hsc

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন (অধ্যায়-৫)

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.6k

Movement for Autonomy and Independence of East Bengal

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের পটভূমি বিশ্লেষণ করতে হলে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া, পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা গ্রহণ ও তাদের শাসননীতি বিশেষ করে অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তারা যে বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেছিল সে সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শাসনব্যবস্থায় এক ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রবণতা লক্ষ করা যায়। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকচক্র পূর্ব পাকিস্তানে এক ধরনের উপনিবেশিক শাসন চালু করে। পাকিস্ত ানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বাস পূর্বাঞ্চলে থাকা সত্ত্বেও সর্বক্ষেত্রে পূর্বাঞ্চলকে বঞ্চিত করা তথা দমিয়ে রাখার একটা প্রবণতা পশ্চিমাঞ্চলের শাসকদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। কালক্রমে স্বৈরতান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রবণতার সাথে সেনাবাহিনীর প্রভাব যুক্ত হলে গণতন্ত্রের বস্ত্রহরণের উপক্রম হয়। বাড়তে থাকে পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর দমন পীড়ন। ধীরে ধীরে বাংলার মানুষের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা অঙ্কুরিত হতে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের ঘটনা প্রবাহ জানা আবশ্যক।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন -জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন গেটিসবার্গ নামক স্থানে আমেরিকাবাসীর উদ্দেশ্যে এক ভাষণ দিয়েছিলেন। এ ভাষণ আমেরিকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ ও উজ্জীবিত করে। ফলে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়।

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন গেটিসবার্গ নামক স্থানে আমেরিকাবাসীর উদ্দেশ্যে এক ভাষণ দিয়েছিলেন। এ ভাষণ আমেরিকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ ও উজ্জীবিত করে। ফলে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়।

নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

শরিফ সাহেব একটি অসহযোগ আন্দোলনের নেতা। তার আহ্বানে দেশের সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, চাকরিজীবীসহ সাধারণ জনতা সাড়া দেয় এবং সকলেই তার নির্দেশ মেনে চলে।

United Front Election or the General Election of 1954 S

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। বাংলাদেশের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের স্বৈরাচারী শাসকচক্রের নেতা মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাদেশিক পরিষদের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা করেন। মুসলিম লীগের সীমাহীন রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং পূর্ব বাংলার প্রতি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই নির্বাচনকে মোকাবিলা করার জন্য তার ৪টি বিরোধী রাজনৈতিক দল যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এ. কে. ফজলুল হক, মাওলানা আতাহার আলী এবং হাজী দানেশের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম এবং বামপন্থি গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। এছাড়া খেলাফতে রাব্বানী ও স্বতন্ত্র দল ভিন্ন ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেয়। এই জোটের প্রতীক ছিল 'নৌকা' এবং ম্যানিফেস্টো ছিল ঐতিহাসিক ২১ দফা বাস্তবায়ন। এ দফাগুলো হলো-

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি

১। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
২। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টনের ব্যবস্থা।
৩। পাটশিল্প জাতীয়করণ করা।
৪। কৃষির উন্নতির জন্য সমবায় কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।
৫। লবণের কারখানা স্থাপন করা।
৬। মোহাজের-শিল্পী-কারিগর শ্রেণির কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
৭। খাল খনন ও সেচের ব্যবস্থা করে বন্যা ও দুর্ভিক্ষের অবসান করা।
৮। শিল্প ও খাদ্যে দেশকে স্বাবলম্বী করা।
প্রবর্তন কর ৯। অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা।
১০। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের মধ্যে ভেদাভেদ দূর করা এবং সকল বিদ্যালয়কে সরকারি সাহায্য করা।
১১। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
১২। শাসন ব্যয় হ্রাস করা। মন্ত্রীর বেতন এক হাজারের বেশি না হওয়া।
১৩। ঘুষ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১৪। জননিরাপত্তা আইন ও অর্ডিন্যান্স প্রভৃতি কালাকানুন রদ করা।
১৫। বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করা

১৬। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউসকে বাংলা ভাষা গবেষণাগারে পরিণত করা।
১৭। ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মরণে শহিদ মিনার নির্মাণ করা।
১৮। ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা।
১৯। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্ব বাংলাকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা।
২০। আইন পরিষদের মেয়াদ কোনোভাবেই বৃদ্ধি না করা।
২১। আইন পরিষদের আসন শূন্য হলে তিন মাসের মধ্যে উপনির্বাচন দিয়ে তা পূরণ করা।
২১ দফাকে সামনে রেখে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৮ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়। যুক্তফ্রন্ট জয়লাভকরে। ৩০৯টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি, ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ ৯টি, পাকিস্তানি জাতীয় কংগ্রেস ২৪টি, তফসিলি ফেডারেশন ২৭টি, অন্যান্য দল বাকি আসনগুলো লাভ করে। দেশ-বিদেশের পত্রিকায় একে 'ব্যালট বিপ্লব' বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়যুক্ত হয়ে ৩ এপ্রিল এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করে।

যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিপরিষদ

১। এ. কে. ফজলুল হক - মুখ্য, স্বরাষ্ট্র, সাহায্য ও পুনর্বাসন; স্বায়ত্তশাসন; শাসনতন্ত্র; নির্বাচন ও পার্লামেন্টারি বিষয়াদি; নিয়োগ, বদলি ও সাধারণ শাখা।
২। আতাউর রহমান খান - বেসামরিক সরবরাহ।
৩। আবু হেনা সরকার - অর্থ।
৪। কফিলউদ্দিন চৌধুরী - বিচার ও আইন।
৫। আবুল মনসুর আহমদ - জনস্বাস্থ্য।
৬। সৈয়দ আজিজুল হক - শিক্ষা ও রেজিস্ট্রার।
৭। আবদুস সালাম খান - শিল্প ও শ্রম।
৮। শেখ মুজিবুর রহমান - কৃষিঋণ, সমবায় ও পল্লিউন্নয়ন।
৯। আবদুল লতিফ বিশ্বাস - রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার।
১০। মুয়াজ্জেম উদ্দীন হুসাইন - স্টেট একুইজিশন।
১১। হামিদ উদ্দিন - বাণিজ্য ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন।
১২। ইউসুফ আলী চৌধুরী - কৃষি, বন ও পাট।
১৩। রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী - মেডিকেল ও জেল।
১৪। আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী - সড়ক ও গৃহ নির্মাণ।

যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার আত্মপ্রকাশে শঙ্কিত হয়ে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী যুক্তফ্রন্ট
মন্ত্রিসভার পতন ঘটানোর জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করে। তাদেরই সৃষ্ট ষড়যন্ত্রে আদমজী পাটকল ও চন্দ্রঘোনায় শ্রমিক দাঙ্গা-

হাঙ্গামার সূত্রপাত ঘটিয়ে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার ব্যর্থতা দেখানো হয়। যে কারণে তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল গোলাম
মোহাম্মাদ (খাজা নাজিম উদ্দীনের পর ১৫ অক্টোবর, ১৯৫১ দায়িত্ব প্রাপ্ত) যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ৯২
'ক' ধারা জারি করেন। ফলে মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক গৃহবন্দি হন এবং জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান
সহ ৩০০০ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। এই ঘটনার অল্পদিনের মধ্যে স্বৈরাচারী গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মাদ ১৯৫৪
খ্রিষ্টাব্দের ১৪ অক্টোবর সার্বভৌম গণপরিষদ বাতিল করে সারা দেশে প্রথম বারের মতো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।

গোলাম মোহাম্মাদ অসুস্থতার অজুহাতে ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ৬ অক্টোবর পদত্যাগ করলে মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা
অস্থায়ী গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। কিছু দিন পর তিনি সেনাবাহিনীর সমর্থনে পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট হন।
সেনাবাহিনী ছিল তার ক্ষমতার উৎস। গণতন্ত্রের প্রতি তার কোনো শ্রদ্ধা ছিল না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মুহাম্মাদ আলী
গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার হস্তক্ষেপের ফলেই ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট
কোয়ালিশন সরকারের পতন ঘটে। শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর
নিযুক্ত হন। ৬ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানকে পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা গঠনের দায়িত্ব দেন।
আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। এ ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মধ্যে কেন্দ্রে
মন্ত্রিসভার রদবদল হয়। ১২ সেপ্টেম্বর হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। তার ব্যাপক উন্নয়নমূলক
কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত হয়ে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা ষড়যন্ত্র শুরু করেন। রিপাবলিকান পার্টির ইচ্ছানুযায়ী জাতীয় পরিষদের আহ্বান ছাড়াই সোহরাওয়ার্দীকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেন। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে তিনি পদত্যাগ করেন।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

Ayub Khan Ascends to the Power: October Revolution

১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সমগ্র দেশে (দ্বিতীয় বার) সামরিক শাসন জারি করেন এবং সেনাবাহিনীর প্রধান আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের সংবিধান বাতিল, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারগুলোকে বরখাস্ত, সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত এবং মৌলিক অধিকারসমূহ স্থগিত করা হয়। এই ঘটনার মাত্র অল্প কয়েকদিন পর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার একান্ত বিশ্বস্ত সহচর আইয়ুব খান এক অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইস্কান্দার মির্জাকে অপসারণ করে আইয়ুব খান নিজেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন (২৭ অক্টোবর, ১৯৫৮)। সেই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি প্রধান সেনাপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবেও বহাল থাকবেন। আইয়ুব খানের এ ক্ষমতা গ্রহণই ইতিহাসে 'অক্টোবর বিপ্লব' নামে খ্যাত। ক্ষমতা গ্রহণ করে আইয়ুব খান তার স্বঘোষিত অক্টোবর বিপ্লবের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার জন্য দেশের ও দশের মঙ্গলের দিকে বিশেষ নজর দেন। তিনি রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার আরম্ভ করেন এবং অনেকের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। সস্তা জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন লাভের জন্য তিনি ব্যবসায়ীদের ভীত সন্ত্রস্ত করে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক করেন, দুর্নীতি দমনের জন্য মারপিট ও গ্রেপ্তার করেন এবং দেশের অবস্থা স্বাভাবিক হলে তিনি সেনাবাহিনীতে ফিরে যাবেন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। দেশবাসী তার কার্যকলাপ ও প্রতিশ্রুতিতে সহজে বিশ্বাস করে তাকে সত্যিকার জনদরদি শাসক মনে করে এ বিপ্লবকে অভিনন্দন জানায়। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আইয়ুব খান ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ৭ আগস্ট 'পোডো' (Public office disqualification order) এবং 'এবডো' (Elective bodies disqualification order) নামে দুটি আদেশ জারি করে দেশের অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করেন। হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীও এই আইনের আওতায় পড়েন।

আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র

আইয়ুব খান সুচতুর রাজনীতিবিদ ছিলেন। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তিনি নানা পন্থা উদ্ভাবন করেন। তার অন্যতম একটি পন্থা ছিল 'মৌলিক গণতন্ত্র'। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ অক্টোবর 'অক্টোবর বিপ্লবের' প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারা ও বহুদিনের উদ্ভাবিত পরিকল্পনা পেশ করেন, যা ইতিহাসে মৌলিক গণতন্ত্র নামে অভিহিত। সংসদীয় গণতন্ত্র বর্জন এবং তদস্থলে মৌলিক গণতন্ত্র প্রবর্তনের পক্ষে তিনি যুক্তি দেখান যে, এদেশে শিক্ষিতের হার কম - বিধায় জনগণের মঙ্গলের জন্য পাশ্চাত্যের সংসদীয় গণতন্ত্র অপেক্ষা তার পরিকল্পিত গণতন্ত্রই এখানে ফলবতী হবে এবং জনগণ সহজে অংশগ্রহণ করতে পারবে। এই অভিনব পদ্ধতি অনুযায়ী ১০০০ থেকে ১৫০০ লোকের মধ্য থেকে একজন সদস্য বা মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচিত হবে। এভাবে দু'অঞ্চলের জন্য ৪০,০০০ করে মোট ৮০,০০০ মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচিত হবে এবং এই নির্বাচিত মৌলিক গণতন্ত্রীরাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন। এই নির্বাচিত মৌলিক গণতন্ত্রীদের আস্থা ভোটে আইয়ুব খান পাঁচ বছরের জন্য পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন (১৯৫৯)।

আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন সূচনা

১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ আতাউর রহমান খানের বাড়িতে পাকিস্তানে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের উপায় বের করার জন্য মিলিত হন। এ ঘটনায়, "দেশকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত”- এ অভিযোগ এনে আইয়ুব খান ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দীকে করাচিতে গ্রেপ্তার করে। এর প্রতিবাদে ১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিল বের হয়, যা ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এদিকে ১ মার্চ ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে আইয়ুব খান দ্বিতীয় সংবিধান ঘোষণা করলে পূর্ব বাংলার ছাত্র সমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা সমাবেশ ও ক্লাস বর্জন করে প্রতিবাদ জানায়। আইয়ুব খান জননিরাপত্তা অর্ডিনেন্স-এর বলে অনেক নেতৃবৃন্দকে কারারুদ্ধ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তোফাজ্জেল হোসেন (মানিক মিয়া), আবুল মনসুর আহমদ, কফিলউদ্দিন চৌধুরী, তাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখ এ দমন নীতির শিকার হন।

১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ জুন পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন নেতা সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে বলেন, এক ব্যক্তি প্রদত্ত (আইয়ুব খান) শাসনতন্ত্র গ্রহণযোগ্য নয় এবং জনপ্রতিনিধি কর্তৃক একটি স্থায়ী শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়। এই বিবৃতি 'নয় নেতার বিবৃতি' নামে প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করে। এর কিছু দিন পর সোহরাওয়ার্দীকে করাচির কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। তিনি মুক্তি পেয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। বিমানবন্দরে তিনি জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, "আমি নয় নেতার শামিল, আমার নম্বর দশ।" প্রচণ্ড বিক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় পরিষদের নির্বাচন ঘোষণা করেন (২৮ এপ্রিল, ১৯৬২)। নির্বাচনের একদিন আগেই শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক প্রাণ ত্যাগ করেন। বাঙালির অধিকার আদায়ের এই সংগ্রামী নেতার মৃত্যুতে পূর্ব পাকিস্তান থমকে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মহাযুগের অবসান হয়।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

Education Movement-1962

১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজ গণমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক গণতান্ত্রিক শিক্ষার দাবিতে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করে, যা 'বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন' নামে অভিহিত। ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন যৌথভাবে এ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন। ১৭ সেপ্টেম্বর হরতাল পালনকালে পুলিশের গুলিতে বাবুল, গোলাম মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ প্রমুখ নিহত হন এবং অনেকে আহত হন। ছাত্র আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খানের গদি কেঁপে ওঠে। এটা ছিল আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার প্রথম সফল গণঅভ্যুত্থান (১৭ সেপ্টেম্বরের আন্দোলনকে স্মরণ রাখতে তখন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি বছর ১৭সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসরূপে পালন করা হয়)। এ সময়ের গণঅভ্যুত্থানে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টায় NDF (Nation Democratic Front) গঠন করেন। এ আন্দোলনের ফলে সরকার হামিদুর রহমান কমিশনের সুপারিশ স্থগিত রাখেন। এ আন্দোলনের আরও গুরুত্ব ছিল যে, এ সময় থেকে ছাত্ররাই আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

Death of Suhrawardi and Reformation of Awami League

বৃদ্ধ বয়সে কারাবাস, অতিরিক্ত পরিশ্রম এবং মানসিক অশান্তির কারণে সোহরাওয়ার্দী হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তিনি চিকিৎসা ও বিশ্রামের জন্য ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে বৈরুতে যান এবং সেখানেই এক হোটেল কক্ষে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (৫ ডিসেম্বর, ১৯৬৩)। তাঁর মৃত্যুতে বাংলার রাজনৈতিক গগনে এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অভাবে NDF দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হয়। তিনি পার্টির সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সহচর শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত আওয়ামী লীগ NDF-এর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এদিকে মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের (মার্চ ও মে মাসের জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ) নির্বাচনে জয়লাভ করে দ্বিতীয়বারের মতো। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন আইয়ুব খান। ফাতেমা জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন 'সম্মিলিত বিরোধী দল' (Combined opposition party) আইয়ুব খানের দুর্নীতি ও অবৈধ ক্ষমতার নিকট হেরে যায়। নির্বাচনে আইয়ুব খান জয় লাভ করলেও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো উন্নয়ন হয়নি। গণঅসন্তোষ ধীরে ধীরে জাগতে থাকে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান অত্যন্ত সুকৌশলে জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে প্রবাহিত করতে তৎপর হন।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

