন্য চাঁদা সংগ্রহ, পুলিশ নির্যাতন থেকে ছাত্রদের রক্ষা করতে লুকিয়ে রাখা, কখনো বন্দী ছাত্রদের জন্য খাবার সংগ্রহে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।

ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের সঠিক তথ্য না থাকলেও যে সকল তথ্য রয়েছে তাতে তাদের ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত নারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কবি সুফিয়া কামাল, নাদেরা বেগম (মুনির চৌধুরীর বোন যিনি কারাগারে পুলিশের কঠোর নির্যাতন ও অত্যাচারের স্বীকার হন), বেগম আনোয়ারা খাতুন (পূর্ববঙ্গের আইন পরিষদের সদস্য), লীলা রায় (জয়শ্রী সম্পাদিকা), অধ্যাপিকা সামসুন্নাহার, সৈয়দা সাহেরা ভানু (সিলেট জেলা মহিলা মুসলিম লীগের সহ সভানেত্রী), সৈয়দা লুৎফুন্নেসা (সিলেট জেলা মহিলা মুসলিম লীগের সম্পাদিকা), রাবেয়া খাতুন, জাহানারা মতিন, রোকেয়া বেগম, হামিদা রহমান, হালিমা খাতুন, হোসনেয়ারা নীরু, ড. সুফিয়া আহমদ প্রমুখ।

ড. সুফিয়া আহমেদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে গঠিত হয় 'সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ'। ২১ ফেব্রুয়ারি তার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল আনন্দময়ী ও বাংলাবাজার স্কুলের মেয়েদের জড়ো করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় নিয়ে আসা। সিদ্ধান্ত হয়েছিল ছেলেদের ১০ জন করে এবং মেয়েদের ৪ জন করে বের হয়ে পুলিশের ব্যারিকেড পার হয়ে এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, প্রথম ২টি দল মিছিল নিয়ে বের হলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে ট্রাকে তোলে। তৃতীয় দল নিয়ে বের হয় মেয়েরা, কিন্তু পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসে অনেকেই আহত হন। ড. হালিমা খাতুনের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, তার ওপর দায়িত্ব ছিল মুসলিম গার্লস স্কুল এবং বাংলাবাজার গার্লস স্কুল থেকে মেয়েদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আসা। মেয়েদের দল বের হলে পুলিশ তা ছত্রভঙ্গ করার জন্য লাঠিচার্জ করে। তারা দমে না গিয়ে গণপরিষদ ভবনের দিকে এগোতে থাকলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে রফিক নিহত হয়। রওশন আরা স্মৃতিচারণে জানা যায়, পুলিশের লাঠিচার্জে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন।

ঢাকার বাইরে নবাবগঞ্জের মডার্ন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম ৩০০ ছাত্রী নিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মিছিল করেছিলেন। এভাবে ভাষা আন্দোলনে বিভিন্ন অঙ্গনে নারীরা অবদান রেখে নারী সমাজের মর্যাদা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। ভাষা আন্দোলনে অবরোধ এবং জীবন বিসর্জন শুধুমাত্র ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এ আন্দোলন হয়েছিল দেশব্যাপী। ঢাকার বাইরে রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, যশোর, রংপুর, বরিশাল, কুমিল্লা, জামালপুর, ময়মনসিংহ এবং সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন শহর-বন্দরে ছাত্র, যুবক সহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ বাংলা ভাষার দাবিতে একাত্মতা ঘোষণা করে।

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

Regional History of Language Movement

ভাষা আন্দোলন বিশ্বের এক নজিরবিহীন ঘটনা। পৃথিবীতে এমন একটিও দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে দেশের মানুষ মায়ের ভাষার জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছে। একমাত্র বাংলাদেশেই মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। বাঙালি জাতিসত্তার মূলভিত্তি হচ্ছে ভাষা আন্দোলন। বায়ান্নোর পথ ধরে চুয়ান্নোর সাধারণ নির্বাচন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তর সালের জাতীয় নির্বাচন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি ধাপে ধাপে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের অনুপ্রেরণা। একুশ শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। তাই একুশ মানে অহংকার, একুশ মানে প্রেরণা, একুশ মানে মাথা নত না করা।.

২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালালে শহিদ হন সালাম, রফিক, শফিক, বরকত, জব্বার আরও অনেকে। পুলিশের গুলিতে ছাত্র হত্যার সংবাদ বাংলার শহর-গ্রাম-গঞ্জে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন স্থানে জনসাধারণের বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে। গ্রামের সাধারণ মানুষ, ছাত্ররা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে থাকে। শ্রমজীবী মানুষও ঘরে বসে থাকেনি। ছাত্র হত্যার বিচারের দাবি গণ দাবিতে পরিণত হয়। ঢাকার বাইরে রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, যশোর, রংপুর, বরিশাল, কুমিল্লা, জামালপুর, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন শহরে-বন্দরে ছাত্র, যুবক, সাধারণ মানুষ ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ এবং মাতৃভাষার দাবিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে এবং আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এখানে অতি সংক্ষেপে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল তার বর্ণনা দেওয়া হলো:

১. চট্টগ্রাম অঞ্চল: তমদ্দুন মজলিশ, চট্টগ্রাম শাখা ভাষা-আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। গ্রাম-গঞ্জে তখন তমদ্দুন মজলিশের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। মোমিন রোডস্থ চট্টগ্রাম শাখার তমদ্দুন মজলিশ অফিসে সে সময় প্রায়ই সভা হতো।
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি আন্দরকিল্লাস্থ তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগ অফিসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আহ্বায়ক হন সাহিত্যিক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী এবং যুগ্ম আহ্বায়ক হন আজিজুর রহমান। আন্দোলন শুরুর সময় মাহবুব-উল-আলম অসুস্থ থাকলে আজিজুর রহমান ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। সকল শ্রেণি ও পেশাজীবী সংগঠন, কৃষক-শ্রমিক সংগঠন, আওয়ামী মুসলিম লীগ ও তমদ্দুন মজলিশের প্রতিনিধিদের এ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংগ্রাম পরিষদের অন্যদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিলেন জহুর আহমেদ চৌধুরী, মোজাফফর আহমদ, ডা.

