End of Cold War
প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র ছিল অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথিকৃৎ। কমিউনিজমের অস্তিত্ব স্নায়ুযুদ্ধের জন্মদান করে, বিপরীতে পুঁজিবাদের অস্তিত্ব স্নায়ুযুদ্ধকে ত্বরান্বিত ও পুষ্ট করে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের পথিকৃৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিজম রোধ করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায় এবং অবশেষে তারই বিজয় অর্জিত হয়। প্রায় অর্ধশতাব্দীকালব্যাপী যে স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্ববাসীকে চরম স্নায়ুচাপে রেখেছিল, তার অবসানের পর বিশ্ববাসী তা থেকে মুক্তি পায়।
কোনো পরিস্থিতিই বিশ্বে চিরস্থায়িত্ব লাভ করে না। সময়ের পরিক্রমায় নিয়মের অধীনেই স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভমাল্টায় এক শীর্ষ বৈঠকে স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের সরকারি ঘোষণা দেন।১০
স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতির এক স্বল্পস্থায়ী অধ্যায়। উৎপত্তি ও অবসানের মধ্যে ৪৫ বছরের ব্যবধান। এ সময়ে স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে রেখেছিল। স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব ছিল ব্যাপক। বৃহৎ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে এর সূত্রপাত হলেও বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রই এর প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে আরেকটি ভয়ংকর যুদ্ধ যেকোনো মুহূর্তে সংঘটিত হতে পারে- এমন একটা কটা পরিস্থিতি স্নায়ুযুদ্ধ সৃষ্টি করেছিল।
স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের কারণসমূহ
Causes of the End of the Cold War
প্রথমত: দুই পরাশক্তির মানসিকতার পরিবর্তন হলে তারা বুঝতে পারে, বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার দিয়ে শান্তি, নিরাপত্তা বা জয় কোনোটাই অর্জন করা যাবে না। ফলে অস্ত্র উৎপাদন হ্রাস, পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস থেকে দূরে সরে এলে স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পথ সুগম হয়।
দ্বিতীয়ত: স্নায়ুযুদ্ধ সৃষ্টিতে যেমন কতগুলো জোটের ভূমিকা ছিল, তেমনি এর অবসানেও জোটের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম-এর ভূমিকা স্নায়ুযুদ্ধ অবসানে সহায়ক হয়। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য ছিল শতাধিক। ন্যামের সম্মেলনগুলোতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির জন্য বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের সমালোচনা করা হতো। এদের নির্বাসনের জন্য শান্তিকামী মানুষকে সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানালে স্নায়ুযুদ্ধের মদদদাতারা নিরুৎসাহ হয়ে পড়ে। এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো স্নায়ুযুদ্ধের রঙ্গমঞ্চ থেকে সযত্নে নিজেদের সরিয়ে রাখে। ফলে স্নায়ুযুদ্ধ গতিহারা হয়ে অবসানের পথে ধাবিত হয়।
তৃতীয়ত: বৃহৎ রাষ্ট্রের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য স্নায়ুযুদ্ধের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে রাখলেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হওয়ায় দ্বিমেরুবাদের অবসান ঘটে। তাদের মধ্যে তিক্ততা, সন্দেহ ও অবিশ্বাস কমতে শুরু করলে স্নায়ুযুদ্ধের পরিবেশগত পরিমণ্ডল দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সাম্যবাদী রাষ্ট্রের মধ্যে সংহতির অভাব দেখা দেয়। ফলে স্নায়ুযুদ্ধ অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে পরিণত হয়।
চতুর্থত: সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ নীতিতে পরিবর্তন এলে স্নায়ুযুদ্ধের অবাসন ত্বরান্বিত হয়। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে মিখাইল গর্বাচেভ ক্ষমতা গ্রহণ করে অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কারের লক্ষ্যে গ্লাসনস্ত (উদার নীতি) ও পেরেস্ত্রৈকা (পুনর্গঠন) কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ফলে তার উদারনীতি কর্মসূচি পশ্চিমা বিশ্বে সমাদৃত হলে স্নায়ুযুদ্ধের আবহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমতে শুরু করে। এদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে সাম্যবাদের অসারতা জনগণের কাছে প্রকাশ পায়। স্নায়ুযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো যে শক্তিশালী অর্থব্যবস্থার প্রয়োজন, তা সোভিয়েত নেতারা প্রস্তুত করতে পারেননি। ফলে সাম্যবাদ কিছুটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং রুশরা উদার নীতিবাদের প্রতি আনুগত্য দেখাতে শুরু করলে সোভিয়েত ইউনিয়নের অতীত অহমে ভাটা পড়ে, যা স্নায়ুযুদ্ধকে অবসানের দিকে ধাবিত করে।
