hsc

৭.৪ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয়াদি

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

3

The Subjects of the Liberation War

সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি

মুক্তিযুদ্ধকে সর্বদলীয় চরিত্রে রূপ দেওয়ার জন্য ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মুজিবনগর সরকারের উদ্যোগে ৯ সদস্যের একটি সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয়। কেননা যেকোনো বৃহৎ কাজের জন্য সকলের সার্বিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। এ বিষয় উপলব্ধি করেই মুজিবনগর সরকার উপদেষ্টা কমিটি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কমিটিটি
ছিল নিম্নরূপ:

আহ্বায়কতাজউদ্দীন আহমেদ (মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি),
সদস্যমাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (ন্যাপ ভাসানী)
সদস্যঅধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ (মস্কোপন্থি ন্যাপ-এর প্রতিনিধি)
সদস্যমনিসিংহ (কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি)
সদস্যমনোরঞ্জন ধর (কংগ্রেস দলের নেতা)
সদস্যক্যাপ্টেন মনসুর আলী (আওয়ামী লীগ দলের প্রতিনিধি)
সদস্যএ.এইচ.এম কামরুজ্জামান (আওয়ামী লীগ দলের প্রতিনিধি)
সদস্যখন্দকার মোশতাক আহমেদ (মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি),
সদস্যমোহাম্মদ তোয়াহা (পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি)

উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, মুজিবনগর সরকার একটি সুশৃঙ্খল সরকার কাঠামোর আওতায় সফলতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে মাত্র নয় মাসের মধ্যে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, এই নয় মাস মুজিবনগর প্রশাসনের সকল স্তরের সদস্য নানাবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাদের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে দেশমাতৃকার কল্যাণে অবদান রেখেছেন।

গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধ

যুদ্ধ পদ্ধতি ছিল গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম পর্যায়ের যুদ্ধগুলো ছিল পরিকল্পনাহীন। অস্ত্র প্রাপ্তি ও প্রশিক্ষণ এ দু'কারণে মুক্তিযোদ্ধারা জুলাই মাসের আগে পরিকল্পিত কোনো আক্রমণ করতে সক্ষম হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আস্থার অভাবে প্রথম দিকে ভারত অস্ত্র দেয়নি। অবশ্য আগস্ট মাসে ৬৭ কোটি টাকার অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল। আগস্ট মাস থেকেই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা পদ্ধতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকসেনা ও তাদের দোসরদের ওপর হামলা ও পাল্টা হামলা চালায়। হামলা চালায় পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটি, সামরিক স্থাপনার ওপর। রাস্তা কেটে, ব্রিজ ভেঙে, ট্রেন লাইন উপরে ফেলে পাকবাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাদের অবরুদ্ধ করে ফেলে। অক্টোবরের শেষের দিকে মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা আক্রমণের পাশাপাশি সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে পাকবাহিনীকে দিশেহারা করে ফেলে। এ সময় মুক্তিবাহিনী ৩,৫৫৯ জন পাক সৈনিক হত্যা করতে সক্ষম হয়। পাকিস্তানের জনসংযোগ অফিসার মেজর সিদ্দিক মালিক বলেছেন, "প্রথম দিকে লাশ আমরা আকাশপথে পাকিস্তানে পাঠিয়েছি। কিন্তু জুলাই-আগস্ট মাসে সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টির ভয়ে মৃতদেহ পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া হয়।"

স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি নৌ যুদ্ধেও মুক্তিযোদ্ধারা আগস্ট মাসের মাঝামাঝি ব্যাপক অভিযান চালায়। নৌপথে অভিযানের নাম ছিল অপারেশন জ্যাকপট। এ অভিযানের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বাংলাদেশে নৌপথে সৈন্য ও অন্যান্য সমর সরঞ্জাম পরিবহন বানচাল করা। গেরিলাদের আক্রমণে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিগুলো প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা ৪৫টি অভিযান চালিয়ে পাকিস্তানি এম.ভি হুরমুজ ও এম.ভি আব্বাস যুদ্ধ জাহাজসহ ১২৬টি যুদ্ধ জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। পাকবাহিনীর সীমাহীন হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধ্বংসযজ্ঞ এদেশের সকল পেশার জনগণকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে। তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে শামিল হতে থাকে। যেকোনো মূল্যে স্বাধীনতা অর্জনই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, নারী, শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, শিল্পী, কামার, কুমার, জেলে বিভিন্ন পেশার মানুষ মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববদ্যালয়ের ছাত্ররা বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বাঙালি ছাত্র যুবকরা শত্রুকে আঘাত হানবার প্রয়োজনীয় রণকৌশল শিখে নিয়ে দ্রুত বাংলার বনে-জঙ্গলে-গ্রামে-গঞ্জে এবং শহরে-নগরে ঢুকে পড়ে। গেরিলা পদ্ধতিতে চলে আক্রমণ। মুক্তিযোদ্ধারা সুযোগ বুঝে পাকবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকবাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। কখনো কখনো পাকবাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনীর গেরিলা হামলায় পাকিস্তানি সুসজ্জিত বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জনগণের নিকট গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিফৌজ নামে সুপরিচিত ছিল। গেরিলা হামলা পাকবাহিনীর নিকট আতঙ্ক ছিল। ঢাকা শহরে - গেরিলা বাহিনী হামলা করে আইয়ুব খানের কু-কর্মের দোসর সাবেক গভর্নর মোনায়েম খানকে তার বাসভবনে হত্যা করে। গেরিলা বাহিনীর এরূপ নজিরবিহীন সাফল্য মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে গেরিলা বাহিনীর অবদান অনেকখানি।