Background of the Pakistan-India War of 1965

১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের পাক-ভারত যুদ্ধ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। কাশ্মীর সমস্যা বহুদিনের একটি অমীমাংসিত সমস্যা। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ বিভাগের সময় কাশ্মীর গণভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানের পক্ষে চলে যায়। কিন্তু তা ভারত মেনে নিতে পারেনি। কাশ্মীরকে ভারত অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতে থাকে। যে কারণে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এর পর পাকিস্তান ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে কাশ্মীরিদের সমর্থনে মুজাহিদ বাহিনী পাঠালে ভারতের সাথে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের একমাত্র লক্ষ্য ছিল যুদ্ধে ভারতকে পরাজিত করে ভারত শাসিত কাশ্মির অধিকার করা এবং কাশ্মিরকে পাকিস্তান রাষ্ট্রভুক্ত করা। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ৬ সেপ্টেম্বর ভারত এক বিরাট ট্যাংক বহর নিয়ে পাকিস্তানের সীমানা অতিক্রম করে লাহোর অভিমুখে অগ্রসর হলে আনুষ্ঠানিকভাবে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়। বাঙালি সৈন্যরা ভারতের এ আক্রমণ ব্যর্থ করে দিয়ে লাহোর শহর রক্ষা করে শৌর্যবীর্যের এক ইতিহাস সৃষ্টি করে। এই যুদ্ধ ১৭ দিন স্থায়ী হয়েছিল। যুদ্ধে পাকিস্তানের শোচনীয় অবস্থা অনুভব করতে পেরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পাশ্চাত্য শক্তি উভয়ই যুদ্ধ বন্ধ করতে আগ্রহী হয়। অবশেষে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে এই যুদ্ধের অবসান হয়। যুদ্ধ বিরতির পর সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী মি. কোসিগিনের আহ্বানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান উজবেকিস্তানের রাজধানী) তাসখন্দে মিলিত হয়ে "যুদ্ধ নয় শান্তি" চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন (১০ জানুয়ারি, ১৯৬৬ খ্রি.)। এই চুক্তি ইতিহাসে 'তাসখন্দ চুক্তি' নামে অভিহিত হয়। সে যাই হোক, চুক্তি অনুযায়ী উভয় দেশ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের সমস্যাগুলো সমাধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এই শান্তি চুক্তিতে যুদ্ধের মূল কারণ কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের কোনো কথা উল্লেখ ছিল না।

পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থান: যুদ্ধ চলাকালে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে পাক সরকারকে সমর্থন করে। কিন্তু যুদ্ধ
শেষে শান্তিচুক্তি পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই যুদ্ধ পশ্চিম পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ থাকে। স্বাভাবিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। তাই সেখানে শান্তি চুক্তির তীব্র প্রতিবাদ হয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। কারণ যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। প্রতিরক্ষার উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এ অঞ্চলের জনসাধারণ প্রতি মুহূর্তে নিরাপত্তার অভাব মারাত্মকভাবে অনুভব করে। এ সময় পূর্ব বাংলার অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। খাদ্য সামগ্রী যথেষ্ট পরিমাণ মজুত না থাকায় খাদ্য সংকট দেখা দেয়; যা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের উদাসীনতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। পূর্ব বাংলার এই চরম সংকটকালেও পূর্ব বাংলার সম্পদ অবাধে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য ব্যয় করা হতো। উপরন্তু যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্গঠন বাবদ ট্যাক্সের মোটা অঙ্কের বোঝা পূর্ব বাংলার উপর বর্তায়। অথচ পাকিস্তানের জন্মলগ্ন হতে এই অঞ্চল নানাভাবে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো। তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হতো। যুদ্ধ শেষে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব বাংলার সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার নানানctiv ষড়যন্ত্র চালাতে থাকে। রবীন্দ্র সংগীতকে বেতারে নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারের এই হীন কাজের বিরুদ্ধে দেশের জাগ্রত to বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র সমাজ তীব্র প্রতিবাদ জানায়।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

Unfair Treatment East Pakistan to West Pakistan

দ্বি-জাতি তত্ত্বের (Theory of two nation) ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। এ অংশ দুটির মধ্যে দূরত্ব হয় ১৫০০ মাইল। এই দূরত্ব শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বাস্তব ক্ষেত্রেও এই দূরত্ব ছিল পাহাড়সম। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান একটি উপনিবেশ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সর্বক্ষেত্রে চরম বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভক্তির পর থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্যসমূহের সংক্ষিপ্ত চিত্র এখানে তুলে ধরা হলো:

অর্থনৈতিক বৈষম্য

পাকিস্তানের শাসনামলে বাংলাদেশের ইতিহাস ছিল শোষণ আর বঞ্চনার ইতিহাস। তার বাস্তব চিত্র দেখা যায় অর্থনৈতিক বৈষম্যের খতিয়ানে। ১৯৪৭ সালে করাচিতে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাজধানী স্থাপিত হয়। এর উন্নয়নের জন্য ব্যয় হয় ২০০ কোটি টাকা। পরে আইয়ুব খান ইসলামাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করলে এর উন্নয়নের জন্য ব্যয় হয় ২০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী নামে পরিচিত ঢাকার উন্নয়নের জন্য ব্যয় হয় মাত্র ২ কোটি টাকা। ১৯৬৭খ্রিষ্টাব্দে ইসলামাবাদ নির্মাণের জন্য ব্যয় হয় ৩০০ কোটি টাকা এবং ঢাকার জন্য ব্যয় হয় ২৫ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় সরকারের সকল কার্যালয়, দেশ রক্ষার সদর দপ্তর, শিক্ষায়তন, স্টেট ব্যাংক, বিমা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিদেশি দূতাবাসের হেড অফিস ইত্যাদি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে বাংলাদেশের অর্জিত মুদ্রা অবিরামভাবে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতো। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় অর্থ চেকের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে সংগ্রহ করত। এই পক্ষপাতিত্বের ফলে বাংলাদেশে মূলধন গড়ে উঠতে পারেনি। পশ্চিম পাকিস্তানে অল্প সময়ের মধ্যে অসংখ্য শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। ব্যাংক, বিমা ও শিল্পের ৮০ ভাগ মালিকানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। বাংলাদেশে মূলধন গড়ে ওঠেনি এই অযুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ব্যবসায়-বাণিজ্যের লাইসেন্স, বৈদেশিক আমদানির সকল সুবিধা পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ীদের দেওয়া হতো। বিদেশ থেকে আমদানি করে পরে সেগুলো বাংলাদেশে রপ্তানি করা হতো। আমদানিকৃত দ্রব্যের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানকে অনেক বেশি মূল্য দিয়ে কিনতে হতো। ফলে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি লেগেই থাকত।

বাংলাদেশের পাট পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের প্রধান অবলম্বন ছিল এবং দুই-তৃতীয়াংশ বৈদেশিক মুদ্রা এই পাট থেকেই আসত। অথচ এই দেশের চাষিরা পাটের মূল্য পেত না। উপরন্তু এই পাট দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্প-কারখানায় চট, বস্তা, কাপড় ইত্যাদি প্রস্তুত করে আবার পূর্ব পাকিস্তানে চড়া দামে বিক্রি করত। ১৯৪৭-১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোট রপ্তানি আয়ে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ ছিল ৫৪.৭%। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আমদানি ব্যয় ছিল মাত্র ৩১.১৬%। পাকিস্তান তার সংগৃহীত রাজস্বের ৬২ ভাগ খরচ করত দেশ রক্ষায় এবং কেন্দ্রীয় সরকার ব্যয় করত ৩২ ভাগ। দেশ রক্ষার দফতর এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যালয় পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত থাকায় রাজস্বের শতকরা ৯৪ ভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হতো।

আইয়ুব খানের আমলের অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

বিষয়পশ্চিম পাকিস্তানপূর্ব পাকিস্তান
১৯৫০/৫১ থেকে ১৯৬৯/৭০ ব্যয়৬১৯৮ কোটি২৯৯৫ কোটি
১৯৫০/৫১ থেকে ১৯৬৯/৭০ মাথাপিছু ব্যয়৫২১ কোটি২৪০ কোটি
১৯৬০/৬১ সালে রাজস্ব৩৮ কোটি উদ্বৃত্ত৬০ কোটি ঘাটতি
দেশরক্ষা খাতে (৬০%)৫০%১০%
বেসামরিক খাতে (৪০%)২৫%১৫%
১৯৬৯/৭০ শিল্প-কারখানায় উৎপাদন।৪৬৭.৪ কোটি টাকা১৯০.৫ কোটি টাকা
বিভিন্ন উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা৮০%২০%
বৈদেশিক সাহায্য৯৬%8%
শিল্প ঋণ ও বিনিয়োগ কর্পোরেশন উন্নয়নে ব্যয়৮০%২০%
গৃহ নির্মাণ উন্নয়নে ব্যয়৮৮%১২%

মোট রাজস্বের ৬০% আসে পূর্ব পাকিস্তান থেকে। এখানে ব্যয় হয় ২৫%। অপরদিকে, ৪০% রাজস্ব আসে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। সেখানে ব্যয় হয় ৭৫%। সকল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই এভাবে বৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠে।

রাজনৈতিক বৈষম্য

পাকিস্তানি শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানে লোকসংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৫০ লক্ষ, পূর্ব পাকিস্তানে লোকসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৫০ লক্ষ। জনসংখ্যায় বাঙালিরা অধিক বলে তারা সর্বজনীন ভোটে সরাসরি নির্বাচনে সার্বভৌম আইনসভা গঠনের এবং গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার গঠনের দাবিদার। কিন্তু পশ্চিমারা সর্বদাই সে পদে বাধা সৃষ্টি করত। স্বৈরাচারী সরকার ঔপনিবেশিক * মনোবৃত্তির স্বার্থে পূর্ব বাংলাকে তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সকল ন্যায়সংগত স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। পশ্চিমা শাসকবর্গ দেশ বরেণ্য নেতা শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক ও শহিদ সোহরাওয়ার্দীকে কল্পিত দেশদ্রোহিতার অভিযোগে কারাগারে নিক্ষেপ করে। সামরিক আইন জারি করে বহু বাঙালিকে বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাগারে আটক রাখে। শেখ মুজিবসহ ৩৫ জনকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা পশ্চিমারা সর্বত্র কুক্ষিগত করে রাখত। এমনকি নির্বাচনে জয়লাভ করলেও ক্ষমতা নিয়ে তারা বিভিন্ন টালবাহানা করত। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ১৯৫৫, ১৯৫৮, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন।

শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য

শিক্ষা ও প্রশাসনের মতো উন্নয়নমূলক ক্ষেত্রেও দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা বিরাজমান ছিল। শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। অথচ ১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র সংখ্যা ছিল দ্বিগুণ। যেখানে ১৯৬৮-৬৯ সালে ২০ বছর পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৫ গুণ। অপর পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানে ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৩০ গুণ। ১৯৫৫-১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ২০৮৪ মিলিয়ন রুপি বরাদ্দ করা হয়। অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ৭৯৭ মিলিয়ন রুপি বরাদ্দ করা হয়। বিদেশি সংস্থা যেমন- এশিয়া ফাউন্ডেশন, কলম্বো প্লান, কমনওয়েলথ থেকে প্রদত্ত অধিকাংশ স্কলারশিপ বিতরণ করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের ছাত্রদের মাঝে। ফলে পূর্ব বাংলার ছাত্ররা দেশ বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কৃষি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ১৬টির মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান ১৩টি, পূর্ব পাকিস্তান ৩টি। একই বছরে যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭০ লক্ষ টাকা সেখানে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ কোটি ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বৈষম্য

প্রশাসনিক দিক থেকে পাকিস্তানের চালিকাশক্তি ছিল সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাগণ। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের যে মন্ত্রণালয় গঠিত হয় তার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাগণ নিয়োগ পান পশ্চিম পাকিস্তানে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মন্ত্রণালয়ের শীর্ষস্থানীয় ৯৫৪ জনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থাৎ বাঙালি ছিল ১১৯ জন। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ৪২০০০ কর্মকর্তার মধ্যে ২৯০০ জন কর্মকর্তা ছিলেন বাঙালি। করাচিতে রাজধানী হওয়ায় সকল সরকারি অফিস-আদালতে পশ্চিম পাকিস্তানিরা প্রশাসনের সকল পদগুলো দখল করেন। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানে গেজেটেড কর্মকর্তা ছিল ১৩৩৮ জন, পশ্চিম পাকিস্তানে এর সংখ্যা ছিল ৩৭০৮ জন। বহির্বিশ্বের সাথে পাকিস্তান সরকারের সুসম্পর্ক থাকায় নিয়োগপ্রাপ্ত ৬৯ জন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে ৬০ জনই পশ্চিম পাকিস্তানের ছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের ছিলেন মাত্র ৯ জন।
১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের তথ্য অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন বিভাগে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের কর্মচারীদের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে ছকের মাধ্যমে দেখানো হলো-

বিবরণপূর্ব পাকিস্তানপশ্চিম পাকিস্তান
প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারিয়েট১৯%৮১%
দেশরক্ষা৮.১%৯১.৯%
স্বরাষ্ট্র২২.৭%৭৭.৩%
শিক্ষা২৭.৩%৭২.৭%
তথ্য২০.১%৭৯.৯%
স্বাস্থ্য১৯%৮১%
কৃষি২১%৭৯%
আইন৩৫%৬৫%

১৯৫৬ সালের এক হিসাব অনুযায়ী

পদপশ্চিম পাকিস্তানপূর্ব পাকিস্তান
জেনারেল
লে. জেনারেল
মেজর জেনারেল২০
বিগ্রেডিয়ার৩৫
কর্নেল৫০

সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য

ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শন করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের ৫৬% বাঙালি থাকা সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকচক্র বাঙালির মুখের ভাষা "বাংলা ভাষা"কে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। মায়ের ভাষা মুছে ফেলে তারা উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। যাতে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। যদিও বাংলার দামাল ছেলেরা তাদের সে ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে দেয়নি।

বাঙালির ভাষার উপর শাসকগোষ্ঠী হামলা চালিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, বরং বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রচলিত করে এর মৌলিকত্ব নষ্ট করার চেষ্টা করে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল অবহেলিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু ছিলেন বলে তাঁর গান পাকিস্তানের বেতারে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। কাজী নজরুল ইসলামকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পরও তাঁর ইসলামি গানগুলো থেকে "হিন্দুয়ানি" শব্দসমূহ বাদ দিয়ে পরিবেশনের ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বিদেশি অপসংস্কৃতির দ্বারা গতিরোধের চেষ্টা করা হয়।

শেষান্তে বলা যায়, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পুঞ্জীভূত অবহেলা, Big Brother আচরণ, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক শোষণ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে উজ্জীবিত করে। ফলশ্রুতিতে স্বায়ত্তশাসনের দাবি শেষ পর্যন্ত বাঙালিদের মুক্তির সংগ্রামে গড়ায়।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

Six Points Programme and its Importance

পাকিস্তানের সৃষ্টিলগ্ন থেকে অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি আকাশ ছোঁয়া বৈষম্য এবং পাক-ভারত যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলার জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ ঘনীভূত হয়। এই যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানকে যেভাবে অরক্ষিত রাখা হয়েছে তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসীনতাকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর করের বোঝা চাপানো হয়। এর ফলে ক্রমশ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি গুরুত্ব পেতে থাকে। পূর্ব বাংলার জনসাধারণের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ লক্ষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলনে নেমে পড়েন। অনৈতিক ও অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ডের জন্য আইয়ুব খানের জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। দেশে 'তাসখন্দ চুক্তি' বিরোধী আন্দোলন জোড়ালো হতে থাকে। তাসখন্দ চুক্তিতে কাশ্মীর সমস্যার কোনো সমাধানের কথা উল্লেখ না থাকায় জনগণ একে অপমানজনক চুক্তি বলে মনে করে। দেশের এই রাজনৈতিক অচল অবস্থায় বিরোধী দলীয় নেতৃবৃন্দ ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য 'নিখিল পাকিস্তান জাতীয় কনফারেন্স' আহ্বান করেন। উক্ত কনফারেন্সে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার মুক্তির সনদ স্বরূপ ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। শেখ মুজিব তাঁর ৬ দফা দাবির যৌক্তিকতা সম্পর্কে বলেন, সাম্প্রতিক পাক-ভারত যুদ্ধের অভিজ্ঞতার আলোকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তা প্রবলভাবে দেখা দেয়। দেশ রক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দাবি একান্ত বাস্তব ও অপরিহার্য। সে বিষয়ে কারো দ্বিমতের অবকাশ নেই। তিনি আরও বলেন যে, দেশ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উভয় অঞ্চলের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন পাকিস্তানের জাতীয় সংহতিকে আরও শক্তিশালী
করবে।