পঞ্চমত: আমেরিকার অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন স্নায়ুযুদ্ধকে দুর্বল করে ফেলে। অমেরিকার অর্থনীতির বিরাট অংশ সমরাস্ত্র প্রস্তুতে ব্যয় হতো। এদিকে জাপান শিল্পোন্নয়নে অগ্রসর হলে আমেরিকা জাপানকে অনুসরণ করে শিল্পোন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে। সামরিকীকরণ থেকে শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হওয়া স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের একটি কারণ।
ষষ্ঠত: মতাদর্শগত বিভেদ, যা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে অনাস্থা, অবিশ্বাসের সৃষ্টি করেছিল, তা ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। বৃহৎ রাষ্ট্রদ্বয় তাদের অনুগামী রাষ্ট্রগুলোকে পুতুলের মতো ব্যবহার করলেও সময় গড়ানোর, সাথে সাথে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আনুগত্যের মাত্রা কমে যায়। রাশিয়া মানেই প্রতিক্রিয়াশীল আর আমেরিকা বলতেই প্রগতিশীল, এ ধারণায় চিড় ধরলে স্নায়ুযুদ্ধের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসে।
সপ্তমত: উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো বৃহৎ রাষ্ট্রদ্বয়ের দ্বারস্থ হতো উন্নয়নের উপাদান পাওয়ার আশায়। উন্নয়নের উপাদানের পরিবর্তে তারা সমরাস্ত্র পেত। সময়ের পরিক্রমায় বিকাশশীল রাষ্ট্রগুলোর কাছে বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। এসব রাষ্ট্রের কাছে রাশিয়া বা আমেরিকার গুরুত্ব, উপযোগিতা হ্রাস পেতে শুরু করলে স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতাও কমতে শুরু করে।
এটা সত্য যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর স্নায়ুযুদ্ধের আপাত অবসান হয়। তবে এটাও সত্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতির একক নিয়ন্তা হয়ে উঠছে। বিশ্ব রাজনীতির শক্তি-সাম্য এখন আর নেই। বর্তমান রাজনীতির যে ধারা, ভবিষ্যৎ ইতিহাস হয়তো শক্তি-সাম্যের জন্যই স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়টাকে উৎকৃষ্ট বলে মনে করে স্মরণ করবে। বর্তমানে স্নায়ুযুদ্ধ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহে অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হচ্ছে। পূর্বের স্নায়ুযুদ্ধ ছিল সামরিক ও আদর্শগত। এখন স্নায়ুযুদ্ধ পুঁজিগত। তাই বলা যায়, স্নায়ুযুদ্ধের ধারণার পরিবর্তন ঘটেনি, রূপ পাল্টেছে মাত্র। বর্তমানে জাপান-আমেরিকা বিরোধ, পাকিস্তান-ভারত বিরোধ, উত্তর কোরিয়া-দক্ষিণ কোরিয়া বিরোধ, ইসরাইল-ইরান বিরোধ, রাশিয়া-ইউক্রেন বিরোধ ও উত্তেজনা স্নায়ুযুদ্ধের নতুন স্বরূপ বলা যায়। ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা পুনরায় স্নায়ুযুদ্ধকে উসকে দিচ্ছে। ৮ই নভেম্বর ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে (শনিবার) বার্লিন প্রাচীর পতনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে জার্মানিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ বলেন, "পৃথিবী আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে।"
স্নায়ুযুদ্ধ: পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব
কাজেই দেখা যায়, স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বিমেরুকরণবাদের প্রভাব ছিল। দুই বৃহৎ শক্তির সাম্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্রনীতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রগুলো সর্বদা তটস্থ থাকত। অন্ধ অনুসরণ করায় বৃহৎ শক্তিগুলো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ পেত, যা স্নায়ুযুদ্ধকে জিইয়ে রাখত।