আনোয়ার হোসেন, চৌধুরী হারুন-অর-রশিদ, হাবিব উল্লা, নুরুজ্জামান, কৃষ্ণগোপাল সেন গুপ্ত, শামসুদ্দিন আহমদ, মফিজুল ইসলাম, রুহুল আমিন নিজামী, ফরিদ আহমদ, ইয়াহিয়াহ খালেদ, এম.এ মান্নান, এমদাদুল ইসলাম, আবু জাফর, ডা. সাইদুর রহমান প্রমুখ।

পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ২১ ফেব্রুয়ারি দেশের অন্যান্য জেলার মতো সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে চট্টগ্রামে সর্বত্র হরতাল, মিটিং, মিছিল এবং লালদীঘি ময়দানে জনসভা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পোস্টার লাগানো হয়। পাড়ায়, মহল্লায়, ক্লাব ও সংগঠনগুলোতে হরতাল সফল করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচির মধ্যে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ও আরবি হরফে বাংলা প্রবর্তনের প্রচেষ্টার প্রতিবাদে ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ণহরতাল পালিত হয়। চট্টগ্রামবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতালে অংশগ্রহণ করে। পুলিশের বাধাকে উপেক্ষা করে জনগণ হরতাল পালনে এগিয়ে আসে।

২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ছাত্র হত্যার সংবাদ ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে পৌঁছলে চট্টগ্রামের মানুষ ক্ষোভে ফেঁটে পড়ে এবং রাস্তায় নেমে আসে। বিকাল বেলা লালদীঘি ময়দান লোকপূর্ণ হয়ে যায়। এ সময় গণপরিষদের সদস্য এ কে খান জনতার চাপে বলতে বাধ্য হন যে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে না পারলে তিনি গণপরিষদ থেকে পদত্যাগ করবেন। এসময় ঢাকার ছাত্র হত্যার সংবাদ শুনে তরুণ সাহিত্যিক এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী অসুস্থ অবস্থায় লিখলেন তার বিখ্যাত কবিতা "কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি"। এটিই ভাষা আন্দোলনের ওপর লিখিত প্রথম কবিতা। কবিতাটি ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টায় লালদীঘি ময়দানের জনসভায় হারুন-অর-রশীদ পাঠ করেন। কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেস থেকে কবিতাটি ছাপানোর ব্যবস্থা করা হলে পাকিস্তান সরকার প্রেসটি বাজেয়াপ্ত করে। প্রেসের ম্যানেজার দবির আহমদকে গ্রেফতার করা হয়। একই সাথে কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী, চৌধুরী হারুন-অর-রশিদ এবং কামাল উদ্দিন আহমদ খানের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। এ মামলা ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। বিচারে প্রেসের ম্যানেজার দবির আহমদকে ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এভাবে দেখা যায় চট্টগ্রাম অঞ্চল বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পৃক্ত হয়ে ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে।

২. রাজশাহী অঞ্চল: রাজশাহী অঞ্চলও ঢাকার আন্দোলনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ১৯৪৮
খ্রিষ্টাব্দ থেকেই এ কর্মসূচি পালন শুরু হয়। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার প্রতিবাদ দিবস ঘোষণা করা হলে তার অংশ হিসেবে ১০ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর ভুবন মোহন পার্কে জনসভার আহ্বান করা হয়। জনাব মোহাম্মদ আনসার আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ জনসভায় বক্তৃতা করেন ক্যাপ্টেন (অব.) শামসুল হক, মোসাদ্দারুল হক প্রমুখ। এ জনসভার ২ দিন পর অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ মোহাম্মদ আনসার আলীর নেতৃত্বে রাজশাহীতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। মোহাম্মদ আনসার আলী ছিলেন তমদ্দুন মজলিশের নেতা। তাঁর বাড়ি নওগাঁ জেলায় হওয়ায় তিনি রাজশাহী ও নওগা জেলায় ভাষা আন্দোলন জোরদার করেন। এজন্য তাকে কারাভোগ করতে হয়।

রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলননের কেন্দ্র ছিল রাজশাহী কলেজ। এ কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক বিভিন্নভাবে ভাষা আন্দোলনে সহযোগিতা করেন। এদের মধ্যে বাংলা বিভাগে মুহাম্মদ আবদুল হাই (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন), ড. মুহাম্মদ এনামুল হক (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন) এবং আরবি-ফারসি বিভাগের ড. গোলাম মকসুদ হিলালী প্রমুখ অন্যতম।

১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে সারা দিনব্যাপী হরতাল এবং বিকেলে ভুবন মোহন পার্কে জনসভা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী শাখায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ভুবন মোহন পার্কে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। একই দিনে হরতাল, মিছিল এবং জনসভা হয়। রাজশাহীর নিবিড় গ্রামেও ভাষা আন্দোলনের প্রভাব লক্ষ করা যায়।

৩. খুলনা অঞ্চল: ভাষা আন্দোলনের প্রভাব খুলনা অঞ্চলেও পরিলক্ষিত হয়। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে উত্থাপিত ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দাবি অগ্রাহ্য হলে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি খুলনার দৌলতপুর কলেজে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা আবদুল হামিদ এতে সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য রাখেন, আমজাদ হোসেন মনসুর আলী, জগদীশ বসু প্রমুখ ছাত্র নেতারা। এসময় খাজা নাজিমুদ্দিনের নিন্দা এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার অপরাধে ১০ মার্চ ১৯৪৮ পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। তার মধ্যে শৈলেশ ঘোষ, স্বদেশ বোস, মন্তোষ গুপ্ত, ধনঞ্জয় দাস, তাহমীদ উদ্দীন উল্লেখযোগ্য।
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচিকে সফল করতে খুলনার ভাষা কর্মীরা ২০ ফেব্রুয়ারি রাতের আধারে কে.ডি ঘোষ রোড, যশোর রোড সহ শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগায়। ২১ ফেব্রুয়ারি নেতৃবৃন্দ স্কুলে স্কুলে গিয়ে ছাত্রদের ক্লাস বর্জনের আহ্বান জানান। ২১ ফেব্রুয়ারির ছাত্র হত্যার সংবাদ খুলনাবাসীরা জানতে পারে ২২ ফেব্রুয়ারি। এ সংবাদে খুলনায় ভাষা আন্দোলনের নতুন মাত্রা যোগ হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে খুলনায় শান্তিপূর্ণ সফল হরতাল পালিত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি জনসভা অনুষ্ঠিত হয় দৌলতপুর বাজারে। এ সভার সভাপতিত্ব করেন আমজাদ হোসেন। মিউনিসিপ্যাল পার্কে অনুষ্ঠিত অপর এক জনসভায় প্রায় দশ হাজার লোক যোগদান করে। স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির সফল নেতৃত্ব এবং আন্তরিক উদ্যোগে ৫ মার্চ খুলনা শহর ও শহরতলিতে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। এভাবে খুলনা অঞ্চল ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখে।