১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে ৬ দফা কর্মসূচি অনুমোদন লাভকরে। ১৮ মার্চ ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ঐ প্রস্তাবগুলো ব্যাখ্যা সহকারে "আমাদের বাঁচার দাবি-৬ দফা” কর্মসূচি জনগণের মধ্যে পেশ করেন।

ছয় দফা দাবি (Six points programme)

১। ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকার ফেডারেশনরূপে গড়তে হবে। তাতে পার্লামেন্টারি পদ্ধতিতে সরকার থাকবে। সকল নির্বাচন প্রাপ্ত বয়স্কদের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। আইনসভাসমূহের সার্বভৌমত্ব থাকবে।
২। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মাত্র ২টি বিষয় থাকবে- প্রতিরক্ষা ও দেশ রক্ষা। অবশিষ্ট সমস্ত বিষয় স্টেটসমূহের (প্রদেশ) হাতে থাকবে।
৩। দুটি অঞ্চলের (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) জন্য হয় দুটি সম্পূর্ণ পৃথক অথচ সহজে বিনিময় যোগ্য মুদ্রার প্রচলন, থাকবে। আর একটি মুদ্রা থাকলে দুটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে, যাতে পূর্ব পাকিস্তানের মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে।
৪। সকল প্রকার ট্যাক্স, খাজনা, কর ইত্যাদি ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা আঞ্চলিক সরকারের হাতে থাকবে। ফেডারেল সরকার তার ব্যয় নির্বাহের জন্য আঞ্চলিক সরকার থেকে একটি অংশ গ্রহণ করবে। এ মর্মে রিজার্ভ ব্যাংকসমূহের উপর বাধ্যতামূলক বিধান শাসনতন্ত্রে থাকবে। এইভাবে জমাকৃত টাকাই ফেডারেল সরকারের তহবিল হবে।
৫। দুই অঞ্চলের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার আলাদা হিসাব রাখতে হবে এবং এই অর্থ সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকবে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার একটি অংশ পাবে। বিদেশে বাণিজ্য মিশন প্রতিষ্ঠা এবং আমদানি ও রপ্তানি ক্ষেত্রে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা আঞ্চলিক সরকারের হাতে থাকবে।
৬। দেশ রক্ষার ব্যাপারে স্বনির্ভরশীলতার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে আলাদা মিলিশিয়া বা প্যারামিলিটারি রক্ষীবাহিনী গঠন করতে হবে।

ছয় দফা দাবির গুরুত্ব (Importance of six points programme)

বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান ও মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে ছয় দফা কর্মসূচি। বাঙালির অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে এটি ছিল ম্যাগনাকার্টা। ম্যাগনাকার্টা হলো ব্রিটেনের রাজা কর্তৃক জনগণকে মৌলিক অধিকার প্রদানের এক প্রতিশ্রুতি। ১২১৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা জন একগুচ্ছ নাগরিক অধিকার জনগণকে প্রদান করেন, যা জনগণের স্বাভাবিক শোষণহীন সমাজে বেড়ে ওঠার রক্ষাকবচ। ৬ দফার মধ্যে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, জননিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ে পাকিস্তানের উভয় অংশের জনগণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। ছয় দফার স্বরূপই ছিল স্বাধীনতা। এই ছয় দফার মধ্যে সরাসরি স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলা হয়নি সত্য কিন্তু প্রতিটি দাবি বিশ্লেষণ করলে স্বায়ত্তশাসনেরই যথার্থতা মিলে। আসলেই এই দাবিগুলো ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রাণের দাবি, পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ও বাঙালির মুক্তির গ্যারান্টি। ছয় দফা দাবির মধ্যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ লুকায়িত ছিল। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৬ দফা দাবি উত্থাপন করায় আওয়ামী লীগ জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়'।

শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফার গুরুত্ব প্রসঙ্গে বলেছেন, "ছয় দফা বাংলার শ্রমিক-কৃষক-মজুর-মধ্যবিত্ত তথা আপামর মানুষের মুক্তির সনদ। ছয় দফা শোষকের হাত থেকে শোষিতের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার ছিনাইয়া আনার হাতিয়ার। ছয় দফা মুসলিম-হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধদের লইয়া গঠিত বাঙালি জাতির স্বকীয় মহিমার আত্মপ্রকাশ-আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের চাবিকাঠি। ছয় দফা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দীর্ঘ অনাচার ও বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে একটি বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।" ছয় দফার দাবি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ এই দাবিকে স্বাগত জানায়।

ছয় দফা দাবির জনপ্রিয়তায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ভীত হয়ে পড়ে এবং আন্দোলন দমনে আত্মনিয়োগ করে। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ছয় দফা দাবির বিরুদ্ধে সমালোচনামুখর হয়ে ওঠেন। তিনি শেখ মুজিব ও তার দলকে বিভেদকারী বলে অভিহিত করেন। তাদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে অস্ত্রের ভাষায় কথা বলবেন এবং গৃহযুদ্ধের হুমকি প্রদান করেন।

আইয়ুব খানের ইঙ্গিতে পুতুল গভর্নর মোনেম খান শেখ মুজিব ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের নেতা ও কর্মীর বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়ের করে। ৮ মে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের রাতে শেখ মুজিব ও তাঁর কয়েকজন বিশিষ্ট সহকর্মীকে পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনের বলে গ্রেফতার করা হয়। ছয় দফা সমর্থনকারী অনেক নেতা ও কর্মীকে একই আইনে কারারুদ্ধ করে নির্যাতন করা হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে ১৩ মে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে "প্রতিবাদ দিবস" পালিত হয়। অতঃপর ৬ দফার দাবিতে ৭ জুন পূর্ব বাংলায় গণ আন্দোলন ও হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এতদ্বসংক্রান্ত আন্দোলন ৭ জুনের আন্দোলন নামে খ্যাত। সরকারের হুশিয়ার বন্দী ও নির্যাতনকে উপেক্ষা করে ৭জুন পূর্ব বাংলায় হরতাল পালিত হয়। কলকারখানা, অফিস-আদালত বন্ধ থাকে। ধর্মঘটি জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বেপরোয়া গুলি চালায়। অনেকে প্রাণ হারায়। তখন থেকে পূর্ব বাংলায় ৭ জুন, ৬ দফা ও স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রতীক দিবস হিসেবে পালিত হয়।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

Historical Agartala Case (State Verses Sheikh Mujibur Rahaman and others)- 1968

ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা (Historical Agartala case)

বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবি আইয়ুব খানের পক্ষে মেনে নেওয়া কখনো সম্ভব ছিল না। তাই ছয় দফাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক চেতনা, স্বাধিকার আন্দোলন। এ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য আইয়ুব খান-মোনেম * খান নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষ ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ এনে এক মামলা দায়ের করে। শাসকগোষ্ঠীর অভিযোগ ছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ভারতের সহায়তায় সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় এক ষড়যন্ত্র করেছে। আগরতলা স্থানটির নাম অনুযায়ী এই মামলার নাম দেওয়া হয় আগরতলা মামলা। সরকারি নথিতে দায়েরকৃত এ মামলাকে রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য মামলা নামে অভিহিত করা হয়। ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন হাইকোর্টের বিচারপতিকে নিয়ে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। ছাত্র-জনতা এই মামলাকে পিণ্ডি ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করে। প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরও অনেক জন সৎসাহসী বাঙালি অফিসারকে দেশের শত্রু বলে চিহ্নিত করে তাঁদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ ও প্রতিবাদী আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়াই ছিল এ মামলার মুখ্য উদ্দেশ্য। ৩ জানুয়ারি ১৯৬৮, দায়ের করা এ মামলার আসামিদের নামের তালিকা:

১। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (গোপালগঞ্জ)

২। লে. কর্নেল মোয়াজ্জেম হোসেন (পিরোজপুর, বরিশাল)

২৩। স্টুয়ার্ড মজিবর রহমান (মাদারীপুর)

৪।এল, এস. সুলতান উদ্দিন আহমদ (নোয়াখালী)

১৫। এল, এস. নূর মোহাম্মদ (ঢাকা)

৬। জনাব আহমেদ ফজলুর রহমান সি. এস. পি. (ঢাকা)

৭। ফ্লাইট সার্জেন্ট মফিজুল্লাহ (নোয়াখালী).

৮। প্রাক্তন কর্পোরাল এ. এস. আবদুল সামাদ (বরিশাল)

৯। প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন (বরিশাল, বাকেরগঞ্জ)

১০। জনাব রুহুল কুদ্দুস সি. এস. পি. (খুলনা)

১১। ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক (বরিশাল সদর)

১২। ভূপতিভূষণ চৌধুরী-আনিক চৌধুরী (চট্টগ্রাম)

১৩। বিধান কৃষ্ণ সেন (চট্টগ্রাম)

১৪। সুবেদার আবদুর রাজ্জাক (কুমিল্লা)

১৫। হাবিলদার মুজিবুর রহমান ই. পি. আর. টি. সি. ক্লার্ক (কুমিল্লা)

১৬। ফ্লাইট সার্জেন্ট আবদুর রাজ্জাক (কুমিল্লা)

১৭। সার্জেন্ট জহিরুল হক (নোয়াখালী)

১৮। মোহাম্মদ খুরশীদ (ফরিদপুর)

১৯। কে. এম. শামসুর রহমান সি. এস. পি. (ঢাকা)

২০। রিসালদার এ. কে. এম. শামসুল হক (ঢাকা)

২১। হাবিলদার আজিজুল হক (বরিশাল, ভোলা)

২২। মাহফুজুল বারী (নোয়াখালী)

২৩। সার্জেন্ট শামসুল হক (নোয়াখালী)

২৪। মেজর ডা. শামসুল আলম (ঢাকা)

২৫। ক্যাপ্টেন মোঃ আবদুল মুত্তালিব (ময়মনসিংহ)

২৬। ক্যাপ্টেন শওকত আলী (ফরিদপুর)

২৭। ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা (বরিশাল সদর)

২৮। ক্যাপ্টেন এ. এস. এম নুরুজ্জামান (বরিশাল)

২৯। ফ্লাইট সার্জেন্ট আবদুল জলিল (ঢাকা)

৩০। মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী (সিলেট)

৩১। লে. এম. এস. এম. রহমান (যশোর)

৩২। সুবেদার এ. কে. এম. তাজুল ইসলাম (বরিশাল, ভান্ডারিয়া)

৩৩। মোহাম্মদ আলী রেজা (কুষ্টিয়া)

৩৪। ক্যাপ্টেন ডা. খুরশিদ উদ্দিন আহমেদ (ময়মনসিংহ)

৩৫। লে. আবদুর রউফ (ময়মনসিংহ)

আগরতলা মামলার কারণ (Causes of Agartala case)

আগরতলা মামলা বাঙালি জনগণ ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তৎকালীন পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র ও দমননীতিরই বহিঃপ্রকাশ। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তি সনদ হিসেবে ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করলে তাকে ও আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার হীন ষড়যন্ত্রে এ মামলা দায়ের করা হয়। নিম্নে আগরতলা মামলার কারণসমূহ উল্লেখ করা হলো:

১. ৬ দফা দাবি নস্যাৎ: ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক উত্থাপিত ৬ দফা দাবি নস্যাৎ করাই ছিল আগরতলা মামলার মুখ্য উদ্দেশ্য। ৬ দফার আন্দোলন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হলে স্বৈরাচারী আইয়ুব-মোনায়েম সরকার শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগকে জনবিচ্ছিন্ন করার জন্য আগরতলা মামলার নীলনকশা (Blueprint) তৈরি করে।

২. শেখ মুজিবসহ কতিপয় দেশ প্রেমিককে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা: ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আইয়ুব
সরকার পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের স্বার্থবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ আনয়ন করে। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে আরও ৩৪ জন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবসহ কতিপয় সৎসাহসী দেশ প্রেমিককে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা।

৩. বাঙালিদের মধ্যে একাত্মতার সংকট সৃষ্টি: তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের প্রতি প্রবল সমর্থন ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে যে একাত্মতার সৃষ্টি হয় তাতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শঙ্কিত হয়ে পড়ে। এই মামলার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে স্তব্ধ করে বাঙালিদের মধ্যে একাত্মতাবোধের সংকট সৃষ্টির প্রয়াস চালানো হয়।

৪. পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার ভিত শক্তিশালী করা আগরতলা মামলার একটি অন্যতম কারণ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার ভিত আরও শক্তিশালী করা। এজন্য তারা ঘৃণ্য আগরতলা মামলার আশ্রয় গ্রহণ করে শেখ মুজিবকে 'পাকিস্তানের শত্রু' এবং 'ভারতের দালাল' বলে প্রচার চালায়।

৫. স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন নস্যাৎ করা আগরতলা মামলার একটি কারণ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দীর্ঘদিনের স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন নস্যাৎ বা বানচাল করা। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে স্বায়ত্তশাসন প্রদানে গড়িমসি করে আসছিল।

৬. শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখা: পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শাসক গোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর শাসন ও শোষণের যে স্টিম রোলার চালিয়ে আসছিল তা অব্যাহত রাখাও এ মামলার অন্যতম কারণ বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন।

৭. গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ করা: পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী পাকিস্তানে অবাধ, সুষ্ঠু, সাধারণ নির্বাচনে অনীহা প্রকাশ করে আসছিল। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা পরাজিত হবে বলে তাদের মনে শঙ্কা ছিল। এই মামলার এটিও অন্যতম কারণ।

৮. বাঙালিদের দাবিয়ে রাখা বাঙালিরা তাদের ন্যায্য অধিকারে সব সময় সোচ্চার ছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু
করে যখনি পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের ওপর জুলুম করেছে তখনই বাঙালিরা রুখে দাঁড়িয়েছে। ছয় দফা দাবিকে কেন্দ্র করে যে জনস্রোত সৃষ্টি হয়েছিল তা থামিয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য বাঙালিদের দাবিয়ে রাখার জন্যই নেতৃস্থানীয় লোকদের বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা দায়ের করা হয় বলে অনেকে মনে করেন।

মামলার বিচার কার্যক্রম

আগরতলা মামলার আসামিদের ১৮ জানুয়ারি 'দেশরক্ষা আইন' থেকে মুক্তি দিয়ে আর্মি, নেভি এন্ড এয়ারফোর্স এ্যাক্ট আইনে গ্রেফতার দেখিয়ে কেন্দ্রীয় জেল থেকে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তরিত করা হয়। এ মামলার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য মে মাসে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। জুন মাসে বিচার শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি এস. এ. রহমান। বিচারের শুরুতে আসামিগণ নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। শেখ মুজিবুর রহমান একে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিকট থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাদের উপর অমানসিক অত্যাচার করে। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণে এই মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এটা যে পাকিস্তানের শাসকচক্রের হীন ষড়যন্ত্র ছিল তা বের হয়ে আসে। এই মামলা সাজিয়ে আইয়ুব খান চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছেন। এই মামলার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বলাবাহুল্য এ মামলা আইয়ুব খানের জন্য আত্মঘাতী হয়। প্রকৃতপক্ষে এই মামলাই তার পতন ডেকে আনে। বাঙালি জাতির মধ্যমণি শেখ মুজিবুর রহমানকে এই মিথ্যা মামলার আসামি করার প্রতিবাদে পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ছাত্ররা শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য নেতাদের মুক্তির জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করে। সরকার এই আন্দোলন দমন করার জন্য পুলিশ, ই.পি.আর. ও সামরিক বাহিনীকে তলব করে। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে এবং ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে এ আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