রাশিয়ার ক্ষমতায় গর্বাচেভের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে রক্তক্ষয়ী কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই। এজন্য সব কৃতিত্ব তারই প্রাপ্য; যার স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর রাশিয়া ইউরোপের পরাশক্তির ভূমিকা পালনে অগ্রসর হলেও পূর্বের ন্যায় শক্তিশালী না হওয়ায় স্নায়ুযুদ্ধের টান-টান উত্তেজনা প্রশমিত হতে শুরু করে। রাশিয়ার গর্বাচেভ-পরবর্তী নেতৃবৃন্দ পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে এবং সাম্যবাদের পরিসমাপ্তি ঘোচানোর কাজে বেশি ব্যস্ত। রাশিয়া মার্কিনি ধাঁচের অর্থনীতি চালু করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতামূলক নীতি গ্রহণ করায় স্নায়ুযুদ্ধের উপযোগিতা হ্রাস পেতে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার যে তিক্ত সম্পর্ক ছিল তা এখন আর নেই। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নয়, ব্রিটেনের সাথেও সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেছেন। অদ্যাবধি স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব থেকে বিশ্ববাসী সম্পূর্ণ মুক্ত না হলেও এর তীব্রতা পূর্বের মতো আর নেই। তবে বর্তমানে সিরিয়া সংকটকে কেন্দ্র করে ভ্লাদিমির পুতিনের প্রেসিডেন্ট আসাদের পক্ষাবলম্বনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার উষ্ণ সম্পর্কে পুনরায় ফাটল ধরেছে এবং স্নায়ুযুদ্ধ আবার পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন কর্তৃক সেনাবাহিনীকে পারমাণবিক বোমা প্রস্তুত রাখার নির্দেশ বিশ্বকে আবার স্নায়ুযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ দ্বীপকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের উষ্ণতা হ্রাস পেয়ে এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে যে ভাষায় হুঁশিয়ারি দিচ্ছে তা স্নায়ুযুদ্ধের নতুন মাত্রার বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। বিশেষ করে সিরিয়াকে কেন্দ্র করে এবং সালিসবারিতে রুশ গুপ্তচর ও তাঁর মেয়েকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা নিয়ে পরাশক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। সিরিয়ায় যা ঘটছে তা থেকে বুঝা যায় স্নায়ুযুদ্ধ সময়কালীন পরিস্থিতির সাথে এখনকার উত্তেজনার মিল রয়েছে। সৌদিকে ইঙ্গিত করে জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনি গুতেরেস বলেছেন, "প্রতিহিংসার শীতল যুদ্ধ ফিরে আসছে।"
প্রধান শব্দসমূহের ব্যাখ্যা
Explanation of Key Words
ট্রুম্যান তত্ত্ব (Truman doctrine): মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই মার্চ ঘোষণা করেন যে, "মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য হলো এমন এক আন্তর্জাতিক পরিবেশ গঠন করা, যার মাধ্যমে সকল জাতি বলপ্রয়োগ ছাড়াই বসবাস করতে পারবে।" তিনি আরও বলেন, "ইউরোপের গণতন্ত্র বিপন্ন এবং তা উদ্ধার করার দায়িত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।" তার এরকম ঘোষণাই ইতিহাসে ট্রুম্যান ডকট্রিন (তত্ত্ব) নামে পরিচিত, যা রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে আরও ফাটল ধরায়।
মার্শাল পরিকল্পনা (Marshall Plan): ট্রুম্যান তত্ত্বের সূত্র ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব জর্জ মার্শাল ১৯৪৭
খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় বলেন, যেখানে দারিদ্র্য, হতাশা ও লোকসংখ্যা বেশি সেখানেই কমিউনিজম শাখা-প্রশাখা ছড়ায়। দরিদ্রতা দূর করতে না পারলে ইউরোপকে কমিউনিজমের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না। এজন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের জন্য তিনি সাহায্যের প্রস্তাব করেন। তার এ বক্তব্যের জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে সাড়ে ৫ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দেয়। তার বক্তব্য ও করণীয় ইতিহাসে মার্শাল পরিকল্পনা নামে পরিচিত।
ন্যাটো (NATO): NATO-এর পূর্ণরূপ হলো North Atlantic Treaty Organization. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত আধিপত্যের ভীতি থেকে ইউরোপের ১১টি দেশের সাথে ২০ বছরের জন্য আত্মরক্ষামূলক যে সামরিক চুক্তি সম্পাদন করে তারই নাম NATO, যা ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বলা হয়, চুক্তিভুক্ত কোনো দেশ আক্রান্ত হলে এ আক্রমণকে সদস্যভুক্ত দেশ নিজেদের উপর আক্রমণ বলে গণ্য করবে।
ওয়ারস জোট (Warsaw Pact): ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মে মাসে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারসতে
আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, রুমানিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মিত্রতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সাহায্যের অঙ্গীকারে ওয়ারস জোট গঠিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী সদস্যভুক্ত কোনো দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সবাই মিলে তার সর্বাত্মক সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে। সত্তরের দশকের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মতভেদের কারণে আলবেনিয়া এই সংস্থার সদস্য পদ ত্যাগ করে। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পর ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়।