যৌথবাহিনীর অভিযান

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে যৌথবাহিনী গঠন এবং অভিযান একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ভারতীয় বাহিনী নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিক্ষিপ্তভাবে প্রবেশ করতে থাকে। এদিকে মুক্তিবাহিনী গেরিলা ও সম্মুখ উভয় আক্রমণ করে ঢাকা, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ এবং খুলনা প্রভৃতি বড় বড় শহর থেকে পাকবাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকের নির্দেশে নভেম্বরে শেষের দিকে পাকিস্তানি বাহিনী ভারতের অমৃতসর, যোধপুর, পাঠনকোর্ট এবং আগ্রায় বিমান হামলা চালায়। এই বিমান হামলার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে পাক-ভারত যুদ্ধে রূপদান। ফলে বাধ্য হয়ে ভারত ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত যুদ্ধে রূপদানে ব্যর্থ হয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আর এক ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের প্রাণপণ চেষ্টা করেন। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন 'নিক্সন'। তিনি যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে সপ্তম নৌবহর পাঠান এবং তা বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এসেছিল। পাশাপাশি জাতিসংঘের l

নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো' প্রয়োগের ফলে উক্ত প্রস্তাব কার্যকর হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের অষ্টম নৌবহরের হুমকির মুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সপ্তম নৌবহর ফেরত নিতে বাধ্য হয়। ২১ নভেম্বর ১৯৭১, বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যৌথ কমান্ডার গঠন করে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে এটি গঠন করে। ভারতের লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরা এ বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত হন। যৌথ কমান্ডারের উদ্যোগে বাংলাদেশের রণাঙ্গনকে ৪টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। ৩ ডিসেম্বর ভারতের অমৃতসরসহ বিভিন্ন বিমান ঘাঁটিতে পাকিস্তানি বিমান বাহিনী হামলা চালালে শুরু হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ। ঐ দিনই 'যৌথ কমান্ডার' ৩৩টি পাকিস্তানি বিমান ভূপাতিত করে। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, সর্বপ্রথম যশোর শত্রু মুক্ত হয়। এরপর ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লালমনিরহাট মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে। কুমিল্লা ও ফেনীতে ৭০০ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। ঐ দিন অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর সর্ব প্রথম ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। পরের দিন যশোর বিমান বন্দরের পতন ঘটে। ১১-১২ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ, হিলি, কুষ্টিয়া, খুলনা, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর ও সিরাজগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়। অতঃপর যৌথবাহিনী ঢাকা দখলকে গুরুত্ব দেয়। ১২ ডিসেম্বর যৌথবাহিনী ঢাকায় পাক সামরিক অবস্থানে বিমান হামলা অব্যাহত রেখে চারদিক থেকে আক্রমণ চালিয়ে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে। ভারতের স্বীকৃতির সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের পট পরিবর্তন ঘটে। একদিকে মুক্তিযোদ্ধারা উৎসাহিত হয়; অন্যদিকে পাক সেনারা কোণঠাসা হয়ে যায়। ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রকারীরা কিন্তু বসে রইল না। এবার তারা যে পরিকল্পনা গ্রহণ করল তা সভ্যতার সকল নৃশংসতাকে হার মানিয়ে দিল। তারা বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করল। বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা না দেখে তারা বাংলার বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে (১৪ ডিসেম্বর) তাদের এই কাজে সহযোগিতা করে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী। বুদ্ধিজীবী হত্যায় তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। পাকহানাদার বাহিনীর এরূপ নৃশংসতায় বাংলার দামাল ছেলেরা দমে মে না না। গিয়ে বরং আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক-বাহিনী এবং তাদের দোসরদের ওপর।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...