আগরতলা মামলার গুরুত্ব (Importance of Agartala case)

আগরতলা মামলার গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এ মামলার মধ্য দিয়ে পাক সাময়িকচক্রের হীন উদ্দেশ্য ফাঁস হয়ে যায় এবং পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। নিম্নে আগরতলা মামলার গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:
প্রথমত, জনগণ বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রের কথা বিশ্বাস করার পরিবর্তে এ মামলাকে বাঙালিদের স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনকে দমন করার জন্য পাকিস্তানি শাসকদের ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য করে। ফলে তাদের দের প্রতি বাঙালিদের অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।

দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতায় পরিণত হয়।

তৃতীয়ত, ৬ দফা ও ১১ দফা দাবি পূর্ব বাংলার সত্যিকারের গণদাবিতে পরিণত হয় রিণত হয়।

চতুর্থত, এ মামলাকে কেন্দ্র করে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। সরকার এ আন্দোলন নস্যাৎ
করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। সমগ্র দেশে ১৪৪ ধারা জারি করে। ।। কিন্তু পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাস্তায় নেমে আসে। পুলিশের গুলিতে আসাদ নিহত হলে (২০ জানুয়ারি) এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

পঞ্চমত, এ মামলাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র আইয়ুব বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হয়। আগরতলা মামলার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খান শেষ পর্যন্ত ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে সরে দাঁড়ান। এটা ছিল বাঙালিদের বিরাট বিজয়।

সর্বোপরি এ মামলা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয় এবং সরকারের গ্রহণযোগ্যতা হারায়।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

Mass Upsurge of 1969

তৎকালীন পাকিস্তানের ইতিহাসে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার, আমলা ও সামরিক চক্রের কর্তৃত্ব বিলোপের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ৮টি বিরোধী দল ১৯৬৯ সালের ৮ জানুয়ারি একত্রিত হয়। তারা 'গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ' নামে একটি জোট গঠন করে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলে। ফলে পাকিস্তানের মসনদ থেকে বিদায় নিতে হয় ১৯৫৮ সালের অক্টোবর বিপ্লবের নায়ক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে।

পটভূমি

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান বাঙালি জাতির জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বস্তুত প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সকল গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে ও সামরিক স্বৈরাচারের অবসান এবং অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের ৬ দফা এবং ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানে পরিচালিত তীব্র গণআন্দোলনই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। জেনারেল আইয়ুব

খানের এক দশকের সামরিক শাসনের নিগ্রহ ও দমনপীড়ন, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের দৈরত্বের অবসান, আগরতলা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, সর্বোপরি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পরিচালিত হয়। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের গোড়াপত্তন হয় ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ৬ দফা ঘোষণার মাধ্যমে। এ গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ- ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরের ৬ আরিখ থেকে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারির ২৩ তারিখের মধ্যে সংঘটিত হয়। এ সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলে গণআন্দোলন শুরু হলেও পূর্ব পাকিস্তানে এর তীব্রতা ছিল বেশি। ৬ দফার ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে বাঙালিরা উত্তাল হলে তাদের উপর নেমে আসে নির্যাতন, জেলজুলুম। ১৯৬৮ সালে আগরতলা মিথ্যা মামলায় বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এতে পূর্ব বাংলার জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং সৃষ্টি হয় গণঅভ্যুত্থান।

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের দুটি গ্রুপ এবং জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের একাংশ নিয়ে ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি একটি সর্বদলীয় 'ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়। দেশে যখন নেতৃত্বের অভাব ঠিক তখনই 'ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ' আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য এ সংগ্রাম পরিষদ ৬ দফাকে সঙ্গে নিয়ে ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের দাবি সম্মিলিত ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।

ছাত্রসমাজের এগারো দফা

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের উত্তাল দিনে ছাত্রসমাজের ১১ দফা কর্মসূচি জনগণের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আগরতলা মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আটক নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে সমগ্র পূর্ব বাংলায় যখন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল, তখন ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে পেশ করা হয় ১১ দফা কর্মসূচি। ছাত্রসমাজের ১১ দফা কর্মসূচি ছিল নিম্নরূপ:

দফা-১: আত্মনির্ভরশীল কলেজগুলোকে প্রাদেশিকীকর প্রাদেশিকীকরণের নীতি প্রত্যাহারে জগন্নাথ কলেজকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা, শিক্ষার ব্যাপক প্রসার, সরকারি কলেজসমূহে নৈশ বিভাগ চালু, ছাত্রদের বেতন ৫০% হ্রাস করা, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দান, শিক্ষকদের বাকস্বাধীনতা দান ও বেতন বৃদ্ধি, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ছাত্রদের বাসে ভ্রমণে ভাড়া হ্রাস করা, ছাত্রাবাসে উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান, জাতীয় শিক্ষা কমিশন ও হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিল ইত্যাদি।

দফা-২: প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচন ও পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রবর্তন করা।
দফা-৩: ৬ দফার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা।
দফা-৪: পশ্চিম পাকিস্তানে ক্ষুদ্র প্রদেশগুলোর জন্য স্বায়ত্তশাসন ও একটি সাব-ফেডারেশন গঠন করা।
দফা -৫: ব্যাংক, বিমা, পাটের ব্যবসা ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা।
দফা-৬: কৃষকদের কর ও খাজনা হ্রাস করা।
দফা-৭: শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, বোনাস, চিকিৎসা, বাসস্থান, ধর্মঘট ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার প্রদান।
দফা-৮: পূর্ব পাকিস্তানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জনসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার।
দফা-৯:জরুরি ব্যবস্থামূলক আইন, নিরাপত্তা আইন এবং অন্যান্য দমনমূলক আইন বাতিলকরণ।
দফা-১০: সিয়াটো, সেন্টো ও পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল এবং নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতি গ্রহণ।
দফা-১১: আগরতলা মামলায় আটক আসামি সহ সকল রাজবন্দিদের মুক্তি দান।

ঘটনাবলি

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা ও আওয়ামী লীগের ৬ দফা দাবির ভিত্তিতে ছাত্রজনতা ঐক্যবদ্ধ হলে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আন্দোলন ও ছাত্র সমাজের আন্দোলন একই মোহনায় মিলিত হলে এক প্রচণ্ড গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলন শুধু পূর্ব বাংলায়ই তীব্র আকার ধারণ করেনি পশ্চিম পাকিস্তানেও এর ঢেউ লাগে। সেখানে আইয়ুব খান বিরোধী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৮ জানুয়ারি থেকে ছাত্ররা তাদের ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ঐ দিন গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আহূত হরতাল জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করে। সরকার ১১ দফা আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। ১৪৪ ধারা জারি করেও আন্দোলনের ধারাকে প্রতিহত করা যায়নি। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় বেরিয়ে আসলে শুরু হয় পুলিশি নির্যাতন। ছাত্র বিক্ষোভের তৃতীয় দিন অর্থাৎ ২০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র জনতার ওপর পুলিশের নির্যাতন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। ছাত্রদের একটি বিক্ষোভ মিছিলের উপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামান নিহত হন (২০ জানুয়ারি দিনটি পরবর্তীতে আসাদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে)। দিন দিন আন্দোলনের গতি আরও তীব্র আকার ধারণ করে এবং তা গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। পুলিশ কর্তৃক ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সমগ্র প্রদেশে ধর্মঘট, মিছিল চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত গণবিক্ষোভ দমন করার জন্য শাসকগোষ্ঠী সেনাবাহিনী তলব করে এবং বিভিন্ন জায়গায় কারফিউ জারি করে। সেনাবাহিনী প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে গুলি চালিয়েও এ দুর্বার আন্দোলন স্তব্ধ করতে পারেনি। পশ্চিম পাকিস্তানেও এ সময় স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও জোরদার হয়। সমগ্র দেশে অরাজকতা দেখা দেয়। অবশেষে আইয়ুব খান গণআন্দোলনের নিকট নতি স্বীকার করেন।

দেশের অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে দেখে তিনি জাতীয় সমস্যাগুলো আলোচনার জন্য বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেন (১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ খ্রি.)। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও আগরতলা মামলায় আটক। সুতরাং তাকে ছাড়া আলোচনা বৈঠক নিরর্থক। কিন্তু আগরতলা মামলা প্রত্যাহার না করলে শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করতে অস্বীকৃতি জানান। এদিকে মাওলানা ভাসানীও গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। সমগ্র দেশব্যাপী আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের দাবি উঠে। ইতোমধ্যে দুটি ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলে। আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহরুল হককে ১৫ ফেব্রুয়ারি বন্দী অবস্থায় ক্যান্টনমেন্টে গুলি করে হত্যা করা হয়। জনতা তখনই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মামলার প্রধান বিচারকের বাড়িসহ কয়েকজন মন্ত্রীর বাড়ি, গাড়ি ও জনস্বার্থ বিরোধী প্রতিটি অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। পরদিন সংবাদ পাওয়া গেল যে, ১৭ ফেব্রুয়ারি সৈন্যরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের রিডার ড. শামসুজ্জোহাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ সংবাদে সারা দেশে বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান আন্দোলনের প্রচণ্ডতা লক্ষ করে ২১ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ ঘোষণা করেন যে, তিনি আগামী নির্বাচনে (১৯৭০ খ্রি.) আর প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবেন না। গণদাবিতে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খানকে বরখাস্ত করেন এবং তদস্থলে ড. এম.এন হুদাকে নিয়োগ করেন।

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেন। শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যরা কারাগার থেকে বিনাশর্তে মুক্তি পান। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল আসামিকে রেসকোর্স ময়দানে এক গণসংবর্ধনা দান করে। তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমদের সভাপতিত্বে এ জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলার নিপীড়িত জনগণের জন্য তার আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ 'বঙ্গবন্ধু' খেতাবে ভূষিত করা হয়। শেখ মুজিব তাঁর বক্তৃতায় জনগণের প্রতি তীব্র কৃতজ্ঞতা ও অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করেন। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, প্রস্তাবিত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি যোগদান করবেন এবং ছাত্রদের ১১ দফা ও আওয়ামী লীগের ৬ দফার ভিত্তিতে আলোচনা চালাবেন। তাঁর দাবি অগ্রাহ্য হলে তিনি দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন গড়ে তুলবেন।

১৯৬৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আহূত গোলটেবিল বৈঠক বসে। Democratic Action Committee-এর প্রতিনিধিগণ এবং বিচারপতি মুর্শেদ ও এয়ার মার্শাল আজগর খানের মতো স্বতন্ত্র নেতৃবৃন্দও এতে যোগ দেন। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টো, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজম খান এবং মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এতে যোগদান করেননি। স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে সকল আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যায়। বৈঠকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন না থাকায় শেখ মুজিবুর রহমান বৈঠক বর্জন করেন এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। ইতোমধ্যে গণআন্দোলন আরও তীব্রতর হয়। দেশের নানা স্থানে অরাজনৈতিক কার্যকলাপ ও হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে। আইন ও প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতির প্রচণ্ডতা লক্ষ করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের নিকট ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মার্চ ক্ষমতা হস্তান্তর করে রাজনীতি থেকে সড়ে দাঁড়ান। সঙ্গে সঙ্গে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের শাসনতন্ত্র ও জাতীয় পরিষদ বাতিল ঘোষিত হয়। একই সাথে দীর্ঘ দশ বছরের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে।

১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে যেসব ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে তাদের সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬)

মজলুম জননেতা নামে খ্যাত মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোহাম্মদ শরাফত আলী খান একজন নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক। মাতা মজিরন বিবি। তার বাল্য নাম চেকা মিয়া। বাল্যকালে তিনি ইরাক থেকে আগত পীর সৈয়দ নাসির উদ্দীন বোগদাদীর নিকট শিক্ষা লাভ করেন এবং তার পরামর্শে তিনি ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এখানে শিক্ষালাভের সময় তিনি দেশপ্রেমের দীক্ষা পান।

টাঙ্গাইল জেলার কাগমারিতে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি তৎকালীন জমিদারদের জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গুপ্তের বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হয়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নেন। এ সময় তিনি খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং দশ মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। জমিদার বিরোধী আন্দোলনের কারণে ব্রিটিশ শাসকদের রোষানলে পড়ে জন্মভূমি সিরাজগঞ্জ ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চলে যান আসামে। সেখানে গিয়েও তিনি নির্যাতিত কৃষক শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ান। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে আসামের ধুবড়ি জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে আয়োজিত বিশাল জনসভায় চরের বাঙালি কৃষক জনতা তাকে 'ভাসানী' উপাধিতে ভূষিত করে। সেই থেকে তিনি হলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। মজলুমদের প্রতি যেখানেই জুলুম হয়েছে সেখানেই তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন। সে কারণেই তাকে মজলুম জননেতা বলা হয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি আসামে আট বছর জেল খাটেন।

১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ভাসানী কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন। একই বছর আসামে বাঙালি নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে 'লাইনপ্রথা' চালু হলে এই প্রথা বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হকের সঙ্গে মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে যোগদান করেন (২২ ও ২৩ মার্চ, ১৯৪০)। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ বিভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। তিনি হন এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (১৯৪৯-১৯৫৭) এবং বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান হন যুগ্ম সম্পাদক। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের নিকট তিনি ছিলেন এক প্রতিবাদী মানুষ। ঐ বছর অর্থাৎ ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বিরুদ্ধে ভূখা মিছিলের নেতৃত্ব দিলে তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলে তিনি আবারও কারারুদ্ধ হন। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি এবং যুক্তফ্রন্টের অভূতপূর্ব সাফল্যে তার অবদান অপরিসীম।

মাওলানা ভাসানী তার দূরদর্শিতা দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানি শাসকদের শোষণের হাত থেকে বাঙালিদের বাঁচা সম্ভব নয়। তাই তিনি ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দেই পাকিস্তান থেকে পূর্ব বাংলাকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।
১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী "পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি" বাতিলের দাবি জানান। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী সে দাবি প্রত্যাখ্যান করলে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন (১৮ মার্চ, ১৯৫৭)। একই বছর তার নেতৃত্বে ২৫ জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে "ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি" (ন্যাপ) গঠিত হয় এবং তিনি হন এর সভাপতি। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি চীনের বিপ্লব দিবস (১ অক্টোবর)-এর উৎসবে যোগদানের জন্য পিকিং যাত্রা করেন। সেখানে ৭ সপ্তাহ অবস্থানকালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সেতুং ও চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই-এর সঙ্গে পাকিস্তান ও চীনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে আলোচনা করেন।

১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলে তখন স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার পেছনে তার অবদান অপরিসীম। তিনি ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর দেশব্যাপী 'প্রতিরোধ দিবস' এবং ৭ ডিসেম্বর হরতালের আহ্বান করেন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণঅভ্যুত্থানে তিনি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলনের তীব্রতায় ২২ মার্চ আগরতলার মামলা প্রত্যাহার এবং ২৫ মার্চ স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে বিভিন্ন জনসভায় তিনি বলেছিলেন, 'স্বাধীন বাংলাদেশ না দেখে তিনি মরবেন না।' এ সময় পশ্চিম পাকিস্তানকে তিনি ওয়ালাইকুম সালাম বলে চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতার কথা জানিয়ে দেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২-এর ২২ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রবর্তন করেন এবং পত্রিকা প্রকাশ (সাপ্তাহিক হক কথা), বিভিন্ন সভা সমিতিতে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি দেশের নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির জন্য সারা জীবন সংগ্রাম পরিচালনা করেন। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে তাঁর অবদান স্মরণীয়। রাজনীতির পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও তিনি স্মরণীয়। তিনি "দেশের সমস্যা ও সমাধান" (১৯৬২) এবং "মাও সেতুং-এর দেশ" নামে দুইখানা গ্রন্থ রচনা করেন। গোটা বাঙালিকে শোক সাগরে ভাসিয়ে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। তার মহা প্রস্থানে বাংলার রাজনীতিতে বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তার প্রতিষ্ঠিত টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে তাকে চিরতরে সমাহিত করা হয়। তার অমর বাণী, "অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, অধিকার আদায় করে নিতে হয় অনাড়ম্বর যাপিত জীবন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সংগ্রাম করে অধিকার আদায় তার জীবনের এই তিন শিক্ষা আমাদের চলার পাথেয়।