৪. বরিশাল অঞ্চল: ইতিহাসে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে বরিশাল অঞ্চল এগিয়ে আসতে দেখা যায়। ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে অর্থাৎ ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকেই তমদ্দুন মজলিশ ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ যুক্ত কমিটির আহ্বানে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু করে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে বরিশাল মুসলিম ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে ছদরুদ্দীনের সভাপতিত্বে ভাষাকে কেন্দ্র করে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আখতার উদ্দীন আহমদ, এম ডব্লিউ লফিতুল্লাহ প্রমুখ এতে বক্তব্য রাখেন। সভা শেষে একটি মিছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে স্লোগান দিয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। ২৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বরিশাল টাউন হলে হাশেম আলী খাঁর সভাপতিত্বে অপর একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। (সূত্র: দৈনিক আজাদ: ৫ মার্চ ১৯৪৮]১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষার দাবিতে দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেওয়া হয়। তারই অংশ হিসেবে ঐ দিন বরিশালের স্কুল ও কলেজে ধর্মঘট পালিত হয়। বরিশালের মুসলিম ছাত্রলীগ এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। এ আন্দোলনের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন কাজী বাহাউদ্দীন আহমদ। ঐ দিন অর্থাৎ ১১ মার্চ বরিশালের সকল সভাস্থল বন্ধ করে দেওয়া হলে কোথাও সভা করার জায়গা পাওয়া যায়নি। অবশেষে শহরে ফকির বাড়ি রাস্তার পাশে সভার আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যার পর পুলিশ কাজী বাহাউদ্দীন আহমদ, শামসুল হক চৌধুরী, আঃ রশিদ, মোহাম্মদ আর্শেদ ও এ.বি.এম *আশরাফ আলী খানকে গ্রেফতার করে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যায়। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র-জনতা থানা ঘিরে ফেলে। বাধ্য হয়ে পুলিশ প্রশাসন গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দেয়।

১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এতে সভাপতি হন আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি আবদুল মালেক খান। তিনি যুবলীগ সম্পাদক আবুল হাশেমকে আহ্বায়ক করে ২৫ জন সদস্য সংগ্রাম পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করেন। বরিশালের ভাষা আন্দোলনের অন্যান্য সংগ্রামী নেতাদের মধ্যে ছিলেন আলী আশরাফ, মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দীন আহমদ প্রমুখ। বরিশালের ভাষা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল বি.এম কলেজের ছাত্র/ছাত্রী বৃন্দ। তাঁরা পৃথক রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলন চালায়। বি.এম. কলেজ শাখার সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন কলেজের তৎকালীন ভি.পি. সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া। ঢাকার আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর বরিশালে সকল বিদ্যালয় ও শহরে হরতাল পালিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার সংবাদ বরিশালে পৌঁছালে বরিশালবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ছাত্রদের সাথে সাধারণ মানুষ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। রাত ৯টায় শহরে মিছিল হয়। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি বরিশালে হরতাল ও মিছিল হয়। এ.কে স্কুল ও বি.এম কলেজের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে মিছিলসহ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। তারা অশ্বিনী কুমার টাউন হল চত্বরে সমবেত হয়। এ.কে.এম আজহার উদ্দিনের সভাপতিত্বে এক শোক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ টায় এ.কে. স্কুল মাঠে শহিদ ছাত্রদের গায়েবোনা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা অশ্বিনী কুমার টাউন হলের সামনে শহিদ মিনার নির্মাণ করে। শহিদ মিনারে শোকের প্রতীক কালো পতাকা এবং সংগ্রামের প্রতীক লাল পতাকা উত্তোলন করে। -এভাবে বরিশাল অঞ্চলকে ভাষা আন্দোলনের সকল স্তরে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়।

৫. সিলেট অঞ্চল: পত্র-পত্রিকায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির মধ্য দিয়ে সিলেট ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের আল-ইসলাহর আগস্ট সংখ্যায় সম্পাদকীয় লেখা হয়, বাংলা ভিন্ন অন্য কোনো ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। এর পর থেকেই সিলেটের মাসিক আল-ইসলাহ এবং সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় ভাষা আন্দোলনের ওপর সংবাদ কখনো আবার প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকে। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ নভেম্বর সিলেটের মাদ্রাসা হলে মতিন উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল "পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু হওয়া উচিত"। প্রধান আলোচক ছিলেন ড. সৈয়দ মুজতবা আলী। সমাবেশে হাজার হাজার লোক অংশগ্রহণ করে। অনুষ্ঠান শুরুর এক পর্যায় মুসলিম লীগের কর্মীরা আক্রমণ চালিয়ে সভা বন্ধ করে দেয়। ফলে ড. সৈয়দ মুজতবা আলী তার বক্তব্য উত্থাপন করতে পারেননি। পরে কলকাতার চতুরঙ্গ ও সিলেটের আল-ইসলাহ পত্রিকায় তাঁর বক্তব্যটি প্রকাশিত হয়। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে সরকারের সাথে ড. সৈয়দ মুজতবা আলীর মতবিরোধ ঘটে এবং তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এরপর ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সিলেট অঞ্চল অনেক কর্মসূচি পালন করে। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে পীর হাবিবুর রহমানকে আহ্বায়ক করে সিলেটে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ছাত্র হত্যার সংবাদ সন্ধ্যায় সিলেটে পৌঁছলে মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে সিলেটবাসী। ২২ ফেব্রুয়ারি সিলেট শহরে হরতাল পালিত হয়। সমস্ত শহরে পোস্টার লাগানো হয়। হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি নওবেলাল পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা বের করে। এদিন নারী সমাজ প্রতিবাদ সভা করে। বিকেলে জিন্নাহ হলে (বর্তমান শহীদ সুলেমান হল) নারী সমাজের আরও একটি সমাবেশ হয়। সিলেটে ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত লাগাতার সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট শহরের বাইরেও চলতে থাকে বিশেষ করে গোপালগঞ্জ থানায়, বিশ্বনাথ থানায়, ফেঞ্চুগঞ্জ থানায়, বিয়ানী বাজার থানায় স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট হয়।

৬. কুমিল্লা অঞ্চল: ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে গণপরিষদে উত্থাপিত ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দাবি অগ্রাহ্য হয়।
ধীরেন্দ্রনাথ কুমিল্লার সন্তান হওয়ায় এবং ন্যায্য দাবি অগ্রাহ্য হওয়ায় কুমিল্লায়ও ভাষা আন্দোলনের ঢেউ লাগে। ১৯৪৮ এবং ১৯৫২ ভাষা আন্দোলনের সকল পর্বে কুমিল্লার ভূমিকা ছিল অনন্য। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে পুলিশির বর্বরতা ও ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২৩ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা শহরের পূর্ণ দিবস হরতাল পালিত হয়। কুমিল্লা শহর জনশূন্য হয়ে যায়। সমস্ত দোকানপাট বন্ধ থাকে। স্থানীয় টাউন হলের জনসভায় এক নজিরবিহীন জনসমাবেশ ঘটে। কুমিল্লার ইতিহাসে এরকম জনসভা কখনো ঘটেনি।

এভাবে রংপুর, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগা, বগুড়া, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, নাটোর, কুড়িগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, জামালপুর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, পঞ্চগড়, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ অঞ্চলে ঢাকাকে অনুসরণ করে ভাষার দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম সংঘটিত হয়।

ভাষার দাবিতে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আন্দোলন কর্মসূচি এখানে তুলে ধরা হলো:

১. ২২ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত জনসভায় একটি "রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ" গঠিত হয় এবং একই দিনে বিকালে স্থানীয় টাউন হলে জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলার মুসলিম লীগ সভাপতি ফখরুদ্দীন আহমদ। এ সভায় গৃহীত প্রস্তাবে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদসহ প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করা হয়।
২. ২৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলার সর্বত্র ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ছাত্র ধর্মঘট, হরতাল, মিছিল ও জনসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করা হয়।
৩. ২৩ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের জনসভায় ছাত্র হত্যার এবং জনসাধারণের ওপর পুলিশি নির্যাতনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।

৪. যশোর জেলায় শিরোলিস্তান গ্রামে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জনসভায় গৃহীত প্রস্তাবে পুলিশি নির্যাতন এবং ছাত্র হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। এ জনসভা থেকে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। এ জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়।

শহিদ মিনারের ইতিকথা

শহিদ মিনার মহান ভাষা আন্দোলন ও বীর শহিদদের স্মৃতি চিরঅম্লান করে রাখার জন্য এবং বাঙালির প্রতিবাদের গৌরবোজ্জ্বল রক্তাক্ত ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্মের নিকট পৌঁছে দেওয়ার স্মৃতির মিনার। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকারের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে মাতৃভাষা বাংলা রক্ষা করার জন্য যেসকল ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছিলেন এবং যাঁরা জীবন বাজি রেখেছিলেন তাদের স্মৃতি ধরে রাখার উদ্দেশ্যে এবং অধিকার আদায়ে প্রেরণা জোগাতেই শহিদ মিনারের সৃষ্টি।
প্রথম শহিদ মিনার: ২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা মেডিকেল ছাত্র হোস্টেলের বারো নম্বর শেডের পূর্বপ্রান্তে রাতারাতি প্রথম শহিদ মিনার তৈরি করেন। সেখানেই প্রথম শহিদ হয়েছিল রফিক উদ্দিন আহমেদ। শহিদ মিনারটি ছিল ১০ ফুট উঁচু এবং ৬ ফুট চওড়া। এর ডিজাইন করেন ডা. সাইদ হায়দার ও ডা. বদরুল আলম। তদারকিতে ছিলেন মির্জা মাজহারুল ইসলাম ও জি.এস শরফুদ্দিন। মেডিকেল কলেজ সম্প্রসারণের জন্য জমিয়ে রাখা ইট, বালু, সিমেন্ট এ কাজে ব্যবহার হয়। ভোর হওয়ার পর কাপড় দিয়ে মিনারটি ঢেকে দেওয়া হয়।

২৪শে ফেব্রুয়ারি শহিদ শফিউর রহমানের পিতা মাহবুবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে শহিদ মিনারের উদ্বোধন করেন। শহিদ মিনার নির্মাণের খবর দৈনিক সংবাদগুলোতে পাঠানো হয়। "শহিদ বীরের স্মৃতি" শিরোনামে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ছাপা হয় শহিদ মিনারের খবর। ২৬ শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় শহিদ মিনারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। ঐ দিনই পুলিশ ও সেনাবাহিনী মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ঘিরে ফেলে এবং রাতের মধ্যেই প্রথম শহিদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। ২৬ শে ফেব্রুয়ারি প্রথম শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলার প্রতিবাদে কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ রচনা করেন 'স্মৃতিস্তম্ভ' নামে এই কবিতাটি-

স্মৃতিস্তম্ভ

স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো

চারকোটি পরিবার

খাড়া রয়েছি তো। যে-ভিৎ কখনো কোনো রাজন্য

পারেনি ভাঙতে

হীরার মুকুট নীল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার

খুরের ঝটিকা ধূলায় চূর্ণ যে-পদপ্রান্তে

যারা বুনি ধান

গুন টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাপর চালাই

সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য।

ইটের মিনার

ভেঙেছে ভাঙুক। ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার জাগরী

চারকোটি পরিবার

এ- কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,

শিয়রে যাহার ওঠে না কান্না, ঝরে না অশ্রু?

সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং

এ- কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,

বিরহে যেখানে নেই হাহাকার? কেবল সেতার

হয় প্রপাতের মহনীয় ধারা, অনেক কথার

পদাতিক ঋতু কলমেরে দেয় কবিতার কাল?

ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক। একটি মিনার গড়েছি আমরা

চারকোটি কারিগর

বেহালার সুরে, রাঙা হৃদয়ের বর্ণ লেখায়

পলাশের আর

রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়

দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই

শহীদদের নাম

এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়, তোমাদের নাম

তাই আমাদের

হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক

শপথের ভাস্কর।

দ্বিতীয় ধাপে শহিদ মিনার: বায়ান্ন সালে শহিদ মিনার ভাঙার দুই বছর পর ১৯৫৪ সালে একুশের শহিদদের স্মরণে নতুন শহিদ মিনার তৈরি করা হয়।

১৯৫৩ সাল থেকে প্রতিবছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি তারিখে মহান ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। যুক্তফ্রন্ট সরকার ভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মৃতিরক্ষার্থে শহিদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক পার্টির মন্ত্রিসভার পতন ঘটলে ৬ই সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন করে শহিদ মিনারের কাজ শুরু হয় এবং একটানা কাজ চালিয়ে ১৯৫৮ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের ভিত্তি, মঞ্চ এবং তিনটি স্তম্ভ তৈরি সমাপ্ত হয়। কিন্তু ১৯৫৮ সালের মার্চ মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে শিল্পী হামিদুর রহমানকে শহিদ মিনার থেকে বের করে দেওয়া হয়। ফলে থেমে যায় শহিদ মিনারের নির্মাণ কাজ। অতঃপর ঐবছরের ২৭শে অক্টোবর জারি করা হয় সামরিক শাসন। আটান্ন থেকে বাষট্টি পর্যন্ত এই অসমাপ্ত শহিদ মিনারেই জনতা পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহিদদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে এবং সকল প্রকার অন্যায়ের প্রতিবাদের জন্য মিলিত হয়েছে এবং শপথ করেছে। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লে. জেনারেল আজম খান শহিদ মিনার নির্মাণের জন্য একটি কমিটি করে দেন। সেই কমিটি শিল্পী হামিদুর রহমানের সাতান্ন সালের শহিদ মিনারের নকশা সুপারিশ করেন। সেই অনুযায়ী ১৯৬৩ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারির

মধ্যে শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হয় এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি নবনির্মিত এই শহিদ উদ্বোধন করেন শহিদ আবুল বরকতের ৭২ বছরের বয়স্ক মা হাসিনা বেগম। তেষট্টি থেকে একাত্তর এই নয় বছর ঐ শহিদ মিনারই ছিল বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের শপথ গ্রহণের পীঠ স্থান। আর তাই একাত্তরের পঁচিশে মার্চ কালরাতে গণহত্যা চালানোর পরে ২৬শে মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী গোলাবর্ষণ করে শহিদ মিনারটি গুড়িয়ে দেয়।