দাঁতাত: যুদ্ধ কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলমান স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা শুরু করে। তারা পরস্পর বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে আগ্রহী হয়। বৃহৎ শক্তির মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠাকে যুক্তরাষ্ট্র দাঁতাত এবং রাশিয়া শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নামে অভিহিত করে। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করে। স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা হ্রাস পায়।
কেন্নান থিসিস: ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কেন্নান থিসিসের মূলকথা হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক ক্ষমতা হ্রাসের দিকে, এ অবস্থায় বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন নতিস্বীকারে বাধ্য হবে। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বেই যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র প্রস্তুতের প্রযুক্তি আবিষ্কার করায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে কৌশলগতভাবে চাপে রাখার এবং আধিপত্য বিস্তারের জন্যই কেন্নান থিসিস প্রকাশিত হয়।
কিউবা সংকট: ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সম্মতিক্রমে কিউবায় সামরিক মিসাইল স্থাপন করে। এই মিসাইল স্থাপন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। যার ফলে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপ আরও বাড়তে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা এবং সোভিয়েত-মার্কিন সম্পর্ক অত্যন্ত তিক্ত হয়ে ওঠে।
গ্লাসনস্ত গ্লাসনস্ত একটি রুশ শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ 'খোলা নীতি'। সাবেক সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ এই নীতির প্রবর্তক। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঘোষণা করেন যে, এখন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণ নির্ভয়ে খোলাখুলিভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারবে। পার্টি ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের প্রকাশ্য সমালোচনাও করতে পারবে। আর এজন্য গর্বাচেভ তার এই নীতিকে গ্লাসনস্ত নীতি বলে অভিহিত করেন। অবশেষে এই গ্লাসনস্ত নীতির কারণেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়।
পেরেস্ত্রৈকা: সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ কর্তৃক ঘোষিত অর্থনৈতিক সংস্কারনীতিই পেরেন্দ্রৈকা নীতি নামে খ্যাত। তিনি গ্লাসনস্ত অর্থাৎ খোলামেলা নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে উদারনৈতিক অর্থনীতি প্রবর্তনের জন্য এই নীতি গ্রহণ করেন। ফলে ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপীয় কমিউনিস্ট দেশসমূহে নয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গৃহীত হতে থাকে। ব্যক্তিমালিকানা, বুর্জোয়া কালচার প্রভৃতিকে আবার আহ্বান জানানো হয়। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে অচিরেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।
ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক চুক্তি। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ৫-১৭ই সেপ্টেম্বর ক্যাম্প ডেভিড নামক স্থানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিনের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি সম্পাদনের পর মিশরকে আরব লীগ ও ওআইসি থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বিরোধীদের রোষানলে পড়েন এবং ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।