আসাদুজ্জামান (১৯৪২---১৯৬৯)

আসাদুজ্জামান ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জুন নরসিংদী জেলাধীন শিবপুর থানার ধানুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলহাজ্জ মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের। আসাদ ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে শিবপুর হাইস্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন (বর্তমান এসএসসি) এবং ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে বি. এ. অনার্স এবং ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে এম. এ. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সিটি 'ল' কলেজে এল, এল, বি.তে ভর্তি হন। এ সময় তিনি ছিলেন তৎকালীন কৃষক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং মাওলানা ভাসানীর রাজনীতির অনুসারী। সাংগঠনিকভাবে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের 'ঢাকা হল' বর্তমান 'শহিদুল্লাহ হল' শাখার সভাপতি ছিলেন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসনের 'বিরুদ্ধে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ২০ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে এক ছাত্রসভা আহ্বান করে। সভায় শহরের

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার ছাত্র যোগদান করে। তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে একটি মিছিল বের করে। মিছিলের এক অংশ মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তা ধরে চাঁনখাঁর পুলের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ গুলি বর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে আসাদের বক্ষ বিদীর্ণ হয়। সাথে সাথে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করে। এ হত্যাকাণ্ডে ২১ জানুয়ারি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হরতাল পালিত হয় এবং পল্টন ময়দানে এক বিশাল গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আসাদ হত্যার প্রতিবাদে ২২ ও ২৩ জানুয়ারি 'শোক দিবস' এবং ২৪ জানুয়ারি প্রতিবাদ দিবস পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির শেষ দিনটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। ফলে এ ঘটনার মাত্র দুমাসের মধ্যে আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা ও তাঁর সরকারের পতন ঘটে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় জীবনে একুশের মতোই এক গৌরবময় অর্জন। এই অর্জনের অন্যতম কাণ্ডারি মৃত্যুঞ্জয়ী ছাত্র নেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনিই উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহিদ।

মতিয়ুর রহমান (১৯৫৭-১৯৬৯)

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণঅভ্যুত্থানে ১২ বছরের যে শিশুটি শহিদ হন তিনি হলেন মতিযুর রহমান। ২৪ জানুয়ারি ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মতিযুর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আজহার আলী মল্লিক একজন ব্যাংক কর্মচারী। মতিয়র রহমান ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন।

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জানুয়ারি আসাদ হত্যার প্রতিবাদে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ঢাকা নগরী মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। মিছিলের উপর পুলিশ গুলি চালালে ৬ জন নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়। এই হত্যার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি দেশব্যাপী ধর্মঘট ডাক দেয়। ধর্মঘটের আহ্বানে সারা দিয়ে সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। ছাত্র-জনতার 'উপর পুলিশ গুলি চালালে মতিয়ুর রহমান শহিদ হন (২৪ জানুয়ারি, ১৯৬৯)। 'অকুতোভয় এই কিশোর মিছিলের পুরোভাগে থেকে বাঙালিদের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। তার আত্মত্যাগে আন্দোলন আরও তীব্র হয়। মতিযুরের জীবন উৎসর্গ বৃথা যায়নি। গণঅভ্যুত্থান সফল হয়। গণ আন্দোলনের মুখে আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে (২৫ মার্চ, ১৯৬৯)। মতিয়র বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম শহিদ।

সার্জেন্ট জহুরুল হক (১৯৩৫-১৯৬৯)

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণঅভ্যুত্থানে সারা দেশ যখন উত্তাল তখন পাক বাহিনী অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে আগরতলা মামলার ১৭ নং আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করে (১৫ ফেব্রুয়ারি)। সার্জেন্ট জহুরুল হক ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে নোয়াখালী জেলা স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করার পর ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগদান করেন। ক্রমে সার্জেন্ট পদে উন্নীত হন। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে' সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় গ্রেফতার হন এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক হন। এ সম্পর্কে প্রেসনোটে বলা হয়, "গত মাসে (ডিসেম্বর, ১৯৬৭) পূর্বপাকিস্তানে উদঘাটিত জাতীয় স্বার্থবিরোধী এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে এদের গ্রেফতার করা হয়েছে।" সরকার এই ষড়যন্ত্রকে "আগরতলা ষড়যন্ত্র" বলে অভিহিত করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে এ মামলার ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলায় ১৭ নম্বর আসামি করা হয় সার্জেন্ট জহুরুল হককে।

প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে আইয়ুব সরকার এই মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। মামলার শেষ তারিখ ছিল ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। আইয়ুব খান যখন রাজনৈতিক দলগুলোকে গোল টেবিল বৈঠকে বসতে প্রস্তাব করেছিল ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী অবস্থায় একটি ক্ষুদ্র ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাবিলদার মনজুর শাহ কর্তৃক নিহত হন (১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯)। তাঁর এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আন্দোলন বেগবান হয়। আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে। তাঁর আত্মত্যাগ পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে। মান্দোলনকে শানিত করে। সার্জেন্ট জহুরুল হক বাঙালি জাতির সূর্য সন্তান।

ড. মুহম্মদ শামসুজ্জোহা (১৯৩৪-১৯৬৯)

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে আর একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মুহম্মদ শামসুজ্জোহাকে হত্যা। এ হত্যাকাণ্ড দিয়ে পাক সেনাবাহিনী পৈশাচিকতার আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
ড. মুহম্মদ শামসুজ্জোহা ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ আগস্ট পশ্চিম বাংলার বাকুড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে বাকুড়া জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে বাঁকুড়া ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে আই. এসসি পাস করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিভাগে ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে বি. এসসি অনার্স এবং ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে এম. এসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে লেকচারার পদে যোগ দেন। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে রিডার পদে উন্নীত হন। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রক্টরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং ছাত্রদের আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ

করেন। তিনি ছাত্রদের বলেছিলেন, "সেনাবাহিনী যদি গুলি চালায় তাহলে আমার বুকের উপর দিয়ে প্রথমে চালাতে হবে, তোমাদের নয়।" তিনি নিজের জীবন দিয়ে একথা প্রমাণ করে গেছেন। আন্দোলন চলা অবস্থায় ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে এই অকুতোভয় সেনানীকে হত্যা করে। তাঁকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে চিরতরে সমাহিত করা হয়। তার নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ড. শামসুজ্জোহা হল'-এর নামকরণ করা হয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে জীবন দিয়ে তিনি যে আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তা বাঙালি ছাত্র-শিক্ষকদের চিরকাল অনুপ্রেরণা যোগাবে।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল ও তাৎপর্য

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৪ বছরের যুক্ত পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে যতগুলো 'ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে ১৯৬৯ সালের 'গণঅভ্যুত্থান' একটি ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এ অভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের পতনের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার গণমানুষের বিজয় অর্জিত হয়। এ বিজয় এটা প্রমাণ করে যে পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি চায়। এ আন্দোলনের বিশেষ ফলাফল ও তাৎপর্য ছিল-

(ক) রাজবন্দিদের মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহার: ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল সর্বদলীয়
ছাত্র সংগ্রাম কমিটি' (Student Action Committee-SAC) এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটি (Democratic Action Committee -DAC)। SAC এর ১১ দফা এবং DAC-এর ৮ দফার ভিত্তিতে গণঅভ্যুত্থান পরিচালিত হয়। ১১ দফা ও ৮ দফার অন্যতম দাবি ছিল সকল রাজবন্দিদের মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহার। এছাড়া সভা-সমাবেশে, মিছিলে-স্লোগানে গণমানুষের দাবি ছিল এটা। সুতরাং গণঅভ্যুত্থানের প্রবল জনদাবির মুখে সরকার বাধ্য হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ শে'ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়।

(খ) গোলটেবিল বৈঠকের আহ্বান: গণঅভ্যুত্থানের চাপে পড়ে আইয়ুব খান ১৭ই ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠকের ঘোষণা দেন। কিন্ত তখনও শেখ মুজিবুর রহমান এর নিঃশর্ত মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহার না করায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। অবশ্য ২২শে ফেব্রুয়ারি রাজবন্দিদের মুক্তির পর ২৬শে ফেব্রুয়ারি উক্ত গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সরকার মূলত গণআন্দোলনে নতি স্বীকার করে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করতে বাধ্য হয়।

(গ) আইয়ুব ও মোনায়েমের পতন: ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের ফলে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ১৯৫৮ সালে এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আইয়ুব খান জোর করে পাকিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক গভর্নরের পদ গ্রহণ করেন। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২০ শে মার্চ বাংলার দ্বিতীয় মীর জাফর নামে খ্যাত মোনায়েম খান অপসারিত হয়। ২৫ শে মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

(ঘ) স্বৈারাচার বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি: ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনসাধারণের মাঝে স্বৈরাচার বিরোধী
আন্দোলন জাগ্রত হয়। জেনারেল আইয়ুব খান একজন স্বৈরাচারী শাসক হলেও প্রথম দিকে তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো আন্দোলন দানা বাঁধতে পারেনি। আইয়ুব খান তা কঠোরভাবে দমন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ঊনসত্তরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে গণঅভ্যুত্থানের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল সে জোয়ারে আয়ুব-মোনায়েমের গদি ভেসে যায়।

(ঙ) অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মপরিচিতি: ১৯৬৬ সালে ৬ দফা ঘোষণার মাধ্যমে শেখ
মুজিবুর রহমান গণমানুষের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। এ আন্দালনে এটা প্রমাণিত হয় যে শেখ মুজিবুর রহমান গণমানুষের কত প্রিয় নেতা এবং এও প্রমাণিত হয় যে তাঁর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত আগরতলা একটি ষড়যন্ত্র মামলা। গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম একটি দাবি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তি, তিনি এবং অন্যান্য রাজবন্দিরা ২২ শে ফেব্রুয়ারি নিঃশর্ত মুক্তি লাভ করেন। ২৩ শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম কমিটির (SAC) উদ্যোগে শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ দিন প্রায় ১০ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে ডাকসুর তৎকালীন ভিপি তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' (বাংলার বন্ধু) উপাধিতে ভূষিত *করেন। এভাবে শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু ও গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা।

(চ) বাঙালি জাতীয়তাবাদের দৃঢ়করণ ও এক্যবদ্ধকরণ: বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তার প্রথম স্ফুরণহয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে এ জাতীয়তাবাদ আস্তে আস্তে বিস্তার লাভ করতে থাকে। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান জাতীয়তাবাদ জাগ্রতর একটি চূড়ান্ত মাইলফলক। এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্যে এগিয়ে যায়।

(ছ) ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত হয়েছিল তার প্রভাবেই ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।

(জ) স্বাধীনতার ক্ষেত্র প্রস্তুত : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ব
প্রস্তুতি। এ আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মুখোশ উন্মোচিত হয়। গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে আইয়ুব খানের পতন হয়। আইয়ুব খানের এ পতন বাংলাদেশি স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। গণঅভ্যুত্থানের প্রভাবেই সত্তর-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে। বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা যাতে হস্তান্তর করতে না হয় সেজন্য ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। বাঙালিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে চূড়ান্ত স্বাধীনতা সংগ্রামে। অর্জন করে হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন স্বাধীনতা। মূলত উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সাফল্যই জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালিদের পরিচালিত যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান - ছিল সবচেয়ে ব্যাপক ও গণসম্পৃক্ত আন্দোলন। ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের পথ ধরেই বীর বাঙালিরা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়। অতএব, বাঙালি জাতির রাজনৈতিক বিকাশ তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান একটি তাৎপর্যবাহী ঐতিহাসিক ঘটনা।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

The Election of 1970

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সামরিক শাসক যখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পূর্বপাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের ওপর একের পর এক নিপীড়নমূলক আচরণ করে তখনই এদেশের জনগণ তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। যার অনিবার্য পরিণতি ছিল ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণ-অভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থানে ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করলে তার উত্তরসূরি জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। তিনি ঘোষণা করেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন করলেও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি করে। এক পর্যায়ে তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে এবং শেষ পর্যায়ে এদেশের নিরীহ মানুষের ওপর আক্রমণ করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে পূর্বপাকিস্তানের (পূর্ববাংলা) মানুষ মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বাংলা শত্রুর দখলমুক্ত হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ এক বেতার ভাষণে পরবর্তী নির্বাচন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এরই ধারবাহিকতায় ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি থেকে সর্বপ্রকার বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে পুনরায় রাজনৈতিক তৎপরতার অনুমতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদ এবং ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা পিছিয়ে ৭ ডিসেম্বর এবং ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য ১২ নভেম্বর পূর্বপাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হওয়ায় ঐ সব অঞ্চলে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

আইনগত কাঠামো আদেশ

ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণে নির্বাচন সংক্রান্ত আইনগত কাঠামো আদেশ (Legal Framework Order) কাঠামোর মূলধারাগুলো ঘোষণা করেন। সেখানে তিনি মূলত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যসংখ্যা কত হবে, ভোটদানের প্রক্রিয়া কী হবে, কতদিনের মধ্যে নির্বাচিত পরিষদ সংবিধান রচনা করবে এবং পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য বিশেষ কিছু দিক তুলে ধরেন। তবে ঘোষণার বিশেষ দিকগুলো ছিল-

১। পশ্চিমপাকিস্তানে এক ইউনিট ভেঙে দিয়ে সাবেক প্রদেশগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হবে। এগুলো ১ জুলাই, ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হবে।
২। ১৩ জন মহিলা প্রতিনিধি নিয়ে ৩১৩ আসনের জাতীয় পরিষদ হবে, আর ৬২১ জন সদস্য নিয়ে হবে পাঁচটি প্রাদেশিক পরিষদ।

সারণি-১:

অঞ্চলজাতীয় পরিষদপ্রাদেশিক পরিষদ
সাধারণমহিলামোটসাধারণমহিলামোট
পূর্ব পাকিস্তান১৬২১৬৯৩০০১০৩১০
পাঞ্জাব৮২৮৫১৮০১৮০
সিন্ধু২৭২৮৬০৬২
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত১৮১৯৪০৪২
বেলুচিস্তান8২০২১
কেন্দ্র শাসিত উপজাতি এলাকা----
মোট =৩০০১৩৩১৩৬০০২১৬২১

৩। নির্বাচনে এক ব্যক্তি এক ভোটনীতি গ্রহণ করা হয়। পাকিস্তানে দুই অংশের আইন ও অর্থনীতি বিষয়ক দায়িত্ব ও ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্ধারণ করবেন।
৪। ভোটার তালিকা ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের জুনের মধ্যে তৈরি হবে।
৫। সংবিধান রচনার জন্য পরিষদের প্রথম অধিবেশন থেকে ১২০ দিনের সময় ধার্য করে দেন। এ সময়ের মধ্যে কাজ সমাধা করতে ব্যর্থ হলে পরিষদ ভেঙে নতুন নির্বাচনের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বলা হয়, সংবিধান রচনা এবং সংবিধানকে সংজ্ঞায়িতকরণ পর্যন্ত সামরিক শাসন বহাল থাকবে। নির্বাচনের নির্দেশনাবলির পাশাপাশি সংবিধানের ভিত্তি সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইনগত কাঠামো আদেশের ২০ নং ধারায় সংবিধানে মূল ছয়টি নীতি বেঁধে দেওয়া হয়। যথা:

(ক) ফেডারেল পদ্ধতির সরকার।
(খ) ইসলামি আদর্শ হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি।
(গ) প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন।
(ঘ) মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
(ঙ) নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিভিন্ন এলাকার মধ্যকার অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বৈষম্য দূর করতে হবে।
(চ) বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

ইয়াহিয়া খানের আইনগত কাঠামো আদেশে মূলত সার্বভৌম পার্লামেন্টের বদলে একটি দুর্বল পার্লামেন্টের রূপরেখা দেওয়া হয়। ফলে পূর্বপাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো এর সমালোচনা করে। তারা এ আদেশের অগণতান্ত্রিক ধারাসমূহ বাদ দেওয়ার দাবি জানায়।