বিজয় অর্জনের পর ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি আবার শহিদ মিনার নির্মাণ কাজ শুরু করে। উক্ত কমিটি শিল্পী হামিদুর রহমানের পেশকৃত নকশা ও পরিকল্পনাই অনুমোদন করেন, যা ছিল সাতান্ন সালের নকশা ও পরিকল্পনা অনুরূপ। হামিদুর রহমানের নকশায় বর্তমানে শহিদ মিনার তিনস্তর বেদির ওপর মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। ৫টি স্তম্ভের মাঝখানে রয়েছে ঈষৎ অবনত সবচেয়ে বড় একটি স্তম্ভ। এর দুপাশে রয়েছে দুটি করে চারটি স্তম্ভ। মাঝখানের বড় ঈষৎ অবনত স্তম্ভটি স্নেহময়ী মা এবং দুপাশে ছোট স্তম্ভ চারটি সন্তানের প্রতীক হিসেবে শহিদ মিনারকে মনে করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে অবস্থিত শহিদ মিনারটিই বর্তমানে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। অবিকল নকশায় দেশের সকল জেলা শহরে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার রয়েছে। দেশের বাইরে প্রথম শহিদ মিনার নির্মিত হয় জাপানে।

একুশের প্রথম গান ও কবিতা

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একুশ তারিখে ছাত্ররা "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই" স্লোগান দিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে এলে পুলিশ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। এতে বেশ কয়েকজন ছাত্র নিহত ও অনেকে আহত হন। সেসময় ঢাকা কলেজের ছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরী ঢাকা মেডিকেলে যান এবং আউটডোরে তিনি মাথার খুলি উড়ে যাওয়া একটি রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান। লাশটি ছিল রফিক উদ্দীনের। লাশটি দেখে তার মনে হলো এটা যেন তার নিজের ভাইয়ের রক্তমাখা লাশ। তখনই তার মনে একটি গানের প্রথম দুই লাইন জেগে ওঠে, পরে তিনি গানটি শেষ করেন। ভাষা আন্দোলনের প্রথম প্রকাশিত লিফলেট "একটি একুশের গান" শিরোনামে প্রকাশিত হয়। গানটি গাওয়ার অপরাধে ঢাকা কলেজের ১১ জন ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের ঘটনার পর 'একুশ' নিয়ে প্রথম গান রচনা করেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে নগ্ন পায়ে প্রভাতে এই গানটি গেয়ে আমরা শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে থাকি। গানটি হলো-

আমার' ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবৈশেখীরা

শিশু হত্যার বিক্ষোভ আজ কাঁপুক বসুন্ধরা

দেশে সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবি

দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?

না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি

সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে

রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;

পথে পানে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন,

এমন সময় ঝড় এলো এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।

সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা,

তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভাইয়ের চরম ঘৃণা

ওরা গুলি ছোড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবিকে রোখে

ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই বাংলার বুকে

ওরা এদেশের নয়,

দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়

ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।

তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি

আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী

আমার শহিদ ভাইয়ের আত্মা ডাকে

জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাঁকে

দারুন ক্রোধের আগুন আবার জ্বালাবো ফেব্রুয়ারি

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি ।

গানটির প্রথম সুরারোপ করেন আবদুল লতিফ। পরে করাচি থেকে ঢাকায় ফিরে এসে ১৯৫৪ সালে আলতাফ মাহমুদ আবার নতুন করে গানটিতে সুরারোপ করেন। সেই সুরেই গানটি হয়ে গেল একুশের প্রভাতফেরির গান। বর্তমানেও আলতাফ মাহমুদের সুরেই গানটি গাওয়া হয়। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে সংকলনে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। তৎকালীন সরকার গানটি বাজেয়াপ্ত করে। জহির রায়হান তার "জীবন থেকে নেয়া" ছবিতে গানটি ব্যবহারের পর এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

হিসেবে স্বীকৃতি পাবার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই গানটির সুনাম আরও বৃদ্ধি পায়। ইতোমধ্যে গানটি হিন্দি, মালয়, ইংরেজি, ফরাসি, সুইডিশ ও জাপানিসহ ১২টি ভাষায় গাওয়া হয়। বিবিসি শ্রোতা জরিপে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ গানের তালিকায় এই গানটির অবস্থান তৃতীয়।

ভাষা আন্দোলনের স্মরণে ১৯৫৪ সালে আবদুল লতিফ লেখেন "ভাষার গান"। গানটি হচ্ছে-

ওরা আমার মুখের ভাষা

কাইড়া নিতে চায়,

ওরা, কথায় কথায় শিকল পরায়

আমার হাতে পায়।

কইতো যাহা আমার দাদায়,

কইছে তাহা আমার বাবায়

এখন কও দেখি ভাই মোর মুখে কি

অন্য কথা শোভা পায়?

সইমু না আর সইমু না,

অন্য কথা কইমু না,

যায় যদি ভাই দিমু সাধের জান,

ঐ জানের বদলে রাখুম রে ভাই

বাপ-দাদার জবানের মান।

যে শুনাইছে আমার দেশের

গাঁও- গেরামের গান

নানান রঙের নানান রসে ভইরাছে তার প্রাণ।

ঢপ-কীর্তন, ভাসান জারি

গাজীর গীত আর কবি, সারি,

আমার এই বাংলাদেশের বয়াতিরা

নাইচা নাইচা কেমন গায়।

তারই তালে তালে হৈ

ঢোল, করতাল বাজে ঐ

বাঁশি কাঁসি খঞ্জিরি, সানাই

কোথায় গেলে দেখতে পাই।

প্রথম কবিতা

ঢাকার কেন্দ্রীয় আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও চৌধুরী হারুনুর রশিদ এবং এম. এ. আজিজকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে চট্টগ্রামে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক চট্টগ্রামের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হরতাল পালিত হয় ৫২'র ২১শে ফেব্রুয়ারি। ঐ দিন অর্থাৎ ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের সংবাদ চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদের সদস্য খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াছের নিকট পৌঁছে। একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে 'একুশ' নিয়ে প্রথম কবিতা লিখলেন চট্টগ্রাম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী। কবিতার নাম ছিল 'কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি'। কবিতাটির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে।

রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলে

যেখানে আগুনের ফুলকির মতো

এখানে ওখানে জ্বলছে অসংখ্য রক্তের ছোপ

সেখানে আমি কাঁদতে আসিনি l

আজ আমি শোকে বিহ্বল নই

আজ আমি ক্রোধে উন্মত্ত নই

আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল।

যে শিশু আর কোন দিন তার

পিতার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার

সুযোগ পাবে না

যে গৃহবধূ আর কোন দিন তার

স্বামীর প্রতীক্ষায় আঁচলে প্রদীপ

ঢেকে দুয়ারে আর দাঁড়ায়ে থাকবে না

যে জননী খোকা এসছে বলে

উদ্দাম আনন্দে সন্তানকে আর

বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না

যে তরুণ মাটির কোলে লুটিয়ে

পড়ার আগে বার বার একটি

প্রিয়তমার ছবি চোখে আনতে

চেষ্টা করেছিল

সে অসংখ্য ভাই বোনের নামে

আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত

যে ভাষায় আমি মাকে সম্বোধনে অভ্যস্ত

সেই ভাষা ও স্বদেশের নামে

এখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে

আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি

যারা আমার অসংখ্য ভাই বোনকে

নির্বিচারে হত্যা করেছে।

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

একুশের চেতনার দিপশিখা এতটাই উজ্জ্বল যে এর বিস্তৃতি শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, দেশের সীমানা ডিঙিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করেছে। পৃথিবীর ইতিহাতে মাতৃভাষার জন্য ১৯৫২'র একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাঙালিরাই জীবন দিয়েছে, এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ইউনেস্কো ১৭ই নভেম্বর ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন বাঙালির পরিচয় বিশ্বব্যাপী। এসব কিছু অর্জন হয়েছে একুশ সৃষ্টির ফলেই। একুশে চেতনার অগ্রযাত্রা আজও থেমে যায়নি। দেশ থেকে দেশান্তরে সাফল্যগাথা নিয়ে ছুটে চলাই যেন একুশের ধর্ম।

একুশ যেভাবে হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯২: বায়ান্নর একুশের রক্তদান অবিস্মরণীয়
করে রাখতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বাংলাভাষীরা ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে বেসরকারিভাবে 'বাংলা ভাষা' দিবস হিসেবে পালন শুরু করে। [সূত্র: ডা. মোহাম্মদ হান্নান লিখিত 'একুশ যেভাবে হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, অন্তর্গত পাক্ষিক অবলোকন ২ বর্ষ ১ সংখ্যা: ঢাকা ২৫শে ফেব্রুয়ারি ১১ই মার্চ ২০০২ পৃ ১৬]। এপ্রিল ১৯৯৪।

৯ই জানুয়ারি ১৯৯৮: এদিন কানাডা প্রবাসী বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম তাদের প্রতিষ্ঠিত The mother language love the world সংগঠনের মাধ্যমে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের কাছে এক পত্র প্রেরণ করেণ। পত্রের মূল বিষয় ছিল বিশ্বের প্রতিটি ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস প্রতিবছর পালন করা হোক এবং যেহেতু পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশের বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছে সেজন্য ২১শে ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হোক (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ১২ই ডিসেম্বর ১৯৯৯)।

২৩শে জানুয়ারি ১৯৯৮ এদিন জাতিসংঘের মহাসচিবের পক্ষে ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক ইনফরমেশন-এর অফিসার ইনচার্জ হাসান ফেরদৌস রফিকুল ইসলামের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করার প্রস্তাবটি যেন কোনো সদস্য দেশ থেকে উত্থাপন করা হয় সে ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ১২ই ডিসেম্বর ১৯৯৯)।

ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ থেকে জানুয়ারি ১৯৯৯: একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার প্রস্তাবটি নিয়ে এ পর্যায়ে রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এস এইচ কে সাদেক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এবং বাংলাদেশস্থ ইউনেস্কো অফিসে বেশ কয়েকটি পত্র লিখে এ ব্যাপারে তাদের সহযোগিতা কামনা করেন। কিন্তু কেউ তার পত্রের জবাব দেননি কিংবা কোনোরূপ উদ্যোগও গ্রহণ করেননি। এতে হতাশ না হয়ে রফিকুল ইসলাম জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এবং ইউনেস্কো সদর দপ্তরে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। অবশেষে মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অব দা ওয়ার্ল্ড-এর পক্ষ থেকে পুনরায় ২৯শে মার্চ ১৯৯৮ তারিখে সাতটি ভাষাভাষী ফিলিপিনো, ইংরেজি, কানাডিস, মালয়, জার্মান, হিন্দি এবং বাংলাদেশি সাত জাতির ১০ জন লোকের স্বাক্ষর নিয়ে জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও ইউনেস্কো সদর দপ্তরে একটি স্মারকলিপি প্রেরণ করেন।

এক পর্যায়ে প্রস্তাবটি জাতিসংঘে উপস্থাপন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রস্থ কানাডিয়ান এম্বেসিকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু এম্বেসি কর্তৃপক্ষ উক্ত পত্রটি কানাডিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। এ পর্যায়ে রফিকুল ইসলাম বেশ কয়েকবার কানাডিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে টেলিফোনে আলাপ করলেও তারা সিদ্ধান্ত দিতে অপারগ হয়। অতঃপর পত্রের অপর একটি কপি রফিকুল ইসলাম সরাসরি জাতিসংঘের মহাসচিবের বরাবরে প্রেরণ করেন। এমতাবস্থায় প্রায় আট মাসাধিককাল জাতিসংঘের তথ্য অধিদপ্তরের সাথে বিভিন্ন সময়ে ফোনে আলাপ করেন। ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯-তে এসে উক্ত দপ্তরের হাসান "ফেরদৌস বিষয়টি নিয়ে ইউনেস্কোর সাথে যোগাযোগ করার উপদেশ দেন (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ১২ই ডিসেম্বর ১৯৯৯)।
১৯শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ হাসান ফেরদৌসের উপদেশ মতো রফিকুল ইসলাম পত্রটি ইউনেস্কোতে প্রেরণ করেন। এ "পর্যায়ে রফিকুল ইসলাম ইউনেস্কোর ভাষা বিভাগের পরিচালকের সঙ্গে আলাপ করেন। ভাষা বিভাগের পরিচালক এ বিষয়ে "খুবই উৎসাহ বোধ করেন। (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ১২ই ডিসেম্বর ১৯৯৯)।

৮ই এপ্রিল ১৯৯৯: উদ্যোক্তারা ইউনেস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করলে ইউনেস্কো সদর দপ্তরে ভাষা বিভাগের আন্না মারিয়া রফিকুল ইসলামকে ৮ই এপ্রিল, ১৯৯৯ সালে এক পত্রে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি রফিকুল ইসলামের নিকট প্রেরণ করেন।
সংক্ষেপে তথ্যগুলো হলো:

১. প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে হলে জেনারেল কনফারেন্সে তা উপস্থাপন করতে হবে। ৩০তম অধিবেশন এ বছরের নভেম্বর/ডিসেম্বরে হবে। ঐ সময় এ সুযোগ রয়েছে।
২. প্রস্তাবটি সমর্থন করে যেকোনো একটি দেশ তার নিজের প্রস্তাব হিসেবে উপস্থাপন করবে।
৩. এ ব্যাপারে ইউনেস্কো ন্যাশনাল কমিশন কোনো একটি দেশকে প্রস্তাবক হিসেবে বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য অনুরোধ করতে বলেন। দেশগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ, কানাডা, ফিনল্যান্ড, ভারত এবং হাঙ্গেরি। (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ১২ই ডিসেম্বর ১৯৯৯)।