ন্যাম: ন্যাম (NAM)-এর পূর্ণরূপ Non Aligned Movement। ন্যাম একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে পুরাতন যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে জন্ম হয় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ন্যামের। ন্যামের বর্তমান সদস্যসংখ্যা ১২০। স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে যখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশ সোভিয়েত অথবা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বলয়ে যোগ দিচ্ছিল তখন ন্যাম অত্যন্ত সফলতার সাথে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সূচনা ঘটায় এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দ্বিমেরুবাদ: স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশকে হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক ব্লক অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদী ব্লকের অধীনে বিবেচনা করে প্রচলিত নীতির নামই দ্বিমেরুবাদ। দ্বিমেরুবাদকে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শক্তিসাম্য হিসেবে দেখে থাকেন বলে দ্বিমেরুবাদকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার অন্যতম উপায় বলে বিবেচনা করেন। স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতায় দ্বিমেরুবাদ অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিরাজমান, যা বহুলভাবে একমেরুকরণ নামে পরিচিত
ফুলটন বক্তৃতা: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মার্চ ফুলটনে যে বক্তৃতা দেন তার প্রভাবেই পৃথিবীতে ঠাণ্ডাযুদ্ধের সূচনা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। তিনি তার বক্তৃতায় বলেন, "কেউ এ কথা বলতে পারবে না যে, ভবিষ্যতে সোভিয়েত রাশিয়া ও তার মিত্ররা কী করবে?" তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বলয় থেকে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে বের করে নিয়ে আসার জন্য ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রতিহত করার জন্য তিনি ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রাতৃত্বমূলক ঐক্যের তত্ত্ব প্রচার করেন।
বার্লিন অবরোধ: ট্রুম্যান তত্ত্ব ও মার্শাল পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের পদক্ষেপ হলো বার্লিন অবরোধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পর জার্মানির রাজধানী বার্লিনকে ৪ ভাগে ভাগ করে শাসন করছিল। আমেরিকা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড তাদের অধিকৃত পশ্চিম বার্লিনে সংযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নিলে রাশিয়ায় স্ট্যালিন ক্ষুব্ধ হয়ে পশ্চিমের সাথে পূর্বের সব ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করে দেন। এর ফলে পশ্চিম জার্মানির ৩ মিলিয়ন মানুষ খাদ্য সরবরাহের সংকটে পড়ে। এ অবরোধ প্রায় ১১ মাস ধরে চলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মিত্রপক্ষের বিমান ২,৭০,২৬৪ বার উড়ানোর মাধ্যমে পশ্চিম বার্লিনে ২২,৫০,০০০ টন খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়। ফলে স্ট্যালিন অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হন।
WARSAW: NATO-র পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মে কমিউনিস্ট দেশগুলো নিয়ে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারসতে যে চুক্তি স্বাক্ষর করে তা ওয়ারস (WARSAW) চুক্তি। এ চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ইউরোপের সোভিয়েত সমর্থনপুষ্ট সাম্রাজ্যকে সুসংহত করা এবং ন্যাটোর ভয়-ভীতি থেকে পূর্ব ইউরোপকে রক্ষা করা।
SEATO: মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার তার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের নীতি অনুসরণ করে কৌশল হিসেবে আলাপ-আলোচনাকে প্রাধান্য দেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিস্টবিরোধী নীতিকে সম্প্রসারণের জন্য যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি গঠনের উদ্যোগ নেন। এ লক্ষ্যে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই সেপ্টেম্বর ম্যানিলায় 'দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থা' (South East Asian Treaty Organization) গঠন করেন। এ চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল এসব অঞ্চলে কমিউনিস্ট চীনের প্রভাব রোধ এবং জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রভাবকে ধ্বংস করা।
MEDO: MEDO-এর পূর্ণরূপ হলো Middle. East Defence Organization. প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে ফেব্রুয়ারি এ সংস্থাটি গঠন করেন। MEDO এবং SEATO NATO-এর সাথে যুক্ত হলে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা সামরিক জোটের এক মাকড়সার জালে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে। ফলে স্নায়ুযুদ্ধ প্রশমনের পরিবর্তে তীব্র হয়ে ওঠে।
স্নায়ুযুদ্ধ - পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই
Read more