নির্বাচন ব্যবস্থাপনা

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২ জুলাই ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা অনুযায়ী পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্টের বিচারক বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। এ নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক কাজ ছিল একটি সার্বজনীন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা। এ তালিকার মধ্যে পূর্বপাকিস্তানের ভোটার সংখ্যা ছিল ৩,১২,১৪,৯৩৫ জন এবং পশ্চিমপাকিস্তানের ২,৫২,০৬,২৬৩ জন। এ ভোটার তালিকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে আওয়ামীপন্থি দলগুলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেও দলীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এককভাবে নির্বাচনের কথা ঘোষণা করেন। ফলে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে দলগুলো পৃথক পৃথকভাবে প্রার্থী মনোনীত করেন। এই নির্বাচনে (সারণি-১) জাতীয় পরিষদে আসন সংখ্যা ছিল ৩০০ এবং মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ১৩টি। এর মধ্যে পূর্বপাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত। নির্ধারিত হয়েছিল সাধারণ ১৬২ এবং মহিলা ৭টি। ১৬২টি আসনের জন্য দলভিত্তিক প্রার্থীসংখ্যা ছিল নিম্নরূপ:

সারণি-২:

দলনির্বাচনের প্রতীকপ্রার্থীসংখ্যা
আওয়ামী লীগনৌকা১৬২
মুসলিম লীগ (কনভেনশন)সাইকেল৯৩
মুসলিম লীগ (কাইউম)বাঘ৬৫
মুসলিম লীগ (কাউন্সিল)হারিকেন৫০
জামায়াতে ইসলামীদাঁড়িপাল্লা৬৯
জমিয়াতুল উলেমা ও নেজামে ইসলামিবই৪৫
জামায়াতে উলামায়ে ইসলামখেজুর গাছ১৩
শর্ষিণার পিরের ইসলামিয়া গণতন্ত্রী দলগাভি
পাকিস্তান দরদি সংঘগরুর গাড়ি
কৃষক-শ্রমিক পার্টিহুঁকা
ন্যাপ (ভাসানী)ধানের শীষ১৫
ন্যাপ (মোজাফফর)কুঁড়ে ঘর৩৬
পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগলাঙল১৩
বেলুচিস্তান যুক্তফ্রন্টচেয়ার
পিডিপিছাতা৮১
দলনির্বাচনের প্রতীকপ্রার্থীসংখ্যা
জাতীয় গণমুসলিম (সংখ্যালঘু)মোমবাতি8
জাতীয় কংগ্রেস (সংখ্যালঘু)কলস8
স্বতন্ত্র প্রার্থী ১০৯
মোট = ৭৬৯

নির্বাচনের ফলাফল

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন লাভ করে। সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ আওয়ামী লীগ মোট ১৬৭টি আসন লাভ করে জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। (সারণি-৩) আবার ১০ দিন পর অনুষ্ঠিত পূর্বপাকিস্তানি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে। (সারণি-৪) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
সারণি-৩: ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ফলাফল:

অতএব, দেখা যাচ্ছে জাতীয় পরিষদে ৩১৩টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন আওয়ামী লীগ লাভ করে (নৌকা প্রতীক নিয়ে)। পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টি ৮৮টি আসন লাভ করে। উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে এবং পিপলস পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে কোনো আসন লাভ করেনি। ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ৩১০টি (মহিলা ১০) আসনের মধ্যে ২৯৮টি (২৮৮+ মহিলা ১০টি) আসন লাভ করে আওয়ামী লীগ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে জয়লাভকরে। ১৪ জানুয়ারি ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন। কিন্তু ভুট্টো গভীর ষড়যন্ত শুরু করে। এদিকে লাহোরে ভারতীয় বিমান 'গঙ্গা' হাইজ্যাক, বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ইত্যাদির অজুহাতে ঢাকায় অধিবেশনের পরিবেশ নেই দেখিয়ে ১লা মার্চ ১৯৭১ ইয়াহিয়া খান অকস্মাৎ ঘোষণা করলেন যে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত থাকবে। এ ঘোষণাতেই শুরু হয় স্বাধিকার আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রভাব ও গুরুত্ব (Impact and importance of the election of 1970)

প্রভাব: বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচন অনন্য ভূমিকা রাখে। এর প্রভাব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষ ভাগ হওযার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান তার ভাষা ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে স্বাধীনতা দাবি করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে এবং ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে (আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে)। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে সাধারণ নির্বাচন না হলে এবং আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হয়তো বা লাভ করা সম্ভব হতো না। কেননা ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে জয়লাভের প্রভাবে বাঙালিরা আত্ম বলীয়ানে বলীয়ান হয়ে ওঠে। বাঙালিদের আত্মবিশ্বাস অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচিত সদস্যদের নিয়েই ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় (১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করে)। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুজিবনগর সরকারই নেতৃত্বে দিয়েছিল। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ফলাফলের ভিত্তিতেই ১৪ জানুয়ারি ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী বলে সম্বোধন করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি ভুট্টোর পরামর্শে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ববাংলার জনগণ উত্তেজিত হয়। ইয়াহিয়া খান অত্যন্ত সুকৌশলে নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা না দিয়ে সেনাবাহিনী লেলিয়ে দেন। শুরু হয় বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রাম। বাঙালিরা বুকের রক্ত দিয়ে তা প্রতিহত করে এবং ছিনিয়ে আনে বিজয়।

গুরুত্ব: বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনের গুরুত্ব বলার অপেক্ষা রাখে না।
বস্তুতপক্ষে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচন তিন দিক থেকে গুরুত্ব বহন করে, যথা:
১. এ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সাফল্য বাঙালিদের ঐক্য জোরদার করে। তারা আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে ওঠে, যা স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।
২. এ নির্বাচনে বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন-শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবার দৃঢ় আশা ব্যক্ত করে। আওয়ামী লীগ যে বাঙালিদের একমাত্র প্রতিনিধি তা এ নির্বাচনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৩. এ নির্বাচনের মাধ্যমেই বাঙালিরা বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাক-শাসকচক্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং সর্বশক্তি দিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

সুতরাং একথা বলা যায়, ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনের পথ ধরেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জিত হয়।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

Non-co-operation Movement

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভূতপূর্ব বিজয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদীরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ঘোষণা করেন, "পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত সদস্যদের ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে দেওয়া হবে না। এরপরও জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলে তা কসাইখানায় পরিণত হবে।" ভুট্টোর পরামর্শে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১ মার্চের এক ঘোষণায় ইয়াহিয়া খান বললেন, “৩ মার্চের ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।" এ ঘোষণার ক্ষেত্রে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে কোনো প্রকার আলাপ-আলোচনা প্রয়োজনবোধ করলেন না। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের সিদ্ধান্তের পেছনে তিনি দুটি কারণ উল্লেখ করেন- (১) পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল পি.পি.পি. এবং অন্যান্য কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদান না করার সিদ্ধান্ত এবং (২) ভারত কর্তৃক পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অস্থিরতা সৃষ্টি। অবশ্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেন, দেশে যে মুহূর্তে স্বাভাবিক ও সুস্থ অবস্থা ফিরে আসবে তখনই তিনি কালবিলম্ব না করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করবেন। বাস্তব ক্ষেত্রে এটা ছিল তাঁর রাজনৈতিক চাতুরতা। পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে, যে কারণ দেখিয়ে ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা দেন তা একটি অযুহাত মাত্র। এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে।

জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার অব্যবহিত পরই পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর এস. এম. আহসান যিনি বাঙালিদের দাবি-দাওয়া ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন তাকে সরিয়ে তাঁর স্থলে গভর্নর হিসেবে লে. জে. টিক্কা খানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। (বেলুচিস্তানের কশাই হিসেবে টিক্কা খানের কুখ্যাতি রয়েছে)। মূলত ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা এবং প্রতিশ্রুতি দেশবাসীকে সন্দিহান করে তোলে। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে এর প্রতিবাদ প্রবল হয়ে ওঠে। জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে মিছিলে অংশগ্রহণ করে। ২ মার্চ আ.স.ম রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের দাবিতে সাড়া দিয়ে ৩ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন এবং সায়া পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণ দিবস হরতালের আহ্বান করেন। সামরিক কর্তৃপক্ষ এদিন শহরে সান্ধ্য আইন জারি করে।

৩ মার্চ বিকালে পল্টন ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ জনসভার আয়োজন করে। সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে এ জনসভায় জনতার ঢল নামে। এ জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান অভিযোগ করে বলেন যে, যখন জাতীয় পরিষদের সব সদস্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কতিপয় সদস্য ঢাকায় উপস্থিত হলেন, তখন অধিবেশন স্থগিত রেখে কেবলমাত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকেই ব্যাহত করা হয়েছে। এ জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারকে পুলিশের নির্যাতন ও সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করতে বলেন এবং একই সাথে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত কর প্রদান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। তিনি একে জাতীয় সংগ্রাম বলে অভিহিত করেন এবং এ সংগ্রামে জনগণের অংশগ্রহণকে অপরিহার্য বলে মনে করেন। শেখ মুজিবুর রহমান নিরস্ত্র মানুষের মৃত্যুর জন্য সরকারকে দায়ী করেন। এর প্রতিবাদস্বরূপ তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অনির্দিষ্টকালের জন্য অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। মাওলানা ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, নুরুল আমীন সহ অন্যান্য নেতারা আওয়ামী লীগ আহূত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করেন। সারা দেশব্যাপী শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। জনগণ অকুণ্ঠভাবে অসহযোগ আন্দোলন সফল করে তোলে।

অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব ও গুরুত্ব (Impact and importance of non-cooperation movement)

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পূর্ব প্রস্তুতি। এ আন্দোলন পাকিস্তান শাসনের ভীতকে দুর্বল করে দেয়। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালিদের মনে পাকসেনাদের ভয় দূরীভূত হয়। মূলত ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই ২৪ দিন পূর্ববাংলা অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যেই ছিল। এসময় সবকিছু অচল অবস্থায় থাকে এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পূর্ববাংলার শাসন কার্য পরিচালিত হয়। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে পূর্ববাংলার সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস, সচিবালয়, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, আদালত, পুলিশ প্রশাসন, ব্যাংক-বিমা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রেলওয়ে পাকিস্তান সরকারের নির্দেশ অমান্য করে। খাজনা-ট্যাক্স আদায় বন্ধ হয়ে যায়। ইয়াহিয়া সরকার কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে যোগদানের জন্য। এর প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ১৪ মার্চ' ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ১৫ দফার এক নির্দেশনায় সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর-খাজনা, বন্ধ ঘোষণা করেন। [মোট কথা অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাবে সেনাবাহিনী ব্যতীত পূর্ব পাকিস্তানের সকল ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।]

গুরুত্ব: ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী সাংবিধানিক উপায়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা শুরু করে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে সমগ্র বাঙালি জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এর পর অসহযোগ আন্দোলন স্বাধিকার আন্দোলনের পথ বেয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ লাভ করে। চারদিকে 'জয় বাংলা', তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ, 'পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা', 'জনগণের একদফা বাংলার স্বাধীনতা', 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর' প্রভৃতি স্লোগানে বাঙালি জনগণ মুখরিত করে তোলে। কিন্তু এ সময় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আলাপ-আলোচনার আড়ালে সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে এবং ২৫ মার্চ 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর পৈশাচিক গণহত্যা শুরু করে। এ সময় যে অনুপ্রেরণায় বাঙালি আপামর জনসাধারণ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তা হলো ৭ মার্চের ভাষণ ও অসহযোগ আন্দোলন এবং দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সৃষ্টি হয় বাঙালির মননে দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। অনেক প্রত্যাশা ও স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ তার যাত্রা আরম্ভ করে।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By

Historical Speech of Seventh March of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

একটি ভাষণ বা বক্তৃতা পথহারা জাতিকে নিয়ে যেতে পারে আলোর পথে। পৌঁছে দিতে পারে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। যে কোনো আদর্শ ও ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভাষণ বা বক্তৃতার কোনো বিকল্প নেই। ধর্ম, রাজনীতি, সমাজ সংগঠনসহ প্রতি ক্ষেত্রে সফল নেতাদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে অবিস্মরণীয় এক বা একাধিক ভাষণ। কোনো কোনো ভাষণ এতটাই গতিময় যার তাৎপর্য কোনো দিন ফুরায় না, স্থায়ী আসন করে নেয় ইতিহাসের পাতায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭মার্চের ভাষণ তারই একটি। এই ভাষণ গোটা বাঙালি জাতিকে জাগ্রত করেছিল, বাহুতে শক্তি যুগিয়েছিল, স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিযে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।

পাকিস্তানি সরকারের সীমাহীন বৈষম্য, শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) বাঙালি জাতির উদ্দেশ্যে প্রায় দশ লক্ষ লোকের এক বিশাল জনসভায় সর্বকালের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ প্রদান করেন, যা ইতিহাসে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ নামে প্রসিদ্ধ। এ ভাষণ বাঙালি জাতির ইতিহাসের যেমন এক অনন্য দলিল তেমনি বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে। ২ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সারা বাংলায় পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অসহযোগ চলছিল। তৎকালীন পাকিস্তানি জনগণই শুধু নয়, আন্তর্জাতিক বিশ্ব অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিল, বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে কী বলেন? পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য এ ছিল অন্তিম মুহূর্ত। অন্যদিকে স্বাধীনতার চেতনায় প্রদীপ্ত বাঙালি জাতির জন্য এ ভাষণ ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করে জাতীয় মুক্তি বা কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে চূড়ান্ত সংগ্রামের সূচনা।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তারিখে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণ

ভাইয়েরা আমার,

আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়। কি অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের পর বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে ও আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল অ্যাসম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো এবং এদেশকে আমরা গড়ে তুলবো। এদেশের মানুষ অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সাথে বলতে হয় ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে আয়ুব খান 'মার্শাল-ল' জারী করে ১০ বছর 'পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনে ৭ জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে আয়ুব খানের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন-গণতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম। তারপর অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সাথে দেখা করেছি।

আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে তাকে অনুরোধ করলাম, ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে হবে। আমি বললাম, ঠিক আছে আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসবো। আমি বললাম, অ্যাসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করবো-এমনকি আমি এ পর্যন্তও বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।

ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন যে, আলোচনার দরজা বন্ধ নয়, আরো আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করলাম- আপনারা আসুন, বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসে তাহলে কসাইখানা হবে অ্যাসেমরি। তিনি বললেন, যে যাবে তাকে মেরে ফেলা হবে, যদি কেউ অ্যাসেম্বলিতে আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচী পর্যন্ত দোকান জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, অ্যাসেম্বলি চলবে। তারপর হঠাৎ ১ তারিখে অ্যাসেম্বলি বন্ধ করে দেওয়া হলো।
ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে অ্যাসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম, আমি যাবো। ভুট্টো বললেন, তিনি যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম থেকে এখানে আসলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো, দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্ধ করার পর এদেশের মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।

আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করুন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সবকিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপনার ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো, তারা শান্তি-পূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। কি পেলাম আমরা? আমরা পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরিব-দুঃখী নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে-তার বুকের উপর হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানে সংখ্যাগুরু-আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
টেলিফোনে আমার সাথে তার কথা হয়। তাকে আমি বলেছিলাম, জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কীভাবে আমার গরিবের উপর, আমার মানুষের বুকের উপর গুলি করা হয়েছে। কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে, কী করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি নাকি স্বীকার করেছি ১০ তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স হবে।

আমি তো অনেক আগেই বলে দিয়েছি কীসের রাউন্ড টেবিল, কার সাথে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের সাথে বসবো? হঠাৎ আমার সাথে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টার গোপন বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন তাতে সমস্ত দোষ তিনি আমার উপর দিয়েছেন, বাংলার মানুষের উপর দিয়েছেন।
ভাইয়েরা আমার,

২৫ তারিখে অ্যাসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ঐ শহীদের রক্তের উপর পাড়া দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না। অ্যাসেম্বলি কল করেছেন, আমার দাবি মানতে হবে। প্রথমে সামরিক আইন 'মার্শাল-ল' Withdraw করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত যেতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখবো, আমরা অ্যাসেম্বলিত বসতে পারবো কি পারবো না। এর পূর্বে অ্যাসেম্বলিতে বসতে আমরা পারি না।

আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাছারি, আদালত-ফৌজদারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে সেজন্য সমস্ত অন্যান্য যে জিনিসগুলো আছে, সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিক্সা, গরুর গাড়ি, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে-শুধু সেক্রেটারীয়েট, সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তর, ওয়াপদা, কোনোকিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়-তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু-আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। ৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।

'আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দুর তাদের পারি সাহায্য করতে চেষ্টা করব। যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা-পয়সা পৌঁছে দেবেন। আর এই ৭ দিনের হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে, প্রত্যেক শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছে দেবেন। সরকারী কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হচ্ছে, ততদিন খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো-কেউ দেবে না। শুনুন, মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায়- হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি, অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়।
মনে রাখবেন, রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে তাহলে কোন বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশনে আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। ২ ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মাইনেপত্র নিতে পারে। পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ববাংলায় চলবে এবং বিদেশের সাথে দেয়ানেয়া চলবে না।
কিন্তু যদি এই দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝেসুঝে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রাম, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।

HISTORIC SPEECH OF THE FATHER OF THE NATION, BANGABANDHU SHEIKH MUJIBUR RAHMAN OF THE 7TH MARCH, 1971

My brothers,
I have come before you today with a heart laden with sadness. You are aware of everything and know all. We have tried with our lives. And yet the sadness remains that today, in Dhaka, Chittagong. Khulna. Rajshahi and Rangpur the streets are soaked in the blood of my brothers. Today the people of Bengal desire emancipation, the people of Bengal wish to live, the people of Bengal demand that their rights be acknowledged.