মে হতে অক্টোবর ১৯৯৯: রফিকুল ইসলাম ৫টি দেশের সঙ্গে ব্যাপকভাবে যোগাযোগ করেন। ফলশ্রুতিতে ১৬ই আগস্ট
১৯৯৯ তারিখে হাঙ্গেরি থেকে প্রথম সমর্থনসূচক প্রস্তাবটি ইউনেস্কো এবং রফিকুল ইসলামের নিকট আসে। ফিনল্যান্ড জানায়, অন্য কোনো দেশ প্রস্তাব উত্থাপন করলে তারা সমর্থন দেবে। বহুবার যোগাযোগ ও ফোনে আলাপের পরে ভারত ও কানাডা সিদ্ধান্ত দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। ইতোমধ্যেই রফিকুল ইসলাম (জুন ১৯৯৯) সেক্রেটারি জেনারেল, ইউনেস্কো অব বাংলাদেশ এবং শিক্ষা সচিব কাজী রকিবউদ্দিনের সাথে আলাপ করেন। তিনি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং অতিসত্বর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এস এইচ কে সাদেকের সাথে আলাপ করেন এবং সময়ের স্বল্পতা হেতু এক ব্যক্তিগত পত্রে বিষয়টি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব আগ্রহান্বিত হন এবং অতি দ্রুততার সাথে প্রস্তাবটি ইউনেস্কোর দপ্তরে প্রেরণের নির্দেশ দেন। ফলে প্রস্তাবটি জমাদানের সর্বশেষ দিনের আগের দিন নানান বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৭ লাইনের একটি প্রস্তাব ফ্যাক্সযোগে প্যারিসে প্রেরণ করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে 'বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কো'র সচিব কফিল উদ্দিন আহমদ প্রস্তাবটি পেশ করেন। ৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কোর ১৫৭তম অধিবেশনে এবং ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে বাংলাদেশে এ প্রস্তাব আসে। ১৬০তম অধিবেশনে তৎকালীন বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী এএইচকে সাদেক বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীদের সাথে আলোচনা করে জনমত সৃষ্টি করে।

কানাডা থেকে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার জন্য যে প্রস্তাব করেছে, বাংলাদেশ সেই উদ্ধৃতিসহ প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। ২৬শে অক্টোবর থেকে ১৭ই নভেম্বর ১৯৯৯ তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এস এইচ কে সাদেক, স্পেশাল এ্যাডভাইজার টু দ্য ডিজি অব ইউনেস্কো তোজাম্মেল হক, রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, ইউনেস্কো সচিব কফিল উদ্দিন আহমদ এবং কাউন্সিলর ইশতিয়াক চৌধুরী এই প্রস্তাবটি পাশ করানোর জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালান। এর ফলে প্যারিসে অনুষ্ঠিত সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবটি বাংলাদেশের তরফ থেকে উত্থাপন করা হলে প্রস্তাবটি যেসব দেশ সমর্থন করেছিল সেগুলো হচ্ছে- ওমান, লেবানন, শ্রীলংকা, ইজিপ্ট, রাশিয়ান ফেডারেশন, বাহামা, ডমিনিক্যান রিপাবলিক, বেলারুস, দি ফিলিপিন্স, কোর্ট ডি ভয়্যার, ইন্ডিয়া, হন্ডুরাস, গাম্বিয়া, ফেডারেটেড স্টেটস অব মাইক্রোনেশিয়া, ভানুয়াটু, ইন্দোনেশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, ক্যামোরোস, পাকিস্তান, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান, লিথুয়ানিয়া, ইতালি এবং সিরিয়া।
১৭ই নভেম্বর ১৯৯৯: এদিন প্যারিসে অনুষ্ঠিত UNESCO-এর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উল্লেখ্য, উক্ত সম্মেলন ১৬ই নভেম্বর শুরু হলেও আলোচ্য সিদ্ধান্তটি হয় ১৭ই নভেম্বর। "প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর নজিরবিহীন আত্মত্যাগের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি। ১৯৫২ সাল থেকে বাংলাদেশের মানুষ এবং ১৯৭১ সালে

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয়ের পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কতটা ভাবগম্ভীর পরিবেশে অদ্যাবধি দিবসটি পালন করছে তাও এ সম্মেলনে (প্যারিস সম্মেলনে) যথার্থ গুরুত্বের সঙ্গে লিপিবদ্ধ হয়।" (সূত্র: বাংলাপিডিয়া, প্রথম খণ্ড: ঢাকা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ২০০৩: পৃ ১৭৭)
দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ১৮৮টি দেশ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' পালনের প্রস্তাবে সম্মত হয়। ইউনেস্কোর ঘোষণায় বলা হয়, "১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি যাঁরা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন তাঁদের স্মরণে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে বিশ্বব্যাপী পালনের জন্য 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করা হলো।" এভাবেই ২১শে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০০০ সালে বিশ্বের ১৮৮টি দেশ প্রথমবারের মতো এ দিবসটিকে "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" হিসেবে পালন করে। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাতত্ত্বের এক সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ভারতবর্ষের সব ভাষা পণ্ডিতদের উপস্থিতিতে বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, "শুধু ভারতে নয় বাংলা ভাষার স্থান হবে এশিয়া মহাদেশের সর্বোচ্চে।" একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কথাটি পরিপূর্ণ সার্থক হয়েছে। আজ বাংলা ভাষার স্থান শুধু এশিয়া মহাদেশে নয়, সমগ্র পৃথিবী জুড়ে। এটা সম্ভব হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি সৃষ্টি এবং বাংলা ভাষার ভাষাতাত্ত্বিক গুণের জন্য। (সূত্র: দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ২/২/২০১৯)

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

Internationalization of Bengali Language

পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র বাঙালিরা মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে জীবন বিসর্জন দিয়েছে। এই দৃষ্টান্তকে স্থাপন করে কানাডা প্রবাসী বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম তাদের প্রতিষ্ঠিত The mother language love the world সংগঠনের মাধ্যমে ২৯ মার্চ, ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফিআনানের কাছে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার প্রস্তাব করে একটি চিঠি পাঠান। এই চিঠিতে ফিলিপিনো, ইংরেজি, ক্যান্ডানিজ, মালয়, জার্মান, হিন্দি এবং বাংলাদেশি সাত জাতি ও সাত ভাষার দশজন স্বাক্ষর করেন। এরপর উদ্যোক্তারা ইউনেস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করলে ইউনেস্কো সদর দপ্তরে ভাষা বিভাগের আন্না মারিয়া রফিকুল ইসলামকে ৩ মার্চ, ১৯৯৯ চিঠিতে আশ্বস্ত করেন। এর পর বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে ৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৭ লাইনের একটি প্রস্তাব প্যারিসে পাঠান। ইউনেস্কোর ১৫৭তম অধিবেশনে এবং ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে বাংলাদেশে এ প্রস্তাব আসে। ১৬০তম অধিবেশনে তৎকালীন বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী এ.এইচ.কে সাদেক বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীদের সাথে আলোচনা করে জনমত সৃষ্টি করে। অবশেষে ১৯৯৯ সালের ১৭নভেম্বর ১৮৮টি দেশ ২১ ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' পালনের প্রস্তাবে সম্মত হয়। ইউনেস্কোর ঘোষণায় বলা হয়, "১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে যাঁরা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন তাঁদের স্মরণে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে বিশ্বব্যাপী পালনের জন্য 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করা হলো।" এভাবেই ২১ ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০০০ সালে বিশ্বের ১৮৮টি দেশ প্রথমবারের মতো এ দিবসটিকে "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" হিসেবে পালন করে। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাতত্ত্বের এক সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ভারতবর্ষের সব ভাষা পণ্ডিতদের উপস্থিতিতে বহুভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, "শুধু ভারতে নয় বাংলা ভাষার স্থান হবে এশিয়া মহাদেশের সর্বোচ্চে।" একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করায় ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কথাটি পরিপূর্ণ স্বার্থক হয়েছে। আজ বাংলা ভাষার স্থান শুধু এশিয়া মহাদেশে নয়, সমগ্র পৃথিবী জুড়ে। এটা সম্ভব হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি সৃষ্টি এবং বাংলা ভাষার ভাষাতাত্ত্বিক গুণের জন্য।

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By

Pre and Post Events of Omare 21

১৯১৮ সালে বিশ্বভারতীয় এক সভায় রবিঠাকুরের উপস্থিতিতে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, "শুধু ভারত কেন সমগ্র এশিয়া মহাদেশেই বাংলা ভাষার স্থান হবে সর্বোচ্চ।" তখন থেকেই বাংলা ভাষার গুরুত্ব উঠে আসে।
১৯৪৭/১ সেপ্টেম্বর 'তমদ্দুন মজলিস' প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন।
১৯৪৭/ ডিসেম্বর তমদ্দুন মজলিস কর্তৃক প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন।
১৯৪৮/২৫ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব।
১৯৪৮/১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মঘট।
১৯৪৮/২১ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রেসকোর্স ময়দানে, ২৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রভাষা উর্দু ঘোষণা।
১৯৪৮/১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু। ১৯৪৯/১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত
১৯৫০/ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান কর্তৃক উর্দু রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা।
১৯৫১/ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের মৃত্যু।
১৯৫২/২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমউদ্দীন প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ। ১৯৫২/৩০ জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট।
১৯৫২/৩১ জানুয়ারি ঢাকায় সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ গঠন এবং আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা।
১৯৫২/২০ ফেব্রুয়ারি, এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি।
১৯৫২/২১ ফেব্রুয়ারি মিছিলের ওপর পুলিশের গুলি, ৪ জন নিহত (রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত) এবং ২১ জন আহত।
১৯৫২/২২ জানুয়ারি গায়েবানা জানাজায় ৩০,০০০ লোকের উপস্থিতি।
১৯৫২/২৩ জানুয়ারি প্রথম শহিদ মিনার তৈরি।
১৯৫২/২৪ জানুয়ারি মেডিকেল কলেজের সামনে শহিদ মিনার উদ্বোধন করেন শহিদ শফিউরের পিতা মাহাবুবুর রহমান।
১৯৫২/২৭ জানুয়ারি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিশ্রুতি।
১৯৫৩/২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম শহিদ দিবস পালন।
১৯৫৪/৯ মে পাকিস্তান গণপরিষদ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান (বাংলাপিডিয়া)।
১৯৫৬/২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম সরকারিভাবে শহিদ দিবস পালন।
১৯৫৯/ আইয়ুব খানের সামরিক সরকার ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি এবং দিবস পালন বাতিল।
১৯৭১/ স্বাধীনতার পর সরকারিভাবে ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস পালন শুরু।
১৯৯৯/১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা।
২০০০/২১ ফেব্রুয়ারি ১৮৮টি রাষ্ট্র প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন।

সারসংক্ষেপ

দ্বিজাতিতত্ত্ব: "ভারতে একটিমাত্র জাতি আর সেটা হলো হিন্দু জাতি", হিন্দু উগ্রবাদী নেতাদের এমন বক্তব্যের প্রতিবাদে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, যে যোগ্যতার ভিত্তিতে হিন্দুরা ভারতের জাতি সেই একই যোগ্যতায় মুসলমানও ভারতের একটি জাতি। সুতরাং ভারতে দুটি জাতি 'হিন্দু জাতি' ও 'মুসলমান জাতি' এটাই মি. জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব।

আওয়ামী লীগ: মুসলমানদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে নবাব স্যার সলিমুল্লাহর উদ্যোগে ১৯০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে মুসলিম লীগ নেতাদের অগণতান্ত্রিক আচরণ ও চরম বৈষম্যের প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের উদরপন্থি কতিপয় নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে ১৯৪৯ সালের ২৩-২৪ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে "আওয়ামী মুসলিম লীগ" নামক একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল জনগণের জন্য দলটি উন্মুক্ত করতে ১৯৫৫ সালে 'মুসলিম' শব্দটি তুলে দিয়ে নামকরণ করা হয় 'আওয়ামী লীগ'। এভাবে ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক পেরিয়ে জনগণের দল হিসাবে 'আওয়ামী লীগ' দলটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

তমদ্দুন মজলিস: পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উর্দুকে নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী ঘোষণা দেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহসহ বাংলার বুদ্ধিজীবীগণ এর প্রতিবাদ জানায়। এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে 'তমদ্দুন মজলিস' নামে একটি ভাষা সংগঠন গড়ে ওঠে। এটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগঠন।

ভাষা শহিদ: মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছে। ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা রক্ষায় আন্দোলনরত ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে রফিক, শফিক, ছালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেকে শাহদৎ বরণ করেন এরাই ভাষা শহিদ। আর যারা ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল তারা ভাষা সৈনিক।

শহিদ মিনার: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে যে সকল বাংলা মায়ের সূর্য সন্তানরা জীবন উৎসর্গ করেছে তাদের স্মৃতি ধরে রাখার স্তম্ভ। দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার রয়েছে, যা দেখে বর্তমান প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হবে। সর্বপ্রথম ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের সামনে শহিদ মিনার তৈরি করা হয়। বর্তমান শহিদ মিনার তিন স্তর বেদির ওপর মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছে বাঙালিরা। এই সার সত্যকে ধারণ
করে কানাডা প্রবাসী বাঙালি রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে ঘোষণা দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের নিকট দাবি তোলে। অবশেষে ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘ (ইউনেস্কো কর্তৃক) ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে ঘোষণা দেয়। তাই আজ আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...