What wrong have we committed? Following the elections, the people of Bangladesh entrusted me and the Awami League with the totality of their electoral support. It was our expectation that the Parliament would meet, there we would frame our Constitution, that we would develop this land, that the people of this country would achieve their economic, political and cultural freedom. But it is a matter of grief that today we are constrained to say in all sadness that the history of the past twenty three years has been the history of a persecution of the people of Bengal, a history of the blood of the people of Bengal. This history of the past twenty three years has been one of the agonising cries of men and women.

The history of Bengal has been a history where the people of this land have made crimson the streets and highways of this land with their blood. We gave blood in 1952; in 1954, we won the elections and yet were not permitted to exercise power. In 1958, Ayub Khan imposed Martial Law and kept the nation in a state of slavery for ten long years. On 7 June 1966, as they rose in support of the Six-Point movement, the sons of my land were mown down in gunfire. When Yahya Khan took over once Ayub Khan fell in the fury of the movement of 1969, he promised that he would give us a Constitution, give us democracy. We put our faith on him. And then history moved a long way, the elections took place. I have met President Yahya Khan. I appealed to him, not just as the majority leader in Bengal but also as the majority leader in Pakistan, to convene the National Assembly on 15 February. He did not pay heed to my appeal. He paid heed to Mr. Bhutto. And he said that the assembly would be convened in the first week of March. I went along with him and said we would sit in the parliament. I said that we would discuss matters in the Assembly. I even went to the extent of suggesting that despite our being in a majority, if anyone proposes anything that is legitimate and right, we would accept his proposal.

Mr. Bhutto came here. He held negotiations with us, and when he left, he said that the door to talk had not closed, that more discussions would take place. After that, I spoke to other political leaders. I told them to join me in deliberations so that we could give shape to a Constitution for the country. But Mr. Bhutto said that if members elected from West Pakistan came here, the Assembly would turn into a slaughter house, an abattoir. He warned that anyone who went to the Assembly would end up losing his life. He issued dire warnings of closing down all the shop from Peshawar to Karachi if the Assembly Session went ahead. I said that the Assembly Session would go ahead. And then, suddenly, on the first of March the Assembly Session was put off. Mr. Yahya Khan, in exercise of his powers as president, had called the National Assembly into Session; and I had said that I would go to the Assembly. Mr. Bhutto said he would not go. Thirty five members came here from West Pakistan. And suddenly the Assembly was put off. The blame was placed squarely on the people of Bengal, the blame was put at my door. Once the Assembly meeting was postponed, the people of this land decided to put up resistance to the act. I enjoined upon them to observe a peaceful general strike. I instructed them to close down all factories and industrial installations. The people responded positively to my directives. Through sheer spontaneity they emerged on to the streets. They were determined to pursue their struggle through peaceful means.

What have we attained? The weapons we have bought with our money to defend the country against foreign aggression are being used against the poor and down-trodden of my country today. It is their hearts the bullets pierce today. We are the majority in Pakistan. Whenever we Bengalis have attempted to ascend to the heights of power, they have swooped upon us.

I have spoken to him over telephone. I told him, "Mr. Yahya Khan, you are the President of Pakistan. Come, be witness to the inhuman manner in which the people of my Bengal are being murdered, to the way in which the mothers of my land are being deprived of their sons." I told him, "come, see and dispense justice". But he construously said that I had agreed to participate in a Round Table Conference to be held on 10 March. I have already said a long time ago, what RTC? With whom do I sit down to talk? Do I fraternise with those who have taken the blood of my people? All of a sudden, without discussing matters with me and after a secret meeting lasting five hours, he has delivered a speech in which he has placed all responsibility for the impasse on me, on the people of Bengal.

My brothers.
They have called the Assembly for the twenty-fifth. The marks of blood have not yet dried up. I said on the tenth that Mujibur Rahman would not walk across that blood to take part in a Round Table Conference. You have called the Assembly. But my demands must be met first. Martial Law must be withdrawn. All military personnel must be taken back to the barracks. An inquiry must be conducted into the manner in which the killings have been caused. And power must be transferred to the elected representatives of the people. And only then shall we consider the question of whether or not to sit in the National Assembly. Prior to the fulfilment of our demands, we cannot take part in the Assembly.
I do not desire the office of Prime Minister. I wish to see the rights of the people of this country established. Let me make it clear, without ambiguity, that beginning today, in Bangladesh, all courts, magistracies, government offices and educational institutions will remain closed for an indefinite period. In order that the poor do not suffer, in order that my people do not go through pain, all other activities will continue, will not come within the ambit of the general strike from tomorrow. Rickshaws, horse carriages, trains and river vessels will ply. The Supreme Court, High Court, Judge's Court, semi-government offices, WAPDA.-nothing will work. Employees will collect their salaries on the twenty-eighth. But if the salaries are not paid, if another bullet is fired, if any more of the people are murdered, it is my directive to all of you: turn every house into a fortress, resist the enemy with everything you have. And for the sake of life, even if I am not around to guide you, direct you, close off all roads and pathways.
We will strive them into submission. We will submerge them in water. You are our brothers. Return to your barracks and no harm will come to you. But do not try to pour bullets into my heart again. You cannot keep seventy five million people in bondage. Now that we have learnt to die, no power on earth can keep us in subjugation.

subjugation.
For those who have embraced martyrdom, and for those who have sustained injuries we in the Awami League will do all we can to relieve their tragedy. Those among you who can please lend a helping hand through contributing to our relief committee. The owners of industries will make certain that the wages of workers who have taken part in the strike for the past week are duly paid to them. I shall tell employees of the government, my word must be heard, and my instructions followed. Until freedom comes to my land, all taxes will be held back from payment. No one will pay them. Bear in mind that the enemy has infiltrated our ranks to cause confusion and sow discord among us. In our Bengal, everyone, be he Hindu or Muslim, Bengali or non-Bengali, is our brother. It is our responsibility to ensure their security. Our good name must not be sullied.
And remember, omployees at radio and television, if radio does not get our message across, no Bengali will go to the radio station. If television does not put forth our point of view, no Bengali will go to television. Banks will remain open for two hours to enable people to engage in transactions. But there will be no transfer of even a single penny from East Bengal to West Pakistan. Telephone and telegram services will continue in East Bengal and news can be despatched overseas.
But if moves are made to exterminate the people of this country, Bengalis must act with caution. In every village, every neighbourhood, set up Sangram Parishad under the leadership of the Awami League. And be prepared with whatever you have. Remember: Having mastered the lesson of sacrifice, we shall give more blood. God willing, we shall free the people of this land. The struggle this time is a struggle for emancipation. The struggle this time is a struggle for independence.
Joi Bangla!

৭ মার্চের ভাষণের প্রভাব ও গুরুত্ব

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দলিল। এটি পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণের একটি। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ৭ মার্চের ভাষণের প্রভাব ও গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বানের ফলে অসহযোগ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে এবং ঢাকার চারদিকে স্বাধীনতা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। একটি সার্বভৌম দেশের মধ্যে আর একটি স্বাধীন দেশের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। কাজেই ৭মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল একটা মাইলফলক। সেদিন বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা না দিলে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়তবা পারত না। তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে হয়তাবা বসে থাকত, আর স্বাধীনতা হতো সুদূরপরাহত। সুতরাং ৭ মার্চের ভাষণ একটি আলোর বিচ্ছুরণ। যে আলোয় পথ দেখেছিল পথ হারা বাঙালি জাতি। নিম্নে ৭ মার্চের ভাষণের বিশ্লেষণধর্মী কয়েকটি গুরুত্ব তুলে ধরা হলো-

১. স্বাধীনতার ঘোষণা বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণে বস্তুত স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। সমগ্র বাঙালি জাতি এই দিনে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ১৯ মিনিটের বক্তৃতায় 'মুক্তি' ও স্বাধীনতা শব্দ দুটি অনেকবার উচ্চারণ করেছেন। ভাষণের ৪র্থ বাক্যে তিনি বলেন, "আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়।" অষ্টম বাক্যে গিয়ে বলেন, "এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। এভাবে মুক্তি ও স্বাধীনতা কথা দুটি বঙ্গবন্ধু আপন করে নিয়েছেন এবং তা বাঙালির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। যা স্বাধীনতা ঘোষণারই নামান্তর। ভাষণের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে ভেসে ওঠে স্বাধীনতার অমোঘ বাণী "রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দিব, তবু দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।" এ ভাষণের প্রতিটি শব্দের মধ্যে স্বাধীনতার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ফলগুধারার মতো উদ্ভাসিত রয়েছে।

৩. মরণপণ সংগ্রামের প্রত্যয়দীপ্ত আহ্বান: বঙ্গবন্ধু তাঁর এ ভাষণে বাংলার জনগণকে সকল প্রকার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে
সাবধান থাকার পরামর্শ দেন এবং শত্রু মোকাবেলার যে আহ্বান জানান, তা বাঙালিদের জীবন বাজি রেখে মরণপণ সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে।

৪. আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের প্রত্যয়দীপ্ত ভাষণ আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ ভাষণের গুরুত্ব ও লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন, উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলকে পূর্ব বাংলার জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি সমর্থন প্রদানে আগ্রহী করে তোলে।
বিশ্বের ইতিহাসে ৭ মার্চের ভাষণ একটি স্থান দখল করে আছে। নরওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় পৃথিবীর সাত বিখ্যাত ব্যক্তির সাত বিখ্যাত ভাষণের মধ্যে উক্ত ভাষণটি স্থান পেয়েছে।

২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কোর The Memory of the World International Register এ মানব জাতির দালিলিক ঐতিহ্যের অন্যতম ডকুমেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। যা গোটা বাঙালি জাতির গৌরবের অহংকার। পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিতে থাকা নথিগুলো সংরক্ষণের লক্ষ্যে UNESCO ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে Memory of the World International Register কর্মসূচি চালু করে। এর রেজিস্টারে ১৯৯৭ থেকে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৪২৭টি ঐতিহাসিক দলিলও সংগ্রহ স্থান পেয়েছে। এ রেজিস্টারে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণটি বিশ্বের প্রথম ও সর্বশেষ মুখে উচ্চারিত কালজয়ী মহাকাব্য। এ ভাষণে রয়েছে রাজমাত্রিক বিশেষত্ব। মাত্র ১৮ মিনিট ভাষণে পুরো ক্যানভাস তুলে ধরেন।

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের সাথে তুলনামূলক পৃথিবীর অন্য বিখ্যাত ছয়টি ভাষণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের সাথে তুলনামূলক পৃথিবীর অন্য বিখ্যাত ছয়টি ভাষণ এখানে তুলে ধরা হলো:
১। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা (১৯১৮-২০১৩) তার অপূর্ব বক্তৃতা দ্বারা উজ্জীবিত করেন পৃথিবীর সব শোষিত মানুষকে। তার অনেক ভাষণের মধ্যে ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১ সেপ্টেম্বর আফ্রিকার ন্যাশনাল কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে বক্তৃতা স্মরণীয় হয়ে আছে অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে। বক্তৃতাটি তিনি শুরু করেন ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর চলমান শ্বেতাঙ্গদের নির্যাতনের কথা দিয়ে। স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন তার অমর বাণী, 'স্বাধীনতা অর্জনের কোন সহজ পথ নেই'।

২। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদ বিরোধী আর এক অবিসংবাদিত নেতা মার্টিন লুথার কিং (১৯২৯-১৯৬৮)। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটনের স্বাধীনতাকামী জনতার বিশাল সমাবেশে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের মতোই চির অম্লান। এ ভাষণে প্রথমে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করলেন স্বাধীনতার জন্য আয়োজিত মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমাবেশে যোগদানের সুযোগ পাওয়ার জন্য। এর পর তার বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হলো, “ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কোন প্রাপ্তি নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত নিগ্রোরা পুলিশের বর্ণনাতীত নির্যাতনের শিকার হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কোন প্রাপ্তি নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের শিশুরা কেবলমাত্র শ্বেতাঙ্গদের জন্য লেখা সাইনবোর্ড দেখবে। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন এই জাতি জাগ্রত হবে এবং মানুষের এই বিশ্বাসের মূল্যায়ন করবে, সব মানুষ জন্মসূত্রে সমান।”

৩। ভারতের অহিংস আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ ও ভারতের জাতির জনক মোহনদাস করমচাদ গান্ধী (মহাত্মা গান্ধী-১৮৬৯-১৯৪৮)। হিংসা নয়, বিদ্বেষ নয়, ত্যাগ আর ভালোবাসাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে তিনি ইতিহাসে ঠাঁই হয়ে আছেন। ব্রিটিশদের ভারতবর্ষ থেকে বিদায় এবং ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি আন্দোলনের ডাক দেন। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ আগস্ট তৎকালীন বোম্বের গাওলিয়া ট্যাক ময়দানে বক্তৃতায় ব্রিটিশদের ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'ব্রিটিশরা ভারত ছাড়'।

৪। ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল (১৮৭৫-১৯৫৫) একজন রাজনীতিবিদ হয়েও সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। জীবনে তিনি অসংখ্য বক্তৃতা দিলেও ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মে-এর ভাষণটি। যুদ্ধে সবার সমর্থন ও সহায়তা কামনা করে তিনি উচ্চারণ করেন, “দেওয়ার মত কিছুই নেই আমার, আছে শুধু রক্ত, কষ্ট, অশ্রু আর ঘাম। আমাদের নীতি হচ্ছে, জল, স্থল ও আকাশ পথে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, আমাদের সবটুকু সামর্থ্য আর ঈশ্বর প্রদত্ত শক্তি নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে এক নিষ্ঠুর দানবের বিরুদ্ধে। আর যদি প্রশ্ন কর আমাদের লক্ষ্য কী? উত্তর একটাই 'বিজয়'। পথ যতই দীর্ঘ কিংবা দুর্গম হোক বিজয় ছাড়া আমাদের বাঁচার কোন পথ নেই।”

৫। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকনের (১৮০৯-১৮৬৫) ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ১-৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের পেনসেলভেনিয়ার গেটিসবার্গে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে প্রায় আট হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯ নভেম্বর উক্ত মৃত্যুর স্মরণসভায় তিনি মাত্র ৩ মিনিটের বক্তৃতায় ইতিহাস গড়েন। বক্তব্যের শুরুতে তিনি স্মরণ করেন তার পূর্ব পুরুষদের, যারা ৪৭ বছর পূর্বে স্বাধীনতা ও সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমেরিকা মহাদেশের গোড়াপত্তন করেছিলেন। মাঝে তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে গৃহযুদ্ধে ক্ষয়-ক্ষতির করুণ আর্তনাদ। আর বক্তৃতা শেষ করেন একটি বাক্য দিয়ে, যা গণতন্ত্রের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা হিসেবে আজও বিবেচিত, "জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা সরকার এবং জনগণের জন্য সরকার পৃথিবী থেকে কখনো হারিয়ে যাবে না" (This Government of the people, by the people and for the people will never perish from the earth)!

৬। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বীপরাজ্য ভার্জিনিয়ার শাসক প্রেট্রিক হেনরী রিমেন্ডের সেইন্ট চার্চে ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মার্চ সর্বস্তরের জনগণের উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করেছিলেন, "জীবন কি এতটাই প্রিয়, আর শান্তি কি এতই মধুর যে, শিকল আর দাসত্বের দামে তাকে কিনতে হবে? আমি জানিনা অন্যরা কোন পথ বেছে নেবে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বলব, আমাকে স্বাধীনতা দাও, নয়তো মৃত্যু।"

জাতীয় চার নেতার সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত

সৈয়দ নজরুল ইসলাম (১৯২৫-১৯৭৫) বঙ্গবন্ধুর অন্যতম বিশ্বস্ত সহকর্মী বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ
নজরুল ইসলামের জন্ম ১৯২৫ সালে ময়মনসিংহ জেলার (বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলা) যশোদলে। তাঁর মাতা নুরুন্নেসা খাতুন এবং পিতা সৈয়দ আব্দুল রহিম। তিনি ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সসহ এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ঐ বছরই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) ভিপি নির্বাচিত হন। তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ (১৯৪৮)-এর অন্যতম সদস্য ছিলেন।

তিনি ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারের আয়কর অফিসার হিসেবে যোগদান করে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫১ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ইতিহাসের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালে 'ল' পাশ করে ময়মনসিংহ আদালতে আইন ব্যবসায় শুরু করেন। ১৯৫৭সালে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালের ৮ মার্চ কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত উক্ত পদে বহাল থাকেন। ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবিতে দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন শুরু হলে আইয়ুব সরকার আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। এ সময় সৈয়দ নজরুল ইসলাম দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তিনি ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১৭ নির্বাচনি এলাকা থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু যে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন করতে তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করেন। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে (শপথ গ্রহণ ১৭ই এপ্রিল) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম হন উপ-রাষ্ট্রপতি। শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে (পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি) সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। দেশ স্বাধীনের পর ২২ শে ডিসেম্বর ১৯৭১ সরকার মুজিবনগর থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৭২ সালের ৯ই এপ্রিল আওয়ামী লীগে পার্লামেন্টারি পার্টির সহকারী নেতা নির্বাচিত হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট একদল বিপথগামী সৈনিকের হাতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশে সামরিক আইন জারি হয়। খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। এর ফলে মুজিব সরকারের পতন ঘটে এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম মন্ত্রিত্ব হারান। ২৩ শে আগস্ট তিনি গ্রেফতার হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় অনধিকার প্রবেশকারী সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। তার নিহতের দিন ৩রা নভেম্বর জেলহত্যা দিবস হিসেবে প্রতিবছর পালন করা হয়। তিনি জাতীয় চার নেতার অন্যতম।

তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫-১৯৭৫): বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য সহকর্মী তাজউদ্দীন আহমদ
১৯২৫ সালের ২৩শে জুলাই গাজিপুর জেলার কাপাশিয়ার মধ্যবিত্ত এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৌলবি মো. ইয়াসিন খান এবং মাতা মেহেরুননেসা খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে তিনি অর্থনীতিতে বিএ অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি গঠিত পাকিস্তান ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ এবং ১৯৬৪ সালে কারাগারে থেকে 'ল' পাশ করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে অংশ নেন। পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশ নেন। তিনি 'সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' (১৯৪৮) এবং সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ (১৯৫২) উভয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে গ্রেফতার ও কারানির্যাতন ভোগ করেন। তিনি পূর্ব-পাকিস্তান যুবলীগ (এপ্রিল ১৯৫১) এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং ঐ বছরই ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪-র সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মনোনয়নে কাপাসিয়া অঞ্চল থেকে পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এ সময় তাজউদ্দিন আহমদ গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৯ সালে মুক্তি লাভকরেন। ১৯৬৪ সালের ৮ই মার্চ কাউন্সিল সভায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলের সম্মেলনে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এ সম্মেলনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৬৬ সালের ১৯ শে মার্চ কাউন্সিল সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রায় ৬ বছর ধরে এই পদে থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে ৬ দফাসহ অন্যান্য আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৬ সালে দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতারের পর ১৯৬৯-এ মুক্তি লাভের পর গণঅভ্যুথানে সক্রিয় অংশ নেন। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৫ আসন থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনে অন্যতম পরিচালক ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে তিনি পালিয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে বসে তিনি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুজিবনগর সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। তিনি তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সাথে বৈঠক করেন। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে (শপথ গ্রহণ ১৭ই এপ্রিল) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম হন উপ-রাষ্ট্রপতি এবং তিনি হন প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক। মুক্তিবাহিনীর জন্য অস্ত্র সংগ্রহ, যুদ্ধ পরিচালনা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের ব্যাপারে তাজউদ্দিন আহমদের কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা সর্বজন জ্ঞাত। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের সংবিধান রচনায় তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩-এর নির্বাচনে তিনি ঢাকা-২২ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এসময় ব্যাংক, বিমা, বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ক্ষেত্রে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট একদল বিপথগামী সৈনিকের হাতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশে সামরিক আইন জারি হয়। খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। এর ফলে মুজিব সরকারের পতন ঘটে। সৈয়দ নজরুল ইসলামের সাথে ২৩ শে আগস্ট ১৯৭৫ তিনি গ্রেফতার হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় অনধিকার প্রবেশকারী সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। তার নিহতের দিন ৩রা নভেম্বর জেল হত্যা দিবস হিসেবে প্রতিবছর পালন করা হয়। তিনি জাতীয় চার নেতার অন্যতম।

ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী (১৯১৯-১৯৭৫): ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ১৯১৯ সালের ১৬ ই জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ
জেলার কাজিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হরফ আলী সরকার এবং মাতার নাম বেগম রওশন আরা। তিনি ১৯৪১ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ এবং ১৯৪৫ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং 'ল'পাস করে পাবনা আদালতে আইন ব্যবসায় শুরু করেন। তিনি পাবনা আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচিত হন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত তিনি পাবনা জেলার মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি এবং একই সাথে লীগের গার্ড বাহিনীর পাবনা জেলা শাখার ক্যাপ্টেন হন। মূলত তখন থেকেই তাঁর নামের সাথে ক্যাপ্টেন কথাটি যুক্ত হয়।

১৯৫১ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করে আমৃত্যু আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য পদে বহাল থাকেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে পাবনা জেলার নেতৃত্ব দেন এবং কারাভোগ করেন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট থেকে মনোনয়ন নিয়ে পাবনা-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে পূর্ববঙ্গ আইনসভার সদস্য হন। ১৯৫৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ-কংগ্রেস দলীয় পূর্ববঙ্গ কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করলে নিরাপত্তা আইনে তিনি গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৯ সালের শেষের দিকে মুক্তি লাভ করেন। ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলনের তিনি ছিলেন অন্যতম রূপকার। ১৯৬৭ সালের ১২ই নভেম্বর আওয়ামী লীগের অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৭০-এর ১৭ই ডিসেম্বর নির্বাচনে পাবনা-১ আসন থেকে পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ২৫শে মার্চের গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের পর তিনি অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ভারতে গমন করেন এবং যোগাযোগ হয় অন্যান্য নেতাদের সাথে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ১৯৭১ সালে ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে (শপথ গ্রহণ ১৭ই এপ্রিল) তিনি অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থ, শিল্প, প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ পাবনা-১ আসন থেকে তিনি পুনরায় জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে দেশে সংসদীয় সরকারের পরিবর্তে একদলীয় রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ২৪শে ফেব্রুয়ারি (১৯৭৫) কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে তিনি সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট একদল বিপথগামী সৈনিকের হাতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশে সামরিক আইন জারি হয়। খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। এর ফলে মুজিব সরকারের পতন ঘটে। ২৩শে আগস্ট (১৯৭৫) সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিনের সাথে তিনি গ্রেফতার হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় অনধিকার প্রবেশকারী সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনিও নির্মমভাবে নিহত হন। ৩রা নভেম্বর জেলহত্যা দিবস হিসেবে প্রতিবছর পালন করা হয়। তিনি জাতীয় চার নেতার একজন। বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে তাঁর অবদান স্মরণীয়।

এ.এইচ.এম.কামারুজ্জামান (১৯২৬-১৯৭৫) পুরোনাম আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। জন্ম ১৯২৬ সালের ২৬শে জুন নাটোরের বাগাতিপাড়ায় বনেদি জমিদার পরিবারে। পিতা আবদুল হামিদ ও মাতা বেগম জেবুন্নিসা। ১৯৪৪ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ স্নাতক পাস করেন। ১৯৫৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'ল' পাস করেন এবং রাজশাহী জজকোর্টে আইন ব্যবসায় শুরু করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৫-১৯৬৪ পর্যন্ত তিনি রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৬২-১৯৬৯ পর্যন্ত জাতীয় পরিষদে সম্মিলিত বিরোধী দলের সম্পাদক হন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনে তাঁর অবদান অপরিসীম। ১৯৬৭-১৯৭০ পর্যন্ত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও ১৯৭০-১৯৭১ পর্যন্ত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে রাজশাহী-৬ আসন থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ২৫শে মার্চের গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের পর তিনি শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমদ ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বগুড়া হয়ে ভারতে গমন করেন এবং যোগাযোগ করেন ভারতে অবস্থানরত অন্যান্য নেতাদের সাথে। সেখানেই মুজিবনগর সরকার গঠনের পরিকল্পনা হয়। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে (শপথ গ্রহণ ১৭ই এপ্রিল) তিনি ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী নিযুক্ত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২৩শে ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র, সাহায্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৭৩-এর নির্বাচনে রাজশাহী-১০ ও রাজশাহী-১১ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪-এর ২০শে জানুয়ারি কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৫-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উক্ত পদে বহাল থাকেন। ১৯৭৫ সালে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠিত হলে তিনি শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট একদল বিপথগামী সৈনিকের হাতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশে সামরিক আইন জারি হয়। খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। এর ফলে মুজিব সরকারের পতন ঘটে। কামারুজ্জামান মন্ত্রিত্ব হারান এবং গ্রেফতার হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় অনধিকার প্রবেশকারী সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আহমদের সাথে তিনিও নির্মমভাবে নিহত হন। এই চার নেতার মৃত্যু দিন '৩রা নভেম্বর' জেলহত্যা দিবস হিসেবে প্রতিবছর পালন করা হয়। কামারুজ্জামান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের স্থপতিদের একজন। বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে। (তথ্যসূত্র: বাংলা একাডেমী রিতাভিধান)

সারসংক্ষেপ

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন: পাকিস্তানি শাসনামলে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচন বা যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। পূর্ববাংলার আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলামী, খেলাফত রাব্বানী এবং গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। এ.কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠন করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকচক্রের চক্রান্তের ফলে দুমাসের মধ্যে এ মন্ত্রিসভায় পতন ঘটে।

পাক-ভারত যুদ্ধ: কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৭ দিন স্থায়ী এই যুদ্ধে পূর্ববাংলার সৈন্যরা শৌর্যবীর্যের পরিচয় দেয়। তথাপিও পূর্ববাংলার প্রতি কোনো সহানুভূতি না দেখিয়ে পাকিস্তানি শাসকরা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ পুনর্গঠন পূর্ববাংলার প্রতি চাপিয়ে দেয়। যুদ্ধকালীন সময় পূর্ববাংলা সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকে যা পূর্ববাংলার অসহায়ত্বকে সমান করে।

অক্টোবর বিপ্লব: ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা অনেক শখ করে আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক -আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। এর কিছুদিন পর আইয়ুব খান অপ্রত্যাশিতভাবে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে - প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে অপসারণ করে আইয়ুব খান নিজেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ ঘটনাটি ছিল ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ অক্টোবর। আইয়ুব খানের অক্টোবর মাসে এই ক্ষমতা গ্রহণই "অক্টোবর বিপ্লব।"

সামরিক শাসন: পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই গণতান্ত্রিক ধারায় স্বৈরশাসন চলতে থাকে। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিরোধী জোট
জয়লাভ করলেও তারা পাকিস্তান রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পান স্বল্প সময়ের জন্য। কারণ ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মে যুক্তফ্রন্ট সরকার বাতিল করে পূর্ববাংলায় গভর্নরের শাসন জারি করা হয়। মাত্র ৪ মাসে ৭ মন্ত্রিসভার পতন হয়। কেন্দ্রীয় সরকার ৩ বার গভর্নরের শাসন জারি করে। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মার্চ জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন। তার শাসনামলে সামরিকবাহিনী রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা মালিক ফিরোজ খানের সংসদীয় সরকার উৎখাত করে দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করা হয় সেনা প্রধান আইয়ুব খানকে। মেজর জেনারেল ওমরাও খান পূর্ব পাকিস্তানে (পূর্ববাংলায়) সামরিক প্রশাসক নিযুক্ত হন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে অর্থাৎ ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান ইস্কান্দার মির্জাকে অপসারণ করে নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সামরিক কায়দায় দেশ পরিচালনা করেন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করলে জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা দখল করে সামরিক কায়দায় শাসনকার্য পরিচালনা করেন।

মৌলিক গণতন্ত্র: আইয়ুব খান কর্তৃক উদ্ভাবিত এক অভিনব পদ্ধতির নাম মৌলিক গণতন্ত্র। আইয়ুব খান সুচতুর
রাজনীতিবিদ ছিলেন। ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে তিনি নানান কৌশল অবলম্বন করেন। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ অক্টোবর "অক্টোবর বিপ্লব" প্রথম বার্ষিকীতে তাঁর বহুদিনের উদ্ভাবিত মৌলিক গণতন্ত্রের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। মৌলিক গণতন্ত্র সম্পর্কে আইয়ুব খান বলেন, এদেশে শিক্ষিতদের হার কম বিধায় এখানে পাশ্চাত্য গণতন্ত্র ফলবতী হবে না। তিনি বলেন, প্রতি ১০০০ থেকে ১৫০০ লোকের মধ্য দিয়ে একজন গণতন্ত্রী নির্বাচিত হবেন। এভাবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে দু'অঞ্চলের জন্য ৪০,০০০ করে মোট ৮০,০০০ মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচিত হবে। এই নির্বাচিত মৌলিক গণতন্ত্রীরাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবেন। এই মৌলিক গণতন্ত্রীদের আস্থা ভোটে আইয়ুব খান প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন (১৯৫৯)।

ছয় দফা দাবি: ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলের এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির স্বরূপ ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই ছয় দফা দাবির মধ্যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ লুকায়িত ছিল। ছয় দফা দাবিকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তা শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
আগরতলা মামলা: ছয় দফা দাবি মেনে নেওয়া প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই ছয় দফা দাবি কেন্দ্রিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য আইয়ুব খান দমননীতির আশ্রয় নেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজনসহ দেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দকে দেশের শত্রু চিহ্নিত করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে আগরতলার মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে এ মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হলে আইয়ুব খানের পতন ত্বরান্বিত হয়।

বৈষম্যমূলক নীতি: বৈষম্যমূলক নীতি হচ্ছে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই - পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রশাসন, সামরিক সর্বক্ষেত্রে এ বৈষম্য ছিল পাহাড়সম। এই বৈষম্যে থেকে মুক্ত হতে বাঙালিরা স্বাধিকার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং অনেক চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে।

-উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণঅভ্যুত্থান স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ছয় দফা ও এগারো দফা ভিত্তিক বাঙালির ন্যায্য দাবি দমন করার জন্য আইয়ুব সরকার যে মামলা হামলার আশ্রয় নিয়েছিল ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণঅভ্যুত্থান তা নস্যাৎ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খানের পতন ঘটে।

সাধারণ নির্বাচন-১৯৭০: পাকিস্তানি সরকারের পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর সার্বজনীন প্রত্যক্ষ
ভোটে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে পাকিস্তানি শাসকচক্র একের পর এক ষড়যন্ত্র শুরু করে। ইয়াহিয়া খান কর্তৃক জাতীয় পরিষদের তারিখ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

অসহযোগ আন্দোলন: ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১ মার্চের এক ঘোষণায় ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থাগিত ঘোষণা করে। কোনো কারণ ছাড়াই এ ঘোষণায় পূর্ববাংলা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩ মার্চ ১৯৭১ পল্টন ময়দানে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...